📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 দোয়া করার শ্রেষ্ঠ সময়

📄 দোয়া করার শ্রেষ্ঠ সময়


দোয়া করার শ্রেষ্ঠ সময় রাতের শেষে। সালাতের শেষে।
রাসূল -কে জিজ্ঞেস করা হল, 'কোন সময় দোয়া বেশি কবুল হয়?'
রাসূল বললেন- 'রাতের শেষে। সালাতের শেষে।' [তিরমিযি : ৩৪৯৯]
রাসূল মুয়ায -কে বলেন, প্রত্যেক সালাতের শেষে এই দোয়া পড়তে ভুলো না-
اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ.
আল্লাহ, তোমায় স্মরণ করতে সাহায্য কর। তোমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনে, উত্তম এবাদতে সাহায্য কর। [আহমদ: ২১৬১৪]
দোয়া করার আরও একটি শ্রেষ্ঠ সময় সিজদা।
রাসূল ﷺ বলেন- আল্লাহর সবচে কাছাকাছি হয় সেজদাকারী। সুতরাং তখন বেশি বেশি দোয়া কর। [মুসলিম : ৪৮২]
অপর এক হাদিসে উল্লেখ হয়েছে- সেজদারত অবস্থায় অধিক দোয়া পড়ার চেষ্টা কর। কারণ তা তোমাদের দোয়া কবুল হওয়ার উপযোগী। [মুসলিম : ৪৭৯]
সেজদায় মাথা রেখে সুবাহানা রাব্বিয়াল আলা যখন পাঠ করা হবে, তখনই আল্লাহর কাছে সহজ কোন দোয়া করা বাঞ্ছনীয়।
আন্দালুসি তার ছেলেকে উপদেশ দিয়ে বলেন- যখন সেজদা কর আল্লাহকে ডাক, যেমন ডেকেছেন ইউনুস।
দুনিয়াতে বেশি বেশি আল্লাহর যিকির নিজের অভ্যাস বানাও। আসমানে তুমি স্মরিত হবে।
জনৈক ব্যক্তি বলেন, আমি এক বুযুর্গের কাছে বসলাম। তিনি বলছেন, 'আগৃছাহ... আগৃছাহ... আগৃছাহ...' আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'আগৃছাহ... আগৃছাহ... অর্থ কী?' তিনি বললেন, 'আসতাগীছু বিল্লাহ। আল্লাহ ﷺ-র কাছে ফরিয়াদ করছি।
আল্লাহ ﷺ বলেছেন- তোমরা যখন ফরিয়াদ করতে শুরু করলে স্বীয় পরোয়ারদিগারের কাছে, তখন তিনি তোমাদের ফরিয়াদের মঞ্জুরী দান করলেন। [আনফাল: ০৯]
হাসান বসরি বলেন, মানুষ আজ দুনিয়াতে নিমজ্জিত। হাবুডুবু খাচ্ছে। এমন কোন পথ দরকার, যা দিয়ে মানুষ হাবুডুবু থেকে পরিত্রাণ পাবে।
কিছু যিকির, কিছু সালাত, কিছু দোয়া, কিছু ইসতিগফার আমাদের পরিত্রাণ পাওয়ার একমাত্র পথ।

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 আমাকে ডাকো; সাড়া দিবো

📄 আমাকে ডাকো; সাড়া দিবো


বি শ্বপ্রতিপালক মহান আল্লাহ -এর জন্য সকল প্রশংসা। সর্বশ্রেষ্ঠ নবির জন্য, তার পরিবার-সহচরদের জন্য সকল দুরূদ ও সালাম। মোহাম্মদ; সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লাম।
মানুষের জীবনে নানা ধরনের অনুষঙ্গ আছে। আছে সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না। মানবজীবনের প্রতিটি অনুষঙ্গেই তার চলার সম্বল হল আল্লাহ -এর কাছে দোয়া-কান্নাকাটি। কাকুতি-মিনতি।
দোয়া একটি এবাদত। সকল এবাদতের সার-মজ্জা। এ অধ্যায়ে দোয়া প্রসঙ্গে আলোচনা হবে-
১. দোয়ার ফযিলত।
২. দোয়ার আদব।
৩. নবিদের দোয়া।
৪. সৎকর্মপরায়ণদের দোয়া।
৫. দোয়ার লাভালাভ।
