📘 আল্লাহর ভয় নির্মল জীবনের পাথেয় > 📄 আল্লাহভীতির ফজিলত

📄 আল্লাহভীতির ফজিলত


প্রিয় মুসলিম ভাই,
আল্লাহভীতির ফজিলত কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত।
কোনো বিষয় ফজিলতপ্রাপ্ত হয়, সেটি আখিরাতে সফলতা অর্জনে কী পরিমাণ ভূমিকা রাখে তার ওপর ভিত্তি করে।
এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, আখিরাতে আল্লাহর সাক্ষাৎলাভে ধন্য হওয়ার জন্য দুনিয়াতে তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও সুসম্পর্ক থাকা আবশ্যক। আর আল্লাহর মারিফাত বা বিশেষ পরিচয় ছাড়া ভালোবাসা অর্জিত হয় না। মারিফাত অর্জিত হয় কেবল ধারাবাহিক ফিকির ও ধ্যানের মাধ্যমে। সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে ভালোবাসা ও নিয়মিত জিকিরের মাধ্যমে। আর ধারাবাহিক ধ্যান ও জিকির তখনই সম্ভব, যখন অন্তর থেকে দুনিয়ার ভালোবাসা দূরীভূত হয়। আর দুনিয়ার স্বাদ-উপভোগ পরিত্যাগ করা ছাড়া অন্তর থেকে দুনিয়ার ভালোবাসা দূর হয় না। দুনিয়ার স্বাদ-উপভোগ পরিত্যাগ করা তখনই সম্ভব, যদি আসক্তিকে দমন করা যায়। আর আল্লাহভীতির দ্বারা যেভাবে আসক্তি দমন করা যায়, তা অন্য কোনো কিছু দ্বারা যায় না। আল্লাহভীতিই আসক্তি দমন করার কার্যকর উপায়।
সুতরাং যার আল্লাহভীতি যে পরিমাণ আসক্তিকে দমন করতে পারে, যে পরিমাণ গুনাহ থেকে বিরত রাখতে পারে
এবং যে পরিমাণ ইবাদতের প্রেরণা জোগাতে পারে; তার আল্লাহভীতি সে পরিমাণ ফজিলতপ্রাপ্ত। এভাবেই লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের দিক দিয়ে আল্লাহভীতির মাঝে তারতম্য ঘটে।
আল্লাহভীতি ফজিলতপূর্ণ না হয়ে উপায়ই বা কী! এর মাধ্যমে নিষ্কলুষতা অর্জিত হয়; অর্জিত হয় তাকওয়া-পরহেজগারি ও নেক আমলের প্রেরণা? আর এ সবই হলো ফজিলতপূর্ণ ও প্রশংসনীয় আমল, যা বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্যশীল করে।
কুরআন ও সুন্নাহয় আল্লাহভীতির ফজিলত সম্পর্কে এত অধিক আয়াত ও হাদিস উল্লেখিত হয়েছে যে, সেগুলো একত্রিত করা সাধ্যাতীত। আল্লাহ তাআলা আল্লাহভীরুদের জন্য তাঁর হিদায়াত, রহমত, ইলম ও সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়েছেন। যার প্রত্যেকটি জান্নাতবাসীদের জন্য মর্যাদার একেকটি স্তর। ১৩৯
ইয়াজিদ রাকাশি খুব বেশি কান্নাকাটি করতেন। এর জন্য তাকে তিরস্কার করে বলা হলো, 'যদি জাহান্নামকে কেবল আপনার জন্যই সৃষ্টি করা হতো, তাহলেও এখন যে পরিমাণ কাঁদেন, তার চেয়ে বেশি কাঁদতে পারতেন না।' তিনি বললেন, 'জাহান্নام তো আমার জন্য এবং আমারই জিন-ইনসান ভাই-বন্ধুদের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। ১৪০
রবি বিন খুসাইম কখনো কখনো রাতে একদমই ঘুমাতেন না। ঘুমন্ত অবস্থায় মৃত্যুর ভয় করতেন তিনি। রাতদিন কাঁদতে থাকতেন। ১৪১
ইউসুফ বিন আসবাত-এর উদ্দেশে মুহাম্মাদ বিন সামুরা লিখিত একটি চিঠি সংরক্ষিত আছে। চিঠিটি আমাদের সামনে আল্লাহভীতির সুন্দর দৃষ্টান্ত তুলে ধরে :
'প্রিয় ভাই,
আগামীকাল ভালো হয়ে যাব—এই ধোঁকায় নিজেকে ফেলো না। এমন চিন্তাকে অন্তরে জায়গা দিয়ো না। কেননা, এটা আমলের প্রতি অনাসক্তি নিয়ে আসে—ধ্বংসকে ত্বরান্বিত করে। এটি মনের অজান্তে আশা-আকাঙ্ক্ষাকে অপূর্ণ রেখে দেয় এবং নীরবে জীবনকে নিঃশেষ করে দেয়। যদি তুমি তা করো, তবে তোমার সংকল্প ও দৃঢ়তা নড়বড়ে হয়ে যাবে। বিরক্তি বাসা বাঁধবে তোমার মাঝে। হে ভাই, তাড়াতাড়ি করো। নাহলে তোমার সাথে তাড়াহুড়ো করা হবে (অর্থাৎ তাড়াতাড়ি আখিরাতের সম্বল জোগাড় করে নাও, নাহলে সম্বলহীন অবস্থায় তোমার সময় শেষ হয়ে যাবে, যাকে তোমার কাছে খুব তাড়াতাড়ি মনে হবে)। চেষ্টা-মুজাহাদা করো। সফলতা এতেই নিহিত। ঘুম থেকে জাগ্রত হও, গাফিলতি ঝেড়ে ফেলো। বিগত সময়ে যত অপরাধ করেছ, শিথিলতা করেছ, সীমালঙ্ঘন করেছ, সবগুলোর কথা
স্মরণ করো। এতে তোমার মাঝে কৃতকর্মের ওপর লজ্জা ও অনুতাপ সৃষ্টি হবে। হে ভাই, কান্নাকাটি ও প্রভুর ধ্যানকে আবশ্যক করে নাও। মাখলুকের সাথে অপ্রয়োজনীয় সম্পর্ক ও সাক্ষাৎ ত্যাগ করো। এতেই নিহিত শান্তি ও সফলতা। আল্লাহ তাআলা আমাকে ও তোমাকে যথাযথ ও সঠিক কাজটি করার তাওফিক দান করুন। আল্লাহর তাওফিক ছাড়া আমাদের কোনো শক্তি নেই। আমাদের সর্দার মুহাম্মাদ -এর ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক।'১৪২
