📄 পরীক্ষায় নিপতীত হওয়ার ফায়দা
এক.
আল্লাহ -র সাহায্য প্রাপ্তির স্বাদ। বিজয়ের সুখ।
কত সাহাবি অসহায় ছিলেন। রিক্ত ছিলেন। আল্লাহ সাহায্যের মাধ্যমে তাদের চক্ষু শীতল করেছেন। সে মানুষ কত সৌভাগ্যবান, যে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করছে, খরচ করছে, দান-সদকা করছে। অবশেষে সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে বিজয়ী হচ্ছে!
বিলাল ইবনে রাবাহ। মূর্তিপূজকদের থেকে তিনি কতটা অপদস্থ হয়েছেন, তা আল্লাহই ভালো জানেন।
আল্লাহ জানেন, বিলাল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর বিশ্বাসী। বিলাল সালাত আদায়কারী। আখেরাতে সফলতা প্রত্যাশী। মক্কার পাহাড়ে পাহাড়ে টেনে হেঁচড়ে বুকে পাথর চাপা দেয়া হচ্ছে, তবু তার মুখ থেকে বের হচ্ছে- 'আহাদ, আহাদ' 'আল্লাহ এক, আল্লাহ এক'।
আল্লাহ্ চাইলেই ঐ পাপিষ্ঠ জালিমদের ধ্বংস করতে পারতেন। বিলালকে মুক্তি দিতে পারতেন। কিন্তু আল্লাহ্ বিলালকে পরীক্ষার একটি পাঠ শিখাতে চাইলেন। অতঃপর আল্লাহ্ বিলালকে বিজয় দান করলেন। ঈমানকে কুফরের উপর বিজয়ী করলেন। বিলালের একিন ও বিশ্বাসকে তাগুতের উপর প্রতিষ্ঠিত করলেন। বিলাল আল্লাহর হেদায়াতে পথপ্রাপ্ত হলেন। বিলাল এখন সফল লোকদের সর্দার। আমাদের মাঝে আজও প্রসিদ্ধ। আর মূর্তিপূজকরা বিফল। ব্যর্থ মনোরথ।
বিলাল ছিলেন ইসলামের মুয়াযযিন। বিশ্ব মুসলিম আজ বিলালকে চেনে।
কবি বলেন-
বিলালের আযান, যে আযানে প্রাণ পায় হাজার আযান।
মক্কা বিজয়ের দিন রাসূল বিলালকে আযান দিতে বললেন। বিলাল তাওহিদের স্তম্ভ কাবায় উঠে আযান দিলেন। তাগুত ও ভ্রষ্টতার নেতৃ-মুশরিকদের ক্ষেপানোর জন্য রাসূল বিলালকে কাবায় উঠালেন। রাসূল তাদের বোঝালেন- দেখ, যে গোলাম তোমাদের কাছে একটাকার মূল্যমানের নয়, সে আজ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর সুবাদে সবার সর্দার!
দেখ এই পবিত্র আল্লাহভীরু মুমিনকে, যে আজ কাবা চড়ে মানুষের কানে কানে তাওহিদের যবানে আযান ফুঁকছে!
দেখ, যাকে তোমরা পাথরের উপর টানা-হেঁচড়া করতে, প্রহার করতে, গালমন্দ বলতে, অপদস্থ করতে, সে আজ বিজয়ের আযান দিচ্ছে!
এ দুনিয়া শুনুক বিলালের আযান- এ যুগ শুনুক, মন দিয়ে শুনুক বিলালের আযান-
সত্য হৃদয়ের দৃঢ়বল বিলাল! আমাদের আনন্দ দাও তুমি সত্য মুসল্লী
তাওবার পানি দিয়ে ধুয়ে দাও, তুমি নিষ্ঠ মুসল্লী যেন পাবো মোরা অষ্টস্বর্গের রাজতোরণ...
আল্লাহ বিলালকে কীভাবে পরীক্ষা করলেন। বিলাল সবর করলেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। আল্লাহ তাকে চিরকালের জন্য সম্মানী করলেন। এই হল বিজয়। এই হল আল্লাহর সাহায্য।
দুই. মহাপ্রতিদান। পরীক্ষিত বান্দার জন্য আল্লাহ -র মহাপ্রতিদান। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল -র কাছে গেলাম। তখন তিনি জ্বরে ভুগছিলেন। আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কঠিন জ্বরে আক্রান্ত।' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ। তোমাদের দু'ব্যক্তি যতটুকু জ্বরে আক্রান্ত হয়, আমি একাই ততটুকু জ্বরে আক্রান্ত হই।' আমি বললাম, 'এটি এ জন্য যে, আপনার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সাওয়াব।' তিনি বললেন-
হাঁ ব্যাপারটি এমনই। কেননা যে কোন মুসলিম মুসিবতে আক্রান্ত হয়, চাই তা একটি কাঁটা কিংবা আরো ক্ষুদ্র কিছু হোক না কেন, এর দ্বারা আল্লাহ তার গোনাহগুলো মুছে দেন, যেভাবে গাছ থেকে পাতাগুলো ঝরে যায়। [বুখারি: ৫৬৪৭]
পরীক্ষার সাথে আল্লাহ -র পক্ষ থেকে রয়েছে সাওয়াব ও প্রতিদান। আল্লাহ -র পক্ষ থেকে যে পরীক্ষাই আসুক, চিন্তা, পেরেশানি, দুঃখ-কষ্ট, এমনকি সূর্যের তীব্রতাই হোক না কেন, তাতে সবর করা চাই। এতে থাকবে আল্লাহ পক্ষ থেকে প্রতিদান। বেশুমার সাওয়াব।
তিন. সম্মান। উচ্চ মর্যাদা। আল্লাহ মানুষকে বিপদ দিয়ে, মানুষের পরীক্ষা নিয়ে তাকে ছোট করতে চান না। তাকে মহান করতে চান। কেউ যদি আখেরাতের প্রতিদান চায়, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করতে চান।
চার.
