📄 আল্লাহভীতিতেও চাই মধ্যমপন্থা
প্রিয় মুসলিম ভাই,
আল্লাহভীতি নিশ্চয় উত্তম ও কল্যাণকর। কিন্তু তার মানে এ নয় যে, সকল ভীতিই প্রশংসনীয়। ভয় যত বেশি হবে, ততই উত্তম—এমন ধারণা অমূলক। বরং ভয় হলো আল্লাহর একটি চাবুক, যা বান্দাকে আমলের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যায়; যাতে তারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে। জন্তু-জানোয়ারদের সোজা রাখতে বেতের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। বাচ্চাদের ক্ষেত্রেও তাই। কিন্তু তার মানে এ নয় যে, বেত দিয়ে অধিক হারে প্রহার করা প্রশংসনীয়। ভয়ের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। অন্য সকল বিষয়ের মতো ভয়ের মাঝেও আছে ছাড়াছাড়ি, বাড়াবাড়ি ও মধ্যমপন্থা। এখানেও মধ্যমপন্থা প্রশংসনীয়। ১২৮
সত্য পথের ওপর অবিচল থাকা ও আসমান-জমিনসম জান্নাতের পথে বিরামহীন যাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহের পরে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি জরুরি, তা হলো আল্লাহর ভয় ও তাঁর ধ্যান।
উম্মে দারদা -এর কাছে জানতে চাওয়া হলো, 'আবু দারদা অধিকাংশ সময় কোন আমল করতেন?' তিনি উত্তর দিলেন, 'ফিকির ও ধ্যান। ১২৯
টিকাঃ
১২৮. আল-ইহইয়া: ৪/১৬৫।
১২৯. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১/২০৮।
📄 চিন্তা-ফিকির উন্মুক্ত করে সত্যের পথ
যে পরজগৎ ও চিরস্থায়ী ঠিকানার ব্যাপারে চিন্তা-ফিকির করে, সে সত্যের রাস্তা খুঁজে পায়।
نرجو البقاء بدار لا ثبات لها فهل سمعت بظل غير منتقل
'আমরা এমন এক ঘরে আজীবন থেকে যাওয়ার আশা করছি, যার কোনো স্থায়িত্ব নেই। তুমি এমন কোনো ছায়ার কথা শুনেছ, যা সরে যায়নি?'
প্রিয় ভাই আমার, সালাফের পথ ছেড়ে আমরা কোথায়?
আবু সিনান বলতেন, 'বয়স বৃদ্ধি পেয়েছে, হাড্ডি দুর্বল হয়ে পড়েছে, আমলের যত্ন নেওয়ার শক্তিও হারিয়ে গেছে'-এই বলে তিনি কাঁদতে থাকতেন। কাঁদতে কাঁদতে বেহুঁশ হয়ে যেতেন।১৩০
ইয়াজিদ রাকাশি এত বেশি কাঁদতেন যে, কান্নার কারণে তার চোখে ছানি পড়ে গিয়েছিল। অশ্রুর অত্যধিক প্রবাহে চোখের শিরাগুলো নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।১৩১
আবু নজর ইসহাক বিন ইবরাহিম বলেন, 'সাইদ বিন আব্দুল আজিজ নামাজ পড়ার সময় আমি জায়নামাজের ওপর তার অশ্রু পড়ার শব্দ শুনতে পেতাম। ১৩২
ইসমাইল বিন জাকারিয়া তার প্রতিবেশী হাবিব বিন মুহাম্মাদ সম্পর্কে বলেন, 'যখন সন্ধ্যা হতো, তখন আমরা তার কান্না শুনতে পেতাম। সকালবেলায়ও তাকে কাঁদতে শুনতাম। তাই তার স্ত্রীর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “সন্ধ্যাবেলায় তিনি কাঁদেন, আবার সকালেও তিনি কাঁদেন। কারণ কী?” স্ত্রী উত্তর দিলেন, “যখন সন্ধ্যা হয়, তখন তিনি সকাল পর্যন্ত বেঁচে না থাকার ভয় করেন। আর যখন সকাল হয়, তখন সন্ধ্যা পর্যন্ত বেঁচে না থাকার ভয় করেন।"
