📄 নবী মুহাম্মদ ﷺ এর কান্না
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ আমাকে বলেছেন, 'কুরআন তিলাওয়াত কর! তাই আমি সূরা আন নিসা তিলাওয়াত করতে লাগলাম যতক্ষণ না এ আয়াতে পৌঁছলাম।
فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا .
“তখন কেমন হবে যখন আমরা প্রত্যেক জাতি থেকে এক একজন সাক্ষী আনব এবং তাদের ওপর আপনাকে (মুহাম্মদ ﷺ কে) সাক্ষী হিসেবে দাঁড় করাব।”
এরপর আমি তাঁর (নবী ﷺ এর) দিকে তাকালাম এবং লক্ষ্য করলাম যে, তাঁর দু'চোখ পানিতে ভরে উঠছে।
এ গুরুত্বপূর্ণ আয়াতটির একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, আবু সাঈদ (রা)-এর বর্ণিত একটি হাদীস থেকে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, একজন নবী আসেন যার সঙ্গী থাকবে দু'জন পুরুষ এবং আরেকজন নবী আসেন তার সাথে থাকবে তিনজন এবং এ রকম কম-বেশি থাকবে (অন্য নবীদের সাথে)। তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে তুমি কি তোমার উম্মতের কাছে আমার বার্তা পৌঁছে দিয়েছ? সে (নবী) উত্তর করবে 'হ্যাঁ'। তখন তার উম্মতকে ডাকা হবে, আল্লাহর এ বাণী তোমাদের কাছে পৌঁছানো হয়েছিল? তখন তারা উত্তরে বলবে 'না'। তখন সে নবীকে জিজ্ঞাসা করা হবে 'কে' তোমার জন্য সাক্ষ্য দিবে? (সে) নবী উত্তরে বলবেন 'মুহাম্মদ ﷺ ও তার উম্মত (আমার জন্য সাক্ষ্য দিবে)। ফলে ডাকা হবে নবী মুহাম্মদ ﷺ এর উম্মতকে এবং তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে "তোমরা কি এ (অন্য নবীদের বাণী) সম্পর্কে জানতে? তারা (উম্মতে মুহাম্মাদী) উত্তরে বলবে 'হ্যাঁ'।
তখন আবারো প্রশ্ন করা হবে তোমরা কিভাবে সে সম্পর্কে জানতে পারলে? তারা উত্তরে বলবে আমাদের নবী মুহাম্মদ ﷺ সে বিষয়ে আমাদের জানিয়েছেন এবং আমরা তা বিশ্বাস করেছি।" তিনি (আবু সাঈদ) বলেন, এ ঘটনাটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কুরআন মাজীদে বলেছেন, আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে (মুসলিমদেরকে) একটি মধ্যমপন্থী জাতি হিসেবে সৃষ্টি করেছি যাতে করে তোমরা সমগ্র মানবজাতির সাক্ষী হতে পার আর মুহাম্মদ ﷺ তোমাদের জন্য সাক্ষী হতে পারেন.....
আলী (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল মিকদাদ ছাড়া বদর যুদ্ধের দিন আমাদের সাথে আর কোনো অশ্বারোহী ছিল না। আমাদের সবাই ঘুমাচ্ছিল (রাতের বেলা) শুধু আল্লাহর রাসূল ﷺ ছাড়া। তিনি একটি গাছের নিচে নামায পড়ছিলেন আর ফজর হওয়ার আগ পর্যন্ত কাঁদছিলেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল ﷺ-এর জীবদ্দশায় একবার সূর্য গ্রহণ হলো। তিনি (রাসূল ﷺ) সালাতে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং সালাতে তিনি এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন মনে হচ্ছিল যেন তিনি রুকুতে যাবেন না। এরপর তিনি রুকুতে গেলেন (এত দীর্ঘ সময় ধরে) মনে হচ্ছিল যেন তিনি আর রুকু থেকে মাথা তুলবেন না। এরপর তিনি রুকু থেকে মাথা তুললেন (এ অবস্থায়) দীর্ঘক্ষণ থাকলেন আর মনে হচ্ছিল যেন তিনি আর সিজদায় যাবেন না। এরপর তিনি সিজদায় গেলেন এবং এত দীর্ঘক্ষণ সেজদায় কাটালেন মনে হচ্ছিল তিনি আর মাথা উঠাবেন না এবং বসা অবস্থায় এত দীর্ঘক্ষণ কাটালেন যেন মনে হচ্ছিল তিনি আর সিজদায় যাবেন না। তারপর তিনি আবার সিজদায় গেলেন এবং এত দীর্ঘক্ষণ সিজদায় থাকলেন যেন মনে হচ্ছিল তিনি আর মাথা তুলবেন না।