শিক্ষা গ্রহণ।
আল্লাহ মানুষকে বিপদ দিয়ে দাসত্বের পাঠদান করান। যে পাঠ কখনও ভুলার নয়। কারণ বিপদ ও পরীক্ষায় পতিত হয়ে মানুষ ছোট হয়ে আসে। বিনীত হয়ে আসে। চরিত্র সংশোধন করে নেয়। অনেক অজ্ঞ মানুষ এমন আছে, যারা অসুস্থ হলে আল্লাহ-র আনুগত্যের বেড়ি গলায় পরে নেয়।
পাঁচ.
সবরের দীক্ষা।
রাসূল -র পক্ষ থেকে সবচে গুরুত্বপূর্ণ পাঠদান হল সবরের পাঠ।
ইমাম আহমদ বলেন, আমি কোরআনে সবর নিয়ে গবেষণা করলাম। নব্বইয়ের অধিক জায়গায় সবরের উল্লেখ হয়েছে।
ওলামায়ে কেরাম বলেন, যে সবরের বাহনে চড়তে পারে, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।
ওমর বলেন, আমরা সবচে উত্তম জীবনোপকরণ পেয়েছি সবর।
অনেকে বলেন, যখন আমরা সবর করি, মুক্তি পাই। সফল হই। যে সবর করে না, তার কোন প্রাপ্তি নেই। প্রাজ্ঞতা নেই। তার জীবনের সুন্দর পরিসমাপ্তি নেই। সুবিন্যস্ত কোন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নেই।
পাঠক! যে কোন বিপদে আসুন ধৈর্য ধারণ করি। আল্লাহর কাছে সাওয়াবের আশা রাখি। সুহাইব থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেন-
মুমিনের বিষয়টি বিস্ময়কর। তার যাবতীয় ব্যাপারই তার জন্য কল্যাণকর। এ বৈশিষ্ট্য মুমিন ছাড়া আর কারো নেই। যদি তার সুখ-শান্তি আসে তবে সে শোকর আদায় করে। এটা তার জন্য কল্যাণকর। যদি দুঃখ মুসিবত আসে তবে সে সবর করে। এটাও তার জন্য কল্যাণকর। [মুসলিম: ২৯৯৯]
সুতরাং আসুন! সর্বাবস্থায় সবর করি। বন্ধু-স্বজন হারানোর বেদনায়, শরীরের কোন অঙ্গ বিকল হওয়ার যন্ত্রণায় সবর করি। ধৈর্য ধরি। ইনশাআল্লাহ, সাহায্য সাথে আসবেই।
লক্ষণীয় হল, আল্লাহ -এর কাছে সবসময় নিরাপদ থাকার দোয়া করতে হবে, বিপদ ও পরীক্ষা আসার দোয়া নয়। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসূল বললেন, 'চাচা! আমি আপনাকে ভালোবাসবো না!'
অপর বর্ণনায় এসেছে, ইবনে আব্বাস রাসূলকে বললেন, 'আমাকে একটি দোয়া শিখিয়ে দিন। আমি তা পড়ে আল্লাহকে ডাকবো।' রাসূল বললেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ. হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে ক্ষমা ও নিরাপত্তা কামনা করি। [প্রাগুক্ত]
বর্ণিত হয়েছে, জনৈক আনসার সাহাবি দোয়া করেছিলেন, 'আল্লাহ, তুমি যদি আখেরাতে আমাকে শাস্তি দাও, তবে তা দুনিয়াতেই দিয়ে দাও। তুমি আজই আমাকে সেই শাস্তি দিয়ে দাও।'
দোয়ার পর সাহাবি অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতার প্রভাবে শীর্ণকায় হয়ে পড়েন।
রাসূল তাকে দেখতে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি কোন কিছু বলে দোয়া করেছ?'
সাহাবি বললেন, 'আমি এই দোয়া করেছি- 'আল্লাহ, তুমি যদি আখেরাতে আমাকে শাস্তি দাও, তবে তা দুনিয়াতেই দিয়ে দাও। তুমি আজই আমাকে সেই শাস্তি দিয়ে দাও।'
রাসূল বললেন-
সুবহানাল্লাহ! তুমি আল্লাহর আযাব সহ্য করতে পারবে! তুমি এই দোয়া কর-
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ হে পরোয়ারদিগার! আমাদের দুনিয়াতেও কল্যাণ দান কর এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান কর। আমাদের দোযখের আযাব থেকে রক্ষা কর। [সূরা বাকারা: ২০১] [প্রাগুক্ত]
আসুন! আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা কামনা করি। যেন আমরা নিরাপত্তার চাদরে আবৃত থাকি। জানি না, এমন বিপদে পতিত হবো, যা সহ্য করতে পারবো না। সবর করতে পারবো না।
আল্লাহ আমাদের সকল অনিষ্ট থেকে নিরাপদ রেখো।
আমাদের জন্য সহজ ও সর্বোত্তম ফয়সালা রেখো।
আমাদের সামগ্রিক ও পরিপূর্ণ কল্যাণ দান করো। জীবনযাপনে স্বাচ্ছন্দময় করো। সময়ে সৌভাগ্যময় করো।
আল্লাহ! তুমি আমাদের উভয় জগতে অভিভাবক হও। সকল বিষয়ে সুন্দর পরিসমাপ্তি দাও। আমিন।
এক.
