📘 আল্লাহর ভয়ে কাঁদা > 📄 দোয়া সম্পর্কে জরুরি কথা

📄 দোয়া সম্পর্কে জরুরি কথা


১. রাসূল ﷺ দোয়াকে মুখখুল ইবাদত (ইবাদতের মগজ) বলেছেন। কথাটি চমৎকার তাৎপর্য বহন করে। দোয়া মানে কিছু চাওয়া। কে চায়? যে অভাব বোধ করে সে-ই চায়। যা না পেলে তার চলে না তা সে পেতে চায়। কার কাছে চায়? যে তার অভাব দূর করতে সক্ষম বলে বিশ্বাস করে তার কাছেই চায়। অভাবের অনুভূতি যার যত বেশি সে তত বেশি কাতরভাবে চায়। আর যার অভাবের ব্যাপকতা সম্পর্কে বেশি ধারণা আছে সে চাইতেই থাকে, সে চাইতে ক্লান্তি বোধ করে না।
যা প্রয়োজন মনে হয় তা না থাকলেই অভাব বোধ হয়। দুনিয়ার জীবনে প্রতি মুহূর্তেই কিছু না কিছু প্রয়োজন মানুষ বোধ করে। এ প্রয়োজন বোধের শেষ নেই। যে হাজার টাকার মালিক সে লক্ষের কাংগাল, যে লক্ষের মালিক সে কোটির কাংগাল। যার যত বেশি আছে সে তত বড় কাংগাল। দুনিয়ায় হাজারো রকমের প্রয়োজন মানুষ বোধ করে। আর যে মরণের পরপারের জীবনে বিশ্বাস করে তার অভাববোধ আরও ব্যাপক। ঐ পারের প্রয়োজন তাকে আরও বড় কাংগাল বানায়।
আল্লাহর কাছে সে-ই বেশি চায় এবং রাতদিন দোয়া করতে থাকে যে দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় প্রয়োজন পূরণে আগ্রহ রাখে। এ দোয়াই প্রমাণ করে যে, সে আল্লাহর দয়ার কাংগাল। এ দোয়া তাকে আল্লাহর প্রতি অতি বিনয়ী বানায়। এ বিনয়ই ইবাদাতের রূহ। যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট কাতরভাবে বিনয়ের সাথে দোয়া করে সে তার এ মহান মনিবের সন্তুষ্টিও চায়। কারণ তিনি সন্তুষ্ট না হলে দোয়া কবুল করবেন না। এ সন্তুষ্টির প্রয়োজনেই সে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলা কর্তব্য মনে করে- অর্থাৎ ইবাদতের সাধনা করতে থাকে।
রাসূল ﷺ আরও বলেছেন, যে দোয়া করে আল্লাহ তার উপর খুশী হন। আর যে দোয়া করে না আল্লাহ তার উপর রাগ করেন। যে দোয়া করে সে আল্লাহর অনুগত বলেই তিনি তার উপর খুশি হন। যে দোয়া করে না সে আল্লাহর ধার ধারেনা বলেই তিনি রাগ করেন। তাই একথা প্রমাণিত হলো যে, দোয়া সত্যিই ইবাদাতের মূল বা মগজ। রাসূল ﷺ একথাও বলেছেন যে, اَلدَّعَاءُ مَرَ الْعَدَةُ দোয়া করাটাও ইবাদত।
২. রাসূল ﷺ বলেছেন যে, মনোযোগের সাথে দোয়া না করলে দোয়া কবুল হয় না। আসলে দোয়া তো মনের ভেতর থেকেই আসতে হবে। মুখে তো দোয়ার শাব্দিক প্রকাশ মাত্র। মুখে উচ্চারণ করে দিল দিয়ে দোয়া করতে হয়। তাহলে না বুঝে আরবিতে মুখে দোয়া আবৃত্তি করলে কেমন করে কবুল হবে? আরবি ভাষা জেনে শব্দে শব্দে বুঝে দোয়া করা জরুরি নয়। কিন্তু যে দোয়াটি পড়া হচ্ছে এর মর্মকথা জানতে হবে। আল্লাহর কাছে কী জিনিস চাওয়া হচ্ছে, দিল যদি সে খবরই না রাখে তাহলে এটা দোয়া হয় কেমন করে? তাই মুখে আরবিতে দোয়া করার সময় কি চাওয়া হচ্ছে মনে তা বুঝতে হবে। যেমন নিরক্ষর লোক টাকা-পয়সা লেনদেন করার সময় নোটের লেখা পড়তে না জানলেও কোনটা কত টাকার নোট তা তাকে অবশ্যই চিনতে হয়।