দোয়া আল্লাহ -এর সাথে বান্দার সুসম্পর্কের রজ্জু। আল্লাহ -এর কাছে সৎ- হৃদয়ে দোয়া করতে পারে সেই, আল্লাহ -এর সাথে যার সতত আচরণ রয়েছে। অধিকাংশ মানুষ বিপদে না পড়লে আল্লাহ -কে ডাকে না। গভীর কোন সঙ্কটের মুখোমুখি না হলে দোয়া করে না।
তারা যখন জলযানে আরোহণ করে তখন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে। [সূরা আনকাবুত : ৬৫]
মানুষ যখন কোন সন্ধিক্ষণের সম্মুখীন হয়, তখন আল্লাহ ছাড়া তার কেউ নেই। ভয়াবহ বিপদে জীবন-পরিধি সঙ্কীর্ণ হয়ে এলে আল্লাহ ছাড়া আর কোনও সাহায্যকারী নেই। পথনির্দেশক নেই।
ওগো আল্লাহ আমার আশার আধার, লক্ষ-কোটি কৃপা তোমার, আমায় রক্ষা করেছ।
অত্যাচারির নিনাদ ভারি, ধ্বংস হবো সমূল ছাড়ি; তুমি রক্ষা করেছ।
তুমি আমায় রক্ষা করে জালিমমনে ভয়ের ভয়াল আঁধার দিয়েছ।
সুলাইমান দলবল নিয়ে বের হলেন। পথিমধ্যে একটি পিঁপড়া তাকে দেখে পিছু হটল। আল্লাহর কাছে হাত তুলল- সুলাইমানের পায়ে যেন পিষ্ট না হয়।
পিঁপড়াকে কে বলল- তাকে সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ! পিঁপড়া কীভাবে বুঝল- জীবন-মৃত্যুর মালিক আল্লাহ! কীভাবে বুঝল- সুখ-দুঃখ, সুস্থতা-নিরাপত্তার মালিক আল্লাহ!
পিঁপড়া আল্লাহর কাছে কত চমৎকার কথা বলল- 'ও চিরঞ্জীব আল্লাহ! সবকিছুর ধারক! তোমার রহমতে আমাদের সাহায্য কর।'
সুলাইমান পিঁপড়ার দোয়া শুনে কাঁদলেন। সহচরদের বললেন, 'চল, ফিরে যাও।'
ঈসা একটি গাভীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। গাভীটি ছিল গর্ভবতী। গাভীর পেটে বাছুরের আভাস বাইরে প্রকাশ পেয়েছে। গাভীটি আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছে। আল্লাহ তার যবান খুলে দিয়েছেন। গাভী বলছে, 'ও চিরঞ্জীব আল্লাহ! সবকিছুর ধারক! আমার জন্য সহজ কর।'
গাভীটি ঈসা -কে বলছে, 'ঈসা রুহুল্লাহ! আল্লাহর কাছে আমার জন্য দোয়া কর। আল্লাহ যেন আমার জন্য সহজ করে দেন।'
ঈসা কান্না করলেন। আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। আল্লাহ গাভীর গর্ভ সহজ করে দিলেন।
মহান এক বুযুর্গ বলেন, আমি লোহিত সাগরে জাহাজে সফর করছিলাম। এডেন নগরীর কাছাকাছি পৌঁছলে মাগরিবের সময় হয়ে যায়। জাহাজ তখন সমুদ্রের মাঝখানে। আমি দাঁড়িয়ে আযান দিলাম। সেখানে সামুদ্রিক বড় একটি সাপ ছিল। আমি যখন আল্লাহু আকবার বললাম, সাপটি লাফিয়ে উঠল। সাপের অর্ধেক পানির উপর প্রকাশ পেল। যখন চুপ হলাম, সাপটি পানিতে ডুবে গেল। এভাবে আযানের একেকটি বাক্য বললাম, সাপটিও একেকবার অর্ধেক পানির উপর উঠে লাফ দিল। আমি একেকবার চুপ হলাম, সাপটিও একেকবার পানিতে ডুবে গেল।

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 দোয়ার আদব

📄 দোয়ার আদব


এক. আল্লাহ -এর পবিত্র নামসমূহের উসিলায় দোয়া করা। আসমাউল হুসনা উল্লেখ করে দোয়া করা।
আল্লাহ -এর কিছু নাম রয়েছে। আল্লাহ নিজেই পছন্দ করেছেন এসব নাম। হাকীম, কারীম, আলীম, হালীম, হাইউন, কাইয়্যুম, যুল জালালি ওয়ালইকরাম ইত্যাদি।
