📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 প্রিয় সন্তান

📄 প্রিয় সন্তান


সন্তান-সন্ততি আল্লাহর অপার নেয়ামত। আল্লাহ সৎকর্মশীলদের আলোচনা করেছেন। বলেছেন, তারা আল্লাহ -র কাছে বলত-
হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানদের পক্ষ থেকে আমদের জন্য চোখের শীতলতা দান কর। [সূরা ফুরকান : ৭৪]
জীবন সুশোভিত করে তোলে সন্তান ও সম্পদ। এগুলো পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য।
সন্তান চোখের সামনে বেড়ে ওঠে, ইসলামের আলোকে জীবন সাজিয়ে তোলে, আল্লাহ-র সেজদায় অবনত হয়, কোরআনের মধুময় তেলাওয়াত শোনায়, -এর চেয়ে সুখকর চিত্র জীবনের আর কোন পাটে আছে!
কিন্তু সেই সন্তানকে যখন আল্লাহ চোখের সামনে থেকে ডেকে নেন, তখন কী আর করার থাকে!
রাসূল বলেন-
আল্লাহ বলেন, 'আমার মুমিন বান্দার অন্তর-প্রিয়কে যখন কেড়ে নেই এবং সে ধৈর্য ধারণ করে, তখন তার জন্য জান্নাতই উপহার! [বুখারী : ৬৪২৪]
আল্লাহ সন্তান কেড়ে নেয়ার কথা বলেননি। বাবা, ভাই বা বন্ধু কেড়ে নেয়ার কথা বলেননি। একজনের কথা বলে অপরজনকে বাদ দেননি। বরং যার বিচ্ছেদে কষ্ট আসে, দুঃখ লাগে, সেই অন্তর-প্রিয়। তিনি বাবা হতে পারেন। সন্তান হতে পারেন। ভাই-বন্ধুও হতে পারেন। তাদের যে কারও বিচ্ছেদে ধৈর্য ধারণ করলে তার জন্য জান্নাত উপহার!
রাসূল ইরশাদ করেন-
কারো সন্তান মারা গেলে আল্লাহ ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করেন, 'তোমরা কি আমার বান্দার সন্তানকে উঠিয়ে নিয়েছ? ফেরেশতারা বলে, 'হাঁ।'
আল্লাহ বলেন, 'তোমরা কি তার কলিজার ধনকে কেড়ে নিলে?' ফেরেশতারা বলে, 'হাঁ।'
আল্লাহ জিজ্ঞেস করেন, 'আমার বান্দা কী বলল?' ফেরেশতারা বলে, 'সে তোমার প্রশংসা করেছে এবং ইন্নালিল্লাহ পড়েছে।'
তখন আল্লাহ বলেন, 'তোমরা আমার বান্দার জন্য জান্নাতে একটি ঘর বানাও এবং তার নাম দাও 'বাইতুল হামদ।” [আহমাদ: ১৯২২৬]
জান্নাতের সেই ভবনটি হবে সাদা মেঘের মত। উজ্জ্বল তারার মত। সেখানে লেখা থাকবে- 'বাইতুল হামদ'। সন্তান হারানোর ব্যথায় যারা ধৈর্য ধারণ করেছে, তারা সেখানে প্রবেশ করবে।
জান্নাতের এই সুসংবাদ মহিলার জন্যও। বরং সন্তান হারানো মহিলা ধৈর্যধারণ করলে তার জন্য রাসূল যে সুসংবাদ দিয়েছেন, পুরুষের জন্য তা দেননি।
রাসূল বলেন- তোমাদের মধ্যে যে মহিলা তিনটি সন্তান আগেই পাঠাবে, (তার জীবিতাবস্থায় তিনটি সন্তান মারা গেলে) তারা তার জন্য জাহান্নামের পর্দাস্বরূপ হয়ে থাকবে।
তখন এক মহিলা বলল, 'আর দুটি পাঠালে?' রাসূল বললেন, 'দুটি পাঠালেও।' [বুখারি: ১০২]
কোন কোন বর্ণনা মতে মহিলা আবার জিজ্ঞেস করল, 'আর একটি পাঠালে?' রাসূল বললেন, 'একটি পাঠালেও।'
একটি সৎসন্তানের মৃত্যুতে সবরকারীর জন্য আল্লাহ জান্নাত উপহার রেখেছেন! সকল প্রশংসা আল্লাহরই!

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 পছন্দের দেহখানি

📄 পছন্দের দেহখানি


আল্লাহ মানুষকে শরীর দিয়েছেন। শক্তি ও সামর্থ্য দিয়েছেন। যৌবন- জৈবিকতা দিয়েছেন। উদ্যম দিয়েছেন। মানুষ তা ভোগ করবে। ব্যবহার করবে।
কিন্তু আল্লাহ তার গভীর হেকমত থেকে এসব ছিনিয়েও নিতে পারেন। অসংখ্য বুযুর্গদের শারীরিক রোগ আল্লাহ দিয়েছেন। শারীরিক পরীক্ষা আল্লাহ নিয়েছেন।
ওরওয়া ইবনে যুবাইর। আয়েশা থেকে অসংখ্য হাদিস বর্ণনাকারী। তিনি চারদিনে একবার কোরআন খতম করতেন। আল্লাহ তার মর্যাদা অত্যুচ্চে পৌঁছানোর ফয়সালা করলেন। তাকে পরীক্ষায় নিপতীত করলেন।
ওরওয়া ইবনে যুবাইর শামের উদ্দেশে সফরে বেরুলেন। পথিমধ্যে তার পায়ে ক্ষয়রোগ দেখা দিল। ডাক্তাররা তার পা কেটে ফেলতে বললেন। তিনি বললেন, 'আমি সবর করছি। আমি এসবের অমুখাপেক্ষী।'
ক্ষয়রোগ বাড়তে লাগল। নলা পর্যন্ত পৌঁছল। ডাক্তাররা আবার পা কাটতে বললেন। তিনি একই উত্তর দিলেন- 'আমি সবর করছি। আমি এসবের অমুখাপেক্ষী।'
ক্ষয় রান পর্যন্ত বৃদ্ধি পেল। ডাক্তাররা বললেন, 'সম্পূর্ণ পা কাটা ছাড়া আর উপায় দেখছি না। না হয় আপনার মৃত্যু হবে।'
তিনি বললেন, 'আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাই। আমরা আল্লাহর জন্য। আল্লাহর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।' 'ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।'
ডাক্তাররা বলল, 'আপনাকে এক পেয়ালা মদ পান করিয়ে পা কাটতে হবে।'
তিনি বললেন, 'সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ আমাকে আকল দিয়েছেন, আর তা আমি মদ খেয়ে বিগড়াবো! আমি অযু করে সালাতে দাঁড়ালে তোমরা পা কেটো।'
ওরওয়া ইবনে যুবাইর অযু করে সালাত শুরু করলেন। আল্লাহকে ডাকছেন। প্রাণ মিশিয়ে কণ্ঠ ছেড়ে তেলাওয়াত করছেন। ডাক্তাররা পা কেটে ফেললেন। প্রচুর রক্ত বেরুল। বেহুশ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন।
কয়েক ঘন্টা পর জ্ঞান ফিরল। তাকে সংবাদ জানানো হল, 'খলিফার সাওয়ারীর পায়ের আঘাতে আপনার ছেলে মৃত্যু বরণ করেছে।'
আল্লাহর কি বিধান! ওরওয়া ইবনে যুবাইরের এই জ্ঞানহারা সময়টুকুর মধ্যে তার ছেলের মৃত্যু! কীভাবে বিপদের পর বিপদ। আল্লাহর কী হেকমত! কেমন তকদীর! কেমন ফয়সালা!
ওরওয়া ইবনে যুবাইর (রাঃ) ছেলের মৃত্যুর সংবাদ শুনে বললেন, 'আলহামদুলিল্লাহ! ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন। আল্লাহ, তোমার জন্য সকল প্রশংসা। তুমি দিয়েছ, তুমিই নিয়ে গেছ। তুমি আমাকে পরীক্ষায় ফেলেছ, তুমিই আমাকে সুস্থ করছ। তুমি আমাকে চারটি অঙ্গ দিয়ে মাত্র একটি নিয়েছ। তোমার কৃতজ্ঞতা পোষণ করছি। সব প্রশংসা তোমার।'
অতঃপর তিনি এই কবিতাগুলো পাঠ করলেন- রুম পায়ে আমায় করোনি ভগ্নমত -আমি করেছি সবর। বিবেক বুদ্ধি জ্ঞানে করিনি কিছু -আমি করেছি সবর। রোগীর আগে তুমি নিয়েছ এক সুস্থ যুবককে -আমি করেছি সবর।
ওরওয়া ইবনে যুবাইর (রাঃ) সবর করলেন। আল্লাহর কাছে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন।
পরীক্ষা কখনও অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আল্লাহ এর দ্বারা মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। ভুলত্রুটি ক্ষমা করেন।
ইবরাহিম (আঃ)। তাওহিদের স্তম্ভ। ইসলামি আকিদার উসতায। তার মাধ্যমে পৃথিবীব্যাপি তাওহিদের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা হয়েছে।
আল্লাহ (সুবঃ) তাকে অনেক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করেছিলেন। তাকে পোড়ানোর জন্য কাঠখড়ি একত্র করা হল। তাতে আগুন প্রজ্জ্বলিত হল। ইবরাহিম (আঃ)-র সামনে আল্লাহর দরজা খোলা ছিল। ধরার মত আল্লাহ (সুবঃ)-র রজ্জু অবশিষ্ট ছিল। তার তওয়াক্কুল ছিল উচ্চমাত্রার।
জিবরাঈল (আঃ) তার কাছে এলেন। ইবরাহিমকে বললেন, 'আপনার কোন সহযোগিতায় আসতে পারি কি?'
তিনি উত্তর করলেন, 'তোমার সহযোগিতা নয়, আমি আল্লাহ (সুবঃ)-র সহযোগিতার অপেক্ষায় আছি!'
ইবরাহিমকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হল। তিনি পাঠ করলেন- 'হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি'মাল ওয়াকীল'।
ইবনে আব্বাস ﷇ একটি দোয়া বর্ণনা করেন, 'হাসবুনাল্লাহু ওয়ানি'মাল ওয়াকীল'। 'আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ঠ, তিনি উত্তম কার্যনির্বাহী!'
ইবনে আব্বাস ﷇ বলেন, "এই দোয়াটি ইবরাহিম ﷇ অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময় পড়েছিলেন। আর রাসুল ﷆ পড়েছিলেন, যখন মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদের জমায়েত হওয়ার সংবাদ এসেছিল। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে-
যখন তাদেরকে লোকে বলেছিলো, তোমাদের বিরুদ্ধে লোক জমায়েত হয়েছে। সুতরাং তোমরা তাদের ভয় কর। কিন্তু এ কথা তাদের বিশ্বাস দৃঢ়তর করেছিল এবং তারা বলেছিল, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কত উত্তম কর্মবিধায়ক। [সূরা আলে ইমরান: ১৭৩]
ইবরাহিম ﷇ অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হয়ে আল্লাহ ﷇ-র মহত্বের কথা স্মরণ করলেন। আল্লাহ ﷇ-ই যথেষ্ট। আল্লাহ ছাড়া কোন হেফযতকারী নেই। কবির ভাষায়-
ওগো আল্লাহ আমার আশার আধার, লক্ষ-কোটি কৃপা তোমার, আমায় রক্ষা করেছো।
অত্যাচারির নিনাদ ভারি, ধ্বংস হবো সমূল ছাড়ি; তুমি রক্ষা করেছো।
তুমি আমায় রক্ষা করে জালিমমনে ভয়ের ভয়াল আঁধার দিয়েছো।
ইবরাহিম অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হয়ে আল্লাহকে ডাকলেন। আল্লাহ ﷇ অগ্নিকে বললেন-
হে অগ্নি, তুমি ইবরাহিমের জন্য শীতল হয়ে যাও, আরামদায়ক হয়ে যাও। [সূরা আম্বিয়া: ৬৯]
আগুনকে শুধু ঠাণ্ডা হতে বললে তা বরফ হয়ে যেত। এজন্য আরামদায়ক ঠান্ডা হতে বললেন। সব আল্লাহ ﷇ-রই কুদরত!
ইবরাহিম-কে আল্লাহ আরও কঠিন পরীক্ষা করেছিলেন সন্তান ইসমাঈল দ্বারা। ইসমাঈল ধীরে ধীরে পরিণত বয়সে পৌঁছলেন। বাবার সাথে চলাফেরা করছেন। এই বয়সে সাধারণত সন্তানের প্রতি বাবার ভালোবাসা অত্যধিক হয়। সন্তানের প্রতি বাবার অন্তর ঝুঁকে যায় খুব বেশি। ইবরাহিমেরও তাই। কিন্তু তার অন্তরে তো শুধু আল্লাহরই ভালোবাসা থাকবে। আল্লাহ ইবরাহিমের অন্তর খালি করতে চাইলেন-
যবে অন্তরের ভালোবাসায় থাকবে না নিজের কিছু, তবেই তো হবে তুমি নিরেট বন্ধু!
ইবরাহিম আল্লাহর খলীল। অন্তরঙ্গ বন্ধু। ইবরাহিমের মনে আল্লাহর ভালোবাসাই বেশি থাকবে। ইসমাঈল যখন পরিণত বয়সে পৌঁছলেন, বাবার নিরঙ্কুশ ভালোবাসা প্রাপ্তির বয়সে পৌঁছলেন, আল্লাহ ইবরাহিম-কে পরীক্ষা করলেন- ইবরাহিমের মনে কার ভালোবাসা বেশি!
ইবরাহিমকে স্বপ্নে দেখালেন- তিনি তার সন্তানকে জবাই করছেন!
নবিদের স্বপ্ন সত্য। স্বপ্ন নিশ্চিত হয়ে তিনি সকালে ছেলেকে জানালেন। ছেলেও একজন প্রকৃত মুমিনের মত প্রতিক্রিয়া জানালেন। আল্লাহ বলেন-
যারা বংশধর ছিলেন পরস্পরের। আল্লাহ শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী। [সূরা আলে ইমরান: ৩৪]
কবির ভাষায়- বাড়ন্ত ছেলে বাড়বে সেভাবে, বাবার প্রতিপালন হবে যেভাবে।
অতঃপর সে যখন পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হল, তখন ইবরাহিম তাকে বললেন, ছেলে! আমি স্বপ্নে দেখি- 'তোমাকে জবাই করছি। এখন তোমার অভিমত কী দেখ।' সে বলল-
পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে সবরকারী পাবেন। [সূরা সাফফাত : ১০২]
ইসমাঈল কত বিনয়ী ভাষায় কথা বললেন! তিনি এভাবেও বলতে পারতেন- 'আপনি আদেশ মত কাজ করুন। আমাকে সবরকারী পাবেন।'
কিন্তু সবর কি তার হাতে! ইচ্ছা করলেই তিনি সবর করতে পারবেন! সবর আল্লাহর হাতে। এ জন্য ইসমাঈল বললেন, 'আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে সবরকারী পাবেন।'
ইবরাহিম ইসমাঈলকে জবাই করার প্রস্তুতি নিলেন। এরপরের ঘটনা কোরআনের ভাষায়-
আমি তার পরিবর্তে জবাই করার জন্য দিলাম এক মহান জন্তু। [সূরা সাফফাত : ১০৭]
ইবরাহিম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। সফল হলেন। প্রমাণ করলেন- তিনি সত্যবাদী। তিনি মুহসিন। আল্লাহ তার জন্য পরবর্তী প্রজন্মে সুনাম ছড়িয়ে দিলেন- তিনি 'সত্যভাষী'। মানুষের মুখে মুখে কেয়ামত পর্যন্ত তার প্রশংসা ও স্তুতি। প্রজন্মান্তরে তার উপর বর্ষিত হচ্ছে দুরূদ ও সালাম। আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 বিপদবালাই

