📄 সৎকর্মপরায়ণদের দোয়া
আল্লাহ বলেন-
মনে রেখো, যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের না কোন ভয়-ভীতি আছে, না তারা চিন্তান্বিত হবে; যারা ঈমান এনেছে এবং ভয় করতে রয়েছে। [সূরা ইউনুস : ৬২, ৬৩]
আল্লাহ -র বন্ধুগণ মসজিদমুখী হন। সামনের কাতারে সালাত আদায় করেন। কোরআন তাদের নিত্যসঙ্গী। মুখে থাকে সদা আল্লাহ -র পবিত্রতা। তারা সওম রাখেন। রাত জেগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। এক আল্লাহ -র যিকির করেন। পর্দায় বসবাস করেন।
সাহাবায়ে কেরাম একটি যুদ্ধে রওয়ানা হলেন। তাদের দলনেতা ছিলেন আলা হাযরামি। চলতে চলতে বাহিনী পথ ভুলে গেল।
তাদের পানি শেষ হয়ে গেল। আশপাশেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। বাহিনীর লোকেরা বলল, 'আমাদের দলনেতা! আল্লাহর কাছে বলুন।'
আলা ইবনে হাযরামি আল্লাহর দিকে ঝুঁকলেন। আল্লাহ -কে ডাকলেন কায়মনোবাক্যে। ছোট্ট একটু দুয়া করলেন- 'ইয়া হাকীমু, ইয়া আযীমু, ইয়া আলীমু, ইয়া হাকীমু, ইয়া আলীমু, ইয়া আযীমু, আগিছনা। আমাদের সাহায্য করুন।'
বর্ণনাকারী বলেন, আল্লাহর কসম! তার দোয়া শেষ হতেই একখণ্ড মেঘ ভেসে এল। মাথার উপর আকাশ ছেয়ে নিল। মুষলধারে বৃষ্টি ঝরাল। সাহাবায়ে কেরام তৃপ্তিভরে পানি পান করলেন। অজু করলেন। তারপর মেঘখণ্ডটি উড়ে গেল!
সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ তাদের দোয়া কত দ্রুত কবুল করেন!
বারা ইবনে মালেক আল্লাহ -র কাছে দোয়া করলেই তা কবুল হত।
একবার তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হলেন। বাহিনীর লোকেরা তাকে বলল, 'আল্লাহ -র দোহাই দিয়ে আপনাকে বলছি! আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন আল্লাহ আমাদের সাহায্য করেন।'
বারা ইবনে মালেক বললেন, 'আমাকে একটু সময় দাও।'
এ কথা বলে তিনি গোসল করলেন। কাফনের কাপড় পরে তলোয়ার হাতে নিয়ে আল্লাহ -র কাছে দোয়া করলেন, 'আল্লাহ, তোমার কসম দিচ্ছি! তুমি আমাকে প্রথম শহীদ বানাও। মুসলমানদের সাহায্য কর।'
যুদ্ধক্ষেত্রে বারা ইবনে মালেক প্রথম শহীদ হলেন। রাহিমাহুল্লাহ। মুসলমানরাও আল্লাহ -র সাহায্যে বিজয়ী হল।
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস । রাসূল তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন, যেন তাঁর দোয়া কবুল হয়। এরপর থেকে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস কোন দোয়া করলেই তা কবুল হত!
তিনি যখন ইরাকে দায়িত্ব পালন করছেন, তখন এক লোক তাকে পরীক্ষা করতে এল। বলল, সে সুন্দর করে সালাত পড়তে পারে না। সব বিধান পালন করতে পারে না।'
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস বদদোয়া করলেন, 'আল্লাহ, তার বয়স দীর্ঘ কর। তার দারিদ্রতা দীর্ঘ কর। তাকে ফেতনার সম্মুখীন কর।'
কয়েক বছর পর সেই লোকটি কুফার রাস্তায় রাস্তায় মানুষের কাছে ভিক্ষা করতে শুরু করল। মানুষের কাছে গিয়ে বলতে লাগল, 'আমি ফেতনায় নিপতীত একজন লোক। সাদের বদদোয়া লেগেছে আমার উপর!'
