📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 নবিদের দোয়া

📄 নবিদের দোয়া


নবিগণ আল্লাহ -এর কাছে দোয়া করতেন। নূহ আল্লাহ -এর কাছে বলেছিলেন-
হে আমার পালনকর্তা, আপনি আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যারা মুমিন হয়ে আমার গৃহে প্রবেশ করে তাদের এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের ক্ষমা করুন এবং জালেমদের কেবল ধ্বংসই বৃদ্ধি করুন। [সূরা নূহ : ২৮]
ইবরাহিম -এর অসংখ্য দোয়া কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। তিনি আমাদের জন্য দোয়া করেছেন। আমাদের এই ভূখণ্ড, সবুজ ভূখণ্ড, ফলদার ভূখণ্ড, মাঠ-ঘাট, দালান-অট্টালিকার জন্য তিনি দোয়া করেছেন।
বস্তুত আমাদের কী ছিল?
আমাদের এই ভূখণ্ড ছিল নির্জন। তৃণহীন। শুষ্ক।
ছিল না এই গাছপালা, বাগানবাড়ি, সবুজ শ্যামলিমা। ছিল না নির্ঝর পানির শীতল ফোয়ারা।
ইবরাহিম আমাদের জন্য দোয়া করেছেন। ফরিয়াদ করে বলেছেন-
হে আমাদের পালনকর্তা, আমি নিজের এক সন্তানকে তোমার পবিত্র ঘরের কাছে চাষাবাদহীন উপত্যকায় আবাদ করেছি। হে আমাদের পালনকর্তা, যাতে তারা সালাত কায়েম রাখে। অতঃপর আপনি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করুন এবং তাদের ফলাদি দ্বারা রুযি দান করুন। সম্ভবত তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। [সূরা ইবরাহিম : ৩৭]
হে আমার পালনকর্তা, আমাকে সালাত কায়েমকারী করুন এবং আমার সন্তানদের মধ্য থেকেও, হে আমার পালনকর্তা! এবং কবুল করুন আমাদের দোয়া। [সূরা ইবরাহিম : ৪০]
মুসা অত্যন্ত সাহসী এবং বীরদর্পী একজন নবি ছিলেন। ইহুদির মত জাতির জন্য তিনিই উপযুক্ত ছিলেন। ইহুদিরা ঠাণ্ডা পানিতেও তার আকৃতি কল্পনা করত। সেই তিনি যখন তাদের সামনে থেকে একটু সড়লেন, তারা গো-বৎসের পূজা শুরু করে দিল।
আল্লাহ তাকে ফেরাউনের কাছে পাঠালেন। তিনি আল্লাহ -র কাছে দোয়া করলেন-
হে আল্লাহ, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন। আমার কাজ সহজ করে দিন। আমার জিহ্বা থেকে জড়তা দূর করে দিন। তারা আমার কথা বুঝুক। [ত্বাহা: ২৫-২৮]
আল্লাহ বললেন-
মুসা, তোমাকে তোমার চাওয়া দেয়া হয়েছে। [সূরা ত্বাহা : ৩৬]
ইউনুস -র প্রসিদ্ধ ঘটনা রয়েছে। স্বজাতির সাথে রাগ হয়ে তাদের ছেড়ে চলে গেলেন। নৌকায় আরোহণ করার পর তাকে মাছে খেয়ে ফেলল। তিনি তখন চিত্তাকর্ষক কিছু বাক্য আল্লাহ -র কাছে ফরিয়াদের ভাষায় তুলে ধরলেন- লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনায যলিমীন।
তুমি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। তুমি নির্দোষ, আমি গোনাহগার। [সূরা আম্বিয়া: ৮৭]
তার কথাগুলো আল্লাহ -র কাছে পৌঁছল। আল্লাহ -র কাছে সকল ভালো কথা এমনই সরাসরি পৌঁছে থাকে। আল্লাহ বলেন-
