📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 যিকিরের নানা ধরন

📄 যিকিরের নানা ধরন


ওলামায়ে কেরামের দৃষ্টিতে আল্লাহর যিকির তিন প্রকার।
এক. অন্তরে আল্লাহ -এর ধ্যান রেখে মুখে আল্লাহর স্মরণ করা। মুখেও আল্লাহ, মনেও আল্লাহ, -এটি হল সবচে তাৎপর্যময় যিকির। মুখে আল্লাহ -এর তাসবীহ পড়বে, অন্তরে তাসবীহর অর্থ চিন্তা করবে। মুখে ইসতিগফার পাঠ করবে, অন্তরে তার অর্থ ও তাৎপর্য চিন্তা করবে। মুখে রাসূলের দুরূদ পড়বে, অন্তরে তার প্রশান্তি অনুভব করবে। এটিই হল সবচে মহান ও তাৎপর্যবাহী যিকির।
দুই. শুধু অন্তরে আল্লাহর যিকির করা। মুখে যিকির নেই, কিন্তু অন্তরে আল্লাহ -এর ধ্যান! ঠোঁট নড়ছে না, জিহ্বা নড়ছে না, কিন্তু মনে মনে আল্লাহ -কে আওড়ানো! এটি হল দ্বিতীয় স্তরের তাৎপর্যবাহী যিকির।
তিন. শুধু মুখে মুখে আল্লাহ -এর যিকির। অন্তরে নেই, কিন্তু তার ঠোঁট নড়ছে। জিহ্বায় আল্লাহ -এর যিকিরের মিহিমিহি কম্পন উঠছে। এই ধরনের যিকিরেও আল্লাহ প্রতিদান দিবেন। বর্ণিত হয়েছে-
বান্দা যখন আমাকে স্মরণ করে, তার দুই ঠোঁট আমার যিকিরে কেঁপে কেঁপে ওঠে, আমি তখন বান্দার সাথেই থাকি! [তিরমিযি : ৩৩৭৫]
আব্দুল্লাহ ইবনে বুসর থেকে বর্ণিত-
জনৈক বেদুঈন রাসূলের কাছে এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! ইসলামের বিধি বিধান আমার প্রতি অনেক হয়ে গেছে। আমাকে তা থেকে কো একটি বলে দিন, যা আমি আঁকড়ে থাকবো।'
তিনি বললেন, 'তোমার জিহ্বা মহান আল্লাহ -র যিকিরে সর্বদা সজীব রাখবে।' [আহমাদ : ১৭২২৭]
উক্ত হাদীসদুটি থেকে এ কথা বোঝা যায়, অন্তরে ছাড়া শুধু মুখের যিকিরেও আল্লাহ প্রতিদান দিবেন।
আবু মুসলিম খাওলানি ছিলেন মহান একজন তাবেঈ। তাঁর জিহ্বা কখনও আল্লাহর যিকিরে অবসাদগ্রস্থ হত না।
যারা মিথ্যা নবুওয়াত দাবি করে নিজেদের নবি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল, তাদের একজন ভণ্ডনবী আসওয়াদ আনাসি। সে ইয়েমেনের প্রান্তরে আবু মুসলিম খাওলানিকে গ্রেফতার করেছিল। আসওয়াদ তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, 'তুমি কি স্বাক্ষ্য দাও যে, মোহাম্মদ আল্লাহর নবি?'
আবু মুসলিম উত্তর দিলেন, 'হ্যাঁ।'
আসওয়াদ আবার জিজ্ঞেস করল, 'তুমি আমার উপর ঈমান রাখ কি? আমাকে নবি হিসেবে মান কি?'
আবু মুসলিম বললেন, 'তুমি কী বলেছ, আমি শুনিনি।'
আবু মুসলিমের উত্তর শুনে আসওয়াদ কিছু লাকড়িতে আগুন জ্বালাল এবং আবু মুসলিমকে সে আগুনে নিক্ষেপ করল।
আবু মুসলিম তখন আল্লাহ -কে স্মরণ করলেন। আল্লাহ আগুনকে শীতল ও আরামদায়ক বানিয়ে দিলেন। তিনি যখন মদিনায় ফিরে এলেন, আবু বকর ও ওমর খুশি হয়ে তার সাথে মোয়ানাকা করলেন এবং বললেন, ‘আল্লাহ তার বন্ধু ইবরাহিমের সাথে যে আচরণ করেছেন, একই আচরিত ব্যক্তি আবু মুসলিমকে মারহাবা! মোবারকবাদ! স্বাগতম!’
আবু মুসলিম সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর যিকির করতেন। রাতে তিনি অল্পই ঘুমাতেন, সারা রাত আল্লাহর যিকিরে ধ্যানমগ্ন থাকতেন। [সিয়ারু আলা মিন নুবালা : ৩৬৯]
কোন দীনী ইলমের মজলিস এবং দীনী মাদরাসাও আল্লাহর মহোত্তম যিকির। হাদিস পাঠের আসর, সালাত-রোযার মাসআলা শিক্ষার আসর, শরঈ বেচাকেনা এবং অন্যান্য মাসআলা শিক্ষার আসরও আল্লাহর কাছে মহোত্তম যিকিরের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ -র কাছে এগুলো হল ঈমানের মজলিস। জান্নাতের আসর।

