📄 ইমরান ইবনে হুসাইন ﷺ
ইমরান ইবনে হুসাইন ইবনে উবাইদ খুযাঈ রাসূলের একজন শীর্ষ সাহাবী। খ্যাতনামা মুজাহিদ। গভীর জ্ঞানের অধিকারী। তিনি এক রোগে ত্রিশ বছর ভুগেছিলেন। বিছানা থেকে উঠতে পারছিলেন না। তাকে কেউ দেখতে এসে বললেন, 'আপনি আল্লাহর কাছে বলুন। তিনি রোগ উঠিয়ে নিন।'
ইমরান ইবনে হুসাইন বললেন, 'আল্লাহর যা পছন্দ, আমারও তাই। আল্লাহ যতদিন আমার জন্য এই রোগ লিখেছেন, আমি ততদিন এই রোগে সন্তুষ্ট।'
ইমরান ইবনে হুসাইন এর জীবনীতে উল্লেখ হয়েছে, প্রতিদিন ফজরে ফেরেশতারা তার সাথে ডান হাতে মুসাফাহা করত! [সিয়ারু আলা মিন নুবালা : ২০১]
তার সাথে ফেরেশতাদের মুসাফাহা অসম্ভব কিছু নয়। এটি বুযুর্গদের কারামাত। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের দৃষ্টিতে তা সম্ভব। তিনি ত্রিশ বছর সবর করেছেন। আল্লাহ দুনিয়াতে ফেরেশতাদের মুসাফাহার মাধ্যমে তার সবরের প্রতিদান দিয়েছেন। তার জন্য রয়েছে ব্যাপক কল্যাণ। আল্লাহ-র কাছে অসংখ্য সাওয়াব।
📄 জান্নাতি মহিলা
ইবনে আব্বাস আতা-কে বললেন, 'আতা! তোমাকে একজন জান্নাতি মহিলা দেখাবো!'
আতা বললেন, 'হাঁ, দেখাও।'
ইবনে আব্বাস বললেন, 'এই মহিলা একবার রাসূল-র কাছে এসে বললেন, আল্লাহর রাসূল! আমি মৃগিরোগী। আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।'
আল্লাহর রাসূল বললেন-
তুমি চাইলে আল্লাহর কাছে তোমার জন্য দোয়া করবো। তুমি চাইলে সবরও করতে পার। বিনিময়ে তোমার জন্য থাকবে জান্নাত। [বুখারি : ৫৬৫২]
রাসূল মহিলাকে কত সুন্দর দুটি বিষয়ে ইচ্ছা দিলেন! মহিলাও কী উত্তম বিষয়টি বেছে নিলেন! বললেন- আমি সবর করছি। তবে আমি সতর খুলে ফেলি। আল্লাহ -র কাছে দোয়া করুন, যেন সতর না খুলি।
রাসূল মহিলার সামনে দুটি পথ তুলে ধরলেন। দুটি দিক দেখালেন। দুটি পদক্ষেপের কথা বললেন। মহিলা উত্তম পথটিই বেছে নিলেন। তিনিই জান্নাতি মহিলা। দুনিয়াতে বিচরণকারী জান্নাতি মহিলা।
📄 প্রিয় রাস্তা চোখ
চোখ গুরুত্বপূর্ণ একটি নেয়ামত। চোখ দিয়ে মানুষ জীবনের আলো দেখে। জন্ম- মৃত্যুর খেলা দেখে। জীবনের সৌন্দর্য উপভোগ করে। চোখ দিয়ে পৃথিবী চেনে। মানুষ চেনে। পৃথিবীর সবকিছুর অস্তিত্ব অবলোকন করে।
আল্লাহ মানুষকে চোখ দিয়ে পরীক্ষায় ফেলেন। সামান্য হুকুম দেন। চোখের দৃষ্টি অন্ধ হয়ে যায়। এখানেই মানুষ শেষ। কিছুই করার থাকে না। কোন উপায়-অবলম্বন থাকে না। উপায় একটাই থাকে- ধৈর্য। সবর।
আনাস ইবনে মালেক থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেন-
(আল্লাহ বলেন) যাকে আমি দুটি প্রিয় বস্তু দ্বারা পরীক্ষা করি এবং সে ধৈর্য ধারণ করে, তাকে দুটি প্রিয় বস্তুর বদলে জান্নাত দেই। [বুখারি : ৫৬৫৩]
কী চমৎকার সংবাদ! কী মনোহর উপস্থাপন!
