📘 আল্লাহর ভয় নির্মল জীবনের পাথেয় > 📄 আমল সুন্দর করার প্রতি মনোযোগী হও

📄 আমল সুন্দর করার প্রতি মনোযোগী হও


মুহাম্মাদ বিন ইয়াজিদ বলেন, 'এক ইদের দিন উহাইব বিন ওয়ারদ নামাজ পড়ালেন। নামাজ শেষে লোকজন তার পাশ দিয়ে ফিরে যাচ্ছিল। তখন তাদের দিকে তাকিয়ে তিনি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। অতঃপর বললেন, “এই লোকগুলো যদি বিশ্বাস করে যে, তাদের ইদ কবুল হয়েছে, তাহলে তাদের উচিত সকল কর্ম ও ব্যস্ততা বাদ দিয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ে ব্যাপৃত থাকা। আর যদি মনে করে যে, কবুল হয়নি, তাহলে আল্লাহর
ইবাদতে আরও বেশি মনোযোগী হওয়া জরুরি।” একটু পর আবার বললেন, “তোমরা আমলের পরিমাণ বৃদ্ধি করার চেষ্টা কোরো না; বরং আমলকে মজবুত ও সুন্দর করার চেষ্টা করো। কেননা, অনেক সময় এমন হয় যে, বান্দা নামাজ আদায় করছে; কিন্তু (নামাজ সুন্দর না হওয়ার কারণে) নামাজেই সে আল্লাহর নাফরমানি করছে। সে রোজা রেখেছে; কিন্তু (রোজা যথাযথ ও সুন্দর না হওয়ার কারণে) এর মাধ্যমে সে আল্লাহর নাফরমানি করছে।”১৮৬
দীর্ঘ আশা লোকদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তাদেরকে দুনিয়া নিয়ে মাতিয়ে রেখেছে এবং দুনিয়ার মোহে ফেলে আখিরাত থেকে উদাসীন করে রেখেছে। তাই এখন মানুষ শুধু দুনিয়াকে নিয়ে ব্যস্ত। সময়ের এক অংশে দুনিয়ার জন্য ঘামঝরা খাটুনি করে, দুনিয়ার তুচ্ছ বস্তু অর্জনের জন্য কষ্ট সহ্য করে। আরেক অংশ আরাম ও বিশ্রামে ব্যয় করে। সেটাকেও হাসি-কৌতুক, খেলাধুলা কিংবা অবহেলায় নষ্ট করে ফেলে। ফলে আখিরাতের জন্য একটু চিন্তাভাবনা করার সময়টুকুও পায় না।
উহাইব বলেন, 'একজন আলিমের মন কীভাবে সায় দেয় হাসি-আনন্দে সময় কাটিয়ে দিতে; অথচ সে জানে যে, এ কারণে কিয়ামতের দিন তার জন্য কঠিন ভয়াবহতা।
অপেক্ষা করে আছে?' এই বলে তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে গেলেন। ১৮৭
প্রিয় ভাই আমার, মাকহুল দিমাশকি বলেন, 'যে ব্যক্তি কেবল ভয় নিয়ে আল্লাহর ইবাদত করে, সে খারিজি; যে কেবল আশা নিয়ে ইবাদত করে, সে মুরজিয়া; যে কেবল প্রেম নিয়ে ইবাদত করে, সে জিন্দিক; আর যে ভয়, আশা ও প্রেম—সবকটি নিয়ে ইবাদত করে, সে-ই প্রকৃত তাওহিদবাদী। ১৮৮
শাইখ ইবনে সাদি বলেন, বান্দার জন্য আবশ্যক হলো, সে আল্লাহর প্রতি একইসাথে ভয় ও আশা উভয়টি রাখবে। নিজের গুনাহ এবং আল্লাহর ইনসাফ ও কঠিন শাস্তির দিকে তাকিয়ে আল্লাহকে ভয় করবে। আবার তাঁর অসীম রহমত ও মাগফিরাতের প্রতি তাকিয়ে তাঁর প্রতি আশা রাখবে। ইবাদতের তাওফিকপ্রাপ্ত হলে তা কবুল করে নিয়ামত পরিপূর্ণ করার আশা রাখবে। পাশাপাশি নিজের পক্ষ থেকে কোনো দুর্বলতা ও কমতির কারণে উক্ত ইবাদত কবুল না হওয়ার ভয় করবে। কোনো গুনাহ হয়ে গেলে তাওবা করবে এবং তাওবা কবুল হওয়ার আশা রাখবে। পাশাপাশি দুর্বল তাওবার কারণে উক্ত গুনাহের কারণে শান্তি পাওয়ার ভয় করবে। এভাবে সকল নিয়ামতের ক্ষেত্রে শুকরিয়া