এক রাতে হাসান-এর নিদ্রাভঙ্গ হলো। ঘুম থেকে জেগেই তিনি কান্না করতে লাগলেন। তার কান্না দেখে পরিবারের লোকেরা ঘাবড়ে গেল। তারা কান্নার কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, 'আমার একটি গুনাহের কথা মনে পড়ে গেছে, তাই কাঁদছি। ১৩৩
উমর বিন আব্দুল আজিজ-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, এক রাতে তিনি নামাজ পড়ছিলেন। নামাজে তিনি তিলাওয়াত করলেন:
إِذِ الْأَغْلَالُ فِي أَعْنَاقِهِمْ وَالسَّلَاسِلُ يُسْحَبُونَ - فِي الْحَمِيمِ ثُمَّ فِي النَّارِ يُسْجَرُونَ)
'যখন বেড়ি ও শৃঙ্খল তাদের গলদেশে পড়বে, তাদেরকে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে। ফুটন্ত পানিতে, অতঃপর তাদেরকে আগুনে জ্বালানো হবে। ১৩৪
তারপর থেকে ফজর পর্যন্ত কেঁদে কেঁদে তিনি বারবার এই আয়াত পড়তে থাকলেন। ১৩৫
তামিম দারি একবার এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন : أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءً مَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ )
'যারা দুষ্কর্ম করেছে; তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে সে লোকদের মতো করে দেবো, যারা ইমান আনে, সৎকর্ম করে এবং তাদের জীবন ও মৃত্যু কি সমান হবে? তাদের দাবি কত মন্দ!'১৩৬
ফজর পর্যন্ত কেঁদে কেঁদে তিনি এই আয়াতই পড়ে গেলেন।
প্রিয় মুসলিম ভাই, তুমি যদি মহান দাতা, পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু প্রভুর দরজা আঁকড়ে থাকো, তাহলে কল্যাণের সুসংবাদ গ্রহণ করো।
ইবনে আরফের কথাটি শোনো। তিনি বলেন, 'যদি দুনিয়ার রাজা-বাদশাহদের সাথে কোনো ব্যক্তি সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে উপকার লাভ করতে পারে না। তাহলে আসমান, জমিন, এতদুভয়ের মাঝে ও ভূগর্ভস্থ সকল মাখলুকের রাজাধিরাজ আল্লাহ তাআলার সাথে যে সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে কী করে উপকার লাভ করতে পারবে?'
তিনিই হলেন রাজাদের রাজা। দুনিয়া ও আখিরাতের মালিক। তাঁর হাতেই সকল কল্যাণের চাবিকাঠি। অথচ আমরা তাঁর কাছে দুআ করার ব্যাপারে উদাসীন থাকি। তাঁর নিকট আশা পোষণে শৈথিল্য প্রদর্শন করি। তাঁর ইবাদত থেকে বিমুখ হয়ে দুনিয়ার চাকচিক্যে মজে থাকি।
আব্দুর রহমান বিন ইয়াজিদ বিন জাবির একবার ইয়াজিদ বিন মারসাদ -কে বললেন, 'কী ব্যাপার, আপনার চোখ কখনো শুকনো দেখি না যে?' তিনি বললেন, 'তোমার এই প্রশ্নের কারণ কী?' আমি বললাম, 'হয়তো তা জেনে দুনিয়াতে আমার কোনো উপকার হবে।' তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাআলা আমাকে জাহান্নামে বন্দী করার হুমকি দিয়েছেন—যদি আমি তাঁর অবাধ্যতা করি। আল্লাহর কসম, যদি তিনি কেবল গোসলখানায় বন্দী করারও হুমকি
দিতেন, তবুও আমার চোখ কখনো অশ্রুহীন না হওয়ারই যোগ্য হতো। '১৩৭
হে ভাই, যাকে আল্লাহ তাআলা জাহান্নামে বন্দী করার হুমকি দিয়েছেন, তার ব্যাপারে তোমার কী ধারণা? তার জন্য কি সব সময় চিন্তিত থাকা এবং অধিক হারে কান্না করা উচিত নয়? এখনই তাওবার ঘোষণা দেওয়া কি তার জন্য জরুরি নয়?
দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা হলে জাহহাক কান্না জুড়ে দিতেন। তাকে এই কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলতেন, 'আমি জানি না, আমার আজকের আমলের মধ্যে কোনটি কবুল হয়েছে।'১৩৮
টিকাঃ
১৩০. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ১১১ পৃ.।
১৩১. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ২১ পৃ.।
১৩২. আস-সিয়ার: ৮/৩৪।
১৩৩. আত-তাবসিরাহ: ১/২৮৭।
১৩৪. সুরা গাফির, ৪০: ৭১-৭২।
১৩৫. তাম্বিহুল গাফিলিন: ২/৬২০।
১৩৬. সুরা আল-জাসিয়া, ৪৫ : ২১।
১৩৭. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৪/২০৫।
১৩৮. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৪/১৫০।
📄 আল্লাহভীতির ফজিলত
প্রিয় মুসলিম ভাই,
আল্লাহভীতির ফজিলত কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত।
কোনো বিষয় ফজিলতপ্রাপ্ত হয়, সেটি আখিরাতে সফলতা অর্জনে কী পরিমাণ ভূমিকা রাখে তার ওপর ভিত্তি করে।
এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, আখিরাতে আল্লাহর সাক্ষাৎলাভে ধন্য হওয়ার জন্য দুনিয়াতে তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও সুসম্পর্ক থাকা আবশ্যক। আর আল্লাহর মারিফাত বা বিশেষ পরিচয় ছাড়া ভালোবাসা অর্জিত হয় না। মারিফাত অর্জিত হয় কেবল ধারাবাহিক ফিকির ও ধ্যানের মাধ্যমে। সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে ভালোবাসা ও নিয়মিত জিকিরের মাধ্যমে। আর ধারাবাহিক ধ্যান ও জিকির তখনই সম্ভব, যখন অন্তর থেকে দুনিয়ার ভালোবাসা দূরীভূত হয়। আর দুনিয়ার স্বাদ-উপভোগ পরিত্যাগ করা ছাড়া অন্তর থেকে দুনিয়ার ভালোবাসা দূর হয় না। দুনিয়ার স্বাদ-উপভোগ পরিত্যাগ করা তখনই সম্ভব, যদি আসক্তিকে দমন করা যায়। আর আল্লাহভীতির দ্বারা যেভাবে আসক্তি দমন করা যায়, তা অন্য কোনো কিছু দ্বারা যায় না। আল্লাহভীতিই আসক্তি দমন করার কার্যকর উপায়।
সুতরাং যার আল্লাহভীতি যে পরিমাণ আসক্তিকে দমন করতে পারে, যে পরিমাণ গুনাহ থেকে বিরত রাখতে পারে
এবং যে পরিমাণ ইবাদতের প্রেরণা জোগাতে পারে; তার আল্লাহভীতি সে পরিমাণ ফজিলতপ্রাপ্ত। এভাবেই লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের দিক দিয়ে আল্লাহভীতির মাঝে তারতম্য ঘটে।
আল্লাহভীতি ফজিলতপূর্ণ না হয়ে উপায়ই বা কী! এর মাধ্যমে নিষ্কলুষতা অর্জিত হয়; অর্জিত হয় তাকওয়া-পরহেজগারি ও নেক আমলের প্রেরণা? আর এ সবই হলো ফজিলতপূর্ণ ও প্রশংসনীয় আমল, যা বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্যশীল করে।