আল্লাহ -র সাহায্য প্রাপ্তির স্বাদ। বিজয়ের সুখ।
কত সাহাবি অসহায় ছিলেন। রিক্ত ছিলেন। আল্লাহ সাহায্যের মাধ্যমে তাদের চক্ষু শীতল করেছেন। সে মানুষ কত সৌভাগ্যবান, যে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করছে, খরচ করছে, দান-সদকা করছে। অবশেষে সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে বিজয়ী হচ্ছে!
বিলাল ইবনে রাবাহ। মূর্তিপূজকদের থেকে তিনি কতটা অপদস্থ হয়েছেন, তা আল্লাহই ভালো জানেন।
আল্লাহ জানেন, বিলাল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর বিশ্বাসী। বিলাল সালাত আদায়কারী। আখেরাতে সফলতা প্রত্যাশী। মক্কার পাহাড়ে পাহাড়ে টেনে হেঁচড়ে বুকে পাথর চাপা দেয়া হচ্ছে, তবু তার মুখ থেকে বের হচ্ছে- 'আহাদ, আহাদ' 'আল্লাহ এক, আল্লাহ এক'।
আল্লাহ্ চাইলেই ঐ পাপিষ্ঠ জালিমদের ধ্বংস করতে পারতেন। বিলালকে মুক্তি দিতে পারতেন। কিন্তু আল্লাহ্ বিলালকে পরীক্ষার একটি পাঠ শিখাতে চাইলেন। অতঃপর আল্লাহ্ বিলালকে বিজয় দান করলেন। ঈমানকে কুফরের উপর বিজয়ী করলেন। বিলালের একিন ও বিশ্বাসকে তাগুতের উপর প্রতিষ্ঠিত করলেন। বিলাল আল্লাহর হেদায়াতে পথপ্রাপ্ত হলেন। বিলাল এখন সফল লোকদের সর্দার। আমাদের মাঝে আজও প্রসিদ্ধ। আর মূর্তিপূজকরা বিফল। ব্যর্থ মনোরথ।
বিলাল ছিলেন ইসলামের মুয়াযযিন। বিশ্ব মুসলিম আজ বিলালকে চেনে।
কবি বলেন-
বিলালের আযান, যে আযানে প্রাণ পায় হাজার আযান।
মক্কা বিজয়ের দিন রাসূল বিলালকে আযান দিতে বললেন। বিলাল তাওহিদের স্তম্ভ কাবায় উঠে আযান দিলেন। তাগুত ও ভ্রষ্টতার নেতৃ-মুশরিকদের ক্ষেপানোর জন্য রাসূল বিলালকে কাবায় উঠালেন। রাসূল তাদের বোঝালেন- দেখ, যে গোলাম তোমাদের কাছে একটাকার মূল্যমানের নয়, সে আজ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর সুবাদে সবার সর্দার!
দেখ এই পবিত্র আল্লাহভীরু মুমিনকে, যে আজ কাবা চড়ে মানুষের কানে কানে তাওহিদের যবানে আযান ফুঁকছে!
দেখ, যাকে তোমরা পাথরের উপর টানা-হেঁচড়া করতে, প্রহার করতে, গালমন্দ বলতে, অপদস্থ করতে, সে আজ বিজয়ের আযান দিচ্ছে!
এ দুনিয়া শুনুক বিলালের আযান- এ যুগ শুনুক, মন দিয়ে শুনুক বিলালের আযান-
সত্য হৃদয়ের দৃঢ়বল বিলাল! আমাদের আনন্দ দাও তুমি সত্য মুসল্লী
তাওবার পানি দিয়ে ধুয়ে দাও, তুমি নিষ্ঠ মুসল্লী যেন পাবো মোরা অষ্টস্বর্গের রাজতোরণ...
আল্লাহ বিলালকে কীভাবে পরীক্ষা করলেন। বিলাল সবর করলেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। আল্লাহ তাকে চিরকালের জন্য সম্মানী করলেন। এই হল বিজয়। এই হল আল্লাহর সাহায্য।
দুই. মহাপ্রতিদান। পরীক্ষিত বান্দার জন্য আল্লাহ -র মহাপ্রতিদান। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল -র কাছে গেলাম। তখন তিনি জ্বরে ভুগছিলেন। আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কঠিন জ্বরে আক্রান্ত।' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ। তোমাদের দু'ব্যক্তি যতটুকু জ্বরে আক্রান্ত হয়, আমি একাই ততটুকু জ্বরে আক্রান্ত হই।' আমি বললাম, 'এটি এ জন্য যে, আপনার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সাওয়াব।' তিনি বললেন-
হাঁ ব্যাপারটি এমনই। কেননা যে কোন মুসলিম মুসিবতে আক্রান্ত হয়, চাই তা একটি কাঁটা কিংবা আরো ক্ষুদ্র কিছু হোক না কেন, এর দ্বারা আল্লাহ তার গোনাহগুলো মুছে দেন, যেভাবে গাছ থেকে পাতাগুলো ঝরে যায়। [বুখারি: ৫৬৪৭]
পরীক্ষার সাথে আল্লাহ -র পক্ষ থেকে রয়েছে সাওয়াব ও প্রতিদান। আল্লাহ -র পক্ষ থেকে যে পরীক্ষাই আসুক, চিন্তা, পেরেশানি, দুঃখ-কষ্ট, এমনকি সূর্যের তীব্রতাই হোক না কেন, তাতে সবর করা চাই। এতে থাকবে আল্লাহ পক্ষ থেকে প্রতিদান। বেশুমার সাওয়াব।
তিন. সম্মান। উচ্চ মর্যাদা। আল্লাহ মানুষকে বিপদ দিয়ে, মানুষের পরীক্ষা নিয়ে তাকে ছোট করতে চান না। তাকে মহান করতে চান। কেউ যদি আখেরাতের প্রতিদান চায়, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করতে চান।
চার.