📄 বিপদবালাই


আল্লাহ যুগে যুগে তার প্রিয় বান্দাদের বিভিন্ন বিপদে ফেলে পরীক্ষা করেছেন।
ইউনুস তার কওমের সাথে রাগ হয়ে চলে গেলেন। আল্লাহ -র কাছে অনুমতি নেননি। নৌকাযোগে যাচ্ছিলেন কোথাও। ঘটনাচক্রে তাকে নৌকা থেকে ফেলে দেয়া হল। তিনি মাছের পেটে চলে গেলেন।
রাতের অন্ধকার। সমুদ্রের অন্ধকার। মাছের পেটের অন্ধকার। তিন স্তরের অন্ধকারে তার সামনে আল্লাহর রজ্জু ছাড়া আর কোন রজ্জু নয়। স্ত্রী-সন্তান-বন্ধু কাউকে স্মরণ করলেন না। একমাত্র আল্লাহকেই স্মরণ করলেন। বললেন, তুমি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তুমি নির্দোষ, আমি গোনাহগার। [সূরা আম্বিয়া: ৮৭]
রাসূল বলেন-
লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনাযযলিমীন'। 'তুমি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। তুমি নির্দোষ, আমি গোনাহগার।' -এটি আমার ভাইয়ের দোয়া। বিপদগ্রস্ত যে কেউ এই দোয়া পাঠ করলে আল্লাহ তার বিপদ দূর করে দিবেন। [আহমাদ : ১৪৬৫]
আন্দালুসি ছেলেকে উপদেশ করেছিলেন-
যখন সেজদা কর আল্লাহ-কে ডাক, যেমন ডেকেছেন ইউনুস।
দুনিয়াতে বেশি বেশি আল্লাহ-র যিকির নিজের অভ্যাস বানাও। আসমানে তুমি স্মরিত হবে।
কেউ এই দোয়া পড়ে আল্লাহ-কে ডাকলে আল্লাহ তার বিপদ দূর করবেন। চিন্তা-পেরেশানি দূর করবেন। অকল্পনীয় জায়গা থেকে রিযিকের ব্যবস্থা করবেন। আল্লাহ-র কাছে সবরকারীদের সাওয়াব ও প্রতিদান মহান!
আল্লাহ ইউনুস-কে তিন পর্দার অন্ধকার থেকে মুক্তি দিলেন-
যদি তিনি আল্লাহর তাসবিহ পাঠ না করতেন, তবে তাকে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত মাছের পেটেই থাকতে হত। [সূরা সাফফাত : ১৪৩, ১৪৪]
ইয়াকুব
কোরআনে বর্ণিত বিপদবালাই ও পরীক্ষাগুলো একই নয়, বিভিন্ন ধরনের। আল্লাহ ব্যক্তি বিশেষ পরীক্ষা ভিন্ন ভিন্ন নিয়েছেন। নেয়ামতও ভিন্ন ভিন্ন দিয়েছেন।
ইয়াকুব-র ছেলে ইউসুফ হারিয়ে গেলেন। কোথায় হারালেন, ইয়াকুব জানেন না। তখন ইয়াকুব বারবার এই কথা বলছিলেন-
এখন সবর করাই আমার পক্ষে শ্রেয়। তোমরা যা বর্ণনা করছ, সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল। [সূরা ইউসুফ: ১৮]
ইউসুফ চল্লিশ বছর পিতার কাছ থেকে দূরে রইলেন। দীর্ঘ বিচ্ছেদে তিনিও ভালোবাসার একটা টান অনুভব করলেন-
বিচ্ছেদ হল দীর্ঘকাল, আমাদের পিতা-পুত্রের। শুকায়নি চোখের জল, কমেনি হৃদয়ের টান এতটুকুন।
যখনই আমাদের মন ডাকে মনকে, কষ্টরা উঠে আসে বুক ফেটে। ইয়াকুব পুত্রশোকে বুক ভাসালেন। নিঃশ্বাস ভারি হয়ে এল ক্রন্দনে। চোখ দুটি সাদা হয়ে গেল। তিনি সবসময় চিন্তায় পেরেশানিতে মগ্ন থেকে বলতেন-
আমি আমার দুঃখ ও অস্থিরতা আল্লাহর সমীপেই নিবেদন করছি। [সূরা ইউসুফ: ৮৬]
তিনি সবকিছু আল্লাহ -র সমীপেই নিবেদন করলেন। আল্লাহ -র পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। সবরের প্রতিদানে আল্লাহ তাঁর মর্যাদা বাড়িয়ে দিলেন।
একজন খাঁটি বান্দার এ-ই বৈশিষ্ট্য- যত দামী হোক, মূল্যবান হোক, কিছু হারিয়ে গেলে আল্লাহ -র কাছেই অনুযোগ করবে।
ইউসুফ
ইউসুফ পরীক্ষায় অবতীর্ণ হলেন। তাঁর উপর অপবাদ আরোপ হল। তিনি সবর করলেন। ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে সবকিছু আল্লাহর কাছে সমর্পণ করলেন। আল্লাহ তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করলেন। তাঁর প্রশংসা করলেন-
নিশ্চয় সে আমার মনোনীত বান্দাদের একজন। [সূরা ইউসুফ : ২৪] ইউসুফ -এর পরীক্ষা ছিল অত্যন্ত ভয়ানক। ইবনুল কাইয়িম মাদারিজুস সালিকীন গ্রন্থে ইউসুফের পরীক্ষা ভয়ানক হওয়ার কিছু কারণ উল্লেখ করেন-
তিনি টগবগে যুবক ছিলেন। যুলাইখার আহ্বান করা মন্দ কাজে নিপতীত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা ছিল।
তিনি সেখানে নিঃস্ব ছিলেন। তাঁর পক্ষে কাউকেই পাননি।
তিনি সুলতানের ঘরে ছিলেন। যেখানে সুলতানের স্ত্রী ছিলেন নির্ভয়। কোন শাস্তির আশঙ্কা তাঁর ছিল না।
যুলাইখা ছিলেন যেন অপ্সরী। সাথে পরিধান করেছিলেন স্বর্ণালঙ্কার আর সবধরনের সাজসজ্জা।
যুলাইখা তাঁকে ঘরে একাকী করে ফেলেছেন। দরজাগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন। তাঁকে প্ররোচিত করেছেন।
এতকিছুর পরও ইউসুফ সবর করেছেন। বলেছেন- এই কাজ থেকে আল্লাহর পানাহ!
কোরআনে বর্ণিত ইউসুফ -এর ঘটনাটি বারবার পাঠ করা প্রত্যেক মুসলমানের জরুরী।
ইফকের ঘটনা
ইসলামের ইতিহাসে বহুল আলোচিত ইফকের ঘটনা। এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে বিস্তৃত এক পরীক্ষা। আয়েশা থেকে এই ঘটনাটি বুখারি গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে-
রাসূল জিহাদে বের হলে স্ত্রীদের নামে লটারি করতেন। লটারিতে যার নাম উঠত, তাঁকে রাসূল সাথে নিয়ে যেতেন।
আয়েশা এক যুদ্ধে রাসূলের সাথে গেলেন। যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে এক জায়গায় যাত্রাবিরতি হল। সেখানে আয়েশা -এর গলার হার হারিয়ে গেলে তিনি তা খোঁজার জন্য বেরুলেন।
এদিকে কাফেলা রওয়ানা হয়ে গেল। তারা ধারণা করেছিল আয়েশা হাওদাজে (পাল্কি সদৃশ) আছেন। আয়েশা -কে তারা আর খোঁজল না। আয়েশা -এর হাওদাজ উটে চড়িয়ে কাফেলা চলে গেল।
আয়েশা জায়গায় ফিরে এসে দেখেন কেউ নেই। তিনি এখন কী করবেন?
আয়েশা নিজেকে পর্দাবৃত করে সেখানেই অবস্থান করলেন এবং বললেন- 'ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।' 'নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো।'
আল্লাহ কোরআনে সবরকারীদের বৈশিষ্ট্য বলেন-
তারা বিপদে পতিত হয়ে বলে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তারই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো। [সূরা বাকারা : ১৫৪]
কাফেলার পেছনে থাকা সাফওয়ান ইবনে মুয়াত্তাল এসে আয়েশা পর্দাবৃত অবস্থায় দেখলেন। তাকে দেখে বললেন- আল্লাহই একমাত্র সাহায্যস্থল!
আয়েশা কসম করে বলেন, সফওয়ান তার সাথে এক শব্দ কথাও বলেননি। সফওয়ান তার উট আয়েশা রাযি. সামনে বসিয়ে দিলেন। আয়েশা উটে চেপে বসলেন। সফওয়ান উটের লাগাম ধরে হাঁটা শুরু করলেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক জায়গায় সাহাবাদের নিয়ে অবস্থান করলেন। সফওয়ান আয়েশা সহ তাদের সাথে মিলিত হলেন।
মুমিনরা জানতেন- আয়েশা ভদ্র সম্ভ্রান্ত মহিলা। তিনি সিদ্দীকা। নিষ্পাপ। পবিত্রতার তিলোত্তমা।
