📄 শোকর আদায় করো আল্লাহ বাড়িয়ে দিবেন
'শ্বপ্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য সকল প্রশংসা। সর্বসম্মানী রাসূল, রাসূলের পরিবার-সহচর সকলের জন্য অগুণতি দুরূদ ও সালাম। মোহাম্মদ, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
আল্লাহ বলেন- তুমি কি তাদের দেখনি, যারা আল্লাহর নেয়ামতকে কুফরে পরিণত করেছে এবং স্বজাতিকে সম্মুখীন করেছে ধ্বংসের আলয়ে- দোযখের? তারা তাতে প্রবেশ করবে, সেটা কতই না মন্দ আবাস! [সূরা ইবরাহীম: ২৮, ২৯]
আল্লাহর নেয়ামতকে কুফরে পরিণত করেছে কারা?
ইবনে আব্বাস বলেন, এরা হল কোরাইশ। কোরাইশের লোকেরা আল্লাহর নেয়ামতকে কুফরে পরিণত করেছে। অস্বীকার করেছে। রাসূল কোরাইশের কাছে দীনের দাওয়াত রাখলেন, কোরাইশ রাসূলকে মিথ্যারোপ করল। রাসূলের আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। এটাই ছিল তাদের নেয়ামতকে কুফরে পরিণত করার স্বরূপ।
অনেক মুফাসসিরের দৃষ্টিতে যে ব্যক্তিই আল্লাহর কিতাব এবং রাসূলের সুন্নত থেকে বিমুখ থাকবে, সে ব্যক্তিই আল্লাহর নেয়ামতকে কুফরে পরিণতকারী হিসেবে সাব্যস্ত হবে। যে ব্যক্তি একটি নেয়ামতে এ ধরণের উন্মাসিকতা দেখাবে, সে মন্দ নিবাস জাহান্নামকে আপন আলয়ে গ্রহণ করেছে। আল্লাহর নেয়ামত অসংখ্য। আল্লাহ বলেন-
আর আল্লাহর নেয়ামত পৌঁছে যাওয়ার পর যদি কেউ সে নেয়ামতকে পরিবর্তিত করে দেয়, তবে আল্লাহর আযাব অতি কঠিন। [বাকারা: ২১১]
যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা কর, তবে গুণে শেষ করতে পারবে না। [সূরা ইবরাহীম : ৩৪]
আয়াতদু'টিতে আল্লাহ একক নেয়ামতের (আর আল্লাহর নেয়ামত পৌঁছে যাওয়ার পর...) উল্লেখ করেছেন। কারণ, একটি নেয়ামতেরই শোকর আদায় না হলে অন্যান্য নেয়ামতের শোকর আদায়ের সম্ভাবনা কোথায়?
আহমাদ কিতাবুয যুহদ-এ উল্লেখ করেন, হাদিসে বর্ণিত হয়েছে- 'আল্লাহ বলেন, আশ্চর্য! বনী আদম! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি, তোমরা অন্যের উপাসনা করছ! আমি তোমাদের রিযিক দিচ্ছি, তোমরা অন্যের কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়ছ! আমার নেয়ামত গ্রহণ করে আমারই থেকে বিমুখ থাকতে পছন্দ কর! আমার কাছে অভাবী হয়ে পাপাচার করে আমাকেই রাগত করছ! আমার মঙ্গল তোমার কাছে অবতরণকারী। তোমার অমঙ্গল আমার কাছে আরোহণকারী।' [কানযুল উম্মাল: ৪৩১৭৪]
হাদিসোক্ত অবস্থা সেসব লোকের হয়ে থাকে, যারা আল্লাহর পথ ভুলে যায়। রাসূলের পথ ছেড়ে যায়। যারা সরল-সঠিক প্রগতির পথ ছেড়ে পশ্চাদশীল পতনের পথ গ্রহণ করে।
ঐতিহাসিকদের বর্ণনা মতে মুসা ইবনে ইমরান দুঃসাহসী পদক্ষেপে অকপটে যে কোন প্রশ্ন করতেন। তিনি আল্লাহকে বলে বসলেন-
হে আমার প্রভু! তোমার দীদার আমাকে দাও, যেন তোমাকে দেখতে পাই। [সূরা আরাফ: ১৪৩]
এই কথা আল্লাহর সামনে আর কেউ বলেননি। মুসা বলেছিলেন। তিনি এমনই সাহসী প্রশ্ন করতেন। একবার তিনি আল্লাহকে বললেন, 'আল্লাহ! তোমার কাছে আমি একটি জিনিস চাইবো।'
আল্লাহ বললেন, 'কী সেই জিনিস?'
মুসা বললেন, 'আমার অজ্ঞাতে আমার ব্যাপারে কোন মন্তব্য করা থেকে মানুষের মুখকে তুমি বিরত রাখ।'
আল্লাহ বললেন, 'তুমি কেন এটি চেয়েছ! আমি তাদের সৃষ্টি করেছি। আমি তাদের রিযিক দেই। আমিই তাদের ক্ষমা করি। তারা বলে, আমি নাকি স্ত্রী-সন্তান গ্রহণ করেছি! অথচ আমি আল্লাহ, আমি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই। আমি স্ত্রী-সন্তান গ্রহণ করিনি।'
আবু হোরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূল ইরশাদ করেন-
আল্লাহ বলেন, 'আদম সন্তান আমাকে গালমন্দ করে, অথচ আমাকে গালমন্দ করা তার উচিত নয়। আর সে আমাকে অস্বীকার করে, অথচ তার তা উচিত নয়। আমাকে গালমন্দ হচ্ছে তার এ উক্তি- আমার সন্তান আছে। আর তার অস্বীকার করা হচ্ছে এ উক্তি- যেভাবে আল্লাহ আমাকে প্রথমে সৃষ্টি করেছেন, সেভাবে কখনও তিনি আমাকে পুনঃসৃষ্টি করবেন না। [বুখারি : ৩১৯৩]
আবু হোরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেছেন-
মহান আল্লাহ বলেন, 'আদম সন্তান যুগ এবং সময়কে গালি দিয়ে আমাকে কষ্ট দেয়। সময় তো আমারই নিয়ন্ত্রণে। রাতদিনের পরিবর্তন আমিই করে থাকি। [বুখারি: ৪৮৬২]
ওমর এর ঘটনা। একবার তিনি সদকার উট দেখতে বেরুলেন। সদকার উটের মধ্যে লাল উটও ছিল। পাশ থেকে একজন বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ সত্যই বলেছেন-
বল, আল্লাহর দয়া ও মেরবাণীতে। সুতরাং এরই প্রতি তাদের সন্তুষ্ট থাকা উচিত। এটিই উত্তম সে সমুদয় থেকে যা সঞ্চয় করেছ। [সূরা ইউনুস: ৫৮]
ওমর বললেন, 'তুমি কি মনে কর, রহমত মানে এই উট! আল্লাহর কসম, এমনটি নয়। তুমি জান, রহমত কী?'
লোকটি বললেন, 'না।'
ওমর বললেন, 'রহমত হল- আল্লাহর নূর প্রাপ্ত হয়ে তার আনুগত্যের সাথে আমল করা। তোমরা আল্লাহর রহমতের আশা রাখ। আল্লাহর নূর প্রাপ্ত হয়ে তার অবাধ্যতা ছেড়ে দাও। আল্লাহর আযাব ভয় কর।'
প্রকৃত নেয়ামত কী?
প্রকৃত নেয়ামত কী? রং-বেরংয়ের বাহারী পোষাক? দামি দামি গাড়ি-ঘোড়া? সুরম্য দালান-ভবন?