আদায় করার বদৌলতে তা টিকে থাকা ও বৃদ্ধি পাওয়ার আশা রাখবে। পাশাপাশি যথাযথ শুকরিয়া না করার কারণে তা কমে যাওয়ার কিংবা একেবারে চলে যাওয়ার ভয় করবে। বিপদ ও মুসিবতের ক্ষেত্রে তা কেটে যাওয়ার আশা রাখবে। সাথে সাথে এ আশাও রাখবে যে, বিপদের ওপর সবর করার কারণে সাওয়াব প্রদান করা হবে। পাশাপাশি বিপদের সময় দুইটা বিপদ একত্রিত হওয়ার ভয় করবে : সবর না করার কারণে প্রত্যাশিত সাওয়াব থেকে মাহরুম হওয়া এবং অপ্রত্যাশিত ফলাফলের সম্মুখীন হওয়া।
সুতরাং তাওহিদবাদী মুসলিমের জন্য জীবনের প্রতিটি অংশে, প্রতিটি ক্ষেত্রে আশা ও ভয়ের মাঝে সমন্বয় করে থাকা বাঞ্ছনীয়। তা ছাড়া সফলতা এর মাঝেই নিহিত। ১৮৯
প্রিয় মুসলিম ভাই, আল্লাহর প্রিয়ভাজন হয়ে চির শান্তির জান্নাতে তাঁর প্রতিবেশিত্ব গ্রহণ করার সহজ ও কষ্টহীন একটি পন্থা জানিয়ে দিই তোমাকে। সবচেয়ে কাছের এবং সবচেয়ে সহজ এ পন্থা। তা হলো : তোমার জীবনকে দুইভাগে ভাগ করে নাও। অতীত ও ভবিষ্যৎ। অতীত জীবনকে তাওবা, লজ্জা ও ইসতিগফারের মাধ্যমে ঠিক করে নাও। এটি করতে গিয়ে তোমাকে তেমন কোনো কষ্ট করতে হবে না। কঠিন কোনো আমল করারও প্রয়োজন নেই। এটা কলবের আমল, হৃদয়ের কর্ম। আর ভবিষ্যতে
গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো। বেঁচে থাকা বা পরিত্যাগ করা কোনো অঙ্গ দ্বারা করতে হয় এমন কোনো কাজ নয়, ফলে তার জন্য কষ্টও পেতে হয় না। এর জন্য তোমাকে কাজে লাগাতে হবে কেবল তোমার মনোবল ও ইচ্ছাশক্তিকে। কিন্তু শরীর ও মন উভয়টিই তার উপকার ভোগ করবে।
এভাবে তুমি অতীত জীবনকে তাওবার মাধ্যমে শুদ্ধ করে নেবে এবং ভবিষ্যতের জীবনকে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমে শুদ্ধ রাখবে। ফলস্বরূপ তুমি লাভ করবে মহাসাফল্য। তেমন কোনো কষ্ট ছাড়াই! তবে সিদ্ধান্তটি তোমাকে আজই নিতে হবে। অর্থাৎ তোমার অতীত ও ভবিষ্যতের মাঝামাঝি এই যে বর্তমান সময়টি আছে, তাকেই মূল্যায়ন করে অর্জন করে নিতে হবে এই মহাসাফল্য। যদি তুমি তা নষ্ট করে ফেলো, তবে এই বিরাট সফলতাও তোমার হাতছাড়া হয়ে যাবে। তার স্থলে জায়গা করে নেবে মহাব্যর্থতা।
সফলতা ও ব্যর্থতা, জান্নাত ও জাহান্নাম দুইটাই তোমার সামনে। আমার দেখানো পথে চলে তুমি চাইলে অর্জন করে নিতে পারো সফলতা ও জান্নাত। আবার তোমার মনের চাহিদা ও আসক্তির কথা মেনে এবং খেলাধুলায় মত্ত থেকে ব্যর্থতা ও জাহান্নামও অর্জন করে নিতে পারো। সিদ্ধান্ত নেওয়াটা তোমার হাতেই ছেড়ে দিলাম। তবে মনে রাখবে, মনের চাহিদা পূরণ ও অহেতুক খেলাধুলা থেকে সবর করে থাকার মাঝে যে কষ্ট আছে, তা সেই কষ্টের তুলনায় খুবই
নগণ্য, যা তোমাকে এসব থেকে সবর না করার কারণে সইতে হবে। ১৯০

