📄 যথাযথভাবে নামায আদায় করা
ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গুনাহের ব্যাপারেও সতর্ক হও। কেননা আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন, ছোটখাট গুনাহের ব্যাপারে সতর্ক হও, নিশ্চয়ই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গুনাহকারীদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে এমন একদল মানুষের মতো যারা একটি উপত্যকায় অবতরণ করেছে। তাদের একজন একটি লাঠি নিল এরপর আরেকজন একটি লাঠি নিল এরপর আরেকজন এভাবে সবাই তাদের রান্নার জন্য অনেক লাঠি জমা করল। এটা হলো তাদের ক্ষুদ্র গুনাহের ধারণার মতোই, কেননা ছোট ছোট গুনাহের বিশালাকার স্তূপই প্রকৃতপক্ষে তোমাদের ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট হবে (যেমনিভাবে লাঠিগুলোর স্তূপ আগুন ধরানোর জন্য যথেষ্ট ছিল)।১০২
যথাযথভাবে নামায আদায় করা১০৩
আবু আইয়ুব আনসারী (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একজন লোক রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে আসল এবং বলল, "আমাকে সংক্ষেপে কিছু শিখিয়ে দিন।” রাসূল ﷺ উত্তরে বললেন, "যখন তুমি নামাযে দাঁড়াবে তখন মনে করবে যেন তুমি এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছ, আর এমন কোনো শব্দ মুখে উচ্চারণ করনা যেজন্য তোমাকে ক্ষমা চাইতে/বিব্রত হতে হয়। আর অন্যের যা আছে তা কামনা কর না।"১০৪
সে নামায কতই না চমৎকার, যে নামাযে নামাযী পৃথিবী ও তার আকর্ষণ ভুলে যায়, আর স্মরণ করে মৃত্যুর কথা, ফলে তার হৃদয় নরম হয় এবং চোখে অশ্রু ঝরে।
টিকাঃ
১০২. ইমাম আহমদ এবং অন্যান্য কর্তৃক বর্ণিত। হাদীসটি সহীহ এবং শায়খ আল বানী একে সাহীহা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
১০৩. আমার (মূল লেখক) বই: দি প্রেয়ার ইটস ইফেক্টস ইন ইনক্রিয়েজিং ঈমান এন্ড পিডুরিফাইং দ্যা সৌল (নামায-আত্মার পরিশুদ্ধকরণে এবং ঈমান বৃদ্ধিতে এর ভূমিকা) (আল-হিদায়াহ পাবলিশিং এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন, ১৯৯৫ বার্মিং হাম, ইউকে)।
১০৪. ইমাম আহমদ ও ইবনে মাজাহ কর্তৃক বর্ণিত এবং আবু নূইয়াম 'আল হিলায়াহ' গ্রন্থে উল্লিখিত। এটি একটি হাসান হাদীস যা শায়খ আলবানী 'আস সাহীহা' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
📄 তাহাজ্জুদে কান্না
হুজদ মানে ঘুম। তাহাজ্জুদ মানে ঘুম ত্যাগ করা। এ থেকেই শেষ রাতের নামাযকে তাহাজ্জুদের নামায বলা হয়। রাতের তিন ভাগের দু'ভাগ শেষ হলে এ নামাযের সময় শুরু হয় এবং সেহরীর শেষ সময় পর্যন্ত চলে। সময়টা এমনভাবেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে যে, ঘুম থেকে জেগেই এ নামায আদায় করতে হয়। এ নামাযকে কিয়ামুল লাইলও বলা হয়, যেহেতু রাতে দাঁড়িয়ে এ নামায আদায় করা হয়।
সকল নফল নামাযের মধ্যে তাহাজ্জুদই শ্রেষ্ঠ। এ বিষয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস পেশ করা হলো-
١. أَفْضَلُ الصَّلوةِ بَعْدَ الْمَفْرُوضَةِ صَلَاةٌ فِي جَوْفِ اللَّيْلِ .
(أحمد)
১. “ফরয নামাযের পর শেষ রাতের নামাযই শ্রেষ্ঠ।”- (আহমদ)
أشْرَفُ أُمَّتِي حَمَلَةُ الْقُرْآنِ وَأَصْحَابُ اللَّيْلِ .
