📄 হাদিসের বার্তা
কাব ইবনে মালিকের ঘটনা আমাদের অনেক বার্তা দেয়। কিছু উল্লেখ করছি:
১. রাসূল ﷺ ভোরবেলা সফরে বের হতেন। এতে মুসলমানের জন্য বার্তা হল, যে কোন সফর ভোরবেলা, ফজরের পরপর করতে পারলে ভালো। রাসূল ইরশাদ করেন, 'হে আল্লাহ! আমার উম্মতের জন্য ভোরবেলায় বরকত দান কর।' [আহমাদ: ১৫০১২]
২. সফর বৃহস্পতিবারে করা সুন্নত। কাব ইবনে মালিক বলেন, 'রাসূল বৃহস্পতিবারে সফর শুরু করেছিলেন।'
রাসূল অধিকাংশ সফর বৃহস্পতিবারে করতেন। ওলামায়ে কেরাম শুক্রবারে সফর করা অপছন্দ করেছেন। অনেকে বলেন, শুক্রবারে ফজরের পর সফর করা অপছন্দের নয়। জুমার প্রথম আযান হওয়ার পর সফর শুরু করা অপছন্দের。
তবে উত্তম হল শুক্রবার সকল কাজ থেকে মুক্ত হয়ে কোথাও স্থির থাকা। ইবাদাত, গোসল, যিকির, কোরআন পাঠ ইত্যাদিতে ব্যস্ত থাকা। মনে রাখতে হবে, শুক্রবার হল মুমিনের ঈদ।
৩. সঙ্ঘবদ্ধ সফরের দলপতির উচিৎ- সকলের খোঁজ-খবর রাখা। রাসূল তাবুকের কাছে যাত্রাবিরতি করে সাহাবিদের খোঁজ নিয়েছিলেন। জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'কাব ইবনে মালিক কোথায়?' বর্ণিত হয়েছে, 'তোমরা সকলেই রক্ষণাবেক্ষণকারী। তোমাদের প্রত্যককেই অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।' [বুখারি: ৮৯৩]
৪. কারো ব্যাপারে কিছু জানা থাকলে তা বলা উচিৎ। ওলামায়ে কেরাম ক্ষেত্র বিশেষ 'জারহ তাদীল' এর অনুমতি দিয়েছেন। তা গীবত হবে না। তবে এই 'জারহ তাদীল' অনুমোদিত স্থানগুলোতেই করা যাবে।
৫. হাদিসের গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা হল, অপর ভাইয়ের মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। কাব ইবনে মালিক-কে জনৈক ব্যক্তি মন্দ বললে মুযায কাবের মর্যাদা রক্ষায় মুখ খুললেন। মন্দ ব্যক্তকারীকে বললেন, 'তুমি অন্যায় বলেছ। আমাদের জানা মতে তিনি একজন মুজাহিদ। তিনি আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালোবাসেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, 'অপর মুসলিম ভাইয়ের মর্যাদা রক্ষাকারীকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়া আল্লাহর দায়িত্ব।' [আহমাদ: ২৭০৬২] সুতরাং কোন মজলিস অপর মুসলমান ভাইয়ের জন্য অপমান ও মর্যাদাহানীমূলক কিছু শুনলে তার প্রতিবাদ করা উচিৎ। স্পষ্ট করে বলা উচিৎ, এটি ভুল। পাশাপাশি আক্রান্ত মুসলিম ভাইয়ের ভালো কিছু জানা থাকলে তা-ও ব্যক্ত করা উচিৎ।
৬. রাসূল সফর থেকে ফিরে আগে মসজিদে গমন করতেন। দুরাকাত সালাত আদায় করতেন। আবু কাতাদা বর্ণনা করেন- إِذَا دَخَلَ أَحَدُكُمُ الْمَسْجِدَ فَلَا يَجْلِسُ حَتَّى يُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে দুরাকাত সালাত আদায় করার আগে যেন না বসে। [বুখারি: ৪৪৪]
৭. সফর থেকে ফিরে লোকদের নিয়ে একটু বসা। সালাম ও মতবিনিময় করা। এটি নববী আদর্শ।
৮. কারো ওযর-অপারগতা গ্রহণ করা। কেউ ওযর ও অপারগতা জানালে তা বাহ্যিক অবস্থার উপর বিবেচনা করা। এ কথা না বলা- সে ভিন্ন কিছু চেয়েছে, তার নিয়ত ভালো ছিল না, সে সত্য বলেনি ইত্যাদি।
৯. পাপাচারীদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা। হাসান বসরী বলেন, 'কী আশ্চর্য! তাবুক যুদ্ধে পিছিয়ে থাকা তিন সাহাবি কোন রক্তপাত করেননি। কারো রাস্তা বন্ধ করেননি। কোন অনাচার করেননি। সম্পদ বিনষ্ট করেননি। তথাপি তারা কী প্রতিদান পেয়েছিল! তাহলে যারা কবীরা গোনাহয় লিপ্ত, অ্লীলতায় লিপ্ত, তাদের সাথে কেমন আচরণ করা উচিৎ!'
