📄 জান্নাতি মহিলা
ইবনে আব্বাস আতা-কে বললেন, 'আতা! তোমাকে একজন জান্নাতি মহিলা দেখাবো!'
আতা বললেন, 'হাঁ, দেখাও।'
ইবনে আব্বাস বললেন, 'এই মহিলা একবার রাসূল-র কাছে এসে বললেন, আল্লাহর রাসূল! আমি মৃগিরোগী। আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।'
আল্লাহর রাসূল বললেন-
তুমি চাইলে আল্লাহর কাছে তোমার জন্য দোয়া করবো। তুমি চাইলে সবরও করতে পার। বিনিময়ে তোমার জন্য থাকবে জান্নাত। [বুখারি : ৫৬৫২]
রাসূল মহিলাকে কত সুন্দর দুটি বিষয়ে ইচ্ছা দিলেন! মহিলাও কী উত্তম বিষয়টি বেছে নিলেন! বললেন- আমি সবর করছি। তবে আমি সতর খুলে ফেলি। আল্লাহ -র কাছে দোয়া করুন, যেন সতর না খুলি।
রাসূল মহিলার সামনে দুটি পথ তুলে ধরলেন। দুটি দিক দেখালেন। দুটি পদক্ষেপের কথা বললেন। মহিলা উত্তম পথটিই বেছে নিলেন। তিনিই জান্নাতি মহিলা। দুনিয়াতে বিচরণকারী জান্নাতি মহিলা।
📄 প্রিয় রাস্তা চোখ
চোখ গুরুত্বপূর্ণ একটি নেয়ামত। চোখ দিয়ে মানুষ জীবনের আলো দেখে। জন্ম- মৃত্যুর খেলা দেখে। জীবনের সৌন্দর্য উপভোগ করে। চোখ দিয়ে পৃথিবী চেনে। মানুষ চেনে। পৃথিবীর সবকিছুর অস্তিত্ব অবলোকন করে।
আল্লাহ মানুষকে চোখ দিয়ে পরীক্ষায় ফেলেন। সামান্য হুকুম দেন। চোখের দৃষ্টি অন্ধ হয়ে যায়। এখানেই মানুষ শেষ। কিছুই করার থাকে না। কোন উপায়-অবলম্বন থাকে না। উপায় একটাই থাকে- ধৈর্য। সবর।
আনাস ইবনে মালেক থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেন-
(আল্লাহ বলেন) যাকে আমি দুটি প্রিয় বস্তু দ্বারা পরীক্ষা করি এবং সে ধৈর্য ধারণ করে, তাকে দুটি প্রিয় বস্তুর বদলে জান্নাত দেই। [বুখারি : ৫৬৫৩]
কী চমৎকার সংবাদ! কী মনোহর উপস্থাপন!
আল্লাহ পরীক্ষা নিচ্ছেন দুটি চোখের আর বলছেন প্রিয় দুটি বস্তুর! কারণ চোখ যে মানুষের অতি প্রিয়! অমূল্য ধন!
আল্লাহ চোখের দৃষ্টি কেড়ে নিচ্ছেন, বলছেন পরীক্ষা করছি! কারণ পরীক্ষায় আছে বান্দার জন্য পুরষ্কার! সাওয়াব ও প্রতিদান। আছে জান্নাত। জান্নাতের খাযানা।
ইয়াযিদ ইবনে হারুন ওয়াসতি। তার চোখের দৃষ্টি হারিয়ে গিয়েছিল। তাকে জিজ্ঞেস করা হল, 'আপনার চোখের দৃষ্টি কোথায় গেল?'
তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম, শেষ রাতের ক্রন্দন চোখের দৃষ্টি নিয়ে গেছে।’
ইবনে আব্বাস রাঃ। শেষ জীবনে তার চোখের দৃষ্টি মিলিয়ে যায়। দুর্মুখেরা ঠাট্টা করতে থাকে। তামাশা রটাতে থাকে। ইবনে আব্বাস রাঃ শুনে বললেন- আল্লাহ যবে মিলিয়ে দিলেন চোখের নূর, হৃদয়দেশে দিলেন নূরের আলোকছটা। স্বচ্ছ বিবেক সরল হৃদয় নেই কো কুব্জ, মুখে আছে তরবারি তেজ বচনধারা।
কত বাস্তবতা তুলে ধরেছেন ইবনে আব্বাস রাঃ। আল্লাহ সাঃ চোখের নূর মিলিয়ে দিলেও অন্তরদেশ আলোকিত। দৃষ্টিসম্পন্ন। চোখের জ্যোতি হারিয়ে গেলেও তার রূহের জ্যোতি রশ্মি ফেলছে জগতময়।
ইবনে হুবাইরা রঃ। ইফসাহ গ্রন্থের প্রণেতা। হাম্বলি মাযহাবের অনুসারী। ইবনুল জাওযি রঃ এর উসতায। আব্বাসি খেলাফতকালের প্রসিদ্ধ উযির। আল্লাহভীরু। তিনি একবার মিনা ময়দানে বৃষ্টির দোয়া করেছেন, মিনায় থাকাকালীনই বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে। তখন তিনি কেঁদে কেঁদে বললেন, ‘হায়! যদি আমার মাগফিরাতের দোয়া করতাম!’