তবে আল্লাহ ও রাসূলের শেখানো ভাষায় শব্দে শব্দে অর্থ বুঝে দোয়া করার মধ্যে যে মজা ও তৃপ্তি তা তারাই অন্তর দিয়ে অনুভব করে যারা অর্থ জানে। তাই শব্দে শব্দে অর্থ বুঝবার তাওফীক আল্লাহ যাদেরকে দিয়েছেন তাদের বেশি করে দোয়া মুখস্থ করা উচিত। আরবি জানা সত্ত্বেও যারা এজন্য সময় খরচ ও মেহনত করে না তারা বড়ই হতভাগা।
৩. যেসব দোয়া আল্লাহর দরবারে পেশ করার জন্য বাছাই করা হলো তা জায়নামাযে বসে হাত তুলে উচ্চারণ না করলে দোয়া বলে গণ্য হবে না এমন মনে করা ভুল। বিভিন্ন অবস্থায়ই দোয়া করতে হয়। খাওয়ার শুরুতে ও শেষে, অযুর আগে, মাঝে ও পরে, শোবার সময় ও জেগে, মসজিদে প্রবেশ করার সময় ও বের হবার সময়, বাজারে চলার সময়, যানবাহনে উঠা ও নামার সময়, পায়খানায় যাবার ও ফিরে আসার সময় এবং এ রকম আরও অনেক সময় যেসব দোয়া করা হয় তাতে কি হাত উঠাতে হয়? এসব দোয়া কি জায়নামাযে বসে উচ্চারণের সুযোগ আছে? তেমনিভাবে সকাল-সন্ধ্যার দোয়াও যে কোনো অবস্থায়ই করা যায়। অন্যান্য দোয়া সুযোগ মতো সবসময়ই করা চলে। হাঁটা, দাঁড়ান, বসা ও শোয়া অবস্থায় মনটাকে দোয়ায় ব্যস্ত রাখলে বাজে চিন্তা থেকে নিস্তার পাওয়া সহজ হয়। অবশ্য তাহাজ্জুদের সময় এবং অন্যান্য নামাযের শেষে জায়নামাযে যথাসম্ভব বিলম্ব করে দোয়া করায় এক বিশেষ মজা ও তৃপ্তি রয়েছে। কিন্তু দোয়া করার জন্য জায়নামাযে বসা যে শর্ত নয় সে কথার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণই আমার বক্তব্যের উদ্দেশ্য। রাসূল ﷺ অনেক সময় হাত তুলে দোয়া করেছেন এবং দোয়ার শেষে হাত দিয়ে মুখমণ্ডল মাসেহ করেছেন।
৪. কাদের দোয়া অবশ্যই কবুল হয় সে বিষয়ে বিভিন্ন হাদীসে মোট ৯ জনের উল্লেখ দেখা যায়: ক. প্রতিশোধ না নেয়া পর্যন্ত মযলুমের দোয়া, খ. বাড়ি ফেরার পূর্ব পর্যন্ত হাজীর দোয়া, গ. জিহাদ বন্ধ করার পূর্ব পর্যন্ত মুজাহিদের দোয়া, ঘ. সুস্থ হবার পূর্ব পর্যন্ত রোগীর দোয়া, ঙ. কারো অনুপস্থিতিতে তার জন্য যে দোয়া করা হয় সে দোয়া, [সবচেয়ে তাড়াতাড়ি এ দোয়া কবুল হয় বলে রাসূল ﷺ বলেছেন। চ. সন্তানের জন্য পিতামাতার দোয়া, ছ. মুসাফিরের দোয়া, জ. ইফতারের সময় রোযাদারের দোয়া ও ঝ. ন্যায়পরায়ণ ইমামের (নেতা বা শাসক) দোয়া।
৫. দোয়া কবুল হবার ধরণ সম্পর্কে রাসূল ﷺ বলেন যে, কোনো মুসলিম যদি গুনাহের কাজের জন্য এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য দোয়া না করে তাহলে তার সব দোয়া তিন প্রকারের মধ্যে কোনো এক ধরণে অবশ্যই কবুল হয়। কোনো দোয়াই অগ্রাহ্য করা হয় না।
ক. হয় তার দোয়া দুনিয়াতেই কবুল করা হয়।
খ. অথবা যে দোয়া সে করেছে তা তার জন্য কল্যাণকর নয় বলে এ দোয়ার বদলে তার সমপরিমাণ গুনাহ মাফ করে দোয়া হয়।
গ. অথবা দোয়ার বদলা আখেরাতে পুরস্কার হিসেবে দেয়া হবে।
৬. দোয়ার ব্যাপারে রাসূল ﷺ এর আরও কয়েকটি হেদায়াত :
ক. দোয়া কবুল হতে দেরী দেখে নিরাশ হয়ে দোয়া করা বাদ দেয়া মস্তবড় ভুল। (এত দোয়া করলাম কবুল তো হয় না বা না জানি কোনো গুনাহ করেছি যার জন্য দোয়া কবুল হচ্ছে না- এ ধরনের কথায় আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন)। দোয়া কবুলের জন্য তাড়াহুড়া করা উচিত নয়।
