📘 আল্লাহর ভয়ে কাঁদা > 📄 তাহাজ্জুদে কান্না

📄 তাহাজ্জুদে কান্না


হুজদ মানে ঘুম। তাহাজ্জুদ মানে ঘুম ত্যাগ করা। এ থেকেই শেষ রাতের নামাযকে তাহাজ্জুদের নামায বলা হয়। রাতের তিন ভাগের দু'ভাগ শেষ হলে এ নামাযের সময় শুরু হয় এবং সেহরীর শেষ সময় পর্যন্ত চলে। সময়টা এমনভাবেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে যে, ঘুম থেকে জেগেই এ নামায আদায় করতে হয়। এ নামাযকে কিয়ামুল লাইলও বলা হয়, যেহেতু রাতে দাঁড়িয়ে এ নামায আদায় করা হয়।
সকল নফল নামাযের মধ্যে তাহাজ্জুদই শ্রেষ্ঠ। এ বিষয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস পেশ করা হলো-
١. أَفْضَلُ الصَّلوةِ بَعْدَ الْمَفْرُوضَةِ صَلَاةٌ فِي جَوْفِ اللَّيْلِ .
(أحمد)
১. “ফরয নামাযের পর শেষ রাতের নামাযই শ্রেষ্ঠ।”- (আহমদ)
أشْرَفُ أُمَّتِي حَمَلَةُ الْقُرْآنِ وَأَصْحَابُ اللَّيْلِ .
(البيهقي)
২. "আমার উম্মতের সবচেয়ে সম্মানিত হলো কুরআনের ধারক ও বাহক এবং রাতের অধিবাসী (রাত জেগে ইবাদাতকারী)।” – (বায়হাকী)
قَبْلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيُّ الدُّعَاءِ أَسْمَعُ قَالَ جَوْفِ اللَّيْلِ الْآخِرِ وَدُبُرَ الصَّلاتِ الْمَكْتُوبَةِ . اَلتَّرْمِذِى)
৩. “জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! কোন দোয়া সবচেয়ে বেশি মকবুল। জওয়াব দিলেন, শেষ রাতের ও ফরয নামাযের পরের দোয়া।” -(তিরমিযী)
عَلَيْكُمْ بِقِيَامِ اللَّيْلِ فَإِنَّهُ دَابُ الصَّالِحِينَ قَبْلَكُمْ وَهُوَ قُرْبَةٌ لَّكُمْ إِلَى رَبِّكُمْ وَمُكَفِّرْ لِلسَّيِّاتِ وَمِنْهَاةً عَنِ الْإِثْمِ .
৪. "রাত জাগা তোমাদের কর্তব্য। এটা তোমাদের পূর্ববর্তী নেক লোকদের তরীকা, তোমাদের রবের নৈকট্য, আগের গুনাহের কাফ্ফারা এবং গুনাহ করা থেকে বিরত রাখার উপায়।” (তিরমিযী)
ه رَحِمَ اللهُ رَجُلاً قَامَ مِنَ اللَّيْلِ فَصَلَّى وَأَيْقَظَ إِمْرَانَهُ فَصَلَّتْ فَإِنْ آبَتْ نَضَحَ فِي وَجْهِهَا الْمَاءَ .
