📄 ক্ষমা চাওয়া ও নিজেই নিজের হিসাব নেয়া
শয়তানকে দূর করা নিঃসন্দেহে হৃদয়কে কোমল করতে ও অশ্রু বিসর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এক বর্ণনায় এসেছে, এক লোক হাসান (রা)-এর কাছে অভিযোগ করল যে তার অন্তর খুব শক্ত। তাই তিনি তাকে বললেন, “বেশি বেশি আল্লাহর যিকির (স্মরণ) কর।” তিনি আরো বললেন, যিকির বা স্মরণ জ্ঞানার্জনে নতুন জীবন দান করে এবং অন্তরে 'খুশু' সৃষ্টি করে। মৃত অন্তর নতুন জীবন পায় আল্লাহর স্মরণে যেমন মৃত ভূ-পৃষ্ঠ নতুন জীবন পায় বৃষ্টিতে।৯২
ক্ষমা চাওয়া ও নিজেই নিজের হিসাব নেয়া
এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনার এ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ ও সুগঠিত করতে। সেই সঙ্গে আমাদের আত্মাকে দৃঢ় ও মজবুত করতে (ক্ষমা চাওয়া প্রয়োজন)। সবচেয়ে সত্যবাদী হলো সে যে ক্ষমা চায়, এভাবে সে আরো খুশু (নম্রতা) অর্জন করে, আরো বেশি তার অন্তর নরম হয়।
বেশি বেশি আল্লাহর কাছে (মোনাজাতে) ক্ষমা ভিক্ষা চাওয়া মানে রাসূল ﷺ এর অনুসরণ করা।৯৩ আর এটাও দরকার যে ব্যক্তি নিজেই নিজের অপরাধের হিসাব নিবে, যেমন আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ .
হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত আগামীকালের জন্য সে কী প্রেরণ করে তা নিয়ে চিন্তা করা।৯৪
আল্লাহ আমাদের আদেশ করেছেন আমাদের নিজেদের হিসেব নিজেদেরকে নিতে, ভালো কাজ করতে, কিয়ামতের দিনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে। যেমন- আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন-
ذَ أَقْسِمُ بِيَوْمِ الْقِيمَةِ لا وَلَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ التَّوَّامَةِ .
আমি শপথ করছি সেই কিয়ামত দিবসের। আরও শপথ করি সেই মনের যে নিজেকে ধিক্কার দেয়।৯৫
ইকরিমা এ আয়াতে কারীমা'র ব্যাখ্যায় বলেন, 'ভালোমন্দ' উভয় অবস্থায় নিজেকে দোষ দেয়া, চাই সেটা তুমি নিজে কর বা না কর। সাঈদ ইবনে জোবায়ের (রা) বলেন, ভালো-মন্দ উভয় কাজেই নিজেকে দোষ দেয়া, মুজাহিদ বলেন, 'অতীতের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং নিজেকে সেজন্য অভিযুক্ত করা।'৯৬
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, অবশ্যই বিশ্বাসীরা তাদের অপরাধ দেখতে পায় যেন সে কোনো পাহাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে আছে যেন তা এক্ষুণি তার উপর ভেঙ্গে পড়বে। আর (অবিশ্বাসী) পাপীরা তাদের অপরাধকে দেখে যেন নাকের পাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে আর সে এটা করে এভাবে গর্ব অনুভব করে। আবু শিহাব৯৭ বলেন, ইবনে মাসউদ (রা) 'সে এটা করে এভাবে' বলে একটা অঙ্গভঙ্গি করেন তার কর্মটি ব্যাখ্যা করে বুঝাতে গিয়ে) “তিনি [ইবনে মাসউদ (রা)] তার হাত নাকের সামনে দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যান।”৯৮