তারই দিকে আরোহণ করে সৎবাক্য এবং সৎকর্ম তাকে তুলে নেয়। [সূরা ফাতির : ১০]
বর্ণিত হয়েছে, ইউনুস যখন এই কথাগুলো বললেন, ফেরেশতারা তা শুনল। ফেরেশতারা আল্লাহ -র কাছে কেঁদে কেঁদে বলল, 'তোমার এক চেনা বান্দার চেনা কিছু কথা! জানি না তিনি কোথায় আছেন!'
আল্লাহ ফেরেশতাদের বললেন, আমি জানি সে কোথায় আছে।
যদি তিনি আল্লাহ -র তাসবিহ পাঠ না করতেন-
তবে তাকে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত মাছের পেটেই থাকতে হত। [সূরা সাফফাত : ১৪৩, ১৪৪]
আল্লাহ তার এই উভয় দোয়ায় তাকে মুক্তি দিলেন।
প্রিয় নবি। তিনিও আল্লাহ-র কাছে দোয়া করেছেন। কিন্তু তার দোয়ায় বিশেষ একটি আকর্ষণ আছে। বিশেষ একটি স্বাদ ও অনুভূতি আছে। তার দোয়াগুলো সবচে আশ্চর্যময় দোয়া। অন্তরপুচ্ছকে নিমিষেই আলোড়িত করে। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত- তিনি একবার তার খালা মাইমুনা রাযি. ঘরে রাতযাপন করেছিলেন। রাসূল শেষ রাতে সালাতে দাঁড়িয়ে দোয়া করছেন-
আল্লাহ, তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি আসমান যমিন এবং এতদুভয়ের সবকিছুর প্রতিপালক। তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি আসমান যমিন এবং এতদুভয়ের সবকিছুর তত্ত্বাবধায়ক। তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি আসমান যমিন এবং এতদুভয়ের সবকিছুর নূর। তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি সত্য। তোমার ওয়াদা সত্য। জান্নাত সত্য। দোযখ সত্য। সকল নবি সত্য। মোহাম্মদ সত্য।
আল্লাহ, তোমারই জন্য আমি সমর্পিত। তোমাতেই আমি বিশ্বাস রেখেছি। তোমারই উপর ভরসা করেছি। তোমারই কাছে প্রত্যাবর্তন করেছি। তোমারই রাহে লড়াই করেছি। তোমরাই দরবারে বিচার চেয়েছি। তুমি আমাকে ক্ষমা কর। আমার পূর্বাপর ক্ষমা কর। আমার প্রকাশ্য-গোপনীয় সবকিছু ক্ষমা কর। তুমি ছাড়া গোনাহ মাফের কেউ নেই। [বুখারি : ১১২০]
আয়েশা থেকে বর্ণিত, রাসূল শেষ রাতে সালাতে এই বলে দোয়া করতেন- হে আল্লাহ, জিবরাঈল মিকাঈল ও ইসরাফীলের রব, আসমান ও যমিনের স্রষ্টা, প্রকাশ্য ও গোপন বিষয়সমূহের জ্ঞানের অধিকারী, তোমর বান্দারা যেসব বিষয়ে মতানৈক্য পোষণ করে তুমিই সেগুলোর ফয়সালা করবে। সত্য ও ন্যায়ের যেসব বিষয়ে মতানৈক্য পোষণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে তুমি আমাকে পথ দেখাও। তুমিই তো যাকে ইচ্ছা সরল সহজ পথ দেখিয়ে থাকো। [প্রাগুক্ত]
দুটি লোক রাসূলকে হত্যার উদ্দেশে আসল। রাসূল দোয়া করলেন, 'আল্লাহ, তুমি যেভাবে ইচ্ছা, আমার জন্য যথেষ্ঠ।'
তাদের একজন বৃদ্ধা সালুলিয়ার ঘরে উষ্ট্রপ্লেগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেছিল। অপরজনকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসমানী একখণ্ড আগুন ভষ্ম করে দিয়েছিল।

