📄 আবু বকর (রা)-এর কান্না
সালাতে আবু বকর (রা)-এর কুরআন তিলাওয়াত শুনাই যেত না তাঁর অত্যাধিক কান্নার কারণে। যে কথা আমরা জানতে পারি, আয়েশা (রা)-এর কাছ থেকে, তিনি (আয়েশা) বলেন, তাঁর (রাসূল ﷺ) অসুস্থতার সময় রাসূল ﷺ বলেন, আবু বকর (রা)-কে নামাযের ইমামতি করতে আদেশ কর। আয়েশা (রা) বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল ﷺ কে বললাম যে, সত্যিই আবু বকর (রা) যদি আপনার স্থলে (নামাযের ইমামতিতে) দাঁড়ান তাহলে লোকেরা তার অত্যাধিক কান্নার ফলে কিছুই শুনতে পাবে না। তাই (হে রাসূল! ﷺ আপনি দয়া করে) উমর (রা)-কে ইমামতি করতে বলুন। নবী মুহাম্মদ ﷺ আবারো বললেন, "আবু বকরকে নামাযে ইমামতির আদেশ দাও।”
এরপর আয়েশা (রা) হাফসা (রা)-কে বললেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ কে বলুন যে, “যদি আবু বকর (রা) আপনার স্থলে ইমামতিতে দাঁড়ান তবে লোকেরা তার কান্নার কারণে তাঁর কথা কিছুই বুঝবে না। তাই উমর (রা)-কে নামাযের ইমামতির আদেশ দিন। হাফসা তাই করলেন এবং রাসূল ﷺ উত্তরে বললেন, চুপ কর! তোমরাতো দেখছি ইউসুফ (আ)-এর উম্মতের মতো। আবু বকরকেই নামাযে ইমামতি করার আদেশ দাও।” তারপরে হাফসা (রা) আয়েশা (রা)-কে বললেন, "তুমি কাজটি আমার জন্য ভালো করলে না।” (অর্থাৎ, আমাকে লজ্জায় ফেলে দিলে/রাসূলের অপছন্দ হয় এমন কথা বলতে বাধ্য করলে।)
অপর একটি বর্ণনায় আছে, 'সত্যিই আবু বকর (রা) একজন কোমল স্বভাবের মানুষ যদি সে আপনার স্থানে আসে তবে সে নামাযে ইমামতি করতে পুরোপুরি সক্ষম হবে না বলে আশংকা করছি।
টিকাঃ
৪০. আল হাফিজ 'আল ফাতহ' গ্রন্থে বলেন, আয়েশা (রা) ও ইউসুফ (আ)-এর উম্মতের মধ্যকার সাদৃশ্য হলো, মিশরের তৎকালীন বাদশাহ আজীজের স্ত্রী (তার শহরের) কিছু সংখ্যক নারীকে রাজপ্রাসাদে দাওয়াত করলেন। তাদের সম্মানে রাজসিক খাবারের আয়োজন করা হলো। তার (স্ত্রীর) আসল উদ্দেশ্য হলো ঐ নারীদেরকে হযরত ইউসুফের অপরূপ সৌন্দর্য দেখানো। আয়েশা (রা)-এর পিতাকে নামাযের ইমামতির দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখতে রাসূল ﷺ কে অনুরোধ করার বাহ্যিক উদ্দেশ্য ছিল যে (আবু বকরের কোমল মনের মানুষ হওয়া) ঈমানদাররা (মুসল্লীরা) তার কান্নার কারণে নামাযের তিলাওয়াত শুনতে পাবে না। তদুপরি এখানে পূর্ণাঙ্গ অর্থ হলো (আয়েশা (রা)-এর আসল উদ্দেশ্য ছিল তিনি সংকিত ছিলেন যে অন্য সাধারণ লোকেরা) রাসূল ﷺ এর ওফাতের অশনি সংকেত যেন দেখতে না পায়। এটাই আশংকারী বুখারী শরীফে উদ্ধৃত হয়েছে, আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যতটা সম্ভব আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে দৃঢ়তার সাথে অনুরোধ করেছিলাম। কারণ এটা আমার একটুও বুঝে আসছিল না যে আল্লাহর রাসূল ﷺ এর স্থানে অন্য কাউকে লোকেরা গ্রহণ করে নিতে পারবে। প্রায়ই আমি ভাবতাম যে অন্য কাউকে রাসূল ﷺ এর স্থানে দেখতে পেলে লোকেরা (রাসূল ﷺ এর মৃত্যুর) একটা অশনি সংকেত ভেবে নেবে। তাই আমি চেয়েছিলাম রাসূল ﷺ যেন আবু বকরের (তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার) ব্যাপারে তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। ইমাম মুসলিমও হাদীসখানা বর্ণনা করেন।
