📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 বুযুর্গদের দোয়া কবুল

📄 বুযুর্গদের দোয়া কবুল


আল্লাহওয়ালা বুযুর্গদেরও দোয়া কবুল হওয়ার অনেক ঘটনা আছে। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি রাসূলের কাছে বললেন, 'আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন আমার দোয়া কবুল করা হয়।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
يَا سَعْدُ أَطِبْ مَطْعَمَكَ تَكُنْ مُسْتَجَابَ الدَّعْوَةِ.
সাদ, তোমার রিযিক হালাল রেখ। তোমার দোয়া কবول হবে। [মাজমাউদ যাওয়াইদ : ১৮১০১]
দোয়া কবুল হওয়ার জন্য রিযিক হালাল হওয়া আবশ্যক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এলোকেশী ধুলোমলিন এক দীর্ঘ পথের মুসাফিরের কথা উল্লেখ করে বলেন- সে আকাশের দিকে দুহাত তুলে দোয়া করছে- 'হে আল্লাহ! হে আল্লাহ!' অথচ তার রিযিক হারাম। পোষাক হারাম। ভরণপোষণও হারাম। কীভাবে তার দোয়া কবুল হবে! [মুসলিম: ১০১৫]
জনৈক ব্যক্তি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের উপর অপবাদ দিয়ে বলল, 'সাদ ন্যায়বিচার করে না। প্রজাদের সাথে ইনসাফ রাখে না। যুদ্ধে বেরোয় না।'
সাদ আল্লাহর কাছে বললেন, 'সে যদি মিথ্যুক হয়, তবে আল্লাহ তার বয়স দীর্ঘ করুন। তাকে ফেতনার সম্মুখীন করুন।'
আল্লাহ সেই লোকের বয়স দীর্ঘ করলেন। বার্ধক্যে তার চোখে পর্দা পড়ে গেল। সে ফেতনারও সম্মুখীন হল। কুফার রাস্তাঘাটে সে মেয়েদের সামনে গিয়ে দাঁড়াত। আর বলত, 'আমি ফেতনায় নিপতীত এক বৃদ্ধ। সাদের বদদোয়া লেগেছে আমার উপর!'
জনৈক ব্যক্তি সাদ এর সামনে আলি -কে গালমন্দ করল। সাদ রাযি. বললেন, 'আমার ভাইকে গালমন্দ করো না।'
অতঃপর সাদ বললেন, 'আল্লাহ, আমাদের পক্ষে তুমিই তার জন্য যেভাবে ইচ্ছা যথেষ্ট হয়ে যাও।'
ঘটনাক্রমে কুফা থেকে একটা উট আসল। লোকজন ছিল উটের পিছনে। ঐ ব্যক্তি এসে উটটাকে প্রহার করল। উটটা তাকে মেরে ফেলল।
সাহাবায়ে কেরাম একটি যুদ্ধে রওয়ানা হলেন। তাদের দলনেতা ছিলেন আলা হাযরামি। চলতে চলতে বাহিনী পথ ভুলে গেল।
তাদের সাথে পানি শেষ হয়ে গেল। আশপাশেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। বাহিনীর লোকেরা বলল, 'আমাদের দলনেতা! আল্লাহর কাছে বলুন।'
আলা ইবনে হাযরামি আল্লাহর দিকে ঝুঁকলেন। আল্লাহকে ডাকলেন কায়মনোবাক্যে। ছোট্ট একটু দোয়া করলেন- 'ইয়া হাকীমু, ইয়া আযীমু, ইয়া আলীমু, ইয়া হাকীমু, ইয়া আলীমু, ইয়া আযীমু, আগিছনা। আমাদের সাহায্য করুন।'
বর্ণনাকারী বলেন, আল্লাহর কসম! তার দোয়া শেষ হতেই একখণ্ড মেঘ উড়ে এল। মাথার উপর আকাশ ছেয়ে নিল। মুষলধারে বৃষ্টি ঝরাল। সাহাবায়ে কেরাম তৃপ্তিভরে পানি পান করলেন। অজু করলেন। তারপর মেঘখণ্ডটি উড়ে গেল!
আলা ইবনে হাযরামি নদির পাড়ে এসে আল্লাহর কাছে বললেন, 'আমাদের জন্য সমুদ্র জমাট করে দাও।'
আল্লাহ সমুদ্র জমাট করে দিলেন। আলা ইবনে হাযরামি দলবলসহ হেঁটে গেলেন।
সমুদ্রপথে বাহিনীর একটি ব্যাগ হারিয়ে গেল। তারা সমুদ্রপথে থাকতেই এক লোক ব্যাগটি নিয়ে এল। ব্যাগে এক ফোঁটা পানিও লাগেনি। আলা ইবনে হাযরামি ঐ লোকের কাছ থেকে ব্যাগটি বুঝে নিলেন।
উম্মে আইমান। মক্কা থেকে মদিনার পথে আল্লাহ ও রাসূলের জন্য হিজরতে বের হলেন। পথিমধ্যে পিপাষার্ত হয়ে পড়লেন। পানি খোঁজ করে পেলেন না। মৃত্যুর উপক্রম হলেন।
উম্মে আইমান আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। আসমান থেকে একটি বালতি নেমে আসল। তিনি পান করলেন। পরিতৃপ্ত হলেন। বালতিটি আসমানে উঠে গেল। এরপর তিনি চল্লিশ বছর বেঁচে ছিলেন। কখনই পিপাসাকাতর হননি!
বারা ইবনে মালেক। রাসূল তার ব্যাপারে বলেন-
অনেক লোক এমনও আছে, যার মাথার চুল এলোমেলো। ধুলাবালি জড়িত। দুখানা পুরাতন কাপড় পরিহিত। যার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করা হয় না। যদি সে আল্লাহর উপর ভরসা রেখে কোন বিষয়ে শপথ করে, আল্লাহ তার কসমকে পূরণ করেন। এসকল লোকের মধ্য হতে বারা ইবনে মালেক হলেন অন্যতম। [তিরমিযি: ৩৮৫৪]
বারা ইবনে মালেক আল্লাহর কাছে দোয়া করলেই তা কবুল হত।
একবার তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হলেন। বাহিনীর লোকেরা তাকে বলল, 'আল্লাহর দোহাই দিয়ে আপনাকে বলছি! আল্লাহর কাছে শপথ করে দোয়া করুন, যেন আল্লাহ আজ আমাদের সাহায্য করেন।'
বারা ইবনে মালেক বললেন, 'আমাকে একটু সময় দাও।'
এ কথা বলে তিনি গোসল করলেন। কাফনের কাপড় পরে তলোয়ার হাতে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, 'আল্লাহ, তোমার কসম দিচ্ছি! তুমি আমাকে প্রথম শহিদ বানাও। মুসলমানদের সাহায্য কর।'
যুদ্ধক্ষেত্রে বারা ইবনে মালেক প্রথম শহিদ হলেন। রাহিমাহুল্লাহ। মুসলমানরাও আল্লাহর সাহায্যে বিজয়ী হল।