কুরআন ও সুন্নাহয় আল্লাহভীতির ফজিলত সম্পর্কে এত অধিক আয়াত ও হাদিস উল্লেখিত হয়েছে যে, সেগুলো একত্রিত করা সাধ্যাতীত। আল্লাহ তাআলা আল্লাহভীরুদের জন্য তাঁর হিদায়াত, রহমত, ইলম ও সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়েছেন। যার প্রত্যেকটি জান্নাতবাসীদের জন্য মর্যাদার একেকটি স্তর। ১৩৯
ইয়াজিদ রাকাশি খুব বেশি কান্নাকাটি করতেন। এর জন্য তাকে তিরস্কার করে বলা হলো, 'যদি জাহান্নামকে কেবল আপনার জন্যই সৃষ্টি করা হতো, তাহলেও এখন যে পরিমাণ কাঁদেন, তার চেয়ে বেশি কাঁদতে পারতেন না।' তিনি বললেন, 'জাহান্নام তো আমার জন্য এবং আমারই জিন-ইনসান ভাই-বন্ধুদের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। ১৪০
রবি বিন খুসাইম কখনো কখনো রাতে একদমই ঘুমাতেন না। ঘুমন্ত অবস্থায় মৃত্যুর ভয় করতেন তিনি। রাতদিন কাঁদতে থাকতেন। ১৪১
ইউসুফ বিন আসবাত-এর উদ্দেশে মুহাম্মাদ বিন সামুরা লিখিত একটি চিঠি সংরক্ষিত আছে। চিঠিটি আমাদের সামনে আল্লাহভীতির সুন্দর দৃষ্টান্ত তুলে ধরে :
'প্রিয় ভাই,
আগামীকাল ভালো হয়ে যাব—এই ধোঁকায় নিজেকে ফেলো না। এমন চিন্তাকে অন্তরে জায়গা দিয়ো না। কেননা, এটা আমলের প্রতি অনাসক্তি নিয়ে আসে—ধ্বংসকে ত্বরান্বিত করে। এটি মনের অজান্তে আশা-আকাঙ্ক্ষাকে অপূর্ণ রেখে দেয় এবং নীরবে জীবনকে নিঃশেষ করে দেয়। যদি তুমি তা করো, তবে তোমার সংকল্প ও দৃঢ়তা নড়বড়ে হয়ে যাবে। বিরক্তি বাসা বাঁধবে তোমার মাঝে। হে ভাই, তাড়াতাড়ি করো। নাহলে তোমার সাথে তাড়াহুড়ো করা হবে (অর্থাৎ তাড়াতাড়ি আখিরাতের সম্বল জোগাড় করে নাও, নাহলে সম্বলহীন অবস্থায় তোমার সময় শেষ হয়ে যাবে, যাকে তোমার কাছে খুব তাড়াতাড়ি মনে হবে)। চেষ্টা-মুজাহাদা করো। সফলতা এতেই নিহিত। ঘুম থেকে জাগ্রত হও, গাফিলতি ঝেড়ে ফেলো। বিগত সময়ে যত অপরাধ করেছ, শিথিলতা করেছ, সীমালঙ্ঘন করেছ, সবগুলোর কথা
স্মরণ করো। এতে তোমার মাঝে কৃতকর্মের ওপর লজ্জা ও অনুতাপ সৃষ্টি হবে। হে ভাই, কান্নাকাটি ও প্রভুর ধ্যানকে আবশ্যক করে নাও। মাখলুকের সাথে অপ্রয়োজনীয় সম্পর্ক ও সাক্ষাৎ ত্যাগ করো। এতেই নিহিত শান্তি ও সফলতা। আল্লাহ তাআলা আমাকে ও তোমাকে যথাযথ ও সঠিক কাজটি করার তাওফিক দান করুন। আল্লাহর তাওফিক ছাড়া আমাদের কোনো শক্তি নেই। আমাদের সর্দার মুহাম্মাদ -এর ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক।'১৪২
গাজওয়ান বলেন, 'আমার ওপর আল্লাহর হক হলো, আমি ততদিন হাসব না, যতদিন না আমি জেনে যাই, দুই আবাসস্থলের (জান্নাত ও জাহান্নাম) মধ্যে কোনটি আমার আবাস।' হাসান বলেন, 'তিনি যা বলেছেন, ঠিক তা-ই করেছেন। এরপর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তাকে কখনো হাসতে দেখা যায়নি।'১৪৩
