📘 আল্লাহর ভয় নির্মল জীবনের পাথেয় > 📄 দুনিয়াতে আল্লাহভীতির ফলাফল

📄 দুনিয়াতে আল্লাহভীতির ফলাফল


যারা আল্লাহকে ভয় করে, দুনিয়াতেও তারা অনেক পুরস্কারে ভূষিত হবে।
আমির বিন কাইস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ সকল বস্তুর মনে তার প্রতি ভয় ঢুকিয়ে দেন। আর যে আল্লাহকে ভয় করে না, আল্লাহ তার মনে সকল বস্তুর ভয় ঢুকিয়ে দেন।’
আপনি সমাজে চোখ বুলিয়ে দেখুন না-আল্লাহভীরু বান্দারাই সমাজের আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হন এবং সবাই তাদের কথাই মান্য করে। মানুষের মনে তাদের প্রতি ভয় ও সমীহ থাকে। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর নাফরমানি করে এবং তাঁর বিধিনিষেধের প্রতি উদাসীনতা প্রদর্শন করে, তারা মানুষের দৃষ্টিতে অবজ্ঞার পাত্রে পরিণত হয়। লজ্জা ও লাঞ্ছনার জালে তারা বন্দী হয়ে পড়ে।

টিকাঃ
৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৬/৯৮।
৬. সহিহুল বুখারি: ৪৬২১, সহিহু মুসলিম: ৯০১।

📘 আল্লাহর ভয় নির্মল জীবনের পাথেয় > 📄 এ ভয় সে ভয় নয়

📄 এ ভয় সে ভয় নয়


কেউ কেউ আল্লাহকে ভয় করার ভয়কে সাধারণ ভয়ের সাথে মিলিয়ে ফেলে। তারা মনে করে, হিংস্র প্রাণী ও অত্যাচারীর প্রতি মানুষের মনে যে ভয় থাকে, আল্লাহভীতির ভয়ও ঠিক তা-ই। তাদের ধারণা অবাস্তব। যে ভয় সত্যিকারের মুমিনদের হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি করে, তা হচ্ছে আল্লাহর শান্তির ভয় ও তাঁর অনুগ্রহ ও ক্ষমার আকাঙ্ক্ষা। প্রকৃত আল্লাহভীরু হওয়ার জন্য এই ভয়ই থাকতে হবে অন্তরে。
উমর বিন আব্দুল আজিজ বলতেন, 'হে আল্লাহ, আপনি যদি জেনে থাকেন, আমি কিয়ামত দিবস ব্যতীত অন্য কিছুকে ভয় পাই, তাহলে আমার সে ভয়কে গ্রহণ করবেন না।'
ইয়াজিদ বিন হাওশাব বলেন, 'আমি হাসান ও উমর বিন আব্দুল আজিজ -এর মতো ভীত কোনো মানুষ দেখিনি। তাদের ভয় দেখে মনে হয়, জাহান্নাম বুঝি শুধু এই দুজনের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে।'
আব্দুর রহমান বিন হারিস বিন হিশাম বলেন, 'আব্দুল্লাহ বিন হানজালা অসুস্থ হয়ে পড়লে আমি তাকে দেখতে গেলাম। সেখানে তার সামনে এক লোক তিলাওয়াত করলেন:
لَهُمْ مِنْ جَهَنَّمَ مِهَادٌ وَمِنْ فَوْقِهِمْ غَوَاشِ
"তাদের জন্য নরকাগ্নির শয্যা রয়েছে এবং ওপর থেকে চাদর।"৮
শুনে তিনি এতটাই কাঁদলেন, আমার মনে হলো কাঁদতে কাঁদতে বুঝি তার প্রাণটাই বের হয়ে যাবে। অতঃপর তিনি বললেন, “তারা জাহান্নামের বিভিন্ন স্তরে উপনীত হবে।” এই বলে তিনি দুই পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে গেলেন। একজন বললেন, “হে আবু আব্দুর রহমান, বসে যান।” তিনি বললেন, “জাহান্নামের স্মরণ আমাকে বসতে দিচ্ছে না। আমি জানি না, আমিও তাদের একজন হব কি না।”
এই যে ভয় তাদের ছিল, এটাই প্রশংসিত ভয়। এ ভয় মানুষকে ইবাদত, আমল, দৃঢ়তা ও তাওবার দিকে ধাবিত করে। এটিই প্রকৃত ভয়।
সাইয়িদুনা উমর বিন খাত্তাব রাঃ একবার হুজাইফা রাঃ-কে প্রশ্ন করেন, 'তোমাকে আল্লাহর দোহাই দিচ্ছি, রাসুলুল্লাহ সাঃ কি মুনাফিকের তালিকায় আমার নাম বলেছেন?' হুজাইফা রাঃ বললেন, 'না। আপনার পরে আর কারও ব্যাপারে আমি (নিফাক থেকে) পবিত্রতার ঘোষণা দেবো না।'৯
সুবহানাল্লাহ! যিনি এই ভয় পাচ্ছেন, তিনি হলেন আমিরুল মুমিনিন, হক-বাতিলের পার্থক্য নিরূপণকারী, দ্বিতীয় খলিফা ও জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবির অন্যতম সাইয়িদুনা উমর বিন খাত্তাব রাঃ।
তাঁর ভয়ের মাত্রা এত বেশি ছিল যে, তিনি নিজের আংটির ওপর খোদাই করে লিখেছিলেন, 'হে উমর, মৃত্যুই উপদেশের জন্য যথেষ্ট।'১০

টিকাঃ
৭. তারিখুল খুলাফা: ২২৪ পৃ.।
৮. সুরা আল-আরাফ, ৭: ৪১।
৯. আল-জাওয়াবুল কাফি: ৭৯ পৃ.।
১০. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ৭/১৪৭।