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 আল্লাহওয়ালাদের কাছে দোয়া প্রার্থনা

📄 আল্লাহওয়ালাদের কাছে দোয়া প্রার্থনা


আমরা সাধারণত একে অপরের কাছে দোয়া প্রার্থনা করি। দোয়ায় বিভিন্নজনের উসিলা ধরে থাকি। অপরকে বলি, 'ভাই, দোয়ার সময় আমাকে স্মরণ রাখবেন। ভুলবেন না যেন।' 'আপনার উসিলায় আল্লাহ যদি এটা করেন...'
আমরা কি যে কারও কাছে এভাবে দোয়া প্রার্থনা করতে পারি!
হ্যাঁ, যে কারও কাছে এভাবে দোয়া প্রার্থনা করা যাবে। তবে দুটি বিষয় লক্ষ রাখতে হবে।
এক. যার কাছে দোয়া চাইবো, তিনি জীবিত থাকবেন। উপস্থিত থাকবেন।
দুই. তিনি নেককার সৎ মানুষ হবেন।
জীবিত কারও উসিলায় দোয়া প্রার্থনা করা যাবে। মৃত কারও কাছে দোয়া প্রার্থনা করা যাবে না। কারও কবরের কাছে গিয়ে এ প্রার্থনা করা যাবে না- 'আল্লাহর কাছে আমি আপনার উসিলা ধরছি।'
এভাবে বললে শিরক হবে। দুনিয়া-আখেরাত নিষ্ফল হবে। কেয়ামতের দিন আল্লাহ-র কাছে কিছুই পাওয়া যাবে না। আল্লাহ বলেন-
আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছে, যদি আল্লাহর শরিক স্থির করেন তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন হবেন। [সূরা যুমার: ৬৫]
জীবিত ব্যক্তি উপস্থিতও থাকতে হবে। অনুপস্থিত কারও উসিলায় দোয়া প্রার্থনা করা যাবে না। যেমন কোন ব্যক্তি রিয়াদ বা জেদ্দায় রইল, আমি এখানে তার উসিলা ধরে দোয়া করলাম- 'আল্লাহ, ঐ ব্যক্তির উসিলায় তোমার কাছে প্রার্থনা করছি। তুমি আমাকে মাফ করে দাও।'
এটা জায়েয হবে না। যার উসিলা ধরা হবে, তিনি উপস্থিত থাকবেন।
যার কাছে দোয়া চাইবো, যার উসিলায় দোয়া চাইবো, তিনি নেককার মানুষ হবেন। কোন পাপাচারীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করা যাবে না। সাম্যবাদী-কমিউনিস্ট, ধর্মত্যাগী-অবিশ্বাসী-নাস্তিকের কাছে দোয়া চাওয়া যাবে না। তাকে এ কথা বলা যাবে না- ‘ভাই, দোয়ার সময় আমাকে ভুলবেন না যেন।’
সে আল্লাহর কাছে কিসের দোয়া করবে! আল্লাহর কাছে তার কিছুই তো নেই! আল্লাহ বলেন-
নিশ্চয় যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলেছে এবং এগুলো থেকে অহঙ্কার করেছে, তাদের জন্য আকাশের দ্বার উন্মুক্ত করা হবে না এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যে পর্যন্ত না সুচের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করে। আমি এমনিভাবে পাপীদের শাস্তি প্রদান করি। [সূরা আরাফ: ৪০]
আল্লাহ-র কাছে তার কোন হক নেই। কোন দাবি নেই। অংশ নেই। গ্রহণযোগ্যতা নেই। সাফল্য, সন্তুষ্টি, বিনিময়, কিছুই নেই। তার জন্য আছে আল্লাহ-র গযব, লানত, দূরত্ব ও ধ্বংস।
দোয়া চাইতে হবে নেককার আল্লাহওয়ালাদের কাছে। ওমর রাসূল-র কাছে বললেন, ‘আল্লাহর রাসূল, আমি ওমরার নিয়ত করেছি।’
রাসূল বললেন- يَا أَخِي لَا تَنْسَنَا مِنْ دُعَائِكَ
ভাই, তোমার দোয়ায় আমাদের ভুলো না। [আহমাদ: ১৯৬]
ইবনে তাইমিয়া বলেন, কেউ যখন কারও কাছে দোয়া প্রার্থনা করে, প্রার্থনাকারী মূলত দোয়াকারীর কল্যাণকামী হয়ে থাকে। দোয়াকারী যখন আল্লাহর কাছে প্রার্থনাকারীর জন্য দোয়া করে, তখন দোয়াকারীকে বলা হয়, ‘তোমার জন্যেও অনুরূপ!’