শিক্ষা গ্রহণ।
আল্লাহ মানুষকে বিপদ দিয়ে দাসত্বের পাঠদান করান। যে পাঠ কখনও ভুলার নয়। কারণ বিপদ ও পরীক্ষায় পতিত হয়ে মানুষ ছোট হয়ে আসে। বিনীত হয়ে আসে। চরিত্র সংশোধন করে নেয়। অনেক অজ্ঞ মানুষ এমন আছে, যারা অসুস্থ হলে আল্লাহ-র আনুগত্যের বেড়ি গলায় পরে নেয়।
পাঁচ.
সবরের দীক্ষা।
রাসূল -র পক্ষ থেকে সবচে গুরুত্বপূর্ণ পাঠদান হল সবরের পাঠ।
ইমাম আহমদ বলেন, আমি কোরআনে সবর নিয়ে গবেষণা করলাম। নব্বইয়ের অধিক জায়গায় সবরের উল্লেখ হয়েছে।
ওলামায়ে কেরাম বলেন, যে সবরের বাহনে চড়তে পারে, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।
ওমর বলেন, আমরা সবচে উত্তম জীবনোপকরণ পেয়েছি সবর।
অনেকে বলেন, যখন আমরা সবর করি, মুক্তি পাই। সফল হই। যে সবর করে না, তার কোন প্রাপ্তি নেই। প্রাজ্ঞতা নেই। তার জীবনের সুন্দর পরিসমাপ্তি নেই। সুবিন্যস্ত কোন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নেই।
পাঠক! যে কোন বিপদে আসুন ধৈর্য ধারণ করি। আল্লাহর কাছে সাওয়াবের আশা রাখি। সুহাইব থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেন-
মুমিনের বিষয়টি বিস্ময়কর। তার যাবতীয় ব্যাপারই তার জন্য কল্যাণকর। এ বৈশিষ্ট্য মুমিন ছাড়া আর কারো নেই। যদি তার সুখ-শান্তি আসে তবে সে শোকর আদায় করে। এটা তার জন্য কল্যাণকর। যদি দুঃখ মুসিবত আসে তবে সে সবর করে। এটাও তার জন্য কল্যাণকর। [মুসলিম: ২৯৯৯]
সুতরাং আসুন! সর্বাবস্থায় সবর করি। বন্ধু-স্বজন হারানোর বেদনায়, শরীরের কোন অঙ্গ বিকল হওয়ার যন্ত্রণায় সবর করি। ধৈর্য ধরি। ইনশাআল্লাহ, সাহায্য সাথে আসবেই।
লক্ষণীয় হল, আল্লাহ -এর কাছে সবসময় নিরাপদ থাকার দোয়া করতে হবে, বিপদ ও পরীক্ষা আসার দোয়া নয়। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসূল বললেন, 'চাচা! আমি আপনাকে ভালোবাসবো না!'
অপর বর্ণনায় এসেছে, ইবনে আব্বাস রাসূলকে বললেন, 'আমাকে একটি দোয়া শিখিয়ে দিন। আমি তা পড়ে আল্লাহকে ডাকবো।' রাসূল বললেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ. হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে ক্ষমা ও নিরাপত্তা কামনা করি। [প্রাগুক্ত]
বর্ণিত হয়েছে, জনৈক আনসার সাহাবি দোয়া করেছিলেন, 'আল্লাহ, তুমি যদি আখেরাতে আমাকে শাস্তি দাও, তবে তা দুনিয়াতেই দিয়ে দাও। তুমি আজই আমাকে সেই শাস্তি দিয়ে দাও।'
দোয়ার পর সাহাবি অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতার প্রভাবে শীর্ণকায় হয়ে পড়েন।
রাসূল তাকে দেখতে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি কোন কিছু বলে দোয়া করেছ?'
সাহাবি বললেন, 'আমি এই দোয়া করেছি- 'আল্লাহ, তুমি যদি আখেরাতে আমাকে শাস্তি দাও, তবে তা দুনিয়াতেই দিয়ে দাও। তুমি আজই আমাকে সেই শাস্তি দিয়ে দাও।'
রাসূল বললেন-
সুবহানাল্লাহ! তুমি আল্লাহর আযাব সহ্য করতে পারবে! তুমি এই দোয়া কর-
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ হে পরোয়ারদিগার! আমাদের দুনিয়াতেও কল্যাণ দান কর এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান কর। আমাদের দোযখের আযাব থেকে রক্ষা কর। [সূরা বাকারা: ২০১] [প্রাগুক্ত]
আসুন! আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা কামনা করি। যেন আমরা নিরাপত্তার চাদরে আবৃত থাকি। জানি না, এমন বিপদে পতিত হবো, যা সহ্য করতে পারবো না। সবর করতে পারবো না।
আল্লাহ আমাদের সকল অনিষ্ট থেকে নিরাপদ রেখো।
আমাদের জন্য সহজ ও সর্বোত্তম ফয়সালা রেখো।
আমাদের সামগ্রিক ও পরিপূর্ণ কল্যাণ দান করো। জীবনযাপনে স্বাচ্ছন্দময় করো। সময়ে সৌভাগ্যময় করো।
আল্লাহ! তুমি আমাদের উভয় জগতে অভিভাবক হও। সকল বিষয়ে সুন্দর পরিসমাপ্তি দাও। আমিন।
এক.