৪১. ইমাম বুখারী কর্তৃক বর্ণিত।
৪২. বুখারী শরীফ হতে বর্ণিত।
📄 উমর (রা)-এর কান্না
উমর (রা)-এর কান্না মসজিদের শেষ কাতার থেকেও শোনা যেত যা আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন আবদুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ (রা)। তিনি বলেন, আমি উমর (রা)-এর নামাযে কুরআন তিলাওয়াতের মধ্যে কান্নার (মৃদু) শব্দ শুনতে পেতাম পেছনের কাতার থেকেও। বিশেষ করে যখন এ আয়াতটি তিলাওয়াত করতেন।
তিনি বললেন, আমি আমার দুঃখ-দুর্দশা ও কষ্টের ফরিয়াদ আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে করছি না।
টিকাঃ
৪৩. সূরা ইউসুফ (১২): ৮৬।
৪৪. মুয়াল্লাক ও জাযম গ্রন্থে ইমাম বুখারী উদ্ধৃত করেছেন এবং শায়েখ নাসিরুদ্দিন আলবানী কর্তৃক তার আল মুখতাসার গ্রন্থে বিশুদ্ধ হিসেবে স্বীকৃত। তিনি বলেন, সাঈদ ইবনে মানসূর হাদীস "ফজরের সালাতের সময়" উল্লেখ করে একে বিশুদ্ধ বর্ণনাসূত্রের সাথে সংযুক্ত করেছেন। ইবনে মুনযির অন্য এক সূত্র থেকে একই বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। ইমাম বায়হাকীও একটি বিশুদ্ধ সূত্র থেকে বর্ণনা করেন এবং এটা উল্লেখ করেন যে, তা ছিল এশার সালাতের সময়। আসলে ঘটনাটি দুই ওয়াক্তের সময়ই ঘটতে পারে।
📄 উসমান ইবনে আফফান (রা)-এর কান্না
উসমান ইবনে আফফান (রা)-এর মুক্ত দাস হানী (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন উসমান ইবনে আফফান (রা) কোনো কবরের পাশে দাঁড়াতেন তাঁর দাড়ি ভিজে না যাওয়া পর্যন্ত কাঁদতেন। একবার তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনি জান্নাত ও জাহান্নামের আলোচনা শুনেছেন কিন্তু কাঁদেননি। অথচ এখন (কবরের আলোচনা শুনে) কাঁদলেন, কেন?” তিনি উত্তরে বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন, “কবর হলো পরকালীন জীবনের প্রথম ধাপ, যদি কেউ এখানে রক্ষা পায় তাহলে পরবর্তী ধাপগুলো আরো সহজ হয়। আর যদি কেউ এখানে রক্ষা না পায় তবে পরবর্তী পর্যায়গুলো হবে আরো ভয়াবহ।” তিনি (রাসূল ﷺ) আরো বলেন, “আমি কবরের চেয়ে অধিক আতংকের জায়গা আর দেখিনি।
টিকাঃ
৪৫. ইমাম তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ হতে বর্ণিত, ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে গারীব হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। শায়খ আলবানী 'আল মিশকাত' গ্রন্থে এ সম্পর্কে বলেন, এর বর্ণনার ধারাবাহিকতা বিশুদ্ধ হাসান।
📄 আয়েশা (রা)-এর কান্না
ইবনে হারিস যিনি নবী মুহাম্মদ ﷺ এর স্ত্রী আয়েশা (রা)-এর ভাতিজা, বর্ণনা করেন যে, তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আবদুল্লাহ ইবনে জোবায়ের (রা) বলেন, আল্লাহর কসম, যদি আয়েশা (রা) এটা ত্যাগ না করে তবে আমি তাকে বয়কট করব (অর্থাৎ, তার কাছে আর আসব না)।