আল্লাহ বলেন- আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সব উত্তম নাম। কাজেই সে নাম ধরেই তাকে ডাক। আর তাদের বর্জন কর, যারা তার নামের ব্যাপারে বাঁকা পথে চলে। [সূরা আরাফ : ১৮০]
আল্লাহ -এর নামগুলো সুনির্দিষ্ট। আল্লাহ -এর জন্য নতুন কোন নাম উদ্ভাবন করা যাবে না। নির্ধারিত নামগুলোর সাথে কোন বৃদ্ধিও করা যাবে না।
রাসূল আল্লাহ -এর নামের উসিলায় দোয়া করতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেছেন- আমি তোমার নিকট প্রার্থনা করি তোমার সে সকল নামের উসিলায়, যা দ্বারা তুমি নিজেকে অভিহিত করেছ। অথবা তুমি তোমার কিতাবে নাযিল করেছ। অথবা তুমি তোমার বান্দাদের উপর এলহাম করেছ। অথবা তুমি গায়েবের পর্দায় তা তোমার নিকট গোপন রেখেছ। তুমি কোরআনকে আমার অন্তরের বসন্ত বানাও। কোরআনের উসিলায় চিন্তা-পেরেশানি দূর কর। [আহমাদ : ৩৭০৪]
রাসূল ﷺ বলেন-
আল্লাহর নিরানব্বইটি নাম আছে। যে তা আয়ত্ত করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। [বুখারি : ২৭৩৬]
হাদিসে আয়ত্ত করার তিনটি উদ্দেশ্য হতে পারে- এক. যে তা মুখস্থ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। দুই. যে নামের আবদার অনুযায়ী আমল করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তিন. যে নামগুলোর অর্থ জানবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। উপরোক্ত তিনটি উদ্দেশ্যই সঠিক।
দুই.
দোয়ায় অনুনয় ও আকুতি-মিনতি করা। নিরাশ না হওয়া। এ কথা না বলা- আমি দোয়া করছি, আল্লাহ কবুল করছেন না। বরং অব্যাহত দোয়া করতে থাকা।
রাসূল ﷺ বলেন-
তোমাদের দোয়া আল্লাহ কবুল করবেন, যদি তোমরা এ কথা না বল- আমি দোয়া করছি, আল্লাহ কবুল করছেন না। [বুখারি : ৬৩৪০]
আল্লাহ -র কাছে প্রতিটি বিষয় পরিমিত। সময়ের ফ্রেমে নির্ধারিত। সুতরাং কারো চাহিদা অনুযায়ী সপ্তাহর মধ্যেই দোয়া কবুল হবে না। মুসা আল্লাহ -র কাছে দোয়া করেছিলেন-
হে আমার পরোয়ারদিগার! তুমি ফেরাউন এবং তার সর্দারদের পার্থিব জীবনের আড়ম্বর দান করেছ। সম্পদ দান করেছ। হে আমার পরোয়ারদিগার! এ জন্যই যে তারা তোমার পথ থেকে বিপথগামী করবে। হে আমার পরোয়ারদিগার! তাদের ধন-সম্পদ ধ্বংস করে দাও। তাদের অন্তরগুলো কঠোর করে দাও। যেন তারা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমান না আনে, যতক্ষণ না বেদনাদায়ক আযাব প্রত্যক্ষ করে নেয়। [সূরা ইউনুস : ৮৮]
বর্ণিত আছে, মুসা -র এই দোয়া চল্লিশ বছর পর কবুল হয়েছিল।
কবি বলেন-
আল্লাহর দানে যদিও বিলম্ব হয়, তাতে লুকায়িত থাকে কোন রহস্য।
আল্লাহ দান করেন চোখের পলকে, যখন দানের দৃষ্টি হয়।
কত কষ্ট লাঘব হয় নিরাশ হওয়ার পর, কত আশা হারায় নিরাশায় নিয়তের পর।
পবিত্র সেই ক্ষমাশীল সত্তা, ভুল করি আমরা সবসময়।
যতই আমরা ভুল করি, তিনি ক্ষমাশীল সবসময়।
অবাধ্যরে দান করেন তিনি, করেন না কভু বঞ্চিত! অবাধ্যরে দান করেন যিনি, তুলনাহীন তাঁর মহত্ত্ব!