খ. দোয়ার দ্বারা তাকদীরও বদলাতে পারে।
গ. ছোট-বড় সব প্রয়োজন পূরণের জন্যই দোয়া করা উচিত- এমনকি জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেলেও ফিতার জন্য দোয়া করা দরকার।
ঘ. দুঃখের দিনে দোয়া কবুল হোক, এ কামনা থাকলে সুখের দিনেও দোয়া করা উচিত।
ঙ. দোয়া প্রার্থীকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে আল্লাহ লজ্জাবোধ করেন।
চ. যার রিযক হালাল নয় তার দোয়া কবুল হয় না।
৭. আল্লাহর কাছে যে জিনিসের জন্য দোয়া করা হয় তা হাসিল করার জন্য বান্দাহকেও চেষ্টা করতে হয়। বিনা চেষ্টায় শুধু দোয়া করে পাওয়ার আশা করা বোকামী। এমন দোয়া আল্লাহ কবুলই করেন না। জমিতে হালচাষ না করে ফসলের জন্য দোয়া বা বিয়ে না করেই সন্তানের জন্য দোয়া কোনো বোকাও করে না। জমিতে প্রাণপণ মেহনত করার পর দিল থেকেই দোয়া আসে যেন আল্লাহ তায়ালা মেহনত বরবাদ না করেন।
আল্লাহর রাজত্ব ও মানুষের খেলাফত কায়েমের জন্য মানুষকে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সে কাজ জান-মাল দিয়ে রাসূল ﷺ ও সাহাবায়ে কেরাম আজীবন মেহনত করেছেন। আল্লাহ ও রাসূলের শেখানো দোয়াগুলো ঐ কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। ঐ কাজ না করে এসব দোয়ার অযীফা পড়া দ্বারা কিছুই হাসিল হতে পারে না। কামাই-রোজগারের জন্য চেষ্টা-তদবীর না করে সোয়া লাখবার রিযিকের দোয়া জপলে এ দোয়া কবুল হয় না। চেষ্টা করা অবস্থায় দোয়া করলে আশা করা যায় যে, দোয়া কবুল হবে। চেষ্টা না করে দোয়া করার নাম 'আমল' রাখা অর্থহীন। শুধু দোয়া করা রোজগারের 'আমল' বলে গণ্য হতে পারে না।
এ পুস্তিকায় যেসব দোয়ার সমাহার হয়েছে এর মূল্য তাদেরই বুঝে আসবে যারা ইসলামী আন্দোলনে নিবেদিত প্রাণ। এসব দোয়া তাদের প্রাণে প্রেরণা, আবেগ, হিম্মত ও জযবা পয়দা করবে। এসব দোয়া যেমন তাদেরকে আরও কর্মতৎপর করবে, তেমনি তাদের কর্মতৎপরতাও দোয়া করার সময় আবেগ সৃষ্টি করবে।

📘 আল্লাহর ভয়ে কাঁদা > 📄 দোয়া প্রার্থীর মানসিক অবস্থা

📄 দোয়া প্রার্থীর মানসিক অবস্থা


এখানে যেসব দোয়া সংকলন করা হয়েছে তা সকল দোয়া প্রার্থীর নিকট সমান আকর্ষণীয় হবার কথা নয়। সবার নিকট সব দোয়া সমান আবেগ সৃষ্টি করে না। দোয়া প্রার্থী তার মানসিক অবস্থা অনুযায়ীই দোয়া বাছাই করে থাকে। এখানে যেসব দোয়া বাছাই করা হয়েছে তা ঐসব দোয়া প্রার্থীরই মনে খোরাক যোগাতে পারে যাদের যাবতীয় কর্মতৎপরতার পেছনে নিম্নরূপ মানসিক অবস্থা বিরাজ করছে-
১. জীবনের সকল ক্ষেত্রে এবং সবসময় সব ব্যাপারে একমাত্র আল্লাহ তায়ালাকেই প্রভু, মনিব, হুকুমকর্তা ও মাবুদ হিসেবে মেনে চলার মধ্যেই আমার জীবনের সাফল্য সম্পূর্ণ নির্ভর করে।
২. আল্লাহ তায়ালাকে মেনে চলার ব্যাপারে মুহাম্মদ ﷺ-কেই একমাত্র পরিপূর্ণ আদর্শ হিসেবে অনুকরণ ও অনুসরণ করে চলবে। এ আদর্শকে অনুকরণ করার উদ্দেশ্যেই সাহাবায়ে কেরাম (রা) বিশেষ করে খোলাফায়ে রাশিদীনকে বাস্তব নমুনা মনে করে।