📄 দোয়ার লাভালাভ
এক.
দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর তাওহিদের ঘোষণা হয়। যার তাওহিদ যতখানি গভীরে প্রেথিত, সে তত বেশি দোয়া করে। দোয়া আল্লাহ -র সাথে সম্পর্কের প্রমাণ।
দুই.
দোয়া আল্লাহ -র দাসত্বের সত্যায়ন। দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহ -র কাছাকাছি পৌঁছা যায়। যে সংগোপনে আল্লাহ -কে ডাকে, সে যেন আল্লাহ -র দাসত্বে অটল রইল।
তিন.
দোয়া ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। যে বান্দা বেশি দোয়া করে, সে আল্লাহর বেশি নৈকট্য অর্জন করে।
কবি বলেন,
আমার চাওয়া যদি ফিরিয়েই বা দিবে,
তবে কেন শিখালে আমায় চাওয়ার ঢং!
আল্লাহ-কে যে বেশি ভালোবাসে, সে আল্লাহ-র কাছে বেশি দোয়া করে। সেজদাবনত হয়ে দোয়া করে। সালাত শেষে দোয়া করে। রাতের শেষে দোয়া করে। দুই আযানের মাঝে দোয়া করে।
চার.
আল্লাহ-র নৈকট্য অর্জন হয়। বান্দা যখন বেশি বেশি দোয়া করে, আল্লাহ-র নৈকট্য অনুধাবন করে। এই অনুধাবন হল নৈকট্যে সর্বোচ্চ স্তর। এহসানের স্তর। এহসান হল-
তুমি এভাবে এবাদত কর, যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ। তুমি আল্লাহকে না দেখলেও আল্লাহ তোমাকে দেখছেন। [বুখারি: ৫০]
পাঁচ.
আল্লাহ-র সাথে সম্পর্ক দৃঢ়তর হয়। যে বেশি দোয়া করে, তার আস্থা তত অবিচল হয়। ভরসা বৃদ্ধি পায়। যে কম দোয়া করে, আল্লাহ-র প্রতি তার আস্থা কমে যায়। নিরাশা তাকে ঘিরে ধরে।
আসুন, বেশি বেশি দোয়া করি। ভিক্ষার হাত আল্লাহ-র কাছে উত্তোলন করি। সাহায্য-সহযোগিতা আল্লাহর কাছেই চাই।
মিসওয়াক করে, পবিত্র হয়ে দোয়া করি। ফযিলতপূর্ণ সময়ে, ফযিলতপূর্ণ স্থানে; বাইতুল্লায়, মসজিদে, যিকিরের মজলিসে কেবলামুখী হয়ে দোয়া করি। আসমাউল হুসনার দোহায় দিয়ে দোয়া করি। দোয়ায় রাসূলের উপর দরূদ পাঠ করি।
📄 আল্লাহকে ডাকো; গোপনে, মিনতিভরে
সকল প্রশংস মহান আল্লাহর জন্য। দুরূদ ও সালাম সর্বশ্রেষ্ঠ নবি ও রাসূল মোহাম্মদের জন্য; সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
আল্লাহ ﷺ বলেন-
তোমরা স্বীয় প্রতিপালককে ডাক কাকুতি-মিনতি করে এবং সংগোপনে। তিনি সীমা অতিক্রমকারীদের পছন্দ করেন না। [সূরা আরাফ : ৫৫]
আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে- বস্তুতঃ আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে। [সূরা বাকারা : ১৮৬]