চার. আশা-আকাঙ্ক্ষায় সীমা লঙ্ঘন না করা। শরিয়তবিরোধী কিছুর দোয়া না করা। উদাহরণত- হে আল্লাহ, তুমি আমায় নবি বানিয়ে দাও!
আবু বকরের চেয়ে উত্তম বানিয়ে দাও! অথচ নবিদের পর আবু বকর সবচে শ্রেষ্ঠ -এ কথা শরিয়তের সিদ্ধান্ত।
আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফফালের ছেলে দোয়া করছে- 'আল্লাহ! জান্নাতের ডান পাশে আমাকে একটি শ্বেত-শুভ্র ভবন দিও।'
আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল তার দোয়া শুনলেন। ছেলেকে ডেকে বললেন, আমি রাসূল -কে বলতে শুনেছি-
শেষ যমানায় এমন একটি জাতি বেরুবে, যারা দোয়ায় এবং পবিত্রতা অর্জনে সীমালঙ্ঘন করবে। [আহমাদ: ১৬২৫৪]
তুমি এমন দোয়া না করে জান্নাত পাওয়ার দোয়া কর। জাহান্নাম থেকে মুক্তির দোয়া কর।
ইবনুল জাওযি বর্ণনা করেন, জনৈক গ্রাম্য ব্যক্তি হজ্জ করতে এসে আরাফায় গমন করল। এরপর মুযদালিফায় রাত্রি যাপন করে প্রথম দিনেই জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ করল এবং সবার আগে খুব দ্রুত হারামে গিয়ে উপস্থিত হল। সেখানে গিয়ে কাবার পর্দা ধরে দোয়া শুরু করল- 'তোমার কাছে মানুষের ভীড় শুরু হওয়ার আগেই আমাকে মাফ কর!'
সুবহানাল্লাহ! কী দোয়া করল লোকটি! আল্লাহ -র কাছে মানুষের নানা অঞ্চলের ভিন্নতা নেই। মানুষের সীমাহীন চাওয়া পূরণে কোন সঙ্কীর্ণতা নেই। মানুষের অগুণতি কণ্ঠ, বৈশিষ্ট্য, প্রথা-প্রচলন, গোত্র নির্ধারণে আল্লাহ -র কোন ভ্রম নেই।
হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন,
হে আমার বান্দারা, তোমাদের আগের ও পরের মানুষ ও জ্বিন সকলে যদি এক ময়দানে সম্মিলিত হয়ে আমার কাছে চাইতে থাক এবং আমি তোমাদের প্রত্যেকের চাহিদা ও প্রার্থনা অনুযায়ী দিতে থাকি, তাতে আমার কাছে যে ধনভাণ্ডার রয়েছে তা ফুরিয়ে যাবে না। বরং এতে যে পরিমাণ সম্পদ কমবে, তার পরিমাণ হবে মহাসমুদ্রে একটি সুঁই ডুবিয়ে বের করে আনার অনুরূপ। [মুসলিম : ২৫৭৭]
পাঁচ.
শ্রেষ্ঠ সময়ে দোয়া করা।
দোয়া করার শ্রেষ্ঠ সময় রাতের শেষ প্রহর। কবি বলেন- 'নিশুতি!
এই যে প্রেমবাসরের গোপন কথা, অভেদ আলাপ; দীর্ঘ তোমার প্রহরগুলোয় এসব কী এমন বিশেষণ?' -বলো!
'যখন ভোর হয়ে এল, অবিরল ঝরবে কেবল রহমধারা, তখন অঞ্জলি ভরে নিবেদন করো পবিত্র প্রেমের অশ্রুমালা!'
নিশুতি বলে- 'এই তো জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি!'