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 সৎকর্মপরায়ণদের দোয়া

📄 সৎকর্মপরায়ণদের দোয়া


আল্লাহ বলেন-
মনে রেখো, যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের না কোন ভয়-ভীতি আছে, না তারা চিন্তান্বিত হবে; যারা ঈমান এনেছে এবং ভয় করতে রয়েছে। [সূরা ইউনুস : ৬২, ৬৩]
আল্লাহ -র বন্ধুগণ মসজিদমুখী হন। সামনের কাতারে সালাত আদায় করেন। কোরআন তাদের নিত্যসঙ্গী। মুখে থাকে সদা আল্লাহ -র পবিত্রতা। তারা সওম রাখেন। রাত জেগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। এক আল্লাহ -র যিকির করেন। পর্দায় বসবাস করেন।
সাহাবায়ে কেরাম একটি যুদ্ধে রওয়ানা হলেন। তাদের দলনেতা ছিলেন আলা হাযরামি। চলতে চলতে বাহিনী পথ ভুলে গেল।
তাদের পানি শেষ হয়ে গেল। আশপাশেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। বাহিনীর লোকেরা বলল, 'আমাদের দলনেতা! আল্লাহর কাছে বলুন।'
আলা ইবনে হাযরামি আল্লাহর দিকে ঝুঁকলেন। আল্লাহ -কে ডাকলেন কায়মনোবাক্যে। ছোট্ট একটু দুয়া করলেন- 'ইয়া হাকীমু, ইয়া আযীমু, ইয়া আলীমু, ইয়া হাকীমু, ইয়া আলীমু, ইয়া আযীমু, আগিছনা। আমাদের সাহায্য করুন।'
বর্ণনাকারী বলেন, আল্লাহর কসম! তার দোয়া শেষ হতেই একখণ্ড মেঘ ভেসে এল। মাথার উপর আকাশ ছেয়ে নিল। মুষলধারে বৃষ্টি ঝরাল। সাহাবায়ে কেরام তৃপ্তিভরে পানি পান করলেন। অজু করলেন। তারপর মেঘখণ্ডটি উড়ে গেল!
সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ তাদের দোয়া কত দ্রুত কবুল করেন!
বারা ইবনে মালেক আল্লাহ -র কাছে দোয়া করলেই তা কবুল হত।
একবার তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হলেন। বাহিনীর লোকেরা তাকে বলল, 'আল্লাহ -র দোহাই দিয়ে আপনাকে বলছি! আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন আল্লাহ আমাদের সাহায্য করেন।'
বারা ইবনে মালেক বললেন, 'আমাকে একটু সময় দাও।'
এ কথা বলে তিনি গোসল করলেন। কাফনের কাপড় পরে তলোয়ার হাতে নিয়ে আল্লাহ -র কাছে দোয়া করলেন, 'আল্লাহ, তোমার কসম দিচ্ছি! তুমি আমাকে প্রথম শহীদ বানাও। মুসলমানদের সাহায্য কর।'
যুদ্ধক্ষেত্রে বারা ইবনে মালেক প্রথম শহীদ হলেন। রাহিমাহুল্লাহ। মুসলমানরাও আল্লাহ -র সাহায্যে বিজয়ী হল।
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস । রাসূল তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন, যেন তাঁর দোয়া কবুল হয়। এরপর থেকে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস কোন দোয়া করলেই তা কবুল হত!
তিনি যখন ইরাকে দায়িত্ব পালন করছেন, তখন এক লোক তাকে পরীক্ষা করতে এল। বলল, সে সুন্দর করে সালাত পড়তে পারে না। সব বিধান পালন করতে পারে না।'
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস বদদোয়া করলেন, 'আল্লাহ, তার বয়স দীর্ঘ কর। তার দারিদ্রতা দীর্ঘ কর। তাকে ফেতনার সম্মুখীন কর।'
কয়েক বছর পর সেই লোকটি কুফার রাস্তায় রাস্তায় মানুষের কাছে ভিক্ষা করতে শুরু করল। মানুষের কাছে গিয়ে বলতে লাগল, 'আমি ফেতনায় নিপতীত একজন লোক। সাদের বদদোয়া লেগেছে আমার উপর!'