না। এসব প্রকৃত নেয়ামত নয়। প্রকৃষ্ট সুখ-সমৃদ্ধি এসব নয়। মানুষের আজ পার্থিব উপায়-উপকরণের অভাব নেই। অথচ তারা আল্লাহবিমুখ। মসজিদবিমুখ। কোরআন থেকে উদাসীন। রাসূলের রেসালাত সম্পর্কে উদাসীন। মানুষ আজ পাপাচারে লিপ্ত। ধর্ম ছেড়ে অধর্মে বিবর্তিত হচ্ছে মানুষ ও মানবসভ্যতা। পর্যটন কেন্দ্রে মহিলাদের বেহায়াপনা। সমুদ্রসৈকতে মহিলাদের উলঙ্গ মেলামেশা। উদ্বাহু উশৃঙ্খলা।
মানুষের প্রকৃত নেয়ামত- ঈমান। প্রকৃষ্ট নেয়ামত- ইসলাম। শ্রেষ্ঠ নেয়ামত- কোরআন। আল্লাহ বলেন-
আল্লাহ দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন একটি জনপদের, যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত। তথায় প্রত্যেক জায়গা থেকে আসত প্রচুর জীবনোপকরণ। অতঃপর তারা আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। তখন আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের কারণে স্বাদ আস্বাদন করালেন; ক্ষুধা ও ভীতির। [সূরা নাহল : ১১২]
ইবনে আব্বাস বলেন, উক্ত নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত জনপদ হল মক্কাবাসী। আল্লাহ তাদের জন্য পৃথিবীর প্রান্তসমূহ থেকে রিযিকের ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু তারা রাসূলের রিসালাত অস্বীকার করেছে। ফলে আল্লাহ তাদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন।
ইবনে আব্বাস সঠিক বলেছেন। আয়াতে উল্লিখিত জনপদ মক্কাবাসী। তদ্রূপ প্রত্যেক এমন জাতি, যারা আল্লাহর পথ ভুলে যায়। সে জাতি আমাদের যতই প্রিয় হোক, যতই অন্তরঙ্গ হোক, তারা অভিশপ্ত। যে জাতি আল্লাহর নেয়ামত ভুলে থাকে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু অমান্য করে, আল্লাহু আকবার তাকবীরের ছায়া থেকে সরে থাকে, তারা অভিশপ্ত। তাদের পাপাচার ও অবাধ্যতা প্রকাশ্য।
আল্লাহ বলেন-
যখন আমি কোন জনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন তার অবস্থাপন্ন লোকদের উদ্বুদ্ধ করি। অতঃপর তারা পাপাচারে মেতে উঠে।
তখন সে জনগোষ্ঠীর উপর আদেশ অবধারিত হয়ে যায়। অতঃপর আমি তাকে উঠিয়ে আছাড় দেই। [সূরা ইসরা : ১৬]
ব্যাখ্যাকারগণ বলেন, আল্লাহ তখন পুরুষ-মহিলাদের মধ্যে অবস্থাপন্ন লোক বাড়িয়ে দেন। তারা পাপাচারে মেতে উঠে। অধিকহারে অবাধ্যতা করে।
মহিলারা পর্দা ছাড়া ঘর থেকে বের হয়। চেহারার কমনীয়তা ছড়িয়ে ঘুরে ফেরে। কোরআন ছেড়ে দেয়। ধর্ম ভুলে যায়। লজ্জা ও শ্লীলতা থেকে বিস্মৃত থাকে। স্বামী অমান্য করে। ঘরের চিন্তা মাথা থেকে উড়ে যায়। বাহু দেখিয়ে, ঊরু দেখিয়ে সমুদ্র পাড়ে প্রমোদ করে।
প্রাচীন এক আরব ব্যক্তির ঘটনা। লোকটি ছিলেন অত্যন্ত আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন। তিনি দেখলেন, এক মহিলা পুরুষের দিকে তাকিয়ে আছে। আরব আশ্চর্য হয়ে বললেন, লাজুক মহিলারাও পুরুষের দিকে তাকায়! আল্লাহর কসম! তুমি আমার জন্য নও। তার একটি কবিতার অর্থ এমন-
পছন্দের খাবারেও যদি মাছি ওড়ে, আস্বাদের স্বাদ তবু উঠে যায়।
গোলাপজলও যদি কুকুরে শোঁকে, তা থেকে রুচি তবু উঠে যায়।
আশ্চর্য! এই লোক যদি বর্তমানের বাজার-হাট আর সমুদ্র সৈকত দেখতেন, তাহলে কী বলতেন!
পুরুষের পরিধানেও লজ্জাজনক, এ রকম শর্ট পোষাকের যুবতীদের দেখলে তিনি কী মন্তব্য করতেন!
আল্লাহ বলেন-
অনেক জনপদ তাদের পালনকর্তা ও তার রাসূলগণের আদেশ অমান্য করেছিল। অতঃপর আমি তাদেরকে কঠোর হিসাবে ধৃত করেছিলাম এবং তাদেরকে ভীষণ শাস্তি দিয়েছিলাম। [সূরা তালাক : ০৮]
উদাহরণত লেবাননের কথা বলা যায়। তাদের অনেক সুখ-শান্তি ছিল। ঘনপল্লবের ছায়াঘেরা বাগান, আর্দ্র আবহাওয়া, ফুল-ফলের সমারোহ, মৃদুমন্দ বাতাস, স্নিগ্ধ সকাল, সবই ছিল।
কিন্তু তারা আল্লাহ -র পথ থেকে বিচ্যুত হল। তাদের মসজিদে আযান কম হত। সৎ কাজে আদেশ আর অসৎ কাজে নিষেধ করার মত লোক ছিল না। অতঃপর তাদের অবস্থা এমন হয়েছিল-
বনী ইসরাঈলের মধ্যে যারা কাফের, তাদেরকে দাউদ ও মরিয়মতনয় ঈসার মুখে অভিসম্পাত করা হয়েছে। এটা এ কারণে যে তারা অবাধ্যতা করত এবং সীমা লঙ্ঘন করত। তারা পরস্পরকে মন্দ কাজে নিষেধ করত না, যা তারা করত। তারা যা করত তা অবশ্যই মন্দ ছিল। [সূরা মায়েদা: ৭৮, ৭৯]
আল্লাহ তাদের উপর রাগ হয়েছেন। আল্লাহ যার উপর রাগ হন, তার জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি অবধারিত-
আর তোমার পরওয়ারদেগার যখন কোন পাপপূর্ণ জনপদকে ধরেন, তখন এমনিভাবেই ধরে থাকেন। নিশ্চয় তার পাকড়াও খুবই মারাত্মক। বড়ই কঠোর। [সূরা হুদ : ১০২]
আল্লাহ লেবাননীদের উপর চাপিয়ে দিলেন যুদ্ধ। হত্যা, লুণ্ঠন, অপহরণ, ভয়, ক্ষুধায় তারা আক্রান্ত হল। পৃথিবীর দিকে দিকে তাদের চিৎকার ধ্বনিত হয়েছিল। ভয়াবহ ক্ষতের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছিল সর্বত্র, রক্ত গড়িয়েছিল সব জায়গায়।
আল্লাহ ইয়ামানবাসীকেও অফুরান নেয়ামত দিয়েছিলেন। কিন্তু তারাও সেই নেয়ামতকে কুফরিতে পরিণত করেছিল। আল্লাহ তাদের জন্য লাঞ্ছনা অবধারিত করে দিলেন। আল্লাহ বলেন-
সাবা-র অধিবাসীদের জন্য তাদের বাসভূমিতে ছিল এক নিদর্শন- দুটি উদ্যান, একটি ডানদিকে একটি বামদিকে। তোমরা তোমাদের পালনকর্তার রিযিক খাও এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। স্বাস্থ্যকর শহর এবং ক্ষমাশীল পালনকর্তা। অতঃপর তারা অবাধ্যতা করল। ফলে আমি তাদের উপর প্রেরণ করলাম প্রবল বন্যা। আর তাদের উদ্যানদুটি পরিবর্তন করে দিলাম এমন দুই উদ্যানে, যাতে উদগত হয় বিস্বাদ ফলমূল, ঝাউ গাছ এবং সামান্য কুলবৃক্ষ। এটা ছিল কুফরের কারণে তাদের প্রতি আমার শাস্তি। আমি অকৃতজ্ঞ ব্যতীত কাউকে শাস্তি দেই না। [সূরা সাবা: ১৫-১৭]
কবির ভাষায়-
মানুষের পার্থিব উন্নতি মূলত লোকসান। যে লাভে কোন কল্যাণ নেই, সেই লাভ অনর্থক। সে জাতি ক্ষতিগ্রস্ত, যে জাতির অস্তিত্বের নেই কোন স্থায়িত্ব।
ইবনে কাসির বলেন, আল্লাহ সাবা জনপদের প্রতিটি লোকের ঘরের পাশে দুটি বাগান দিয়েছিলেন। একটি ডান দিকে, আরেকটি বাম দিকে। প্রতিটি বাগানে গাছে গাছে ঝুলে থাকতো থোকায় থোকায় ফল। ছিল ছায়াময় শ্যামলিমা। সুপেয় কোমল পানি। পাখিদের কিচিরমিচির। সেকি অফুরান নেয়ামত! প্রাচুর্যপূর্ণ জীবন!