টিকাঃ
১৮৬. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/২৫।
১৮৭. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/২২১।
১৮৮. আল-ইহইয়া: ৪/১৭৪।
১৮৯. আল-কাওলুস সাদিদ: ১১৯ পৃ.।
১৯০. আল-ফাওয়ায়িদ: ১৫১ পৃ.।

📘 আল্লাহর ভয় নির্মল জীবনের পাথেয় > 📄 আল্লাহভীতির আলামত

📄 আল্লাহভীতির আলামত


এখানে এমন কিছু আলামত ও লক্ষণ তুলে ধরছি, যেগুলোর মাধ্যমে বান্দা নিজেকে চিনতে পারবে—সে কি আল্লাহভীরুদের অন্তর্ভুক্ত, না গাফিল ও উদাসীন লোকদের দলভুক্ত।
১. জিহ্বায় আল্লাহভীতি প্রকাশ পাওয়া। সে মিথ্যা, গিবত ও অহেতুক কথাবার্তা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকে এবং জিহ্বাকে আল্লাহর জিকির, তিলাওয়াতে কুরআন ও ইলমি আলোচনায় মশগুল রাখে।
২. অন্তরসম্পর্কিত বিষয়ের ব্যাপারে ভয় করা। তার অন্তর থেকে শত্রুতা, হিংসা-বিদ্বেষ ইত্যাদি বিদায় নেয় এবং তাতে কল্যাণকামিতা ও মুসলিমদের প্রতি সহমর্মিতা জায়গা করে নেয়।
৩. পেটসম্পর্কিত বিষয়ে ভয় পাওয়া। সে হালাল ব্যতীত অন্য কোনো খাবার গ্রহণ করে না এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত খায় না।
৪. দৃষ্টিসম্পর্কিত বিষয়ে ভয় পাওয়া। সে নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাত করে না এবং আগ্রহের চোখ দিয়ে দুনিয়াকে দেখে না। বরং শিক্ষা গ্রহণ করার দৃষ্টি নিয়ে দুনিয়াকে দেখে।
৫. পা-সম্পর্কিত বিষয়ে ভয় পাওয়া। সে গুনাহের জন্য পা বাড়ায় না।
৬. হাতসম্পর্কিত বিষয়ে ভয় পাওয়া। সে হারামের দিকে হাত প্রসারিত করে না। সে কেবল আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতের দিকেই হাত বাড়ায়।
৭. ইবাদতের ব্যাপারে ভয় পাওয়া। সে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত করে। কৃত্রিমতা ও কপটতা থেকে বিরত থাকে।
এই সব গুণ যার মাঝে পাওয়া যায়, সে ওই লোকদের অন্তর্ভুক্ত, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন :
وَالْآخِرَةُ عِنْدَ رَبِّكَ لِلْمُتَّقِينَ )
'আর পরকাল আপনার পালনকর্তার কাছে তাদের জন্যই, যারা ভয় করে।'