📘 আল্লাহর ভয় নির্মল জীবনের পাথেয় > 📄 সকল অনিষ্টের মূল

📄 সকল অনিষ্টের মূল


প্রিয় মুসলিম ভাই আমার, দীর্ঘ আশা ও প্রবৃত্তির দাসত্ব সকল অনিষ্টের মূল। প্রবৃত্তি মানুষকে হক থেকে দূরে রাখে এবং দীর্ঘ আশা মানুষকে আখিরাতের কথা ভুলিয়ে দেয় এবং পরকালের প্রস্তুতিতে ব্যাহত করে।”
ফুজাইল বিন ইয়াজ বলেন, 'যদি তোমাকে প্রশ্ন করা হয়, তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো?-তখন তুমি চুপ থেকো। কেননা, যদি “হ্যাঁ” বলো, তবে তুমি মিথ্যাবাদী। আর যদি “না” বলো, তবে তুমি কাফির। ১২
কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এই প্রশ্নের উত্তরে “হ্যাঁ” বলে; অথচ তারা সগিরা-কবিরা সব ধরনের গুনাহে লিপ্ত!
কোথায় হারিয়ে গেল আল্লাহভীতি!?
আখিরাত, কিয়ামত, হাশর ও মিজান নিয়ে চিন্তা-ফিকিরই বা কোথায়!?
প্রিয় ভাই আমার,
আবু সুলাইমান দারানি-এর মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হলে তার ছাত্ররা তাকে বললেন, 'সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আপনি মহা ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু রবের দরবারে যাচ্ছেন।' তখন
তিনি তাদের বললেন, 'বরং এভাবে বলো, “আপনি সেই রবের দরবারে যাচ্ছেন, যিনি সকল ছোট গুনাহের হিসাব নেবেন এবং বড় গুনাহের জন্য শাস্তি দেবেন।”
আল্লাহ তাআলা যথার্থই বলেছেন: فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ - وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ 'অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে। এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও দেখতে পাবে। ১৩
শুধু গুনাহকে ভয় পেলে চলবে না। অকল্যাণকর মৃত্যু ও পুনরুত্থানের ব্যাপারেও ভয় পেতে হবে।
আব্দুর রহমান বিন মাহদি বলেন, 'একবার সুফইয়ান আমার কাছে রাত্রি যাপন করলেন। যন্ত্রণা বেড়ে গেলে তিনি কান্না শুরু করলেন। তখন তাকে এক লোক বললেন, “আপনি মনে হয় অধিক গুনাহের ভয়ে কাঁদছেন।” তখন তিনি মাটি থেকে কিছু একটা উঠিয়ে নিয়ে বললেন, “আল্লাহর কসম, আমার গুনাহ আমার কাছে এই বস্তুর চেয়েও তুচ্ছ। আমি ভয় পাচ্ছি মৃত্যুর পূর্বে ইমান চলে যাওয়ার।”১৪
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
(يَخَافُونَ يَوْمًا تَتَقَلَّبُ فِيهِ الْقُلُوبُ وَالْأَبْصَارُ)
'তারা ভয় করে সেই দিনকে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে। ১৫
আমাদের সালাফগণ আফসোস ও লজ্জার এই কিয়ামতের দিনকে খুব বেশি ভয় পেতেন। যেদিনের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে :
(يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَى وَمَا هُمْ بِسُكَارَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدُ)
'যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যধাত্রী তার দুধের শিশুকে বিস্মৃত হবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করবে এবং মানুষকে তুমি দেখবে মাতাল; অথচ তারা মাতাল নয়। বস্তুত, আল্লাহর আজাব সুকঠিন।' ১৬
হাসান বলেন, 'সেই দিনটির ব্যাপারে তোমার কী ধারণা, যেদিন মানুষ পঞ্চাশ হাজার বছর পরিমাণ সময়
ধরে পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে? সেদিন তারা না পাবে কিছু খেতে, না পাবে পান করতে। এমনকি যখন তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে যাবে এবং ক্ষুধার জ্বালায় পেটে জ্বলন সৃষ্টি হবে, তখন তাদেরকে (অপরাধীদেরকে) নিয়ে যাওয়া হবে জাহান্নামে; তারপর পান করানো হবে জাহান্নামের ফুটন্ত নহরের ভীষণ গরম পানি। ১৭
উহাইব বিন ওয়ারদ বলেন, 'আল্লাহভীতি হলো কোনো ঘরে অবস্থানরত একজন মানুষের মতো, যে ঘরটি তার মালিক যতদিন থাকে, ততদিন টিকে থাকে; আর যখনই মালিক সে ঘর ছেড়ে অন্য ঘরে অবস্থান করতে শুরু করে, তখন এই ঘরটি ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহভীতিও ঠিক তা-ই। যতক্ষণ কোনো শরীরে আল্লাহভীতি থাকে, ততক্ষণ শরীরটি ভালো থাকে। আর যখনই সেই শরীর থেকে আল্লাহভীতি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখনই তা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সে যখন মানুষের আসরে গমন করে, তখন মানুষ বলে, “লোকটি কত খারাপ!” কেউ যদি প্রশ্ন করে, “তাকে খারাপ বলার কী কারণ?” তখন তারা বলে, “কোনো কারণ দেখছি না, তবে কেন যেন লোকটাকে ভীষণ অপছন্দ হচ্ছে আমাদের!” এটা তার ভেতর থেকে আল্লাহভীতি চলে যাওয়ার কারণে হয়েছে।
আর যখন তাদের মাঝে এমন কোনো মানুষ আসে, যার ভেতর আল্লাহভীতি আছে, তখন তারা বলে, “লোকটি কত ভালো!” কেউ যদি বলে, "তার মাঝে এমন কী গুণ তোমরা দেখতে পেলে?” তখন তারা বলে, "তেমন কোনো গুণ দেখছি না, তবে কেন যেন লোকটার প্রতি আমাদের মনে ভীষণ ভালোবাসা জন্মেছে।””১৮
ইবনে উমর-এর নিকট এক ভিক্ষুক আসলো। তিনি তার ছেলেকে বললেন, 'একে এক দিনার দাও।' সে চলে যাওয়ার পর ছেলে বললেন, 'আল্লাহ আপনার এই দান কবুল করুন।' তখন তিনি বললেন, 'যদি আমি জানতে পারতাম যে, আল্লাহ তাআলা আমার একটি সিজদা বা এক দিরহাম সদাকা কবুল করে নিয়েছেন, তবে মৃত্যুই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি পছন্দনীয় হবে। কেননা, আল্লাহ তাআলা কেবল তাকওয়াবানদের আমলই কবول করে থাকেন।'
وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ )
'এবং যারা যা দান করবার, তা ভীত ও কম্পিত হৃদয়ে এ কারণে দান করে যে, তারা তাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তন করবে।'১৯
এই আয়াতের তাফসিরে হাসান বলেন, 'তারা নেক আমল যা করার সবই করেছেন; তবুও এ ভয়ে ভীত যে, এই আমল হয়তো তাদেরকে আল্লাহর আজাব থেকে নিষ্কৃতি দিতে পারবে না।'২০
এই যথার্থ ও উন্নত বোধের কারনেই হয়তো তিনি সব সময় চিন্তামগ্ন থাকতেন। ইউনুস বিন উবাইদুল্লাহ বলেন, 'আমি হাসান-এর চেয়ে অধিক ভাবুক কাউকে দেখিনি। তিনি বলতেন, “আমরা হেসে চলেছি; অথচ এমনও হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলা আমাদের আমলসমূহ দেখে ঘোষণা দিয়েছেন—আমি তোমাদের কোনো আমল কবুল করব না।”
আল্লাহভীতি ধ্বংস ও পদস্খলন থেকে বাঁচার রক্ষাকবচ। ফুজাইল বলেন, 'যার ভেতর আল্লাহভীতি আছে, সেই আল্লাহভীতি তাকে সকল ভালো কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে।'২১

টিকাঃ
১১. আল-ফাওয়ায়িদ: ১৩০ পৃ.।
১২. তাজকিয়াতুন নুফুস: ১১৭ পৃ.।
১৩. সুরা আল-জিলজাল, ৯৯: ৭-৮।
১৪. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/১৫০।
১৫. সুরা আন-নুর, ২৪ : ৩৭।
১৬. সুরা আল-হাজ, ২২ : ২।
১৭. আল-ইহইয়া: ৪/৫০০।
১৮. ইবনে রজব রচিত আত-তাখওয়িফ মিনান নার: ৫ পৃ.।
১৯. সুরা আল-মুমিনুন, ২৩: ৬০।
২০. আজ-জুহদ: ৪২০ পৃ.।
২১. আল-ইহইয়া: ৪/১৭০।