রাসূল ইরশাদ করেন-
মহামহিম আল্লাহ প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন, 'কে আছে এমন যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দিবো। কে আছে এমন যে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে তা দিবো। কে আছে এমন যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করবো। [বুখারি : ১১৪৫]
আল্লাহ বলেন-
তারা রাতের সামান্য অংশই নিদ্রা যেত। রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করত। [সূরা যারিয়াত : ১৭, ১৮]
(তারা) শেষ রাতে ক্ষমা প্রার্থনাকারী। [সূরা আলে ইমরান : ১৭]
দোয়া করার আরেকটি শ্রেষ্ঠ সময় সিজদা।
হাদিসে উল্লেখ হয়েছে-
সেজদারত অবস্থায় অধিক দোয়া পড়ার চেষ্টা কর। কারণ তা তোমাদের দোয়া কবুল হওয়ার উপযোগী। [মুসলিম : ৪৭৯]
রাসূল বলেন- আল্লাহর সবচে কাছাকাছি হয় সেজদাকারী। সুতরাং তখন বেশি বেশি দোয়া কর। [মুসলিম : ৪৮২]
মুহাম্মদ ইবনে জাফর সাদিক কোথাও সেজদা করলে কান্না করতেন। তার কান্নায় উপস্থিত লোকেরাও কান্না করত। তিনি কেঁদে কেঁদে বলতেন, 'তোমার মিসকিন তোমার সামনে। তোমার ফকীর তোমার সামনে।' দোয়া করার আরেকটি শ্রেষ্ঠ সময় শুক্রবার আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত।
আবু হোরায়রা থেকে বর্ণিত, 'রাসূল জুমার দিন সম্পর্কে আলোচনা করেন এবং বলেন-
এ দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, যে কোন মুসলিম বান্দা যদি এ সময় সালাতে দাঁড়িয়ে আল্লাহর নিকট কিছু চায়, তা হলে তিনি তাকে অবশ্যই তা দান করে থাকেন এবং তিনি হাত দিয়ে ইশারা করে বুঝিয়ে দিলেন, সে সময়টি খুবই সংক্ষিপ্ত। [বুখারি : ৯৩৫]
এ সময়টি হল আসরের পর থেকে মাগরিবের মধ্যবর্তী সময়। দোয়া করার আরও একটি শ্রেষ্ঠ সময় আরাফার দিন। আরাফার দিনে আল্লাহ বান্দাদের দেখে ফেরেশতাদের বলেন-
দেখ ফেরেশতারা, আমার বান্দারা কেমন আলুথালু ধূলিমলিন হয়ে পূর্বাহ্নে হাজির হয়েছে। তোমরা সাক্ষী থাক, আমি তাদের মাফ করে দিলাম। [ইবনে খুজাইমা : ২৮২১]
ছয়. কৃত্রিম সুর-ছন্দ এবং কৃত্রিম ভনিতা পরিহার করা। দোয়া হবে অকৃত্রিম। হৃদয়োদদ্গত। খাঁজমুক্ত। দুর্বোধ্যতামুক্ত।
সাত. হাদিসে বর্ণিত সুসংক্ষিপ্ত সুসমৃদ্ধ বাক্য দ্বারা দোয়া করা। আয়েশা বলেন, রাসূল অত্যন্ত সমৃদ্ধ বাক্যদ্বারা দোয়া করতেন।
হাদিসে বর্ণিত কিছু সুসংক্ষিপ্ত-সুসমৃদ্ধ দোয়া- رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ. হে পরোয়ারদিগার! আমাদের দুনিয়াতেও কল্যাণ দান কর এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান কর। আমাদের দোযখের আযাব থেকে রক্ষা কর। [বুখারি : ৪৫২২]
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْئَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ. হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষমা ও নিরাপত্তা কামনা করি। [আহমাদ: ৪৭৭০]
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَلُكَ الْهُدَى وَالتَّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى. হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে সঠিক পথনির্দেশ আল্লাহভীরুতা চারিত্রিক নির্মলতা ও সমৃদ্ধি কামনা করছি। [মুসলিম: ২৭২১]
اللَّهُمَّ اهْدِنِي وَسَدِّدْنِي. হে আল্লাহ! আমাকে হোদায়াত কর এবং সোজা রাখ। [মুসলিম: ২৭২৫]
اللَّهُمَّ أَلْهِمْنِي رُشْدِي وَأَعِذْنِي مِنْ شَرِّ نَفْسِي. হে আল্লাহ! আমার অন্তরে সৎপথের সন্ধান দাও এবং আমাকে আমার মনের অপকারিতা হতে পানাহ দাও। [তিরমিযি: ৩৪৮৩]
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوْبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ. হে আল্লাহ! অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে তোমার দীনের উপর অবিচল রাখ। [আহমাদ: ১১৬৯৭]