৩. আখিরাতে চিরস্থায়ী জীবনের সাফল্যই আমার দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের একমাত্র চূড়ান্ত লক্ষ্য। মহান মনিবের সন্তুষ্টি, রাসূল ﷺ এর শাফায়াত এবং জান্নাতে নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সালেহ লোকদের সঙ্গ লাভই আখেরাতের সাফল্যের আসল লক্ষ্য।
৪. রাসূল ﷺ স্বয়ং সাহাবায়ে কেরামের জামায়াতকে নিয়ে ইকামাতে দ্বীনের উদ্দেশ্যে আল্লাহর পথে জিহাদ করার যে উদাহরণ রেখে গেছেন এর সত্যিকার অনুকরণ ছাড়া আখেরাতে ঐ সাফল্য কিছুতেই আশা করতে পারি না।
৫. আল্লাহর যমীনে আল্লাহর আইন ও সৎলোকের শাসন কায়েমের আন্দোলনে আমার জীবনকে সম্পূর্ণরূপে নিয়োজিত করলাম। আমার জীবন ও মরণ আল্লাহ তায়ালারই জন্য উৎসর্গ করলাম।
৬. আল্লাহর দরবারে শহীদই নবীর পর শ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী বলে আমি মনিবের নিকট ঐ মর্যাদারই কাংগাল।

📘 আল্লাহর ভয়ে কাঁদা > 📄 আল্লাহর ভয়ে অশ্রু বিসর্জন

📄 আল্লাহর ভয়ে অশ্রু বিসর্জন


আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
اللهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتبًا مُّتَشَابِهًا مَثَانِي وَ تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُودُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ، ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ .
আল্লাহ সর্বোত্তম বাণী নাযিল করেছেন, এটা এমন একটি গ্রন্থ যার সমস্ত অংশ সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার মধ্যে বিভিন্ন সময়ের পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। এসব শুনে সে লোকদের লোম শিউরে উঠে যারা তাদের রবকে ভয় করে। তারপর তাদের দেহমন বিগলিত হয়ে আল্লাহর স্মরণের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ঘোষণা-
إِنَّ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ مِنْ قَبْلِهِ إِذَا يُتْلَى عَلَيْهِمْ يَخِرُّونَ لِلأَذْقَانِ سُجَّدًا لا وَيَقُولُونَ سُبْحانَ رَبِّنَا إِنْ كَانَ وَعْدُ رَبِّنَا لَمَفْعُولاً وَيَخِرُّونَ لِلْأَذْقَانِ يَبْكُونَ وَيَزِيدُهُمْ خُشُوعًا .
নিঃসন্দেহে যাদেরকে এর আগে জ্ঞান দেয়া হয়েছিল (অর্থাৎ, ইহুদি ও খ্রিস্টানদেরকে) তাদেরকে যখন এটা শুনানো হয় তখন তারা অবনত মস্তকে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং বলে ওঠে মহিমা আমাদের প্রভুর। আমাদের রবের অঙ্গিকার তো পূর্ণ হয়েই থাকে এবং তারা নতমুখে কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়ে এবং তা শুনে তাদের বিনয় আরো বেড়ে যায়।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ঘোষণা-
أولَئِكَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِمْ مِّنَ النَّبِيِّينَ مِنْ ذُرِّيَّةِ أَدَمَ وَمِمَّنْ حَمَلْنَا مَعَ نُوحٍ وَمِنْ ذُرِّيَّةِ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْرَائِيلَ وَ وَمِمَّنْ هَدَيْنَا وَاجْتَبَيْنَا إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ أَيْتُ الرَّحْمَنِ خَرُّوا سُجَّدًا وَبُكِيًّا .