আল্লাহ -র সাহায্য প্রাপ্তির স্বাদ। বিজয়ের সুখ।
কত সাহাবি অসহায় ছিলেন। রিক্ত ছিলেন। আল্লাহ সাহায্যের মাধ্যমে তাদের চক্ষু শীতল করেছেন। সে মানুষ কত সৌভাগ্যবান, যে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করছে, খরচ করছে, দান-সদকা করছে। অবশেষে সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে বিজয়ী হচ্ছে!
বিলাল ইবনে রাবাহ। মূর্তিপূজকদের থেকে তিনি কতটা অপদস্থ হয়েছেন, তা আল্লাহই ভালো জানেন।
আল্লাহ জানেন, বিলাল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর বিশ্বাসী। বিলাল সালাত আদায়কারী। আখেরাতে সফলতা প্রত্যাশী। মক্কার পাহাড়ে পাহাড়ে টেনে হেঁচড়ে বুকে পাথর চাপা দেয়া হচ্ছে, তবু তার মুখ থেকে বের হচ্ছে- 'আহাদ, আহাদ' 'আল্লাহ এক, আল্লাহ এক'।
আল্লাহ্ চাইলেই ঐ পাপিষ্ঠ জালিমদের ধ্বংস করতে পারতেন। বিলালকে মুক্তি দিতে পারতেন। কিন্তু আল্লাহ্ বিলালকে পরীক্ষার একটি পাঠ শিখাতে চাইলেন। অতঃপর আল্লাহ্ বিলালকে বিজয় দান করলেন। ঈমানকে কুফরের উপর বিজয়ী করলেন। বিলালের একিন ও বিশ্বাসকে তাগুতের উপর প্রতিষ্ঠিত করলেন। বিলাল আল্লাহর হেদায়াতে পথপ্রাপ্ত হলেন। বিলাল এখন সফল লোকদের সর্দার। আমাদের মাঝে আজও প্রসিদ্ধ। আর মূর্তিপূজকরা বিফল। ব্যর্থ মনোরথ।
বিলাল ছিলেন ইসলামের মুয়াযযিন। বিশ্ব মুসলিম আজ বিলালকে চেনে।
কবি বলেন-
বিলালের আযান, যে আযানে প্রাণ পায় হাজার আযান।
মক্কা বিজয়ের দিন রাসূল বিলালকে আযান দিতে বললেন। বিলাল তাওহিদের স্তম্ভ কাবায় উঠে আযান দিলেন। তাগুত ও ভ্রষ্টতার নেতৃ-মুশরিকদের ক্ষেপানোর জন্য রাসূল বিলালকে কাবায় উঠালেন। রাসূল তাদের বোঝালেন- দেখ, যে গোলাম তোমাদের কাছে একটাকার মূল্যমানের নয়, সে আজ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর সুবাদে সবার সর্দার!
দেখ এই পবিত্র আল্লাহভীরু মুমিনকে, যে আজ কাবা চড়ে মানুষের কানে কানে তাওহিদের যবানে আযান ফুঁকছে!
দেখ, যাকে তোমরা পাথরের উপর টানা-হেঁচড়া করতে, প্রহার করতে, গালমন্দ বলতে, অপদস্থ করতে, সে আজ বিজয়ের আযান দিচ্ছে!
এ দুনিয়া শুনুক বিলালের আযান- এ যুগ শুনুক, মন দিয়ে শুনুক বিলালের আযান-
সত্য হৃদয়ের দৃঢ়বল বিলাল! আমাদের আনন্দ দাও তুমি সত্য মুসল্লী
তাওবার পানি দিয়ে ধুয়ে দাও, তুমি নিষ্ঠ মুসল্লী যেন পাবো মোরা অষ্টস্বর্গের রাজতোরণ...
আল্লাহ বিলালকে কীভাবে পরীক্ষা করলেন। বিলাল সবর করলেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। আল্লাহ তাকে চিরকালের জন্য সম্মানী করলেন। এই হল বিজয়। এই হল আল্লাহর সাহায্য।
দুই. মহাপ্রতিদান। পরীক্ষিত বান্দার জন্য আল্লাহ -র মহাপ্রতিদান। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল -র কাছে গেলাম। তখন তিনি জ্বরে ভুগছিলেন। আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কঠিন জ্বরে আক্রান্ত।' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ। তোমাদের দু'ব্যক্তি যতটুকু জ্বরে আক্রান্ত হয়, আমি একাই ততটুকু জ্বরে আক্রান্ত হই।' আমি বললাম, 'এটি এ জন্য যে, আপনার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সাওয়াব।' তিনি বললেন-
হাঁ ব্যাপারটি এমনই। কেননা যে কোন মুসলিম মুসিবতে আক্রান্ত হয়, চাই তা একটি কাঁটা কিংবা আরো ক্ষুদ্র কিছু হোক না কেন, এর দ্বারা আল্লাহ তার গোনাহগুলো মুছে দেন, যেভাবে গাছ থেকে পাতাগুলো ঝরে যায়। [বুখারি: ৫৬৪৭]
পরীক্ষার সাথে আল্লাহ -র পক্ষ থেকে রয়েছে সাওয়াব ও প্রতিদান। আল্লাহ -র পক্ষ থেকে যে পরীক্ষাই আসুক, চিন্তা, পেরেশানি, দুঃখ-কষ্ট, এমনকি সূর্যের তীব্রতাই হোক না কেন, তাতে সবর করা চাই। এতে থাকবে আল্লাহ পক্ষ থেকে প্রতিদান। বেশুমার সাওয়াব।
তিন. সম্মান। উচ্চ মর্যাদা। আল্লাহ মানুষকে বিপদ দিয়ে, মানুষের পরীক্ষা নিয়ে তাকে ছোট করতে চান না। তাকে মহান করতে চান। কেউ যদি আখেরাতের প্রতিদান চায়, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করতে চান।
চার.