رحِمَ اللهُ امْرَةً قَامَتْ مِنَ اللَّيْلِ فَصَلَّتْ وَأَيْقَظَتْ زَوْجَهَا فَصَلَّى فَإِنْ أَبَى نَضَحَتْ فِي وَجْهِهِ الْمَاء ۔ (ابو داود ونسائی)
৫. “আল্লাহ ঐ লোকের উপর রহম করুক যে রাতে উঠে, নামায আদায় করে ও তার স্ত্রীকে জাগায় এবং সেও নামায পড়ে। যদি সে উঠতে না চায় তাহলে তার মুখে পানি ছিটায়।
আল্লাহ ঐ মহিলার উপর রহম করুক যে রাতে উঠে, নামায পড়ে ও তার স্বামীকে জাগায় এবং সেও নামায পড়ে। যদি সে উঠতে না চায় তাহলে তার মুখে পানি ছিটায়।” – (আবু দাউদ ও নাসাঈ)
আসলেই শেষ রাতে উঠা আল্লাহর সাথে মহব্বতের সম্পর্কেরই প্রতীক। দুনিয়া যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন ঘুমের স্বাদ ও বিছানার মায়া ত্যাগ করা তার পক্ষেই সম্ভব যে আল্লাহর মহব্বতের কাংগাল। এ স্বাদ যে পায় তার পক্ষে এটা কঠিন মনে হয় না।

📘 আল্লাহর ভয়ে কাঁদা > 📄 নিজেকে কাঁদাও

📄 নিজেকে কাঁদাও


আর জেনে রাখুন যে, নিজেকে কাঁদানোর প্রতিদান সত্যিকারের কান্নার চেয়ে কম হবে তথাপি আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া পরবশ হতে পারেন। আর এটাই কান্নার উপায়। কেননা যে ব্যক্তি নিজেকে কাঁদায় সে মূলত নিজের নফসের বিরুদ্ধে কঠিন সংগ্রাম করে এবং নিজের জবাবদিহিতা নিজে নেয় এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের প্রচেষ্টা চালায়।
আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ .
যারা আমার জন্য (আল্লাহর পথে) সংগ্রাম সাধনা করবে তাদেরকে আমি আমার পথ দেখাব।”১০৬
অতএব যে ব্যক্তিই তার অন্তরকে কাঁদাতে চেষ্টা করবে আল্লাহ ঐ ব্যক্তিকে কায়মনো বাক্যে কাঁদতে এবং এক্ষেত্রে সফলতা অর্জনে সঠিক পথ নির্দেশ প্রদান করবেন।
আনাস (রা) হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছেন যে, হে মানুষ! কাঁদো, যদি তোমার কান্না না আসে তবে কান্নার ভান কর। অবশ্যই জাহান্নামীরা ততক্ষণ পর্যন্ত কাঁদবে যতক্ষণ না তাদের গাল ভিজে যায়, অশ্রু প্রবাহিত হয় এবং শুকিয়ে যায়। এরপর (চোখ দিয়ে) রক্তক্ষরণ হওয়া পর্যন্ত তারা কাঁদবে এবং তাদের চোখে গর্ত হয়ে যাবে।"১০৭
এ পথে চলতে তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে আদেশ করেছেন কাঁদতে অথবা কান্নার ভান করতে। তিনি ﷺ জাহান্নামবাসীদের কান্নার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন অর্থাৎ (তিনি বলেছেন) তাদের চোখের পানি গাল বেয়ে প্রবাহিত হবে স্রোতস্বীনি নদীর মতো যতক্ষণ না তা নিঃশেষ হয়। এরপর তা শুকিয়ে রক্ত প্রবাহিত হবে এমনকি সেখানে গর্ত হয়ে যাবে।
এরপর আর তুমি কী চাইতে পার, হে আল্লাহর বান্দা! তোমার কান্না (আসার) জন্য আর কী লাগবে? আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি যে এটা একটি গভীর ও গুরুতর হুঁশিয়ারি, এ হুঁশিয়ারি তোমার তাওবা আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া এবং কাঁদার জন্য যথেষ্ট।