📘 আল্লাহর ভয় নির্মল জীবনের পাথেয় > 📄 যে পরিমাণ আল্লাহভীতি থাকা ওয়াজিব

📄 যে পরিমাণ আল্লাহভীতি থাকা ওয়াজিব


যে পরিমাণ আল্লাহভীতি ফরজসমূহ আদায় করতে এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকতে উদ্বুদ্ধ করে, সে পরিমাণ আল্লাহভীতি সবার মাঝে থাকা ওয়াজিব। এর অতিরিক্ত ভয় যা নফল আদায় করতে এবং সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম মাকরুহ থেকে বেঁচে থাকতে উদ্বুদ্ধ করে এবং অপ্রয়োজনীয় মুবাহ কাজ করতে অনুৎসাহিত করে, তা উত্তম ও প্রশংসিত। যদি এর চেয়েও বেশি আল্লাহভীতি থাকে, যার কারণে মানুষ রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে বা মৃত্যুর দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়, অথবা এমন চিন্তিত হয়ে পড়ে যে, প্রয়োজনীয় জীবনোপকরণ অর্জন করা থেকেও সে বিরত থাকে—এমন আল্লাহভীতি থাকা ভালো নয়। শরিয়ত এই বাড়াবাড়িকে অপছন্দ করে। ২২
ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'আমি শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া -কে বলতে শুনেছি, “প্রশংসিত আল্লাহভীতি হলো, যা হারামে লিপ্ত হতে বাধা দেয়।”২৩
একদা তাউস জনৈক মাথাবিক্রেতার পাশ দিয়ে গেলেন। মাথাবিক্রেতা বাইরে মাথা বের করে রেখেছিল। তা দেখে তিনি মূর্ছা গেলেন। আর কোনোদিন তিনি ভুনা মাথা দেখতে পেলে সেদিন রাতে খাবার খেতেন না। ২৪
সুফইয়ান বিন উয়াইনা বলেন, 'আল্লাহ তাআলা বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহ করে জাহান্নام সৃষ্টি করেছেন; যেন এর মাধ্যমে তিনি বান্দাদের ভয় দেখাতে পারেন; যাতে তারা নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকতে পারে।'
যাদের মাঝে আল্লাহভীতি আছে, তারাই প্রকৃত দ্বীনদার, মুত্তাকি ও দুনিয়াবিমুখ।
কেননা, আল্লাহভীতি যাদের স্বভাবে পরিণত হয় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে মিশে যায়, তাদের কাছ থেকেই সৎকর্ম ও নেক আমল প্রকাশ পায়। এরাই প্রকৃত আল্লাহভীরু বান্দা, যাদের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে ইবনে আব্বাস বলেছিলেন, 'ভয় নিয়ে যাদের হৃদয় আনন্দিত, চক্ষু যাদের অশ্রুসিক্ত; যারা বলে, “আমরা কীভাবে আনন্দিত হতে পারি; অথচ মৃত্যু আমাদের পেছনে, কবর আমাদের সামনে, কিয়ামত আমাদের প্রতিশ্রুত গন্তব্য, আমাদের রাস্তা হবে জাহান্নামের ওপর দিয়ে এবং আমাদের দাঁড়াতে হবে আল্লাহর সামনে!?”২৫
প্রকৃত আল্লাহভীতি হলো, গোপন ও নির্জন মুহূর্তেও আল্লাহকে ভয় করা। যখন কোনো চোখ তোমাকে দেখতে পায় না, কোনো কান তোমাকে শুনতে পায় না, তখনও যদি তুমি আল্লাহকে ভয় পাও, তবেই তুমি প্রকৃত আল্লাহভীরু।
আনাস-এর মুখে এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা শোনো। তিনি বলেন, 'একদিন উমর বিন খাত্তাব বের হলেন। তাঁর সাথে আমিও বের হলাম। একটি প্রাচীরবেষ্টিত বাগানে তিনি প্রবেশ করলেন। আমি দেয়ালের এপাশে আর তিনি ওপাশে। শুনলাম তিনি নিজেকে বলছেন, "আমিরুল মুমিনিন উমর বিন খাত্তাব, একটা কথা ভালোভাবে জেনে নাও। আল্লাহর কসম, হয়তো তুমি আল্লাহকে ভয় করবে, নতুবা তিনি তোমাকে আজাব দেবেন।”২৬
একদিন মুআজ খুব কাঁদলেন। তাঁকে বলা হলো, 'আপনি এত কাঁদলেন কেন?' তিনি বললেন, 'কারণ, আল্লাহ তাআলা সকল মানুষকে দুই দলে বিভক্ত করবেন। একদলকে জান্নাতে রাখবেন, আরেক দলকে নিক্ষেপ করবেন জাহান্নামে। আর আমি জানি না, আমি কোন দলে থাকব!'২৭
মুসা বিন মাসউদ বলেন, 'আমরা যখন সাওরি-এর মজলিশে বসতাম, তখন তার ভয় ও অস্থিরতা দেখে মনে হতো, জাহান্নাম বুঝি আমাদের বেষ্টন করে রেখেছে।'২৮
হাসান বসরি ﷽ বলেন, 'এক ব্যক্তি হাজার বছর পর জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। হায়, আমি যদি অন্তত সেই মানুষটি হতাম!'২৯
প্রিয় ভাই, এরাই হলেন মুহাম্মাদ ﷺ-এর উম্মতের আলোকবর্তিকা। সুতরাং তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করো।
শাকিক বিন ইবরাহিম ﷽ বলেন, 'বান্দার জন্য চিন্তা ও ভয়ের চেয়ে উত্তম কোনো বন্ধু হতে পারে না। চিন্তা বলতে স্বীয় গুনাহের চিন্তা আর ভয় বলতে শেষ ঠিকানা, কোথায় হবে তার ভয়।'
আমির বিন কাইস ﷽ বলেন, 'দুনিয়াতে যে বেশি পেরেশান ও চিন্তাগ্রস্ত, আখিরাতে সে-ই সর্বাধিক আনন্দিত হবে। দুনিয়াতে যে বেশি কাঁদে, সে-ই আখিরাতে সবচেয়ে বেশি হাসবে। দুনিয়াতে যে সবচেয়ে বেশি চিন্তা-ফিকির করে, কিয়ামতের দিন তার ইমানই সবচেয়ে নিরেট সাব্যস্ত হবে।'
মুসলিম ভাই আমার, ভয় ও আশা—এ দুই স্তরের মাঝামাঝি থাকা চাই। অর্থাৎ আল্লাহর ভয় এবং তাঁর রহমতের আশা।
ফুজাইল বিন ইয়াজ ﷽ বলেন, 'যতদিন জীবিত থাকবে, ততদিন আল্লাহর চেয়ে বেশি আর কাউকে ভয় করবে না।
আর যখন মৃত্যুবরণ করবে, তখন আল্লাহ ব্যতীত আর কারও কাছে আশা করবে না।'৩০
সালিহ বিন আহমাদ বিন হাম্বল বলেন, 'আমার পিতার জন্য কেউ দুআ করলে তিনি বলতেন, “সকল আমল তার শেষ অবস্থার ওপর নির্ভরশীল।”৩১
প্রিয় ভাই আমার, বান্দা দুই অবস্থায় আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হয়। এক. নামাজ পড়ার সময়। দুই. আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের সময়। সুতরাং যে প্রথম অবস্থার হক যথাযথরূপে আদায় করবে, তার জন্য দ্বিতীয় অবস্থা সহজ হবে। আর যে প্রথম অবস্থার হক যথাযথ আদায় করবে না, দ্বিতীয় অবস্থা তার জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
(وَمِنَ اللَّيْلِ فَاسْجُدْ لَهُ وَسَبِّحْهُ لَيْلًا طَوِيلًا - إِنَّ هَؤُلَاءِ يُحِبُّونَ الْعَاجِلَةَ وَيَذَرُونَ وَرَاءَهُمْ يَوْمًا ثَقِيلًا )
'রাত্রির কিছু অংশে তাঁর উদ্দেশ্যে সিজদা করুন এবং রাত্রির দীর্ঘ সময় তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করুন। নিশ্চয় এরা পার্থিব জীবনকে ভালোবাসে এবং এক কঠিন দিবসকে পশ্চাতে ফেলে রাখে। '৩২
শুমাইত বিন আজলান তার প্রায় ওয়াজে বলতেন, 'মুমিন মনে মনে বলে, “এখানে তিনটি দিন আছে। গতকাল— যা তুমি অতিবাহিত করে এসেছ। আগামীকাল—যা তুমি নাও পেতে পারো। চলমান দিন—যা করার তোমাকে এই দিনেই করতে হবে। আগামীকালের আশা করে বসে থাকা যাবে না। আগামীকালের রিজিক নিয়ে চিন্তাও করতে হবে না। তোমাকে যদি আগামীকাল বাঁচিয়ে রাখা হয়, তবে তোমার আগামীকালের রিজিকের ব্যবস্থা আল্লাহ অবশ্যই করবেন। আগামীকালের আগে যে এক রাত আর এক দিন আছে, এই সময়ে অনেকেই মারা যাবে। তুমিও তাদের একজন হবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।'
শুধু আজকের দিনের চিন্তাই তোমার জন্য যথেষ্ট। যদি তুমি তোমার দুর্বল অন্তরের ওপর অনাগত বছর ও যুগসমূহের চিন্তার ভার তুলে দাও, মূল্যবৃদ্ধি ও মূল্যহ্রাসের চিন্তা ঢুকিয়ে দাও, শীত আসার পূর্বে শীতের চিন্তা এবং গ্রীষ্মকাল আসার পূর্বে গরমের চিন্তার ভার তুলে দাও, তবে তোমার দুর্বল অন্তর আখিরাতের জন্য কিছু সঞ্চয় করার সময় কোথায় পাবে?
এসব করে তুমি কখন জান্নাত তলব করবে? জাহান্নাম থেকে পলায়ন করবেই বা কখন? প্রতিদিন একটু একটু করে তোমার জীবন শেষ হয়ে যায়; কিন্তু এ নিয়ে তোমার কোনো চিন্তাই নেই! তোমার জন্য যতটুকু যথেষ্ট, তা তোমাকে দান করা হয়েছে; কিন্তু তুমি তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে আরও বেশি অর্জন করার জন্য উঠে পড়ে লাগলে,
যা তোমাকে একসময় পথভ্রষ্ট করে ছাড়বে। তুমি অল্পতে সন্তুষ্ট নও আর বেশিতে পরিতৃপ্ত নও—এই তোমার অবস্থা।
এসব দেখে আমার ভীষণ আশ্চর্য হয়। একজন মানুষ অনন্ত জীবন আখিরাতকে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও কীভাবে প্রতারণাময় পার্থিব জীবনের জন্য হাড়ভাঙা মেহনত করতে পারে!? আমার কাছে বিষয়টা ভারি অদ্ভুত লাগে।
প্রিয় ভাই আমার, সালাফের পথ ছেড়ে কোথায় আমরা!?