আর যারা ঈমান রাখে, তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়। [সূরা তাওবা: ১২৪]
কিন্তু মোনাফেকদের মনে কপটতা চাড়া দিল। সন্দেহ নড়ে উঠল। আল্লাহ হেফাযত করুন; তারা চারদিকে কথা ছড়াতে লাগল- আয়েশা কেন দেরি করলেন! সফওয়ান কেন আয়েশাকে নিয়ে এল! এসবের কারণ কী?
মোনাফেকদের নেফাক অহঙ্কার ঔদ্ধত্য এবং আল্লাহবিমুখিতা এমনই বৃদ্ধি পেল!
রাসূল মদিনায় ফিরে এলেন। তখনও এতকিছু অবগত হননি।
আয়েশা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কিন্তু তিনি রাসূলের কাছে আগের মত প্রেম অনুভব করলেন না। কারণ এতক্ষণে সব কথা রাসূলের কানে এসেছিল। রাসূল আয়েশার কাছে যেতেন। খোঁজ নিতেন- 'আয়েশা অসুস্থ! সে কেমন আছে?' এর বেশি কোন কথা বলতেন না।
আয়েশা চিন্তিত হলেন। তার সন্দেহ হল, রাসূলের কাছে আগের মত প্রেম সোহাগ অনুভব করছি না কেন?
আয়েশা উম্মে মিসতাহর কাছে সব জানলেন। সব জেনে আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য রাসূলের কাছে বাবা-মায়ের কাছে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। রাসূলের অনুমতিক্রমে অসুস্থ অবস্থায়ই তিনি বাবা-মায়ের কাছে গেলেন।
আয়েশা তখনও জানতেন না, যে অপবাদ তাকে দেয়া হয়েছে, তার আড়ালে রয়েছে মানুষের সবচে মর্যাদাকর অবস্থান! সাইয়িদ কুতুব বলেন-
এই ঘটনায় রাসূলের মর্যাদা এবং রিসালাতে আঘাত এল। রাসূল ও সাহাবাদের স্তম্ভিত করে পূর্ণ একমাসে গড়াল। মোনাফেকরা শুধু অপবাদই ছড়াতে পারল।
একজন সংস্কারক মানবরক্ত নতুন করে সঞ্চালন করতে চান। নিজের মর্যাদায় পরিবারের মর্যাদায় কোন আঘাত আসলে সে অন্ধকার থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসতে চান। না হয় কীভাবে তিনি ময়দানে দাঁড়াবেন! কীভাবে তিনি রিসালাতের দায়িত্ব পালন করবেন! কীভাবে মানুষকে শিখাবেন! জিহাদ করবেন! সমস্যা সমাধান করবেন!
এ এক ভয়ানক পরিস্থিতি। ভয়ঙ্কর বিপদ। রহস্যের মূল পাঠ হল, আল্লাহ এতদিন অহি নাযিল করেননি। আল্লাহ মানবজাতির সন্দেহপ্রবণতা পরীক্ষা করলেন। মুমিন মোনাফেক এবং সত্যবাদী মিথ্যাবাদীর পার্থক্য প্রকাশ করলেন।
রাসূল নিকটভাজন বন্ধু ও চাচাতো ভাই আলি এর কাছে এলেন। মুসা -র জন্য হারুন যেমন ছিলেন, রাসূলের জন্য আলিও তেমনই ছিলেন। রাসূল আলিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আলি! কী মনে করছ তুমি!'
আলি উত্তর দিলেন, 'আল্লাহর রাসূল! আয়েশা ছাড়া আরও অনেক মহিলা আছে।'
রাসূল উসামা এর কাছে পরামর্শ করলেন। তিনি বললেন, 'আল্লাহর রাসূল! আপনার স্ত্রীর ব্যাপারে ভালো ছাড়া আর কিছুই জানি না।'
রাসূল আয়েশা এর খেদমতে নিয়োজিত বাদির কাছে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কী মনে করছ?'
বাদি বললেন, ‘তিনি নিয়মিত রোযাদার। তাহাজ্জুদগুযার। ইবাদাতগুযার। আমি তাকে শুধু ভালোই জানি। তিনি ঘুমালে পোষা প্রাণীরা তৈরি থাকা খামিরা খেয়ে ফেলে।’
অর্থাৎ, তার সারল্য ও সহজতা খুব বেশি, ফলে ছাগল এসে পাত্র থেকে খামিরা খেয়ে ফেলে।
আয়েশা একদিন মহিলাদের সাথে বের হলেন। এক মহিলা তাকে অপবাদের কথা জানাল। আয়েশা তা শুনে মুখ থুবড়ে পরে গেলেন। তার অসুস্থতা আরও বৃদ্ধি পেল। অস্থিরতা দ্বিগুণ হল। তিনি ঘুমোতে পারতেন না। কান্নায় কলিজা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হত।
রাসূল তার কাছে এলেন। বললেন, ‘আয়েশা! তুমি অপরাধে সম্পৃক্ত হয়ে থাকলে আল্লাহর কাছে তাওবা কর। ক্ষমা প্রার্থনা কর। তুমি পবিত্র হলে অচিরেই আল্লাহ তোমার পবিত্রতা ঘোষণা করবেন।’
আয়েশা এ কথা শুনে বাবার কাছে বললেন, ‘আমার পক্ষ থেকে উত্তর দিন।’
বাবা বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি কী বলবো, বুঝছি না।’
আয়েশা রাযি. মায়ের কাছে গেলেন, ‘রাসূলের সাথে কথা বলুন।’
মা বললেন, ‘আমি কী বলবো, জানি না।’
আয়েশা থেকে বসলেন। বললেন, ‘আমার আর আপনাদের দৃষ্টান্ত আবু ইউসুফের এই কথার মত-
এখন সবর করাই আমার পক্ষে শ্রেয়। তোমরা যা বর্ণনা করছ, সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল।’ [সূরা ইউসুফ: ১৮]
আয়েশা গোস্বায় ইয়াকুব -র নাম ভুলে ‘আবু ইউসুফ’ বলেছেন।
রাসূল ﷺ সেখান থেকে সড়তে না সড়তেই অহি নাযিল হল। তিনি ঘুমিয়েছিলেন। এই আয়াত তেলাওয়াত করতে করতে জাগ্রত হলেন-
যারা মিথ্যা অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। তোমরা একে নিজেদের জন্য খারাপ মনে করো না, বরং এটা তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক। [সূরা নূর: ১১]
আল্লাহ সপ্তআকাশ উপর থেকে আয়েশা এর পবিত্রতা ঘোষণা করলেন। তার মর্যাদা আগের চেয়ে বহুতর বৃদ্ধি করলেন। আয়েশা এর ধৈর্যের ফলে আল্লাহ তার অসংখ্য ভুলত্রুটি ক্ষমা করলেন। [বুখারি : ২৬৬১]
যারা মিথ্যা অপবাদ রটিয়েছিল, রাসূল তাদের শাস্তি প্রদান করলেন। বেত্রাঘাত করলেন।
রাসূল অনেক কঠিন কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে পরীক্ষিত হয়েছেন। জিহাদের ময়দানে পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। সবর করেছেন। ধৈর্য ধারণ করেছেন।
কলিজার ধন, হৃদয়ের আবেগ পুত্র ইবরাহিমের দুই বছর বয়সের মৃত্যু ছিল কঠিন একটি পরীক্ষা। আনাস রাযি. বলেন, আমি রাসূল-র সাথে গিয়েছিলাম। রাসূলের সামনে পুত্র ইবরাহিমকে আনা হল। তখন সে মৃত্যুমুখী। প্রাণ উড়ুউড়ু। রাসূল তাকে কোলে নিলেন। কেঁদে কেঁদে বললেন-
ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন। চোখ কাঁদছে। হৃদয় অস্থির হচ্ছে। তবু আমার আল্লাহ যাতে সন্তুষ্ট, আমি তাই বলি। ইবরাহিম! তোমার বিচ্ছেদে আমরা ভারাক্রান্ত। [বুখারি : ১৩০৩]
রাসূলের মেয়ে ইন্তেকাল করেছেন। রাসূল সবর করেছেন। ধৈর্য ধরেছেন। যাইনাব এর কবরের কাছে মাটি আঁচড়ে কেঁদে কেঁদে বলছেন-
কসম সেই সত্ত্বার, যার হাতে আমার প্রাণ! আমি যা জানি, তোমরা তা জানলে কম হাসতে এবং বেশি বেশি কাঁদতে। [বুখারি: ৪২৬১]
রাসূল দাওয়াত প্রচারেও অনেক পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। তাকে কাফেররা জাদুকর, কবি, গণক বলেছিল। এগুলোও পরীক্ষা। রাসূল ধৈর্য ধরেছেন। সবর করেছেন।
পরীক্ষায় নিপতিত হওয়া নবীদের সুন্নত। বিভিন্নভাবে আমাদের সামনে পরীক্ষা আসতে পারে। এমন জায়গা থেকে এমনভাবে পরীক্ষা আসবে, কল্পনারও বাইরে থেকে। তখন আমাদের একটাই করণীয়- সবর। ধৈর্য।

