📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 যিকিরের পণ্য ও প্রয়োজন

📄 যিকিরের পণ্য ও প্রয়োজন


শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, ফরয এবাদতের পর সবচেয়ে ফযিলতপূর্ণ এবাদত হল যিকির। তাঁর এই কথার সাথে সকল ওলামায়ে কেরামের ঐকমত্য রয়েছে।
আল্লাহ -র সন্তুষ্টি অর্জনের দুটি মাধ্যম রয়েছে। এক. আল্লাহর ফিকির। দুই. আল্লাহর যিকির।
আল্লাহ -র ফিকিরের অর্থ হল তাঁর সৃষ্টিকূল, নিদর্শনাবলী এবং নেয়ামতসমূহের গবেষণা করা।
আল্লাহ -র যিকিরের অর্থ হল শরীয়তের সিদ্ধসীমায় তাঁর নাম ও গুণাবলি স্মরণ করা।
কোরআনে যিকিরের ফযিলত
আল্লাহ বলেন-
নিশ্চয় আসমান ও যমিন সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের আবর্তনে নিদর্শন রয়েছে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্য। যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা গবেষণা করে আসমান ও যমিন সৃষ্টির বিষয়ে। (তারা বলে-) আমাদের প্রভু! এসব তুমি অনর্থক সৃষ্টি করনি। সকল পবিত্রতা তোমারই। আমাদের তুমি দোযখের শাস্তি থেকে বাঁচাও। [সূরা আলে ইমরান: ১৯০, ১৯১]
নেককার লোকেরা কোথাও একত্র হলে আল্লাহ -র স্মরণ করে। বদকার লোকেরা একত্র হলে শয়তানঘনিষ্ঠ আলোচনার আড্ডা জমায়।
নেককারদের আলোচনা হল আল্লাহ -র পবিত্রতার বর্ণনা, স্তুতিবয়ান, একত্ববাদের ঘোষণা। বদকারদের আলোচনা হল গান-বাজনা, তামাশা-কৌতুক, অশ্লীলতা, গিবত, চোগলখুরি।
কবির ভাষায়- রোগ-বিরোগে তোমায় স্মরি, সুস্থ হই।
তোমায় ভুলে গেলেই কভু ধ্বংস হই।
নেককারদের অন্তর যখন অসুস্থ হয়ে আসে, আল্লাহ -র স্মরণে তাদের সুস্থতা আসে। বদকাররা অনর্থ আলাপে মগ্ন হয়। ফলে তাদের অন্তরের অপমৃত্যু ঘটে। সুস্থতা ও সঞ্জীবনী তাদের ভাগ্যে আর জোটে না। আল্লাহ - বলেন-
জেনে রেখো, আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তরসমূহ শান্তি পায়। [সূরা রাদ : ২৮]
পক্ষান্তরে যে অন্তরে দুনিয়ার আসক্তি বসে যায়, পার্থিব স্বাদ অনুভুত হয়, সে অন্তর কখনও প্রশান্তি অনুভব করে না।
মানুষ আজ পদ-পদবীর ফাঁদে আটকা পড়েছে। ধন-সম্পদ, দালান-অট্টালিকা, পরিবার-সন্তানের দাপটে অন্ধ হয়ে গেছে। তাদের অন্তর পরিশুদ্ধ হচ্ছে না। বক্ষগুলো দীন গ্রহণের জন্য উন্মুক্ত ও প্রশস্ত হচ্ছে না। আল্লাহ বলেন-
এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সঙ্কীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করবো। সে বলবে, 'হে আমার পালনকর্তা! আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমি তো চক্ষুমান ছিলাম। আল্লাহ বলবেন, 'এমনিভাবে তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল। অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। তেমনিভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাবো। [সূরা ত্বাহা : ১২৪-১২৬]
মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর। এবং সকাল বিকাল আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা কর। [সূরা আহযাব : ৪১, ৪২]
মানুষ কখন আল্লাহ -কে অধিক পরিমাণে স্মরণকারী হয়?
ইবনে সালাহ বলেন, যে রাসূল থেকে বর্ণিত যিকিরগুলো সকাল-সন্ধ্যা আদায় করে, সেই আল্লাহ -কে অধিক পরিমাণে স্মরণকারী।
ইবনে আব্বাস বলেন, দিনে-রাতে, সফরে-বাড়িতে, সুখে-দুঃখে যে আল্লাহ -কে স্মরণ করে, সেই আল্লাহ -কে অধিক পরিমাণে স্মরণকারী।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, মসজিদে আগমন-প্রস্থান, টয়লেটে প্রবেশ-বহির্গমন, ঘুমোনোর সময়, ঘুম থেকে জাগার সময়, খানার শুরুতে ও শেষে, কাপ পরিধানের সময় রাসূল ﷺ যেসব দোয়া শিখিয়েছেন, সেসব দোয়া নিয়মিত পাঠকারীই হল আল্লাহ -কে অধিক পরিমাণে স্মরণকারী।
অনেকে বলেন, আল্লাহ -র স্মরণে জিহ্বাকে সজীব রাখাই হল আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করার স্বরূপ। আব্দুল্লাহ ইবনে বুসর থেকে বর্ণিত- জনৈক বেদুঈন রাসূলের কাছে এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! ইসলামের বিধিবিধান আমার প্রতি অনেক হয়ে গেছে। আমাকে তা থেকে কো একটি বলে দিন, যা আমি আঁকড়ে থাকবো।'
তিনি বললেন, 'তোমার জিহ্বা মহান আল্লাহর যিকিরে সর্বদা সজীব রাখবে।' [আহমাদ : ১৭২২৭]
জনৈক নেককার ব্যক্তির মৃত্যুর সময় তাকে বলা হল, 'আল্লাহকে স্মরণ করুন।' তিনি বললেন, 'আমি আল্লাহকে ভুলিনি যে তাকে নতুন করে স্মরণ করবো।'
জুনাইদ বিন মোহাম্মদ ছিলেন প্রখ্যাত একজন বুযুর্গ। মৃত্যুর সময়ও তিনি কোরআন তিলাওয়াত করছিলেন। তাকে তখন বলা হল, 'আপনি মৃত্যুর সময়ও কোরআন তিলাওয়াত করছেন!'
তিনি উত্তর দিলেন, 'নেক কাজের প্রতি আমার চেয়ে বেশি মুহতাজ আর কে?'
জনৈক নেককার ব্যক্তি বলেন, 'আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে কখন স্মরণ করেন, আমি জানি।'
জিজ্ঞেস করা হল, 'কখন আল্লাহ আপনাকে স্মরণ করেন?'
তিনি বললেন, যখন আমি আল্লাহকে স্মরণ করি, তখন আল্লাহ আমাকে স্মরণ করেন। আল্লাহ বলেন, তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমি তোমাদের স্মরণ করবো। [সূরা বাকারা : ১৫২]