আবু মুসহির বলেন, 'আমি সাইদ বিন আব্দুল আজিজ -কে কোনোদিন হাসতে দেখিনি। মুচকি হাসতেও দেখিনি কখনো। আর তিনি কখনো কোনো বিষয়ের অভিযোগ করেননি।'
হাসান -এর জনৈক শাগরিদ বলেন, 'আমরা হাসান -এর মজলিশে বসতাম। সেখানে জাহান্নام, কিয়ামত, আখিরাত, মৃত্যু এসবের আলোচনা ছাড়া আর কিছুই থাকত না।'
হাজ্জাজ একবার সাইদ বিন জুবাইর -কে খুব আশ্চর্য হয়ে বললেন, 'আমি শুনেছি, আপনি নাকি কখনো হাসেননি!' তিনি বললেন, 'কীভাবে হাসব; অথচ জাহান্নাম তেতে আছে আর শিকল নিয়ে তার প্রহরীরা প্রস্তুত!?'
একদা হাসান খুব করে কাঁদলেন। কান্নার কারণ জানতে চাওয়া হলে তিনি বললেন, 'আমি ভয় করছি, আগামীকাল আমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।'৩৪
হায়, আমরা যারা গল্পগুজবে সময় নষ্ট করি, হাসি-ঠাট্টায় অবধারিত পরিণতি সম্পর্কে বেখবর হয়ে থাকি, তারা আসলাফের আদর্শ থেকে আজ কত দূরে!
প্রিয় ভাই আমার,
ইবনে আওন বলেন, 'নিজের অধিক আমলের ওপর ভরসা কোরো না। কেননা তুমি জানো না, তা কবুল হয়েছে কি না। আর গুনাহের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থেকো না। কেননা তুমি জানো না, তা ক্ষমা করা হয়েছে কি না। তোমার ভালো-মন্দ সকল আমলের অবস্থা তোমার অজানা।'৩৫
হাসান বলেন, 'আমি এমন কিছু মানুষকে দেখেছি, যারা পৃথিবীসম মাল সদাকা করলেও গুনাহের শাস্তি থেকে নিজেদের নিরাপদ মনে করতেন না।'৩৬
মূর্খ লোকেরা আল্লাহর ক্ষমা, মেহেরবানি ও দয়ার ওপর ভরসা করে থাকে। ফলে তারা আল্লাহর বিধিনিষেধের ধার ধারে না। তারা ভুলে যায় যে, আল্লাহ দয়াবান হওয়ার পাশাপাশি কঠিন শাস্তিদাতাও বটে।
যারা আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা করে গুনাহের ওপর অটল থাকে, আল্লাহর নাফরমানদের মাঝে তাদের তেমন কোনো পার্থক্য নেই।
মারুফ বলেন, 'তুমি যার কথা মানো না, তার নিকট দয়ার আশা করা চরম বোকামি।'
জনৈক আলিম বলেন, 'মাত্র তিন দিরহাম চুরি করার অপরাধে যিনি তোমার হাত কর্তন করার শাস্তি দিয়েছেন, আখিরাতে তিনি এমন লঘু শাস্তিই দেবেন—এমনটি ভেবে নির্ভর থেকো না।'
সালাফের পথ ও আদর্শ থেকে আমরা কতটা দূরে সরে এসেছি, তা তাদের মজলিশের আলোচনার বিষয়বস্তু এবং আমাদের আসরের বিষয়বস্তু দেখলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মুসা বিন মাসউদ বলেন, 'আমরা যখন সাওরি -এর মজলিশে বসতাম, তখন তার ভয় ও অস্থিরতা দেখে মনে হতো, জাহান্নাম বুঝি আমাদের বেষ্টন করে রেখেছে।'৩৯
সুফইয়ান যখন আখিরাতের আলোচনা করতেন, তখন রক্ত-প্রস্রাব করতেন!
বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত আছে, জুরারাহ বিন আওফা লোকদের নিয়ে সকালে নামাজ পড়ছিলেন। যখন তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন : ﴿فَإِذَا نُقِرَ فِي النَّاقُورِ﴾ ‘যেদিন শিঙায় ফুঁক দেওয়া হবে।’ ৪০
তখন তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। অতঃপর এই অবস্থাতেই তার মৃত্যু হয়। ৪১
প্রিয় ভাই, সালাফের পথ ছেড়ে কোথায় আমরা!?
কাঁদতে কাঁদতে বুদাইল বিন মাইসারা -এর চোখে ঘা হয়ে যায়। এই কারণে তাকে কেউ তিরস্কার করলে তিনি বলতেন, 'কিয়ামতের দিন দীর্ঘ তৃষ্ণার ভয়ে আমি কাঁদতে থাকি।' ৪২
উমর বিন খাত্তাব-এর অবস্থা দেখো। তিনি ভয় ও আশার মাঝামাঝি থাকতেন। তিনি বলতেন, 'যদি আসমান থেকে কোনো ঘোষণাকারী বলেন, “হে লোকেরা, কেবল একজন ব্যতীত তোমাদের সবাই জান্নাতে প্রবেশ করবে”-আমি তখন ওই একজন হওয়ার ভয় করি। আর যদি ঘোষণা করেন, “হে লোকেরা, তোমাদের মধ্য থেকে একজন ব্যতীত বাকি সবাই জাহান্নামে প্রবেশ করবে”-আমি ওই একজন হওয়ার আশা রাখি। '৪৩
উরওয়া বলেন, 'প্রতিদিন সকালে আমি সর্বপ্রথম আয়িশা -কে সালাম করতে যেতাম। একদিন গিয়ে দেখলাম, তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে এই আয়াতটি পড়ে যাচ্ছেন : فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقَانَا عَذَابَ السَّمُومِ
“অতঃপর আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করেছেন। "৪৪
তিনি আয়াতটি বারবার পড়ছেন আর কেঁদে কেঁদে দুআ করছেন। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। পরে বিরক্ত হয়ে বাজারে চলে গেলাম। বাজার থেকে ফিরে দেখলাম, তিনি সেই আগের মতো নামাজে দাঁড়িয়ে আছেন আর অনবরত কান্নাকাটি করে চলেছেন। '৪৫
ইবরাহিম তাইমি বলেন, 'আমাদের মসজিদে আমি আব্দুল্লাহ -এর ষাটজন শিষ্যকে পেয়েছি। তাদের সর্বকনিষ্ঠ হলেন হারিস বিন সুওয়াইদ। একদিন তাকে সুরা জিলজাল পড়তে শুনলাম। পড়তে পড়তে তিনি এই আয়াত পর্যন্ত আসলেন :
فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ
“অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে।”৪৬
তখন তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। অতঃপর বললেন, “এই যে সকল সৎকর্ম ও মন্দকর্ম একত্রিত করার কথা এই সুরায় বলা হয়েছে, তা খুব ভীতিকর।”৪৭
প্রিয় মুসলিম ভাই, সৃষ্টির পর থেকে আজ অবধি মানুষ সফরে আছে। জান্নাত অথবা জাহান্নামে প্রবেশ করার আগে এই সফর থামবে না। বুদ্ধিমান বুঝে নেয়, সফরে কষ্ট ও ঝুঁকি থাকবেই। আর সফরে আরাম-আয়েশ ও স্বাদ-উপভোগ খোঁজা স্বভাবত অসম্ভব। এসব পাওয়া যাবে সফরের শেষে। এ কথাও স্বতঃসিদ্ধ যে, সফরের প্রতিটি পদক্ষেপ ও প্রতিটি মুহূর্ত চলমান, স্থির নয়। আর মুসাফির যখন সফর করে, তখন পাথেয় সংগ্রহে রাখা তার জন্য
আবশ্যক। মুসাফিরের কোনো বিরতি নেই, নেই কোনো বিশ্রাম ও ঘুম। শুধু যে পরিমাণ বিশ্রাম ও ঘুম সফরের শক্তি অর্জনের জন্য প্রয়োজন, ততটুকুই সে বিশ্রাম নেবে এবং ঘুমাবে।৪৮
জুনাইদ বলেন, 'আমার বয়স যখন সাত বছর, একদিন আমি আস-সারি আস-সাকাতি -এর সামনে খেলা করছিলাম। তখন সেখানে লোকজন “শোকর” সম্পর্কে আলোচনা করছিল। আস-সারি আস-সাকাতি আমাকে বললেন, “বেটা, তুমি কি জানো শোকর কী?” আমি বললাম, “আল্লাহর নিয়ামতের মাধ্যমে তাঁর নাফরমানি না করা।”৪৯
প্রিয় ভাই, সালাফের একনিষ্ঠতা ও আল্লাহভীতির আরেকটি নমুনা নিয়ে চিন্তা করো।
ইউনুস বিন উবাইদ বলেন, 'আমরা মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি -কে তার মৃত্যুশয্যায় দেখতে গেলাম। তিনি বললেন, "আমার হাত-পা ধরে যখন জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, তখন আমার ব্যাপারে মানুষ কী বলে, তা কোনো কাজে আসবে না আমার।”৫০
ইউনুস বিন উবাইদ-এর ব্যাপারে কথিত আছে যে, তিনি (ফরজ ব্যতীত অতিরিক্ত) তেমন বেশি নামাজ-রোজা আদায় করতেন না; কিন্তু আল্লাহর যেকোনো হক সামনে আসলে তিনি তার জন্য পূর্ণ প্রস্তুত থাকতেন।৫১
একবার উমর বিন আব্দুল আজিজ-এর দৃষ্টি পড়ল বিবর্ণ চেহারার এক ব্যক্তির প্রতি। তাকে তিনি বললেন, 'তোমাকে বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন?' লোকটি উত্তর দিলেন, 'অসুখের কারণে, হে আমিরুল মুমিনিন।' উমর প্রশ্নটি আরও তিনবার করলেন। লোকটিও একই উত্তর তিনবার দিলেন। অতঃপর উমর বললেন, 'তুমি চাইলে আমি তোমাকে একটি কথা বলি, “আমি দুনিয়ার মিষ্টতা অনুভব করেছি। ফলে আমার চোখে দুনিয়ার চাকচিক্য ও আনন্দ- উপভোগ তুচ্ছ হয়ে পড়েছে। এখানের স্বর্ণ ও পাথর আমার কাছে একসমান। আমি দেখতে পেয়েছি, মানুষ জান্নাতের দিকে যাচ্ছে; কিন্তু আমি ধরেছি জাহান্নামের পথ। তাই আমি রাতে নির্ঘুম থেকে ইবাদত করেছি। দিনের বেলায় তৃষ্ণা ও উপবাসে থেকেছি (রোজা রেখেছি)। তবুও আল্লাহর ক্ষমা ও শান্তির সামনে এসব খুবই তুচ্ছ ও নগণ্য।”৫২
প্রিয় মুসলিম ভাই আমার, বান্দার প্রতিটি অঙ্গে আল্লাহর একটি নির্দেশ ও একটি নিষেধ রয়েছে। অনুরূপভাবে প্রতিটি