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 বুযুর্গদের বিপদে পরীক্ষিত হওয়ার ঘটনা

📄 বুযুর্গদের বিপদে পরীক্ষিত হওয়ার ঘটনা


আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বুযুর্গরাও নানা বিপদে নিপতিত হয়েছেন এবং পরীক্ষিত হয়েছেন।
ইবনুল কাইয়িম বলেন, হে দুর্বলমনা! নূহ আলাইহিস সালাম রাস্তায় রাস্তায় আর্তনাদ করে ফিরেছেন। ইয়াহইয়া জবাই হয়েছেন। যাকারিয়া হত্যা হয়েছেন। ইমামগণ কারাবন্দী হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য ওলামায়ে কেরাম বেত্রাঘাতে আহত হয়েছেন।
এভাবেই সবাই পরীক্ষিত হয়েছেন। উম্মতের নেতা হয়েছেন-
আমি তাদের নেতা বানালাম। তারা আমার নির্দেশ অনুসারে পথ প্রদর্শন করতেন। আমি তাদের প্রতি অহি নাযিল করলাম সৎকর্ম করার, সালাত কায়েম করার এবং যাকাত দান করার। তারা আমার এবাদতে ব্যাপৃত ছিল। [সূরা আম্বিয়া: ৭৩]
ইমাম আহমদ ; আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের ইমাম। হাজারে হাজার মারফু মাওকুফ মুসনাদ মাকতু আসার এবং তাবেঈদের বাণী তার মুখস্থ ছিল। তিনি কারাবন্দী হয়েছিলেন। চাবুকের আঘাতে জর্জরিত হয়েছিলেন। কেন?
এবাদতকারী এবং দুনিয়াবিুখ হয়ে চাবুকের আঘাতে জর্জরিত হয়েছেন!
হাদিসের অঙ্গনে ব্যাপক পারদর্শী হয়েও চাবুকের আঘাতে রঞ্জিত হয়েছেন! দিনভর রোযা রেখেও তিনি রক্তাত্ত হয়েছেন!
দুনিয়ার শোভা বর্জন, সৎকাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ, উচ্ছল প্রভাকর দীনী দাওয়াত, আল্লাহর অস্তিত্বে দৃঢ় অবিচল থেকে তিনি বেত্রাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন!
উম্মতের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে দীনের শিক্ষা এবং দীক্ষা দান করে বেত্রাঘাতে মৃতপ্রায় হয়েছেন!
এসব ছিল মূলত আল্লাহর পরীক্ষা। আল্লাহ পরীক্ষা নিয়ে তার মর্যাদা আকাশছোঁয়া করেছেন।
ইমাম আহমদ কারাবরণ করেছেন। বেত্রাঘাত সহ্য করেছেন। অতঃপর যখন মুক্ত হয়েছেন, তখন যেন লালচে স্বর্ণ আগুনে পুড়ে আরও নিরেট ও খাঁটি সোনায় পরিণত হয়েছেন!
আল্লাহ বলেন-
মানুষ কি মনে করে, তারা একথা বলেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে- 'আমরা বিশ্বাস করি' এবং তাদের পরীক্ষা করা হবে না? আমি তাদেরও পরীক্ষা করেছি যারা তাদের পূর্বে ছিল। আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন যারা সত্যবাদী এবং নিশ্চয় জেনে নেবেন মিথ্যুকদের। [সূরা আনকাবূত : ২, ৩]
দীন ও ঈমান শুধু দাবির নাম নয়।
কবি বলেন- দাবির পক্ষে যবে না থাকে প্রমাণ, ওরা শুধুই দাবিদার, দাবির নেই কোন প্রাণ।
কোন ব্যক্তি যদি আল্লাহ -কে ভালোবাসে, কিন্তু আযান হলে শরীয়ত সমর্থিত কারণ ছাড়া মসজিদে না যায়, তাহলে সে মুনাফিক।
কেউ যদি আল্লাহ ও তার রাসূলের সাথে সুসম্পর্ক বজায়ের দাবি করে, তাদের ভালোবাসার প্রচার করে, কিন্তু তার সন্তানের মৃত্যুতে আল্লাহ -র ফয়সালা ও তকদিরের উপর ক্ষোভ আসে, অযৌক্তিক কথা বলে, তাহলে সে কেমন ঈমানদার! কোথায় তার দাবির সত্যতা? এটাই কি প্রকৃত ঈমানের পরিচয়! প্রকৃত ঈমানের দাবি কী?
বন্ধুদের সাথে রাত জেগে আড্ডা এবং বন্ধুদের ডাকে সাড়া দেয়ার চেয়ে ঠান্ডা ফজরে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে বেশি তৃপ্তি পাওয়াই হল প্রকৃত ঈমানের দাবি ও চাহিদা। রাসূল ইরশাদ করেন-
আল্লাহ বলেন, 'হে আমার বন্দারা! কোন মুমিন বান্দা যখন রাতে উঠে ঠান্ডা পানি দিয়ে অযু করে আমাকে ডাকে, আমি তোমাদের সাক্ষ্য করছি, আমি সেই বান্দাকে ক্ষমা করে দেই। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাই। [তথ্যসূত্র পাওয়া যায়নি]
আল্লাহ -র সাথে সততার প্রমাণ কী?
হৃদয়ের উয়তা ও আবেগ নিয়ে মুমিনদের সাথে সালাতের কাতারে দাঁড়ানোই হল আল্লাহর সাথে সততার প্রমাণ। মুনাফিকরাও সালাত পড়ে- কিন্তু আল্লাহকে ভালোবেসে নয়, নিষ্ঠতা ও আত্মসমর্পণের সাথে নয়। আল্লাহ বলেন-
তারা যখন সালাতে দাঁড়ায়, তখন দাঁড়ায় একান্ত শিথিলভাবে লোক দেখানোর জন্য। আর তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে। [সূরা নিসা: ১৪২]
মুনাফিকরা সালাত পড়ে শিথিলভাবে। কেরাআন পড়ে শিথিলভাবে। আল্লাহ প্রেমের দাবিতে তাদের সততা নেই। নিষ্ঠতা নেই। আল্লাহ -র প্রতি তাদের ভালোবাসা ও তাড়না নেই। এই সালাত তাদের কোনই উপকারে আসে না।
ইমাম আহমদ 'আল্লাহ আমার প্রভু' বলার অপরাধে কারান্তরীণ হয়েছেন। আমরা তাকে প্রতিটি মজলিসে, মিম্বারে, সভা-সেমিনারে সশ্রদ্ধ স্মরণ করি। আল্লাহ তার মর্যাদা এমনই বৃদ্ধি করেছেন।
তার প্রতিপক্ষকে আল্লাহ নিশ্চি... করেছেন। নাম-গন্ধ মুছে দিয়েছেন। তার বিরোধিতা করেছিল উযির ইবনে যাইয়াত। ইমাম আহমদ তাকে বদদোয়া দিয়েছেন। সে শাস্তি পেয়েছে। চাবুক খেয়েছে। চুলায় জ্বলে ছাই-ভম হয়েছে।
আহমদ ইবনে আবু দাউদ জাহমি। শরীয়তে নানা অসঙ্গতির উদ্ভাবনকারী। মোতাযিলাদের শীর্ষ ব্যক্তি। তার কারণে ইমাম আহমদ বেত্রাঘাতের অন্যায় শাস্তি ভোগ করেছেন।
ইমাম আহমদ বদদোয়া করেছিলেন- আল্লাহ! তার শরীরে তুমি শাস্তি দাও। আল্লাহ তাকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করলেন। শরীরের অর্ধাঙ্গ অবশ করে দিলেন।
লোকেরা আহমদ ইবনে আবু দাউদকে জিজ্ঞেস করত, 'আপনার কী অবস্থা?'
সে বলত, 'আমার শরীরের এই অংশে একটি মাছি বসলেও মনে হয় কেয়ামত হয়ে গেছে। আর শরীরের এই অংশে কেউ ছুরি দিয়ে কাটলেও কোন অনুভুতি হয় না।'
আহমদ ইবনে আবু দাউদ এই শাস্তি কেন ভোগ করেছিল? কারণ সে আল্লাহবিমুখ ছিল। সত্য অস্বীকার করেছিল। অথচ ইমাম আহমদ আজ পর্যন্ত হাদিসের কিতাবে শত-সহস্রবার স্মরিত হচ্ছেন!
জনৈক বুযুর্গ এক জালেম উযিরের দরবারে উপস্থিত হল। উযির বুযুর্গকে একটি চড় কষিয়ে বসিয়ে দিলেন। বুযুর্গ আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন- 'আল্লাহ! সে আমাকে আঘাত করেছে, তুমি তার হাত কেটে দাও।'
আল্লাহ বুযুর্গকে মূলত পরীক্ষা করলেন। বুযুর্গ আল্লাহ-র কাছেই অনুযোগ করেছেন। আল্লাহ উযিরকে আরেক জালেমের সামনে ফেললেন। জালেম তার ডান হাত কেটে দিল। উযির তখন আক্ষেপ করে কবিতায় বলতে লাগল-
ডান হাত কেটে গেল, আর নেই বেঁচে থাকার স্বাধ। হায় জীবন! আমার ডান হাত গেল, আর কী আছে আমার!
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া। আল্লাহ তাকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষায় নিপতিত করেছিলেন। তার মান-সম্ভ্রমে নির্লজ্জ অবাস্তব অসত্য অপবাদ দেয়া হয়েছিল।
তিনি আল্লাহর দিকে মানুষকে ডাকতেন। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর দাওয়াত দিতেন। মানুষের আকীদা-বিশ্বাস ঠিক করে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আহ্বান করতেন। এসবের কারণে তিনি কারান্তরীণ হয়েছিলেন!
তাকে যখন জেলে দেয়া হল, দরজা বন্ধ করে দেয়া হল। তিনি প্রহরীর দিকে তাকিয়ে তেলাওয়াত করতে লাগলেন-
অতঃপর উভয় দলে মাঝখানে খাড়া করা হবে একটি প্রাচীর। যার একটি দরজা হবে। তার অভ্যন্তরে থাকবে রহমত এবং বাইরে থাকবে আযাব। [সূরা হাদিদ: ১৩]
ইবনে তাইমিয়া-কে সমকালের সুলতান সালজুকির কাছে উপস্থিত করা হল। সুলতান তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইবনে তাইমিয়া! আপনি নাকি আমার রাজত্ব ছিনাতে চাচ্ছেন?'
ইবনে তাইমিয়া হাসলেন। তার অন্তরে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তিনি চান আখেরাত। আল্লাহর খাযানা। দুনিয়া তার দৃষ্টিতে তুচ্ছ। নগণ্য। মসজিদে তিনি যে মজলিস করতেন, দুনিয়া তার অর্ধেক সময়ের মূল্যমানও নয়।
ইবনে তাইমিয়া বললেন, 'আল্লাহর কসম! আপনার রাজত্ব, আপনার বাপ-দাদার রাজত্ব আমার কাছে এক পয়সারও সমমান নয়।'
অদ্যাবধি ইবনে তাইমিয়া বেঁচে আছেন। তার অসংখ্য নিদর্শন, রচনা ও কিতাব আজও মুসলমানের অন্তরে জীবিত হয়ে আছে। কিন্তু পৃথিবী থেকে সেই সালজুকি সুলতানের নাম-পরিচয় নিশ্চিহ্ন হয়ে মুছে গেছে।
আল্লাহ ইবনে তাইমিয়ার মর্যাদা উঁচু করেছেন। তিনি তখন একা ছিলেন। কারণ তিনি আল্লাহর এবাদত করেছেন। আনুগত্য করেছেন। অথচ সুলতানের সৈন্য-সামন্ত কত কিছু ছিল। সবসহ তিনি ধরাপৃষ্ঠ থেকে অজ্ঞাত হয়ে গেছেন।
যত মানুষ বিপদে নিপতিত হয়ে সবর করেছেন, ধৈর্য ধরেছেন, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বাড়িয়েছেন। সম্ভব বৃদ্ধি করেছেন। পরীক্ষিত বান্দারা কেয়ামত পর্যন্ত অগুণতি মানুষের দোয়ায় সপ্রশংস স্মরিত হন।

আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বুযুর্গরাও নানা বিপদে নিপতিত হয়েছেন এবং পরীক্ষিত হয়েছেন।
ইবনুল কাইয়িম বলেন, হে দুর্বলমনা! নূহ আলাইহিস সালাম রাস্তায় রাস্তায় আর্তনাদ করে ফিরেছেন। ইয়াহইয়া জবাই হয়েছেন। যাকারিয়া হত্যা হয়েছেন। ইমামগণ কারাবন্দী হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য ওলামায়ে কেরাম বেত্রাঘাতে আহত হয়েছেন।
এভাবেই সবাই পরীক্ষিত হয়েছেন। উম্মতের নেতা হয়েছেন-
আমি তাদের নেতা বানালাম। তারা আমার নির্দেশ অনুসারে পথ প্রদর্শন করতেন। আমি তাদের প্রতি অহি নাযিল করলাম সৎকর্ম করার, সালাত কায়েম করার এবং যাকাত দান করার। তারা আমার এবাদতে ব্যাপৃত ছিল। [সূরা আম্বিয়া: ৭৩]
ইমাম আহমদ ; আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের ইমাম। হাজারে হাজার মারফু মাওকুফ মুসনাদ মাকতু আসার এবং তাবেঈদের বাণী তার মুখস্থ ছিল। তিনি কারাবন্দী হয়েছিলেন। চাবুকের আঘাতে জর্জরিত হয়েছিলেন। কেন?
এবাদতকারী এবং দুনিয়াবিুখ হয়ে চাবুকের আঘাতে জর্জরিত হয়েছেন!
হাদিসের অঙ্গনে ব্যাপক পারদর্শী হয়েও চাবুকের আঘাতে রঞ্জিত হয়েছেন! দিনভর রোযা রেখেও তিনি রক্তাত্ত হয়েছেন!
দুনিয়ার শোভা বর্জন, সৎকাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ, উচ্ছল প্রভাকর দীনী দাওয়াত, আল্লাহর অস্তিত্বে দৃঢ় অবিচল থেকে তিনি বেত্রাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন!
উম্মতের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে দীনের শিক্ষা এবং দীক্ষা দান করে বেত্রাঘাতে মৃতপ্রায় হয়েছেন!
এসব ছিল মূলত আল্লাহর পরীক্ষা। আল্লাহ পরীক্ষা নিয়ে তার মর্যাদা আকাশছোঁয়া করেছেন।
ইমাম আহমদ কারাবরণ করেছেন। বেত্রাঘাত সহ্য করেছেন। অতঃপর যখন মুক্ত হয়েছেন, তখন যেন লালচে স্বর্ণ আগুনে পুড়ে আরও নিরেট ও খাঁটি সোনায় পরিণত হয়েছেন!
আল্লাহ বলেন-
মানুষ কি মনে করে, তারা একথা বলেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে- 'আমরা বিশ্বাস করি' এবং তাদের পরীক্ষা করা হবে না? আমি তাদেরও পরীক্ষা করেছি যারা তাদের পূর্বে ছিল। আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন যারা সত্যবাদী এবং নিশ্চয় জেনে নেবেন মিথ্যুকদের। [সূরা আনকাবূত : ২, ৩]
দীন ও ঈমান শুধু দাবির নাম নয়।
কবি বলেন- দাবির পক্ষে যবে না থাকে প্রমাণ, ওরা শুধুই দাবিদার, দাবির নেই কোন প্রাণ।
কোন ব্যক্তি যদি আল্লাহ -কে ভালোবাসে, কিন্তু আযান হলে শরীয়ত সমর্থিত কারণ ছাড়া মসজিদে না যায়, তাহলে সে মুনাফিক।
কেউ যদি আল্লাহ ও তার রাসূলের সাথে সুসম্পর্ক বজায়ের দাবি করে, তাদের ভালোবাসার প্রচার করে, কিন্তু তার সন্তানের মৃত্যুতে আল্লাহ -র ফয়সালা ও তকদিরের উপর ক্ষোভ আসে, অযৌক্তিক কথা বলে, তাহলে সে কেমন ঈমানদার! কোথায় তার দাবির সত্যতা? এটাই কি প্রকৃত ঈমানের পরিচয়! প্রকৃত ঈমানের দাবি কী?
বন্ধুদের সাথে রাত জেগে আড্ডা এবং বন্ধুদের ডাকে সাড়া দেয়ার চেয়ে ঠান্ডা ফজরে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে বেশি তৃপ্তি পাওয়াই হল প্রকৃত ঈমানের দাবি ও চাহিদা। রাসূল ইরশাদ করেন-
আল্লাহ বলেন, 'হে আমার বন্দারা! কোন মুমিন বান্দা যখন রাতে উঠে ঠান্ডা পানি দিয়ে অযু করে আমাকে ডাকে, আমি তোমাদের সাক্ষ্য করছি, আমি সেই বান্দাকে ক্ষমা করে দেই। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাই। [তথ্যসূত্র পাওয়া যায়নি]
আল্লাহ -র সাথে সততার প্রমাণ কী?
হৃদয়ের উয়তা ও আবেগ নিয়ে মুমিনদের সাথে সালাতের কাতারে দাঁড়ানোই হল আল্লাহর সাথে সততার প্রমাণ। মুনাফিকরাও সালাত পড়ে- কিন্তু আল্লাহকে ভালোবেসে নয়, নিষ্ঠতা ও আত্মসমর্পণের সাথে নয়। আল্লাহ বলেন-
তারা যখন সালাতে দাঁড়ায়, তখন দাঁড়ায় একান্ত শিথিলভাবে লোক দেখানোর জন্য। আর তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে। [সূরা নিসা: ১৪২]
মুনাফিকরা সালাত পড়ে শিথিলভাবে। কেরাআন পড়ে শিথিলভাবে। আল্লাহ প্রেমের দাবিতে তাদের সততা নেই। নিষ্ঠতা নেই। আল্লাহ -র প্রতি তাদের ভালোবাসা ও তাড়না নেই। এই সালাত তাদের কোনই উপকারে আসে না।
ইমাম আহমদ 'আল্লাহ আমার প্রভু' বলার অপরাধে কারান্তরীণ হয়েছেন। আমরা তাকে প্রতিটি মজলিসে, মিম্বারে, সভা-সেমিনারে সশ্রদ্ধ স্মরণ করি। আল্লাহ তার মর্যাদা এমনই বৃদ্ধি করেছেন।
তার প্রতিপক্ষকে আল্লাহ নিশ্চি... করেছেন। নাম-গন্ধ মুছে দিয়েছেন। তার বিরোধিতা করেছিল উযির ইবনে যাইয়াত। ইমাম আহমদ তাকে বদদোয়া দিয়েছেন। সে শাস্তি পেয়েছে। চাবুক খেয়েছে। চুলায় জ্বলে ছাই-ভম হয়েছে।
আহমদ ইবনে আবু দাউদ জাহমি। শরীয়তে নানা অসঙ্গতির উদ্ভাবনকারী। মোতাযিলাদের শীর্ষ ব্যক্তি। তার কারণে ইমাম আহমদ বেত্রাঘাতের অন্যায় শাস্তি ভোগ করেছেন।
ইমাম আহমদ বদদোয়া করেছিলেন- আল্লাহ! তার শরীরে তুমি শাস্তি দাও। আল্লাহ তাকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করলেন। শরীরের অর্ধাঙ্গ অবশ করে দিলেন।
লোকেরা আহমদ ইবনে আবু দাউদকে জিজ্ঞেস করত, 'আপনার কী অবস্থা?'
সে বলত, 'আমার শরীরের এই অংশে একটি মাছি বসলেও মনে হয় কেয়ামত হয়ে গেছে। আর শরীরের এই অংশে কেউ ছুরি দিয়ে কাটলেও কোন অনুভুতি হয় না।'
আহমদ ইবনে আবু দাউদ এই শাস্তি কেন ভোগ করেছিল? কারণ সে আল্লাহবিমুখ ছিল। সত্য অস্বীকার করেছিল। অথচ ইমাম আহমদ আজ পর্যন্ত হাদিসের কিতাবে শত-সহস্রবার স্মরিত হচ্ছেন!
জনৈক বুযুর্গ এক জালেম উযিরের দরবারে উপস্থিত হল। উযির বুযুর্গকে একটি চড় কষিয়ে বসিয়ে দিলেন। বুযুর্গ আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন- 'আল্লাহ! সে আমাকে আঘাত করেছে, তুমি তার হাত কেটে দাও।'
আল্লাহ বুযুর্গকে মূলত পরীক্ষা করলেন। বুযুর্গ আল্লাহ-র কাছেই অনুযোগ করেছেন। আল্লাহ উযিরকে আরেক জালেমের সামনে ফেললেন। জালেম তার ডান হাত কেটে দিল। উযির তখন আক্ষেপ করে কবিতায় বলতে লাগল-
ডান হাত কেটে গেল, আর নেই বেঁচে থাকার স্বাধ। হায় জীবন! আমার ডান হাত গেল, আর কী আছে আমার!
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া। আল্লাহ তাকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষায় নিপতিত করেছিলেন। তার মান-সম্ভ্রমে নির্লজ্জ অবাস্তব অসত্য অপবাদ দেয়া হয়েছিল।
তিনি আল্লাহর দিকে মানুষকে ডাকতেন। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর দাওয়াত দিতেন। মানুষের আকীদা-বিশ্বাস ঠিক করে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আহ্বান করতেন। এসবের কারণে তিনি কারান্তরীণ হয়েছিলেন!
তাকে যখন জেলে দেয়া হল, দরজা বন্ধ করে দেয়া হল। তিনি প্রহরীর দিকে তাকিয়ে তেলাওয়াত করতে লাগলেন-
অতঃপর উভয় দলে মাঝখানে খাড়া করা হবে একটি প্রাচীর। যার একটি দরজা হবে। তার অভ্যন্তরে থাকবে রহমত এবং বাইরে থাকবে আযাব। [সূরা হাদিদ: ১৩]
ইবনে তাইমিয়া-কে সমকালের সুলতান সালজুকির কাছে উপস্থিত করা হল। সুলতান তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইবনে তাইমিয়া! আপনি নাকি আমার রাজত্ব ছিনাতে চাচ্ছেন?'
ইবনে তাইমিয়া হাসলেন। তার অন্তরে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তিনি চান আখেরাত। আল্লাহর খাযানা। দুনিয়া তার দৃষ্টিতে তুচ্ছ। নগণ্য। মসজিদে তিনি যে মজলিস করতেন, দুনিয়া তার অর্ধেক সময়ের মূল্যমানও নয়।
ইবনে তাইমিয়া বললেন, 'আল্লাহর কসম! আপনার রাজত্ব, আপনার বাপ-দাদার রাজত্ব আমার কাছে এক পয়সারও সমমান নয়।'
অদ্যাবধি ইবনে তাইমিয়া বেঁচে আছেন। তার অসংখ্য নিদর্শন, রচনা ও কিতাব আজও মুসলমানের অন্তরে জীবিত হয়ে আছে। কিন্তু পৃথিবী থেকে সেই সালজুকি সুলতানের নাম-পরিচয় নিশ্চিহ্ন হয়ে মুছে গেছে।
আল্লাহ ইবনে তাইমিয়ার মর্যাদা উঁচু করেছেন। তিনি তখন একা ছিলেন। কারণ তিনি আল্লাহর এবাদত করেছেন। আনুগত্য করেছেন। অথচ সুলতানের সৈন্য-সামন্ত কত কিছু ছিল। সবসহ তিনি ধরাপৃষ্ঠ থেকে অজ্ঞাত হয়ে গেছেন।
যত মানুষ বিপদে নিপতিত হয়ে সবর করেছেন, ধৈর্য ধরেছেন, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বাড়িয়েছেন। সম্ভব বৃদ্ধি করেছেন। পরীক্ষিত বান্দারা কেয়ামত পর্যন্ত অগুণতি মানুষের দোয়ায় সপ্রশংস স্মরিত হন।

আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বুযুর্গরাও নানা বিপদে নিপতিত হয়েছেন এবং পরীক্ষিত হয়েছেন।

ইবনুল কাইয়িম বলেন, হে দুর্বলমনা! নূহ আলাইহিস সালাম রাস্তায় রাস্তায় আর্তনাদ করে ফিরেছেন। ইয়াহইয়া জবাই হয়েছেন। যাকারিয়া হত্যা হয়েছেন। ইমামগণ কারাবন্দী হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য ওলামায়ে কেরাম বেত্রাঘাতে আহত হয়েছেন।

এভাবেই সবাই পরীক্ষিত হয়েছেন। উম্মতের নেতা হয়েছেন-

আমি তাদের নেতা বানালাম। তারা আমার নির্দেশ অনুসারে পথ প্রদর্শন করতেন। আমি তাদের প্রতি অহি নাযিল করলাম সৎকর্ম করার, সালাত কায়েম করার এবং যাকাত দান করার। তারা আমার এবাদতে ব্যাপৃত ছিল। [সূরা আম্বিয়া: ৭৩]

ইমাম আহমদ ; আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের ইমাম। হাজারে হাজার মারফু মাওকুফ মুসনাদ মাকতু আসার এবং তাবেঈদের বাণী তার মুখস্থ ছিল। তিনি কারাবন্দী হয়েছিলেন। চাবুকের আঘাতে জর্জরিত হয়েছিলেন। কেন?

এবাদতকারী এবং দুনিয়াবিমুখ হয়ে চাবুকের আঘাতে জর্জরিত হয়েছেন!

হাদিসের অঙ্গনে ব্যাপক পারদর্শী হয়েও চাবুকের আঘাতে রঞ্জিত হয়েছেন! দিনভর রোযা রেখেও তিনি রক্তাত্ত হয়েছেন!

দুনিয়ার শোভা বর্জন, সৎকাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ, উচ্ছল প্রভাকর দীনী দাওয়াত, আল্লাহর অস্তিত্বে দৃঢ় অবিচল থেকে তিনি বেত্রাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন!

উম্মতের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে দীনের শিক্ষা এবং দীক্ষা দান করে বেত্রাঘাতে মৃতপ্রায় হয়েছেন!

এসব ছিল মূলত আল্লাহর পরীক্ষা। আল্লাহ পরীক্ষা নিয়ে তার মর্যাদা আকাশছোঁয়া করেছেন।

ইমাম আহমদ কারাবরণ করেছেন। বেত্রাঘাত সহ্য করেছেন। অতঃপর যখন মুক্ত হয়েছেন, তখন যেন লালচে স্বর্ণ আগুনে পুড়ে আরও নিরেট ও খাঁটি সোনায় পরিণত হয়েছেন!