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 দোয়ায় বাড়াবাড়ি

📄 দোয়ায় বাড়াবাড়ি


দোয়ায় অনেক সময় বাড়াবাড়ি হয়। যেমন কেউ দোয়া করল- ‘হে আল্লাহ, তুমি আমায় নবি বানিয়ে দাও!’
'আবু বকরের চেয়ে উত্তম বানিয়ে দাও!' 'উসমান আলির চেয়ে উত্তম বানিয়ে দাও।'
এরূপ দোয়া বৈধ নয়। সম্পূর্ণ হারাম।
আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফফালের ছেলে দোয়া করছে- 'আল্লাহ! জান্নাতের ডান পাশে আমাকে একটি শ্বেত-শুভ্র ভবন দিও।'
আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল তার দোয়া শুনলেন। ছেলেকে ডেকে বললেন, “আমি রাসূল -কে বলতে শুনেছি, 'শেষ যমানায় এমন একটি জাতি বেরুবে, যারা দোয়ায় এবং পবিত্রতা অর্জনে সীমালঙ্ঘন করবে।' তুমি এমন দোয়া না করে জান্নাত পাওয়ার দোয়া কর। জাহান্নাম থেকে মুক্তির দোয়া কর।” [আহমাদ: ১৬৩৫৪]
দোয়ায় বাড়াবাড়ির আরেকটি রূপ হল কৃত্রিম সুর-ছন্দে এবং ভনিতায় দোয়া করা।

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 দোয়ার বিরক্তি, নিরাশা, ক্রমে দোয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া

📄 দোয়ার বিরক্তি, নিরাশা, ক্রমে দোয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া


রাসূল বলেন-
তোমাদের দোয়া আল্লাহ কবুল করবেন, যদি তোমরা এ কথা না বল- ‘আমি দোয়া করছি, আল্লাহ কবুল করছেন না। [বুখারি: ৬৩৪০]
আল্লাহ দ্রুত দোয়া কবুল করেন না। বান্দাকে দোয়ায় অব্যাহত রাখতে চান। আল্লাহ -র কাছে প্রতিটি বিষয় সমাধা হওয়ার জন্য সময় নির্দিষ্ট আছে। আল্লাহ নির্দিষ্ট সময়ে পরিমিতভাবে সকল বিষয় সমাধা করেন। সুতরাং দোয়া কবুল হওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করা উচিৎ নয়।
কখনও কখনও দুনিয়ার চেয়ে আখেরাতে দোয়াটি বেশি লাভজনক হয়। দোয়ার উসিলায় বিভিন্ন অনিষ্টও দূর করা হয়। বর্তমান সঙ্কটের চেয়ে দ্বিগুণ সঙ্কট দূর করা হয়।
কখনও আবার আল্লাহ এই দোয়ার সাওয়াব সংরক্ষিত রাখেন। কিছু বিলম্বে দোয়ার প্রতিফলন ঘটান। সুতরাং দোয়া কবুল হওয়ার জন্য তাড়াহুড়া উচিৎ নয়। নিরাশ হওয়া উচিৎ নয়। বরং দোয়া অব্যাহত রাখা চাই। আল্লাহ -র রহমত থেকে অবিশ্বাসীরাই নিরাশ হয়!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00