📄 আল্লাহভীরুদের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ
ইবাদতগুজার আল্লাহভীরু বান্দাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অনেক অনুগ্রহ ও পুরস্কার রয়েছে। তন্মধ্যে বিশেষ একটি অনুগ্রহের কথা তিনি হাদিসে কুদসিতে উল্লেখ করেছেন:
وَعِزَّتِي وَجَلَالِي لَا أَجْمَعُ لِعَبْدِي أَبَدًا أَمْنَيْنِ وَلَا خَوَفَيْنِ؛ إِنْ هُوَ أَمِنَنِي فِي الدُّنْيَا، أَخَفْتُهُ يَوْمَ أَجْمَعُ فِيهِ عِبَادِي، وَإِنْ هُوَ خَافَنِي فِي الدُّنْيَا، أَمَّنْتُهُ يَوْمَ أَجْمَعُ فِيهِ عِبَادِي
'আমার ইজ্জত ও জালালের কসম, আমি কখনো আমার বান্দার জন্য দুটি নিরাপত্তা ও দুটি ভীতি একত্রিত করব না। যদি সে দুনিয়াতে আমার ব্যাপারে নির্ভয় থাকে, তাহলে আমি তাকে কিয়ামত দিবসে ভীত-সন্ত্রস্ত করব।
আর যদি সে দুনিয়াতে আমাকে ভয় করে, তাহলে আমি তাকে কিয়ামত দিবসে নিরাপত্তা দান করব।’
সাইয়িদুনা আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের উদ্দেশ্যে এমন এক খুতবা দিলেন, ইতিপূর্বে এমন খুতবা আমি কোনোদিন শুনিনি। তিনি বললেন:
لَوْ تَعْلَمُونَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيلًا، وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا
“আমি যা জানি, তা যদি তোমরা জানতে, তবে তোমরা কম হাসতে এবং বেশি কাঁদতে।”
এ কথা শুনে সাহাবিগণ মুখ ঢেকে নিলেন এবং গুনগুন করে কাঁদতে লাগলেন।‘৬
📄 দুনিয়াতে আল্লাহভীতির ফলাফল
যারা আল্লাহকে ভয় করে, দুনিয়াতেও তারা অনেক পুরস্কারে ভূষিত হবে।
আমির বিন কাইস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ সকল বস্তুর মনে তার প্রতি ভয় ঢুকিয়ে দেন। আর যে আল্লাহকে ভয় করে না, আল্লাহ তার মনে সকল বস্তুর ভয় ঢুকিয়ে দেন।’
আপনি সমাজে চোখ বুলিয়ে দেখুন না-আল্লাহভীরু বান্দারাই সমাজের আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হন এবং সবাই তাদের কথাই মান্য করে। মানুষের মনে তাদের প্রতি ভয় ও সমীহ থাকে। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর নাফরমানি করে এবং তাঁর বিধিনিষেধের প্রতি উদাসীনতা প্রদর্শন করে, তারা মানুষের দৃষ্টিতে অবজ্ঞার পাত্রে পরিণত হয়। লজ্জা ও লাঞ্ছনার জালে তারা বন্দী হয়ে পড়ে।
টিকাঃ
৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৬/৯৮।
৬. সহিহুল বুখারি: ৪৬২১, সহিহু মুসলিম: ৯০১।
📄 এ ভয় সে ভয় নয়
কেউ কেউ আল্লাহকে ভয় করার ভয়কে সাধারণ ভয়ের সাথে মিলিয়ে ফেলে। তারা মনে করে, হিংস্র প্রাণী ও অত্যাচারীর প্রতি মানুষের মনে যে ভয় থাকে, আল্লাহভীতির ভয়ও ঠিক তা-ই। তাদের ধারণা অবাস্তব। যে ভয় সত্যিকারের মুমিনদের হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি করে, তা হচ্ছে আল্লাহর শান্তির ভয় ও তাঁর অনুগ্রহ ও ক্ষমার আকাঙ্ক্ষা। প্রকৃত আল্লাহভীরু হওয়ার জন্য এই ভয়ই থাকতে হবে অন্তরে。