বর্ণিত হয়েছে যে, উমর ইবনে খাত্তাব (রা) বলেন, তোমার হিসাব নেয়ার আগে নিজেই নিজের হিসাব নাও। আর নিজেই নিজের আমলনামার পরিমাপ কর তোমার আমল পরিমাপ করার পূর্বে।৯৯
বর্ণিত হয়েছে যে, মায়মুন ইবনে মিহরান বলেন, একজন আল্লাহর বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত মুত্তাকীনদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে না যতক্ষণ না সে তার ব্যবসায়িক পার্টনারের চেয়ে বেশি সূক্ষ্মভাবে ও গুরুত্ব সহকারে নিজের আমলিয়াতের হিসাব-নিকাশ না করবে, দু'জন ব্যবসায়ী তাদের নিজেদের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের হিসেব করে।১০০
এছাড়াও, ঈমানদারেরা আল্লাহর সামনে জবাবদিহিতার জন্য দৃঢ় প্রত্যয়ী থাকবে। সত্যিই সহজ হবে তার জন্য, যে ব্যক্তি পৃথিবীতে নিজের হিসাব নিজে করত আর কিয়ামতের দিন কঠিন হবে তার জন্য যে ব্যক্তি পৃথিবীতে নিজে নিজের হিসাব করত না।১০১
টিকাঃ
৯২. এ সংক্রান্ত চমৎকার আলোচনার জন্য দেখুন 'লাতাইফ আল মাআ'রিফ' গ্রন্থের 'যিকর ও দোয়ার উপকারিতা' অধ্যায়টি।
৯৩. তাঁর ﷺ এ বক্তব্য থেকে প্রমাণিত: আল্লাহর শপথ আমি ক্ষমা চাই আল্লাহর নিকট এবং অনুতপ্ত এ দিনে অন্তত সত্তরবার।” ইমাম বুখারী কর্তৃক বর্ণিত। তিনি ﷺ আরো বলেন, অবশ্যই আমার হৃদয় ভরে যায় এবং নিশ্চয়ই আমি দিনে ১০০ বার আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। 'ভুলে যাওয়া'র যে উদ্ধৃতি এখানে দেয়া হয়েছে তিনি তার ঊর্ধ্বে আর সাধারণ মানুষের বেলায় তা ঘটে থাকে। নবী ﷺ এর অন্তর সবসময়ই আল্লাহ সুবহানাহু ও তায়ালার স্মরণে ভরে থাকে। যদি কখনো মাঝে মাঝে স্বাভাবিক মানবিক প্রবৃত্তি ভর করে সেটা দৈবিক ঘটনামাত্র। আর সবসময় তাঁর ﷺ মাথায় উম্মতের, ইসলামের চিন্তা ও এর কল্যাণের কথা থাকে। আর এ মানবিক প্রবৃত্তিকেই তিনি অপরাধ গণ্য করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে থাকেন (আন নিহায়াহ)।
৯৪. সূরা হাশর (৫৯) : ১৮
৯৫. সূরা কিয়ামাহ (৭৫): ১-২
৯৬. তাফসীরে ইবনে কাসীর হতে উদ্ধৃত। ইংরেজি অনুবাদকের নোট: নাফসে লাওয়ামাহ : অর্থাৎ আত্মসমালোচক আত্মা- শব্দটি আরবি মূল শব্দ 'লাম' বা লাওয়াস' থেকে এসেছে যার অর্থ নিজেকে বা অন্যকে দোষ দেয়া এবং তীক্ষ্ণ সমালোচনা করা। এভাবে যখন আল্লাহ আত্মসমালোচক আত্মার শপথ করে বলেন, তখন ঐ বাক্যে এমন এক ব্যক্তিকে বুঝায় যে নিজের কর্মকাণ্ড সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ করে এবং নিজেকে প্রবলভাবে সমালোচনা করেন।
৯৭. আবু শিহাব এ বর্ণনার একজন বর্ণনাকারী।
৯৮. ইমাম বুখারী কর্তৃক বর্ণিত।
৯৯. ইমাম তিরমিযী কর্তৃক 'তামরীজ' আকারে, দেখুন তুহফাতুল আহওয়াদী হাদীস নং ২৫৭৭
১০০. ইমাম তিরমিযী কর্তৃক 'তারমীজ' আকারে দেখুন, তুহফাতুল আহওয়াদী হাদীস নং ২৫৭৭
১০১. 'হাসান' হিসেবে উদ্ধৃত। এর অর্থ সহীহ।
📄 যথাযথভাবে নামায আদায় করা
ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গুনাহের ব্যাপারেও সতর্ক হও। কেননা আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন, ছোটখাট গুনাহের ব্যাপারে সতর্ক হও, নিশ্চয়ই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গুনাহকারীদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে এমন একদল মানুষের মতো যারা একটি উপত্যকায় অবতরণ করেছে। তাদের একজন একটি লাঠি নিল এরপর আরেকজন একটি লাঠি নিল এরপর আরেকজন এভাবে সবাই তাদের রান্নার জন্য অনেক লাঠি জমা করল। এটা হলো তাদের ক্ষুদ্র গুনাহের ধারণার মতোই, কেননা ছোট ছোট গুনাহের বিশালাকার স্তূপই প্রকৃতপক্ষে তোমাদের ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট হবে (যেমনিভাবে লাঠিগুলোর স্তূপ আগুন ধরানোর জন্য যথেষ্ট ছিল)।১০২
যথাযথভাবে নামায আদায় করা১০৩
আবু আইয়ুব আনসারী (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একজন লোক রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে আসল এবং বলল, "আমাকে সংক্ষেপে কিছু শিখিয়ে দিন।” রাসূল ﷺ উত্তরে বললেন, "যখন তুমি নামাযে দাঁড়াবে তখন মনে করবে যেন তুমি এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছ, আর এমন কোনো শব্দ মুখে উচ্চারণ করনা যেজন্য তোমাকে ক্ষমা চাইতে/বিব্রত হতে হয়। আর অন্যের যা আছে তা কামনা কর না।"১০৪
সে নামায কতই না চমৎকার, যে নামাযে নামাযী পৃথিবী ও তার আকর্ষণ ভুলে যায়, আর স্মরণ করে মৃত্যুর কথা, ফলে তার হৃদয় নরম হয় এবং চোখে অশ্রু ঝরে।
টিকাঃ
১০২. ইমাম আহমদ এবং অন্যান্য কর্তৃক বর্ণিত। হাদীসটি সহীহ এবং শায়খ আল বানী একে সাহীহা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
১০৩. আমার (মূল লেখক) বই: দি প্রেয়ার ইটস ইফেক্টস ইন ইনক্রিয়েজিং ঈমান এন্ড পিডুরিফাইং দ্যা সৌল (নামায-আত্মার পরিশুদ্ধকরণে এবং ঈমান বৃদ্ধিতে এর ভূমিকা) (আল-হিদায়াহ পাবলিশিং এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন, ১৯৯৫ বার্মিং হাম, ইউকে)।
১০৪. ইমাম আহমদ ও ইবনে মাজাহ কর্তৃক বর্ণিত এবং আবু নূইয়াম 'আল হিলায়াহ' গ্রন্থে উল্লিখিত। এটি একটি হাসান হাদীস যা শায়খ আলবানী 'আস সাহীহা' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
📄 তাহাজ্জুদে কান্না
হুজদ মানে ঘুম। তাহাজ্জুদ মানে ঘুম ত্যাগ করা। এ থেকেই শেষ রাতের নামাযকে তাহাজ্জুদের নামায বলা হয়। রাতের তিন ভাগের দু'ভাগ শেষ হলে এ নামাযের সময় শুরু হয় এবং সেহরীর শেষ সময় পর্যন্ত চলে। সময়টা এমনভাবেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে যে, ঘুম থেকে জেগেই এ নামায আদায় করতে হয়। এ নামাযকে কিয়ামুল লাইলও বলা হয়, যেহেতু রাতে দাঁড়িয়ে এ নামায আদায় করা হয়।
সকল নফল নামাযের মধ্যে তাহাজ্জুদই শ্রেষ্ঠ। এ বিষয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস পেশ করা হলো-
١. أَفْضَلُ الصَّلوةِ بَعْدَ الْمَفْرُوضَةِ صَلَاةٌ فِي جَوْفِ اللَّيْلِ .
(أحمد)
১. “ফরয নামাযের পর শেষ রাতের নামাযই শ্রেষ্ঠ।”- (আহমদ)
أشْرَفُ أُمَّتِي حَمَلَةُ الْقُرْآنِ وَأَصْحَابُ اللَّيْلِ .