গাজওয়ান বলেন, 'আমার ওপর আল্লাহর হক হলো, আমি ততদিন হাসব না, যতদিন না আমি জেনে যাই, দুই আবাসস্থলের (জান্নাত ও জাহান্নাম) মধ্যে কোনটি আমার আবাস।' হাসান বলেন, 'তিনি যা বলেছেন, ঠিক তা-ই করেছেন। এরপর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তাকে কখনো হাসতে দেখা যায়নি।'১৪৩
আল্লাহভীতি একটি ভালো গুণ। অনুরূপভাবে আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসাও একটি ভালো গুণ। ঠিক এই গুণগুলো যদি মানুষের জন্য হয়, যেমন: মানুষকে ভয় পাওয়া, মানুষের জন্য কাউকে ভালোবাসা, তখন সেগুলো মন্দ।
মানুষ যখন কাউকে ভয় পায়, তখন তার সাক্ষাৎকেও ভয় পায়। বরং তার সাথে সাক্ষাৎ করাকে অপছন্দ করে। কিন্তু আল্লাহকে ভয় পাওয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি পুরোপুরি উল্টো। এ জন্যই আমরা দেখতে পাই, মানুষ যখন সৃষ্টিকর্তাকে ভয় করে, তখন তাঁর আনুগত্যে ফিরে আসে এবং তাঁর কাছেই আশ্রয় খোঁজে। বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয় এই আয়াতে :
﴿فَفِرُّوا إِلَى اللهِ ﴾
‘অতএব, আল্লাহর দিকে ধাবিত হও।’ ১৪৪
এর তাফসিরে ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ‘গুনাহ থেকে তাওবা করার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ধাবিত হও এবং তাঁর অনুগত হয়ে আমল করো।’
জাহান্নামের ভয়, আল্লাহর ভয়ে কান্না, পরম প্রতাপশালী সত্তার অধিকার আদায়ে শিথিলতার কারণে লজ্জিত হওয়া— সবই আল্লাহভীতির অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহভীতি প্রশংসনীয় হওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে, এ ভীতির পরিণাম সুখকর। এর মাধ্যমে অর্জিত হয় জান্নাত এবং নাজাত পাওয়া যায় জাহান্নাম থেকে।
নেককার ও মুত্তাকিদের কর্ম ছিল আশ্চর্যজনক। তারা আমলের ময়দানে মুজাহাদা করতেন। প্রতিটি সেকেন্ডকে
মূল্য দিতেন। এ সবের মাঝে আবার থাকত ইখলাস ও সততার সুবাস, থাকত না কৃত্রিমতা ও লৌকিকতার দুর্গন্ধ।
মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি বলেন, 'যদি প্রকৃত মুত্তাকি ব্যক্তি বিশ বছর পর্যন্ত ক্রন্দন করে, তবুও তার পাশে থাকা স্ত্রী তা টের পায় না।'
আতা সুলাইমি-কে প্রশ্ন করা হলো, 'এ পেরেশানি কীসের?' তিনি বললেন, 'ধ্বংস হও তুমি, মৃত্যু আমার ঘাড়ে, কবর আমার ঘর, কিয়ামতে আমাকে দাঁড়াতে হবে, জাহান্নামের ওপরের পুল হলো আমার রাস্তা, আমি জানি না আমার সাথে কী করা হবে—এত কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে পেরেশান না হয়ে উপায় আছে?'১৪৫
প্রিয় মুসলিম ভাই, বর্তমান সময়ে মানুষ জীবনকে খুব উপভোগ করছে। হাসি-আনন্দ ও কৌতুক-রসিকতায় তাদের দিন কাটে। এসব দেখে একটি প্রশ্ন বারবার কানে বাজে : কী সেই কারণ, যার ফলে মানুষ এত খুশি, এত আনন্দিত?
প্রশ্নটির উত্তর হাসান-এর মুখেই শোনো। তিনি বলেন, 'মুমিনের হাসির কারণ তার গাফিলতি।'১৪৬
হাসান-এর এই কথাটি তার জীবনে বাস্তবরূপে প্রতিফলিত হয়েছিল। ইউনুস-এর কথা থেকে তা-ই প্রমাণিত হয়। তিনি বলেন, 'হাসান-এর সাথে যতবারই তুমি দেখা করবে, ততবারই মনে হবে যে, তিনি কোনো বিপদে আক্রান্ত।'১৪৭
এ-ই ছিল সালাফের অবস্থা। তাদের দুনিয়া এমনই ছিল। তারা তো বিদায় নিয়েছেন, তাদের সাথে তাদের আমলসমূহও বিদায় নিয়েছে। তারা এক পথ দিয়ে চলেছিলেন—আমরা চলেছি অন্য পথে।
সালাম বিন আবু মুতি বলেন, 'এক রাতে আমি মালিক বিন দিনার-এর কাছে গেলাম। তিনি তখন চেরাগহীন একটি ঘরে অবস্থান করছিলেন এবং হাতে একটি রুটি নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছিলেন। আমি বললাম, “আবু ইয়াহইয়া, আপনার কাছে কি চেরাগ নেই? রুটি রাখার মতো কোনো পাত্র কি নেই?” তিনি বললেন, “ছাড়ো এসব বিষয়! এসবে মাথা ঘামানোর সময় কোথায়? আমি তো আমার কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত, অনুতপ্ত।”'
তাদের অবস্থা এমন হওয়ার কারণ হলো, তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী এবং মৃত্যুর পর অবশ্যই হিসাব-নিকাশ হবে। ছোট-বড় কোনো বিষয়ই হিসাব থেকে বাদ পড়বে না।