اللَّهُمَّ مُصَرِّفَ الْقُلُوْبِ صَرِفْ قُلُوْبَنَا عَلَى طَاعَتِكَ. হে আল্লাহ! অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী, আমাদের অন্তরসমূহকে তোমার এবাদত ও আনুগত্যের দিকে আবর্তিত করে দাও। [মুসলিম: ২৬৫৪]
উক্ত দোয়াসমূহ ব্যতীত হাদিসের পাতায় পাতায় আরও অসংখ্য ব্যাপক অর্থবহ সুসংক্ষিপ্ত-সুসমৃদ্ধ দোয়া রয়েছে।
আট. নিভৃতে নিচু স্বরে দোয়া করা। আল্লাহ বলেন- তোমরা স্বীয় প্রতিপালককে ডাক কাকুতি-মিনতি করে এবং সংগোপনে। তিনি সীমা অতিক্রমকারীদের পছন্দ করেন না। [সূরা আরাফ: ৫৫]

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 নবিদের দোয়া

📄 নবিদের দোয়া


নবিগণ আল্লাহ -এর কাছে দোয়া করতেন। নূহ আল্লাহ -এর কাছে বলেছিলেন-
হে আমার পালনকর্তা, আপনি আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যারা মুমিন হয়ে আমার গৃহে প্রবেশ করে তাদের এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের ক্ষমা করুন এবং জালেমদের কেবল ধ্বংসই বৃদ্ধি করুন। [সূরা নূহ : ২৮]
ইবরাহিম -এর অসংখ্য দোয়া কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। তিনি আমাদের জন্য দোয়া করেছেন। আমাদের এই ভূখণ্ড, সবুজ ভূখণ্ড, ফলদার ভূখণ্ড, মাঠ-ঘাট, দালান-অট্টালিকার জন্য তিনি দোয়া করেছেন।
বস্তুত আমাদের কী ছিল?
আমাদের এই ভূখণ্ড ছিল নির্জন। তৃণহীন। শুষ্ক।
ছিল না এই গাছপালা, বাগানবাড়ি, সবুজ শ্যামলিমা। ছিল না নির্ঝর পানির শীতল ফোয়ারা।
ইবরাহিম আমাদের জন্য দোয়া করেছেন। ফরিয়াদ করে বলেছেন-
হে আমাদের পালনকর্তা, আমি নিজের এক সন্তানকে তোমার পবিত্র ঘরের কাছে চাষাবাদহীন উপত্যকায় আবাদ করেছি। হে আমাদের পালনকর্তা, যাতে তারা সালাত কায়েম রাখে। অতঃপর আপনি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করুন এবং তাদের ফলাদি দ্বারা রুযি দান করুন। সম্ভবত তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। [সূরা ইবরাহিম : ৩৭]
হে আমার পালনকর্তা, আমাকে সালাত কায়েমকারী করুন এবং আমার সন্তানদের মধ্য থেকেও, হে আমার পালনকর্তা! এবং কবুল করুন আমাদের দোয়া। [সূরা ইবরাহিম : ৪০]
মুসা অত্যন্ত সাহসী এবং বীরদর্পী একজন নবি ছিলেন। ইহুদির মত জাতির জন্য তিনিই উপযুক্ত ছিলেন। ইহুদিরা ঠাণ্ডা পানিতেও তার আকৃতি কল্পনা করত। সেই তিনি যখন তাদের সামনে থেকে একটু সড়লেন, তারা গো-বৎসের পূজা শুরু করে দিল।
আল্লাহ তাকে ফেরাউনের কাছে পাঠালেন। তিনি আল্লাহ -র কাছে দোয়া করলেন-
হে আল্লাহ, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন। আমার কাজ সহজ করে দিন। আমার জিহ্বা থেকে জড়তা দূর করে দিন। তারা আমার কথা বুঝুক। [ত্বাহা: ২৫-২৮]
আল্লাহ বললেন-
মুসা, তোমাকে তোমার চাওয়া দেয়া হয়েছে। [সূরা ত্বাহা : ৩৬]
ইউনুস -র প্রসিদ্ধ ঘটনা রয়েছে। স্বজাতির সাথে রাগ হয়ে তাদের ছেড়ে চলে গেলেন। নৌকায় আরোহণ করার পর তাকে মাছে খেয়ে ফেলল। তিনি তখন চিত্তাকর্ষক কিছু বাক্য আল্লাহ -র কাছে ফরিয়াদের ভাষায় তুলে ধরলেন- লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনায যলিমীন।
তুমি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। তুমি নির্দোষ, আমি গোনাহগার। [সূরা আম্বিয়া: ৮৭]
তার কথাগুলো আল্লাহ -র কাছে পৌঁছল। আল্লাহ -র কাছে সকল ভালো কথা এমনই সরাসরি পৌঁছে থাকে। আল্লাহ বলেন-
তারই দিকে আরোহণ করে সৎবাক্য এবং সৎকর্ম তাকে তুলে নেয়। [সূরা ফাতির : ১০]
বর্ণিত হয়েছে, ইউনুস যখন এই কথাগুলো বললেন, ফেরেশতারা তা শুনল। ফেরেশতারা আল্লাহ -র কাছে কেঁদে কেঁদে বলল, 'তোমার এক চেনা বান্দার চেনা কিছু কথা! জানি না তিনি কোথায় আছেন!'