আল্লাহ পরীক্ষা নিচ্ছেন দুটি চোখের আর বলছেন প্রিয় দুটি বস্তুর! কারণ চোখ যে মানুষের অতি প্রিয়! অমূল্য ধন!
আল্লাহ চোখের দৃষ্টি কেড়ে নিচ্ছেন, বলছেন পরীক্ষা করছি! কারণ পরীক্ষায় আছে বান্দার জন্য পুরষ্কার! সাওয়াব ও প্রতিদান। আছে জান্নাত। জান্নাতের খাযানা।
ইয়াযিদ ইবনে হারুন ওয়াসতি। তার চোখের দৃষ্টি হারিয়ে গিয়েছিল। তাকে জিজ্ঞেস করা হল, 'আপনার চোখের দৃষ্টি কোথায় গেল?'
তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম, শেষ রাতের ক্রন্দন চোখের দৃষ্টি নিয়ে গেছে।’
ইবনে আব্বাস রাঃ। শেষ জীবনে তার চোখের দৃষ্টি মিলিয়ে যায়। দুর্মুখেরা ঠাট্টা করতে থাকে। তামাশা রটাতে থাকে। ইবনে আব্বাস রাঃ শুনে বললেন- আল্লাহ যবে মিলিয়ে দিলেন চোখের নূর, হৃদয়দেশে দিলেন নূরের আলোকছটা। স্বচ্ছ বিবেক সরল হৃদয় নেই কো কুব্জ, মুখে আছে তরবারি তেজ বচনধারা।
কত বাস্তবতা তুলে ধরেছেন ইবনে আব্বাস রাঃ। আল্লাহ সাঃ চোখের নূর মিলিয়ে দিলেও অন্তরদেশ আলোকিত। দৃষ্টিসম্পন্ন। চোখের জ্যোতি হারিয়ে গেলেও তার রূহের জ্যোতি রশ্মি ফেলছে জগতময়।
ইবনে হুবাইরা রঃ। ইফসাহ গ্রন্থের প্রণেতা। হাম্বলি মাযহাবের অনুসারী। ইবনুল জাওযি রঃ এর উসতায। আব্বাসি খেলাফতকালের প্রসিদ্ধ উযির। আল্লাহভীরু। তিনি একবার মিনা ময়দানে বৃষ্টির দোয়া করেছেন, মিনায় থাকাকালীনই বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে। তখন তিনি কেঁদে কেঁদে বললেন, ‘হায়! যদি আমার মাগফিরাতের দোয়া করতাম!’
একদিন তিনি উযিরের আসনে বসে আছেন। জনৈক ব্যক্তি তার কাছে আগমন করলেন। ইবনে হুবাইরা তাকে কিছু হাদিয়া দিলেন। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। উপস্থিত লোকেরা ইবনে হুবাইরাকে বলল, ‘কী ব্যাপার, চেনা-জানা নেই। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন! হাদিয়াও দিলেন!’
তিনি বললেন, ‘আমরা যুবক ছিলাম। তিনি আমাকে চিনেননি। আমি তাকে চিনেছি। তার এক আঘাতে ত্রিশ বছর হল, আমার চোখের দৃষ্টি মিলিয়ে গিয়েছিল। আমি এ কথা কাউকে বলিনি।’
ইবনে হুবাইরা কারও কাছে অভিযোগ করেননি। অভিযোগ-অনুযোগ তো শুধু আল্লাহরই কাছে!