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 সুন্নাহয় যিকিরের ফযিলত

📄 সুন্নাহয় যিকিরের ফযিলত


একজন শুভ্রকেশী হাড্ডিসার বয়োবৃদ্ধের জন্য সর্বোত্তম আমল আল্লাহর যিকির।
একজন সুদর্শন শক্তিভরা যুবকের জন্যও সর্বোত্তম আমল আল্লাহর যিকির।
আল্লাহর যিকিরের মত সর্বোত্তম আমল ইসলামে দ্বিতীয়টি নেই।
রাসূল একবার মক্কার রাস্তা দিয়ে ভ্রমণ করছিলেন। জুমদান নামক একটা পাহাড়ে উপনীত হয়ে তিনি বললেন, 'তোমরা ভ্রমণ করো, এটি জুমদান পাহাড়। (মনে রেখ) নির্জনবাসীরা আগে বেড়ে গেছে।'
সাথীরা জিজ্ঞেস করল, 'হে আল্লাহর রাসূল! নির্জনবাসী কারা?' রাসূল উত্তরে বললেন, 'বেশি বেশি আল্লাহর যিকিরে রত পুরুষ ও নারী।' [মুসলিম : ২৬৭৬]
নির্জনবাসী- যে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত নেক আমল করে।
নির্জনবাসী- যে ইলমে অনন্য। আল্লাহর যিকিরে অগ্রগণ্য। কোন মজলিসে- বৈঠকে সবাই যখন কথা বলতে পছন্দ করে, তখনও সে আল্লাহর যিকিরকে বেছে নেয়।
গাযালি বলেন, মানুষ যে কোন মজলিসে আপন আপন পেশা ও পছন্দের বিষয়ে কথা বলে। কাঠমিস্ত্রি কোথাও বসলে কাঠ-চৌকাঠের আলাপ জুড়ে দেয়। রাজমিস্ত্রি কোথাও বসলে তার নির্মাণের আলাপ জুড়ে দেয়। কামার জুড়ে দেয় লোহার আলাপ। বস্ত্র ব্যবসায়ী শুরু করে পোষাকের আলাপ। আর যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের মুখে সবসময় আল্লাহর যিকির। আল্লাহর যিকির।
ইউসুফ -কে যে কূপে ফেলা হয়েছিল, সেটিতে একটি পাথর ছিল। পাথরের চারপাশে পানি। তখন রাত, ইউসুফ পাথরের উপর। সেখানে তার কেউ নেই। আল্লাহ ছাড়া কোন সঙ্গী-সহচর, সাহায্যকারী কেউ নেই।
ইউসুফ আল্লাহ -র যিকির শুরু করলেন। ইবনে আব্বাস এর বর্ণনানুসারে তার যিকিরে সমুদ্রের মাছ থমকে দাঁড়িয়েছিল। ব্যাঙের ঘ্যাঙর- ঘ্যাঙ থেমে গিয়েছিল। আল্লাহ -এর একাগ্র যিকিরের প্রভাবেই এমন হয়েছিল। ইউসুফ আল্লাহকে স্মরণ করেছিলেন, আল্লাহও ইউসুফকে হেফাযত করেছিলেন। (ইবনে রজব-কৃত জামিউল উলূমি ওয়ালহিকাম)
ইউনুস । তিনি যখন মাছের পেটে, তখন আল্লাহকেই স্মরণ করেছিলেন। আল্লাহ বলেন-
যদি তিনি আল্লাহর তাসবিহ পাঠ না করতেন, তবে তাকে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত মাছের পেটেই থাকতে হত। [সূরা সাফফাত: ১৪৩, ১৪৪]
আবু দারদা থেকে বর্ণিত-
রাসূল সাহাবিদের বললেন, 'আমি তোমাদের এমন একটি আমলের কথা বলব, যা সবচে ফযিলতপূর্ণ! তোমাদের প্রভুর কাছে সবচে পবিত্র! আল্লাহর রাস্তায় তোমাদের স্বর্ণ-রূপা ব্যয় করার চেয়ে উত্তম! শত্রুর সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষের চেয়ে উত্তম!'
সাহাবায়ে কেরام বললেন, 'হ্যাঁ, অবশ্যই বলুন।'
রাসূল বললেন- 'সেই আমলটি হল আল্লাহর যিকির।' [মুসলিম : ২১১৯৫]
আল্লাহর যিকির নফল জিহাদের চেয়ে উত্তম। নফল রোযা এবং সদকার চেয়েও উত্তম।