এরপর তিনি জোরে নিঃশ্বাস নিতে লাগলেন এবং এ বলে কাঁদতে লাগলেন ইয়া আল্লাহ! আপনি কি প্রতিজ্ঞা করেননি যে, যতক্ষণ আমি তাদের মধ্যে আছি ততক্ষণ তাদের কোনো শাস্তি দিবেন না? প্রভু! আপনি কি আমাকে এ ওয়াদা দেননি যে, যতক্ষণ তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে ও আমরা ক্ষমা প্রার্থনা করব ততক্ষণ আপনি কোনো শাস্তি দিবেন না? যখন তিনি দু'রাকাত নামায শেষ করলেন তখন সূর্যগ্রহণ দূর হয়ে গেল এবং তিনি তখন দাঁড়িয়ে গেলেন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন এবং তাসবীহ পাঠ করলেন। এরপর বললেন, চন্দ্র ও সূর্য হলো আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দুটি নিদর্শন, তারা (চন্দ্র ও সূর্য) কারো জন্ম-মৃত্যুর কারণে গ্রহণ করে না। তাই যদি তুমি তাদের গ্রহণ হতে দেখ, তাহলে আল্লাহর নাম স্মরণে মশগুল হয়ে যাও।
বারা ইবনে আযেব (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার যখন আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে ছিলাম। তখন তিনি একদল মানুষের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী উদ্দেশ্যে তারা এখানে একত্রিত হয়েছে? বলা হলো, 'একটি কবর খুড়ার জন্য'। এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ বিস্মিত ও আতঙ্কিত অবস্থায় তার সাহাবায়ে কেরামের সামনে কবরের পাশে চলে গেলেন এবং হাটু গেড়ে বসে পড়লেন সেখানে। তিনি কী করেছেন তা দেখার জন্য আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তার চোখের জলে মাটি ভিজে না যাওয়া পর্যন্ত কাঁদতে লাগলেন এরপর তিনি আমাদের দিকে তাকালেন এবং বললেন, হে আমার ভাইয়েরা! এমন একটি দিনের জন্য প্রস্তুত হও।
আবদুল্লাহ ইবনে আশ শিখখির (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে আমাদের সাথে সালাত আদায়ে পেয়েছি এবং আমি তাঁর বুকের মধ্য হতে আসা কান্নার আওয়াজ শুনেছি, যা অনেকটা পাত্রে ফুটন্ত পানির শব্দের মতো।
টিকাঃ
২৭. ইবনুল কাইয়ুম তার "যাদ আল মাআদ” গ্রন্থে বলেন, নবী করীম ﷺ এর কান্না ছিল তার হাসির মতোই (নিঃশব্দের)। তিনি শব্দ করে কাঁদেননি এবং তার কণ্ঠস্বরও উচ্চ হয়নি। একেবারে তার (মুচকি) হাসির মতোই ছিল কান্না, যাতে কোনো শব্দ হয়নি। তথাপি তার চোখ পানিতে ভরে উঠেছিল। যতক্ষণ না তা ঝরে পড়েছিল। আর সে কান্নার শব্দ ছিল (পানির/চায়ের) কেতলি থেকে তা (পানি/চা) ঢালার শব্দের মতো আর সে শব্দ ভেসে আসছিল তার বুকের মধ্য থেকে। মৃতের রুহের মাগফিরাত কামনায় তিনি (রাসূল ﷺ) কাঁদতেন। (কিয়ামতের ময়দানে) উম্মতের (কঠিন মুহূর্তের) ভয় ও সমবেদনায় তিনি কাঁদবেন। আল্লাহর প্রতি সুগভীর ভালোবাসা ও ভয়ের কারণে তিনি কাঁদবেন। এ সংক্রান্ত কুরআনের আয়াতে কারীমা শুনে তিনি কেঁদে উঠেন। বস্তুত এ কান্না হলো গভীর আকুতি, ভালোবাসা ও আনন্দের কান্না যাকে বিশেষ রূপ দিয়েছে আল্লাহর ভয় বা খাশিয়াহ।