(البيهقي)
২. "আমার উম্মতের সবচেয়ে সম্মানিত হলো কুরআনের ধারক ও বাহক এবং রাতের অধিবাসী (রাত জেগে ইবাদাতকারী)।” – (বায়হাকী)
قَبْلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيُّ الدُّعَاءِ أَسْمَعُ قَالَ جَوْفِ اللَّيْلِ الْآخِرِ وَدُبُرَ الصَّلاتِ الْمَكْتُوبَةِ . اَلتَّرْمِذِى)
৩. “জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! কোন দোয়া সবচেয়ে বেশি মকবুল। জওয়াব দিলেন, শেষ রাতের ও ফরয নামাযের পরের দোয়া।” -(তিরমিযী)
عَلَيْكُمْ بِقِيَامِ اللَّيْلِ فَإِنَّهُ دَابُ الصَّالِحِينَ قَبْلَكُمْ وَهُوَ قُرْبَةٌ لَّكُمْ إِلَى رَبِّكُمْ وَمُكَفِّرْ لِلسَّيِّاتِ وَمِنْهَاةً عَنِ الْإِثْمِ .
৪. "রাত জাগা তোমাদের কর্তব্য। এটা তোমাদের পূর্ববর্তী নেক লোকদের তরীকা, তোমাদের রবের নৈকট্য, আগের গুনাহের কাফ্ফারা এবং গুনাহ করা থেকে বিরত রাখার উপায়।” (তিরমিযী)
ه رَحِمَ اللهُ رَجُلاً قَامَ مِنَ اللَّيْلِ فَصَلَّى وَأَيْقَظَ إِمْرَانَهُ فَصَلَّتْ فَإِنْ آبَتْ نَضَحَ فِي وَجْهِهَا الْمَاءَ .
رحِمَ اللهُ امْرَةً قَامَتْ مِنَ اللَّيْلِ فَصَلَّتْ وَأَيْقَظَتْ زَوْجَهَا فَصَلَّى فَإِنْ أَبَى نَضَحَتْ فِي وَجْهِهِ الْمَاء ۔ (ابو داود ونسائی)
৫. “আল্লাহ ঐ লোকের উপর রহম করুক যে রাতে উঠে, নামায আদায় করে ও তার স্ত্রীকে জাগায় এবং সেও নামায পড়ে। যদি সে উঠতে না চায় তাহলে তার মুখে পানি ছিটায়।
আল্লাহ ঐ মহিলার উপর রহম করুক যে রাতে উঠে, নামায পড়ে ও তার স্বামীকে জাগায় এবং সেও নামায পড়ে। যদি সে উঠতে না চায় তাহলে তার মুখে পানি ছিটায়।” – (আবু দাউদ ও নাসাঈ)
আসলেই শেষ রাতে উঠা আল্লাহর সাথে মহব্বতের সম্পর্কেরই প্রতীক। দুনিয়া যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন ঘুমের স্বাদ ও বিছানার মায়া ত্যাগ করা তার পক্ষেই সম্ভব যে আল্লাহর মহব্বতের কাংগাল। এ স্বাদ যে পায় তার পক্ষে এটা কঠিন মনে হয় না।
📄 নিজেকে কাঁদাও
আর জেনে রাখুন যে, নিজেকে কাঁদানোর প্রতিদান সত্যিকারের কান্নার চেয়ে কম হবে তথাপি আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া পরবশ হতে পারেন। আর এটাই কান্নার উপায়। কেননা যে ব্যক্তি নিজেকে কাঁদায় সে মূলত নিজের নফসের বিরুদ্ধে কঠিন সংগ্রাম করে এবং নিজের জবাবদিহিতা নিজে নেয় এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের প্রচেষ্টা চালায়।
আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ .
যারা আমার জন্য (আল্লাহর পথে) সংগ্রাম সাধনা করবে তাদেরকে আমি আমার পথ দেখাব।”১০৬
অতএব যে ব্যক্তিই তার অন্তরকে কাঁদাতে চেষ্টা করবে আল্লাহ ঐ ব্যক্তিকে কায়মনো বাক্যে কাঁদতে এবং এক্ষেত্রে সফলতা অর্জনে সঠিক পথ নির্দেশ প্রদান করবেন।
আনাস (রা) হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছেন যে, হে মানুষ! কাঁদো, যদি তোমার কান্না না আসে তবে কান্নার ভান কর। অবশ্যই জাহান্নামীরা ততক্ষণ পর্যন্ত কাঁদবে যতক্ষণ না তাদের গাল ভিজে যায়, অশ্রু প্রবাহিত হয় এবং শুকিয়ে যায়। এরপর (চোখ দিয়ে) রক্তক্ষরণ হওয়া পর্যন্ত তারা কাঁদবে এবং তাদের চোখে গর্ত হয়ে যাবে।"১০৭
এ পথে চলতে তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে আদেশ করেছেন কাঁদতে অথবা কান্নার ভান করতে। তিনি ﷺ জাহান্নামবাসীদের কান্নার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন অর্থাৎ (তিনি বলেছেন) তাদের চোখের পানি গাল বেয়ে প্রবাহিত হবে স্রোতস্বীনি নদীর মতো যতক্ষণ না তা নিঃশেষ হয়। এরপর তা শুকিয়ে রক্ত প্রবাহিত হবে এমনকি সেখানে গর্ত হয়ে যাবে।
এরপর আর তুমি কী চাইতে পার, হে আল্লাহর বান্দা! তোমার কান্না (আসার) জন্য আর কী লাগবে? আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি যে এটা একটি গভীর ও গুরুতর হুঁশিয়ারি, এ হুঁশিয়ারি তোমার তাওবা আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া এবং কাঁদার জন্য যথেষ্ট।
আপনি কি সত্যিই এ দৃশ্য (জাহান্নাম ও তিরস্কার) থেকে নিরাপদ? আপনি কি (খালেস) বান্দা ও জান্নাতবাসী হওয়ার ব্যাপার নিশ্চিত? (নিশ্চিত না) তাই কাঁদুন এবং অশ্রু বিসর্জন দিন এজন্য নয় যে পৃথিবীতে আপনি পুরস্কৃত হবেন; বরং কেয়ামতের দিন রক্তকান্নার পূর্বেই পৃথিবীতে কাঁদুন এটা ভাবুন যে পরকালে আপনি পুরস্কৃত হচ্ছেন না (কারণ সে নিশ্চয়তা নেই)।
যদি আপনি না কাঁদেন কিংবা কান্না না আসে তবে জেনে রাখুন যে আপনার ঈমান দুর্বল এবং পার্থিব আকর্ষণ আপনাকে গ্রাস করেছে আর আপনি এক মহা বিপদের মধ্যে আছেন। তাই আল্লাহর রাস্তায় বেড়িয়ে পড়ুন। জীবনকে খামচে ধরুন মৃত্যুর (খামচে ধরার) পূর্বেই। খালেছ মনে তাওবাহ করুন। আল্লাহর পথে ও ভালো কাজে এগিয়ে আসুন।
ইবনে আবি মুলায়েক (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমরা আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা)-এর সাথে এক উপত্যকায় বসেছিলাম। তিনি [আমর (রা)] বলেন, কাঁদো, যদি কান্না না আসে তবে কান্নার ভান কর। যদি তোমরা (জাহান্নামের শাস্তির কথা) জানতে, তবে তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত নামায পড়তে যতক্ষণ না তোমাদের পিঠ ভেঙ্গে যায় আর ততক্ষণ পর্যন্ত কাঁদতে যতক্ষণ না কণ্ঠ শুকিয়ে যায়।"১০৮