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 যিকিরীনদের ঘটনাপাঠ

📄 যিকিরীনদের ঘটনাপাঠ


খালেদ ইবনে মাদানী। প্রতিদিন চল্লিশ হাজার বার আল্লাহ আল্লাহ যিকির করতেন।
ইউসুফ ইবনে আসবাত। প্রতিদিন এক লক্ষ বার আল্লাহর যিকির করতেন। তাসবীহ-তাহলীল পাঠ করতেন।
মহান এই মনীষীদের প্রতিটি শ্বাসে-প্রশ্বাসে আল্লাহর যিকির মিশিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা?
কত কথা বলি!
কত অনর্থ করি!
প্রমোদ-বিনোদন করি!
কিন্তু জীবনের কতটুকু অংশ আল্লাহর স্মরণে ব্যয় করি।
কতটুকু সময় আল্লাহর যিকিরে বাহিত করি! রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন- مَثَلُ الَّذِي يَذْكُرُ رَبَّهُ وَالَّذِي لَا يَذْكُرُ رَبَّهُ مَثَلُ الْحَيَّ وَالْمَيِّتِ. যে ব্যক্তি আল্লাহর যিকির করে এবং যে আল্লাহর যিকির করে না, উভয়ের দৃষ্টান্ত জীবিত এবং মৃতের ন্যায়। [বুখারি : ৬৪০৭]
যারা আল্লাহ -কে স্মরণ করে না, তারা মৃত। তারা খায়-দায়, ফুর্তি করে, গান-বাজনা করে, ভ্রমণ-প্রমোদ করে, কিন্তু-
তারা মৃত, প্রাণহীন এবং কবে পুনরুত্থিত হবে, জানে না। [সূরা নাহল: ২১]
আসল মৃত সে-ই, যে ঈমানের সাথে, কোরআনের সাথে, আল্লাহ -র আনুগত্যের সাথে জীবন চালায় না।
যে রাসূল -র নূর ও সুন্নাহকে জীবনের সাথে ঘনিষ্ঠ করে না।
যে জীবনের প্রকৃত পরিচয় জানে না। আল্লাহ বলেন-
আর যে মৃত ছিল, অতঃপর আমি তাকে জীবিত করেছি এবং তাকে এমন একটি আলো দিয়েছি, যা নিয়ে সে মানুষের মধ্যে চলাফেরা করে। সে কি ঐ ব্যক্তির সমতুল্য হতে পারে, যে অন্ধকারে রয়েছে- সেখান থেকে বের হতে পারছে না? [সূরা আনআম : ১২২]
অন্ধকার! এ হল আল্লাহ -র অবাধ্যতার অন্ধকার! কুপ্রবৃত্তির অন্ধকার! আল্লাহর সাথে দূরত্বের অন্ধকার!
রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন-
আমার নিকট ‘সুবহানাল্লাহি ওয়ালহামদুলিল্লাহি ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার’ পাঠ করা পৃথিবীর যাবতীয় বস্তু থেকে অধিক প্রিয়, যেসব বস্তুর উপর সূর্য উদিত হয়।” অপর এক বর্ণনায় যেসব বস্তুর উপর সূর্য উদিত হয় এর স্থলে যেসব বস্তুর উপর সূর্য অস্ত যায় বর্ণিত হয়েছে। [মুসলিম: ২৬৯৫]
দুনিয়া অতি তুচ্ছ। দুনিয়ার সোনা-রূপা অতি নগণ্য। যেদিন মৃত্যু হবে, নেক আমল করার সব পথ রুদ্ধ হবে, সেদিন এসবের কোন মূল্যই থাকবে না।
'সুবহানাল্লাহি ওয়ালহামদুলিল্লাহি ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার' রাসূলের কাছে দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। রাসূল বলেন-
যে ব্যক্তি সুবহানাল্লাহিল আযীম ওয়াবিহামদিহী পাঠ করল, তার জন্য জান্নাতে একটি খেজুর গাছ রোপিত হল। [তিরমিযি : ৩৪৬৪]
জান্নাতের কত খেজুর গাছ প্রতিদিন না জানি আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে! কবি বলেন-
ঐ দুনিয়ায় ঘর বাধো মন; ঘরের রক্ষী থাক রাযি আহমদ হবেন প্রতিবেশী, নির্মাতা তার মহান রব... ভবন হবে স্বর্ণালী তার মিসক হবে পলেস্তর যাফরানী ঘাস তরুলতায় মাঠ-জমি-ঘাট সব উর্বর...
ইবনুল কাইয়িম বলেন, রাসূল সবসময় যিকির করতেন। তার শ্বাস-প্রশ্বাস ছিল যিকির। তার কথাবার্তা, কাজকর্ম সবই ছিল আল্লাহর যিকির।
রাসূল দিনরাত আল্লাহ -কে স্মরণ করতেন। তিনি মানুষের সাথে থাকতেন, অথচ তার অন্তর আল্লাহ -র সাথে সম্পর্কযুক্ত থাকত। আল্লাহ বলেন-
আপনি বলুন- আমার সালাত, আমার কোরবানী, এবং আমার জীবন ও মৃত্যু বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য। [সূরা আনয়াম : ১৬২]
রাসূল সবসময় আল্লাহ -র সাথে সম্পর্ক জুড়ে থাকতেন। রাসূলের অন্তর সর্বদা জাগ্রত থাকত। -এটি ছিল রাসূলের অনন্য বৈশিষ্ট্য।
রাসূল রাতে ঘুমাতেন, কিন্তু তার অন্তর জাগ্রত থাকত। এজন্য রাসূল ঘুমালেও ঘুমের কারণে তার অযু ছুটত না। একবার তিনি ঘুমের আগের অযু দিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলেন। আয়েশা -কে বললেন, 'আয়েশা! আমার চোখ ঘুমায়, কিন্তু আমার অন্তর ঘুমায় না।'
অথচ আমরা যখন ঘুমাই, আমাদের অন্তরও ঘুমিয়ে থাকে।
কবির ভাষায়- সকল চোখই ঘুমে বিভোর, কিছু চোখে তন্দ্রা নাই! বিছানাতে পিঠ লাগে না, গলগলিয়ে অশ্রু বয়... এমনই যাকিরীনদের অন্তর। এমন ব্যক্তিই আল্লাহকে সর্বদা স্মরণকরী।