২৮. সূরা-৪ নিসা : আয়াত-৪১।
২৯. বুখারী মুসলিম এবং আরো অনেক সূত্র হতে বর্ণিত।
৩০. সূরা আল বাকারা (২): ১৪৩
৩১. ইবনে মাজাহ ইমাম আহমদ কর্তৃক বর্ণিত এবং ইমাম বুখারী এ ধরনের একটি হাদীসও বর্ণনা করেছেন আর এটা আস সাহীহহাতেও রয়েছে।
৩২. ইবনে খুজায়মাহ তার সহীহ'তে উদ্ধৃত করেছেন। শায়েখ আলবানী একে তার সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব গ্রন্থে সহীহ বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
৩৩. হাদীসটি আশ শামাইল আল-মুহাম্মাদিয়্যাহ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। আন নাসায়ী শরীফে সালাতিল কুসুফ অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে। শায়েখ আলবানী মুখতাসার আশ শামায়েল-এ বলেন, আবু দাউদ এটি বর্ণনা করেছেন, দেখুন সহীহ আবু দাউদ শরীফ। ইবরা আল যালীল গ্রন্থে এর কিছুসংখ্যক লেখক হাদীসটিকে বর্ণনার ধারাবাহিকতা সূত্রে সংগ্রহীত। এছাড়া সূর্য গ্রহণের নামাযে প্রতি রাকাআতে দুই রুকু এটা ইবনে আমর এবং আরো অনেকের নিকট হতে বর্ণিত সূর্যগ্রহণ অনুচ্ছেদের হাসীদগুলোতে লিপিবদ্ধ রয়েছে যা বিশুদ্ধ দুটি হাদীস গ্রন্থে ও অন্যান্য সূত্রে উল্লিখিত হয়েছে। আর আমি (লেখক) এ সংক্রান্ত হাদীসগুলোকে 'সিফাতু সালাতিল কুসূফ' নামক একটি পুস্তিকায় সংকলন করেছি। এ বইয়ে আলোচিত হয়েছে যে, রুকু একবারই উল্লিখিত হয়েছে, এটা একটি দুর্বল বর্ণনা যা, অনেকগুলো শক্তিশালী বর্ণনার বিপরীত।
৩৪. বুখারী শরীফের 'আততারীখ' অনুচ্ছেদে, ইবনে মাজাহ, আহমদ এবং অন্যান্য গ্রন্থেও বর্ণিত হয়েছে। এটি একটি হাসান হাদীস যা শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী তার 'আস সাহীহা' গ্রন্থেও উল্লেখ করেছেন।
৩৫. আবু দাউদ, আন নাসায়ী এবং ইমাম তিরমিযী আশ শামায়েলে বর্ণনা করেছেন। এছাড়া আল হাফিজ তার 'আল ফাতহ' গ্রন্থে বলেন: এর বর্ণনার ধারাবাহিকতা শক্তিশালী। ইবনে খুজায়মাহ, ইবনে হিব্বান এবং আল হাকীম একে বিশুদ্ধ বলে ঘোষণা করেছেন। শায়েখ আলবানী তার 'আত তারগীব ওয়াত তারহীব, গ্রন্থেও একে বিশুদ্ধ বলে ঘোষণা করেছেন।
📄 সাহাবায়ে আজমাঈনের কান্না/সাহাবাগণের কান্না
ইরবাদ ইবনে ছারীয়্যাহ (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ আমাদের গভীর সতর্কবাণী দিয়েছেন যা আমাদের অন্তরে কম্পন সৃষ্টি করেছে এবং আমাদের চোখের অশ্রু বিগলিত করেছে। তাই আমরা রাসূল ﷺ কে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ এটা আমাদের কাছে বিদায়ী হজ্বের মতো মনে হচ্ছে, তাই আমাদেরকে আরো উপদেশ দিন। তিনি উত্তর করলেন, আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি আল্লাহর ভয়ে ভীত হতে (তাকওয়া অর্জনে) এবং (নেতার বক্তব্য) শ্রবণ ও আনুগত্যের এমনকি যদি একজন আবিসিনিয়ার দাসকেও (কেননা আবিসিনিয়ার লোকেরা অত্যন্ত কালো ও কুৎসিত চেহারার হয়ে থাকে। বঙ্গানুবাদক) তোমাদের নেতা বানানো হয়। আর তোমাদের মধ্যে যারা দীর্ঘায়ু হবে তারা অনেক মতানৈক্য দেখবে। তখন তোমাদের কর্তব্য হলে আমার সুন্নাহকে এবং সাহাবায়ে কেরামের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা। দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরার মতো। নব আবিষ্কৃত বা বিদায়াতীর (ইবাদত বন্দেগীর) ব্যাপারে সাবধান থাকবে। কেননা প্রত্যেক নব আবিষ্কার বা বিদায়াত হলো বিভ্রান্তি।