টিকাঃ
১৩৯. আল-ইহইয়া: ৪/১৬৮।
১৪০. আত-তাখওয়িফ মিনান নার: ২৫ পৃ.।
১৪১. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ১৮ পৃ.।
১৪২. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৪/২৩৮।
১৪৩. ইমাম আহমাদ রচিত আজ-জুহদ: ৩০০ পৃ.।
১৪৪. সুরা আজ-জারিয়াত, ৫১ : ৫০।
১৪৫. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/৩২৭।
১৪৬. ইমাম আহমাদ রচিত আজ-জুহদ: ৩৯৩ পৃ.।
১৪৭. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ৭০ পৃ.।

📘 আল্লাহর ভয় নির্মল জীবনের পাথেয় > 📄 ভয় ও আশা—কোনটি বেশি উত্তম?

📄 ভয় ও আশা—কোনটি বেশি উত্তম?


প্রিয় মুসলিম ভাই,
ভয় ও আশার ফজিলত সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। অনেক সময় এসব দেখে কেউ কেউ দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যায় যে, এই দুইয়ের মাঝে কোনটি বেশি উত্তম।
ভয় উত্তম নাকি আশা উত্তম—এই প্রশ্নটি রুটি উত্তম নাকি পানি উত্তম টাইপের একটি প্রশ্ন।
এর উত্তর হলো, রুটি ক্ষুধার্তের জন্য উত্তম, আর পানি উত্তম তৃষ্ণার্তের জন্য। একই ব্যক্তি যদি একসাথে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত হয়, তবে দেখতে হবে, ক্ষুধা বেশি, নাকি তৃষ্ণা বেশি। যদি ক্ষুধা বেশি হয়, তবে রুটি উত্তম। আর যদি তৃষ্ণা বেশি হয়, তবে পানি উত্তম। যদি উভয়টি সমান হয়, তাহলে উত্তম হওয়ার দিক দিয়ে উভয়টিই সমান।
ভয় ও আশা এ দুটি দ্বারা অন্তরের রোগের চিকিৎসা করা হয়। তাই এ দুটির ফজিলত ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পাবে বান্দার অন্তরের রোগের প্রকোপের বিচারে। কেউ যদি আল্লাহর অসীম রহমত ও ক্ষমার দিকে তাকিয়ে প্রবঞ্চিত হয় এবং আল্লাহর আজাব থেকে নিজেকে নিরাপদ ভাবে, তবে তার জন্য ভয় উত্তম। আর যদি কারও অন্তরে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাতের ব্যাপারে নৈরাশ্যের রোগ থাকে, তবে তার জন্য আশা উত্তম। অনুরূপভাবে বান্দার মাঝে যদি গুনাহের
প্রবণতা বেশি থাকে, তাহলে তার জন্য ভয়ই উত্তম।
তবে প্রয়োজনীয়তার বিচারে সাধারণভাবে ভয়কে আশার চেয়ে উত্তম বলা যায়। যেমন, রুটি ওষুধের চেয়ে উত্তম। কারণ রুটি দিয়ে ক্ষুধা দূরীভূত হয় আর ক্ষুধার সমস্যা মানুষের সর্বদা লেগেই থাকে। পক্ষান্তরে ওষুধ কেবল অসুস্থ হলে প্রয়োজন হয়। রুটির প্রয়োজনীয়তা যেহেতু ওষুধের চেয়ে বেশি, তাই রুটি ওষুধের চেয়ে উত্তম। অনুরূপভাবে ভয় আশার চেয়ে উত্তম। কারণ মানুষের মাঝে গুনাহ ও নাফরমানির প্রবণতা বেশি—যার সমাধান হলো আল্লাহর ভয়। তাই ভয়ের প্রয়োজন যেহেতু আশার চেয়ে বেশি, তাই সাধারণভাবে ভয় আশার চেয়ে উত্তম।
তবে উৎসমূলের বিচারে ভয়ের চেয়ে আশা বেশি উত্তম। কেননা, আশার উৎসমূল হলো রবের রহমত ও মাগফিরাত; আর ভয়ের উৎসমূল হলো তাঁর ক্রোধ। ১৪৮ আর যে ব্যক্তি আল্লাহর মেহেরবানি ও দয়াবিষয়ক গুণাবলির প্রতি লক্ষ করে, তার অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। আল্লাহর ভালোবাসা হলো আল্লাহর নৈকট্যের সর্বোচ্চ স্তর। পক্ষান্তরে, ভয়ের ভিত্তি হলো ক্রোধবিষয়ক গুণাবলি। আর প্রেমের সাথে যে মিল আশার সাথে আছে, তা ভয়ের নেই। ১৪৯
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, 'আল্লাহর নাফরমান প্রত্যেকেই মূর্খ। আর প্রত্যেক আল্লাহভীরু জ্ঞানী ও আল্লাহর অনুগত। নাফরমানকে মূর্খ বলার কারণ হলো, তার আল্লাহভীতিতে কমতি আছে। যদি পূর্ণরূপে আল্লাহভীতি থাকত, তাহলে সে নাফরমানি করতে পারত না।'১৫০
শাইখ ইবনে সাদি বলেন, 'আল্লাহভীতির আলামত হলো, পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথরূপে আমল করতে চেষ্টা করা।'১৫১
ইবনুল কাইয়িম আল্লাহভীতির ফজিলত সম্পর্কে বলেন, 'ভয় আল্লাহর পথের পথিকদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনজিল এবং কলবের জন্য সর্বাধিক উপকারী। এটা সবার জন্য ফরজ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
(فَلا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ) 'সুতরাং তোমরা তাদের ভয় করো না। আর তোমরা যদি ইমানদার হয়ে থাকো, তবে আমাকে ভয় করো।'১৫২
(فَإِيَّايَ فَارْهَبُونِ) 'অতএব আমাকেই ভয় করো।'১৫৩
যাদের মাঝে ভয় আছে, তাদের প্রশংসা করে আল্লাহ বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ هُمْ مِنْ خَشْيَةِ رَبِّهِمْ مُشْفِقُونَ - وَالَّذِينَ هُمْ بِآيَاتِ رَبِّهِمْ يُؤْمِنُونَ - وَالَّذِينَ هُمْ بِرَبِّهِمْ لَا يُشْرِكُونَ - وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ - أُولَئِكَ يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَهُمْ لَهَا سَابِقُونَ
'নিশ্চয় যারা তাদের রবের ভয়ে সন্ত্রস্ত, যারা তাদের রবের নিদর্শনাবলিতে ইমান আনে, যারা তাদের রবের সাথে কাউকে শরিক করে না এবং যারা তাদের রবের নিকট প্রত্যাবর্তন করবে এই বিশ্বাসে তাদের যা দান করার তা দান করে ভীত-কম্পিত হৃদয়ে, তারাই দ্রুত সম্পাদন করে কল্যাণকর কাজ এবং তারা এতে অগ্রগামী হয়। '১৫৪
সত্যিকারের ও প্রশংসনীয় আল্লাহভীতি হলো, যা বান্দাকে হারাম থেকে বিরত রাখে। যদি আল্লাহভীতি এর চেয়ে বৃদ্ধি পায়, তাহলে তা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করে দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ১৫৫
হে প্রিয়, আমরা এতক্ষণ ধরে আল্লাহভীতির ব্যাপারে আলোচনা করে আসছি। আশা করি, এতক্ষণে নিশ্চয় আমাদের হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, অন্তরে ফিকির তৈরি হয়েছে এবং নতুনভাবে তাওবা করার সুযোগ
হয়েছে। সামনে আমরা আশা সম্পর্কে আলোচনা করব। আশা আল্লাহর রহমতের অন্যতম প্রবেশদ্বার এবং তা অনেক ক্ষেত্রে পাপের পথ থেকে তাওবা করে পুণ্যের পথে ফিরে আসার কারণ হয়।
সুফইয়ান সাওরি -এর অসুস্থতা বেড়ে গেলে তিনি খুব অস্থির ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন। তখন তার কাছে মারহুম ইবনে আব্দুল আজিজ প্রবেশ করলেন। তিনি বললেন, 'হে আবু আব্দুল্লাহ, অত অস্থির হচ্ছেন কেন? আপনি তো সেই রবের কাছেই যাচ্ছেন, ষাট বছর যাবৎ আপনি যাঁর ইবাদত করেছেন। যাঁর জন্য আপনি রোজা রেখেছেন, সালাত পড়েছেন, হজ করেছেন... তাঁর কাছেই তো যাচ্ছেন। এত ঘাবড়ে যাওয়ার কী আছে...?' তার কথায় সুফইয়ান সাওরি -এর অস্থিরতা ও ভয় কেটে গেল।১৫৬
আল্লাহর রহমতের প্রশস্ততা অনুধাবন করে সুফইয়ান সাওরি বলেন, 'আমি চাই না যে, (কিয়ামতের দিন) আমার হিসাব নেওয়ার দায়িত্ব আমার পিতামাতার হাতে দেওয়া হোক। কেননা, আমি জানি যে, আল্লাহ তাআলা আমার প্রতি পিতামাতার চেয়ে বেশি দয়ালু।'
আবু উবাইদা খাওয়াস কেঁদে কেঁদে বলতেন, 'আমি বুড়ো হয়ে গেছি, সুতরাং (তেমন আমল করতে না পারলেও) আমাকে জাহান্নام থেকে মুক্তি দান করুন।'১৫৭
তিনি বান্দাদের প্রতি আল্লাহর দয়া ও করুণার কথা জানতেন বলেই তাঁর কাছে এমন আবদার করতে পেরেছেন।