আমাদের অবস্থাও বর্তমানে এমনই। দালান-কোটা, গাড়ি-ঘোড়া, সুখ- স্বাচ্ছন্দ্য, অভিজাত খাবার-পানীয় সবই আছে। কিন্তু লোকজন ফ্যাসাদ করছে। ফ্যাসাদে কেউ বাধা দিলে তা-ও সহ্য করছে না। পাপাচার করছে, তার পাপাচার নিয়ে কেউ মুখ খুললে তা-ও পছন্দ করছে না। অশ্লীলতা করছে। দীনী বিষয়ে ধোঁকাবাজি করছে। অন্যায় প্রতিষ্ঠা করছে। সৎ লোকদের বিরোধিতা করছে। রাসূলের রিসালাত নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করছে। মসজিদের সাধারণ কর্মকাণ্ডে বাধা প্রদান করছে। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ এর বন্ধন ছিন্ন করছে।
ইবনে কাসির সাবা জনপদের নেয়ামতের বর্ণনা দিয়ে বলেন, খালি ঝুড়ি মাথায় নিয়ে কেউ সাবা জনপদের বাগান এপাড়-ওপাড় অতিক্রম করলে গাছ থেকে ফল পড়ে তার ঝুড়ি পূর্ণ হয়ে যেত।
কিন্তু তারা এ নেয়ামতের যথামূল্যায়ন করেনি। তারা অকৃতজ্ঞ হয়েছে। কৃতঘ্ন হয়ে প্রকাশ্য গোনাহে লিপ্ত হয়েছে। মসজিদগুলো বিরাণ করে আল্লাহ -র সাথে প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। সালাত ভুলে গিয়েছে। আল্লাহ -কে সেজদা করার কথা বেমালুম ভুলে গেছে। দিনরাত আমোদ-প্রমোদ করে কাটিয়েছে।
কবির ভাষায়-
কবে দিবে হেদায়াত তব মন তোমাকে সৎ কাজ দেখাবে তব মন্দ তোমাকে।
এই কৃতঘ্ন অধিবাসীর অনিষ্ট যদি তাদের কাছেই শুধু পৌঁছুত, আমাদের কাছে না পৌঁছুত, তবে তো কথা ছিল। কিন্তু খারাপ কাজের অনিষ্ট, কুপ্রভাব এবং অশুভ পরিণতি ব্যাপক ও সামগ্রিক হয়ে থাকে। আর ভালো কাজের পরিণতি হয়ে থাকে নির্দিষ্ট। আমরা যদি তাদের নিষেধ না করি, খারাপ কাজ থেকে নিবৃত করার চেষ্টা না করি, ভালো কাজের আদেশ না করি, আল্লাহ আমাদের উপরও গোস্বা হবেন। আমাদেরও শাস্তি দিবেন।
আল্লাহ সাবার জনপদের সাথে কী করেছেন! তাদের শাস্তি দেয়ার জন্য কোন বাহিনী প্রেরণ করেছেন? ফেরেসতা পাঠিয়েছেন?
না। আল্লাহ তাদের ধ্বংস করার জন্য এমন কিছুই করেননি। তাদের ধ্বংস করার জন্য বাহিনী বা ফেরেসতা পাঠাবেনই বা কেন? তারা তো এগুলোর মোকাবিলার উপযুক্ত নয়। বরং এরও চেয়ে নিকৃষ্ট! আল্লাহ নমরূদকে ধ্বংস করেছেন ছোট্ট একটি মশা দ্বারা। কারণ সে মশা দ্বারাই ধ্বংস হওয়ার উপযুক্ত-
আর মাছি যদি তাদের কাছ থেকে কোনকিছু ছিনিয়ে নেয়, তবে তারা তার কাছ থেকে তা উদ্ধার করতে পারবে না। প্রার্থনাকারী ও যার কাছে প্রার্থনা করা হয়, উভয়েই শক্তিহীন। [সূরা হাজ্জ : ৭৩]
আল্লাহ সাবার জনপদ ধ্বংস করার জন্য একটি ইঁদুর পাঠালেন। ইঁদুরটি বাগানের বাঁধের গোড়া দুর্বল করে দিল। বাঁধ ভেঙ্গে বাগানে পানি গড়াল। সবকিছু ডুবে গেল প্লাবনের মত। সাবার জনপদ বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল। শিশু, বৃদ্ধ, মহিলা, সকলে কাঁদতে লাগল। কিন্তু এখানেই তাদের পরিসমাপ্তি!
যুগে যুগে যে কেউ আল্লাহ-র পথ থেকে বিচ্যুত হলে, রাসূলের পথের উপর অভিযোগ করলে, তাদের অবস্থা এমনই হবে। অবাধ্যতা যত বেশি করবে, আল্লাহ অবাধ্যের নীচতা প্রকাশ করার জন্য তাকে ততই নিকৃষ্ট বস্তুর মাধ্যমে ধ্বংস করবেন।
আল্লাহ-র অসংখ্য নেয়ামতের সংরক্ষণ কেবল কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যমেই সম্ভব। আল্লাহ বলেন-
যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, তবে তোমাদের আরও দিবো এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর। [সূরা ইবরাহিম : ০৭]
আব্বাসি খেলাফতযুগের একটি ঘটনা। সে যুগে একটি জাতি ছিল বারামেকি। আল্লাহ তাদেরকে নেয়ামত ঢেলে দিয়েছিলেন। এমনকি তাদের ভবনের পলেস্তরায় ছিল স্বর্ণধোয়া প্রলেপ।
কিন্তু তারা আল্লাহ -কে স্মরণ রাখেনি। আল্লাহ-কে ভয় করেনি। তারা আল্লাহ -র বিধান লঙ্ঘন করেছে। তাদের ভবনে চলতো গানবাজনা, মদ্যপান, মাস্তি, আরো কত কি!