আল্লাহ বলেন-

মানুষ কি মনে করে, তারা একথা বলেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে- 'আমরা বিশ্বাস করি' এবং তাদের পরীক্ষা করা হবে না? আমি তাদেরও পরীক্ষা করেছি যারা তাদের পূর্বে ছিল। আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন যারা সত্যবাদী এবং নিশ্চয় জেনে নেবেন মিথ্যুকদের। [সূরা আনকাবূত : ২, ৩]

দীন ও ঈমান শুধু দাবির নাম নয়।

কবি বলেন- দাবির পক্ষে যবে না থাকে প্রমাণ, ওরা শুধুই দাবিদার, দাবির নেই কোন প্রাণ।

কোন ব্যক্তি যদি আল্লাহ -কে ভালোবাসে, কিন্তু আযান হলে শরীয়ত সমর্থিত কারণ ছাড়া মসজিদে না যায়, তাহলে সে মুনাফিক।

কেউ যদি আল্লাহ ও তার রাসূলের সাথে সুসম্পর্ক বজায়ের দাবি করে, তাদের ভালোবাসার প্রচার করে, কিন্তু তার সন্তানের মৃত্যুতে আল্লাহ -র ফয়সালা ও তকদিরের উপর ক্ষোভ আসে, অযৌক্তিক কথা বলে, তাহলে সে কেমন ঈমানদার! কোথায় তার দাবির সত্যতা? এটাই কি প্রকৃত ঈমানের পরিচয়! প্রকৃত ঈমানের দাবি কী?

বন্ধুদের সাথে রাত জেগে আড্ডা এবং বন্ধুদের ডাকে সাড়া দেয়ার চেয়ে ঠান্ডা ফজরে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে বেশি তৃপ্তি পাওয়াই হল প্রকৃত ঈমানের দাবি ও চাহিদা। রাসূল ইরশাদ করেন-

আল্লাহ বলেন, 'হে আমার বন্দারা! কোন মুমিন বান্দা যখন রাতে উঠে ঠান্ডা পানি দিয়ে অযু করে আমাকে ডাকে, আমি তোমাদের সাক্ষ্য করছি, আমি সেই বান্দাকে ক্ষমা করে দেই। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাই। [তথ্যসূত্র পাওয়া যায়নি]

আল্লাহ -র সাথে সততার প্রমাণ কী?

হৃদয়ের উয়তা ও আবেগ নিয়ে মুমিনদের সাথে সালাতের কাতারে দাঁড়ানোই হল আল্লাহর সাথে সততার প্রমাণ। মুনাফিকরাও সালাত পড়ে- কিন্তু আল্লাহকে ভালোবেসে নয়, নিষ্ঠতা ও আত্মসমর্পণের সাথে নয়। আল্লাহ বলেন-

তারা যখন সালাতে দাঁড়ায়, তখন দাঁড়ায় একান্ত শিথিলভাবে লোক দেখানোর জন্য। আর তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে। [সূরা নিসা: ১৪২]

মুনাফিকরা সালাত পড়ে শিথিলভাবে। কেরাআন পড়ে শিথিলভাবে। আল্লাহ প্রেমের দাবিতে তাদের সততা নেই। নিষ্ঠতা নেই। আল্লাহ -র প্রতি তাদের ভালোবাসা ও তাড়না নেই। এই সালাত তাদের কোনই উপকারে আসে না।

ইমাম আহমদ 'আল্লাহ আমার প্রভু' বলার অপরাধে কারান্তরীণ হয়েছেন। আমরা তাকে প্রতিটি মজলিসে, মিম্বারে, সভা-সেমিনারে সশ্রদ্ধ স্মরণ করি। আল্লাহ তার মর্যাদা এমনই বৃদ্ধি করেছেন।

তার প্রতিপক্ষকে আল্লাহ নিশ্চিহ্ন করেছেন। নাম-গন্ধ মুছে দিয়েছেন। তার বিরোধিতা করেছিল উযির ইবনে যাইয়াত। ইমাম আহমদ তাকে বদদোয়া দিয়েছেন। সে শাস্তি পেয়েছে। চাবুক খেয়েছে। চুলায় জ্বলে ছাই-ভস্ম হয়েছে।

আহমদ ইবনে আবু দাউদ জাহমি। শরীয়তে নানা অসঙ্গতির উদ্ভাবনকারী। মোতাযিলাদের শীর্ষ ব্যক্তি। তার কারণে ইমাম আহমদ বেত্রাঘাতের অন্যায় শাস্তি ভোগ করেছেন।

ইমাম আহমদ বদদোয়া করেছিলেন- আল্লাহ! তার শরীরে তুমি শাস্তি দাও। আল্লাহ তাকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করলেন। শরীরের অর্ধাঙ্গ অবশ করে দিলেন।

লোকেরা আহমদ ইবনে আবু দাউদকে জিজ্ঞেস করত, 'আপনার কী অবস্থা?'

সে বলত, 'আমার শরীরের এই অংশে একটি মাছি বসলেও মনে হয় কেয়ামত হয়ে গেছে। আর শরীরের এই অংশে কেউ ছুরি দিয়ে কাটলেও কোন অনুভুতি হয় না।'

আহমদ ইবনে আবু দাউদ এই শাস্তি কেন ভোগ করেছিল? কারণ সে আল্লাহবিমুখ ছিল। সত্য অস্বীকার করেছিল। অথচ ইমাম আহমদ আজ পর্যন্ত হাদিসের কিতাবে শত-সহস্রবার স্মরিত হচ্ছেন!

জনৈক বুযুর্গ এক জালেম উযিরের দরবারে উপস্থিত হল। উযির বুযুর্গকে একটি চড় কষিয়ে বসিয়ে দিলেন। বুযুর্গ আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন- 'আল্লাহ! সে আমাকে আঘাত করেছে, তুমি তার হাত কেটে দাও।'

আল্লাহ বুযুর্গকে মূলত পরীক্ষা করলেন। বুযুর্গ আল্লাহ-র কাছেই অনুযোগ করেছেন। আল্লাহ উযিরকে আরেক জালেমের সামনে ফেললেন। জালেম তার ডান হাত কেটে দিল। উযির তখন আক্ষেপ করে কবিতায় বলতে লাগল-

ডান হাত কেটে গেল, আর নেই বেঁচে থাকার স্বাধ। হায় জীবন! আমার ডান হাত গেল, আর কী আছে আমার!

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া। আল্লাহ তাকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষায় নিপতিত করেছিলেন। তার মান-সম্ভ্রমে নির্লজ্জ অবাস্তব অসত্য অপবাদ দেয়া হয়েছিল।

তিনি আল্লাহর দিকে মানুষকে ডাকতেন। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর দাওয়াত দিতেন। মানুষের আকীদা-বিশ্বাস ঠিক করে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আহ্বান করতেন। এসবের কারণে তিনি কারান্তরীণ হয়েছিলেন!

তাকে যখন জেলে দেয়া হল, দরজা বন্ধ করে দেয়া হল। তিনি প্রহরীর দিকে তাকিয়ে তেলাওয়াত করতে লাগলেন-

অতঃপর উভয় দলে মাঝখানে খাড়া করা হবে একটি প্রাচীর। যার একটি দরজা হবে। তার অভ্যন্তরে থাকবে রহমত এবং বাইরে থাকবে আযাব। [সূরা হাদিদ: ১৩]

ইবনে তাইমিয়া-কে সমকালের সুলতান সালজুকির কাছে উপস্থিত করা হল। সুলতান তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইবনে তাইমিয়া! আপনি নাকি আমার রাজত্ব ছিনাতে চাচ্ছেন?'

ইবনে তাইমিয়া হাসলেন। তার অন্তরে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তিনি চান আখেরাত। আল্লাহর খাযানা। দুনিয়া তার দৃষ্টিতে তুচ্ছ। নগণ্য। মসজিদে তিনি যে মজলিস করতেন, দুনিয়া তার অর্ধেক সময়ের মূল্যমানও নয়।

ইবনে তাইমিয়া বললেন, 'আল্লাহর কসম! আপনার রাজত্ব, আপনার বাপ-দাদার রাজত্ব আমার কাছে এক পয়সারও সমমান নয়।'

অদ্যাবধি ইবনে তাইমিয়া বেঁচে আছেন। তার অসংখ্য নিদর্শন, রচনা ও কিতাব আজও মুসলমানের অন্তরে জীবিত হয়ে আছে। কিন্তু পৃথিবী থেকে সেই সালজুকি সুলতানের নাম-পরিচয় নিশ্চিহ্ন হয়ে মুছে গেছে।

আল্লাহ ইবনে তাইমিয়ার মর্যাদা উঁচু করেছেন। তিনি তখন একা ছিলেন। কারণ তিনি আল্লাহর এবাদত করেছেন। আনুগত্য করেছেন। অথচ সুলতানের সৈন্য-সামন্ত কত কিছু ছিল। সবসহ তিনি ধরাপৃষ্ঠ থেকে অজ্ঞাত হয়ে গেছেন।

যত মানুষ বিপদে নিপতিত হয়ে সবর করেছেন, ধৈর্য ধরেছেন, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বাড়িয়েছেন। সম্ভব বৃদ্ধি করেছেন। পরীক্ষিত বান্দারা কেয়ামত পর্যন্ত অগুণতি মানুষের দোয়ায় সপ্রশংস স্মরিত হন।

আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বুযুর্গরাও নানা বিপদে নিপতিত হয়েছেন এবং পরীক্ষিত হয়েছেন。
ইবনুল কাইয়িম বলেন, হে দুর্বলমনা! নূহ আলাইহিস সালাম রাস্তায় রাস্তায় আর্তনাদ করে ফিরেছেন। ইয়াহইয়া জবাই হয়েছেন। যাকারিয়া হত্যা হয়েছেন। ইমামগণ কারাবন্দী হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য ওলামায়ে কেরام বেত্রাঘাতে আহত হয়েছেন。
এভাবেই সবাই পরীক্ষিত হয়েছেন। উম্মতের নেতা হয়েছেন-
আমি তাদের নেতা বানালাম। তারা আমার নির্দেশ অনুসারে পথ প্রদর্শন করতেন। আমি তাদের প্রতি অহি নাযিল করলাম সৎকর্ম করার, সালাত কায়েম করার এবং যাকাত দান করার। তারা আমার এবাদতে ব্যাপৃত ছিল। [সূরা আম্বিয়া: ৭৩]
ইমাম আহমদ ; আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের ইমাম। হাজারে হাজার মারফু মাওকুফ মুসনাদ মাকতু আসার এবং তাবেঈদের বাণী তার মুখস্থ ছিল। তিনি কারাবন্দী হয়েছিলেন। চাবুকের আঘাতে জর্জরিত হয়েছিলেন। কেন?
এবাদতকারী এবং দুনিয়াবিমুখ হয়ে চাবুকের আঘাতে জর্জরিত হয়েছেন!
হাদিসের অঙ্গনে ব্যাপক পারদর্শী হয়েও চাবুকের আঘাতে রঞ্জিত হয়েছেন! দিনভর রোযা রেখেও তিনি রক্তাত্ত হয়েছেন!
দুনিয়ার শোভা বর্জন, সৎকাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ, উচ্ছল প্রভাকর দীনী দাওয়াত, আল্লাহর অস্তিত্বে দৃঢ় অবিচল থেকে তিনি বেত্রাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন!
উম্মতের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে দীনের শিক্ষা এবং দীক্ষা দান করে বেত্রাঘাতে মৃতপ্রায় হয়েছেন!
এসব ছিল মূলত আল্লাহর পরীক্ষা। আল্লাহ পরীক্ষা নিয়ে তার মর্যাদা আকাশছোঁয়া করেছেন।
ইমাম আহমদ কারাবরণ করেছেন। বেত্রাঘাত সহ্য করেছেন। অতঃপর যখন মুক্ত হয়েছেন, তখন যেন লালচে স্বর্ণ আগুনে পুড়ে আরও নিরেট ও খাঁটি সোনায় পরিণত হয়েছেন!
আল্লাহ বলেন-
মানুষ কি মনে করে, তারা একথা বলেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে- 'আমরা বিশ্বাস করি' এবং তাদের পরীক্ষা করা হবে না? আমি তাদেরও পরীক্ষা করেছি যারা তাদের পূর্বে ছিল। আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন যারা সত্যবাদী এবং নিশ্চয় জেনে নেবেন মিথ্যুকদের। [সূরা আনকাবূত : ২, ৩]
দীন ও ঈমান শুধু দাবির নাম নয়।
কবি বলেন- দাবির পক্ষে যবে না থাকে প্রমাণ, ওরা শুধুই দাবিদার, দাবির নেই কোন প্রাণ।
কোন ব্যক্তি যদি আল্লাহ -কে ভালোবাসে, কিন্তু আযান হলে শরীয়ত সমর্থিত কারণ ছাড়া মসজিদে না যায়, তাহলে সে মুনাফিক।
কেউ যদি আল্লাহ ও তার রাসূলের সাথে সুসম্পর্ক বজায়ের দাবি করে, তাদের ভালোবাসার প্রচার করে, কিন্তু তার সন্তানের মৃত্যুতে আল্লাহ -র ফয়সালা ও তকদিরের উপর ক্ষোভ আসে, অযৌক্তিক কথা বলে, তাহলে সে কেমন ঈমানদার! কোথায় তার দাবির সত্যতা? এটাই কি প্রকৃত ঈমানের পরিচয়! প্রকৃত ঈমানের দাবি কী?
বন্ধুদের সাথে রাত জেগে আড্ডা এবং বন্ধুদের ডাকে সাড়া দেয়ার চেয়ে ঠান্ডা ফজরে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে বেশি তৃপ্তি পাওয়াই হল প্রকৃত ঈমানের দাবি ও চাহিদা। রাসূল ইরশাদ করেন-
আল্লাহ বলেন, 'হে আমার বন্দারা! কোন মুমিন বান্দা যখন রাতে উঠে ঠান্ডা পানি দিয়ে অযু করে আমাকে ডাকে, আমি তোমাদের সাক্ষ্য করছি, আমি সেই বান্দাকে ক্ষমা করে দেই। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাই। [তথ্যসূত্র পাওয়া যায়নি]
আল্লাহ -র সাথে সততার প্রমাণ কী?
হৃদয়ের উয়তা ও আবেগ নিয়ে মুমিনদের সাথে সালাতের কাতারে দাঁড়ানোই হল আল্লাহর সাথে সততার প্রমাণ। মুনাফিকরাও সালাত পড়ে- কিন্তু আল্লাহকে ভালোবেসে নয়, নিষ্ঠতা ও আত্মসমর্পণের সাথে নয়। আল্লাহ বলেন-
তারা যখন সালাতে দাঁড়ায়, তখন দাঁড়ায় একান্ত শিথিলভাবে লোক দেখানোর জন্য। আর তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে। [সূরা নিসা: ১৪২]
মুনাফিকরা সালাত পড়ে শিথিলভাবে। কেরাআন পড়ে শিথিলভাবে। আল্লাহ প্রেমের দাবিতে তাদের সততা নেই। নিষ্ঠতা নেই। আল্লাহ -র প্রতি তাদের ভালোবাসা ও তাড়না নেই। এই সালাত তাদের কোনই উপকারে আসে না。
ইমাম আহমদ 'আল্লাহ আমার প্রভু' বলার অপরাধে কারান্তরীণ হয়েছেন। আমরা তাকে প্রতিটি মজলিসে, মিম্বারে, সভা-সেমিনারে সশ্রদ্ধ স্মরণ করি। আল্লাহ তার মর্যাদা এমনই বৃদ্ধি করেছেন。
তার প্রতিপক্ষকে আল্লাহ নিশ্চি... করেছেন। নাম-গন্ধ মুছে দিয়েছেন। তার বিরোধিতা করেছিল উযির ইবনে যাইয়াত। ইমাম আহমদ তাকে বদদোয়া দিয়েছেন। সে শাস্তি পেয়েছে। চাবুক খেয়েছে। চুলায় জ্বলে ছাই-ভম হয়েছে।
আহমদ ইবনে আবু দাউদ জাহমি। শরীয়তে নানা অসঙ্গতির উদ্ভাবনকারী। মোতাযিলাদের শীর্ষ ব্যক্তি। তার কারণে ইমাম আহমদ বেত্রাঘাতের অন্যায় শাস্তি ভোগ করেছেন।
ইমাম আহমদ বদদোয়া করেছিলেন- আল্লাহ! তার শরীরে তুমি শাস্তি দাও। আল্লাহ তাকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করলেন। শরীরের অর্ধাঙ্গ অবশ করে দিলেন。
লোকেরা আহমদ ইবনে আবু দাউদকে জিজ্ঞেস করত, 'আপনার কী অবস্থা?'
সে বলত, 'আমার শরীরের এই অংশে একটি মাছি বসলেও মনে হয় কেয়ামত হয়ে গেছে। আর শরীরের এই অংশে কেউ ছুরি দিয়ে কাটলেও কোন অনুভুতি হয় না।'
আহমদ ইবনে আবু দাউদ এই শাস্তি কেন ভোগ করেছিল? কারণ সে আল্লাহবিমুখ ছিল। সত্য অস্বীকার করেছিল। অথচ ইমাম আহমদ আজ পর্যন্ত হাদিসের কিতাবে শত-সহস্রবার স্মরিত হচ্ছেন!
জনৈক বুযুর্গ এক জালেম উযিরের দরবারে উপস্থিত হল। উযির বুযুর্গকে একটি চড় কষিয়ে বসিয়ে দিলেন। বুযুর্গ আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন- 'আল্লাহ! সে আমাকে আঘাত করেছে, তুমি তার হাত কেটে দাও।'
আল্লাহ বুযুর্গকে মূলত পরীক্ষা করলেন। বুযুর্গ আল্লাহ-র কাছেই অনুযোগ করেছেন। আল্লাহ উযিরকে আরেক জালেমের সামনে ফেললেন। জালেম তার ডান হাত কেটে দিল। উযির তখন আক্ষেপ করে কবিতায় বলতে লাগল-
ডান হাত কেটে গেল, আর নেই বেঁচে থাকার স্বাধ। হায় জীবন! আমার ডান হাত গেল, আর কী আছে আমার!
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া। আল্লাহ তাকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষায় নিপতিত করেছিলেন। তার মান-সম্ভ্রমে নির্লজ্জ অবাস্তব অসত্য অপবাদ দেয়া হয়েছিল।
তিনি আল্লাহর দিকে মানুষকে ডাকতেন। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর দাওয়াত দিতেন। মানুষের আকীদা-বিশ্বাস ঠিক করে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আহ্বান করতেন। এসবের কারণে তিনি কারান্তরীণ হয়েছিলেন!
তাকে যখন জেলে দেয়া হল, দরজা বন্ধ করে দেয়া হল। তিনি প্রহরীর দিকে তাকিয়ে তেলাওয়াত করতে লাগলেন-
অতঃপর উভয় দলে মাঝখানে খাড়া করা হবে একটি প্রাচীর। যার একটি দরজা হবে। তার অভ্যন্তরে থাকবে রহমত এবং বাইরে থাকবে আযাব। [সূরা হাদিদ: ১৩]
ইবনে তাইমিয়া-কে সমকালের সুলতান সালজুকির কাছে উপস্থিত করা হল। সুলতান তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইবনে তাইমিয়া! আপনি নাকি আমার রাজত্ব ছিনাতে চাচ্ছেন?'
ইবনে তাইমিয়া হাসলেন। তার অন্তরে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তিনি চান আখেরাত। আল্লাহর খাযানা। দুনিয়া তার দৃষ্টিতে তুচ্ছ। নগণ্য। মসজিদে তিনি যে মজলিস করতেন, দুনিয়া তার অর্ধেক সময়ের মূল্যমানও নয়।
ইবনে তাইমিয়া বললেন, 'আল্লাহর কসম! আপনার রাজত্ব, আপনার বাপ-দাদার রাজত্ব আমার কাছে এক পয়সারও সমমান নয়।'
অদ্যাবধি ইবনে তাইমিয়া বেঁচে আছেন। তার অসংখ্য নিদর্শন, রচনা ও কিতাব আজও মুসলমানের অন্তরে জীবিত হয়ে আছে। কিন্তু পৃথিবী থেকে সেই সালজুকি সুলতানের নাম-পরিচয় নিশ্চিহ্ন হয়ে মুছে গেছে।
আল্লাহ ইবনে তাইমিয়ার মর্যাদা উঁচু করেছেন। তিনি তখন একা ছিলেন। কারণ তিনি আল্লাহর এবাদত করেছেন। আনুগত্য করেছেন। অথচ সুলতানের সৈন্য-সামন্ত কত কিছু ছিল। সবসহ তিনি ধরাপৃষ্ঠ থেকে অজ্ঞাত হয়ে গেছেন।
যত মানুষ বিপদে নিপতিত হয়ে সবর করেছেন, ধৈর্য ধরেছেন, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বাড়িয়েছেন। সম্ভব বৃদ্ধি করেছেন। পরীক্ষিত বান্দারা কেয়ামত পর্যন্ত অগুণতি মানুষের দোয়ায় সপ্রশংস স্মরিত হন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00