আয়েশা (রা) জানতে চাইলেন, সত্যিই কি তিনি (আবদুল্লাহ ইবনে জোবায়ের (রা)) একথা বলেছেন? লোকেরা উত্তরে বলল, 'হ্যাঁ'। আয়েশা (রা) তখন বললেন, আমি আল্লাহর কসম করে বলছি আমি আবদুল্লাহ ইবনে জোবায়ের (রা)-এর সাথে আর কথা বলব না। যখন এ (কথা না বলার) বিরতি দীর্ঘ হচ্ছিল তখন (এ অবস্থা নিরসনে) আবদুল্লাহ ইবনে জোবায়ের তার (আয়েশা (রা)-এর) পরিচিত কোনো মধ্যস্থতাকারী খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু আয়েশা (রা) একথা শুনে বললেন, আল্লাহর শপথ, আমি কোনো (তার নিয়োজিত) মধ্যস্থতাকারীকে মেনে নেব না। আর আমি আমার শপথ ভেঙে কোনো পাপও করব না। এরপর যখন এ বিরতি আরো দীর্ঘ হচ্ছিল (এবং মনে মনে কষ্ট পাচ্ছিলেন) তখন তিনি মিসওয়ার ইবনে মাকরামা এবং বনী যোহরার গোত্র থেকে আগত আবদুর রহমান বিন আসওয়াদ বিন আবদে ইয়াগুসের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলেন, আমি আপনাকে অনুরোধ করছি, আল্লাহর কসম, আয়েশা (রা)-এর কাছে আমাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন। কেননা আমার সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার শপথ করা তার জন্য হারাম।
তাই মিসওয়ার ও আবদুর রহমান তার সাথে সামনে এগিয়ে চলল। তাঁকে (আবদুল্লাহ ইবনে জোবায়েরকে) কাপড় দিয়ে পেচিয়ে তাদের মধ্যখানে আড়াল করে রাখল। তারা আয়েশা (রা)-এর কাছে পৌঁছে প্রবেশের অনুমতি চেয়ে সালাম দিল "আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহি ওবারাকাতুহু” আমরা কি ভিতরে আসতে পারি! আয়েশা (রা) বললেন, 'হ্যাঁ, আসুন'। তারা বললেন, আমাদের সবাই আসবে? তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আপনাদের সবাই আসুন।” তিনি জানতেন না যে আবদুল্লাহ ইবনে জোবায়ের (রা) তাদের মধ্যে আছেন। তাই যখন তারা প্রবেশ করলেন তখন আয়েশা (রা)ও অন্য লোক মারফত জোবায়ের (রা)-এর প্রবেশের কথা জানতে পারেন।
জোবায়ের (রা) আয়েশা (রা)-কে করজোরে মিনতি করতে থাকলেন তাকে ক্ষমা করার জন্য আর কাঁদছিলেন। মিসওয়ার ও আবদুর রহমানও আয়েশা (রা)-কে জোবায়ের (রা)-এর সাথে কথা বলতে ও তাকে ক্ষমার আবেদন গ্রহণ করে নিতে অনুরোধ করতে লাগলেন। তারা তাকে বললেন, “আপনি (আয়েশা) জানেন যে নবী ﷺ (মুসলিমদের সাথে কথা না বলার মতো) সম্পর্ক বিচ্ছিন্নকারিতা নিষেধ করেছেন। এ কারণে যে কোনো মুসলিমের জন্য এটা হারাম যে সে তার ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশি কথা বলবে না।”
এভাবে তারা যখন বার বার তাঁকে (আত্মীয়তার সম্পর্ক ভালো রাখা ও অন্যের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করার মাহাত্ম্য) স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন এবং অসুখী ও অস্বস্তিকর পরিবেশ যা সম্পর্ক বিনষ্টের ফলে তৈরি হয় তা তুলে ধরলেন। আয়েশা (রা)ও তাদেরকে কাঁদতে কাঁদতে তার শপথের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন এ বলে, “আমি তো শপথ করেছি আর শপথ খুবই কঠিন ব্যাপার।” তারা তাকে নাছোর বান্দার মতো অনুরোধ করতে থাকলেন যতক্ষণ না তিনি আবদুল্লাহ ইবনে জোবায়েরের সাথে কথা বলেন। অবশেষে তিনি আবদুল্লাহ ইবনে জোবায়েরের সাথে কথা বললেন এবং তার শপথ ভাঙার কাফফারাস্বরূপ চল্লিশটি দাস মুক্ত করে দেন। পরে যখনই তার [আয়েশা (রা)] শপথের কথা স্মরণ হতো তখন তিনি এত বেশি কাঁদতেন যে তাঁর চোখের পানিতে তাঁর গায়ের চাদর ভিজে যেত।
টিকাঃ
৪৬. হাফিজ বলেন, যেহেতু সে (আবদুল্লাহ ইবনে জোবায়ের) ছিল তাঁর (আয়েশা (রা)-এর) ভাতিজা এবং তার বেড়ে উঠায় তাঁর ভূমিকা ছিল।
৪৭. বুখারী শরীফ।