টিকাঃ
১৪৮. আর আল্লাহর রহমত তাঁর ক্রোধের ওপর প্রাধান্য পায়। (অনুবাদক)
১৪৯. আল-ইহইয়া: ৪/১৭৩।
১৫০. আল-ইমান: ১৯ পৃ.।
১৫১. তাইসিরুল কারিমির রহমান: ২/১৮৫।
১৫২. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৭৫।
১৫৩. সুরা আন-নাহল, ১৬: ৫১।
১৫৪. সুরা আল-মুমিনুন, ২৩: ৫৭-৬১।
১৫৫. মাদারিজুস সালিকিন: ১/৫৪৮।
১৫৬. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ৮/৪৭।
১৫৭. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ২১ পৃ.।

📘 আল্লাহর ভয় নির্মল জীবনের পাথেয় > 📄 ভয় ও আশা : এক পাখির দুই ডানা

📄 ভয় ও আশা : এক পাখির দুই ডানা


প্রিয় মুসলিম ভাই,
আশা ও ভয় এমন দুটি ডানা, যেগুলোর সাহায্যে আল্লাহর নৈকট্যশীল বান্দারা মাকামে মাহমুদ পানে উড়াল দেয়। আশা ও ভয় এমন দুটি বাহন, যে দুটির ওপর সওয়ার হয়ে তারা আখিরাতের পথে ছুটে চলে—যে পথের পদে পদে রয়েছে কঠিন বাধা। সুতরাং আশার লাগাম ব্যতীত অন্য কোনো বস্তু বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্য ও জান্নাতের শান্তি পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে না। অনুরূপভাবে ভয় ব্যতীত অন্য কিছু জাহান্নামের আগুন ও কঠিন আজাবকে রুখতে পারে না। ১৫৮
সুফইয়ান সাওরি বলেন, 'আমার এক ভাই মারা গেল। একদিন আমি তাকে স্বপ্নে দেখলাম। আমি তাকে বললাম, “আল্লাহ তাআলা তোমার সাথে কীরূপ আচরণ করেছেন?” সে বলল, “তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন। আর বলেছেন, “পূর্বে যে চিন্তা-বিষণ্ণতায় দিন কাটাতে, এর বিপরীতে এখানে হাসি-আনন্দে মেতে থাকো।”
আশার ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম ও বাড়াবাড়ি কাম্য নয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা খুব বেড়ে গেছে এবং তারা অলীক স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। মৃত্যু ও তৎপরবর্তী বিষয়ের জন্য তারা মোটেও প্রস্তুত নয়।
تؤمل في الدنيا طويلا ولا تدري إذا جن ليل هل تعيش إلى الفجر فكم من صحيح مات من غير علة وكم من عليل عاش دهرا إلى دهر وكم من فتى يمسي ويصبح آمنا وقد نسجت أكفانه وهو لا يدري
'দুনিয়াতে দীর্ঘ আশা নিয়ে বসে আছ; অথচ তুমি জানো না, এই রাত অন্ধকার হয়ে আসলে ফজরের আলো আর উদ্ভাসিত হবে কি না। কত সুস্থ সবল মানুষ রোগব্যাধি ছাড়াই মরে যায় আর কত অসুস্থ মানুষ ধুঁকে ধুঁকে যুগের পর যুগ জীবিত থেকে যায়। কত যুবক নির্ভার হয়ে সকাল- সন্ধ্যায় উপনীত হয়; অথচ তার অজান্তেই তার কাফন বোনা হয়ে গেছে।'১৫৯
সুফইয়ান সাওরি বলেন, 'দুনিয়াবিমুখতা হলো আশা কম হওয়া। স্বাদহীন খাবার গ্রহণ করা আর ঢিলেঢালা আলখাল্লা পরা দুনিয়াবিমুখতা নয়।'১৬০
দীর্ঘ আশা একটি মারাত্মক দুরারোগ্য ব্যাধি। এই ব্যাধি যখন কারও কলবে জেঁকে বসে যায়, তখন তার স্বভাব-প্রকৃতি ও রুচিবোধ নষ্ট হয়ে যায়। এর চিকিৎসা খুবই জটিল। বাঘা বাঘা ডাক্তার-হেকিমরাও ব্যর্থ এর চিকিৎসা করতে। বান্দার মাঝে আশা যত দীর্ঘ হয়, তার আমল তত খারাপ হয়ে যায়। ১৬১
দীর্ঘ আশার ফলে মন শক্ত ও পাষাণ হয়ে পড়ে। আর নিয়তের বিশুদ্ধতার ফলে গুনাহ কমে যায়।১৬২
দীর্ঘ আশা ও দীর্ঘসূত্রতার ব্যাধি আমাদের আক্রান্ত করেছে। ফলে মানুষের যে একটি শেষ পরিণতি আছে, তা আমরা দেখতে পাই না। এই আবাস থেকে অচিরেই আমাদের চলে যেতে হবে, তা আমরা অনুভব করতে পারি না। অথচ সালাফের মাঝে সর্বদা এই অনুভূতি জাগরূক থাকত।
জনৈক সালাফ বলেন, 'যতবারই আমি ঘুমিয়েছি, ততবারই নিজেকে বলেছি, “এই ঘুম থেকে তুমি নাও জাগতে পারো।”১৬৩
يَا أَيُّهَا النَّاسُ كَانَ لِي أَمَلُ ** قَصَّرَ بِي عَنْ بُلُوغِهِ الْأَجَلُ فَلَيْتَّقِ اللهَ رَبَّهُ رَجُلٌ ** أَمْكَنَهُ فِي زَمَانِهِ الْعَمَلُ
مَا أَنَا وَحْدِي نُقِلْتُ حَيْثُ تَرَى ** كُلُّ إِلَى مِثْلِهِ سَيَنْتَقِلُ
‘হে লোকসকল, আমার একটি আশা ছিল; কিন্তু মৃত্যু আমাকে সে আশা পূরণ করতে দেয়নি। সুতরাং যার এখনো আমল করার সময় আছে, সে যেন আল্লাহকে ভয় করে (দ্রুত আমল করে আমলনামা সমৃদ্ধ করে নেয়)। পৃথিবী থেকে কেবল আমি একাই বিদায় নিয়েছি তা নয়; বরং এভাবে প্রত্যেককেই বিদায় নিতে হবে অচিরেই।’১৬৪
হাসান বলেন, ‘একবার তিনজন আলিম এক জায়গায় একত্রিত হলেন। তাদের একজনকে বাকি দুজন প্রশ্ন করলেন, “আপনার আশা কী?” তিনি বললেন, “যখন একটি নতুন মাস শুরু হয়, তখন আমি মনে করি যে, এই মাসেই আমার মৃত্যু হবে।” বাকি দুজন বললেন, “যথার্থ আশা।” অতঃপর দ্বিতীয়জনকে প্রশ্ন করলেন, “আপনার আশা কী?” তিনি বললেন, “যখন একটি নতুন সপ্তাহ শুরু হয়, তখন আমি ধারণা করি যে, এই সপ্তাহে আমি মৃত্যুবরণ করব।” বাকি দুজন মন্তব্য করলেন, “যথার্থ আশা।” অতঃপর তৃতীয়জনকে প্রশ্ন করা হলো, “আপনার আশা কী?” তিনি উত্তর দিলেন, “সেই ব্যক্তির আবার কীসের আশা, যার প্রাণটাও অন্যের হাতে?”
প্রিয় ভাই আমার, সালাফের আদর্শ ছেড়ে কোথায় আমরা !?
বকর মুজানি বলেন, ‘সম্ভব হলে তোমরা ঘুমানোর সময় মাথার কাছে অসিয়তনামা লিখে রেখো। কেননা, হতে পারে দুনিয়াবাসী হয়ে রাতটা কাটালেও তোমাদের সকাল হবে আখিরাতবাসী হিসেবে।’১৬৫
মুহাম্মাদ বিন আবু তাওবা বলেন, ‘মারুফ কারখি নামাজের ইকামত দিলেন। অতঃপর আমাকে বললেন, “নামাজ পড়াও।” আমি বললাম, “আমি আপনাদেরকে এই নামাজ পড়ালেও এর পরে আর নামাজ পড়াব না।” তখন তিনি বললেন, “তুমি তো দেখছি, মনে মনে ভেবে বসে আছ যে, এই নামাজের পরে দ্বিতীয় নামাজ আসা পর্যন্ত তুমি জীবিত থাকবে। এমন দীর্ঘ আশা থেকে আল্লাহর পানাহ চাই। কেননা, তা নেক আমলকে বাধাগ্রস্ত করে।”’১৬৬
মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি -কে বলা হলো, ‘কী অবস্থায় আপনার সকাল হলো?’ তিনি বললেন, ‘এমন অবস্থায়, যখন আমার মৃত্যু নিকটে, আশা-আকাঙ্ক্ষা দূরে এবং আমল খারাপ। ১৬৭
দাউদ তায়ি বলেন, ‘আমি আতওয়ান বিন আমর তামিমি -কে প্রশ্ন করলাম, “কম আশা কী?” তিনি উত্তর দিলেন, “নিশ্বাস টেনে তা ছাড়ার মধ্যবর্তী সময়ের আশা করা।”’
রুস্তম বলেন, 'এ কথাটি আমি ফুজাইল বিন ইয়াজ-কে বললে তিনি কেঁদে উঠলেন। আর বললেন, “তার কথার মর্ম হলো, নিশ্বাস টানার পর তা ছেড়ে দেওয়ার পূর্বেই মৃত্যু এসে যাওয়ার ভয় করা।” সত্যিই আতওয়ান মৃত্যু সম্পর্কে এমন আশঙ্কায় থাকতেন। '১৬৮
দাউদ তায়ি বলেন, 'যদি আমি আশা করতাম যে, আমি এক মাস বেঁচে থাকব, তাহলে তুমি আমাকে অবশ্যই বড় কোনো কাজ করতে দেখতে। কীভাবেই বা এমন আশা করব; অথচ আমি দেখতে পাচ্ছি, রাত-দিনের প্রতিটি ক্ষণে কোনো না কোনো বিপদ মাখলুককে নিঃশেষ করে চলেছে?'১৬৯
قصر الآمال في الدنيا تفز * * * فدليل العقل تقصير الأمل
'আশা-আকাঙ্ক্ষা কমিয়ে ফেলো, তবেই হবে তুমি সফল। আশা-আকাঙ্ক্ষা কম হওয়াটাই বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক।'
হে সংক্ষিপ্ত সময়ে দীর্ঘ আশায় নিমজ্জিত, তুমি কি আশা পূরণ হওয়ার পূর্বেই কাউকে মরে যেতে দেখোনি? তবুও কি তুমি তাওবাকে দেরি করে পতনকে ত্বরান্বিত করতে চাইবে?
يَا مَنْ يَعِدُ غَدًا لِتُوبَتِهِ *** أَعْلَى يَقِينٍ مِنْ بُلُوغِ غَدٍ الْمَرْءُ فِي زَلَلٍ عَلَى أَمَلٍ *** وَمُنْيَةُ الْإِنْسَانِ بِالرَّصَدِ أَيَّامُ عُمُرِكَ كُلُّهَا عَدَدُ *** وَلَعَلَّ يَوْمَكَ آخِرُ الْعَدَدِ
'তুমি আগামীকাল তাওবা করার প্রস্তুতি নিচ্ছ, যেন তোমার পাক্কা বিশ্বাস, তুমি আগামীকাল পর্যন্ত থাকবে! শোনো, এভাবেই আশার পাল্লায় পড়ে মানুষ পতনের সম্মুখীন হয়। মানুষের মৃত্যু যে কাছে কোথাও ওত পেতে আছে! কয়দিন তুমি বেঁচে থাকবে, তা সুনির্ধারিত। হতে পারে, আজকের দিনটিই তোমার শেষ দিন।'
হে ভাই, মৃত্যু আসার পূর্বেই তাওবা করে নাও। দুআ কবুল হওয়ার দরজা বন্ধ হওয়ার পূর্বেই পুণ্যের পথে ফিরে এসো। সজাগ হও, অনটনের দিন কাছেই চলে এসেছে। দুনিয়া হলো ব্যবসার বাজার, তিরস্কারমূলক নসিহতের মজলিশ এবং ফজরের নিকটবর্তী গ্রীষ্মের রাতের মতো খুব অল্প তার সময়সীমা। এখানে শক্তি গ্রীষ্মকালীন মেঘের মতো, অবসর হলো সাময়িক কল্পনা। সুস্থতা যেন মেহমানের ঘুম। সৌন্দর্য যেন নকল মুদ্রার চমক। দুনিয়া ছলনাময়ী প্রেমিকার মতো। তাই এ দুনিয়ার পেছনে সময় ব্যয় না করে দ্রুত আখিরাতের সম্বল অর্জন করে নাও। যা করার খুব জলদি করতে হবে। কারণ সময় তোমার জীবনকে তরবারির মতো কেটে চলেছে। ১৭০
আব্দুল্লাহ আসরি বলেন, 'প্রকৃত মুমিনকে তুমি কেবল তিন অবস্থায় দেখবে: মসজিদ (নামাজ, তিলাওয়াত, জিকির ইত্যাদির মাধ্যমে) আবাদ করা অবস্থায়; বাড়িতে অবস্থান করা অবস্থায়-যে বাড়ি তার ইজ্জত-সম্ভ্রম সুরক্ষিত রাখে; অথবা কোনো বৈধ পার্থিব জরুরত পূরণ করা অবস্থায়। '১৭১
يا من بدنياه اشتغل *** وغره طول الأمل الموت يأتي بغتة *** والقبر صندوق العمل
'ওহে দুনিয়ার মোহে লিপ্ত মানুষ, দীর্ঘ আশা তোমাকে প্রবঞ্চিত করছে। সতর্ক হয়ে যাও, মৃত্যু কিন্তু অকস্মাৎ এসে পড়বে। আর কবর হলো আমলের সিন্দুক। '১৭২
দীর্ঘ আশা মানুষের যে পরিমাণ ক্ষতি করে, অন্য কোনো বস্তু এতটা করতে পারে না। আর যে বিষয়টি মানুষের সবচেয়ে বেশি সময় নষ্ট করে, তা হলো তাসওয়িফ বা ভবিষ্যতে তাওবা করবে বলে কালক্ষেপণ করা।
সাইদ বিন সাইদ বলেন, 'সগিরা গুনাহের ক্ষুদ্রতার দিকে তাকিয়ো না; বরং এর মাধ্যমে কার অবাধ্যতা হচ্ছে, তাঁর দিকে তাকাও। '১৭৩
ঈসা বলেন, 'তিন ব্যক্তিকে নিয়ে আমার খুব আশ্চর্য হয়। ১. গাফিল; কিন্তু তার ব্যাপারে আল্লাহ গাফিল নন। ২. দুনিয়ার বাসনাকারী; কিন্তু মৃত্যু তাকে খুঁজে ফিরছে। ৩. প্রাসাদ নির্মাণকারী; কিন্তু তার আসল ঘর হলো কবর।'
প্রিয় ভাই আমার,
জীবনের কয়েকটি দিন ভালোভাবে চলায় তুমি সময়ের ব্যাপারে ইতিবাচক ধারণা করতে শুরু করেছ। কয়েকটি রাত নিরাপদ থেকেছ; আর সেই রাতগুলোই তোমাকে প্রতারিত করছে। কিন্তু কোনো এক রাতের প্রান্তভাগে বিপদ এসে ঠিকই আক্রমণ করে বসবে।
ফুজালা বিন সাইফি খুব বেশি কান্নাকাটি করতেন। একদিন তিনি কাঁদছিলেন এমন সময়ে তার কাছে এক ব্যক্তি প্রবেশ করল। লোকটি তার স্ত্রীর কাছে তার কান্নার কারণ জানতে চাইল। স্ত্রী বললেন, 'তার ধারণা, তিনি দীর্ঘ একটি সফরের ইচ্ছা করেছেন; কিন্তু তার হাতে পর্যাপ্ত পাথেয় নেই।'
আমাদের অবস্থাও এমন নয় কি? আমরাও তো আখিরাতের পথে সফরে আছি। খুব দীর্ঘ এই সফর। কিন্তু আমাদের হাতে পাথেয় কই?
হে ভাই, পাথেয় হলো কম আশা ও গন্তব্যের জন্য সম্বল সংগ্রহ করা। এই সফর শুরু হয়েছে এবং অচিরেই তা
শেষ হতে চলেছে। দুনিয়াতে আমরা ক্ষণিকের মেহমান। এখানে আমাদের অবস্থান কল্পনাপ্রসূত স্বপ্ন কিংবা বাড়তি ছায়ার মতো। অতঃপর আমরা সমবেত হব বিশাল এক জনসমাগমে। যেদিন কবরে যা আছে, তা উত্থিত হবে এবং অন্তরে যা আছে, তা প্রকাশিত হবে।
ইবরাহিম বিন খুমাইস বলেন, 'সাবধানতা দেখে কাজা (আল্লাহর নির্ধারিত ফায়সালা) হাসে। আশা দেখে মৃত্যু হাসে। ব্যবস্থাপনা দেখে তাকদির হাসে। কষ্ট-মেহনত দেখে ভাগ্য হাসে।'
قصر الآمال في الدنيا تفز * * * فدليل العقل تقصير الأمل إن من يطلبه الموت على *** غرة منه جدير بالوجل
'আশা-আকাঙ্ক্ষা কমিয়ে ফেলো, তবেই হবে তুমি সফল। আশা-আকাঙ্ক্ষা কম হওয়াটাই বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। মৃত্যু যাকে তার অজান্তে খুঁজে ফিরে, সে কেবল ভয় পাওয়ারই উপযুক্ত।'১৭৪