শিক্ষা গ্রহণ।
আল্লাহ মানুষকে বিপদ দিয়ে দাসত্বের পাঠদান করান। যে পাঠ কখনও ভুলার নয়। কারণ বিপদ ও পরীক্ষায় পতিত হয়ে মানুষ ছোট হয়ে আসে। বিনীত হয়ে আসে। চরিত্র সংশোধন করে নেয়। অনেক অজ্ঞ মানুষ এমন আছে, যারা অসুস্থ হলে আল্লাহ-র আনুগত্যের বেড়ি গলায় পরে নেয়।
পাঁচ.
সবরের দীক্ষা।
রাসূল -র পক্ষ থেকে সবচে গুরুত্বপূর্ণ পাঠদান হল সবরের পাঠ।
ইমাম আহমদ বলেন, আমি কোরআনে সবর নিয়ে গবেষণা করলাম। নব্বইয়ের অধিক জায়গায় সবরের উল্লেখ হয়েছে।
ওলামায়ে কেরাম বলেন, যে সবরের বাহনে চড়তে পারে, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।
ওমর বলেন, আমরা সবচে উত্তম জীবনোপকরণ পেয়েছি সবর।
অনেকে বলেন, যখন আমরা সবর করি, মুক্তি পাই। সফল হই। যে সবর করে না, তার কোন প্রাপ্তি নেই। প্রাজ্ঞতা নেই। তার জীবনের সুন্দর পরিসমাপ্তি নেই। সুবিন্যস্ত কোন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নেই।
পাঠক! যে কোন বিপদে আসুন ধৈর্য ধারণ করি। আল্লাহর কাছে সাওয়াবের আশা রাখি। সুহাইব থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেন-
মুমিনের বিষয়টি বিস্ময়কর। তার যাবতীয় ব্যাপারই তার জন্য কল্যাণকর। এ বৈশিষ্ট্য মুমিন ছাড়া আর কারো নেই। যদি তার সুখ-শান্তি আসে তবে সে শোকর আদায় করে। এটা তার জন্য কল্যাণকর। যদি দুঃখ মুসীবত আসে তবে সে সবর করে। এটাও তার জন্য কল্যাণকর। [মুসলিম: ২৯৯৯]
সুতরাং আসুন! সর্বাবস্থায় সবর করি। বন্ধু-স্বজন হারানোর বেদনায়, শরীরের কোন অঙ্গ বিকল হওয়ার যন্ত্রণায় সবর করি। ধৈর্য ধরি। ইনশাআল্লাহ, সাহায্য সাথে আসবেই।
লক্ষণীয় হল, আল্লাহ -এর কাছে সবসময় নিরাপদ থাকার দোয়া করতে হবে, বিপদ ও পরীক্ষা আসার দোয়া নয়। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসূল বললেন, 'চাচা! আমি আপনাকে ভালোবাসবো না!'
অপর বর্ণনায় এসেছে, ইবনে আব্বাস রাসূলকে বললেন, 'আমাকে একটি দোয়া শিখিয়ে দিন। আমি তা পড়ে আল্লাহকে ডাকবো।' রাসূল বললেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ. হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে ক্ষমা ও নিরাপত্তা কামনা করি। [প্রাগুক্ত]
বর্ণিত হয়েছে, জনৈক আনসার সাহাবি দোয়া করেছিলেন, 'আল্লাহ, তুমি যদি আখেরাতে আমাকে শাস্তি দাও, তবে তা দুনিয়াতেই দিয়ে দাও। তুমি আজই আমাকে সেই শাস্তি দিয়ে দাও।'
দোয়ার পর সাহাবি অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতার প্রভাবে শীর্ণকায় হয়ে পড়েন।
রাসূল তাকে দেখতে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি কোন কিছু বলে দোয়া করেছ?'
সাহাবি বললেন, 'আমি এই দোয়া করেছি- 'আল্লাহ, তুমি যদি আখেরাতে আমাকে শাস্তি দাও, তবে তা দুনিয়াতেই দিয়ে দাও। তুমি আজই আমাকে সেই শাস্তি দিয়ে দাও।'
রাসূল বললেন-
সুবহানাল্লাহ! তুমি আল্লাহর আযাব সহ্য করতে পারবে! তুমি এই দোয়া কর-
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ হে পরোয়ারদিগার! আমাদের দুনিয়াতেও কল্যাণ দান কর এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান কর। আমাদের দোযখের আযাব থেকে রক্ষা কর। [সূরা বাকারা: ২০১] [প্রাগুক্ত]
আসুন! আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা কামনা করি। যেন আমরা নিরাপত্তার চাদরে আবৃত থাকি। জানি না, এমন বিপদে পতিত হবো, যা সহ্য করতে পারবো না। সবর করতে পারবো না।
আল্লাহ আমাদের সকল অনিষ্ট থেকে নিরাপদ রেখো।
আমাদের জন্য সহজ ও সর্বোত্তম ফয়সালা রেখো।
আমাদের সামগ্রিক ও পরিপূর্ণ কল্যাণ দান করো। জীবনযাপনে স্বাচ্ছন্দময় করো। সময়ে সৌভাগ্যময় করো।
আল্লাহ! তুমি আমাদের উভয় জগতে অভিভাবক হও। সকল বিষয়ে সুন্দর পরিসমাপ্তি দাও। আমিন।
এক.