আল্লাহভীতি একটি ভালো গুণ। অনুরূপভাবে আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসাও একটি ভালো গুণ। ঠিক এই গুণগুলো যদি মানুষের জন্য হয়, যেমন: মানুষকে ভয় পাওয়া, মানুষের জন্য কাউকে ভালোবাসা, তখন সেগুলো মন্দ।
মানুষ যখন কাউকে ভয় পায়, তখন তার সাক্ষাৎকেও ভয় পায়। বরং তার সাথে সাক্ষাৎ করাকে অপছন্দ করে। কিন্তু আল্লাহকে ভয় পাওয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি পুরোপুরি উল্টো। এ জন্যই আমরা দেখতে পাই, মানুষ যখন সৃষ্টিকর্তাকে ভয় করে, তখন তাঁর আনুগত্যে ফিরে আসে এবং তাঁর কাছেই আশ্রয় খোঁজে। বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয় এই আয়াতে :
﴿فَفِرُّوا إِلَى اللهِ ﴾
‘অতএব, আল্লাহর দিকে ধাবিত হও।’ ১৪৪
এর তাফসিরে ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ‘গুনাহ থেকে তাওবা করার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ধাবিত হও এবং তাঁর অনুগত হয়ে আমল করো।’
জাহান্নামের ভয়, আল্লাহর ভয়ে কান্না, পরম প্রতাপশালী সত্তার অধিকার আদায়ে শিথিলতার কারণে লজ্জিত হওয়া— সবই আল্লাহভীতির অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহভীতি প্রশংসনীয় হওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে, এ ভীতির পরিণাম সুখকর। এর মাধ্যমে অর্জিত হয় জান্নাত এবং নাজাত পাওয়া যায় জাহান্নাম থেকে।
নেককার ও মুত্তাকিদের কর্ম ছিল আশ্চর্যজনক। তারা আমলের ময়দানে মুজাহাদা করতেন। প্রতিটি সেকেন্ডকে
মূল্য দিতেন। এ সবের মাঝে আবার থাকত ইখলাস ও সততার সুবাস, থাকত না কৃত্রিমতা ও লৌকিকতার দুর্গন্ধ।
মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি বলেন, 'যদি প্রকৃত মুত্তাকি ব্যক্তি বিশ বছর পর্যন্ত ক্রন্দন করে, তবুও তার পাশে থাকা স্ত্রী তা টের পায় না।'
আতা সুলাইমি-কে প্রশ্ন করা হলো, 'এ পেরেশানি কীসের?' তিনি বললেন, 'ধ্বংস হও তুমি, মৃত্যু আমার ঘাড়ে, কবর আমার ঘর, কিয়ামতে আমাকে দাঁড়াতে হবে, জাহান্নামের ওপরের পুল হলো আমার রাস্তা, আমি জানি না আমার সাথে কী করা হবে—এত কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে পেরেশান না হয়ে উপায় আছে?'১৪৫
প্রিয় মুসলিম ভাই, বর্তমান সময়ে মানুষ জীবনকে খুব উপভোগ করছে। হাসি-আনন্দ ও কৌতুক-রসিকতায় তাদের দিন কাটে। এসব দেখে একটি প্রশ্ন বারবার কানে বাজে : কী সেই কারণ, যার ফলে মানুষ এত খুশি, এত আনন্দিত?