সুতরাং হে ভাই, ততক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হোয়ো না, যতক্ষণ না পূর্ণরূপে জানতে পারো, কোথায় তোমার ঘর, কোথায় তোমার ঠিকানা। যেসব ইবাদত ছুটে গেছে, কাজা করে নাও। যেসব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা বাকি আছে করে নাও।
কারণ, কোনোরূপ পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই তোমার মৃত্যু এসে যাবে। তখন আর সময় পাবে না। ১৭৫
দুনিয়ার তুচ্ছ ও নগণ্য বিষয়ের পেছনে আমাদের দৌড়ঝাঁপ দেখে জনৈক দার্শনিক আশ্চর্য প্রকাশ করে বলেন, 'ওই লোকের প্রতি আমার খুব আশ্চর্য হয়, যে সম্পদ ক্ষয় হলে পেরেশান হয়; কিন্তু জীবন ক্ষয়ের ব্যাপারে তার কোনো পেরেশানি নেই। ওই লোকের প্রতিও আমার আশ্চর্য হয়, যে দুনিয়া পেরিয়ে আখিরাতের দিকে যাত্রা করছে; কিন্তু সে পেছনের দুনিয়া নিয়ে পড়ে আছে—আখিরাতের প্রতি তার কোনো খেয়ালই নেই।' ১৭৬
এ সম্পর্কে উমর বিন খাত্তাব খুব দারুণ একটি উপদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'আল্লাহর অধিক ধৈর্য দেখে ধোঁকা খেয়ো না। এমন বোকামি কোরো না কোনোদিন। তুমি আল্লাহর এই আয়াত নিশ্চয় শুনে থাকবে: (فَلَمَّا آسَفُونَا انْتَقَمْنَا مِنْهُمْ فَأَغْرَقْنَاهُمْ أَجْمَعِينَ) "অতঃপর যখন আমাকে রাগান্বিত করল, তখন আমি তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিলাম এবং নিমজ্জিত করলাম তাদের সবাইকে।”১৭৭
হাসান তার হৃদয়জাগানিয়া ওয়াজে বলতেন, 'আখিরাতের জন্য দ্রুত প্রস্তুতি নাও। কারণ জীবন কয়েকটি নিশ্বাসের সমষ্টি মাত্র। এই নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলেই তোমাদের আমলের সময় শেষ, যে আমলের মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে। আল্লাহ তাআলা সেই ব্যক্তির ওপর রহম করুন, যে নিজের নফসের দিকে লক্ষ রাখে এবং গুনাহের সংখ্যা ও পরিমাণ নিয়ে কান্নাকাটি করে।'১৭৮
فقل للذي قد غره طول عمره وما قد حواه من زخارف تخدع أفق وانظر الدنيا بعين بصيرة تجد ما فيها ودائع ترجع
'বলো তাকে, যে দীর্ঘ জীবন এবং তার চাকচিক্যে প্রবঞ্চনার শিকার। সজাগ হও, দুনিয়াকে অন্তরের চোখ দিয়ে দেখো। দেখবে, দুনিয়ার সবকিছুই আমানত, নির্ধারিত সময়ে সবই ফিরে যাবে মালিকের কাছে।'১৭৯
দীর্ঘ আশা আমাদের ধোঁকায় রেখেছে। একদিন ভালো হয়ে যাওয়ার কল্পনা আমাদের গাফিল করে রেখেছে। আমাদের যে কারও সাথে এমন হওয়া সম্ভব, হঠাৎ তার মৃত্যু এসে উপস্থিত হবে আর সে বলবে, 'হে আমার রব, আমাকে
ফেরত পাঠান।' তিনি বলবেন, 'কেন ফিরে যেতে চাও?' সে বলবে, 'যাতে কিছু নেক আমল করে আসতে পারি।'
পক্ষান্তরে, আমাদের সালাফের অবস্থা ছিল আমাদের সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা সজাগ ও সচেতন হয়ে জীবন কাটাতেন। মৃত্যুর দিনের জন্য যা যা প্রয়োজন, সবই আগেভাগে প্রস্তুত রাখতেন। হাবিব আজমি -এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তিনি সকালে স্ত্রীকে বলতেন, 'আজ যদি আমি মরে যাই, তাহলে অমুক আমাকে গোসল দেবে এবং অমুক অমুক আমার খাটিয়া বহন করবে।'১৮০
مَا الدَّهْرُ إِلَّا يَقْظَةٌ وَنَوْمٌ*** وَلَيْلَةٌ بَيْنَهُمَا وَيَوْمٌ يَعِيشُ قَوْمٌ وَيَمُوتُ قَوْمٌ *** وَالدَّهْرُ قَاضٍ مَا عَلَيْهِ لُومُ
'জাগরণ আর ঘুম, এ দুইয়ের মাঝে একটি রাত ও একটি দিন—এই তো সময়। এরই মাঝে বেঁচে থাকে একদল লোক, আর মরে যায় একদল লোক। সময় সবকিছুকে নিঃশেষ করে দেয়। তাকে দোষ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।'১৮১
সাদ বিন মুআজ বলেন, 'ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকে আমি যেকোনো নামাজ পড়েছি, সবকটিতে আমার নফস যেটি ভাবতে চেয়েছে, তার উল্টোটাই আমি ভেবেছি।
যতবার জানাজার পেছনে আমি হেঁটেছি, প্রতিবারই আমি নফসের চাহিদার বিরুদ্ধে চিন্তা করেছি। আর রাসুল -কে যত কথা বলতে শুনেছি, সবগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছি। ১৮২
জনৈক নেককার ব্যক্তি বলেন, 'আমি এক লোককে তার মৃত্যুর পর স্বপ্নে দেখলাম। তখন তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আল্লাহ তাআলা আপনার সাথে কেমন আচরণ করেছেন?” তিনি উত্তর দিলেন, “আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন।” আমি বললাম, “আপনার দৃষ্টিতে কোন আমল উত্তম?” তিনি উত্তর দিলেন, “তাওয়াক্কুল তথা আল্লাহর প্রতি অকুণ্ঠ আস্থা ও সংক্ষিপ্ত আশা।”১৮৩
প্রিয় মুসলিম ভাই, সেই রবের ব্যাপারে গাফিল হোয়ো না, যিনি তোমার জীবনের জন্য সুনির্দিষ্ট মেয়াদ রেখেছেন এবং তোমার দিন ও নিশ্বাসসমূহের জন্য নির্ধারিত সীমা তৈরি করেছেন। তিনি ব্যতীত অন্য সকলকে ছাড়া তোমার উপায় আছে; কিন্তু তিনি ছাড়া তোমার কোনো উপায় নেই। ১৮৪
প্রতিদিন কারও না কারও মৃত্যুর সংবাদ আমরা শুনি। আমরা 'ইন্নালিল্লাহ' পড়ে কিছুক্ষণ চিন্তা-ফিকির করি। অতঃপর আবার সেই আগের গাফিলতি ও দীর্ঘ আশায়
ফিরে যাই। যেন মৃত্যুর ফেরেশতা আমাদের দরজার আশেপাশেও ঘেঁষবেন না; রুহ কবজ করা তো বহুত দূর কি বাত! ১৮৫
আব্দুল্লাহ বিন সালাবা বলেন, 'তুমি হাসছ!? অথচ তোমার কাফনের কাপড় হয়তো বোনা হয়ে গেছে।'
উমর-এর মুক্তোদানার মতো মূল্যবান দুয়েকটি কথা শোনো। তিনি বলেন, 'ধ্বংস তার জন্য, দুনিয়া যার ধ্যান- জ্ঞান, গুনাহ যার কর্ম। সে কোন মুখে আগামীকাল আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে? যে পরিমাণ তোমরা শস্য উৎপাদন করেছ, সে পরিমাণই তো ফসল কাটতে পারবে!'