এক আলেম তাদেরকে সতর্ক করলেন। বললেন, আল্লাহ -র নেয়ামতের ব্যাপারে সতর্ক হও। জেনে রাখ, কৃতজ্ঞতা না থাকলে নেয়ামত কোন কাজে আসবে না।
কবির ভাষায়-
থাকতে ফসল করো যতন, পাপে খায় সব পুণ্যরে।
প্রভুর ভয়ের ভূষণ ধর, শোধ নিবেন এক পলকে।
বারামেকি জাতি আল্লাহ -র কৃতজ্ঞতা পোষণ করেনি। আল্লাহ -র রাগ এল তাদের উপর। আল্লাহ তাদের প্রিয়পাত্র বাদশাহ হারুনুর রশিদের হাতেই শাস্তি রচনা করলেন। একদিন সকালে ক্রোধের সূর্যাগ্নি নিয়ে তাদের সামনে তেজিয়ে দাঁড়ালেন হারুনুর রশিদ।
আল্লাহ তাদের প্রিয়পাত্র বাদশাহ হারুনুর রশিদের হাতেই তাদের শাস্তি রচনা করলেন। বারামেকিদের সবচেয়ে প্রিয় ও বন্ধুভাবাপন্ন বাদশাহ হারুনুর রশিদ একদিন সকালে ক্রোধের সূর্যাগ্নি নিয়ে তাদের সামনে তেজিয়ে দাঁড়ালেন। তলোয়ারের সূর্যতেজ আঘাতে যুবকদের হত্যা করলেন।
বারামেক গোত্রের জনৈক ব্যক্তি ইয়াহইয়া ইবনে খালেদ বারামেকি। সাত বছর তিনি কারাগারে ধুকে ধুঁকে কেঁদেছিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, 'কী অপরাধে তোমাদের এ করুণ পরিণতি?'
ইয়াহইয়া ইবনে খালেদ বললেন, 'আমরা আল্লাহ -র অবাধ্য হয়েছি। মজলুমের আর্তনাদ রাতের আঁধারকে গাঢ় করে তুলেছে। আমরা উদাসীন ছিলাম, কিন্তু আল্লাহ উদাসীন হননি।'
মজলুমের আর্তনাদ বড় ভয়াবহ। নেককারদের আর্তনাদ বড় ভয়াবহ।
আলি ইবনে আবি তালিব -কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, 'আল্লাহর আরশ এবং যমিনের মাঝে দূরত্ব কতটুকু?'
তিনি উত্তর করেছিলেন, 'আরশ এবং যমিনের মাঝে দূরত্ব শুধু আল্লাহর কাছে মাকবুল দোয়া। আল্লাহ তা মেঘের উপর উঠিয়ে নেন। আল্লাহ বলেন,
আমার ইযযতের কসম! আমার মহত্ত্বের কসম! আমি কিছু সময় পরেও তোমার সাহায্য করবো। [আহমাদ : ৭৯৮৩]
শোকর বা কৃতজ্ঞতা কী?
আল্লাহ বলেন-
যে কৃতজ্ঞ হয়, সে তো কেবল নিজ কল্যাণের জন্যই কৃতজ্ঞ হয়। [সূরা লোকমান : ১২]
আর যারা কৃতজ্ঞ, তাদের আমি প্রতিদান দিবো। [আলে ইমরান : ১৪৫]
জনৈক বুযুর্গকে শোকরের সংজ্ঞা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, চোখের শোকর আল্লাহ -র ভয়ে ক্রন্দন করা। মানুষ কোরআন তেলাওয়াত শুনে কান্না করে না। আল্লাহ -র স্মরণে কান্না করে না। অথচ আনন্দ-বিনোদনে কান্না করে। গান শুনে কান্না করে। এই কান্নায় চোখের শোকর আদায় হবে না।
আবু বকর এবং ওমর কোরআন তেলাওয়াত শুনলে চোখের পানিতে তাদের দাড়ি ভিজে যেত।
চোখের শোকর আল্লাহ -র ভয়ে কান্না করা। অন্তরের শোকর আল্লাহ -কে লজ্জা করা। যার অন্তর আল্লাহ -র জন্য প্রস্তুত, দুনিয়া-আখেরাতে সে সফল।
রাসূল বলেন- 'লজ্জা মানুষের কল্যাণই বহন করে।' [বুখারি : ৬১১৭]
শাফেঈ বলেন, আল্লাহর কসম! যদি জানতাম, আমার লজ্জার চেয়ে পানি পান কম হয়, তাহলে মানুষের সামনে কখনও পানি পান করতাম না।
কতই না চমৎকার বলেছেন শাফেঈ। আল্লাহ-ই তাকে এমন বুঝ দান করেছেন। আজ এমন এক প্রজন্ম তৈরি হয়েছে, যারা ইসলাম থেকে নির্লজ্জভাবে বিমুখ রয়েছে। মসজিদ থেকে নির্লজ্জের মত পিছপা হয়েছে। ইসলামকে কাঁটছাট করে, আল্লাহকে অস্বীকার করে, রাসূলকে গালমন্দ করে, কোরআন বেমালুম ছেড়ে দিয়ে চরম লজ্জাহীনতার পরিচয় বহন করে।
অন্ধকারের পরিণতি ভয় কর না যদি, তবে করতে পার- যা মন চাহে, তা।
লজ্জা-শরম হারিয়ে শেষে ভোগ-বিলাশে
কল্যাণাশা! -কী আর পাবে তা!
লজ্জা মানুষের ভূষণ। মানুষের পর্দা ও আড়ড়। আল্লাহ মানুষকে লজ্জা দিয়েছেন, যেন পাপ কাজের বাসনা জাগলে আল্লাহ-কে লজ্জা করে। লজ্জা দিয়ে সেই পাপের মনস্তাপ ঢেকে রাখে।
শয়তান মানুষকে নিষিদ্ধ বস্তু দেখিয়ে বলবে, 'এটা দেখ।' তখন লজ্জা বলবে, 'না। ওটা দেখবে না।'
শয়তান নিষিদ্ধ কিছু শুনিয়ে প্রণোদনা দিবে, 'এটা শোন।' লজ্জা তাকে বলবে, 'না। ওটা শুনবে না।'
শয়তান নিষিদ্ধ রাস্তার পথ দেখিয়ে বলবে, 'চল ওদিকে।' লজ্জা তাকে বলবে, 'না। ওদিকে চলবে না।'
আল্লাহ বলেন- তুমি কি তাদের দেখনি, যারা আল্লাহর নেয়ামতকে কুফরে পরিণত করেছে এবং স্বজাতিকে সম্মুখীন করেছে ধ্বংসের আলয়ে। [সূরা ইবরাহিম : ২৮]
নেয়ামত দুই প্রকার।
এক. আল্লাহ -এর নিকটভাজনদের জন্য।
দুই. মুসলমান-কাফের সকলের জন্য। মানুষ-জীবজন্তু সবকিছুর জন্য।
দ্বিতীয় প্রকার নেয়ামতের উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন-
আপনি ছেড়ে দিন তাদের, খেয়ে নিক এবং ভোগ করে নিক এবং আশায় ব্যাপৃত থাকুক। অতিসত্বর তারা জেনে নিবে। [সূরা হিজর : ০৩]
উক্ত আয়াতে আল্লাহ সবার জন্য খাদ্য-পানীয় এবং অন্যান্য নেয়ামতের কথা বলেছেন। তাদের ব্যাপারেই আল্লাহ বলেছেন-
আপনি কি মনে করেন যে তাদের অধিকাংশ শোনে অথবা বোঝে! তারা তো চতুষ্পদ জন্তুর মত বরং আরও পথভ্রান্ত। [সূরা ফুরকান: ৪৪]
তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত! তাদের পানাহার চতুষ্পদ জন্তুর মত। তাদের উঠাবসা, চলাফেরাও চতুষ্পদ জন্তুর মত। অপর এক আয়াতে আল্লাহ তাদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেন- আল্লাহ তাদের ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়েছেন। কিন্তু তারা এসব ভালো কাজে ব্যয় করেনি।
আর আমি সৃষ্টি করেছি দোযখের জন্য বহু জ্বিন ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে, তার দ্বারা বিবেচনা করে না। তাদের চোখ রয়েছে, তার দ্বারা দেখে না। আর তাদের কান রয়েছে, তার দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত। বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই হল গাফেল, শৈথিল্যপরায়ণ। [সূরা আরাফ : ১৭৯]
মানুষের চোখ না থাকলেই কি সে অন্ধ? যাদের চোখ আছে, তবু তারা দেখে না, তারাই অন্ধ। যাদের চর্মচক্ষু আছে, কিন্তু অন্তঃচোখ নেই, তারাই প্রকৃত অন্ধ-
বস্তুতঃ চোখ তো অন্ধ হয় না, কিন্তু বক্ষস্থিত অন্তরই অন্ধ হয়। [সূরা হাজ্জ : ৪৬]
যে ব্যক্তি জানে যে যা কিছু পালনকর্তার পক্ষ থেকে আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে তা সত্য, সে কি ঐ ব্যক্তির সমান যে অন্ধ? তারাই বোঝে যারা বোধশক্তিসম্পন্ন। [সূরা রাদ : ১৯]
যে ব্যক্তি জানে, দোকান-পাট থেকে মসজিদ উত্তম, অশ্লীল পত্র-পত্রিকার চেয়ে কোরআন উত্তম, গান-বাজনার চেয়ে তেলাওয়াত উত্তম, অসৎ সঙ্গ থেকে সৎ সঙ্গ উত্তম, সে ব্যক্তি কি ঐ ব্যক্তির সমান, যে তার মাথা খেয়ে পশ্চাদগামী হয়েছে! আল্লাহ -এর আনুগত্য থেকে বিমুখ হয়েছে! যে নিজেই শয়তান হয়েছে-
আমার পদোন্নতি হয়েছে শয়তানের দলে।
এখন শয়তান ভিড়েছে আমার দলে!