প্রশ্নটির উত্তর হাসান-এর মুখেই শোনো। তিনি বলেন, 'মুমিনের হাসির কারণ তার গাফিলতি।'১৪৬
হাসান-এর এই কথাটি তার জীবনে বাস্তবরূপে প্রতিফলিত হয়েছিল। ইউনুস-এর কথা থেকে তা-ই প্রমাণিত হয়। তিনি বলেন, 'হাসান-এর সাথে যতবারই তুমি দেখা করবে, ততবারই মনে হবে যে, তিনি কোনো বিপদে আক্রান্ত।'১৪৭
এ-ই ছিল সালাফের অবস্থা। তাদের দুনিয়া এমনই ছিল। তারা তো বিদায় নিয়েছেন, তাদের সাথে তাদের আমলসমূহও বিদায় নিয়েছে। তারা এক পথ দিয়ে চলেছিলেন—আমরা চলেছি অন্য পথে।
সালাম বিন আবু মুতি বলেন, 'এক রাতে আমি মালিক বিন দিনার-এর কাছে গেলাম। তিনি তখন চেরাগহীন একটি ঘরে অবস্থান করছিলেন এবং হাতে একটি রুটি নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছিলেন। আমি বললাম, “আবু ইয়াহইয়া, আপনার কাছে কি চেরাগ নেই? রুটি রাখার মতো কোনো পাত্র কি নেই?” তিনি বললেন, “ছাড়ো এসব বিষয়! এসবে মাথা ঘামানোর সময় কোথায়? আমি তো আমার কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত, অনুতপ্ত।”'
তাদের অবস্থা এমন হওয়ার কারণ হলো, তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী এবং মৃত্যুর পর অবশ্যই হিসাব-নিকাশ হবে। ছোট-বড় কোনো বিষয়ই হিসাব থেকে বাদ পড়বে না।
টিকাঃ
১৩৯. আল-ইহইয়া: ৪/১৬৮।
১৪০. আত-তাখওয়িফ মিনান নার: ২৫ পৃ.।
১৪১. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ১৮ পৃ.।
১৪২. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৪/২৩৮।
১৪৩. ইমাম আহমাদ রচিত আজ-জুহদ: ৩০০ পৃ.।
১৪৪. সুরা আজ-জারিয়াত, ৫১ : ৫০।
১৪৫. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/৩২৭।
১৪৬. ইমাম আহমাদ রচিত আজ-জুহদ: ৩৯৩ পৃ.।
১৪৭. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ৭০ পৃ.।
📄 ভয় ও আশা—কোনটি বেশি উত্তম?
প্রিয় মুসলিম ভাই,
ভয় ও আশার ফজিলত সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। অনেক সময় এসব দেখে কেউ কেউ দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যায় যে, এই দুইয়ের মাঝে কোনটি বেশি উত্তম।
ভয় উত্তম নাকি আশা উত্তম—এই প্রশ্নটি রুটি উত্তম নাকি পানি উত্তম টাইপের একটি প্রশ্ন।
এর উত্তর হলো, রুটি ক্ষুধার্তের জন্য উত্তম, আর পানি উত্তম তৃষ্ণার্তের জন্য। একই ব্যক্তি যদি একসাথে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত হয়, তবে দেখতে হবে, ক্ষুধা বেশি, নাকি তৃষ্ণা বেশি। যদি ক্ষুধা বেশি হয়, তবে রুটি উত্তম। আর যদি তৃষ্ণা বেশি হয়, তবে পানি উত্তম। যদি উভয়টি সমান হয়, তাহলে উত্তম হওয়ার দিক দিয়ে উভয়টিই সমান।