আপনি কি সত্যিই এ দৃশ্য (জাহান্নাম ও তিরস্কার) থেকে নিরাপদ? আপনি কি (খালেস) বান্দা ও জান্নাতবাসী হওয়ার ব্যাপার নিশ্চিত? (নিশ্চিত না) তাই কাঁদুন এবং অশ্রু বিসর্জন দিন এজন্য নয় যে পৃথিবীতে আপনি পুরস্কৃত হবেন; বরং কেয়ামতের দিন রক্তকান্নার পূর্বেই পৃথিবীতে কাঁদুন এটা ভাবুন যে পরকালে আপনি পুরস্কৃত হচ্ছেন না (কারণ সে নিশ্চয়তা নেই)।
যদি আপনি না কাঁদেন কিংবা কান্না না আসে তবে জেনে রাখুন যে আপনার ঈমান দুর্বল এবং পার্থিব আকর্ষণ আপনাকে গ্রাস করেছে আর আপনি এক মহা বিপদের মধ্যে আছেন। তাই আল্লাহর রাস্তায় বেড়িয়ে পড়ুন। জীবনকে খামচে ধরুন মৃত্যুর (খামচে ধরার) পূর্বেই। খালেছ মনে তাওবাহ করুন। আল্লাহর পথে ও ভালো কাজে এগিয়ে আসুন।
ইবনে আবি মুলায়েক (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমরা আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা)-এর সাথে এক উপত্যকায় বসেছিলাম। তিনি [আমর (রা)] বলেন, কাঁদো, যদি কান্না না আসে তবে কান্নার ভান কর। যদি তোমরা (জাহান্নামের শাস্তির কথা) জানতে, তবে তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত নামায পড়তে যতক্ষণ না তোমাদের পিঠ ভেঙ্গে যায় আর ততক্ষণ পর্যন্ত কাঁদতে যতক্ষণ না কণ্ঠ শুকিয়ে যায়।"১০৮
বদরের যুদ্ধবন্দীদের সম্পর্কে ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, যখন বদরের যুদ্ধবন্দীদের আটক করা হয় তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ আবু বকর (রা) ও উমর (রা)-এর কাছে জানতে চান, “যুদ্ধবন্দীদের সাথে কেমন আচরণ করা উচিত?” আবু বকর (রা) বলেন, হে আল্লাহর নবী! তারা আমাদের আত্মীয়। আমার মনে হয় তাদের কাছ থেকে আমাদের মুক্তিপণ নেয়া উচিত আর এ মুক্তিপণ আমাদের শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে একটি শক্তি হিসেবে কাজ করবে। আর হতে পারে আল্লাহ তাদেরকে হেদায়াত দান করেন। এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ উমর (রা)-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে খাত্তাবের সন্তান, তুমি কী ভাবছ? আমি (উমর) বললাম, 'না, আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি আবু বকরের সাথে একমত নই। আমি মনে করি আপনার উচিত আমাদেরকে তাদের ঘাড় থেকে গর্দান কেটে নেয়ার অনুমতি দেয়া।
তাই আলীকে হত্যা করতে আর আমাকে ওমুক ওমুককে (তারা উমরের আত্মীয়) হত্যা করার অনুমতি দিন। নিঃসন্দেহে তারা কাফেরদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ও সর্দার। আল্লাহর রাসূল ﷺ আবু বকরের মতামত অনুমোদন করলেন আর আমার মতামত বাতিল করলেন। এর পরের দিন যখন আমি তাদের কাছে আসি, আমি দেখলাম রাসূলুল্লাহ ﷺ ও আবু বকর (রা) একসাথে বসে আছেন এবং কাঁদছেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! আমাকে বলুন, কোন জিনিস আপনাকে এবং আপনার সঙ্গীকে কাঁদাচ্ছে? যদি আমি এতে কান্নার কিছু পাই তবে আমিও কাঁদব আর যদি আমার কান্না না আসে তবে কান্নার চেষ্টা করে যাব যে কারণে আপনারা উভয়ে কাঁদছেন। নবী ﷺ বললেন, আমি কাঁদছি কারণ যে মুক্তিপণ নেয়ার পরামর্শ তোমার সঙ্গীরা দিয়েছে তাদের শাস্তিস্বরূপ তা আমাকে দেখানো হয়েছে এ গাছটির চেয়েও আরো নিকট থেকে।”