এরাই হচ্ছে নবীগণ আদম সন্তানদের মধ্য থেকে যাদের ওপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছিলেন এবং যাদেরকে আমি নূহের সাথে নৌকায় আরোহণ করিয়েছিলাম, তাদের বংশধরদের থেকে, আর ইবরাহীম ও ইসমাঈলের বংশধরদের থেকে, আর এরা ছিল তাদের মধ্য থেকে যাদেরকে আমি সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছিলাম এবং বাছাই করে নিয়েছিলাম। এদের অবস্থা এই ছিল যে, যখন করুণাময়ের আয়াত এদেরকে শুনানো হতো তখন কান্নারত অবস্থায় সিজদায় লুটিয়ে পড়ত।
আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি, (কিয়ামতের দিন) যেদিন আল্লাহর ছায়া ব্যতীত অন্য কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত শ্রেণির মানুষকে তাঁর (আল্লাহর) ছায়াতলে তিনি আশ্রয় দিবেন। আর তারা হলো-
১. ন্যায়পরায়ণ শাসক, ২. ঐ যুবক যে আল্লাহর বন্দেগীতে বেড়ে উঠেছে, ৩. ঐ ব্যক্তি যার হৃদয় মসজিদে যেতে ব্যাকুল থাকে। ৪. দু'জন ব্যক্তি যারা আল্লাহর জন্যই পরস্পরকে ভালোবাসে, সাক্ষাত করে এবং সে অবস্থায়ই পৃথক হয়। ৫. এমন পুরুষ যে উচ্চ বংশের ও সুন্দরী রমণীর কুপ্রস্তাব এ বলে ফিরিয়ে দেয় যে "আমি আল্লাহকে ভয় করি"। ৬. এমন ব্যক্তি যে এত গোপনে দান করে যে তার বাম হাত জানে না তার ডান হাত কী দান করল। ৭. এবং এমন ব্যক্তি নিভৃতে আল্লাহর স্মরণে আল্লাহর ভয়ে যার নয়নযুগল অশ্রুসিক্ত হয়।
আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে কেঁদেছে জাহান্নামের আগুন তাকে স্পর্শ করবে না এমনকি দুধ দোহন করার পর আবার তা স্তনে ফেরত যাবে (তবুও সে ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে না)। আর জিহাদের ময়দানের ধূলি ও জাহান্নামের ধোঁয়া কখনই একত্র হবে না।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছেন, ঐ দু'চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না। (এক) যে চোখ আল্লাহর ভয়ে অশ্রু বিসর্জন দেয়। (দুই) যে চোখ সারারাত আল্লাহর পথে পাহারায় সতর্ক থাকে।
আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, দুটি চোখকে জাহান্নামের আগুনের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এক. আল্লাহর ভয়ে যে চোখ অশ্রুসিক্ত হয়েছে, দুই. যে চোখ সারারাত ইসলামের স্বার্থে বা কাফেরদের থেকে একটি পরিবারের নিরাপত্তা দিতে পাহারায় থেকেছে।
আবু উমামা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছে দুটি ফোটা ও দুটি চিহ্নের চেয়ে অধিক প্রিয় কিছু নেই। এক ফোটা অশ্রু যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ভয়ে ঝরে পড়ে এবং এক ফোটা রক্ত যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার পথে প্রবাহিত হয়। তেমনিভাবে দুটি চিহ্ন, একটি হলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার জন্য সহ্য করা হয়। আরেকটি, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কর্তৃক নির্ধারিত বিধি-নিষেধ পালন করতে গিয়ে যে (আঘাতের) চিহ্ন পাওয়া হয়।
উসমান (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তুবা তাদের জন্য যারা তাদের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করে, যারা তাদের বসবাসের ঘরটিকে যথেষ্ট মনে করে (অর্থাৎ, বাসস্থানেই তৃপ্ত) এবং যারা নিজেদের ভুলের জন্য (গুনাহের ভয়ে) আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে।
উকবা ইবনে আমির (রা) হতে বর্ণিত, তিনি জানতে চেয়ে প্রশ্ন করেন, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! কিসে মুক্তি পাওয়া যায়? রাসূল ﷺ উত্তরে বলেন, তোমার জিহ্বাকে সংযত রাখলে, তোমার ঘরে (সম্পত্তিতে) সন্তুষ্ট থাকলে এবং তোমার ভুল-ভ্রান্তিতে আল্লাহর কাছে কাঁদলে।