টিকাঃ
১৯১. সুরা আজ-জুখরুফ, ৪৩ : ৩৫।

📘 আল্লাহর ভয় নির্মল জীবনের পাথেয় > 📄 যে চারটি বিষয়ে ভয় পাওয়া নেককারদের জন্য জরুরি

📄 যে চারটি বিষয়ে ভয় পাওয়া নেককারদের জন্য জরুরি


ফকিহ সমরকন্দি বলেন, 'যারা নেক আমল করে, তাদের জন্য চারটি বিষয়কে ভয় পাওয়া জরুরি। সুতরাং যারা বদ আমল করে, তাদের জন্য ভয় পাওয়া কতটা জরুরি, তা সহজেই অনুমেয়।
১. কবুল না হওয়ার ভয়। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন: إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ) 'আল্লাহ মুত্তাকিদের পক্ষ থেকেই তো গ্রহণ করেন। ১৯২
২. রিয়া বা লোক-দেখানোর ভয়। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেছেন: وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ) 'তাদেরকে এই আদেশই দেওয়া হয়েছিল যে, দ্বীনকে কেবল আল্লাহর জন্য নিবেদিত করে একনিষ্ঠভাবে তারা আল্লাহর ইবাদত করবে। ১৯৩
৩. নেক আমল কিয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত রাখার ভয়। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
(مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا)
'যে সৎকর্ম নিয়ে আসবে, সে তার দশগুণ পাবে।' ১৯৪
এখানে নেক আমলকে আখিরাতে নিয়ে যাওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, শুধু নেক আমল করাই যথেষ্ট নয়; বরং তা কিয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হবে। রিদ্দাহ, রিয়া ইত্যাদির কারণে যদি তা নষ্ট হয়ে যায়, তবে সে আমলের কোনো মূল্য নেই।
৪. ইবাদতে ব্যর্থ হওয়ার ভয়। কেননা, এ কথা জানা নেই যে, তাকে ইবাদতের তাওফিক দেওয়া হবে, কি হবে না। কারণ তাওফিক একমাত্র আল্লাহর হাতে।
(وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ)
'আল্লাহর মদদ দ্বারাই কিন্তু কাজ হয়ে থাকে, আমি তাঁর ওপরই নির্ভর করি এবং তাঁরই দিকে ফিরে যাই।' ১৯৫-১৯৬

টিকাঃ
১৯২. সুরা আল-মায়িদা, ৫: ২৭।
১৯৩. সুরা আল-বাইয়িনাহ, ৯৮ : ৫।
১৯৪. সুরা আল-আনআম, ৬: ১৬০।
১৯৫. সুরা হুদ, ১১: ৮৮।
১৯৬. আল-ইহইয়া: ৪/১৬।

📘 আল্লাহর ভয় নির্মল জীবনের পাথেয় > 📄 পরিশিষ্ট

📄 পরিশিষ্ট


প্রিয় ভাই আমার, পরিশেষে আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে দুআ করি, তিনি যেন আমাকে, তোমাকে, আমাদের পিতামাতা ও বন্ধুবান্ধবদের সবাইকে সেই কঠিন দিনে নিরাপত্তা দান করেন, যেদিনের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে :
يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ - وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ - وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ - لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنُ يُغْنِيهِ )
'সেদিন মানুষ পালাবে তার ভাই থেকে, তার মা ও বাবা থেকে এবং তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের থেকে। তাদের প্রত্যেকেরই এমন কঠিন অবস্থা হবে, যা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে। ১৯৭
আর আমাদেরকে সেই দলের অন্তর্ভুক্ত করে নেন, যাদেরকে সেদিন ডেকে বলা হবে :
ادْخُلُوا الْجَنَّةَ لَا خَوْفٌ عَلَيْكُمْ وَلَا أَنْتُمْ تَحْزَنُونَ)
'প্রবেশ করো জান্নাতে। তোমাদের কোনো ভয় নেই এবং তোমরা দুঃখিত হবে না।'১৯৮

টিকাঃ
১৯৭. সুরা আবাসা, ৮০ : ৩৪-৩৭।
১৯৮. সুরা আল-আরাফ, ৭ : ৪৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00