পাপাচারীর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বৈশিষ্ট্য। আর যে বিদয়াত প্রচার করে, তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা আবশ্যক।
তদ্রূপ অন্যান্য গোনাহয় লিপ্ত যেমন, মাদকাসক্ত, গান শ্রবণকারী, সুন্নতের বিরোধিতাকারীদের প্রাথমিক সতর্ক ও নসিহত করে তাদের সাথেও সম্পর্কচ্ছেদ করা উচিৎ।
পার্থিব কোন বিষয়ে কারো সাথে তিন দিনের বেশি সম্পর্কচ্ছেদ রাখা বৈধ নয়। রাসূল বলেন-
তিন দিনের বেশি কোন মুসলিম ভাইয়ের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ রাখা মুসলমানের জন্য বৈধ নয়; দুজনের সাক্ষাৎ হলে পরষ্পর মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাদের জন্য ভালো হল সালাম দিয়ে শুরু করা। [বুখারি: ৬০৭৭]
দীনী বিষয়ে অবাধ্যদের সাথে ভালো মনে হলে তাদের শিষ্টাচার শিখানো পর্যন্ত সম্পর্কচ্ছেদ করা জরুরি। ইবনে তাইমিয়া বলেন, 'সম্পর্কচ্ছেদের কারণে যদি অবাধ্যতা আরও বৃদ্ধি পায়, তাহলে সম্পর্কচ্ছেদ না করা চাই।
ফতোয়ায়ে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
১০. এক মুসলমান অপর মুসলমানকে সুসংবাদ প্রদান করা। কারো সন্তান ভূমিষ্ট হল, ছেলে কোন বিপদ থেকে মুক্ত হল, তখন বাবা-মাকে সুসংবাদ প্রদান করা। কারো ব্যাপারে ভালো কিছু শুনলে, স্বপ্ন দেখলে তাকে সুখবর শোনানো।
হিংসুক ও বিদ্বেষপরায়ণ লোকেরা কারো ব্যাপারে ভালো কিছু প্রকাশ করে, অন্তরে তার ব্যাপারে মন্দ পোষে। মুসলিম ভাইয়ের ভালো কিছু দেখলে বা শুনলে তা গোপন রাখে। সম্মানহানীকর কিছু শুনলে তা কানে কানে প্রচার করে।
১১. সুসংবাদপ্রদানকারীকে কিছু হাদিয়া ও উপহার প্রদান করা। মুসলিম সবসময় সম্মানী। উদারহস্ত। দানশীল।
১২. একটি মুসলিম জীবনের সবচে শ্রেষ্ঠ দিন হল আল্লাহর কাছে তওবা কবুল হওয়ার দিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাবকে বলেছিলেন, 'সুসংবাদ হে কাব! আল্লাহ তোমার তওবা কবুল করেছেন। জন্মাবধি আজকের দিনটি তোমার জন্য সবচে উৎকৃষ্ট।'
এটি কাবে জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। এই দিন তার ইসলামের দিন। তাওবা কবুল হওয়ার দিন।
📄 সারকথা
বিপদাপদে জীবন যতই দুর্বিষহ হোক, বিপদাপদ যতই ঘনীভূত হোক, এর থেকে মুক্তি দিতে পারেন একমাত্র আল্লাহ。
ইবনুল জাওযি বলেন, রিযিক দিতে পারেন একমাত্র আল্লাহ। বিপদ থেকে মুক্তি দিতে পারেন একমাত্র আল্লাহ।
এটাই আহলে সুন্নাত ওয়ালজামাতের আকিদা। প্রগাঢ় বিশ্বাস।
সমাপ্ত