📄 জীবনের মহেন্দ্রক্ষণ কোনটি?
কথায়-কাজে, সার্বিক বিষয়ে রাসূলের আলোকবর্তিকায় পরিচালিত হওয়া মুহূর্তটিই জীবনের সফল মুহূর্ত। মধুময় অধ্যায়।
কবির ভাষায়-
তোমার পথে পদচারী যে ক্লান্ত হয় না কখনো।
এ চোখ প্রশান্ত প্রেমবীণা শুনে- এ হৃদয় প্রশান্ত প্রেমলীলা খেলে-
তোমার বাণীতে নিবারিত পিয়াস, তিয়াস আসে না কখনো। তোমার পথে পদচারী যে ক্লান্ত হয় না কখনো।
রাসূলের বিরোধিতা করে কেমন আয়েশে জীবন যাপিত হয়? রাসূলের অবাধ্যতা করে কেমন সুখ আস্বাদিত হয়? রাসূলের আদর্শ বাদ দিয়ে কেমন সুনাম-সুখ্যাতি অর্জন হয়? এসব ধোঁকা। এসব মরিচিকা।
রাসূলের মহান জীবনাদর্শই মুসলমানের জীবনকাঠি। আল্লাহর সন্তুষ্টিই মুসলমানের একমাত্র জিয়নকাঠি।
যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূল্লাল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম নমুনা। [সূরা আহযাব : ২১]
আল্লাহ ঈমানদারদের উপর অনুগ্রহ করেছেন- তাদের মাঝে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে নবি পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের জন্য তার আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদের পরিশোধন করেন এবং তাদের কিতাব ও কাজের কথা শিক্ষা দেন। বস্তুত তারা ছিল পূর্ব থেকেই পথভ্রষ্ট। [সূরা আলে ইমরান : ১৬৪]
রাসূলের প্রেমবীণা গেয়ে কবি বলেন- তোমার প্রেমে অন্ধ হয়ে ভুলেছি বাঁধ পাহাড়সম যা কিছু মোর তোমার চেয়ে নেই তো কিছু মহোত্তম। তোমার ভালোবাসায় আমি নিন্দা শুনি নিত্যদিন, সে নিন্দাতেই মান, তৃপ্ত আমি, -নেই অভিযোগ কোনও দিন। তোমায় দেখার তীব্র আশা উথলে আছে এই মনে। তোমার দেখা পাবো যখন হবে কেমন সেই ক্ষণে! দুনিয়াতেই তৃপ্ত আজি এই দুনিয়ার অধিক লোক
তোমায় ছাড়া কসম আল্লাহর কিসের তৃপ্তি পায় দ্যুলোক!
রাসূলের জীবনের বৃহৎ, উচ্ছল ও দ্যুতিময় একটি অধ্যায় হল আল্লাহ-র যিকির।
ইবনুল কাইয়িম বলেন, রাসূল সবসময় যিকির করতেন। তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস ছিল যিকির। তাঁর কথাবার্তা, কাজকর্ম সবই ছিল আল্লাহর যিকির।
রাসূল শুয়ে বসে দাঁড়িয়ে সর্বাবস্থায় আল্লাহ-র যিকির করতেন।
প্রতিটি পদক্ষেপে চলাফেরায় প্রস্থানে অবস্থানে আল্লাহ-র যিকির করতেন।
রাসূল কোথাও ভাষণ দিতেন, সেখানেও আল্লাহ-কে স্মরণ করতেন।
কারো সাতে কথা বলতেন, তখনও আল্লাহ-কে স্মরণ করতেন।
রাসূলে -র যিকিরের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন-
আর স্মরণ করতে থাক স্বীয় পালনকর্তাকে আপন মনে, ক্রন্দনরত ও ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় এবং এমন স্বরে, যা চীৎকার করে বলা অপেক্ষা কম, সকালে ও সন্ধ্যায়। আর বে-খবর থেকো না। [সূরা আরাফ : ২০৫]
আল্লাহ-কে এমন স্বরে স্মরণ করতে হবে যা চিৎকার অপেক্ষা কম। এটাই আদব। আর আল্লাহকে ডাকতে হবে সংগোপনে। আল্লাহ বলেন-
তোমরা স্বীয় প্রতিপালককে ডাক কাকুতি-মিনতি করে এবং সংগোপনে। তিনি সীমা অতিক্রমকারীদের পছন্দ করেন না। [সূরা আরাফ : ৫৫]