(البيهقي)
২. "আমার উম্মতের সবচেয়ে সম্মানিত হলো কুরআনের ধারক ও বাহক এবং রাতের অধিবাসী (রাত জেগে ইবাদাতকারী)।” – (বায়হাকী)
قَبْلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيُّ الدُّعَاءِ أَسْمَعُ قَالَ جَوْفِ اللَّيْلِ الْآخِرِ وَدُبُرَ الصَّلاتِ الْمَكْتُوبَةِ . اَلتَّرْمِذِى)
৩. “জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! কোন দোয়া সবচেয়ে বেশি মকবুল। জওয়াব দিলেন, শেষ রাতের ও ফরয নামাযের পরের দোয়া।” -(তিরমিযী)
عَلَيْكُمْ بِقِيَامِ اللَّيْلِ فَإِنَّهُ دَابُ الصَّالِحِينَ قَبْلَكُمْ وَهُوَ قُرْبَةٌ لَّكُمْ إِلَى رَبِّكُمْ وَمُكَفِّرْ لِلسَّيِّاتِ وَمِنْهَاةً عَنِ الْإِثْمِ .
৪. "রাত জাগা তোমাদের কর্তব্য। এটা তোমাদের পূর্ববর্তী নেক লোকদের তরীকা, তোমাদের রবের নৈকট্য, আগের গুনাহের কাফ্ফারা এবং গুনাহ করা থেকে বিরত রাখার উপায়।” (তিরমিযী)
ه رَحِمَ اللهُ رَجُلاً قَامَ مِنَ اللَّيْلِ فَصَلَّى وَأَيْقَظَ إِمْرَانَهُ فَصَلَّتْ فَإِنْ آبَتْ نَضَحَ فِي وَجْهِهَا الْمَاءَ .
رحِمَ اللهُ امْرَةً قَامَتْ مِنَ اللَّيْلِ فَصَلَّتْ وَأَيْقَظَتْ زَوْجَهَا فَصَلَّى فَإِنْ أَبَى نَضَحَتْ فِي وَجْهِهِ الْمَاء ۔ (ابو داود ونسائی)
৫. “আল্লাহ ঐ লোকের উপর রহম করুক যে রাতে উঠে, নামায আদায় করে ও তার স্ত্রীকে জাগায় এবং সেও নামায পড়ে। যদি সে উঠতে না চায় তাহলে তার মুখে পানি ছিটায়।
আল্লাহ ঐ মহিলার উপর রহম করুক যে রাতে উঠে, নামায পড়ে ও তার স্বামীকে জাগায় এবং সেও নামায পড়ে। যদি সে উঠতে না চায় তাহলে তার মুখে পানি ছিটায়।” – (আবু দাউদ ও নাসাঈ)
আসলেই শেষ রাতে উঠা আল্লাহর সাথে মহব্বতের সম্পর্কেরই প্রতীক। দুনিয়া যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন ঘুমের স্বাদ ও বিছানার মায়া ত্যাগ করা তার পক্ষেই সম্ভব যে আল্লাহর মহব্বতের কাংগাল। এ স্বাদ যে পায় তার পক্ষে এটা কঠিন মনে হয় না।
📄 নিজেকে কাঁদাও
আর জেনে রাখুন যে, নিজেকে কাঁদানোর প্রতিদান সত্যিকারের কান্নার চেয়ে কম হবে তথাপি আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া পরবশ হতে পারেন। আর এটাই কান্নার উপায়। কেননা যে ব্যক্তি নিজেকে কাঁদায় সে মূলত নিজের নফসের বিরুদ্ধে কঠিন সংগ্রাম করে এবং নিজের জবাবদিহিতা নিজে নেয় এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের প্রচেষ্টা চালায়।
আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ .
যারা আমার জন্য (আল্লাহর পথে) সংগ্রাম সাধনা করবে তাদেরকে আমি আমার পথ দেখাব।”১০৬
অতএব যে ব্যক্তিই তার অন্তরকে কাঁদাতে চেষ্টা করবে আল্লাহ ঐ ব্যক্তিকে কায়মনো বাক্যে কাঁদতে এবং এক্ষেত্রে সফলতা অর্জনে সঠিক পথ নির্দেশ প্রদান করবেন।
আনাস (রা) হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছেন যে, হে মানুষ! কাঁদো, যদি তোমার কান্না না আসে তবে কান্নার ভান কর। অবশ্যই জাহান্নামীরা ততক্ষণ পর্যন্ত কাঁদবে যতক্ষণ না তাদের গাল ভিজে যায়, অশ্রু প্রবাহিত হয় এবং শুকিয়ে যায়। এরপর (চোখ দিয়ে) রক্তক্ষরণ হওয়া পর্যন্ত তারা কাঁদবে এবং তাদের চোখে গর্ত হয়ে যাবে।"১০৭
এ পথে চলতে তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে আদেশ করেছেন কাঁদতে অথবা কান্নার ভান করতে। তিনি ﷺ জাহান্নামবাসীদের কান্নার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন অর্থাৎ (তিনি বলেছেন) তাদের চোখের পানি গাল বেয়ে প্রবাহিত হবে স্রোতস্বীনি নদীর মতো যতক্ষণ না তা নিঃশেষ হয়। এরপর তা শুকিয়ে রক্ত প্রবাহিত হবে এমনকি সেখানে গর্ত হয়ে যাবে।
এরপর আর তুমি কী চাইতে পার, হে আল্লাহর বান্দা! তোমার কান্না (আসার) জন্য আর কী লাগবে? আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি যে এটা একটি গভীর ও গুরুতর হুঁশিয়ারি, এ হুঁশিয়ারি তোমার তাওবা আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া এবং কাঁদার জন্য যথেষ্ট।
আপনি কি সত্যিই এ দৃশ্য (জাহান্নাম ও তিরস্কার) থেকে নিরাপদ? আপনি কি (খালেস) বান্দা ও জান্নাতবাসী হওয়ার ব্যাপার নিশ্চিত? (নিশ্চিত না) তাই কাঁদুন এবং অশ্রু বিসর্জন দিন এজন্য নয় যে পৃথিবীতে আপনি পুরস্কৃত হবেন; বরং কেয়ামতের দিন রক্তকান্নার পূর্বেই পৃথিবীতে কাঁদুন এটা ভাবুন যে পরকালে আপনি পুরস্কৃত হচ্ছেন না (কারণ সে নিশ্চয়তা নেই)।
যদি আপনি না কাঁদেন কিংবা কান্না না আসে তবে জেনে রাখুন যে আপনার ঈমান দুর্বল এবং পার্থিব আকর্ষণ আপনাকে গ্রাস করেছে আর আপনি এক মহা বিপদের মধ্যে আছেন। তাই আল্লাহর রাস্তায় বেড়িয়ে পড়ুন। জীবনকে খামচে ধরুন মৃত্যুর (খামচে ধরার) পূর্বেই। খালেছ মনে তাওবাহ করুন। আল্লাহর পথে ও ভালো কাজে এগিয়ে আসুন।
ইবনে আবি মুলায়েক (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমরা আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা)-এর সাথে এক উপত্যকায় বসেছিলাম। তিনি [আমর (রা)] বলেন, কাঁদো, যদি কান্না না আসে তবে কান্নার ভান কর। যদি তোমরা (জাহান্নামের শাস্তির কথা) জানতে, তবে তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত নামায পড়তে যতক্ষণ না তোমাদের পিঠ ভেঙ্গে যায় আর ততক্ষণ পর্যন্ত কাঁদতে যতক্ষণ না কণ্ঠ শুকিয়ে যায়।"১০৮
বদরের যুদ্ধবন্দীদের সম্পর্কে ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, যখন বদরের যুদ্ধবন্দীদের আটক করা হয় তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ আবু বকর (রা) ও উমর (রা)-এর কাছে জানতে চান, “যুদ্ধবন্দীদের সাথে কেমন আচরণ করা উচিত?” আবু বকর (রা) বলেন, হে আল্লাহর নবী! তারা আমাদের আত্মীয়। আমার মনে হয় তাদের কাছ থেকে আমাদের মুক্তিপণ নেয়া উচিত আর এ মুক্তিপণ আমাদের শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে একটি শক্তি হিসেবে কাজ করবে। আর হতে পারে আল্লাহ তাদেরকে হেদায়াত দান করেন। এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ উমর (রা)-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে খাত্তাবের সন্তান, তুমি কী ভাবছ? আমি (উমর) বললাম, 'না, আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি আবু বকরের সাথে একমত নই। আমি মনে করি আপনার উচিত আমাদেরকে তাদের ঘাড় থেকে গর্দান কেটে নেয়ার অনুমতি দেয়া।