রাসূল ﷺ বলেন-
দোয়া একটি স্বতন্ত্র এবাদত। [প্রাগুক্ত]
দোয়া সকল এবাদতের সার-মজ্জা। [প্রাগুক্ত]
এ অধ্যায়ে দোয়া প্রসঙ্গে কিছু শিরোনাম আলোচনা হবে-
১. দোয়ার প্রতি অনুপ্রেরণা।
২. কোরআনে বর্ণিত নবিদের বিভিন্ন দোয়া।
৩. হাদিসে বর্ণিত সবচে তাৎপর্যময় দোয়া।
৪. রাসূল ﷺ থেকে সহিহভাবে বর্ণিত দোয়াসমূহ।
৫. সাইয়িদুল ইসতিগফার। শ্রেষ্ঠ ইসতিগফারের বিস্তারিত বিবরণ।
৬. চিন্তা-পেরেশানি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থেকে মুক্তিপ্রার্থনা।
৭. আল্লাহ -র কাছে দোয়া কবুল হওয়ার কিছু বিরল দৃষ্টান্ত।
📄 দোয়ার প্রতি অনুপ্রেরণা
রাসূল ইরশাদ করেন, দোয়া একটি স্বতন্ত্র এবাদত। [প্রাগুক্ত]
এই হাদিসটি আমাদের দোয়ার প্রতি অনুপ্রেরণা যোগায়।
অনেকেই দোয়ার প্রতি গুরুত্ব কম দেয়। বলে থাকে, এটি দ্বিতীয় স্তরের এবাদত। দোয়া করলেও কী, না করলেও কী! এটি স্বাভাবিক একটি বিষয়! অথচ দোয়া হল রাতের অস্ত্র! রাতের বর্শা!
জনৈক বুযুর্গকে এক জালেম বাদশাহর কাছে উপস্থিত করা হল। বাদশাহ বুযুর্গকে বলল, 'আল্লাহর কসম! তোমাকে এমনভাবে হত্যা করবো, এভাবে আর কেউ কাউকে হত্যা করেনি!'
বুযুর্গ বললেন, 'তোমার কাছে সৈন্য আছে। অস্ত্র আছে। তীর-তলোয়ার আছে। আর আমার কাছে আছে রাতের মরণাস্ত্র! রাতের বর্শা!'
বাদশাহ জিজ্ঞেস করল, 'কী তোমার রাতের অস্ত্র?'
বুযুর্গ বললেন, 'এ হল শেষ রাতের চোখের জলে ধোয়া তীক্ষ্ণ বর্শা! এ অস্ত্র হল বিনয় ও আবেগমাখা মন্ত্র! এ আবেগ ও অশ্রু আল্লাহ -র কাছে পৌঁছে। তখন আল্লাহ বলেন, আমার ইযযত ও মহত্ত্বের কসম! আমি কিছুক্ষণ পরে হলেও তোমার সাহায্য করবোই!'
বাদশাহ ভয় পেয়ে গেল। কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'তুমি যতক্ষণ আল্লাহ -র আশ্রয় গ্রহণ করবে, ততক্ষণ আমি তোমাকে স্পর্শও করবো না!'
বারামেকা জাতির ইতিহাস সুবিদিত। তাদের প্রাচুর্য ও ঐশ্বর্য ছিল। আমোদ- প্রমোদ ছিল। খাওয়া-দাওয়া, ফুর্তি, সবই তারা করেছিল। দীর্ঘ জীবন বেঁচে ছিল। উঁচু উঁচু দালান-কোঠাও নির্মাণ করেছিল। কিন্তু সবকিছুতেই তারা সীমালঙ্ঘন করেছিল। এমনকি তাদের ভবনগুলোর পলেস্তরায় স্বর্ণপ্রলেপ দিয়েছিল।
বলতে বলতে তারা জুলম অত্যাচার শুরু করল। রক্তপাত শুরু করল। তখন তাদেরই একজন বুযুর্গ ও বয়স্ক ব্যক্তি আল্লাহ -এর কাছে হাত তুললেন-
‘আল্লাহ! তুমি বারামেকা জাতিকে ধ্বংস কর!’