অঙ্গে রয়েছে একটি নিয়ামত ও উপকারিতা। সুতরাং বান্দা যখন কোনো অঙ্গে আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়ন করে এবং নিষেধ থেকে বিরত থাকে, তখন ওই অঙ্গের নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় হয়ে যায়। ফলে সে ওই অঙ্গের উপকারিতা সম্পূর্ণরূপে উপভোগ করতে সক্ষম হয়। আর যদি সে ওই অঙ্গে আল্লাহর বিধিনিষেধের পরোয়া না করে, তবে আল্লাহ তাআলা সেই অঙ্গের উপকারিতা অকার্যকর করে দেন। ফলে সেটা তার জন্য ব্যথা ও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সময়ের প্রতিটি অংশে আল্লাহর প্রতি বান্দার দায়িত্ব রয়েছে, যা পালন করার মাধ্যমে সে আল্লাহর দিকে এগিয়ে যায়, তাঁর নিকটবর্তী হয়। সুতরাং বান্দা যদি তার সময়কে দায়িত্ব পালনে ব্যয় করে, তাহলে সে আল্লাহর দিকে এগোয়। আর যদি সময়কে প্রবৃত্তির অনুগমন ও হেলায় কাটিয়ে দেয়, তাহলে সে আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরে যায়। এভাবে বান্দা প্রতিটি মুহূর্তে হয়তো আল্লাহর দিকে অগ্রসর হয় অথবা পিছিয়ে পড়ে। মাঝখানে স্থির থাকে না কখনো। আল্লাহ বলেন :
﴿لِمَنْ شَاءَ مِنْكُمْ أَنْ يَتَقَدَّمَ أَوْ يَتَأَخَّرَ)
'তোমাদের মধ্যে যে চায় অগ্রসর হতে অথবা পিছিয়ে থাকতে, তার জন্য।'৫৩-৫৪
বর্তমানে মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতির কোনো স্থান নেই। বরং তুচ্ছ দুনিয়া ও মিথ্যা আশার ছলনায় তারা প্রবঞ্চিত। ফলে তাদের মনে রহমত ও জান্নাতের আকাঙ্ক্ষা নেই, নেই আল্লাহর ক্রোধ ও জাহান্নামের ভয়ও।
প্রিয় ভাই আমার, সালাফের পথ ছেড়ে কোথায় আমরা!?
ইবনে আবি মুলাইকা বলেন, 'রাসুল-এর ৩০ জন সাহাবিকে আমি পেয়েছি। তাঁদের প্রত্যেকে নিজের ব্যাপারে নিফাকের (মুনাফিক হওয়ার) ভয় করতেন।’৫৫
হাসান-কে প্রশ্ন করা হলো, 'আপনি কি নিজের ব্যাপারে নিফাকের আশঙ্কা করেন?' তিনি বললেন, 'যেখানে উমর -এর মতো ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে নিফাকের আশঙ্কা করেছেন, সেখানে আমি কী করে নিরাপদ বোধ করতে পারি?'৫৬
মালিক বিন দিনার মাঝেমধ্যে সারা রাত দাঁড়িয়ে থেকে দাড়িতে হাত বুলাতেন আর বলতেন, 'হে আমার রব, আপনিই জানেন, কে জান্নাতের অধিবাসী আর কে জাহান্নামের। জানি না, এ দুই আবাসের মধ্যে কোনটি মালিকের ঠিকানা?'৫৭
জনৈক সালাফ রাতদিন কাঁদতে থাকতেন। তার কাছে এর কারণ জানতে চাওয়া হলে তিনি বলতেন, 'আমি ভয় পাই যে, আল্লাহ তাআলা আমাকে গুনাহের ওপর দেখে বলবেন, “দূর হ আমার কাছ থেকে! আমি তোর প্রতি খুবই অসন্তুষ্ট।"'৫৮
আমানত রক্ষা করা, হকসমূহ আদায় করে দেওয়া, জুলুম থেকে দূরে থাকা ইত্যাদি গুণাবলি মুমিনদের মাঝে আল্লাহভীতি থাকার লক্ষণ। একদা উমর বিন খাত্তাব মক্কা অভিমুখে সফর করছিলেন। পথিমধ্যে তাঁর মাঝে তন্দ্রাভাব আসলে তিনি বিশ্রামের জন্য যাত্রাবিরতি করলেন। তখন তাঁর নিকট পাহাড় থেকে একজন রাখাল বের হয়ে এলেন। তিনি রাখালকে বললেন, 'ছাগলের এই পাল থেকে আমাকে একটি ছাগল বিক্রি করো।' রাখাল বললেন, 'আমি রাখালমাত্র, ছাগলপালের মালিক অন্য কেউ।' উমর বললেন, 'একটা ছাগল আমাকে বিক্রি করো আর তোমার মালিককে বোলো, "তা বাঘে খেয়ে ফেলেছে।” রাখাল বললেন, 'কিন্তু আল্লাহকে কী জবাব দেবো?' এ কথা শুনে উমর কেঁদে ওঠেন। তারপর তিনি তার মালিকের কাছে গেলেন এবং তাকে কিনে আজাদ করে দিলেন। আর বললেন, 'তোমার এই কথা দুনিয়াতে তোমাকে মুক্ত করেছে। আশা করছি, আখিরাতেও তা তোমার মুক্তির কারণ হবে।'
আমাদের বর্তমান সমাজে অন্যের হক মেরে খাওয়া এবং ওজনে কম দেওয়া প্রভৃতি যেসব মারাত্মক ব্যাধি প্রসার লাভ করেছে, তা লোকদের মাঝে আল্লাহভীতি ও তাঁর অস্তিত্বের অনুভব না থাকার কারণে হয়েছে। নাহলে, কিয়ামতের দিন ছোট-বড় সকল গুনাহের ব্যাপারে হিসাব নেওয়ার কথা জানা সত্ত্বেও কেউ তার জন্য প্রস্তুতি না নিয়ে কী করে থাকে?’
হাসান বলেন, ‘কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তিকে আটকে রেখে বলবে, “তোমার ও আমার মাঝে বোঝাপড়া বাকি আছে।” আটক ব্যক্তি বলবে, “আমি তো তোমাকে চিনিও না।” সে বলবে, “তুমি আমার দেয়াল থেকে আমার অনুমতি ছাড়া মাটি নিয়েছিলে।” এভাবে আরেকজন এসে বলবে, “তুমি আমার কাপড় থেকে সুতা নিয়েছিলে।” এভাবে সকল পাওনাদার একের পর এক আসতে থাকবে। এ ধরনের বর্ণনা আল্লাহভীরুদের অন্তরকে ভীত ও প্রকম্পিত করে তোলে।’৫৯
প্রিয় মুসলিম ভাই, সফর তবেই শেষ হয়, যদি মুসাফির দৃঢ়পদে পথচলা অব্যাহত রাখে। মুসাফির যদি রাস্তা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে এবং সারা রাত ঘুমিয়ে কাটায়, তবে সে তার গন্তব্যে কীভাবে পৌঁছুবে?৬০
সুফইয়ান সাওরি বলেন, 'আমি এক ব্যক্তিকে দেখলাম, তিনি কাবার পর্দা আঁকড়ে ধরে আছেন আর বলছেন, “হে আল্লাহ, আমাকে নিরাপদ রাখুন।” আমি তাকে বললাম, "কী হলো আপনার? আপনি কীসের ভয়ে এমন করছেন?" তিনি বললেন, “আমরা ছিলাম চার ভাই। আল্লাহর প্রতি ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে তাদের একজন খ্রিষ্টান, একজন ইহুদি, আরেকজন অগ্নিপূজক হয়ে গেছে। আল্লাহর ভয় ও তাঁর শাস্তি থেকে নিরাপদ থাকার আশায় আমিই কেবল ইসলামের ওপর অটল আছি।”৬১
উসমান বিন আবু দাহরাস ফজরের সময় জাগ্রত হয়ে বলতেন, 'এখন আমি মানুষের সাথে চলাফেরা করব। জানি না, মানুষের সাথে চলাফেরা করতে গিয়ে নিজের ওপর কী কী অবিচার করে বসি। '৬২
হাকিম আবুল কাসিম বলেন, 'যে ব্যক্তি কোনো বস্তুকে ভয় করে, সে ওই বস্তু থেকে পালিয়ে বেড়ায়। কিন্তু আল্লাহকে যে ভয় করে, সে তাঁর নিকটবর্তী হয়। '৬৩
আবু আব্দুল্লাহ আহমাদ বিন হাম্বল -কে বলা হলো, 'আপনার জন্য কত মানুষ যে দুআ করে!' এ কথা শুনে
তার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। আর বললেন, 'আমি ভয় পাই যে, এ সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসবে।'৬৪
প্রিয় মুসলিম ভাই, সর্বাধিক প্রবঞ্চিত ব্যক্তি হলো সে, যে দুনিয়া ও তার নগদ ফলাফল নিয়ে প্রবঞ্চিত। ফলে সে দুনিয়াকে আখিরাতের ওপর প্রাধান্য দেয় এবং আখিরাতকে ছেড়ে দুনিয়াকে নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে। এমনকি এ ধরনের কেউ কেউ বলে বসে, 'দুনিয়া নগদ, আখিরাত বাকি; আর বাকির চেয়ে নগদ ভালো।' আর কেউ কেউ বলে, 'নগদ বালিকণা বাকি মুক্তার চেয়ে উত্তম।'
আবার কেউ কেউ বলে, 'দুনিয়ার স্বাদ-উপভোগ সুনিশ্চিত; আখিরাতের স্বাদ-উপভোেগ সংশয়পূর্ণ। তাই আমি সংশয়পূর্ণ বিষয়ের আশায় সুনিশ্চিত বিষয় ছাড়তে রাজি নই।'
এ সবই শয়তানের কুমন্ত্রণা ও সূক্ষ্ম হামলা। অবুঝ জন্তুরা এসব লোকের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান। কেননা অবুঝ জন্তু কোনো বস্তুর দ্বারা ক্ষতির আশঙ্কা করলে তার ধারেকাছে যায় না। কিন্তু এসব লোক নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। ধ্বংসের প্রতি বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মাঝামাঝি অবস্থান করা সত্ত্বেও।
এ ধরনের মানুষ যদি আল্লাহ, রাসুল, আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ ও প্রতিদানের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা মানুষ হয়,
তবে কিয়ামতের দিন তার আফসোস ও আক্ষেপ সবার চেয়ে বেশি এবং দীর্ঘ হবে। আর যদি অবিশ্বাসী হয়, তার ব্যাপারে কী আর বলব?৬৫
প্রিয় ভাই আমার, কখনো কি ভেবে দেখেছ, আগামীকাল মানুষ যখন দুই ঘরের (জান্নাত ও জাহান্নাম) কোনো একটিতে স্থানান্তরিত হবে, তখন তোমার স্থান কোন ঘরে হবে? এ বিষয়ের জন্য তুমি কি যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছ, যেমনটি দুনিয়াবি বিষয়ে আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে রাখো!?
ইবরাহিম তাইমি বলেন, 'যতবার আমি কাজের আগে কথা বলেছি, প্রতিবারেই এই আশঙ্কা করেছি যে, এই কথায় আমি মিথ্যুক সাব্যস্ত হব।'৬৬