তাই আলীকে হত্যা করতে আর আমাকে ওমুক ওমুককে (তারা উমরের আত্মীয়) হত্যা করার অনুমতি দিন। নিঃসন্দেহে তারা কাফেরদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ও সর্দার। আল্লাহর রাসূল ﷺ আবু বকরের মতামত অনুমোদন করলেন আর আমার মতামত বাতিল করলেন। এর পরের দিন যখন আমি তাদের কাছে আসি, আমি দেখলাম রাসূলুল্লাহ ﷺ ও আবু বকর (রা) একসাথে বসে আছেন এবং কাঁদছেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! আমাকে বলুন, কোন জিনিস আপনাকে এবং আপনার সঙ্গীকে কাঁদাচ্ছে? যদি আমি এতে কান্নার কিছু পাই তবে আমিও কাঁদব আর যদি আমার কান্না না আসে তবে কান্নার চেষ্টা করে যাব যে কারণে আপনারা উভয়ে কাঁদছেন। নবী ﷺ বললেন, আমি কাঁদছি কারণ যে মুক্তিপণ নেয়ার পরামর্শ তোমার সঙ্গীরা দিয়েছে তাদের শাস্তিস্বরূপ তা আমাকে দেখানো হয়েছে এ গাছটির চেয়েও আরো নিকট থেকে।”
টিকাঃ
১০৫. কান্নার প্রকারভেদ তুলে ধরে ইবনে কায়্যিম, যারা বিনীত হয়ে কাঁদেন তাদের সম্পর্কে বলেন। তিনি যাদ আল মা'আদ গ্রন্থে বলেন, এটা (কান্না) হতে পারে দু'ধরনের, (এক) প্রশংসনীয়, (দুই) নিন্দনীয়। প্রশংসনীয় কান্নায়, হৃদয়ের কোমলতা ও গভীর আল্লাহভীতি বৃদ্ধি কামনা করা হয় এবং এ কান্না মানুষকে শোনানো বা দেখানোর জন্য হয় না। অন্যদিকে অপছন্দনীয় কান্নায়, কান্না (কৃত্তিমভাবে) তৈরি করা হয় .... এভাবে বদরের যুদ্ধবন্দীদের প্রতি উমর (রা)-এর
১০৬. সূরা আনকাবুত (২৯) : ৬৯
১০৭. শায়খ আলবানী সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব গ্রন্থে একে হাসান বলেছেন। বক্তব্যকে উল্লেখ করা হয়, "... আর যদি আমার (উমরের) কান্না না আসে তবে আমি কান্নার ভান করি কেননা তোমরা সবাই কাঁদছ।” নবী ﷺ (উমরের) এ বক্তব্যকে অনুমোদন করেন নি। কিছু সালাফীপন্থি আলেম বলেন, "আল্লাহর ভয়ে কাঁদুন আর যদি কান্না না আসে তবে কান্নার ভান করুন।”
১০৮. তারগীব ওয়াত তারহীব গ্রন্থে তিনি বলেন: “হাকিম একে মারফু হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, হাদীসটি তাদের শর্তানুযায়ী সহীহ।” শায়খ আলবানী তার আল তালীক আর রাগীব গ্রন্থে বলেন, এটা স্পষ্ট যে, এটা একটি ভুল প্রকাশ এবং প্রসঙ্গটি এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে যেমন আল মুসতাদরাক গ্রন্থে উল্লেখ করা।
📄 হুঁশিয়ারী মনে রাখা
এ ব্যাপারে অনেক বর্ণনা রয়েছে তন্মধ্যে ইরবাদ ইবনে সারীয়া (রা) হতে বর্ণিত হাদীসটি উল্লেখযোগ্য যা ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের উদ্দেশ্যে এক সারগর্ভ বক্তব্য রাখেন যার ফলে আমাদের অন্তর কেঁপে উঠে এবং চোখ অশ্রুতে ভরে উঠে।
ইবনে আব্বাস (রা) নিম্নের আয়াতে কারীমাসমূহের ব্যাখ্যায় বলেন (যা ইতোপূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছিল),
اَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ ، وَلَا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ مِنْ قَبْلُ فَطَالَ عَلَيْهِمُ الْآمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ ، وَكَثِيرٌ مِّنْهُمْ فَسِقُونَ .