টিকাঃ
১০৫. কান্নার প্রকারভেদ তুলে ধরে ইবনে কায়্যিম, যারা বিনীত হয়ে কাঁদেন তাদের সম্পর্কে বলেন। তিনি যাদ আল মা'আদ গ্রন্থে বলেন, এটা (কান্না) হতে পারে দু'ধরনের, (এক) প্রশংসনীয়, (দুই) নিন্দনীয়। প্রশংসনীয় কান্নায়, হৃদয়ের কোমলতা ও গভীর আল্লাহভীতি বৃদ্ধি কামনা করা হয় এবং এ কান্না মানুষকে শোনানো বা দেখানোর জন্য হয় না। অন্যদিকে অপছন্দনীয় কান্নায়, কান্না (কৃত্তিমভাবে) তৈরি করা হয় .... এভাবে বদরের যুদ্ধবন্দীদের প্রতি উমর (রা)-এর
১০৬. সূরা আনকাবুত (২৯) : ৬৯
১০৭. শায়খ আলবানী সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব গ্রন্থে একে হাসান বলেছেন। বক্তব্যকে উল্লেখ করা হয়, "... আর যদি আমার (উমরের) কান্না না আসে তবে আমি কান্নার ভান করি কেননা তোমরা সবাই কাঁদছ।” নবী ﷺ (উমরের) এ বক্তব্যকে অনুমোদন করেন নি। কিছু সালাফীপন্থি আলেম বলেন, "আল্লাহর ভয়ে কাঁদুন আর যদি কান্না না আসে তবে কান্নার ভান করুন।”
১০৮. তারগীব ওয়াত তারহীব গ্রন্থে তিনি বলেন: “হাকিম একে মারফু হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, হাদীসটি তাদের শর্তানুযায়ী সহীহ।” শায়খ আলবানী তার আল তালীক আর রাগীব গ্রন্থে বলেন, এটা স্পষ্ট যে, এটা একটি ভুল প্রকাশ এবং প্রসঙ্গটি এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে যেমন আল মুসতাদরাক গ্রন্থে উল্লেখ করা।

📘 আল্লাহর ভয়ে কাঁদা > 📄 হুঁশিয়ারী মনে রাখা

📄 হুঁশিয়ারী মনে রাখা


এ ব্যাপারে অনেক বর্ণনা রয়েছে তন্মধ্যে ইরবাদ ইবনে সারীয়া (রা) হতে বর্ণিত হাদীসটি উল্লেখযোগ্য যা ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের উদ্দেশ্যে এক সারগর্ভ বক্তব্য রাখেন যার ফলে আমাদের অন্তর কেঁপে উঠে এবং চোখ অশ্রুতে ভরে উঠে।
ইবনে আব্বাস (রা) নিম্নের আয়াতে কারীমাসমূহের ব্যাখ্যায় বলেন (যা ইতোপূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছিল),
اَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ ، وَلَا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ مِنْ قَبْلُ فَطَالَ عَلَيْهِمُ الْآمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ ، وَكَثِيرٌ مِّنْهُمْ فَسِقُونَ .
"যারা মু'মিন, তাদের জন্য কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি? তারা তাদের মতো যেন না হয়, যাদেরকে ইতোপূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছিল। তাদের ওপর সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে, অতঃপর তাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে গেছে। তাদের অধিকাংশই পাপাচারী।"১১২