উমর বিন আব্দুল আজিজ বলতেন, 'হে আল্লাহ, আপনি যদি জেনে থাকেন, আমি কিয়ামত দিবস ব্যতীত অন্য কিছুকে ভয় পাই, তাহলে আমার সে ভয়কে গ্রহণ করবেন না।'
ইয়াজিদ বিন হাওশাব বলেন, 'আমি হাসান ও উমর বিন আব্দুল আজিজ -এর মতো ভীত কোনো মানুষ দেখিনি। তাদের ভয় দেখে মনে হয়, জাহান্নাম বুঝি শুধু এই দুজনের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে।'
আব্দুর রহমান বিন হারিস বিন হিশাম বলেন, 'আব্দুল্লাহ বিন হানজালা অসুস্থ হয়ে পড়লে আমি তাকে দেখতে গেলাম। সেখানে তার সামনে এক লোক তিলাওয়াত করলেন:
لَهُمْ مِنْ جَهَنَّمَ مِهَادٌ وَمِنْ فَوْقِهِمْ غَوَاشِ
"তাদের জন্য নরকাগ্নির শয্যা রয়েছে এবং ওপর থেকে চাদর।"৮
শুনে তিনি এতটাই কাঁদলেন, আমার মনে হলো কাঁদতে কাঁদতে বুঝি তার প্রাণটাই বের হয়ে যাবে। অতঃপর তিনি বললেন, “তারা জাহান্নামের বিভিন্ন স্তরে উপনীত হবে।” এই বলে তিনি দুই পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে গেলেন। একজন বললেন, “হে আবু আব্দুর রহমান, বসে যান।” তিনি বললেন, “জাহান্নামের স্মরণ আমাকে বসতে দিচ্ছে না। আমি জানি না, আমিও তাদের একজন হব কি না।”
এই যে ভয় তাদের ছিল, এটাই প্রশংসিত ভয়। এ ভয় মানুষকে ইবাদত, আমল, দৃঢ়তা ও তাওবার দিকে ধাবিত করে। এটিই প্রকৃত ভয়।
সাইয়িদুনা উমর বিন খাত্তাব রাঃ একবার হুজাইফা রাঃ-কে প্রশ্ন করেন, 'তোমাকে আল্লাহর দোহাই দিচ্ছি, রাসুলুল্লাহ সাঃ কি মুনাফিকের তালিকায় আমার নাম বলেছেন?' হুজাইফা রাঃ বললেন, 'না। আপনার পরে আর কারও ব্যাপারে আমি (নিফাক থেকে) পবিত্রতার ঘোষণা দেবো না।'৯
সুবহানাল্লাহ! যিনি এই ভয় পাচ্ছেন, তিনি হলেন আমিরুল মুমিনিন, হক-বাতিলের পার্থক্য নিরূপণকারী, দ্বিতীয় খলিফা ও জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবির অন্যতম সাইয়িদুনা উমর বিন খাত্তাব রাঃ।
তাঁর ভয়ের মাত্রা এত বেশি ছিল যে, তিনি নিজের আংটির ওপর খোদাই করে লিখেছিলেন, 'হে উমর, মৃত্যুই উপদেশের জন্য যথেষ্ট।'১০
টিকাঃ
৭. তারিখুল খুলাফা: ২২৪ পৃ.।
৮. সুরা আল-আরাফ, ৭: ৪১।
৯. আল-জাওয়াবুল কাফি: ৭৯ পৃ.।
১০. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ৭/১৪৭।
📄 সকল অনিষ্টের মূল
প্রিয় মুসলিম ভাই আমার, দীর্ঘ আশা ও প্রবৃত্তির দাসত্ব সকল অনিষ্টের মূল। প্রবৃত্তি মানুষকে হক থেকে দূরে রাখে এবং দীর্ঘ আশা মানুষকে আখিরাতের কথা ভুলিয়ে দেয় এবং পরকালের প্রস্তুতিতে ব্যাহত করে।”
ফুজাইল বিন ইয়াজ বলেন, 'যদি তোমাকে প্রশ্ন করা হয়, তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো?-তখন তুমি চুপ থেকো। কেননা, যদি “হ্যাঁ” বলো, তবে তুমি মিথ্যাবাদী। আর যদি “না” বলো, তবে তুমি কাফির। ১২
কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এই প্রশ্নের উত্তরে “হ্যাঁ” বলে; অথচ তারা সগিরা-কবিরা সব ধরনের গুনাহে লিপ্ত!