📄 প্রিয় সন্তান
সন্তান-সন্ততি আল্লাহর অপার নেয়ামত। আল্লাহ সৎকর্মশীলদের আলোচনা করেছেন। বলেছেন, তারা আল্লাহ -র কাছে বলত-
হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানদের পক্ষ থেকে আমদের জন্য চোখের শীতলতা দান কর। [সূরা ফুরকান : ৭৪]
জীবন সুশোভিত করে তোলে সন্তান ও সম্পদ। এগুলো পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য।
সন্তান চোখের সামনে বেড়ে ওঠে, ইসলামের আলোকে জীবন সাজিয়ে তোলে, আল্লাহ-র সেজদায় অবনত হয়, কোরআনের মধুময় তেলাওয়াত শোনায়, -এর চেয়ে সুখকর চিত্র জীবনের আর কোন পাটে আছে!
কিন্তু সেই সন্তানকে যখন আল্লাহ চোখের সামনে থেকে ডেকে নেন, তখন কী আর করার থাকে!
রাসূল বলেন-
আল্লাহ বলেন, 'আমার মুমিন বান্দার অন্তর-প্রিয়কে যখন কেড়ে নেই এবং সে ধৈর্য ধারণ করে, তখন তার জন্য জান্নাতই উপহার! [বুখারী : ৬৪২৪]
আল্লাহ সন্তান কেড়ে নেয়ার কথা বলেননি। বাবা, ভাই বা বন্ধু কেড়ে নেয়ার কথা বলেননি। একজনের কথা বলে অপরজনকে বাদ দেননি। বরং যার বিচ্ছেদে কষ্ট আসে, দুঃখ লাগে, সেই অন্তর-প্রিয়। তিনি বাবা হতে পারেন। সন্তান হতে পারেন। ভাই-বন্ধুও হতে পারেন। তাদের যে কারও বিচ্ছেদে ধৈর্য ধারণ করলে তার জন্য জান্নাত উপহার!
রাসূল ইরশাদ করেন-
কারো সন্তান মারা গেলে আল্লাহ ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করেন, 'তোমরা কি আমার বান্দার সন্তানকে উঠিয়ে নিয়েছ? ফেরেশতারা বলে, 'হাঁ।'
আল্লাহ বলেন, 'তোমরা কি তার কলিজার ধনকে কেড়ে নিলে?' ফেরেশতারা বলে, 'হাঁ।'
আল্লাহ জিজ্ঞেস করেন, 'আমার বান্দা কী বলল?' ফেরেশতারা বলে, 'সে তোমার প্রশংসা করেছে এবং ইন্নালিল্লাহ পড়েছে।'
তখন আল্লাহ বলেন, 'তোমরা আমার বান্দার জন্য জান্নাতে একটি ঘর বানাও এবং তার নাম দাও 'বাইতুল হামদ।” [আহমাদ: ১৯২২৬]
জান্নাতের সেই ভবনটি হবে সাদা মেঘের মত। উজ্জ্বল তারার মত। সেখানে লেখা থাকবে- 'বাইতুল হামদ'। সন্তান হারানোর ব্যথায় যারা ধৈর্য ধারণ করেছে, তারা সেখানে প্রবেশ করবে।
জান্নাতের এই সুসংবাদ মহিলার জন্যও। বরং সন্তান হারানো মহিলা ধৈর্যধারণ করলে তার জন্য রাসূল যে সুসংবাদ দিয়েছেন, পুরুষের জন্য তা দেননি।
রাসূল বলেন- তোমাদের মধ্যে যে মহিলা তিনটি সন্তান আগেই পাঠাবে, (তার জীবিতাবস্থায় তিনটি সন্তান মারা গেলে) তারা তার জন্য জাহান্নামের পর্দাস্বরূপ হয়ে থাকবে।
তখন এক মহিলা বলল, 'আর দুটি পাঠালে?' রাসূল বললেন, 'দুটি পাঠালেও।' [বুখারি: ১০২]
কোন কোন বর্ণনা মতে মহিলা আবার জিজ্ঞেস করল, 'আর একটি পাঠালে?' রাসূল বললেন, 'একটি পাঠালেও।'
একটি সৎসন্তানের মৃত্যুতে সবরকারীর জন্য আল্লাহ জান্নাত উপহার রেখেছেন! সকল প্রশংসা আল্লাহরই!