একদিন তিনি উযিরের আসনে বসে আছেন। জনৈক ব্যক্তি তার কাছে আগমন করলেন। ইবনে হুবাইরা তাকে কিছু হাদিয়া দিলেন। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। উপস্থিত লোকেরা ইবনে হুবাইরাকে বলল, ‘কী ব্যাপার, চেনা-জানা নেই। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন! হাদিয়াও দিলেন!’
তিনি বললেন, ‘আমরা যুবক ছিলাম। তিনি আমাকে চিনেননি। আমি তাকে চিনেছি। তার এক আঘাতে ত্রিশ বছর হল, আমার চোখের দৃষ্টি মিলিয়ে গিয়েছিল। আমি এ কথা কাউকে বলিনি।’
ইবনে হুবাইরা কারও কাছে অভিযোগ করেননি। অভিযোগ-অনুযোগ তো শুধু আল্লাহরই কাছে!
📄 প্রিয় সন্তান
সন্তান-সন্ততি আল্লাহর অপার নেয়ামত। আল্লাহ সৎকর্মশীলদের আলোচনা করেছেন। বলেছেন, তারা আল্লাহ -র কাছে বলত-
হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানদের পক্ষ থেকে আমদের জন্য চোখের শীতলতা দান কর। [সূরা ফুরকান : ৭৪]
জীবন সুশোভিত করে তোলে সন্তান ও সম্পদ। এগুলো পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য।
সন্তান চোখের সামনে বেড়ে ওঠে, ইসলামের আলোকে জীবন সাজিয়ে তোলে, আল্লাহ-র সেজদায় অবনত হয়, কোরআনের মধুময় তেলাওয়াত শোনায়, -এর চেয়ে সুখকর চিত্র জীবনের আর কোন পাটে আছে!
কিন্তু সেই সন্তানকে যখন আল্লাহ চোখের সামনে থেকে ডেকে নেন, তখন কী আর করার থাকে!
রাসূল বলেন-
আল্লাহ বলেন, 'আমার মুমিন বান্দার অন্তর-প্রিয়কে যখন কেড়ে নেই এবং সে ধৈর্য ধারণ করে, তখন তার জন্য জান্নাতই উপহার! [বুখারী : ৬৪২৪]
আল্লাহ সন্তান কেড়ে নেয়ার কথা বলেননি। বাবা, ভাই বা বন্ধু কেড়ে নেয়ার কথা বলেননি। একজনের কথা বলে অপরজনকে বাদ দেননি। বরং যার বিচ্ছেদে কষ্ট আসে, দুঃখ লাগে, সেই অন্তর-প্রিয়। তিনি বাবা হতে পারেন। সন্তান হতে পারেন। ভাই-বন্ধুও হতে পারেন। তাদের যে কারও বিচ্ছেদে ধৈর্য ধারণ করলে তার জন্য জান্নাত উপহার!