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 যিকিরের প্রেক্ষিত

📄 যিকিরের প্রেক্ষিত


প্রত্যেক যিকিরের একটি প্রেক্ষিত রয়েছে। আল্লাহ -র দাসত্ব করার ক্ষেত্রে প্রেক্ষিত অনুযায়ী যিকির করা উচিত। যিকিরের সময়োপযোগিতা, স্থান-উপযোগিতা লক্ষ রাখা উচিত। এতে আল্লাহ -র আনুগত্য বেশি প্রকাশ পায়।
সালাতের পর রাসূল ﷺ তেত্রিশবার সুবহানাল্লাহ, তেত্রিশবার আলহামদুলিল্লাহ, চৌত্রিশবার আল্লাহু আকবার, একশ বার লা ইলাহা ইল্লাহ, আয়াতুল কুরসী এবং মুয়াওয়াযাত (সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস) পাঠ করা সুন্নত করেছেন।
এমনই প্রত্যেক যিকিরের একটি প্রেক্ষিত বা উপযোগিতা ও সাজুয্যতা রয়েছে। যেমন-
পাহাড়ে আরোহণ বা ভারী কিছু উত্তোলনের সময় লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ পাঠ করা।
আবু মুসা আশয়ারী বলেন, আমরা একটি উপত্যকায় উঠছিলাম। রাসূল আমাদের সাথে ছিলেন। লোকেরা উঁচু আওয়াযে তাকবির দিচ্ছিল। আমি মনে মনে লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ পাঠ করছিলাম। রাসূল আমাকে বললেন, 'আবু মুসা! আমি তোমাকে জান্নাতের একটি খাযানার কথা বলবো না!'
আমি বললাম, 'হ্যাঁ রাসূল, বলুন।'
রাসূল বললেন, 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।' [বুখারি : ৪২০৫]
তদ্রূপ আল্লাহ-র নিদর্শনাবলি ও আশ্চর্য সব সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে সুবহানাল্লাহ পাঠ করা।
কোন গোনাহের কাজ বা আল্লাহ-র অবাধ্যতার কথা মনে আসলে আসতাগফিরুল্লাহি ওয়াআতুবু ইলাইহি পাঠ করা।
রাসূলের নাম আলোচনা হলে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঠ করা।
খাওয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ এবং শেষে আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করা।
হাদিসে রাসূল যত যিকিরের কথা বলেছেন, চিন্তকদের কাছে প্রতিটি যিকিরেরই একটি প্রেক্ষিত রয়েছে। একটি সাজুয্যতা ও উপযোগিতা রয়েছে।