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 যিকিরের নানা ধরন

📄 যিকিরের নানা ধরন


ওলামায়ে কেরামের দৃষ্টিতে আল্লাহর যিকির তিন প্রকার।
এক. অন্তরে আল্লাহ -এর ধ্যান রেখে মুখে আল্লাহর স্মরণ করা। মুখেও আল্লাহ, মনেও আল্লাহ, -এটি হল সবচে তাৎপর্যময় যিকির। মুখে আল্লাহ -এর তাসবীহ পড়বে, অন্তরে তাসবীহর অর্থ চিন্তা করবে। মুখে ইসতিগফার পাঠ করবে, অন্তরে তার অর্থ ও তাৎপর্য চিন্তা করবে। মুখে রাসূলের দুরূদ পড়বে, অন্তরে তার প্রশান্তি অনুভব করবে। এটিই হল সবচে মহান ও তাৎপর্যবাহী যিকির।
দুই. শুধু অন্তরে আল্লাহর যিকির করা। মুখে যিকির নেই, কিন্তু অন্তরে আল্লাহ -এর ধ্যান! ঠোঁট নড়ছে না, জিহ্বা নড়ছে না, কিন্তু মনে মনে আল্লাহ -কে আওড়ানো! এটি হল দ্বিতীয় স্তরের তাৎপর্যবাহী যিকির।
তিন. শুধু মুখে মুখে আল্লাহ -এর যিকির। অন্তরে নেই, কিন্তু তার ঠোঁট নড়ছে। জিহ্বায় আল্লাহ -এর যিকিরের মিহিমিহি কম্পন উঠছে। এই ধরনের যিকিরেও আল্লাহ প্রতিদান দিবেন। বর্ণিত হয়েছে-
বান্দা যখন আমাকে স্মরণ করে, তার দুই ঠোঁট আমার যিকিরে কেঁপে কেঁপে ওঠে, আমি তখন বান্দার সাথেই থাকি! [তিরমিযি : ৩৩৭৫]
আব্দুল্লাহ ইবনে বুসর থেকে বর্ণিত-
জনৈক বেদুঈন রাসূলের কাছে এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! ইসলামের বিধি বিধান আমার প্রতি অনেক হয়ে গেছে। আমাকে তা থেকে কো একটি বলে দিন, যা আমি আঁকড়ে থাকবো।'
তিনি বললেন, 'তোমার জিহ্বা মহান আল্লাহ -র যিকিরে সর্বদা সজীব রাখবে।' [আহমাদ : ১৭২২৭]
উক্ত হাদীসদুটি থেকে এ কথা বোঝা যায়, অন্তরে ছাড়া শুধু মুখের যিকিরেও আল্লাহ প্রতিদান দিবেন।
আবু মুসলিম খাওলানি ছিলেন মহান একজন তাবেঈ। তাঁর জিহ্বা কখনও আল্লাহর যিকিরে অবসাদগ্রস্থ হত না।
যারা মিথ্যা নবুওয়াত দাবি করে নিজেদের নবি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল, তাদের একজন ভণ্ডনবী আসওয়াদ আনাসি। সে ইয়েমেনের প্রান্তরে আবু মুসলিম খাওলানিকে গ্রেফতার করেছিল। আসওয়াদ তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, 'তুমি কি স্বাক্ষ্য দাও যে, মোহাম্মদ আল্লাহর নবি?'
আবু মুসলিম উত্তর দিলেন, 'হ্যাঁ।'
আসওয়াদ আবার জিজ্ঞেস করল, 'তুমি আমার উপর ঈমান রাখ কি? আমাকে নবি হিসেবে মান কি?'
আবু মুসলিম বললেন, 'তুমি কী বলেছ, আমি শুনিনি।'
আবু মুসলিমের উত্তর শুনে আসওয়াদ কিছু লাকড়িতে আগুন জ্বালাল এবং আবু মুসলিমকে সে আগুনে নিক্ষেপ করল।
আবু মুসলিম তখন আল্লাহ -কে স্মরণ করলেন। আল্লাহ আগুনকে শীতল ও আরামদায়ক বানিয়ে দিলেন। তিনি যখন মদিনায় ফিরে এলেন, আবু বকর ও ওমর খুশি হয়ে তার সাথে মোয়ানাকা করলেন এবং বললেন, ‘আল্লাহ তার বন্ধু ইবরাহিমের সাথে যে আচরণ করেছেন, একই আচরিত ব্যক্তি আবু মুসলিমকে মারহাবা! মোবারকবাদ! স্বাগতম!’
আবু মুসলিম সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর যিকির করতেন। রাতে তিনি অল্পই ঘুমাতেন, সারা রাত আল্লাহর যিকিরে ধ্যানমগ্ন থাকতেন। [সিয়ারু আলা মিন নুবালা : ৩৬৯]
কোন দীনী ইলমের মজলিস এবং দীনী মাদরাসাও আল্লাহর মহোত্তম যিকির। হাদিস পাঠের আসর, সালাত-রোযার মাসআলা শিক্ষার আসর, শরঈ বেচাকেনা এবং অন্যান্য মাসআলা শিক্ষার আসরও আল্লাহর কাছে মহোত্তম যিকিরের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ -র কাছে এগুলো হল ঈমানের মজলিস। জান্নাতের আসর।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00