ভয় ও আশা এ দুটি দ্বারা অন্তরের রোগের চিকিৎসা করা হয়। তাই এ দুটির ফজিলত ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পাবে বান্দার অন্তরের রোগের প্রকোপের বিচারে। কেউ যদি আল্লাহর অসীম রহমত ও ক্ষমার দিকে তাকিয়ে প্রবঞ্চিত হয় এবং আল্লাহর আজাব থেকে নিজেকে নিরাপদ ভাবে, তবে তার জন্য ভয় উত্তম। আর যদি কারও অন্তরে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাতের ব্যাপারে নৈরাশ্যের রোগ থাকে, তবে তার জন্য আশা উত্তম। অনুরূপভাবে বান্দার মাঝে যদি গুনাহের
প্রবণতা বেশি থাকে, তাহলে তার জন্য ভয়ই উত্তম।
তবে প্রয়োজনীয়তার বিচারে সাধারণভাবে ভয়কে আশার চেয়ে উত্তম বলা যায়। যেমন, রুটি ওষুধের চেয়ে উত্তম। কারণ রুটি দিয়ে ক্ষুধা দূরীভূত হয় আর ক্ষুধার সমস্যা মানুষের সর্বদা লেগেই থাকে। পক্ষান্তরে ওষুধ কেবল অসুস্থ হলে প্রয়োজন হয়। রুটির প্রয়োজনীয়তা যেহেতু ওষুধের চেয়ে বেশি, তাই রুটি ওষুধের চেয়ে উত্তম। অনুরূপভাবে ভয় আশার চেয়ে উত্তম। কারণ মানুষের মাঝে গুনাহ ও নাফরমানির প্রবণতা বেশি—যার সমাধান হলো আল্লাহর ভয়। তাই ভয়ের প্রয়োজন যেহেতু আশার চেয়ে বেশি, তাই সাধারণভাবে ভয় আশার চেয়ে উত্তম।
তবে উৎসমূলের বিচারে ভয়ের চেয়ে আশা বেশি উত্তম। কেননা, আশার উৎসমূল হলো রবের রহমত ও মাগফিরাত; আর ভয়ের উৎসমূল হলো তাঁর ক্রোধ। ১৪৮ আর যে ব্যক্তি আল্লাহর মেহেরবানি ও দয়াবিষয়ক গুণাবলির প্রতি লক্ষ করে, তার অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। আল্লাহর ভালোবাসা হলো আল্লাহর নৈকট্যের সর্বোচ্চ স্তর। পক্ষান্তরে, ভয়ের ভিত্তি হলো ক্রোধবিষয়ক গুণাবলি। আর প্রেমের সাথে যে মিল আশার সাথে আছে, তা ভয়ের নেই। ১৪৯
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, 'আল্লাহর নাফরমান প্রত্যেকেই মূর্খ। আর প্রত্যেক আল্লাহভীরু জ্ঞানী ও আল্লাহর অনুগত। নাফরমানকে মূর্খ বলার কারণ হলো, তার আল্লাহভীতিতে কমতি আছে। যদি পূর্ণরূপে আল্লাহভীতি থাকত, তাহলে সে নাফরমানি করতে পারত না।'১৫০
শাইখ ইবনে সাদি বলেন, 'আল্লাহভীতির আলামত হলো, পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথরূপে আমল করতে চেষ্টা করা।'১৫১
ইবনুল কাইয়িম আল্লাহভীতির ফজিলত সম্পর্কে বলেন, 'ভয় আল্লাহর পথের পথিকদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনজিল এবং কলবের জন্য সর্বাধিক উপকারী। এটা সবার জন্য ফরজ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
(فَلا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ) 'সুতরাং তোমরা তাদের ভয় করো না। আর তোমরা যদি ইমানদার হয়ে থাকো, তবে আমাকে ভয় করো।'১৫২
(فَإِيَّايَ فَارْهَبُونِ) 'অতএব আমাকেই ভয় করো।'১৫৩
যাদের মাঝে ভয় আছে, তাদের প্রশংসা করে আল্লাহ বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ هُمْ مِنْ خَشْيَةِ رَبِّهِمْ مُشْفِقُونَ - وَالَّذِينَ هُمْ بِآيَاتِ رَبِّهِمْ يُؤْمِنُونَ - وَالَّذِينَ هُمْ بِرَبِّهِمْ لَا يُشْرِكُونَ - وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ - أُولَئِكَ يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَهُمْ لَهَا سَابِقُونَ