আল্লাহ তাদের শাস্তি দিলেন। একটু অবকাশ আর দিলেন না। ভয়ানক শাস্তিতে তাদের ধ্বংস করলেন। ‘আর তোমার পরওয়ারদেগার যখন কোন পাপপূর্ণ জনপদকে ধরেন, তখন এমনিভাবেই ধরে থাকেন। নিশ্চয় তার পাকড়াও খুবই মারাত্মক। বড়ই কঠোর। [সূরা হুদ: ১০২]
তাদের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র বাদশাহ হারুনুর রশিদের হাতেই তাদের শাস্তি রচনা করলেন। যে আল্লাহ -এর রজ্জু বাদ দিয়ে অন্য রজ্জু ধরে, তখন অন্য রজ্জুই তার আসল রজ্জু কেটে দেয়। যে কোন বন্ধু-সাথী গ্রহণ করে আল্লাহ -কে ভুলে যায়, তখন ঐ বন্ধুই তাকে স্থলিত করে।
বারামেকিদের সবচেয়ে প্রিয় ও বন্ধুভাবাপন্ন বাদশাহ হারুনুর রশিদ বারামেকি যুবকদের হত্যা করলেন। বৃদ্ধদের জেলে পুরলেন। ভবনগুলোয় সৈন্য জড়ো করলেন।
বারামেক গোত্রের জনৈক বৃদ্ধ, বয়সাধিক্যে তার ভ্রুযুগল চোখের উপর এসে পড়েছিল, -তাকে জিজ্ঞেস করা হল- ‘কেমন আছেন?’
তিনি বললেন, ‘আখেরাতবাসীদের তুলনায় আমরা মৃত নই। দুনিয়াবাসীর তুলনায় আমরা জীবিতও নই। আমি আট বছর যাবৎ বন্দী হয়ে আছি। সূর্যের আলো দেখছি না।’
জিজ্ঞেস করা হল, ‘কী অপরাধে আপনাদের এ করুণ পরিণতি?’
তিনি বললেন, ‘আমরা আল্লাহ -এর অবাধ্য হয়েছি। মজলুমের আর্তনাদ রাতের আঁধারকে গাঢ় করে তুলেছে। আমরা উদাসীন ছিলাম, কিন্তু আল্লাহ উদাসীন হননি।’
দোয়ার গুরুত্ব কিছুতেই কম নয়। দোয়া দ্বিতীয় স্তরের এবাদত নয়। যাদের কাছে দোয়ার গুরুত্ব কম, তারা আহমক ছাড়া আর কী!
ইবনুল জাওযি ؒ এক আহমকের ঘটনা উল্লেখ করেন। আহমক কোথাও সফরের উদ্যোগ নিল। তাকে বলা হল, 'আমরা তোমার জন্য দোয়া করবো?' আহমক বলল, 'না। আমার দোয়ার দরকার নেই। গন্তব্যস্থল কাছেই!'
কতবড় আহমক! গন্তব্য কাছে হোক, দূরে হোক, আল্লাহর হেফাযত ছাড়া কোন গত্যন্তর আছে কি! আল্লাহই তো আমাদের সাহায্য ও সঙ্গ দেন সবসময়!
হাসন বসরি ؒ। একবার কোরআনের কজন কারীর কাছে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মুখোশ উন্মোচন করেছিলেন। হাজ্জাজের উপর রাগ প্রকাশ করে তাকে বকেছিলেন। হাজ্জাজের ক্ষোভ হল। হাসান বসরি ؒ-কে তলব করে পাঠাল। তার পেয়াদারা গিয়ে হাসান বসরিকে বলল, 'হাজ্জাজ আপনাকে ডেকেছেন।'
হাসান বসরি আল্লাহ ﷻ-র কাছে দোয়া করলেন। বললেন, 'আল্লাহ, হাজ্জাজকে আজ আমার বশ করে দিও।'
হাসান বসরি হাজ্জাজের কাছে পৌঁছুবামাত্র হাজ্জাজ পরিবর্তন হয়ে গেল। তার রাগ উড়ে গেল। হাসান বসরি হাজ্জাজের সামনে আসলেন, হাজ্জাজ আচমকা এক ভয়ে লজ্জায় সুগন্ধি নিয়ে হাসানকে সুগন্ধি মাখিয়ে দিল।
পেয়াদারা হাজ্জাজকে জিজ্ঞেস করল, 'আপনি হাসানকে কিছু করলেন না যে!' হাজ্জাজ বলল, 'আল্লাহর কসম! তাকে দেখে আমার জীবনের সবচে বেশি ভীত ও ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম!'
সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ ﷻ বলেন-
আপনি সেই চিরঞ্জীবের উপর ভরসা করুন, যার মৃত্যু নেই। [ফুরকান: ৫৮]
যাদেরকে লোকেরা বলেছে যে, 'তোমাদের সাথে মোকাবেলা করার জন্য লোকেরা সমাবেশ করেছে বহু সাজ-সরঞ্জাম; তাদের ভয় কর।' তখন তাদের বিশ্বাস আরও দৃঢ়তর হয়ে যায় এবং তারা বলে আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট; কতই না চমৎকার কামিয়াবীদানকারী! অতঃপর ফিরে এলো মুসলমানরা আল্লাহর অনুগ্রহ নিয়ে, তাদের কিছুই অনিষ্ট হলো না। তারপর তারা আল্লাহর ইচ্ছার অনুগত হলো। বস্তুত আল্লাহর অনুগ্রহ অতি বিরাট। [সূরা আলে ইমরান: ১৭৩, ১৭৪]
সাহাবায়ে কেরام রাসূল ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলেন, 'আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ কি আমাদের নিকটেই রয়েছেন, আমরা তাকে চুপিসারে ডাকবো! নাকি তিনি আমাদের অনেক দূরে, আমরা তাকে সজোরে ডাকবো!'
সাহাবায়ে কেরামের উত্তরে আল্লাহ ﷺ বলেন-
আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে- বস্তুতঃ আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে। [সূরা বাকারা : ১৮৬]
দোয়া কবুল হওয়ার জন্য আল্লাহ ﷻ বান্দার উপর দুটি বিষয় অপরিহার্য করেছেন।
এক. আল্লাহ ও তার রাসূলের ডাকে সর্বাবস্থায় সাড়া দেয়া। যে আল্লাহ ও তার রাসূলের ডাকে সাড়া দিবে না, আল্লাহও তার ডাকে কখনও সাড়া দিবেন না। বস্তুতঃ বান্দাই দোয়া কবুল হওয়ার পথ রুদ্ধ করেছে।
দুই. বান্দা সৎকর্মপরায়ণ হওয়া।
দোয়া কখনও কখনও বিলম্বে কবুল হয়। দোয়া কবুলে বিলম্বে হলে নিরাশ হওয়া উচিৎ নয়। দোয়া একটি এবাদত। আল্লাহ ﷺ-র নেয়ামত। দোয়া যখন বিলম্বে কবুল হয়, বান্দা তখন অব্যাহত দোয়া করে আল্লাহপ্রদত্ত নেয়ামতেই ডুবে থাকে। আল্লাহ ﷺ-র এবাদতে মগ্ন থাকে।
জনৈক বুযুর্গ বলেন, 'আল্লাহর কসম! আমি চাই আমার দোয়া বিলম্বে কবুল হোক। দোয়া যত বিলম্বে কবুল হবে, আমি ততই দোয়া করতে থাকবো এবং আল্লাহকে ডাকার অমৃত অনুভব করতে থাকবো!'