মানুষ প্রথমে শয়তানের অনুসরণ করে। শয়তান তাকে কাছে ভেড়ায়। ধীরে ধীরে তার অবস্থা আরও করুণ হয়। শয়তানের দলে তার অবস্থান উন্নত হয়। তখন সে নিজেই এমন শয়তান হয়ে যায়, যের শয়তান তার দ্বারা পরিচালিত হয়। সে হয়ে যায় বিতাড়িত শয়তান।
যখন সে নিজেই বিতাড়িত শয়তান হয়ে যায়, তখন তার অনিষ্ট অন্যদের আক্রান্ত করে। তার কুপ্রভাবে আরও মানুষ প্রভাবিত হয়। ফেতনায় জড়িয়ে পড়ে। নিজে ধ্বংস হয়। পরিবার ধ্বংস করে। ভাই-বন্ধুদের ধ্বংস করে। পরিবেশ ও সমাজ ধ্বংস করে। সে যেখানেই যায়, সেখানেই ফেতনা ছড়াতে থাকে।
বিপরীতে এমন মানুষ আছেন, যারা নিজে সৎ। তাদের সংশ্রবে অন্যরাও সৎপথে আসে। সৎলোক যেখানে যান, সেখানে বরকত ছড়ায়। সেখানের পরিবেশ সংশোধিত হয়। আল্লাহ এমন এক নবির কথা উল্লেখ করে বলেন-
আমি যেখানেই থাকি, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। [সূরা মারইয়াম : ৩১]
এই নবি যেখানেই আগমন করতেন, সেখানেই বরকত প্রকাশ পেত।
মুতানাব্বি বলেন-
যেথা আগমন করে কোন অভিজাত কিবা কোন সম্মানী সেথা সজীব হয় সোনালী শ্যামল ঝরে নির্ঝর প্রবাহিণী।
কোন সম্মানী ব্যক্তির আগমনে একটি মজলিস জান্নাতের বাগানে পরিণত হয়।
অভিজাত ব্যক্তির সাথে সফর করাও একটি সৌভাগ্য। তার সান্নিধ্যে জীবন সুরভিত হয়। তিনি বিদায় গ্রহণ করে দোয়া করতে থাকেন। তার থেকে কেউ বিদায় গ্রহণ করে তার জন্য কান্না করতে থাকে।
বিপরীতে কোন মন্দ ব্যক্তির সংশ্রব অকল্যাণ বয়ে আনে। তার সাথে ভর করে শয়তানের আগমন ঘটে। গোনাহর পরিবেশ তৈরি হয়। আল্লাহ -র গজব নাযিল হয়।
জাফর সাদিক বলেন, তিন ব্যক্তির সংশ্রব কখনও গ্রহণ করবে না। তাদের উপর আল্লাহ -র গযব অবধারিত।
এক. আল্লাহ -র অবাধ্যের সংশ্রব গ্রহণ করো না। সে আল্লাহর সাথে বন্ধন ছিন্ন করেছে।
দুই. যে বাবা-মাকে কষ্ট দেয়, তার সাথে মিশবে না। সে অভিশপ্ত।
তিন. মিথ্যুকের সাথে উঠাবসা করবে না। সে তোমার দূরের লোকদের কাছে আনবে। কিন্তু কাছের লোকদের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি করবে।
আল্লাহ মানুষকে দু'ধরণের নেয়ামত দান করেছেন।
এক. মুসলমান-কাফের সকলের জন্য।
দুই. শুধু মুসলমানদের জন্য।
মুসলমানদের জন্য বিশেষ নেয়ামত হল ইসলাম, কোরআন, হেদায়াত। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-
আল্লাহ পছন্দের বান্দা, অপছন্দের বান্দা সকলকে দুনিয়া দান করেন। কিন্তু দীনী বিষয়ে পছন্দের বান্দাদেরই উৎকর্ষ দান করেন। [আহমাদ : ৩৬৬৩]
আল্লাহ যার মঙ্গল চান, তাকে দীনের বুঝ দান করেন। [বুখারি: ৭১]
মুসলমানদের বিশেষ নেয়ামত লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। সাফা পর্বত থেকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ -এর নিশান উত্তোলিত হয়েছিল। জনৈক আলেম কত সুন্দর করে বলেছেন-
সাফা পর্বত থেকে মুয়াযযিন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন। মানুষের অন্তর জয় করার আযান দিয়েছেন। তখন সকলেরই সফলতা অর্জনের সুযোগ ছিল। কিন্তু আবু জাহল বলল, আমি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অস্বীকার করলাম।
আবু লাহাব বলল, আমি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অস্বীকার করলাম।
অপর দিকে সালমান ফারসি পারস্যে বসেই বললেন, 'লাব্বাইক! হে আল্লাহ, আমি হাজির!'
বিলাল হাবশা থেকে তাকবির দিলেন- 'আল্লাহু আকবার!' রাসূল বিলালকে বললেন-
বিলাল! সালাত কায়েম কর। সালাতের মাধ্যমে আমাদের প্রশান্তি দাও। [আহমাদ: ২২৫৭৮]
সুহাইব রাসূলের কাছে উপস্থিত হলেন। আল্লাহর জন্য নিজের জান বাজি রাখলেন।
আর মানুষের মাঝে এক শ্রেণীর লোক রয়েছে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিকল্পে নিজেদের জানের বাজি রাখে। [সূরা বাকারা: ২০৭]
কায়স ইবনে হাযেম খলিফা সুলাইমান ইবনে আব্দুল মালেকের কাছে উপস্থিত হলেন। খলিফা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আমরা দুনিয়া ভালোবাসি, আখেরাত অপছন্দ করি, এর কারণ কী?'