রাসূল ইরশাদ করেন-
কারো সন্তান মারা গেলে আল্লাহ ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করেন, 'তোমরা কি আমার বান্দার সন্তানকে উঠিয়ে নিয়েছ? ফেরেশতারা বলে, 'হাঁ।'
আল্লাহ বলেন, 'তোমরা কি তার কলিজার ধনকে কেড়ে নিলে?' ফেরেশতারা বলে, 'হাঁ।'
আল্লাহ জিজ্ঞেস করেন, 'আমার বান্দা কী বলল?' ফেরেশতারা বলে, 'সে তোমার প্রশংসা করেছে এবং ইন্নালিল্লাহ পড়েছে।'
তখন আল্লাহ বলেন, 'তোমরা আমার বান্দার জন্য জান্নাতে একটি ঘর বানাও এবং তার নাম দাও 'বাইতুল হামদ।” [আহমাদ: ১৯২২৬]
জান্নাতের সেই ভবনটি হবে সাদা মেঘের মত। উজ্জ্বল তারার মত। সেখানে লেখা থাকবে- 'বাইতুল হামদ'। সন্তান হারানোর ব্যথায় যারা ধৈর্য ধারণ করেছে, তারা সেখানে প্রবেশ করবে।
জান্নাতের এই সুসংবাদ মহিলার জন্যও। বরং সন্তান হারানো মহিলা ধৈর্যধারণ করলে তার জন্য রাসূল যে সুসংবাদ দিয়েছেন, পুরুষের জন্য তা দেননি।
রাসূল বলেন- তোমাদের মধ্যে যে মহিলা তিনটি সন্তান আগেই পাঠাবে, (তার জীবিতাবস্থায় তিনটি সন্তান মারা গেলে) তারা তার জন্য জাহান্নামের পর্দাস্বরূপ হয়ে থাকবে।
তখন এক মহিলা বলল, 'আর দুটি পাঠালে?' রাসূল বললেন, 'দুটি পাঠালেও।' [বুখারি: ১০২]
কোন কোন বর্ণনা মতে মহিলা আবার জিজ্ঞেস করল, 'আর একটি পাঠালে?' রাসূল বললেন, 'একটি পাঠালেও।'
একটি সৎসন্তানের মৃত্যুতে সবরকারীর জন্য আল্লাহ জান্নাত উপহার রেখেছেন! সকল প্রশংসা আল্লাহরই!
📄 পছন্দের দেহখানি
আল্লাহ মানুষকে শরীর দিয়েছেন। শক্তি ও সামর্থ্য দিয়েছেন। যৌবন- জৈবিকতা দিয়েছেন। উদ্যম দিয়েছেন। মানুষ তা ভোগ করবে। ব্যবহার করবে।
কিন্তু আল্লাহ তার গভীর হেকমত থেকে এসব ছিনিয়েও নিতে পারেন। অসংখ্য বুযুর্গদের শারীরিক রোগ আল্লাহ দিয়েছেন। শারীরিক পরীক্ষা আল্লাহ নিয়েছেন।
ওরওয়া ইবনে যুবাইর। আয়েশা থেকে অসংখ্য হাদিস বর্ণনাকারী। তিনি চারদিনে একবার কোরআন খতম করতেন। আল্লাহ তার মর্যাদা অত্যুচ্চে পৌঁছানোর ফয়সালা করলেন। তাকে পরীক্ষায় নিপতীত করলেন।
ওরওয়া ইবনে যুবাইর শামের উদ্দেশে সফরে বেরুলেন। পথিমধ্যে তার পায়ে ক্ষয়রোগ দেখা দিল। ডাক্তাররা তার পা কেটে ফেলতে বললেন। তিনি বললেন, 'আমি সবর করছি। আমি এসবের অমুখাপেক্ষী।'
ক্ষয়রোগ বাড়তে লাগল। নলা পর্যন্ত পৌঁছল। ডাক্তাররা আবার পা কাটতে বললেন। তিনি একই উত্তর দিলেন- 'আমি সবর করছি। আমি এসবের অমুখাপেক্ষী।'
ক্ষয় রান পর্যন্ত বৃদ্ধি পেল। ডাক্তাররা বললেন, 'সম্পূর্ণ পা কাটা ছাড়া আর উপায় দেখছি না। না হয় আপনার মৃত্যু হবে।'
তিনি বললেন, 'আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাই। আমরা আল্লাহর জন্য। আল্লাহর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।' 'ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।'
ডাক্তাররা বলল, 'আপনাকে এক পেয়ালা মদ পান করিয়ে পা কাটতে হবে।'
তিনি বললেন, 'সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ আমাকে আকল দিয়েছেন, আর তা আমি মদ খেয়ে বিগড়াবো! আমি অযু করে সালাতে দাঁড়ালে তোমরা পা কেটো।'
ওরওয়া ইবনে যুবাইর অযু করে সালাত শুরু করলেন। আল্লাহকে ডাকছেন। প্রাণ মিশিয়ে কণ্ঠ ছেড়ে তেলাওয়াত করছেন। ডাক্তাররা পা কেটে ফেললেন। প্রচুর রক্ত বেরুল। বেহুশ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন।
কয়েক ঘন্টা পর জ্ঞান ফিরল। তাকে সংবাদ জানানো হল, 'খলিফার সাওয়ারীর পায়ের আঘাতে আপনার ছেলে মৃত্যু বরণ করেছে।'
আল্লাহর কি বিধান! ওরওয়া ইবনে যুবাইরের এই জ্ঞানহারা সময়টুকুর মধ্যে তার ছেলের মৃত্যু! কীভাবে বিপদের পর বিপদ। আল্লাহর কী হেকমত! কেমন তকদীর! কেমন ফয়সালা!