মুসা ﷺ আল্লাহ ﷻ-র কাছে দোয়া করেছিলেন-
হে আমার পরোয়ারদিগার! তুমি ফেরাউন এবং তার সর্দারদের পার্থিব জীবনের আড়ম্বর দান করেছ। সম্পদ দান করেছ। হে আমার পরোয়ারদিগার! এ জন্যই যে তারা তোমার পথ থেকে বিপথগামী করবে। হে আমার পরোয়ারদিগার! তাদের ধন-সম্পদ ধ্বংস করে দাও। তাদের অন্তরগুলো কঠোর করে দাও। যেন তারা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমান না আনে, যতক্ষণ না বেদনাদায়ক আযাব প্রত্যক্ষ করে নেয়। [সূরা ইউনুস: ৮৮]
হারুন তখন মুসার সাথে ছিলেন। তিনি মুসার দোয়ার সাথে সাথে বলছিলেন- আমীন। আমীন। তখন আল্লাহ বললেন-
তোমাদের দোয়া কবুল হয়েছে। [সূরা ইউনুস: ৮৯]
তাদের এই দোয়া কবুল হতে চল্লিশ বছর বিলম্ব হয়েছিল। এতদিন তার কখনও নিরাশ হননি। নিঃস্পৃহ হননি।
ইয়াকুব -ও ইউসুফ -র জন্য চল্লিশ বছর কেঁদেছিলেন।
ইমাম আহমাদ কিতাবুয যুহদ-এ বর্ণনা করেন, মুসা আলাইহিস সালাম যখন মাদয়ানে প্রবেশ করেন, পাথর সড়িয়ে পানি পান করেন, তখন একটি ছায়ায় বসে তিনি আল্লাহর কাছে কেঁদেছিলেন- 'হে রব! আমি ফকির। গরিব। অসুস্থ। উপবাসী।'
আল্লাহ তখন অহি নাযিল করলেন, 'মুসা! যাকে আমি খাওয়াই না, সে উপবাসী। যাকে আমি সাহায্য করি না, সে গরিব। যাকে আমি সাবলম্বী করি না, সে ফকির। যাকে আমি চিকিৎসা দেই না, সে অসুস্থ।'
আমাদের জীবন পথের অন্যতম পাথেয় দোয়া। রাসূল ইরশাদ করেন, 'দোয়া একটি স্বতন্ত্র এবাদত।' দোয়া মানুষের ঈমানের পরিচয়। যে ব্যক্তি পাঁচ বেলা সালাতে দোয়া করে, ফজরের পর দোয়া করে, শেষ রাতে দোয়া করে, সালাতের আগে-পরে, জুমার দিনে দোয়া করে, সে ঈমানদার ব্যক্তি। তার ঈমানের পূর্ণতা আছে।
আর যে ব্যক্তি উচাটন, পাপিষ্ঠ, ভুলে হয়ত কখনও আল্লাহ -কে ডাকে, তবে সে তার দোয়া পরিমাণই ঈমানদার। যতটুকু সে দোয়া করে, ততটুকুই তার ঈমানের শক্তি। আল্লাহ বলেন-
তোমরা স্বীয় প্রতিপালককের ডাক কাকুতি-মিনতি করে এবং সংগোপনে। তিনি সীমা অতিক্রমকারীদের পছন্দ করেন না। [সূরা আরাফ : ৫৫]
আর স্মরণ করতে থাক স্বীয় পালনকর্তাকে আপন মনে, ক্রন্দনরত ও ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় এবং এমন সুরে, যা চীৎকার করে বলা অপেক্ষা কম, সকালে ও সন্ধ্যায়। আর বে-খবর থেকো না। [সূরা আরাফ: ২০৫]
আল্লাহ -এর যিকির ভীত হয়ে করা উত্তম। দোয়া সংগোপনে করা উত্তম।
দোয়া সংগোপনে করার রহস্য হল- এক. মন যেন নিবিষ্ট থাকে। বিক্ষিপ্ত না হয়।
দুই. সংগোপনে দোয়া করলে তা অত্যধিক ইখলাসপূর্ণ হয়। রিয়া-সুময়া; লৌকিকতা ও প্রচারপ্রিয়তার আশঙ্কা কম থাকে।
তিন. হিংসুকের দৃষ্টি থেকে দূরে থাকা যায়। কারণ, হিংসুক দোয়া থেকে বিমুখ করার জন্য ষড়যন্ত্র করতে পারে।
আবু মুসা আশয়ারি বলেন, খায়বারের যুদ্ধসফরে আমরা একটি উপত্যকা পারি দিচ্ছিলাম। রাসূল আমাদের সাথে ছিলেন। লোকেরা উঁচু আওয়াযে তাকবির দিচ্ছিল- আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু। রাসূল বললেন, 'তোমরা নিজেদের প্রতি সদয় হও। তোমরা এমন কোন সত্তাকে ডাকছ না, যিনি বধির বা অনুপস্থিত। তোমরা ডাকছ সেই সত্তাকে, যিনি শ্রবণকারী। অতি নিকটে অবস্থানকরী। যিনি তোমাদের সাথেই রয়েছেন।' আমি মনে মনে লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ পাঠ করছিলাম। রাসূল আমাকে বললেন, 'আবু মুসা! আমি তোমাকে জান্নাতের একটি খাযানার কথা বলবো!'