কায়স বললেন, 'কারণ, তোমরা দুনিয়ার জীবন সাজিয়েছ, আখেরাতকে উজাড় করেছ। এখন তোমরা দীর্ঘ সুসজ্জিত জীবন ছেড়ে উজাড় করা জায়গায় যেতে অপছন্দ করছ।'
হ্যাঁ, তাইতো! অনেকে দুনিয়াকে সজ্জিত করে, আখেরাত বরবাদ করে। আর অনেকে দুনিয়াতে কিছুরই মালিক হয়নি, কিন্তু আল্লাহ -র সাথে ঈমানে-সততায় দুনিয়ার ধনী হয়েছে।
সালিম ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর । তিনি ছিলেন প্রখ্যাত আলেম। শীর্ষ সাত ফকীহর (ইসলামী আইনবিদ) একজন। একবার তিনি বাইতুল্লাহর হেরেমে অবস্থান করছিলেন। হিশাম ইবনে আব্দুল মালিক সেখানে উপস্থিত হলেন। তার মন্ত্রী-আমলারাও সাথে ছিলেন। সালিম তখন হাতে জুতা বহন করছিলেন। তার জুতা, পাগড়ী, এবং পরিধেয় কাপড়ের মূল্য ছিল তের দিরহাম। হিশাম তাকে বললেন, 'আমার কাছে তোমার কোন কিছুর প্রয়োজন আছে কি?'
সালিম উত্তর দিলেন, 'বাইতুল্লাহর ভিতর তোমার এ কথা বলতে লজ্জা হয়নি!'
হিশাম তার উত্তর শুনে ভড়কে গেলেন। বাইতুল্লাহ থেকে বের হয়ে সালিমের অপেক্ষা করতে থাকলেন। সালিম বের হলে আবার তাকে বললেন, 'তখন আমরা হেরেমের ভিতর ছিলাম। এখন বের হয়েছি। আমার কাছে তোমার কোন কিছুর প্রয়োজন আছে কি?'
সালিম বললেন, 'দুনিয়ার প্রয়োজনের কথা বলছ, নাকি আখেরাতের প্রয়োজনের কথা বলছ!'
হিশাম বললেন, 'দুনিয়ার প্রয়োজনের কথা বলছি।'
সালিম বললেন, 'আল্লাহর কসম! তুমি তো দুনিয়ার মালিক নও, একজন ফকীর! যিনি দুনিয়ার মালিক, তার কাছেই চাইনি। এখন তোমার কাছে চাইবো!'
ভাবার বিষয়- মানুষ কয়েক মিলিয়ন টাকার মালিক হয়ে, দালান-কোঠা, বাগ- বাগিচার মালিক হয়ে নিজেকে দুনিয়ার বাদশাহ মনে করে। অথচ সে জানেও না- যে ঈমানের দৌলত রাখে, তার জন্য প্রাচুর্য ও ঐশ্বর্য হল অন্তরের ভিতর! তোমরা দুনিয়া ধর আর ছেড়ে দাও, আমার অন্তর বড় অদ্ভুত, উন্ন, প্রফুল্লা! আমিই প্রাচুর্যশীল সবচে, আমায় বন্ধু বানাও, কর লুণ্ঠন...
ওয়ালীদ ইবনে মুগিরা। তার অঢেল স্বর্ণ-রূপার খনি ছিল। কুড়াল দিয়ে স্বর্ণ ভাঙ্গত সে। দুই বছর অন্তর কাবা শরিফকে স্বর্ণমণ্ডিত করত। তার দশ ছেলে ছিল। সে রেশমের জুতা পরে হাঁটত।
এত নেয়ামত পেয়ে সে আল্লাহকে অস্বীকার করেছে। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর দাওয়াত অস্বীকার করেছে। আল্লাহ্-র নেয়ামতকে কুফরে পরিণত করেছে। আল্লাহ তার ব্যাপারে বলেন-
যাকে আমি অনন্য করে সৃষ্টি করেছি, তাকে আমার হাতে ছেড়ে দিন। আমি তাকে বিপুল ধনসম্পদ দিয়েছি। এবং সদা সঙ্গী পুত্রবর্গ দিয়েছি। তাকে খুব স্বচ্ছলতা দিয়েছি। এরপরও সে আশা করে যে, আমি তাকে আরও বেশি দেই। কখনই নয়, সে আমার নিদর্শনসমূহের বিরুদ্ধাচরণকারী। [সূরা মুদ্দাসসির: ১১-১৬]
আল্লাহ তাকে নিকৃষ্টতম মৃত্যু দিয়েছেন। তার ধনসম্পদ, প্রাচুর্য কোন কিছুই কাজে আসেনি। কারণ সে আল্লাহ -র অবাধ্যতা করেছে। তার নেয়ামতের অকৃতজ্ঞতা করেছে।
সাহাবায়ে কেরام যখন জাযিরা থেকে বের হন, তখন তাদের সাথে পরিধানের কাপড় এবং অস্ত্র ছাড়া আর কিছু ছিল না। তারা এ অবস্থায় চকচকে স্বর্ণময় কিসরা-কায়সারে প্রবেশ করেছিল। সাদ কিসরার স্বর্ণভবন দেখে আশ্চর্য হয়ে বলে উঠলেন- 'আল্লাহু আকবার!' তখন তার চোখ থেকে অশ্রু গড়াচ্ছিল। তিনি তেলাওয়াত করলেন-
তারা ছেড়ে গিয়েছিল কত উদ্যান ও প্রস্রবন, কত শস্যক্ষেত্র ও সুরম্য স্থান, কত সুখের উপকরণ, যাতে তারা খোশগল্প করত, এমনিই হয়েছিল এবং আমি ওগুলোর মালিক করেছিলাম ভিন্ন সম্প্রদায়কে। তাদের জন্য ক্রন্দন করেনি আকাশ ও পৃথিবী এবং তারা অবকাশও পায়নি। [সূরা দুখান : ২৫-২৯]
কুতাইবা বিন মুসলিম প্রাচ্য জয় করে বিপুল পরিমাণ গনিমত লাভ করেছিলেন। তিনি মন্ত্রীদের তা দেখিয়ে বললেন, 'তোমরা কি এমন একজন মানুষ দেখবে, যার কাছে আমি এসব অর্পণ করলে সে এসব ফিরিয়ে দিবে!'
মন্ত্রীরা বলল, 'এতসব সম্পদ থেকে বিমুখ থাকার মতো কেউ আছেন বলে আমাদের মনে হয় না।
কুতাইবা ছিলেন অত্যন্ত সৎ নিষ্ঠ সমর্পিত একজন ধার্মিক। তিনি বললেন, 'তোমাদের আমি উম্মতে মোহাম্মদি থেকে এমন একজন লোক দেখাবো, যার কাছে স্বর্ণ মাটির মতো।'
এ কথা বলে তিনি মোহাম্মদ বিন ওয়াসি আযদিকে উপস্থিত করার আদেশ দিলেন।
মোহাম্মদ বিন ওয়াসি একজন আলেম ও আবেদ ছিলেন। কুতাইবা একদিন তাকে বাহিনীর জন্য দোয়া করতে দেখে বলেছিলেন, 'এক আল্লাহর কসম! মোহাম্মদ বিন ওয়াসির দোয়ায় উত্তলিত হাতের আঙ্গুল আমার কাছে এক হাজার ধারালো তলোয়ার এবং তাগড়া যুবকের চেয়ে উত্তম!'
কুতাইবা বেশ কিছু স্বর্ণসহ মন্ত্রীদের পাঠালেন মোহাম্মদ বিন ওয়াসির কাছে। মন্ত্রীরা এসে সংবাদ দিল, মোহাম্মদ বিন ওয়াসি স্বর্ণগুলো গ্রহণ করেছেন।
চিন্তায় পড়ে গেলেন কুতাইবা। বললেন, 'আল্লাহ যা করেন। ঘটনা এমন হওয়ার কথা নয়। হে আল্লাহ! আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত করো না।'
তখন একজন ভিক্ষুক মোহাম্মদ বিন ওয়াসির কাছ দিয়ে ভিক্ষা করে যাচ্ছিল। মোহাম্মদ বিন ওয়াসি সবগুলো স্বর্ণ সেই ভিক্ষুককে দিয়ে দিলেন।
কুতাইবা এই কথা শুনে বললেন, 'আমি কি তোমাদের বলিনি, উম্মতে মোহাম্মদিতে এমন একজন লোক আছেন, যার কাছে স্বর্ণ মাটিতুল্য!'