আনাস (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে নসীহত করেন যা আমরা এর আগে কখনো শুনিনি। তিনি (রাসূল ﷺ) বলেন, আমি যা জানি যদি তোমরা তা জানতে তবে তোমরা হাসতে কম আর কাঁদতে বেশি। একথা শুনার পরই সাহাবায়ে আজমাঈন তাদের মুখ ঢেকে ফেলেন এবং কাঁদতে শুরু করেন।
টিকাঃ
৩৬. অর্থাৎ : সুন্নাত আমলের সাথে লেগে থাকে এবং তা পালনে সংগ্রাম করা। সেই ব্যক্তির মতো যে তার মাড়ির দাঁত দিয়ে শক্ত করে কোনো প্রিয় বস্তু ধরে রাখে। এ কারণে যে তা হাত ফসকে বেড়িয়ে যাবে।
৩৭. ইমাম আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ এবং অন্যান্য কর্তৃক বর্ণিত। সংগ্রহীত সুনানে ইবনে মাজাহ, সহীহ সুনানে আবু দাউদ এবং সহীহ সুনানে আত তিরমিযী থেকে উৎসারিত। এছাড়াও দেখুন, সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব এবং তাখরীজ অভ কিতাব আসসুন্নাহ।
৩৮. অর্থাৎ : তাঁরা (সাহাবাগণ) কেঁদেছিলেন এবং তাতে ফুপিয়ে কাঁদার মতো শব্দ হয়নি। আরবি শব্দ 'খানীন' ব্যবহৃত হয়েছে যার অর্থ এমন শব্দ যা নাকের বাঁশি থেকে উৎপন্ন হয়। তার নাকের বদলে মুখ থেকেও সে শব্দ উচ্চারিত হতে পারে (আন নিহায়াহ)। আল হাফিজ 'আল ফাতহ' গ্রন্থে বলেন, শব্দটি 'হ' উচ্চারণে 'হানীন' হিসেবে যার অধিকাংশই সহীহ আল বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে আর আল কাশমীহানী 'খ' উচ্চারণে 'খানীন' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যার প্রথমটি বুকের মধ্য থেকে আসা কান্নার শব্দ বুঝতে, আর দ্বিতীয়টি নাকের মধ্য হতে আশা কান্নার শব্দ বুঝাতে ব্যবহৃত হয়।
৩৯. বুখারী ও মুসলিম হতে বর্ণিত।
📄 আবু বকর (রা)-এর কান্না
সালাতে আবু বকর (রা)-এর কুরআন তিলাওয়াত শুনাই যেত না তাঁর অত্যাধিক কান্নার কারণে। যে কথা আমরা জানতে পারি, আয়েশা (রা)-এর কাছ থেকে, তিনি (আয়েশা) বলেন, তাঁর (রাসূল ﷺ) অসুস্থতার সময় রাসূল ﷺ বলেন, আবু বকর (রা)-কে নামাযের ইমামতি করতে আদেশ কর। আয়েশা (রা) বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল ﷺ কে বললাম যে, সত্যিই আবু বকর (রা) যদি আপনার স্থলে (নামাযের ইমামতিতে) দাঁড়ান তাহলে লোকেরা তার অত্যাধিক কান্নার ফলে কিছুই শুনতে পাবে না। তাই (হে রাসূল! ﷺ আপনি দয়া করে) উমর (রা)-কে ইমামতি করতে বলুন। নবী মুহাম্মদ ﷺ আবারো বললেন, "আবু বকরকে নামাযে ইমামতির আদেশ দাও।”
এরপর আয়েশা (রা) হাফসা (রা)-কে বললেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ কে বলুন যে, “যদি আবু বকর (রা) আপনার স্থলে ইমামতিতে দাঁড়ান তবে লোকেরা তার কান্নার কারণে তাঁর কথা কিছুই বুঝবে না। তাই উমর (রা)-কে নামাযের ইমামতির আদেশ দিন। হাফসা তাই করলেন এবং রাসূল ﷺ উত্তরে বললেন, চুপ কর! তোমরাতো দেখছি ইউসুফ (আ)-এর উম্মতের মতো। আবু বকরকেই নামাযে ইমামতি করার আদেশ দাও।” তারপরে হাফসা (রা) আয়েশা (রা)-কে বললেন, "তুমি কাজটি আমার জন্য ভালো করলে না।” (অর্থাৎ, আমাকে লজ্জায় ফেলে দিলে/রাসূলের অপছন্দ হয় এমন কথা বলতে বাধ্য করলে।)