টিকাঃ
৪. ৩৯-সূরা যুমার : আয়াত-২৩।
৫. ১৭-সূরা বনী ইসরাঈল: আয়াত-১০৭-১০৯। (১০৭ নং আয়াতটি সিজদার আয়াত)
৬. ১৯-সূরা মারইয়াম: আয়াত-৫৮। (আয়াতটি সিজদার আয়াত)
৭. শায়খ আলবানী "আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব” গ্রন্থে বলেন, আল্লাহর ছায়ার পরিধি হলো তার প্রভুত্বের/মালিকানার পরিধি। প্রতিটি ছায়াই তাঁর ছায়া, তাঁর সম্পত্তি, তাঁর সৃষ্টি এবং কর্তৃত্ব। [অর্থাৎ, আল্লাহ এ ছায়ার মালিক। যে বিষয়টি এখানে জোর দেয়া হয়েছে তা হলো, এটা (ছায়া থাকাটা) আল্লাহর প্রতি কোনো বৈশিষ্ট্যের আরোপ নয় এবং এটা হলো 'আল্লাহর গোলাম', 'আল্লাহর ঘর' ইত্যাদি শব্দগুলোর মতো। তাই ছায়া আল্লাহর বাড়তি কোনো গুণ নয় তবে এটিকে তাঁর সাথে সংযুক্তির উদ্দেশ্য হলো স্বাতন্ত্র্য ও মহত্বের প্রকাশ, যা দ্বারা তাকে অন্য সকল সাধারণ ছায়া থেকে আলাদা বুঝায় ।।
এখানে যে ছায়াকে বুঝানো হয়েছে তা তাঁর (আল্লাহর) আরশের (বসার স্থানের) ছায়া যা অন্য একটি হাদীসে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যে দিনের কথা বলা হয়েছে তা কিয়ামতের দিন, যেদিন মানুষ বিশ্বজগতের প্রতিপালকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে এবং সূর্য তাদের খুব নিকটে চলে আসবে এবং তারা তখন প্রচণ্ড গরম অনুভব করবে ও ঘামতে শুরু করবে। একমাত্র তাঁর ছায়া ব্যতিত আর কোনো ছায়া সেখানে থাকবে না।
৮. শায়খ আলবানী তার 'আত তারগীব ওয়াত তারহীব' গ্রন্থে বলেন, তিনি (শাসক) হলেন এমন ব্যক্তি যিনি বহু মানুষের ওপর কর্তৃত্ব খাটানোর অধিকার রাখেন। আর তিনি প্রকৃত অর্থেই মুসলিমদের ভালো ও কল্যাণ সাধনে পেরেশান থাকেন। হাদীসটি একজন ন্যায়পরায়ণ শাসকের (অন্য ব্যক্তিদের প্রথমে) কথা দিয়ে শুরু হওয়ার কারণ হলো তাঁর লোকের (হাদীসের অন্য লোকদের চেয়ে) ব্যাপক কল্যাণ সাধনের সুযোগ রয়েছে। ঐ শাসকের জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ যে সে তার শাসনকার্যে কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ করবে কেননা তাছাড়া সে ন্যায়পরায়ণ হতে পারবে না। তাই এ ব্যাপারে আল্লাহর বিধান মেনে নিতে সাবধান হও।
৯. শায়খ আলবানী তার 'আত তারগীব ওয়াত তারহীব' গ্রন্থে বলেন, অর্থাৎ মসজিদের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা আছে এবং মসজিদে জামায়াতে নামায আদায়ে সে সচেষ্ট থাকে।
১০. শায়খ বলেন, "আল্লাহর জন্য সাক্ষাত করা এবং আল্লাহর জন্য পৃথক হওয়ার অর্থ হলো আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার কারণেই তাদের সাক্ষাত এবং তারা উভয়ই পৃথক হওয়ার আগ পর্যন্ত এ ভালোবাসার ওপর স্থির থাকে। তাদের প্রত্যেকেই বিশ্বাস করে যে তাদের এ ভালোবাসা আল্লাহর (পথে কাজের) জন্য আর এটাই তাদের সাক্ষাত ও পৃথক হওয়ার অন্যতম শর্ত।
১১. আলবানী বলেন, উচ্চ বংশের এবং সুন্দরী রমণী থেকে তার কামনা-বাসনা নিবৃত রাখতে গিয়ে এটা মুখের কথা কিংবা অন্তরের কথাও হতে পারে। উচ্চ বংশ ও সুন্দরী বিশেষভাবে উল্লেখের কারণ, সে খুবই কাঙ্ক্ষিত এবং তাকে পাওয়াও অনেক কঠিন। বাস্তবতা হলো একজন পুরুষ তাকে (এ রকম নারী) পেতে অন্তরে কামনা করে এবং মুখেও প্রকাশ করে।
১২. বুখারী, মুসলিম এবং অন্যান্য সূত্র থেকে বর্ণিত। এ হাদীস সংক্রান্ত আরো বিস্তারিত অধ্যায়ের জন্য সহীহ আত তারগীব (১/২০১) দেখা যেতে পারে।
১৩. আত তিরমিযী হতে বর্ণিত, তিনি একে হাসান সহীহ হাদীস বলেছেন। আন নাসায়ী শরীফেও হাদীসটি উদ্ধৃত হয়েছে। আল হাকীম বলেছেন এর বর্ণনার ধারাবাহিকতা সহীহ। আল মুনযিরী কর্তৃক আত তারগীব ওয়াত তারহীব গ্রন্থেও উদ্ধৃত করা হয়েছে। শায়খ আলবানীও একে আল মিশকাত গ্রন্থে (৩৮২৮) ও আত তারগীব ওয়াত তারহীব গ্রন্থে বিশ্বাসযোগ্য বলে ঘোষণা করেছেন।