"যারা মু'মিন, তাদের জন্য কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি? তারা তাদের মতো যেন না হয়, যাদেরকে ইতোপূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছিল। তাদের ওপর সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে, অতঃপর তাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে গেছে। তাদের অধিকাংশই পাপাচারী।"১১২
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন যে, তারা হলো এমন ব্যক্তি যারা পৃথিবীর আকর্ষণে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে এবং আল্লাহর সাবধান বাণী থেকে গাফেল হয়ে রয়েছে এটা 'লাতায়েফ আল মাআ'রিফ' গ্রন্থে এসেছে, হুঁশিয়ারি হলো চাবুকের মতো যা আমাদের হৃদয়ে আঘাত করে যেমনিভাবে চাবুক শরীরে আঘাত করে। আঘাত করা শেষ হওয়ার পর, একই সাথে আঘাতের প্রভাবও শেষ হবে যতক্ষণ না একজন আঘাত করেছিল। অধিকন্তু, আঘাতের ব্যথা নির্ভর করে ব্যক্তির শরীরে আঘাতের শক্তির ওপর। তাই যখনই কাউকে প্রবলভাবে আঘাত করা হয় তার ব্যথা প্রমাণস্বরূপ থেকে যায় দীর্ঘক্ষণ।
অনেক সালাফী আলেম, কোনো এক মজলিশে আল্লাহর হুঁশিয়ারি বা সতর্কবাণী (অর্থাৎ, কুরআন-হাদীসের আলোচনা) শুনার পর মজলিশ ত্যাগ করার পর একটা শান্তি, স্নিগ্ধ ও ভাব-গাম্ভীর্যতার অনুভূতি তাদের মাঝে বয়ে যেত। এরপর (অবস্থা এমন হতো যে আল্লাহর ভয়ে) তাদের কেউ খাবারও খেতে পারত না। তবে অনেকেই সেই শুনে আসা আলোচনা অনুযায়ী দীর্ঘদিন আমল করত। হাসান বসরী (র) প্রায়ই বেরিয়ে পরতেন, তিনি ছিলেন এমন মানুষ যিনি সবসময় পরকালকে যেন নিজের চোখে দেখতে পেতেন, আর মানুষকে এ ব্যাপারে সচেতন করতেন। আর লোকেরা তার কাছ থেকে পৃথিবীকে মূল্যহীন জ্ঞান করার শিক্ষা নিয়ে ফিরে যেত।
সুফিয়ান সাওরী (রা) তার মজলিশে প্রায়ই পার্থিব (আকর্ষণ মুক্ত হওয়ার) আলোচনা থেকে সান্ত্বনা খুঁজে পেতেন।
ইমাম আহমদ ছিলেন এমন মানুষ যার মজলিশে এমনকি তার অনুপস্থিতিও পার্থিব (আকর্ষণ সৃষ্টিকারী) কোনো বিষয়াদি আলোচিত হতো না।
সালাফীদের অনেকে বলেন, “দ্বীনের আলোচনা তখনই কার্যকরী হয় যখন তা অন্তর থেকে দেয়া হয় আর তা নিঃসন্দেহে তখন অন্য একটি হৃদয়ে পৌঁছায়। তেমনিভাবে দ্বীনের আলোচনা যা শুধু জিহ্বা দিয়ে উচ্চারিত হয় তা কেবলমাত্র এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে বের হয়ে যায়।
ঘৃণা, শত্রুতা ও প্রতারণার নোংরামী থেকে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা১১৩ অবশ্যই এ কাজটির (ব্যক্তি) কাঁদাতে ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে এবং এর বিপরীতে (চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য) কাঁদতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে এবং বিরত রাখবে।
টিকাঃ
১০৯. "যতক্ষণ না তিনি দেশময় প্রচুর রক্তপাত ঘটাবে" এর অর্থ হলো শত্রুদের খতমকরণ বৃদ্ধি পাওয়া। তিনি আন নিহায়াহ গ্রন্থে বলেন, এর অর্থ- ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো তবে এখানে যে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে তা হলো, 'কাফেরদের ব্যাপকভাবে হত্যা করা।"
১১০. সূরা আল আনফাল (৪): ৬৭-৬৯
১১১. সহীহ মুসলিম হতে বর্ণিত।
১১২. সূরা আল হাদীদ (৫৭): ১৬