মানুষ দীনকে দুনিয়ার উপর প্রাধান্য দিলে আল্লাহ তার কাছে দুনিয়াকে ছোট করে উপস্থিত করেন। আর যারা দুনিয়াকে দীনের উপর প্রাধান্য দেয়, তাদের দীন ধ্বংস হয়ে যায়।
আল্লাহ বলেন-
তুমি কি তাদের দেখনি, যারা আল্লাহর নেয়ামতকে কুফরে পরিণত করেছে এবং স্বজাতিকে সম্মুখীন করেছে ধ্বংসের আলয়ে। [সূরা ইবরাহীম : ২৮]
যা মানুষকে আল্লাহ -র আনুগত্যের সহযোগিতা করে, মানুষের জন্য জান্নাতের রাস্তা সুগম করে, সৌভাগ্যের অধিকারী বানায়, তা-ই নেয়ামত।
রাসূল সাহাবিদের ধন-সম্পদ দিয়েছেন। ধন-সম্পদ দিয়ে অন্তরসমূহ একত্রিত করেছেন।
হোনাইনের যুদ্ধে আল্লাহ রাসূলকে বিজয় দান করেছেন। রাসূল সেখানে প্রচুর গনিমত পেয়েছিলেন। আরবের বিভিন্ন গোত্রের নতুন ইসলাম গ্রহণকারীদের মাঝে সেসব গনিমত বণ্টন করেছেন, যারা আনসারদের মত।
কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। কিন্তু আনসারদের জন্য গনিমতের কোন অংশ রাখেনি, অথচ আনসাররা রাসূলকে বদর-উহুদে সাহায্য করেছিল।
আনসাররা এতে একটু মনোক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন। মূলত এটি ছিল মানবিক দুর্বলতা। আনসাররা বলাবলি করছিলেন, 'আল্লাহ তার রাসূলকে হেফাযত করুন। তিনি সবাইকে গনিমত দিলেও আমাদের দেননি। অথচ আমরা তাকে সাহায্য করেছি। আশ্রয় দিয়েছি। সমর্থন ও প্রতিরক্ষা দিয়েছি।'
আনসারদের এসব মন্তব্য চারদিকে চর্চা হল এবং একে একে তা রাসূলের কানেও পৌঁছল। রাসূল আনসারদের সর্দার সাদ বিন ওবাদা-কে ডেকে পাঠালেন। সাদকে বললেন, 'তোমাদের এ কেমন মন্তব্য শুনলাম!'
সাদ বললেন, 'যা শুনেছেন, তা-ই। আমাদের কতক যুবক এমন কথা বলেছে।'
রাসূল বললেন, 'তোমার কওমকে আমার কাছে একত্রিত কর।'
সাদ সকলকে একত্র করলেন। রাসূল তাদের উদ্দেশে বললেন, 'হে আনসাররা! তোমাদের এ কেমন মন্তব্য আমার কাছে পৌঁছল!'
আনসাররা বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! যা শুনেছেন, তা-ই।'
রাসূল বললেন, 'আমি যখন তোমাদের কাছে এসেছি, তখন তোমরা বিক্ষিপ্ত ছিলে। অতঃপর আল্লাহ কি আমার দ্বারা তোমাদের সুসংহত করেননি!'
আনসাররা বলল, 'সব আল্লাহ ও তার রাসূলের অনুগ্রহে।'
রাসূল বললেন, 'আমি তোমাদের কাছে এসেছি, তোমরা দরিদ্র ছিলে। আল্লাহ আমার দ্বারা তোমাদের বিত্তশালী বানাননি?'
আনসাররা বলল, 'সব আল্লাহ ও তার রাসূলের অনুগ্রহে।'
রাসূল তার আওয়ায উঁচু করে বললেন, 'আনসাররা! যার হাতে আমার জান, তার কসম করে বলছি! তোমরা চাইলে বলতে পারতে এবং সত্যই বলতে- আপনি আমাদের কাছে বিতাড়িত হয়ে এসেছেন, আমরা আপনাকে আশ্রয় দিয়েছি। আপনি রিক্তহস্তে এসেছেন, আমরা সহমর্মিতা করেছি। আপনি নিঃস্ব হয়ে এসেছেন, আমরা সাহায্য করেছি।'
আনসাররা বলল, 'সব আল্লাহ ও তার রাসূলের অনুগ্রহে।'
রাসূল আবার উঁচু আওয়াযে বললেন, 'আনসাররা! সবাই ছাগল আর উট নিয়ে ঘরে ফিরবে, তোমরা আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে ঘরে ফিরবে, এতে তোমরা সন্তুষ্ট নও! আল্লাহর কসম! মানুষ যা নিয়ে ঘরে ফিরছে, তার তুলনায় তোমরা যা নিয়ে ঘরে ফিরছ, তাই উত্তম। আল্লাহ আনসারদের ক্ষমা করুন। আনসারদের সন্তানদের ক্ষমা করুন। সবার সাথে আমার স্বাভাবিক সুসম্পর্ক, আনসারদের সাথে অত্যধিক অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। সবাই যদি একটি জাতি বা উপত্যকা গ্রহণ করে, আমি আনসারদের গ্রহণ করবো।' [বুখারি: ২৩৭৭]
রাসূলের এ বক্তব্যে আনসারদের অশ্রুঝরা প্রতিক্রিয়া হল। কান্নাবিগলিত হয়ে তাদের দাড়ি পর্যন্ত ভিজে গেল।
রাসূল উক্ত বক্তব্যের মাধ্যমে তাদের কাছে এ কথা স্পষ্ট করেছেন- আল্লাহ তাঁর পছন্দের পাত্র, অপছন্দের পাত্র, সবাইকে দুনিয়ার প্রাচুর্য দান করেন। কিন্তু দীনের প্রাচুর্য যাকে ভালোবাসেন, তাকেই দান করেন।
আমর ইবনে তাগলিব থেকে বর্ণিত, একবার রাসূল এর কাছে কিছু মাল বা কিছু সংখ্যক যুদ্ধবন্দী উপস্থিত করা হল। তিনি তা বণ্টন করে দিলেন। বণ্টনের সময় কিছু লোককে দিলেন এবং কিছু লোককে বাদ দিলেন।
রাসূলের কাছে সংবাদ পৌঁছল- যাদের তিনি দেননি, তারা অসন্তুষ্ট হয়েছে। তখন রাসূল আল্লাহর প্রশংসা ও তার মহিমা বর্ণনা করে বললেন, 'আম্মা বাদ! আল্লাহর শপথ! আমি কোন লোককে দেই আর কোন লোককে দেই না। যাকে আমি দেই না, সে যাকে আমি দেই, তার চাইতে আমার কাছে অধিক প্রিয়। তবে আমি এমন লোকদের দেই, যাদের অন্তরে অধৈর্য ও মালের প্রতি লিপ্সা দেখতে পাই। আর কিছু লোককে আল্লাহ যাদের অন্তরে অমুখাপেক্ষিতা এবং কল্যাণ রেখেছেন, তাদের সে অবস্থার উপর ন্যস্ত করি। তাদের মধ্যে আমর ইবনে তাগলিব একজন।'
বর্ণনাকারী আমর ইবনে তাগলিব বলেন, 'আল্লাহর শপথ! রাসুলের এ বাণীর পরিবর্তে আমি দুনিয়া এবং দুনিয়াতে যা কিছু আছে পছন্দ করি না।' [বুখারি: ৯২৩]
মুসলিম যুবক! আল্লাহর সাথে তোমার অঙ্গিকার ভঙ্গ করছ। আল্লাহর সাথে সম্পর্কের সুতা কর্তন করছ। এটাই কি তোমার যৌবনের প্রতিদান? শরীর-স্বাস্থ্য, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুস্থ রাখার প্রতিদান?