১৪. আত তিরমিযী শরীফে উদ্ধৃত এবং শায়খ আলবানী আল মিশকাত ও আত তারগীবে একে সহীহ বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
১৫. আল হাকীম রচিত আল মুসতাদরাক গ্রন্থে উদ্ধৃত এবং আরো অনেকেই উদ্ধৃত করেছেন। শায়েখ আলবানী তার আত তারগীব গ্রন্থেও একে সহীহ বলে স্বীকার করেছেন।
১৬. ইমাম তিরমিযী একে হাসান বলে উদ্ধৃত করেছেন। শায়খ আলবানীও একে বর্ণনার ধারাবাহিকতায় হাসান বলেছেন তার আল মিশকাত গ্রন্থে এবং আত তারগীব গ্রন্থে সহীহ বলেছেন।
১৭. এটা জান্নাতের একটি গাছ। এর বিস্তৃতি প্রায় একশত বছরের পথের সমান। জান্নাতবাসীদের পোশাক এ গাছে শুকাতে দেয়া হয়। রাসূল ﷺ এর বাণী, "তুবা হলো জান্নাতের একটি বৃক্ষ, এর সীমা একশত বছরের দূরত্বের সমান। এবং জান্নাতবাসীদের পোশাকাদি এখানে শুকাতে দেয়া হয়।” ইমাম আহমদ এবং আরো অনেকেই উদ্ধৃত করেছেন, এটা হাসান লি গায়রিহী। 'আস সাহীহা'তে শায়খ আলবানীও উদ্ধৃত করেছেন
১৮. ইমাম তাবরানী তার "আল আওসাত আস সাগীর" গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন এবং এর বর্ণনার ধারাবাহিকতাকে হাসান বলেছেন। আল মুনজিরী (র) “আত তারগীব ওয়াত তারহীব” গ্রন্থেও হাদীসখানা সম্পৃক্ত করেছেন। শায়খ আলবানী সহীহ আত তারগীব-এ একে হাসান বলে ঘোষণা করেছেন।
১৯. ইবনে আল মুবারাক 'আয যুহদ' গ্রন্থে ইমাম আহমদ আত তিরমিযী গ্রন্থে এবং আরো অনেকেই হাদীসটিকে উদ্ধৃত করেছেন। এটি একটি সহীহ হাদীস এবং শায়েখ আলবানী আস সাহীহা গ্রন্থে উদ্ধৃত করেন।

📘 আল্লাহর ভয়ে কাঁদা > 📄 আত্মার কাঠিন্যের ব্যাপারে সতর্ক হও

📄 আত্মার কাঠিন্যের ব্যাপারে সতর্ক হও


আত্মার কঠিনতার ব্যাপারে সতর্ক হোন, কেননা এটা (কাঠিন্য) আপনাকে জাহান্নামে নিয়ে যেতে পারে। তাই আপনার আত্মাকে কঠিন হওয়া থেকে রক্ষা করুন এবং হৃদয় কঠিন করতে পারে এমন সবকিছু থেকে সতর্ক থাকুন। আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যেন ঘৃণাভরে মুখ ফিরিয়ে না নেন সেদিকেও সাবধান থাকুন।
أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ لَا وَلَا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ مِنْ قَبْلُ فَطَالَ عَلَيْهِمُ الْآمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ ، وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فَسِقُونَ .
“যারা মু'মিন, তাদের জন্য কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি? তারা তাদের মতো যেন না হয়, যাদেরকে পূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছিল। তাদের ওপর সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে অতঃপর তাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে গেছে। তাদের অধিকাংশই উদ্ধত ও অবাধ্য।
এ আয়াতে কারীমার ব্যাখ্যায় আবু হাজিম উল্লেখ করেছেন আমের ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে জোবায়ের (রা) তার পিতার মাধ্যমে জ্ঞাত হন যে, ইসলাম গ্রহণের চার বছর পর এ আয়াত নাযিল হয়। এ আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাদেরকে ভর্ৎসনা করেন।
তারা (মু'মিনরা) তাদের মতো যেন না হয়ে যায় ইতোপূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল। তাদের ওপর সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে তাই বলে কি তাদের অন্তর কঠিন হয়ে গিয়েছিল? আর তাদের অধিকাংশই ছিল উদ্ধত্য ও অবাধ্য।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, তারা এ পৃথিবীতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে এবং আল্লাহর সতর্কবাণী থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