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন যে, তারা হলো এমন ব্যক্তি যারা পৃথিবীর আকর্ষণে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে এবং আল্লাহর সাবধান বাণী থেকে গাফেল হয়ে রয়েছে এটা 'লাতায়েফ আল মাআ'রিফ' গ্রন্থে এসেছে, হুঁশিয়ারি হলো চাবুকের মতো যা আমাদের হৃদয়ে আঘাত করে যেমনিভাবে চাবুক শরীরে আঘাত করে। আঘাত করা শেষ হওয়ার পর, একই সাথে আঘাতের প্রভাবও শেষ হবে যতক্ষণ না একজন আঘাত করেছিল। অধিকন্তু, আঘাতের ব্যথা নির্ভর করে ব্যক্তির শরীরে আঘাতের শক্তির ওপর। তাই যখনই কাউকে প্রবলভাবে আঘাত করা হয় তার ব্যথা প্রমাণস্বরূপ থেকে যায় দীর্ঘক্ষণ।
অনেক সালাফী আলেম, কোনো এক মজলিশে আল্লাহর হুঁশিয়ারি বা সতর্কবাণী (অর্থাৎ, কুরআন-হাদীসের আলোচনা) শুনার পর মজলিশ ত্যাগ করার পর একটা শান্তি, স্নিগ্ধ ও ভাব-গাম্ভীর্যতার অনুভূতি তাদের মাঝে বয়ে যেত। এরপর (অবস্থা এমন হতো যে আল্লাহর ভয়ে) তাদের কেউ খাবারও খেতে পারত না। তবে অনেকেই সেই শুনে আসা আলোচনা অনুযায়ী দীর্ঘদিন আমল করত। হাসান বসরী (র) প্রায়ই বেরিয়ে পরতেন, তিনি ছিলেন এমন মানুষ যিনি সবসময় পরকালকে যেন নিজের চোখে দেখতে পেতেন, আর মানুষকে এ ব্যাপারে সচেতন করতেন। আর লোকেরা তার কাছ থেকে পৃথিবীকে মূল্যহীন জ্ঞান করার শিক্ষা নিয়ে ফিরে যেত।
সুফিয়ান সাওরী (রা) তার মজলিশে প্রায়ই পার্থিব (আকর্ষণ মুক্ত হওয়ার) আলোচনা থেকে সান্ত্বনা খুঁজে পেতেন।
ইমাম আহমদ ছিলেন এমন মানুষ যার মজলিশে এমনকি তার অনুপস্থিতিও পার্থিব (আকর্ষণ সৃষ্টিকারী) কোনো বিষয়াদি আলোচিত হতো না।
সালাফীদের অনেকে বলেন, “দ্বীনের আলোচনা তখনই কার্যকরী হয় যখন তা অন্তর থেকে দেয়া হয় আর তা নিঃসন্দেহে তখন অন্য একটি হৃদয়ে পৌঁছায়। তেমনিভাবে দ্বীনের আলোচনা যা শুধু জিহ্বা দিয়ে উচ্চারিত হয় তা কেবলমাত্র এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে বের হয়ে যায়।
ঘৃণা, শত্রুতা ও প্রতারণার নোংরামী থেকে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা১১৩ অবশ্যই এ কাজটির (ব্যক্তি) কাঁদাতে ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে এবং এর বিপরীতে (চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য) কাঁদতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে এবং বিরত রাখবে।

টিকাঃ
১০৯. "যতক্ষণ না তিনি দেশময় প্রচুর রক্তপাত ঘটাবে" এর অর্থ হলো শত্রুদের খতমকরণ বৃদ্ধি পাওয়া। তিনি আন নিহায়াহ গ্রন্থে বলেন, এর অর্থ- ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো তবে এখানে যে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে তা হলো, 'কাফেরদের ব্যাপকভাবে হত্যা করা।"
১১০. সূরা আল আনফাল (৪): ৬৭-৬৯
১১১. সহীহ মুসলিম হতে বর্ণিত।
১১২. সূরা আল হাদীদ (৫৭): ১৬

📘 আল্লাহর ভয়ে কাঁদা > 📄 বেশি বেশি নফল ইবাদাত বা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ করা

📄 বেশি বেশি নফল ইবাদাত বা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ করা


আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছেন, “আল্লাহ বলেছেন, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব যে আমার প্রিয় ইবাদতগুজার বান্দার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। সবচেয়ে পছন্দনীয় যেসব কাজ করে বান্দাহ আমার কাছাকাছি আসতে পারে (অর্থাৎ প্রিয় হতে পারে) তা হলো, ফরজ ইবাদতসমূহ পালন করা। এরপর যে কাজ করে আমার কাছাকাছি আসতে পারে তা হচ্ছে, বেশি বেশি নফল ইবাদত করা। এরপর আমি তার শ্রবণেন্দ্রীয়তে পরিণত হই ফলে সে দেখতে পায়, তার দর্শনেন্দ্রীয়তে পরিণত ইহকালে সে দেখতে পায়, তার হাতের শক্তিতেও আমার অস্তিত্ব থাকে ফলে সে ধরতে পারে এবং চলার শক্তিতেও আমার অস্তিত্ব থাকে যার মাধ্যমে সে হাঁটতে পারে। আর যদি সে আমার কাছে কোনো কিছু চায় তবে আমি তাকে দান করি। যদি সে আমার কাছে নিরাপত্তা চায় আমি তাকে নিরাপত্তা দিই। আর আমি কোনো কাজ করতেই সংকোচবোধ করি না তবে একজন মুমিন বান্দাহ'র আত্মা নিয়ে নিতে (সংকোচ করি) কেননা, সে মৃত্যুকে ঘৃণা করে আর আমি তাকে হতাশ করতে ঘৃণা করি।১১৪
এভাবে আপনার স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ বা নফল ইবাদতের পরিমাণ যতটা সম্ভব বৃদ্ধি করুন। বৃদ্ধি করুন আপনার নামায, রোযা, যাকাত প্রদান, হজ্জ করা এবং প্রত্যেকটা ভালো কাজ যতখানি আপনি করতে সক্ষম ততখানি বৃদ্ধি করুন যাতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আপনাকে ভালোবাসতে পারেন এবং আপনি যা চান তার জন্য কবুল করতে পারেন এবং এ সকল কিছুর প্রথমে যা আপনি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা করেন তা হলো, আল্লাহ সুবহানাহু ও তায়ালার ভয়ে কাঁদতে পারার যোগ্যতা অর্জন করা (তার জন্যও যেন আল্লাহ আপনাকে কবুল করতে পারেন)।
পৃথিবীকে মূল্যহীন ও গুরুত্বহীন জ্ঞান করা এবং একে পরিত্যাগ করা অবশ্যই পৃথিবীর প্রতি ভালোবাসা হৃদয়ের কঠিনতার অন্যতম কারণ আর এটা (পার্থিব আকর্ষণ) ব্যক্তিকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করে। আর অবশ্যই পার্থিব আকর্ষণ হতে বিরত থাকুন ও পরিত্যাগ করুন অন্তরকে নরম করে এর খুশু (অনুগত ও নম্রভাব) বৃদ্ধি করে এবং কান্নায় দু'চোখ ভেজাতে সাহায্য করে।
তাই পার্থিব বিষয়াদিতে সহজেই দীর্ঘসময় কাটানো হতে সাবধান থাকুন। আপনাকে অবশ্যই পার্থিব ব্যস্ততা পরিহার করতে হবে এবং যতটা পারেন একে গুরুত্বহীন মনে করুন। আর এ পথে চলতে সাহায্য করবে এমন বই বেশি পড়ুন।
পার্থিব আকর্ষণ পরিহারকরণে রাসূল ﷺ এর পথ নির্দেশ নিয়ে গভীর চিন্তা করুন। তাঁর খাদ্য, পানীয়, পোশাক, আসবাবপত্র ইত্যাদি গ্রহণে কঠোর ও অনঢ় জীবনযাপন নিয়ে চিন্তা করুন।
আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুহাম্মদ ﷺ এর পরিবার মদীনায় হিজরতের পর কোনো একদিনও আটার রুটি খাননি তবে রাসূল ﷺ এর ওফাতের পর এক নাগারে তিনদিন তা খেয়েছেন।১১৬
আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ﷺ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন এবং তিনি কোনোদিন শুধু রুটি খাননি।১১৭
আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুহাম্মদ ﷺ এর পরিবার তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোনোদিন শুধু রুটি দিয়ে এক নাগারে দুই দিন আহার করেন নি।১১৮