কোথায় হারিয়ে গেল আল্লাহভীতি!?
আখিরাত, কিয়ামত, হাশর ও মিজান নিয়ে চিন্তা-ফিকিরই বা কোথায়!?
প্রিয় ভাই আমার,
আবু সুলাইমান দারানি-এর মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হলে তার ছাত্ররা তাকে বললেন, 'সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আপনি মহা ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু রবের দরবারে যাচ্ছেন।' তখন
তিনি তাদের বললেন, 'বরং এভাবে বলো, “আপনি সেই রবের দরবারে যাচ্ছেন, যিনি সকল ছোট গুনাহের হিসাব নেবেন এবং বড় গুনাহের জন্য শাস্তি দেবেন।”
আল্লাহ তাআলা যথার্থই বলেছেন: فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ - وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ 'অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে। এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও দেখতে পাবে। ১৩
শুধু গুনাহকে ভয় পেলে চলবে না। অকল্যাণকর মৃত্যু ও পুনরুত্থানের ব্যাপারেও ভয় পেতে হবে।
আব্দুর রহমান বিন মাহদি বলেন, 'একবার সুফইয়ান আমার কাছে রাত্রি যাপন করলেন। যন্ত্রণা বেড়ে গেলে তিনি কান্না শুরু করলেন। তখন তাকে এক লোক বললেন, “আপনি মনে হয় অধিক গুনাহের ভয়ে কাঁদছেন।” তখন তিনি মাটি থেকে কিছু একটা উঠিয়ে নিয়ে বললেন, “আল্লাহর কসম, আমার গুনাহ আমার কাছে এই বস্তুর চেয়েও তুচ্ছ। আমি ভয় পাচ্ছি মৃত্যুর পূর্বে ইমান চলে যাওয়ার।”১৪
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
(يَخَافُونَ يَوْمًا تَتَقَلَّبُ فِيهِ الْقُلُوبُ وَالْأَبْصَارُ)
'তারা ভয় করে সেই দিনকে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে। ১৫
আমাদের সালাফগণ আফসোস ও লজ্জার এই কিয়ামতের দিনকে খুব বেশি ভয় পেতেন। যেদিনের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে :
(يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَى وَمَا هُمْ بِسُكَارَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدُ)
'যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যধাত্রী তার দুধের শিশুকে বিস্মৃত হবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করবে এবং মানুষকে তুমি দেখবে মাতাল; অথচ তারা মাতাল নয়। বস্তুত, আল্লাহর আজাব সুকঠিন।' ১৬
হাসান বলেন, 'সেই দিনটির ব্যাপারে তোমার কী ধারণা, যেদিন মানুষ পঞ্চাশ হাজার বছর পরিমাণ সময়
ধরে পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে? সেদিন তারা না পাবে কিছু খেতে, না পাবে পান করতে। এমনকি যখন তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে যাবে এবং ক্ষুধার জ্বালায় পেটে জ্বলন সৃষ্টি হবে, তখন তাদেরকে (অপরাধীদেরকে) নিয়ে যাওয়া হবে জাহান্নামে; তারপর পান করানো হবে জাহান্নামের ফুটন্ত নহরের ভীষণ গরম পানি। ১৭