গাজালি ভয়ের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, 'ভয় আসক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয় এবং স্বাদ-উপভোগকে রসহীন করে তোলে। ফলে যার মাঝে ভয় আছে, তার কাছে পছন্দনীয় গুনাহসমূহ অপছন্দনীয় হয়ে ওঠে। যেভাবে মধুপ্রেমী ব্যক্তির কাছে মধু অপছন্দনীয় হয়ে ওঠে, যখন সে জানতে পারে যে, মধুতে বিষ মেশানো আছে। তখন সে ভয় ও আশঙ্কায় নিজের চাহিদাকে জলাঞ্জলি দেয়। যার মাঝে ভয় আছে, তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুশীল ও ভদ্র হয়। অন্তর বিনম্র ও স্থির থাকে। অহংকার ও হিংসা-বিদ্বেষ তার মাঝে
থাকে না। ভয়ের কারণে সে সর্বদা চিন্তিত থাকে। পরিণাম সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে। ফলে সময়ের প্রতি অংশকে সে আল্লাহর ধ্যান, আত্মপর্যালোচনা এবং আখিরাতের জন্য চেষ্টা-মেহনতে ব্যয় করে। '৬৭
উমর বিন আব্দুল আজিজ-এর সহধর্মিনী ফাতিমা বিনতে আব্দুল্লাহ বিন মারওয়ান বলেন, 'উমরের চেয়ে অধিক সালাত ও সওম আদায়কারী মানুষ থাকতে পারে; কিন্তু আল্লাহকে উমরের চেয়ে বেশি ভয় পায়, এমন মানুষ আমি দেখিনি। ইশার নামাজ আদায় করার পর তিনি মসজিদে বসে যেতেন। অতঃপর রবের দরবারে দুহাত তুলে একনাগাড়ে রোনাজারি করতে থাকতেন, যতক্ষণ না ঘুম তাঁর ওপর বিজয়ী হয়। কিছুক্ষণ ঘুমানোর পর আবার উঠে যেতেন। আবার সেই আগের মতো দুহাত তুলে কাঁদতে থাকতেন, যতক্ষণ না ঘুম চোখদুটিকে বন্ধ করে দেয়।'৬৮
এটি সে ভয়, যা মানুষকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে এবং পাপাচার থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
জনৈক দার্শনিক বলেন, 'চিন্তা খানা থেকে বিরত রাখে আর ভয় গুনাহ থেকে বিরত রাখে। আকাঙ্ক্ষা ইবাদতে শক্তি জোগায় আর মৃত্যুর স্মরণ অহেতুক কাজ থেকে বিমুখ করে রাখে।'৬৯
যদি আল্লাহভীতি আল্লাহর রহমত থেকে নৈরাশ্যের কারণ হয়, সে আল্লাহভীতি আমাদের উদ্দিষ্ট নয়। কেননা,
إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ)
'নিশ্চয় আল্লাহর রহমত থেকে কাফির সম্প্রদায় ব্যতীত অন্য কেউ নিরাশ হয় না।'৭০
জগতের সকল কিছুর ওপর ছেয়ে আছে আল্লাহর রহমত। তিনি পরম করুণাময়, মহান ক্ষমাশীল। মহা দানশীল, মেহেরবান। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁকে ভয় করতে হয়। আখিরাতে গুনাহগার ও অপরাধীদের জন্য যে শাস্তি প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে, তাকে ভয় পেতে হয়। যেন এ ভয় তাকে পাপাচার ও পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত হওয়া থেকে বাঁচায়। সাথে সাথে আল্লাহর রহমত এবং মুত্তাকি মুমিনদের জন্য তিনি যেসব সাওয়াব ও নিয়ামত প্রস্তুত করে রেখেছেন, তার প্রতি আশাও থাকতে হবে।
বর্তমান যুগে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে গাফিলতির রোগ। দুনিয়ার চাকচিক্যে মজে গিয়ে আখিরাতের অনন্ত জীবনের জন্য আমল না করার রোগ। এই রোগের চিকিৎসা হলো, মৃত্যুর স্মরণ, আখিরাতের স্মরণ; জান্নাত ও জাহান্নামের মুরাকাবা।
খেলাধুলা, হাসি-আনন্দ ও হেলায়-ফেলায় কেটে যায় আমাদের জীবন। আমাদের সালাফগণের জীবনও কি এভাবেই অতিবাহিত হতো? গাফিলতি ও শিথিলতায় তারাও কি ঠিক আমাদের মতোই ছিলেন?
ইবরাহিম বিন ইসা বলেন, 'আমি হাসান -এর মতো অধিক চিন্তাগ্রস্ত আর কাউকে দেখিনি। যতবারই আমি তাকে দেখেছি, মনে হয়েছে তিনি কিছুক্ষণের মধ্যেই বিপদের সম্মুখীন হতে চলেছেন। '৭১
আতা সুলাইমি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে আলা বিন মুহাম্মাদ আলি তাকে দেখতে গেলেন। তিনি আতা সুলাইমির স্ত্রী উম্মে জাফর -কে বললেন, 'আতার হঠাৎ সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ার কারণ কী?' তিনি বললেন, 'আমি উনুনে আগুন জ্বালালাম। তা দেখেই তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেছেন। '৭২
প্রিয় ভাই আমার, তাদের আদর্শ থেকে আমরা আজ কত দূরে!?
সুলাইমান দারানি বলেন, 'হাসান বিন সালিহ -এর মাঝে যে রকম ভয় আমি দেখেছি, তা আর কারোর মধ্যে দেখিনি। একরাতে কিয়ামুল লাইলে তিনি সুরা নাবা
তিলাওয়াত করলেন। তিলাওয়াত শেষ হতেই তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে গেলেন। ফজর পর্যন্ত এভাবেই তিনি পড়ে ছিলেন। ৭৩
إِذَا مَا اللَّيْلُ أَظْلَمُ كَابَدُوهُ فَيُسْفِرُ عَنْهُمْ وَهُمْ رُكُوعُ أَطَارَ الْخَوْفُ نَوْمَهُمْ فَقَامُوا وَأَهْلُ الْأَمْنِ فِي الدُّنْيَا هُجُوعُ
‘রাত যখন আবৃত হয় আঁধারের চাদরে, ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা আমলের সংগ্রামে। রুকু অবস্থায় তাদের সামনে উদ্ভাসিত হয় সুবহে সাদিক। আল্লাহর ভয় কেড়ে নেয় তাদের ঘুম; তাই তারা দাঁড়িয়ে যায় ইবাদতে—যখন দুনিয়াবাসী থাকে নিদ্রামগ্ন। ৭৪
হে মিথ্যা আশায় প্রবঞ্চিত, ইবলিস একসময় সম্মানের অধিকারী ছিল। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশিত একটি সিজদা না করার কারণে আল্লাহ তাআলা তাকে সম্মানের আসন থেকে নামিয়ে দিয়েছেন। অভিশাপ দিয়েছেন তাকে। আল্লাহর নির্দেশের বিপরীত এক লোকমা খাবার খাওয়ার অপরাধে আদম -কে তিনি জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছেন। অবৈধ পাত্রে আঙুলের অগ্রভাগ পরিমাণ যৌনাঙ্গ ঢুকানোর
অপরাধে জিনাকারীকে বীভৎস পদ্ধতিতে হত্যার আদেশ দিয়েছেন। অপবাদের একটি বাক্য উচ্চারণ করা কিংবা এক ফোঁটা মদ পান করার অপরাধে পিঠের ওপর কঠিন বেত্রাঘাতের বিধান প্রণয়ন করেছেন। মাত্র তিন দিরহাম চুরি করার অপরাধে শরীরের মূল্যবান একটি অঙ্গ কেটে ফেলা তাঁর নির্দেশ।
সুতরাং তোমার গুনাহের কারণে তিনি তোমাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন না—এমনটি মনে করে নির্ভার থাকার কোনো সুযোগ নেই।
وَلَا يَخَافُ عُقْبَاهَا
‘আল্লাহ তাআলা এই ধ্বংসের কোনো বিরূপ পরিণতির আশঙ্কা করেন না।’ ৭৬
একটি বিড়ালকে কষ্ট দেওয়ার কারণে এক মহিলা জাহান্নামি হয়েছে। আর মানুষ অনেক সময় এমন কথা
বলে ফেলে, যাকে সে তেমন গুরুতর মনে করে না; কিন্তু সেই কথা তাকে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করে—যার ব্যাপ্তি পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যবর্তী বিস্তারসম। আবার কোনো ব্যক্তি ষাট বছর আল্লাহর ইবাদতে করে। যখন তার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়, তখন অসিয়ত করার ক্ষেত্রে জুলুম করে বসে। ফলে খারাপ আমল নিয়ে তার মৃত্যু হয়। জাহান্নাম হয় তার ঠিকানা। কারণ, জীবন ও আমলের ভালো-মন্দ তার সর্বশেষ অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ৭৭
এ জন্যই সুফইয়ান প্রায় সময় কেঁদে কেঁদে বলতেন, 'আমি মৃত্যুর সময় ইমান হারিয়ে ফেলার ভয় করি।' ৭৮
সালাফগণ দুনিয়াকে কেবল আখিরাতের রাস্তা হিসেবে নিতেন। দুনিয়ার সকল বিষয়ের সামনে তারা আখিরাতকে কল্পনা করতেন। এখানকার কোথাও দাঁড়ালে তারা কিয়ামতের দিবসে দাঁড়ানোর কথা ভাবতেন। এই বোধ ও মানসিকতাই তো হৃদয়ের জীবন।
রাবিয়া বিনতে ইসমাইল বলেন, 'আমি যখনই আজান শুনি, তখনই কিয়ামতের ঘোষকের কথা আমার মনে পড়ে যায়। যখনই শিলাবৃষ্টি দেখি, তখনই আমলনামা ওড়ার কথা আমার স্মরণে আসে। আর পঙ্গপাল দেখলে আমার ভাবনায় হাশরের কথা চলে আসে।'
যাদের হৃদয় মজবুত ও নিষ্কলুষ ইমানের ধারক, তাদের হৃৎপিণ্ডের প্রতিটি স্পন্দনে আল্লাহভীতির ঔজ্জ্বল্য ফুটে ওঠে। প্রতি সেকেন্ডে তারা মৃত্যুর কথা স্মরণ করে। কিয়ামত দিবসের কথা স্মরণ করে। একটি দিন অতিবাহিত হলে তারা বিশ্বাস করে, হিসাব ও শাস্তির দিন একধাপ কাছে চলে এসেছে।
খালিদ বিন খিদাশ বলেন, ‘একবার আব্দুল্লাহ বিন ওয়াহাব-কে তারই রচিত বই (أهوال يوم القيامة) “কিয়ামতের ভয়াবহতা” পড়ে শোনানো হলো। তখন তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলেন। এরপর একটি কথাও তিনি বলেননি। এভাবে কয়েক দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তিনি মারা গেলেন। আল্লাহ তার ওপর রহম করুন।’৭৯