আল্লাহ -র সাহায্য প্রাপ্তির স্বাদ। বিজয়ের সুখ।
কত সাহাবি অসহায় ছিলেন। রিক্ত ছিলেন। আল্লাহ সাহায্যের মাধ্যমে তাদের চক্ষু শীতল করেছেন। সে মানুষ কত সৌভাগ্যবান, যে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করছে, খরচ করছে, দান-সদকা করছে। অবশেষে সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে বিজয়ী হচ্ছে!
বিলাল ইবনে রাবাহ। মূর্তিপূজকদের থেকে তিনি কতটা অপদস্থ হয়েছেন, তা আল্লাহই ভালো জানেন।
আল্লাহ জানেন, বিলাল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর বিশ্বাসী। বিলাল সালাত আদায়কারী। আখেরাতে সফলতা প্রত্যাশী। মক্কার পাহাড়ে পাহাড়ে টেনে হেঁচড়ে বুকে পাথর চাপা দেয়া হচ্ছে, তবু তার মুখ থেকে বের হচ্ছে- 'আহাদ, আহাদ' 'আল্লাহ এক, আল্লাহ এক'।
আল্লাহ্ চাইলেই ঐ পাপিষ্ঠ জালিমদের ধ্বংস করতে পারতেন। বিলালকে মুক্তি দিতে পারতেন। কিন্তু আল্লাহ্ বিলালকে পরীক্ষার একটি পাঠ শিখাতে চাইলেন। অতঃপর আল্লাহ্ বিলালকে বিজয় দান করলেন। ঈমানকে কুফরের উপর বিজয়ী করলেন। বিলালের একিন ও বিশ্বাসকে তাগুতের উপর প্রতিষ্ঠিত করলেন। বিলাল আল্লাহর হেদায়াতে পথপ্রাপ্ত হলেন। বিলাল এখন সফল লোকদের সর্দার। আমাদের মাঝে আজও প্রসিদ্ধ। আর মূর্তিপূজকরা বিফল। ব্যর্থ মনোরথ।
বিলাল ছিলেন ইসলামের মুয়াযযিন। বিশ্ব মুসলিম আজ বিলালকে চেনে。
কবি বলেন-
বিলালের আযান, যে আযানে প্রাণ পায় হাজার আযান।
মক্কা বিজয়ের দিন রাসূল বিলালকে আযান দিতে বললেন। বিলাল তাওহিদের স্তম্ভ কাবায় উঠে আযান দিলেন। তাগুত ও ভ্রষ্টতার নেতৃ-মুশরিকদের ক্ষেপানোর জন্য রাসূল বিলালকে কাবায় উঠালেন। রাসূল তাদের বোঝালেন- দেখ, যে গোলাম তোমাদের কাছে একটাকার মূল্যমানের নয়, সে আজ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর সুবাদে সবার সর্দার!
দেখ এই পবিত্র আল্লাহভীরু মুমিনকে, যে আজ কাবা চড়ে মানুষের কানে কানে তাওহিদের যবানে আযান ফুঁকছে!
দেখ, যাকে তোমরা পাথরের উপর টানা-হেঁচড়া করতে, প্রহার করতে, গালমন্দ বলতে, অপদস্থ করতে, সে আজ বিজয়ের আযান দিচ্ছে!
এ দুনিয়া শুনুক বিলালের আযান- এ যুগ শুনুক, মন দিয়ে শুনুক বিলালের আযান-
সত্য হৃদয়ের দৃঢ়বল বিলাল! আমাদের আনন্দ দাও তুমি সত্য মুসল্লী
তাওবার পানি দিয়ে ধুয়ে দাও, তুমি নিষ্ঠ মুসল্লী যেন পাবো মোরা অষ্টস্বর্গের রাজতোরণ...
আল্লাহ বিলালকে কীভাবে পরীক্ষা করলেন। বিলাল সবর করলেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। আল্লাহ তাকে চিরকালের জন্য সম্মানী করলেন। এই হল বিজয়। এই হল আল্লাহর সাহায্য।
দুই. মহাপ্রতিদান। পরীক্ষিত বান্দার জন্য আল্লাহ -র মহাপ্রতিদান। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল -র কাছে গেলাম। তখন তিনি জ্বরে ভুগছিলেন। আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কঠিন জ্বরে আক্রান্ত।' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ। তোমাদের দু'ব্যক্তি যতটুকু জ্বরে আক্রান্ত হয়, আমি একাই ততটুকু জ্বরে আক্রান্ত হই।' আমি বললাম, 'এটি এ জন্য যে, আপনার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সাওয়াব।' তিনি বললেন-
হাঁ ব্যাপারটি এমনই। কেননা যে কোন মুসলিম মুসিবতে আক্রান্ত হয়, চাই তা একটি কাঁটা কিংবা আরো ক্ষুদ্র কিছু হোক না কেন, এর দ্বারা আল্লাহ তার গোনাহগুলো মুছে দেন, যেভাবে গাছ থেকে পাতাগুলো ঝরে যায়। [বুখারি: ৫৬৪৭]
পরীক্ষার সাথে আল্লাহ -র পক্ষ থেকে রয়েছে সাওয়াব ও প্রতিদান। আল্লাহ -র পক্ষ থেকে যে পরীক্ষাই আসুক, চিন্তা, পেরেশানি, দুঃখ-কষ্ট, এমনকি সূর্যের তীব্রতাই হোক না কেন, তাতে সবর করা চাই। এতে থাকবে আল্লাহ পক্ষ থেকে প্রতিদান। বেশুমার সাওয়াব।
তিন. সম্মান। উচ্চ মর্যাদা। আল্লাহ মানুষকে বিপদ দিয়ে, মানুষের পরীক্ষা নিয়ে তাকে ছোট করতে চান না। তাকে মহান করতে চান। কেউ যদি আখেরাতের প্রতিদান চায়, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করতে চান।