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 যিকিরের লাভালাভ

📄 যিকিরের লাভালাভ


ওলামায়ে কেরام যিকিরের একশটি লাভের কথা উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে কিছু হল-
১. শয়তান বিদূরিত হয়।
২. আল্লাহ সন্তুষ্ট হন।
৩. বন্ধু-সহচরদের ভালোবাসা অর্জন হয়।
৪. মহোত্তম প্রতিদান পাওয়া যায়।
৫. ভুল-ত্রুটি ও পাপাচারের ক্ষতিপূরণ হয়।
৬. চেহারায় ঔজ্জ্বল্য আসে।
৭. হৃদয়টা উদার ও মহান হয়।
৮. আল্লাহ ও বান্দার মাঝে ভালোবাসা তৈরি হয়।
৯. জীবন বরকতময় এবং যৌবন সংরক্ষিত ও গতিশীল হয়।
১০. আনুগত্যের অভ্যাস হয়।
১১. গিবত চোগলখুরিসহ অনুরূপ গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা যায়।
১২. অন্তর আল্লাহমুখী হয়, অন্তরে হিসাবের ভয় তৈরি হয় এবং তাওবা ও অনুতপ্ততার তাওফিক হয়।
১৩. বিভিন্ন নেক আমলের অনুরূপ সাওয়াব পাওয়া যায়। কখনও বা উক্ত নেক আমলেরও বেশি সাওয়াব পাওয়া যায়।
১৪. ফেরেশতারা যিকিরকারীকে স্মরণ করে।
১৫. আল্লাহ যিকিরকারীকে স্মরণ করেন।
১৬. আল্লাহর বিশেষ সঙ্গ ও নিরাপত্তা পাওয়া যায়।
১৭. সন্দেহ সংশয় ও গোনাহের মানসিকতা থেকে মুক্তি মেলে।
১৮. চিন্তা পেরেশানি অস্থিরতা জীবন নিয়ে হতাশা ও অনিশ্চয়তা দূর হয়।
১৯. সময়ে-বয়সে বরকত আসে। বয়স বৃদ্ধিও পায়।
২০. মুমিনের অন্তর প্রশান্ত করে।
২১. অপরাপর নেক আমলের মানসিকাত তৈরি হয় এবং আগ্রহ বৃদ্ধি পায়, শক্তি সঞ্চার হয়।
২২. ইবনুল কাইয়িম বলেন, সবচে বড় ফায়দা হল নেফাক থেকে বেঁচে থাকা যায়। কারণ মোনাফেক আল্লাহকে স্মরণ করে না। আল্লাহ বলেন-
তারা যখন সালাতে দাঁড়ায়, তখন একান্ত শিথিলভাবে লোক দেখানোর জন্য দাঁড়ায়। আর তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে। [সূরা নিসা: ১৪২]
মোনাফেকরা আল্লাহ-কে স্মরণ করে না। বাজারে, গাড়িতে, বিমানে, মসজিদে, কোথাও তারা আল্লাহ-কে স্মরণ করে না। আল্লাহ-কে মুমিনারই স্মরণ করে।
কেউ যদি নিজের ঈমান ও নিফাক পরীক্ষা করতে চায়, তাহলে সে নিজেকে পর্যালোচনা করে দেখুক। সে সবসময় আল্লাহ -কে স্মরণ করে কি? বাজারে, গাড়িতে, লোক সমাগমে সে আল্লাহ -কে স্মরণ করে কি? যদি সে আল্লাহ -কে সবসময় সবখানে স্মরণ করে, তাহলে সে মুমিন। তার জন্য ঈমানের সুসংবাদ। অন্যথায় সে হতচ্ছাড়া। তার ভাগ্যে ক্রন্দন আর ক্রন্দন ...

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 যিকিরের সময়

📄 যিকিরের সময়


যিকিরের জন্য সবচে সুন্দর সময় হল ফজর শুরু হওয়ার পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত এবং আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। বর্ণিত হয়েছে- فَسُبْحْنَ اللَّهِ حِينَ تُمْسُونَ وَحِينَ تُصْبِحُونَ ﴿١٤﴾ وَلَهُ الْحَمْدُ فِي السَّمَاتِ وَالْأَرْضِ وَعَشِيًّا وَ حِينَ تُظْهِرُونَ ﴿١٨﴾ অতএব তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা স্মরণ কর সকালে ও সন্ধ্যায় এবং অপরাহ্নে ও মধ্যাহ্নে। নভোমণ্ডল এবং ভূমণ্ডলে তাঁরই প্রশংসা। [সূরা রুম: ১৭, ১৮]
রাসূল সূর্যোদয় পর্যন্ত আল্লাহর যিকির করতেন। আনাস থেকে বর্ণিত হয়েছে-
রাসূল বলেছেন, যে ব্যক্তি জামাতের সাথে ফজরের সালাত আদায় করে সূর্যোদয় পর্যন্ত সেখানে বসে আল্লাহর যিকির করবে এবং এরপর দুরাকাত সালাত (ইশরাক) আদায় করবে, তার জন্য একটি হজ্জ ও ওমরা পালনের সাওয়াব হবে। আনাস বলেন, রাসূল বলেছেন, ঐ ব্যক্তির জন্য হজ্জ ও ওমরার পরিপূর্ণ সাওয়াব হবে। পরিপূর্ণ সাওয়াব হবে। পরিপূর্ণ সাওয়াব হবে। [তিরমিযি : ৫৮৬]
রাসূল -র আমল এমন ছিল।
ইবনে তাইমিয়া ফজরের পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত সালাতের জায়গায় বসে থাকতেন। বলতেন, এই হল আমার ভোর। এভাবে ভোর না হলে আমার শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে!
ফজরের পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত যিকিরের সর্বোত্তম সময়। এ সময় হৃদয়ের দুয়ারগুলো উজাড় হয়। ফুল ফোটে। পাখি ডাকে। আল্লাহ -র বরকত নাযিল হয়। রিযিক নাযিল হয়। সাফল্য নাযিল হয়।
আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্তও যিকিরের উত্তম সময়। সূর্যাস্তের পর কয়েক ঘন্টা, বা এক ঘন্টা, বা আধাঘন্টা বা তারও কম সময় যিকিরের জন্য উত্তম।
আল্লাহ আমাদের অধিক পরিমাণ যিকির করার তাওফিক দান করুন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00