ওরওয়া ইবনে যুবাইর (রাঃ) ছেলের মৃত্যুর সংবাদ শুনে বললেন, 'আলহামদুলিল্লাহ! ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন। আল্লাহ, তোমার জন্য সকল প্রশংসা। তুমি দিয়েছ, তুমিই নিয়ে গেছ। তুমি আমাকে পরীক্ষায় ফেলেছ, তুমিই আমাকে সুস্থ করছ। তুমি আমাকে চারটি অঙ্গ দিয়ে মাত্র একটি নিয়েছ। তোমার কৃতজ্ঞতা পোষণ করছি। সব প্রশংসা তোমার।'
অতঃপর তিনি এই কবিতাগুলো পাঠ করলেন- রুম পায়ে আমায় করোনি ভগ্নমত -আমি করেছি সবর। বিবেক বুদ্ধি জ্ঞানে করিনি কিছু -আমি করেছি সবর। রোগীর আগে তুমি নিয়েছ এক সুস্থ যুবককে -আমি করেছি সবর।
ওরওয়া ইবনে যুবাইর (রাঃ) সবর করলেন। আল্লাহর কাছে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন।
পরীক্ষা কখনও অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আল্লাহ এর দ্বারা মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। ভুলত্রুটি ক্ষমা করেন।
ইবরাহিম (আঃ)। তাওহিদের স্তম্ভ। ইসলামি আকিদার উসতায। তার মাধ্যমে পৃথিবীব্যাপি তাওহিদের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা হয়েছে।
আল্লাহ (সুবঃ) তাকে অনেক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করেছিলেন। তাকে পোড়ানোর জন্য কাঠখড়ি একত্র করা হল। তাতে আগুন প্রজ্জ্বলিত হল। ইবরাহিম (আঃ)-র সামনে আল্লাহর দরজা খোলা ছিল। ধরার মত আল্লাহ (সুবঃ)-র রজ্জু অবশিষ্ট ছিল। তার তওয়াক্কুল ছিল উচ্চমাত্রার।
জিবরাঈল (আঃ) তার কাছে এলেন। ইবরাহিমকে বললেন, 'আপনার কোন সহযোগিতায় আসতে পারি কি?'
তিনি উত্তর করলেন, 'তোমার সহযোগিতা নয়, আমি আল্লাহ (সুবঃ)-র সহযোগিতার অপেক্ষায় আছি!'
ইবরাহিমকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হল। তিনি পাঠ করলেন- 'হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি'মাল ওয়াকীল'।
ইবনে আব্বাস ﷇ একটি দোয়া বর্ণনা করেন, 'হাসবুনাল্লাহু ওয়ানি'মাল ওয়াকীল'। 'আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ঠ, তিনি উত্তম কার্যনির্বাহী!'
ইবনে আব্বাস ﷇ বলেন, "এই দোয়াটি ইবরাহিম ﷇ অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময় পড়েছিলেন। আর রাসুল ﷆ পড়েছিলেন, যখন মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদের জমায়েত হওয়ার সংবাদ এসেছিল। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে-
যখন তাদেরকে লোকে বলেছিলো, তোমাদের বিরুদ্ধে লোক জমায়েত হয়েছে। সুতরাং তোমরা তাদের ভয় কর। কিন্তু এ কথা তাদের বিশ্বাস দৃঢ়তর করেছিল এবং তারা বলেছিল, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কত উত্তম কর্মবিধায়ক। [সূরা আলে ইমরান: ১৭৩]
ইবরাহিম ﷇ অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হয়ে আল্লাহ ﷇ-র মহত্বের কথা স্মরণ করলেন। আল্লাহ ﷇ-ই যথেষ্ট। আল্লাহ ছাড়া কোন হেফযতকারী নেই। কবির ভাষায়-
ওগো আল্লাহ আমার আশার আধার, লক্ষ-কোটি কৃপা তোমার, আমায় রক্ষা করেছো।
অত্যাচারির নিনাদ ভারি, ধ্বংস হবো সমূল ছাড়ি; তুমি রক্ষা করেছো।
তুমি আমায় রক্ষা করে জালিমমনে ভয়ের ভয়াল আঁধার দিয়েছো।
ইবরাহিম অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হয়ে আল্লাহকে ডাকলেন। আল্লাহ ﷇ অগ্নিকে বললেন-
হে অগ্নি, তুমি ইবরাহিমের জন্য শীতল হয়ে যাও, আরামদায়ক হয়ে যাও। [সূরা আম্বিয়া: ৬৯]
আগুনকে শুধু ঠাণ্ডা হতে বললে তা বরফ হয়ে যেত। এজন্য আরামদায়ক ঠান্ডা হতে বললেন। সব আল্লাহ ﷇ-রই কুদরত!