আল্লাহ ফেরেশতাদের বললেন, আমি জানি সে কোথায় আছে।
যদি তিনি আল্লাহ -র তাসবিহ পাঠ না করতেন-
তবে তাকে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত মাছের পেটেই থাকতে হত। [সূরা সাফফাত : ১৪৩, ১৪৪]
আল্লাহ তার এই উভয় দোয়ায় তাকে মুক্তি দিলেন।
প্রিয় নবি। তিনিও আল্লাহ-র কাছে দোয়া করেছেন। কিন্তু তার দোয়ায় বিশেষ একটি আকর্ষণ আছে। বিশেষ একটি স্বাদ ও অনুভূতি আছে। তার দোয়াগুলো সবচে আশ্চর্যময় দোয়া। অন্তরপুচ্ছকে নিমিষেই আলোড়িত করে। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত- তিনি একবার তার খালা মাইমুনা রাযি. ঘরে রাতযাপন করেছিলেন। রাসূল শেষ রাতে সালাতে দাঁড়িয়ে দোয়া করছেন-
আল্লাহ, তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি আসমান যমিন এবং এতদুভয়ের সবকিছুর প্রতিপালক। তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি আসমান যমিন এবং এতদুভয়ের সবকিছুর তত্ত্বাবধায়ক। তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি আসমান যমিন এবং এতদুভয়ের সবকিছুর নূর। তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি সত্য। তোমার ওয়াদা সত্য। জান্নাত সত্য। দোযখ সত্য। সকল নবি সত্য। মোহাম্মদ সত্য।
আল্লাহ, তোমারই জন্য আমি সমর্পিত। তোমাতেই আমি বিশ্বাস রেখেছি। তোমারই উপর ভরসা করেছি। তোমারই কাছে প্রত্যাবর্তন করেছি। তোমারই রাহে লড়াই করেছি। তোমরাই দরবারে বিচার চেয়েছি। তুমি আমাকে ক্ষমা কর। আমার পূর্বাপর ক্ষমা কর। আমার প্রকাশ্য-গোপনীয় সবকিছু ক্ষমা কর। তুমি ছাড়া গোনাহ মাফের কেউ নেই। [বুখারি : ১১২০]
আয়েশা থেকে বর্ণিত, রাসূল শেষ রাতে সালাতে এই বলে দোয়া করতেন- হে আল্লাহ, জিবরাঈল মিকাঈল ও ইসরাফীলের রব, আসমান ও যমিনের স্রষ্টা, প্রকাশ্য ও গোপন বিষয়সমূহের জ্ঞানের অধিকারী, তোমর বান্দারা যেসব বিষয়ে মতানৈক্য পোষণ করে তুমিই সেগুলোর ফয়সালা করবে। সত্য ও ন্যায়ের যেসব বিষয়ে মতানৈক্য পোষণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে তুমি আমাকে পথ দেখাও। তুমিই তো যাকে ইচ্ছা সরল সহজ পথ দেখিয়ে থাকো। [প্রাগুক্ত]
দুটি লোক রাসূলকে হত্যার উদ্দেশে আসল। রাসূল দোয়া করলেন, 'আল্লাহ, তুমি যেভাবে ইচ্ছা, আমার জন্য যথেষ্ঠ।'
তাদের একজন বৃদ্ধা সালুলিয়ার ঘরে উষ্ট্রপ্লেগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেছিল। অপরজনকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসমানী একখণ্ড আগুন ভষ্ম করে দিয়েছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00