টিকাঃ
১৫৮. আল-ইহইয়া: ৪/১৪৯।
১৫৯. দিওয়ানুল ইমাম আলি: ৯৬ পৃ.।
১৬০. মাদারিজুস সালিকিন: ২/১১।
১৬১. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ-দ্বীন: ১০৮ পৃ.।
১৬২. আল-আকিবাহ : ৬৮ পৃ.।
১৬৩. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ৪৬৫ পৃ.।
১৬৪. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া : ১৩/৪০।
১৬৫. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ৪৬৫ পৃ.।
১৬৬. হিলইয়াতুল আওলিয়া : ৮/৩৬১, আল-আকিবাহ : ৯০ পৃ.।
১৬৭. আস-সিয়ার: ৬/১২১।
১৬৮. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/১২৭।
১৬৯. আল-ইহইয়া: ৪/৪৮৩।
১৭০. আল-মুদহিশ: ২৩২ পৃ.।
১৭১. ইমাম আহমাদ রচিত আজ-জুহদ: ৩৩৮ পৃ.।
১৭২. দিওয়ানুল ইমাম আলি: ১৫৮ পৃ.।
১৭৩. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ৯৫ পৃ.।
১৭৪. মাওয়ারিদুজ জামআন: ২/২৬।
১৭৫. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ১১ পৃ.।
১৭৬. আল-আকিবাহ: ৯০ পৃ.।
১৭৭. সুরা আজ-জুখরুফ, ৪৩ : ৫৫।
১৭৮. আল-ইহইয়া: ৪/৪৮৮।
১৭৯. ইরশাদুল ইবাদ: ৭০ পৃ.।
১৮০. সাইদুল খাতির: ২০৪ পৃ.।
১৮১. দিওয়ানুল ইমাম আলি: ১৭১ পৃ.।
১৮২. আল-ইহইয়া: ৩/৩২৬।
১৮৩. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ৫০ পৃ.।
১৮৪. আল-ফাওয়ায়িদ: ১২৯ পৃ.।
১৮৫. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/৩৮১।