গভীর পান্ডিত্যের অধিকারী শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া উল্লেখ করেন, আল্লাহ-র যিকির করলে অন্তরে একটি আনন্দ ও উচ্ছলতা আসে। এই আনন্দ ও উচ্ছলতা যেন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে না যায়, এ জন্য আল্লাহ-কে স্মরণ করতে হবে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় এবং এমন সুরে, যা চীৎকার করে বলা অপেক্ষা কম। পক্ষান্তরে আল্লাহ-কে ডাকা একটি মহামূল্যবান নেয়ামত। এর দ্বারা বান্দার উপর হিংসার ভয় হয়। এজন্য আল্লাহ-কে ডাকার ক্ষেত্রে সংগোপনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
আল্লাহ বলেন-
তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমি তোমাদের স্মরণ করবো। [সূরা বাকারা : ১৫২]
রাসূল বলেন-
আল্লাহ বলেন, 'যে আমাকে মনে মনে স্মরণ করে, তাকে আমি মনে মনে স্মরণ করি। যে আমাকে কোন মজলিসে স্মরণ করে, আমি তাকে তার চেয়ে উত্তম মজলিসে স্মরণ করি। [বুখারি : ৭৪০৫]
আল্লাহ বলেন, 'যে আমাকে স্মরণ করে, আমি তার সঙ্গে উপবেশনকারী। [মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা : ১২৬৫]
কবি বলেন-
রোগ-বিরোগে তোমায় স্মরি, সুস্থ হই।
তোমায় ভুলে গেলেই কভু ধ্বংস হই।
জনৈক নেককার ব্যক্তি বলেন, 'আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে কখন স্মরণ করেন, আমি জানি।'
জিজ্ঞেস করা হল, 'কখন আল্লাহ আপনাকে স্মরণ করেন?'
তিনি বললেন, 'যখন আমি আল্লাহকে স্মরণ করি, তখন আল্লাহ আমাকে স্মরণ করেন। আল্লাহ বলেন-
তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমি তোমাদের স্মরণ করবো। [সূরা বাকারা : ১৫২]
আল্লাহ বলেন-
জেনে রেখো, আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তরসমূহ শান্তি পায়। [রাদ: ২৮]
কোরআন তেলাওয়াতে অন্তরসমূহ শান্তি পায়।
আল্লাহ -কে স্বাভাবিকভাবে ডাকলেও অন্তরসমূহ শান্তি পায়।
আল্লাহ বলেন-
আল্লাহর অধিক যিকিরকারী পুরুষ ও যিকিরকারী মাহিলা- তাদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপুরস্কার। [সূরা আহযাব: ৩৫]
ইবনুস সালাহ বলেন, যে সকাল-সন্ধ্যা, সালাতের পর এবং নির্ধারিত প্রতিটি সময়ে আল্লাহর যিকির করে, সেই আল্লাহ-কে অধিক পরিমাণে স্মরণকারী।
ইবনে আব্বাস বলেন, দিনে-রাতে, সফরে-বাড়িতে, সুখে-দুঃখে যে আল্লাহকে স্মরণ করে, সেই আল্লাহ-কে অধিক পরিমাণে স্মরণকারী।
ইবনে তাইমিয়া বলেন, আল্লাহর স্মরণে জিহ্বাকে সজীব রাখাই হল আল্লাহ-কে অধিক পরিমাণে স্মরণ করার স্বরূপ।
আব্দুল্লাহ ইবনে বুসর থেকে বর্ণিত-
জনৈক বেদুঈন রাসূলের কাছে এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! ইসলামের বিধি বিধান আমার প্রতি অনেক হয়ে গেছে। আমাকে তা থেকে কোন একটি বলে দিন, যা আমি আঁকড়ে থাকবো।'
রাসূল বলেন, 'মহান আল্লাহর যিকিরে তোমার জিহ্বা সর্বদা সজীব রাখ।' [প্রাগুক্ত]
আল্লাহ বলেন-
নিশ্চয় আসমান ও যমিন সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের আবর্তনে নিদর্শন রয়েছে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্য।, যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা গবেষণা করে আসমান ও যমিন সৃষ্টির বিষয়ে। (তারা বলে-) আমাদের প্রভু! এসব তুমি অনর্থক সৃষ্টি করনি। সকল পবিত্রতা তোমারই। আমাদের তুমি দোযখের শাস্তি থেকে বাঁচাও। [আলে ইমরান: ১৯০, ১৯১]
কবির ভাষায়-
দুনিয়াতে বেশি বেশি আল্লাহর যিকির নিজের অভ্যাস বানাও। আসমানে তুমি স্মরিত হবে।