বদরের যুদ্ধবন্দীদের সম্পর্কে ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, যখন বদরের যুদ্ধবন্দীদের আটক করা হয় তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ আবু বকর (রা) ও উমর (রা)-এর কাছে জানতে চান, “যুদ্ধবন্দীদের সাথে কেমন আচরণ করা উচিত?” আবু বকর (রা) বলেন, হে আল্লাহর নবী! তারা আমাদের আত্মীয়। আমার মনে হয় তাদের কাছ থেকে আমাদের মুক্তিপণ নেয়া উচিত আর এ মুক্তিপণ আমাদের শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে একটি শক্তি হিসেবে কাজ করবে। আর হতে পারে আল্লাহ তাদেরকে হেদায়াত দান করেন। এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ উমর (রা)-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে খাত্তাবের সন্তান, তুমি কী ভাবছ? আমি (উমর) বললাম, 'না, আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি আবু বকরের সাথে একমত নই। আমি মনে করি আপনার উচিত আমাদেরকে তাদের ঘাড় থেকে গর্দান কেটে নেয়ার অনুমতি দেয়া।
তাই আলীকে হত্যা করতে আর আমাকে ওমুক ওমুককে (তারা উমরের আত্মীয়) হত্যা করার অনুমতি দিন। নিঃসন্দেহে তারা কাফেরদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ও সর্দার। আল্লাহর রাসূল ﷺ আবু বকরের মতামত অনুমোদন করলেন আর আমার মতামত বাতিল করলেন। এর পরের দিন যখন আমি তাদের কাছে আসি, আমি দেখলাম রাসূলুল্লাহ ﷺ ও আবু বকর (রা) একসাথে বসে আছেন এবং কাঁদছেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! আমাকে বলুন, কোন জিনিস আপনাকে এবং আপনার সঙ্গীকে কাঁদাচ্ছে? যদি আমি এতে কান্নার কিছু পাই তবে আমিও কাঁদব আর যদি আমার কান্না না আসে তবে কান্নার চেষ্টা করে যাব যে কারণে আপনারা উভয়ে কাঁদছেন। নবী ﷺ বললেন, আমি কাঁদছি কারণ যে মুক্তিপণ নেয়ার পরামর্শ তোমার সঙ্গীরা দিয়েছে তাদের শাস্তিস্বরূপ তা আমাকে দেখানো হয়েছে এ গাছটির চেয়েও আরো নিকট থেকে।”
টিকাঃ
১০৫. কান্নার প্রকারভেদ তুলে ধরে ইবনে কায়্যিম, যারা বিনীত হয়ে কাঁদেন তাদের সম্পর্কে বলেন। তিনি যাদ আল মা'আদ গ্রন্থে বলেন, এটা (কান্না) হতে পারে দু'ধরনের, (এক) প্রশংসনীয়, (দুই) নিন্দনীয়। প্রশংসনীয় কান্নায়, হৃদয়ের কোমলতা ও গভীর আল্লাহভীতি বৃদ্ধি কামনা করা হয় এবং এ কান্না মানুষকে শোনানো বা দেখানোর জন্য হয় না। অন্যদিকে অপছন্দনীয় কান্নায়, কান্না (কৃত্তিমভাবে) তৈরি করা হয় .... এভাবে বদরের যুদ্ধবন্দীদের প্রতি উমর (রা)-এর
১০৬. সূরা আনকাবুত (২৯) : ৬৯
১০৭. শায়খ আলবানী সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব গ্রন্থে একে হাসান বলেছেন। বক্তব্যকে উল্লেখ করা হয়, "... আর যদি আমার (উমরের) কান্না না আসে তবে আমি কান্নার ভান করি কেননা তোমরা সবাই কাঁদছ।” নবী ﷺ (উমরের) এ বক্তব্যকে অনুমোদন করেন নি। কিছু সালাফীপন্থি আলেম বলেন, "আল্লাহর ভয়ে কাঁদুন আর যদি কান্না না আসে তবে কান্নার ভান করুন।”
১০৮. তারগীব ওয়াত তারহীব গ্রন্থে তিনি বলেন: “হাকিম একে মারফু হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, হাদীসটি তাদের শর্তানুযায়ী সহীহ।” শায়খ আলবানী তার আল তালীক আর রাগীব গ্রন্থে বলেন, এটা স্পষ্ট যে, এটা একটি ভুল প্রকাশ এবং প্রসঙ্গটি এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে যেমন আল মুসতাদরাক গ্রন্থে উল্লেখ করা।