📘 আল্লাহর ভয় নির্মল জীবনের পাথেয় > 📄 আমল সুন্দর করার প্রতি মনোযোগী হও

📄 আমল সুন্দর করার প্রতি মনোযোগী হও


মুহাম্মাদ বিন ইয়াজিদ বলেন, 'এক ইদের দিন উহাইব বিন ওয়ারদ নামাজ পড়ালেন। নামাজ শেষে লোকজন তার পাশ দিয়ে ফিরে যাচ্ছিল। তখন তাদের দিকে তাকিয়ে তিনি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। অতঃপর বললেন, “এই লোকগুলো যদি বিশ্বাস করে যে, তাদের ইদ কবুল হয়েছে, তাহলে তাদের উচিত সকল কর্ম ও ব্যস্ততা বাদ দিয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ে ব্যাপৃত থাকা। আর যদি মনে করে যে, কবুল হয়নি, তাহলে আল্লাহর
ইবাদতে আরও বেশি মনোযোগী হওয়া জরুরি।” একটু পর আবার বললেন, “তোমরা আমলের পরিমাণ বৃদ্ধি করার চেষ্টা কোরো না; বরং আমলকে মজবুত ও সুন্দর করার চেষ্টা করো। কেননা, অনেক সময় এমন হয় যে, বান্দা নামাজ আদায় করছে; কিন্তু (নামাজ সুন্দর না হওয়ার কারণে) নামাজেই সে আল্লাহর নাফরমানি করছে। সে রোজা রেখেছে; কিন্তু (রোজা যথাযথ ও সুন্দর না হওয়ার কারণে) এর মাধ্যমে সে আল্লাহর নাফরমানি করছে।”১৮৬
দীর্ঘ আশা লোকদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তাদেরকে দুনিয়া নিয়ে মাতিয়ে রেখেছে এবং দুনিয়ার মোহে ফেলে আখিরাত থেকে উদাসীন করে রেখেছে। তাই এখন মানুষ শুধু দুনিয়াকে নিয়ে ব্যস্ত। সময়ের এক অংশে দুনিয়ার জন্য ঘামঝরা খাটুনি করে, দুনিয়ার তুচ্ছ বস্তু অর্জনের জন্য কষ্ট সহ্য করে। আরেক অংশ আরাম ও বিশ্রামে ব্যয় করে। সেটাকেও হাসি-কৌতুক, খেলাধুলা কিংবা অবহেলায় নষ্ট করে ফেলে। ফলে আখিরাতের জন্য একটু চিন্তাভাবনা করার সময়টুকুও পায় না।
উহাইব বলেন, 'একজন আলিমের মন কীভাবে সায় দেয় হাসি-আনন্দে সময় কাটিয়ে দিতে; অথচ সে জানে যে, এ কারণে কিয়ামতের দিন তার জন্য কঠিন ভয়াবহতা।
অপেক্ষা করে আছে?' এই বলে তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে গেলেন। ১৮৭
প্রিয় ভাই আমার, মাকহুল দিমাশকি বলেন, 'যে ব্যক্তি কেবল ভয় নিয়ে আল্লাহর ইবাদত করে, সে খারিজি; যে কেবল আশা নিয়ে ইবাদত করে, সে মুরজিয়া; যে কেবল প্রেম নিয়ে ইবাদত করে, সে জিন্দিক; আর যে ভয়, আশা ও প্রেম—সবকটি নিয়ে ইবাদত করে, সে-ই প্রকৃত তাওহিদবাদী। ১৮৮
শাইখ ইবনে সাদি বলেন, বান্দার জন্য আবশ্যক হলো, সে আল্লাহর প্রতি একইসাথে ভয় ও আশা উভয়টি রাখবে। নিজের গুনাহ এবং আল্লাহর ইনসাফ ও কঠিন শাস্তির দিকে তাকিয়ে আল্লাহকে ভয় করবে। আবার তাঁর অসীম রহমত ও মাগফিরাতের প্রতি তাকিয়ে তাঁর প্রতি আশা রাখবে। ইবাদতের তাওফিকপ্রাপ্ত হলে তা কবুল করে নিয়ামত পরিপূর্ণ করার আশা রাখবে। পাশাপাশি নিজের পক্ষ থেকে কোনো দুর্বলতা ও কমতির কারণে উক্ত ইবাদত কবুল না হওয়ার ভয় করবে। কোনো গুনাহ হয়ে গেলে তাওবা করবে এবং তাওবা কবুল হওয়ার আশা রাখবে। পাশাপাশি দুর্বল তাওবার কারণে উক্ত গুনাহের কারণে শান্তি পাওয়ার ভয় করবে। এভাবে সকল নিয়ামতের ক্ষেত্রে শুকরিয়া
আদায় করার বদৌলতে তা টিকে থাকা ও বৃদ্ধি পাওয়ার আশা রাখবে। পাশাপাশি যথাযথ শুকরিয়া না করার কারণে তা কমে যাওয়ার কিংবা একেবারে চলে যাওয়ার ভয় করবে। বিপদ ও মুসিবতের ক্ষেত্রে তা কেটে যাওয়ার আশা রাখবে। সাথে সাথে এ আশাও রাখবে যে, বিপদের ওপর সবর করার কারণে সাওয়াব প্রদান করা হবে। পাশাপাশি বিপদের সময় দুইটা বিপদ একত্রিত হওয়ার ভয় করবে : সবর না করার কারণে প্রত্যাশিত সাওয়াব থেকে মাহরুম হওয়া এবং অপ্রত্যাশিত ফলাফলের সম্মুখীন হওয়া।
সুতরাং তাওহিদবাদী মুসলিমের জন্য জীবনের প্রতিটি অংশে, প্রতিটি ক্ষেত্রে আশা ও ভয়ের মাঝে সমন্বয় করে থাকা বাঞ্ছনীয়। তা ছাড়া সফলতা এর মাঝেই নিহিত। ১৮৯
প্রিয় মুসলিম ভাই, আল্লাহর প্রিয়ভাজন হয়ে চির শান্তির জান্নাতে তাঁর প্রতিবেশিত্ব গ্রহণ করার সহজ ও কষ্টহীন একটি পন্থা জানিয়ে দিই তোমাকে। সবচেয়ে কাছের এবং সবচেয়ে সহজ এ পন্থা। তা হলো : তোমার জীবনকে দুইভাগে ভাগ করে নাও। অতীত ও ভবিষ্যৎ। অতীত জীবনকে তাওবা, লজ্জা ও ইসতিগফারের মাধ্যমে ঠিক করে নাও। এটি করতে গিয়ে তোমাকে তেমন কোনো কষ্ট করতে হবে না। কঠিন কোনো আমল করারও প্রয়োজন নেই। এটা কলবের আমল, হৃদয়ের কর্ম। আর ভবিষ্যতে
গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো। বেঁচে থাকা বা পরিত্যাগ করা কোনো অঙ্গ দ্বারা করতে হয় এমন কোনো কাজ নয়, ফলে তার জন্য কষ্টও পেতে হয় না। এর জন্য তোমাকে কাজে লাগাতে হবে কেবল তোমার মনোবল ও ইচ্ছাশক্তিকে। কিন্তু শরীর ও মন উভয়টিই তার উপকার ভোগ করবে।
এভাবে তুমি অতীত জীবনকে তাওবার মাধ্যমে শুদ্ধ করে নেবে এবং ভবিষ্যতের জীবনকে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমে শুদ্ধ রাখবে। ফলস্বরূপ তুমি লাভ করবে মহাসাফল্য। তেমন কোনো কষ্ট ছাড়াই! তবে সিদ্ধান্তটি তোমাকে আজই নিতে হবে। অর্থাৎ তোমার অতীত ও ভবিষ্যতের মাঝামাঝি এই যে বর্তমান সময়টি আছে, তাকেই মূল্যায়ন করে অর্জন করে নিতে হবে এই মহাসাফল্য। যদি তুমি তা নষ্ট করে ফেলো, তবে এই বিরাট সফলতাও তোমার হাতছাড়া হয়ে যাবে। তার স্থলে জায়গা করে নেবে মহাব্যর্থতা।
সফলতা ও ব্যর্থতা, জান্নাত ও জাহান্নাম দুইটাই তোমার সামনে। আমার দেখানো পথে চলে তুমি চাইলে অর্জন করে নিতে পারো সফলতা ও জান্নাত। আবার তোমার মনের চাহিদা ও আসক্তির কথা মেনে এবং খেলাধুলায় মত্ত থেকে ব্যর্থতা ও জাহান্নামও অর্জন করে নিতে পারো। সিদ্ধান্ত নেওয়াটা তোমার হাতেই ছেড়ে দিলাম। তবে মনে রাখবে, মনের চাহিদা পূরণ ও অহেতুক খেলাধুলা থেকে সবর করে থাকার মাঝে যে কষ্ট আছে, তা সেই কষ্টের তুলনায় খুবই
নগণ্য, যা তোমাকে এসব থেকে সবর না করার কারণে সইতে হবে। ১৯০

টিকাঃ
১৮৬. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/২৫।
১৮৭. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/২২১।
১৮৮. আল-ইহইয়া: ৪/১৭৪।
১৮৯. আল-কাওলুস সাদিদ: ১১৯ পৃ.।
১৯০. আল-ফাওয়ায়িদ: ১৫১ পৃ.।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00