অপর একটি বর্ণনায় আছে, 'সত্যিই আবু বকর (রা) একজন কোমল স্বভাবের মানুষ যদি সে আপনার স্থানে আসে তবে সে নামাযে ইমামতি করতে পুরোপুরি সক্ষম হবে না বলে আশংকা করছি।
টিকাঃ
৪০. আল হাফিজ 'আল ফাতহ' গ্রন্থে বলেন, আয়েশা (রা) ও ইউসুফ (আ)-এর উম্মতের মধ্যকার সাদৃশ্য হলো, মিশরের তৎকালীন বাদশাহ আজীজের স্ত্রী (তার শহরের) কিছু সংখ্যক নারীকে রাজপ্রাসাদে দাওয়াত করলেন। তাদের সম্মানে রাজসিক খাবারের আয়োজন করা হলো। তার (স্ত্রীর) আসল উদ্দেশ্য হলো ঐ নারীদেরকে হযরত ইউসুফের অপরূপ সৌন্দর্য দেখানো। আয়েশা (রা)-এর পিতাকে নামাযের ইমামতির দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখতে রাসূল ﷺ কে অনুরোধ করার বাহ্যিক উদ্দেশ্য ছিল যে (আবু বকরের কোমল মনের মানুষ হওয়া) ঈমানদাররা (মুসল্লীরা) তার কান্নার কারণে নামাযের তিলাওয়াত শুনতে পাবে না। তদুপরি এখানে পূর্ণাঙ্গ অর্থ হলো (আয়েশা (রা)-এর আসল উদ্দেশ্য ছিল তিনি সংকিত ছিলেন যে অন্য সাধারণ লোকেরা) রাসূল ﷺ এর ওফাতের অশনি সংকেত যেন দেখতে না পায়। এটাই আশংকারী বুখারী শরীফে উদ্ধৃত হয়েছে, আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যতটা সম্ভব আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে দৃঢ়তার সাথে অনুরোধ করেছিলাম। কারণ এটা আমার একটুও বুঝে আসছিল না যে আল্লাহর রাসূল ﷺ এর স্থানে অন্য কাউকে লোকেরা গ্রহণ করে নিতে পারবে। প্রায়ই আমি ভাবতাম যে অন্য কাউকে রাসূল ﷺ এর স্থানে দেখতে পেলে লোকেরা (রাসূল ﷺ এর মৃত্যুর) একটা অশনি সংকেত ভেবে নেবে। তাই আমি চেয়েছিলাম রাসূল ﷺ যেন আবু বকরের (তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার) ব্যাপারে তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। ইমাম মুসলিমও হাদীসখানা বর্ণনা করেন।
৪১. ইমাম বুখারী কর্তৃক বর্ণিত।
৪২. বুখারী শরীফ হতে বর্ণিত।
📄 উমর (রা)-এর কান্না
উমর (রা)-এর কান্না মসজিদের শেষ কাতার থেকেও শোনা যেত যা আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন আবদুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ (রা)। তিনি বলেন, আমি উমর (রা)-এর নামাযে কুরআন তিলাওয়াতের মধ্যে কান্নার (মৃদু) শব্দ শুনতে পেতাম পেছনের কাতার থেকেও। বিশেষ করে যখন এ আয়াতটি তিলাওয়াত করতেন।
তিনি বললেন, আমি আমার দুঃখ-দুর্দশা ও কষ্টের ফরিয়াদ আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে করছি না।
টিকাঃ
৪৩. সূরা ইউসুফ (১২): ৮৬।
৪৪. মুয়াল্লাক ও জাযম গ্রন্থে ইমাম বুখারী উদ্ধৃত করেছেন এবং শায়েখ নাসিরুদ্দিন আলবানী কর্তৃক তার আল মুখতাসার গ্রন্থে বিশুদ্ধ হিসেবে স্বীকৃত। তিনি বলেন, সাঈদ ইবনে মানসূর হাদীস "ফজরের সালাতের সময়" উল্লেখ করে একে বিশুদ্ধ বর্ণনাসূত্রের সাথে সংযুক্ত করেছেন। ইবনে মুনযির অন্য এক সূত্র থেকে একই বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। ইমাম বায়হাকীও একটি বিশুদ্ধ সূত্র থেকে বর্ণনা করেন এবং এটা উল্লেখ করেন যে, তা ছিল এশার সালাতের সময়। আসলে ঘটনাটি দুই ওয়াক্তের সময়ই ঘটতে পারে।