উরওয়াহ (রা) হতে বর্ণিত, আয়েশা (রা) তাকে বলেন, “হে আমার ভাতিজা! আমরা প্রায়ই দুই মাসের মধ্যে তিনটি চাঁদ দেখতাম আর আল্লাহর রাসূল ﷺ এর ঘরে কোনো আগুন জ্বালানো হতো না।" আমি (উরওয়াহ) প্রশ্ন করলাম, তখন কী খেয়ে বেঁচে থাকতেন? তিনি (আয়েশা) উত্তরে বললেন, দুটি কালো বস্তু- এক. খেজুর, দুই. পানি। তথাপি রাসূল ﷺ এর কিছু আনসার প্রতিবেশিদের গবাদিপশু ছিল, যা দুধ দিত। আর তারা প্রায়ই আল্লাহর রাসূল ﷺ এর জন্য কিছু দুধ প্রেরণ করতেন, সেখান থেকে তিনি [রাসূল ﷺ] আমাদেরকেও দিতেন।১১৯
আনাস (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল ﷺ এর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কখনই জানতাম না যে তিনি রাগীফ (এক ধরনের রুটি) খেয়েছেন।১২০
সামাক হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নু'মান ইবনে বশীর (রা)-কে বলতে শুনেছি, তুমি কি যত ইচ্ছা তত পান ও আহার কর না? অথচ আমি তোমাদের নবী ﷺ কে দেখেছি তিনি ক্ষুধা নিবারণে ছোট এক টুকরো খেজুরও পেতেন না।১২১ আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বিছানা ছিল পশুর পশম দিয়ে তৈরি যাতে কিছু পশমও ছিল।১২২
আবু বুরদাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, (রাসূল ﷺ এর মৃত্যুর পর) আয়েশা (রা) আমাদের সামনে একটি সাধারণ জামার উপরের অংশ এবং নিচের অংশ বা পায়জামা (আরবিতে ইজার) নিয়ে আসলেন এবং তিনি বললেন, এ দুটো পড়ে রাসূল ﷺ মৃত্যুবরণ করেন।১২৩ এছাড়াও এ সংক্রান্ত বহু হাদীস রয়েছে।১২৪
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার কাধে হাত রাখলেন এবং বললেন, পৃথিবীতে এমনভাবে বসবাস কর যেন তুমি একজন মুসাফির বা পথিক। আর ইবনে উমর (রা) প্রায়ই বলতেন যে, যদি তুমি সন্ধ্যা পর্যন্ত বেঁচে থাক তবে পরের দিন সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকার ইচ্ছা পোষণ কর না। আর যদি তুমি সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাক তবে আর সন্ধ্যা পর্যন্ত বেঁচে থাকার ইচ্ছা পোষণ কর না। অসুস্থতার জন্য তোমার স্বাস্থ্য প্রস্তুত রেখ এবং মৃত্যুর জন্য তোমার জীবনকে প্রস্তুত রেখ।১২৫
তাই আর দেরি নয় হে আমার ভাই ও বোনেরা! একজন মুসাফির বা পথিকের ন্যায় আপনার স্বভাব, আচার-আচরণ, খাদ্য, পানীয়, বাসস্থান এবং অন্যান্য যা আপনি করে থাকেন তা গড়ে তুলুন। আমাদের চোখ রাখা উচিত এবং প্রতীক্ষায় থাকা উচিত আমাদের আসল বাড়ি জান্নাতের দিকে। তাই আমাদের সন্ধ্যায় বেঁচে থাকলে (পরদিন) সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকার কামনা করা উচিত নয়। এভাবে যদি আবার সকালে বেঁচে থাকি আমাদের উচিত নয় সন্ধ্যা পর্যন্ত বেঁচে থাকার কামনা করা। তাই আমাদের উচিত নয় আত্মসমালোচনা, আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার কথা এবং আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বসমূহ পালনের কথা এমনকি একটি ভালো কাজের কথাও ভুলে না যাওয়া।