প্রিয় মুসলিম ভাই,
আল্লাহভীতি যতটা শক্তিশালী হয়, আল্লাহর ধ্যান, আত্মপর্যালোচনা ও আমলের মেহনত ততটা শক্তিশালী হয়। আল্লাহভীতিই অন্তরে এসবের তাড়না সৃষ্টি করে। আর আল্লাহভীতি ততটা শক্তিশালী হয়, যতটা আল্লাহর পরিচয়, তাঁর গুণ ও কর্মের পরিচয় এবং নিজের দোষত্রুটি ও সেসবের ভয়াবহ পরিণামের অনুভব অন্তরে শক্তিশালী হয়। আল্লাহভীতির সর্বনিম্ন স্তর হলো আমলে তার ছাপ
পরিলক্ষিত হওয়া এবং হারাম ও নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বিরত থাকা। এই স্তরের নাম (الورع) ‘পরহেজগারি’।
আল্লাহভীতি যদি এই স্তরের চেয়ে আরেকটু শক্তিশালী হয়, তখন বান্দা হারামের দিকে নিয়ে যায় এমন সন্দেহপূর্ণ বিষয়াদিও বর্জন করে। এই স্তরের নাম তাকওয়া। তাকওয়া সংশয়যুক্ত বিষয় থেকে বিরত রাখে এবং সংশয়মুক্ত বিষয়ের পথে ধাবিত করে। আল্লাহভীতি এর চেয়ে আরও একটু উন্নত হলে তা বান্দাকে এমন সব মুবাহ বিষয় থেকেও বিরত রাখে, যাতে সাধারণত কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু ক্ষতি হতে পারে এমন আশঙ্কা আছে। এটিকে বলে (الصدق في التقوى) ‘তাকওয়ায় সত্যবাদিতা।’ সুতরাং কেউ যদি নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর দাসত্বে নিয়োজিত করে, সে এমন কোনো ঘর নির্মাণ করে না, যেটি তার বসবাসের কাজে আসবে না; এমন কোনো খাবার জমা করে না, যা সে খাবে না; দুনিয়ার প্রতি তাকায় না, কারণ দুনিয়াকে একসময় ছাড়তে হবে এবং জীবনের একটি ক্ষণও আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও জন্য ব্যয় করে না—এটিই হলো ‘তাকওয়ায় সত্যবাদিতা।’ যার মাঝে এই গুণ আছে, তাকে বলা হয় ‘সিদ্দিক।’ ‘তাকওয়ায় সত্যবাদিতা’র মধ্যে ‘তাকওয়া’ আছে। (الورع) ‘পরহেজগারি’ তাকওয়ার অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপভাবে পরহেজগারির মধ্যে ‘ইফফাত’ তথা নিষ্কলুষতাও অন্তর্ভুক্ত। কেননা, ‘ইফফাত’ বলা হয়, বিশেষভাবে কুপ্রবৃত্তির আসক্তি ও চাহিদা থেকে বিরত থাকা।
আল্লাহভীতি প্রথমে ভালো কাজের উৎসাহ ও মন্দ কাজ থেকে বাধা প্রদানের মাধ্যমে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর প্রভাব সৃষ্টি করে। এর প্রাথমিক পর্যায় শুরু হয় কুপ্রবৃত্তির আসক্তি দমনের মাধ্যমে। তাকে বলা হয় 'ইফফাত' বা নিষ্কলুষতা। এর ওপরের পর্যায়ের নাম হলো (الورع) বা 'পরহেজগারি'। এটি শুধু কুপ্রবৃত্তির আসক্তি থেকে বাধা দেয় তা নয়; বরং সকল প্রকার নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বিরত রাখে। এর ওপরের স্তর হলো 'তাকওয়া'। কেননা, তা নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে দূরে রাখার পাশাপাশি সংশয়পূর্ণ বিষয়াদি থেকেও বিরত রাখে। যাদের মাঝে পূর্ণরূপে তাকওয়া বিদ্যমান, তাকওয়ায় যারা সত্যবাদী, তাদেরকে 'সিদ্দিক' ও 'মুকাররাব' তথা আল্লাহর একান্ত নৈকট্যশীল অভিধায় অভিহিত করা যায়। ৮০
ইয়াহইয়া বিন ফজল বলেন, 'আমি এক ব্যক্তিকে মুহাম্মাদ বিন মুনকাদির-এর ব্যাপারে আলোচনা করতে শুনলাম যে, এক রাতে তিনি নামাজ পড়ছিলেন। একপর্যায়ে তিনি এত অধিক হারে কাঁদতে লাগলেন যে, তার পরিবারের লোকেরা ভীত হয়ে উঠল। তারা জিজ্ঞেস করল, “আপনার কান্নার কারণ কী?” তিনি কোনো প্রত্যুত্তর না করে একনাগাড়ে কাঁদতে থাকলেন। তখন তারা আবু হাজিম-এর নিকট লোক পাঠিয়ে এ ব্যাপারে অবহিত করল। আবু হাজিম তার কাছে আসলেন। তখনও তিনি
একনাগাড়ে কেঁদে চলেছেন। আবু হাজিম বললেন, “ভাই, আপনি কেন এত কাঁদছেন? আপনার পরিবারের লোকেরা তো আপনার কান্না দেখে ভীত হয়ে পড়েছে!” তখন তিনি বললেন, “আমি কিরাআত পড়তে পড়তে আল্লাহর কিতাবের একটি আয়াত পর্যন্ত আসলাম।” তিনি জানতে চাইলেন, “কোন আয়াত?” বললেন :
وَبَدَا لَهُمْ مِنَ اللَّهِ مَا لَمْ يَكُونُوا يَحْتَسِبُونَ “তাদের জন্য আল্লাহর নিকট থেকে এমন কিছু প্রকাশিত হবে, যা তারা কল্পনাও করেনি।”৮১
বর্ণনাকারী বলেন, 'তখন আবু হাজিম -ও কান্না জুড়ে দিলেন। তীব্র হয়ে উঠল তাদের দুজনের ক্রন্দন। তা দেখে পরিবারের এক লোক আবু হাজিম -কে বললেন, “আপনাকে আমরা এনেছিলাম কান্না থামাতে; কিন্তু আপনি তো কান্না আরও বাড়িয়ে দিলেন!”
বর্ণনাকারী বলেন, 'অতঃপর তিনি তাদের কান্নার কারণ বলে দিলেন পরিবারের লোকদেরকে। '৮২
وما شاب رأسي عن سنين تتابعت على ولكن شيبتني الوقائع
'বয়স বেড়ে যাওয়ার কারণে আমার চুলে পাকন ধরেনি, কিয়ামতের কঠিন অবস্থার বিবরণই আমার চুল সাদা করে ফেলেছে। ১৮৩
হাসসান বিন আবু সিনান -এর অসুস্থতার সময় কেউ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'কেমন আছেন?' তিনি উত্তর দিলেন, 'ভালো, যদি জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাই।'৮৪
মুতাররিফ বিন আব্দুল্লাহ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি নসিহত করেছেন। স্বচ্ছ মুক্তোদানার মতো অমূল্য এই নসিহত। তিনি বলেন, 'তোমরা নেক আমল করতে থাকো। যদি আল্লাহ তাআলা আমাদের আশা অনুযায়ী আমাদের প্রতি রহম করেন, আমাদের ক্ষমা করেন, তাহলে আমল আমাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করবে। আর যদি এর উল্টো হয়— যেমনটা হওয়ার আমরা ভয় করি, তাহলে আমাদেরকে বলতে হবে না, “হে আমাদের রব, আমাদেরকে পুনরায় দুনিয়াতে ফেরত পাঠান। আমরা সৎকাজ করব। পূর্বে যা করতাম, তা করব না।” বরং আমাদের বলতে হবে, “আমরা আমল করেছি; কিন্তু সে আমল আমাদের কোনো উপকার করেনি।”৮৫
قد كنت ميتا فصرت حيا *** وعن قليل تصير ميتا بنيت بدار الفناء بيتا *** فابن لدار البقاء بيتا
'তুমি মৃত ছিলে। এখন তুমি জীবিত; কিন্তু অচিরেই তুমি আবার মৃত হয়ে যাবে। নশ্বর দুনিয়াতে থাকার জন্য তুমি একটি বাড়ি নির্মাণ করেছ। এবার অবিনশ্বর আখিরাতের জন্য একটি বাড়ি নির্মাণ করো।'৮৬
তাদের হৃদয়সমূহ আল্লাহর ইবাদতে আবাদ ছিল। চক্ষুগুলো ছিল ভয় ও আশায় অশ্রুসজল। আল্লাহর রহমতের আশা এবং আজাবের ভয়ে তাদের বিগলিত অশ্রুধারাই তাদের জান্নাতের পথকে সুগম করেছিল।
আবু সুলাইমান দারানি বলেন, 'যে অন্তর থেকে আল্লাহভীতি বিদায় নেয়, সে অন্তর বরবাদ হয়ে যায়।'৮৭
সুতরাং হে প্রিয় ভাই, তোমার অন্তরের সাথে আবু সুলাইমান দারানি-এর এই কথাকে মিলিয়ে দেখো। দেখো, তোমার অন্তরে আল্লাহভীতি কতটুকু আছে।
ভাই আমার, সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়, আখিরাতে কামিয়াব হতে চায়, সে যেন তার অন্তরকে সব সময় লক্ষ্য অর্জনের
পথে অবিচল রাখে; জিহ্বাকে বেহুদা কথাবার্তা থেকে বিরত রাখে—আল্লাহর জিকির ও ইমান-জাগানিয়া আলোচনায় ব্যাপৃত থাকে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং প্রবৃত্তির আনুগত্য থেকে নিজেকে বিরত রাখে। ওয়াজিব ও মুসতাহাব আমলগুলো মনোযোগ সহকারে আদায় করে। আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের আগ পর্যন্ত এইভাবে জীবনযাপন করে।৮৮
একবার সাইয়িদুনা আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা কাঁদলেন। তাঁর কান্না দেখে তাঁর স্ত্রীও কাঁদলেন। তিনি স্ত্রীকে বললেন, 'তুমি কাঁদছ কেন?' তিনি বললেন, 'আপনাকে কাঁদতে দেখেছি; তাই আমিও কাঁদছি।' তিনি বললেন, 'আমাকে জানানো হয়েছে যে, আমি আখিরাতে পরীক্ষার সম্মুখীন হব; কিন্তু সফল হতে পারব কি না, সে ব্যাপারে আমাকে জানানো হয়নি।'৮৯
তাইমি বলেন, 'মৃত্যু ও আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভয় আমার অন্তর থেকে দুনিয়ার হাসি-আনন্দ কেড়ে নিয়েছে।'৯০
কথিত আছে, 'আবু উবাইদা খাওয়াস চল্লিশ বছর পর্যন্ত না হেসে ছিলেন। এবং আল্লাহর প্রতি লজ্জাবশত চল্লিশ বছর পর্যন্ত আসমানের দিকে মুখ তুলে তাকাননি।'