চার. শিক্ষা গ্রহণ।
আল্লাহ মানুষকে বিপদ দিয়ে দাসত্বের পাঠদান করান। যে পাঠ কখনও ভুলার নয়। কারণ বিপদ ও পরীক্ষায় পতিত হয়ে মানুষ ছোট হয়ে আসে। বিনীত হয়ে আসে। চরিত্র সংশোধন করে নেয়। অনেক অজ্ঞ মানুষ এমন আছে, যারা অসুস্থ হলে আল্লাহ-র আনুগত্যের বেড়ি গলায় পরে নেয়।
পাঁচ. সবরের দীক্ষা।
রাসূল -র পক্ষ থেকে সবচে গুরুত্বপূর্ণ পাঠদান হল সবরের পাঠ।
ইমাম আহমদ বলেন, আমি কোরআনে সবর নিয়ে গবেষণা করলাম। নব্বইয়ের অধিক জায়গায় সবরের উল্লেখ হয়েছে।
ওলামায়ে কেরাম বলেন, যে সবরের বাহনে চড়তে পারে, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।
ওমর বলেন, আমরা সবচে উত্তম জীবনোপকরণ পেয়েছি সবর।
অনেকে বলেন, যখন আমরা সবর করি, মুক্তি পাই। সফল হই। যে সবর করে না, তার কোন প্রাপ্তি নেই। প্রাজ্ঞতা নেই। তার জীবনের সুন্দর পরিসমাপ্তি নেই। সুবিন্যস্ত কোন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নেই।
পাঠক! যে কোন বিপদে আসুন ধৈর্য ধারণ করি। আল্লাহর কাছে সাওয়াবের আশা রাখি। সুহাইব থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেন-
মুমিনের বিষয়টি বিস্ময়কর। তার যাবতীয় ব্যাপারই তার জন্য কল্যাণকর। এ বৈশিষ্ট্য মুমিন ছাড়া আর কারো নেই। যদি তার সুখ-শান্তি আসে তবে সে শোকর আদায় করে। এটা তার জন্য কল্যাণকর। যদি দুঃখ মুসীবত আসে তবে সে সবর করে। এটাও তার জন্য কল্যাণকর। [মুসলিম: ২৯৯৯]
সুতরাং আসুন! সর্বাবস্থায় সবর করি। বন্ধু-স্বজন হারানোর বেদনায়, শরীরের কোন অঙ্গ বিকল হওয়ার যন্ত্রণায় সবর করি। ধৈর্য ধরি। ইনশাআল্লাহ, সাহায্য সাথে আসবেই।
লক্ষণীয় হল, আল্লাহ -এর কাছে সবসময় নিরাপদ থাকার দোয়া করতে হবে, বিপদ ও পরীক্ষা আসার দোয়া নয়। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসূল বললেন, 'চাচা! আমি আপনাকে ভালোবাসবো না!'
অপর বর্ণনায় এসেছে, ইবনে আব্বাস রাসূলকে বললেন, 'আমাকে একটি দোয়া শিখিয়ে দিন। আমি তা পড়ে আল্লাহকে ডাকবো।' রাসূল বললেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ. হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে ক্ষমা ও নিরাপত্তা কামনা করি। [প্রাগুক্ত]
বর্ণিত হয়েছে, জনৈক আনসার সাহাবি দোয়া করেছিলেন, 'আল্লাহ, তুমি যদি আখেরাতে আমাকে শাস্তি দাও, তবে তা দুনিয়াতেই দিয়ে দাও। তুমি আজই আমাকে সেই শাস্তি দিয়ে দাও।'
দোয়ার পর সাহাবি অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতার প্রভাবে শীর্ণকায় হয়ে পড়েন।
রাসূল তাকে দেখতে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি কোন কিছু বলে দোয়া করেছ?'
সাহাবি বললেন, 'আমি এই দোয়া করেছি- 'আল্লাহ, তুমি যদি আখেরাতে আমাকে শাস্তি দাও, তবে তা দুনিয়াতেই দিয়ে দাও। তুমি আজই আমাকে সেই শাস্তি দিয়ে দাও।'
রাসূল বললেন-
সুবহানাল্লাহ! তুমি আল্লাহর আযাব সহ্য করতে পারবে! তুমি এই দোয়া কর-
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ হে পরোয়ারদিগার! আমাদের দুনিয়াতেও কল্যাণ দান কর এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান কর। আমাদের দোযখের আযাব থেকে রক্ষা কর। [সূরা বাকারা: ২০১] [প্রাগুক্ত]
আসুন! আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা কামনা করি। যেন আমরা নিরাপত্তার চাদরে আবৃত থাকি। জানি না, এমন বিপদে পতিত হবো, যা সহ্য করতে পারবো না। সবর করতে পারবো না।
আল্লাহ আমাদের সকল অনিষ্ট থেকে নিরাপদ রেখো।
আমাদের জন্য সহজ ও সর্বোত্তম ফয়সালা রেখো।
আমাদের সামগ্রিক ও পরিপূর্ণ কল্যাণ দান করো। জীবনযাপনে স্বাচ্ছন্দময় করো। সময়ে সৌভাগ্যময় করো।
আল্লাহ! তুমি আমাদের উভয় জগতে অভিভাবক হও। সকল বিষয়ে সুন্দর পরিসমাপ্তি দাও। আমিন।