'নিশ্চয় যারা তাদের রবের ভয়ে সন্ত্রস্ত, যারা তাদের রবের নিদর্শনাবলিতে ইমান আনে, যারা তাদের রবের সাথে কাউকে শরিক করে না এবং যারা তাদের রবের নিকট প্রত্যাবর্তন করবে এই বিশ্বাসে তাদের যা দান করার তা দান করে ভীত-কম্পিত হৃদয়ে, তারাই দ্রুত সম্পাদন করে কল্যাণকর কাজ এবং তারা এতে অগ্রগামী হয়। '১৫৪
সত্যিকারের ও প্রশংসনীয় আল্লাহভীতি হলো, যা বান্দাকে হারাম থেকে বিরত রাখে। যদি আল্লাহভীতি এর চেয়ে বৃদ্ধি পায়, তাহলে তা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করে দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ১৫৫
হে প্রিয়, আমরা এতক্ষণ ধরে আল্লাহভীতির ব্যাপারে আলোচনা করে আসছি। আশা করি, এতক্ষণে নিশ্চয় আমাদের হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, অন্তরে ফিকির তৈরি হয়েছে এবং নতুনভাবে তাওবা করার সুযোগ
হয়েছে। সামনে আমরা আশা সম্পর্কে আলোচনা করব। আশা আল্লাহর রহমতের অন্যতম প্রবেশদ্বার এবং তা অনেক ক্ষেত্রে পাপের পথ থেকে তাওবা করে পুণ্যের পথে ফিরে আসার কারণ হয়।
সুফইয়ান সাওরি -এর অসুস্থতা বেড়ে গেলে তিনি খুব অস্থির ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন। তখন তার কাছে মারহুম ইবনে আব্দুল আজিজ প্রবেশ করলেন। তিনি বললেন, 'হে আবু আব্দুল্লাহ, অত অস্থির হচ্ছেন কেন? আপনি তো সেই রবের কাছেই যাচ্ছেন, ষাট বছর যাবৎ আপনি যাঁর ইবাদত করেছেন। যাঁর জন্য আপনি রোজা রেখেছেন, সালাত পড়েছেন, হজ করেছেন... তাঁর কাছেই তো যাচ্ছেন। এত ঘাবড়ে যাওয়ার কী আছে...?' তার কথায় সুফইয়ান সাওরি -এর অস্থিরতা ও ভয় কেটে গেল।১৫৬
আল্লাহর রহমতের প্রশস্ততা অনুধাবন করে সুফইয়ান সাওরি বলেন, 'আমি চাই না যে, (কিয়ামতের দিন) আমার হিসাব নেওয়ার দায়িত্ব আমার পিতামাতার হাতে দেওয়া হোক। কেননা, আমি জানি যে, আল্লাহ তাআলা আমার প্রতি পিতামাতার চেয়ে বেশি দয়ালু।'
আবু উবাইদা খাওয়াস কেঁদে কেঁদে বলতেন, 'আমি বুড়ো হয়ে গেছি, সুতরাং (তেমন আমল করতে না পারলেও) আমাকে জাহান্নام থেকে মুক্তি দান করুন।'১৫৭
তিনি বান্দাদের প্রতি আল্লাহর দয়া ও করুণার কথা জানতেন বলেই তাঁর কাছে এমন আবদার করতে পেরেছেন।
টিকাঃ
১৪৮. আর আল্লাহর রহমত তাঁর ক্রোধের ওপর প্রাধান্য পায়। (অনুবাদক)
১৪৯. আল-ইহইয়া: ৪/১৭৩।
১৫০. আল-ইমান: ১৯ পৃ.।
১৫১. তাইসিরুল কারিমির রহমান: ২/১৮৫।
১৫২. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৭৫।
১৫৩. সুরা আন-নাহল, ১৬: ৫১।
১৫৪. সুরা আল-মুমিনুন, ২৩: ৫৭-৬১।
১৫৫. মাদারিজুস সালিকিন: ১/৫৪৮।
১৫৬. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ৮/৪৭।
১৫৭. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ২১ পৃ.।