ইবরাহিম-কে আল্লাহ আরও কঠিন পরীক্ষা করেছিলেন সন্তান ইসমাঈল দ্বারা। ইসমাঈল ধীরে ধীরে পরিণত বয়সে পৌঁছলেন। বাবার সাথে চলাফেরা করছেন। এই বয়সে সাধারণত সন্তানের প্রতি বাবার ভালোবাসা অত্যধিক হয়। সন্তানের প্রতি বাবার অন্তর ঝুঁকে যায় খুব বেশি। ইবরাহিমেরও তাই। কিন্তু তার অন্তরে তো শুধু আল্লাহরই ভালোবাসা থাকবে। আল্লাহ ইবরাহিমের অন্তর খালি করতে চাইলেন-
যবে অন্তরের ভালোবাসায় থাকবে না নিজের কিছু, তবেই তো হবে তুমি নিরেট বন্ধু!
ইবরাহিম আল্লাহর খলীল। অন্তরঙ্গ বন্ধু। ইবরাহিমের মনে আল্লাহর ভালোবাসাই বেশি থাকবে। ইসমাঈল যখন পরিণত বয়সে পৌঁছলেন, বাবার নিরঙ্কুশ ভালোবাসা প্রাপ্তির বয়সে পৌঁছলেন, আল্লাহ ইবরাহিম-কে পরীক্ষা করলেন- ইবরাহিমের মনে কার ভালোবাসা বেশি!
ইবরাহিমকে স্বপ্নে দেখালেন- তিনি তার সন্তানকে জবাই করছেন!
নবিদের স্বপ্ন সত্য। স্বপ্ন নিশ্চিত হয়ে তিনি সকালে ছেলেকে জানালেন। ছেলেও একজন প্রকৃত মুমিনের মত প্রতিক্রিয়া জানালেন। আল্লাহ বলেন-
যারা বংশধর ছিলেন পরস্পরের। আল্লাহ শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী। [সূরা আলে ইমরান: ৩৪]
কবির ভাষায়- বাড়ন্ত ছেলে বাড়বে সেভাবে, বাবার প্রতিপালন হবে যেভাবে।
অতঃপর সে যখন পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হল, তখন ইবরাহিম তাকে বললেন, ছেলে! আমি স্বপ্নে দেখি- 'তোমাকে জবাই করছি। এখন তোমার অভিমত কী দেখ।' সে বলল-
পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে সবরকারী পাবেন। [সূরা সাফফাত : ১০২]
ইসমাঈল কত বিনয়ী ভাষায় কথা বললেন! তিনি এভাবেও বলতে পারতেন- 'আপনি আদেশ মত কাজ করুন। আমাকে সবরকারী পাবেন।'
কিন্তু সবর কি তার হাতে! ইচ্ছা করলেই তিনি সবর করতে পারবেন! সবর আল্লাহর হাতে। এ জন্য ইসমাঈল বললেন, 'আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে সবরকারী পাবেন।'
ইবরাহিম ইসমাঈলকে জবাই করার প্রস্তুতি নিলেন। এরপরের ঘটনা কোরআনের ভাষায়-
আমি তার পরিবর্তে জবাই করার জন্য দিলাম এক মহান জন্তু। [সূরা সাফফাত : ১০৭]
ইবরাহিম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। সফল হলেন। প্রমাণ করলেন- তিনি সত্যবাদী। তিনি মুহসিন। আল্লাহ তার জন্য পরবর্তী প্রজন্মে সুনাম ছড়িয়ে দিলেন- তিনি 'সত্যভাষী'। মানুষের মুখে মুখে কেয়ামত পর্যন্ত তার প্রশংসা ও স্তুতি। প্রজন্মান্তরে তার উপর বর্ষিত হচ্ছে দুরূদ ও সালাম। আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।