আমাদের উচিত আমাদের (দৈনন্দিন) জীবনকে এমনভাবে পরিচালনা করা যেন আমরা আমাদের চোখে কেয়ামতের (ভয়াবহ) দিনটি দেখতে পাচ্ছি। আমাদের উচিত অসুস্থতার জন্য স্বাস্থ্যকে প্রস্তুত রাথা এবং স্বাস্থ্যকে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগানো, সাথে সাথে আমাদের সবাইকে এসব জানিয়ে সচেতন করা যাতে আমরা ধেয়ে আসা মৃত্যুর ও ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পেতে পারি (অর্থাৎ মৃত্যু যন্ত্রণা যাতে কম হয়)।
একজন মুসাফির যে তার দেশ, পরিবার, সন্তানাদি, আত্মীয়স্বজন ছেড়ে কষ্ট করে একাকি সফর করে সে কি অন্য দেশে তার সাম্রাজ্য গড়ার জন্য এ কষ্ট করে? (অর্থাৎ অথবা একজন পথিক কি কোনো বিচ্ছিন্ন পথে প্রান্তরে বাস করে?!) (অর্থাৎ আমরা আমাদের আসল বাড়ির কথা ভুলে এ পৃথিবীতেই যেন আবাস গেড়ে বসে না যাই)।
আর আপনি, আল্লাহ আপনার উপর রহমত বর্ষণ করুন- এ পৃথিবীতে একজন মুসাফির, জান্নাতের বাড়ি থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছেন, সেখানকার স্ত্রী ও সন্তানদের নিকট থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছেন। আর এটা তখনই ঘটবে যখন আপনি জান্নাতবাসী হবেন। কিন্তু যদি এমন হয় যে আপনি জাহান্নামের অধিবাসীদের মতো সকল কাজ করে যাচ্ছেন আর জান্নাতে আপনার কোনো বাড়ি নেই, নেই কোনো সন্তান, নেই পরিবার শুধু আছে শাস্তি; এক অকল্পনীয় খারাবি আপনার জন্য অপেক্ষা করছে কেমন হবে তখন?!
তাই আরাম-আয়েশের জীবন থেকে সাবধান হোন। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আরাম-আয়েশের জীবন থেকে সাবধান হও। কারণ, নিশ্চয়ই আল্লাহর (প্রকৃত) বান্দা তারা নয় যারা আরাম-আয়েশের জীবনযাপন করে।১২৬
অতএব আপনার জন্য প্রয়োজন 'আল বাদাদাহ' যেমন নবী ﷺ বলেন, 'ঈমান হলো আল বাদাদাহ।'১২৭ আর 'আল বাদাদাহ' অর্থ হলো সাধারণ ও ধার্মিক জীবনযাপন করা।

টিকাঃ
১১৩. আমার (মূল লেখক) 'মিম মাওয়াকিফ আস সাহীহা' গ্রন্থের 'নম্বর ৮ : আবদুল্লাহ ইবনে উমর ও জান্নাতী একজন” থেকে উদ্ধৃত।
১১৪. ইমাম বুখারী ও অন্যান্য কর্তৃক বর্ণিত।
১১৬. বুখারী ও মুসলিম হতে বর্ণিত।
১১৭. ইমাম বুখারী কর্তৃক বর্ণিত।
১১৮. ইমাম মুসলিম হতে বর্ণিত।
১২১. ইমাম মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত।
১২২. বুখারী ও মুসলিম হতে বর্ণিত।
১২৩. বুখারী ও মুসলিম হতে বর্ণিত।
১২৪. আরো তথ্যের জন্য সহীহ বুখারী শরীফের 'খাদ্য' অধ্যায়ের 'রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সাহাবীগণ কী খেতেন' অনুচ্ছেদ এবং 'হৃদয় বিগলিতকরণ' অধ্যায়ের কিভাবে নবী ﷺ ও তার সাহাবীগণ জীবনধারণ করতেন অনুচ্ছেদে। সহীহ মুসলিম শরীফের 'ত্যাগ ও অন্তর বিগলিতকরণ' অধ্যায় এবং 'রিয়াদুস সালেহীন' গ্রন্থের অধ্যায়-৫৬।
১২৫. ইমাম বুখারী কর্তৃক বর্ণিত।
১২৬. ইমাম আহমদ ও আবু নূআইম কর্তৃক 'হিলায়াহ' গ্রন্থে বর্ণিত শায়েখ আল বানী 'মিশকাত' গ্রন্থে বলেন, এর সনদ সহীহ।
১২৭. ইবনে মাজাহ কর্তৃক বর্ণিত। আস সাহীহা গ্রন্থে একে সহীহ হাদীস বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00