উহাইব বিন ওয়ারদ বলেন, 'আল্লাহভীতি হলো কোনো ঘরে অবস্থানরত একজন মানুষের মতো, যে ঘরটি তার মালিক যতদিন থাকে, ততদিন টিকে থাকে; আর যখনই মালিক সে ঘর ছেড়ে অন্য ঘরে অবস্থান করতে শুরু করে, তখন এই ঘরটি ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহভীতিও ঠিক তা-ই। যতক্ষণ কোনো শরীরে আল্লাহভীতি থাকে, ততক্ষণ শরীরটি ভালো থাকে। আর যখনই সেই শরীর থেকে আল্লাহভীতি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখনই তা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সে যখন মানুষের আসরে গমন করে, তখন মানুষ বলে, “লোকটি কত খারাপ!” কেউ যদি প্রশ্ন করে, “তাকে খারাপ বলার কী কারণ?” তখন তারা বলে, “কোনো কারণ দেখছি না, তবে কেন যেন লোকটাকে ভীষণ অপছন্দ হচ্ছে আমাদের!” এটা তার ভেতর থেকে আল্লাহভীতি চলে যাওয়ার কারণে হয়েছে।
আর যখন তাদের মাঝে এমন কোনো মানুষ আসে, যার ভেতর আল্লাহভীতি আছে, তখন তারা বলে, “লোকটি কত ভালো!” কেউ যদি বলে, "তার মাঝে এমন কী গুণ তোমরা দেখতে পেলে?” তখন তারা বলে, "তেমন কোনো গুণ দেখছি না, তবে কেন যেন লোকটার প্রতি আমাদের মনে ভীষণ ভালোবাসা জন্মেছে।””১৮
ইবনে উমর-এর নিকট এক ভিক্ষুক আসলো। তিনি তার ছেলেকে বললেন, 'একে এক দিনার দাও।' সে চলে যাওয়ার পর ছেলে বললেন, 'আল্লাহ আপনার এই দান কবুল করুন।' তখন তিনি বললেন, 'যদি আমি জানতে পারতাম যে, আল্লাহ তাআলা আমার একটি সিজদা বা এক দিরহাম সদাকা কবুল করে নিয়েছেন, তবে মৃত্যুই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি পছন্দনীয় হবে। কেননা, আল্লাহ তাআলা কেবল তাকওয়াবানদের আমলই কবول করে থাকেন।'
وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ )
'এবং যারা যা দান করবার, তা ভীত ও কম্পিত হৃদয়ে এ কারণে দান করে যে, তারা তাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তন করবে।'১৯
এই আয়াতের তাফসিরে হাসান বলেন, 'তারা নেক আমল যা করার সবই করেছেন; তবুও এ ভয়ে ভীত যে, এই আমল হয়তো তাদেরকে আল্লাহর আজাব থেকে নিষ্কৃতি দিতে পারবে না।'২০
এই যথার্থ ও উন্নত বোধের কারনেই হয়তো তিনি সব সময় চিন্তামগ্ন থাকতেন। ইউনুস বিন উবাইদুল্লাহ বলেন, 'আমি হাসান-এর চেয়ে অধিক ভাবুক কাউকে দেখিনি। তিনি বলতেন, “আমরা হেসে চলেছি; অথচ এমনও হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলা আমাদের আমলসমূহ দেখে ঘোষণা দিয়েছেন—আমি তোমাদের কোনো আমল কবুল করব না।”
আল্লাহভীতি ধ্বংস ও পদস্খলন থেকে বাঁচার রক্ষাকবচ। ফুজাইল বলেন, 'যার ভেতর আল্লাহভীতি আছে, সেই আল্লাহভীতি তাকে সকল ভালো কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে।'২১
টিকাঃ
১১. আল-ফাওয়ায়িদ: ১৩০ পৃ.।
১২. তাজকিয়াতুন নুফুস: ১১৭ পৃ.।
১৩. সুরা আল-জিলজাল, ৯৯: ৭-৮।
১৪. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/১৫০।
১৫. সুরা আন-নুর, ২৪ : ৩৭।
১৬. সুরা আল-হাজ, ২২ : ২।
১৭. আল-ইহইয়া: ৪/৫০০।
১৮. ইবনে রজব রচিত আত-তাখওয়িফ মিনান নার: ৫ পৃ.।
১৯. সুরা আল-মুমিনুন, ২৩: ৬০।
২০. আজ-জুহদ: ৪২০ পৃ.।
২১. আল-ইহইয়া: ৪/১৭০।