আমি বললাম, 'হ্যাঁ রাসূল, বলুন।'
রাসূল বললেন, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। [বুখারি: ৪২০৫]
আল্লাহ বলেন-
আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে- বস্তুতঃ আমি রয়েছি সন্নিকটে। [সূরা বাকারা: ১৮৬]
আল্লাহ আমাদের নিকটে রয়েছেন। এটি জ্ঞানগত। আল্লাহ মূলত আরশে আপন শান অনুযায়ী অবস্থান করছেন। আল্লাহ বলেন-
আপনি কি ভেবে দেখেননি, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে, আল্লাহ তা জানেন। তিন ব্যক্তির এমন কোন পরামর্শ হয় না, যাতে তিনি চতুর্থ না থাকেন। এবং পাঁচ জনেরও হয় না, যাতে তিনি ষষ্ঠ না থাকেন। তারা এতদপেক্ষা কম হোক বা বেশি হোক, তারা যেখানেই থাকুক না কেন, তিনি তাদের সাথে আছেন। তারা যা করে, তিনি কেয়ামতের দিন তা তাদের জানিয়ে দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত। [সূরা মুজাদালা : ০৭]
আল্লাহ দুজনের সাথে তৃতীয়জন থাকেন জ্ঞানগতভাবে। তিনি মূলত আরশে আপন শান অনুযায়ী আছেন। দোয়ারত ব্যক্তির দোয়া শুনছেন। পিঁপড়ার কৃশকায়ের অভ্যন্তরে মগযও দেকছেন। পিঁপড়ার পায়ের ছাপ দেখছেন। হাঁটার আওয়ায শুনছেন। তিমিড় কালো রাত্রিতে কালো কোন যমিনে, পৃথিবীর তলদেশে, সবখানেই তিনি পিঁপড়াকে দেখছেন। আল্লাহ বলেন-
তার কাছেই অদৃশ্য জগতের চাবি রয়েছে। এগুলো তিনি ব্যতীত কেউ জানে না। স্থলে ও জলে যা আছে, তিনিই জানেন। কোন পাতা ঝরে না; কিন্তু তিনি তা জানেন। কোন শস্যকণা মৃত্তিকার অন্ধকার অংশে পতীত হয় না এবং কোন আর্দ্র ও শুষ্ক দ্রব্য পতীত হয় না; কিন্তু তা সব প্রকাশ্য গ্রন্থে রয়েছে। [সূরা আনয়াম : ৫৯]
আল্লাহ দোয়াকারীর প্রশংসা করেছেন। দোয়ার জন্য নবিদেরও বিশেষ প্রশংসা করেছেন-
তারা সৎকর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ত, তারা আশা ও ভীতি সহকারে আমাকে ডাকত এবং তারা ছিল আমার কাছে বিনীত। [সূরা আম্বিয়া: ৯০]