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 দোয়ার লাভালাভ

📄 দোয়ার লাভালাভ


এক.
দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর তাওহিদের ঘোষণা হয়। যার তাওহিদ যতখানি গভীরে প্রেথিত, সে তত বেশি দোয়া করে। দোয়া আল্লাহ -র সাথে সম্পর্কের প্রমাণ।
দুই.
দোয়া আল্লাহ -র দাসত্বের সত্যায়ন। দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহ -র কাছাকাছি পৌঁছা যায়। যে সংগোপনে আল্লাহ -কে ডাকে, সে যেন আল্লাহ -র দাসত্বে অটল রইল।
তিন.
দোয়া ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। যে বান্দা বেশি দোয়া করে, সে আল্লাহর বেশি নৈকট্য অর্জন করে।
কবি বলেন,
আমার চাওয়া যদি ফিরিয়েই বা দিবে,
তবে কেন শিখালে আমায় চাওয়ার ঢং!
আল্লাহ-কে যে বেশি ভালোবাসে, সে আল্লাহ-র কাছে বেশি দোয়া করে। সেজদাবনত হয়ে দোয়া করে। সালাত শেষে দোয়া করে। রাতের শেষে দোয়া করে। দুই আযানের মাঝে দোয়া করে।
চার.
আল্লাহ-র নৈকট্য অর্জন হয়। বান্দা যখন বেশি বেশি দোয়া করে, আল্লাহ-র নৈকট্য অনুধাবন করে। এই অনুধাবন হল নৈকট্যে সর্বোচ্চ স্তর। এহসানের স্তর। এহসান হল-
তুমি এভাবে এবাদত কর, যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ। তুমি আল্লাহকে না দেখলেও আল্লাহ তোমাকে দেখছেন। [বুখারি: ৫০]
পাঁচ.
আল্লাহ-র সাথে সম্পর্ক দৃঢ়তর হয়। যে বেশি দোয়া করে, তার আস্থা তত অবিচল হয়। ভরসা বৃদ্ধি পায়। যে কম দোয়া করে, আল্লাহ-র প্রতি তার আস্থা কমে যায়। নিরাশা তাকে ঘিরে ধরে।
আসুন, বেশি বেশি দোয়া করি। ভিক্ষার হাত আল্লাহ-র কাছে উত্তোলন করি। সাহায্য-সহযোগিতা আল্লাহর কাছেই চাই।
মিসওয়াক করে, পবিত্র হয়ে দোয়া করি। ফযিলতপূর্ণ সময়ে, ফযিলতপূর্ণ স্থানে; বাইতুল্লায়, মসজিদে, যিকিরের মজলিসে কেবলামুখী হয়ে দোয়া করি। আসমাউল হুসনার দোহায় দিয়ে দোয়া করি। দোয়ায় রাসূলের উপর দরূদ পাঠ করি।

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 আল্লাহকে ডাকো; গোপনে, মিনতিভরে

📄 আল্লাহকে ডাকো; গোপনে, মিনতিভরে


সকল প্রশংস মহান আল্লাহর জন্য। দুরূদ ও সালাম সর্বশ্রেষ্ঠ নবি ও রাসূল মোহাম্মদের জন্য; সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
আল্লাহ ﷺ বলেন-
তোমরা স্বীয় প্রতিপালককে ডাক কাকুতি-মিনতি করে এবং সংগোপনে। তিনি সীমা অতিক্রমকারীদের পছন্দ করেন না। [সূরা আরাফ : ৫৫]
আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে- বস্তুতঃ আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে। [সূরা বাকারা : ১৮৬]
রাসূল ﷺ বলেন-
দোয়া একটি স্বতন্ত্র এবাদত। [প্রাগুক্ত]
দোয়া সকল এবাদতের সার-মজ্জা। [প্রাগুক্ত]
এ অধ্যায়ে দোয়া প্রসঙ্গে কিছু শিরোনাম আলোচনা হবে-
১. দোয়ার প্রতি অনুপ্রেরণা।
২. কোরআনে বর্ণিত নবিদের বিভিন্ন দোয়া।
৩. হাদিসে বর্ণিত সবচে তাৎপর্যময় দোয়া।
৪. রাসূল ﷺ থেকে সহিহভাবে বর্ণিত দোয়াসমূহ।
৫. সাইয়িদুল ইসতিগফার। শ্রেষ্ঠ ইসতিগফারের বিস্তারিত বিবরণ।
৬. চিন্তা-পেরেশানি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থেকে মুক্তিপ্রার্থনা।
৭. আল্লাহ -র কাছে দোয়া কবুল হওয়ার কিছু বিরল দৃষ্টান্ত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00