টিকাঃ
২২. আত-তাখওয়িফ মিনান-নার: ৩৩ পৃ.।
২৩. মাদারিজুস সালিকিন: ১/৫১৪।
২৪. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৪/৪, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ৯/২৭২।
২৫. আল-ইহইয়া: ৪/১৯৪।
২৬. মুহাসাবাতুন নাফস: ৩১ পৃ., ইমাম আহমাদ রচিত আজ-জুহদ: ১৭১ পৃ.।
২৭. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ২১ পৃ.।
২৮. আল-ইহইয়া: ৪/১৮১।
২৯. আল-ইহইয়া: ৪/১৮১।
৩০. আল-আকিবাহ: ১৪৬ পৃ.।
৩১. আস-সিয়ার: ১১/২২৬।
৩২. সুরা আল-ইনসান, ৭৬ : ২৭-২৮।
৩৩. আল-আকিবাহ : ৩৯ পৃ.।
৩৪. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/২৩৩।
৩৫. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ২১১ পৃ.।
৩৬. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ২১১ পৃ.।
৩৭. সর্বনিম্ন কতটুকু পরিমাণের সম্পদ চুরি করলে হাত কাটা হবে, এ নিয়ে ইমামদের মাঝে ইখতিলাফ রয়েছে। ইমাম আবু হানিফা -এর মতে, সর্বনিম্ন দশ দিরহাম সমমূল্যের জিনিসপত্র চুরি করলে চোরের হাত কাটা হবে। আর বর্তমানে দশ দিরহামে দুই ভরি সাত মাশা তথা আড়াই তোলা র একটু বেশি রুপা হয়। আধুনিক পরিমাপে হয় ৩০.৬১৮ গ্রাম রুপা। উল্লেখ্য, এ শাস্তি প্রয়োগের দায়িত্ব ইসলামি ভূখণ্ডের রাষ্ট্রপ্রধানের; সাধারণ মানুষের এ অধিকার নেই যে, চুরির অপরাধে অন্যের হাত কেটে দেবে। (সূত্র: ইসলামি জীবনব্যবস্থা)
৩৮. আল-জাওয়াবুল কাফি: ২৬ পৃ.।
৩৯. আল-ইহইয়া: ৪/১৮১।
৪০. সুরা আল-মুদ্দাসসির, ৭৪: ৮।
৪১. আল-ইহইয়া: ১৬৯ পৃ., আস-সিয়ার: ৪/৫১৬।
৪২. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/২৬৫।
৪৩. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১/৩৫।
৪৪. সুরা আত-তুর, ৫২: ২৭।
৪৫. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/২২৯।
৪৬. সুরা আল-জিলজাল, ৯৯ : ৭।
৪৭. হিলইয়াতুল আওলিয়া : ৪/১২৭।
৪৮. আল-ফাওয়ায়িদ: ২৪৫ পৃ.।
৪৯. আস-সিয়ার: ১৪/৬৮।
৫০. মুহাসাবাতুন নাফস: ৫১ পৃ.।
৫১. আস-সিয়ার: ৬/২৯১।
৫২. আত-তাখওয়িফ মিনান-নার: ৪৪ পৃ.।
৫৩. সুরা আল-মুদ্দাসসির, ৭৪: ৩৭।
৫৪. আল-ফাওয়ায়িদ: ২৪৯ পৃ.।
৫৫. আল-জাওয়াবুল কাফি: ৭৯ পৃ.।
৫৬. তাজকিরাতুল হুফফাজ: ২/৪৫১।
৫৭. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ৭০০ পৃ.।
৫৮. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ৯১ পৃ.।
৫৯. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ৬৯ পৃ.।
৬০. আল-ফাওয়ায়িদ: ১৩১ পৃ.।
৬১. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ৩৪ পৃ.।
৬২. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/২১৮।
৬৩. তাজকিয়াতুন নুফুস: ১১৭ পৃ.।
৬৪. আল-ওয়ারা': ১৫২ পৃ.।
৬৫. আল-জাওয়াবুল কাফি: ৩৬ পৃ.।
৬৬. আল-জাওয়াবুল কাফি: ৭৯ পৃ.।
৬৭. আল-ইহইয়া: ৪/১৬।
৬৮. তাজকিরাতুল হুফফাজ: ১/১২০।
৬৯. তাম্বিহুল গাফিলিন: ২/৪১৯।
৭০. সূরা ইউসুফ, ১২:৮৭।
৭১. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/২৩৩।
৭২. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/৩২২।
৭৩. তাজকিরাতুল হুফফাজ: ১/২১৬।
৭৪. উকুদুল লুলু ওয়াল মারজান: ২৭০ পৃ.।
৭৫. সর্বনিম্ন কতটুকু পরিমাণের সম্পদ চুরি করলে হাত কাটা হবে, এ নিয়ে ইমামদের মাঝে ইখতিলাফ রয়েছে। ইমাম আবু হানিফা -এর মতে, সর্বনিম্ন দশ দিরহাম সমমূল্যের জিনিসপত্র চুরি করলে চোরের হাত কাটা হবে। আর বর্তমানে দশ দিরহামে দুই ভরি সাত মাশা তথা আড়াই তোলা-লার একটু বেশি রুপা হয়। আধুনিক পরিমাপে হয় ৩০.৬১৮ গ্রাম রুপা। উল্লেখ্য, এ শাস্তি প্রয়োগের দায়িত্ব ইসলামি ভূখণ্ডের রাষ্ট্রপ্রধানের; সাধারণ মানুষের এ অধিকার নেই যে, চুরির অপরাধে অন্যের হাত কেটে দেবে। (সূত্র : ইসলামি জীবনব্যবস্থা)
৭৬. সুরা আশ-শামস, ৯১ : ১৫।
৭৭. আল-ফাওয়ায়িদ : ৮৩ পৃ.।
৭৮. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ৭০ পৃ.।
৭৯. আস-সিয়ার: ৯/২২৬।
৮০. আল-ইহইয়া: ৪/১৬৪।
৮১. সুরা আজ-জুমার, ৩৯: ৪৭।
৮২. শাজারাতুজ জাহাব: ১১৮ পৃ.।
৮৩. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/১৪১, আস-সিয়ার: ৫/৩৫৫।
৮৪. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ১০১ পৃ.।
৮৫. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ২৮৩ পৃ.।
৮৬. দিওয়ানুল ইমাম আলি: ৫২ পৃ.।
৮৭. আল-ইহইয়া: ৪/১৭০।
৮৮. আল-ফাওয়ায়িদ: ১৩১ পৃ.।
৮৯. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ২৯৪ পৃ.।
৯০. কুরতুবি রচিত আত-তাজকিরাহ: ১০ পৃ.।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00