(আল্লাহর ভয়ে) অশ্রু বিসর্জন আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা/করুণা যা তিনি তাঁর বান্দার হৃদয়ে ঢেলে দেন।
উমামা ইবনে যায়েদ (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা একবার নবী মুহাম্মদ ﷺ এর সঙ্গে ছিলাম। তাঁর একজন মেয়ে এক দূত মারফত খবর পাঠালেন যে, তার ছোট্ট এক ছেলে সন্তান মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। রাসূল ﷺ ঐ দূতকে বললেন, তুমি তাঁর (রাসূল ﷺ এর মেয়ের) কাছে ফিরে যাও এবং তাঁকে বল যে, আল্লাহ যা কিছু দেন বা নেন এটা তাঁর (আল্লাহর) ব্যাপার। তাকে ধৈর্যধারণ করতে এবং মৃত্যুপরবর্তী জীবনে আল্লাহর পুরস্কারের কথা স্মরণ করতে বলো। পরে বার্তাবাহক রাসূলের ﷺ কাছে ফিরে আসলেন এবং বললেন, সে আল্লাহর কসম করে আপনাকে তার কাছে যেতে বলেছে। তাই রাসূল ﷺ তার উদ্দেশ্যে সাদ ইবনে উবাদা ও মু'আজ ইবনে জাবাল রাসূল ﷺ কে অনুসরণ করলেন এবং আমি নিজেও তাদের সাথে গেলাম। ছোট্ট বালকটিকে নবী ﷺ এর কাছে আনা হলো। বালকটি তখন গোঙানির মতো শব্দ করছিল যেন মৃত্যুর পূর্বে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছে। তৎক্ষণাৎ রাসূলের ﷺ চোখে জল ছল ছল করে উঠে। এ দৃশ্য দেখে সাদ (রা) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! এটা কী? (অর্থাৎ, এ কান্না কিসের কান্না?) তিনি উত্তরে বললেন, এটা আল্লাহর ক্ষমা/দয়া যা আল্লাহ তাঁর বান্দার অন্তরে ঢেলে দেন। আর নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাঁর দয়া সে বান্দার মধ্যে রাখেন যে দয়ালু।

টিকাঃ
২০. সূরা- হাদীদ : আয়াত-১৬।
২১. সুনানে ইবনে মাজাহ গ্রন্থে সহীহ হিসেবে উল্লিখিত।
২২. ইমাম আল বাগাবী তার তাফসীর গ্রন্থে এটি উল্লেখ করেছেন।
২৩. ইবনে কাইয়ুম বলেন, কান্না অনেক প্রকারের। যেমন, ১. অনুগ্রহ অনুকম্পার কান্না, ২. ভীতি ও ভক্তির কান্না, ৩. প্রেম ও প্রীতির কান্না, ৪. আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের কান্না, ৫. উদ্বেগ উৎকণ্ঠা ও মানসিক আর প্রত্যেক বস্তুরই একটি নির্ধারিত আয়ুষ্কাল রয়েছে। সুতরাং যাতনার কান্না, যে বেদনার বিষ এ হৃদয় সহ্য করতে পারে না। ৬. দুঃখের কান্না, ৭. ক্লান্তি-শ্রান্তি ও দুর্বলতার কান্না, ৮. প্রতারণার কান্না-যে প্রতারণার শিকার হলে চোখ অশ্রুতে ভারি হয়ে উঠে, হৃদয় ফেটে যায়। ৯. যারা কান্না ও অর্থের বিনিময়ে কান্না, যেমন কিছু অর্থের বিনিময়ে শোক প্রকাশ করে। [অনুবাদকের নোট: ইসলাম পূর্ব আরবের একটি প্রথা ছিল এমন, কোনো মৃতের জন্য শোক প্রকাশ করতে লোক ভাড়া করা হতো, কান্নাকাটি ও মাতম করার জন্য, যা একটি আবেগঘন ও কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করত। আর এটা করা হতো এজন্য, যেন লোকেরা মনে করে নিহত ব্যক্তিটি খুব জনপ্রিয় ছিল এবং তাকে লোকেরা খুব ভালোবাসে। নবী ﷺ নবুয়তের পর এ কুসংস্কার বন্ধ করেন। ১০. ঐক্যমতের কান্না, যখন কেউ দেখে কোনো একটা ব্যাপারে লোকেরা কান্নাকাটি করছে তখন সেও তাদের কান্নায় শরিক হয় কান্নার কারণ না জেনেই। (জাদ আল মাআদ থেকে ঈষৎ সংক্ষিপ্ত)।
২৪. গোঙানির শব্দ (আল কা'কা): কোনো কিছুর (মৃদু) নড়াচড়া যেখান থেকে শব্দ কানে আসে। যে অর্থটি এখানে নেয়া হয়েছে তা হলো বিক্ষোভ ও আন্দোলন। তিনি (কথন/বর্ণনাকারী) বুঝাতে চেয়েছেন: প্রত্যেকবার নিঃশ্বাসে শিশুটি দীর্ঘ নয় সাথে সাথেই আরেকটি নিঃশ্বাস নেয় যা তাকে মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়ে যায়। (আন নিহায়া থেকে সংকলিত)
২৫. নিঃশ্বাসের শব্দটি ছিল পুরনো কোনো (তরল পদার্থের) পাত্রের (যেমন কলস, মাটির হাড়ি ইত্যাদি) মধ্য হতে আসা শব্দের মতো!।
২৬. বুখারী ও মুসলিম শরীফ হতে বর্ণিত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00