মুসলিম যুবতী! আল্লাহ তোমাকে সৌন্দর্য দিয়েছেন। কোমল করেছেন। বস্ত্রাবৃত করেছেন। তোমাকে প্রতিপালন করেছেন। পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। তোমাকে নানা ধরনের নেয়ামত দিয়েছেন। এরপরও তুমি আল্লাহ -এর পথ ছেড়ে শয়তানের পথ ধরছ! শয়তানের পথে গিয়ে মানুষকে ফেতনায় নিপতীত করছ!
এটাই তোমাদের নেয়ামতের প্রতিদান?
নেয়ামতের প্রকারসমূহ
এক.
প্রকাশ্য নেয়ামত। ধন-সম্পদ মানুষের প্রকাশ্য নেয়ামত।
ধন-সম্পদ কখনো মানুষের জন্য নেয়ামত। কখনোও আবার শাস্তি পাওয়ার উপকরণ।
ধন-সম্পদ আল্লাহ -এর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয়িত হলে আল্লাহ সেই সম্পদ দিয়ে মানুষকে দুনিয়া-আখেরাতে সফল করে তোলেন।
আব্দুর রহমান ইবনে আউফ ধন-সম্পদ ব্যয় করে জান্নাতের অধিকারী হয়েছেন।
কেউ যদি মনে করে, ইসলাম ধন-সম্পদ ও অর্থনীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, তাহলে তার এই ধারণা ভুল। বরং ইসলাম ধন-সম্পদের বিলাসিতা, অপচয় ইত্যাদিকে নিষেধ করে।
ধন-সম্পদ যদি দীনের খেদমতের জন্য ব্যয়িত হয়, আল্লাহ -এর আনুগত্যের অধীন হয়, তবে তা মানুষের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ বয়ে আনবে।
তাবুক যুদ্ধের সময় রাসূল ﷺ মিম্বারে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'কে এই কঠিন দিনের সেনাবাহিনী সাজিয়ে দিবে? তার জন্য জান্নাতের ঘোষণা!' [আহমাদ : ৫১৩]
সকলের মাঝ থেকে উসমান (রাঃ) দাঁড়ালেন। বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি এই কঠিন দিনের বাহিনী সাজিয়ে দিবো। অর্থ, অস্ত্র, ঘোড়া, জিনপোশ, -আল্লাহর রাহে সবই আমি বহন করবো।
উসমানের ঘোষণা শুনে রাসূলের দুই চোখে অশ্রু গড়ালো। রাসূল তার জন্য দোয়া করে বললেন, 'আল্লাহ! উসমানের পূর্বাপর সব গুনাহ মাফ করো। আল্লাহ! তুমি তার উপর সন্তুষ্ট হও, আমিও তার উপর সন্তুষ্ট। আজকের পর উসমানের কোন কর্ম তার ক্ষতি বয়ে আনবে না।' [আহমাদ : ২০১০৭]
দুই.
পদ-পদবী মানুষের প্রকাশ্য নেয়ামত। পদ-পদবী কখনো ইসলামের সাহায্য করে। কখনো ইসলামের বিরোধী শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। দাঈ ও দাওয়াতের পথে দুর্ভেদ্য গিরিপথের ভূমিকা পালন করে।
ওমর ইবনে আব্দুল আযিয (রহঃ) খেলাফতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি সৎ ছিলেন। মানুষকে মুক্তির পথে পরিচালিত করেছিলেন।
অপর দিকে আবু মুসলিম খোরাসানি, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ শাসক হয়ে হাজার-হাজার, লক্ষ-লক্ষ মুসলমান হত্যা করেছিল।
আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল (সঃ)-কে বলতে শুনেছেন, ‘বনী ইসরাইলের মধ্যে তিনজন লোক ছিল। একজন শ্বেতরোগী। একজনের মাথায় টাক। একজন অন্ধ।
আল্লাহ (সুবঃ) তাদের পরীক্ষা কতে চাইলেন। তিনি তাদের কাছে একজন ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতা প্রথমে শ্বেতরোগীর কাছে আসলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার কাছে কোন জিনিস বেশি প্রিয়?'
সে জবাব দিল, 'সুন্দর রং ও সুন্দর চামড়া। কারণ মানুষ আমাকে ঘৃণা করে।' ফেরেশতা তার শরীরের উপর হাত বুলিয়ে দিলেন। তার রোগ সেড়ে গেল। তার শরীরে সুন্দর চামড়া ও রং দান করা হল।
ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোন ধরনের সম্পদ তোমার কাছে বেশি প্রিয়?’
সে জবাব দিল, 'উট'। অথবা সে বলল, 'গরু'।
(এ ব্যাপারে বর্ণনাকরীর সন্দেহ রয়েছে যে, শ্বেতরোগী বা টাকওয়ালা, দুজনের একজন বলেছিল উট আর অপরজন বলেছিল গরু।)
তাকে একটি দশ মাসের গর্ভবতী উটনী দেয়া হল। ফেরেশতা উট দিয়ে দোয়া করলেন- 'এতে তোমার জন্য বরকত হোক।'
এরপর ফেরেশতা টাকওয়ালার কাছে গেলেন। বললেন, 'তোমার কাছে কী পছন্দনীয়?'
সে বলল, 'সুন্দর চুল আমার বেশি পছন্দনীয়। আমি চাই- এ রোগ যেন চলে যায়। মানুষ এ রোগের কারণে আমাকে ঘৃণা করে।'
ফেরেশতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তৎক্ষণাৎ মাথার টাক চলে গেল। মাথা ভর্তি সুন্দর চুল গজিয়ে উঠল।
ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'কোন সম্পদ তোমার নিকট অধিক প্রিয়?'
সে বলল, আমার সবচে প্রিয় সম্পদ গরু।
তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দেয়া হল। ফেরেশতা তার জন্য দোয়া করলেন, 'এতে তোমাকে বরকত দান করা হোক।'
এরপর ফেরেশতা অন্ধের কাছে আসলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'কোন জিনিস তোমার কাছে বেশি প্রিয়?'
সে বলল, 'আল্লাহ যেন আমার চোখের জ্যোতি ফিরিয়ে দেন। আমি যেন মানুষকে দেখতে পারি।'
ফেরেশতা তার চোখে হাত বুলিয়ে দিলেন। তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন।
ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার সবচে প্রিয় সম্পদ কী?'
সে জবাব দিল, 'ছাগল আমার বেশি প্রিয়।'
ফেরেশতা তাকে একটি গর্ভবতী ছাগী দিলেন।
উল্লিখিত লোকদের পশুগুলো বাচ্চা দিল। একজনের উটে ময়দান ভরে গেল। অপরজনের গরুতে মাঠ পূর্ণ হয়ে গেল। অপর একজনের ছাগলে উপত্যকা ভরে গেল।
ফেরেশতা তার পূর্ববর্তী আকৃতি ধারণ করে শ্বেতরোগীর কাছে এসে বললেন, 'আমি একজন নিঃস্ব ব্যক্তি। আমার সফরের সকল সম্বল শেষ হয়ে গেছে। আজ আমার গন্তব্যে পৌঁছার জন্য আল্লাহ ️ছাড়া কোন উপায় নেই। আমি তোমার কাছে ঐ সত্তার নামে একটি উট চাচ্ছি, যিনি তোমাকে সুন্দর রং, কোমল চামড়া এবং সম্পদ দান করেছেন। আমি এর উপর সাওয়ার হয়ে আমার গন্তব্যে পৌঁছুবো।'
লোকটি বলল, 'আমার উপর বহু দায়-দায়িত্ব রয়েছে। কাজেই আমার পক্ষে দান করা সম্ভব নয়।'
ফেরেশতা তাকে বললেন, 'সম্ভবত আমি তোমাকে চিনি। তুমি কি একসময় শ্বেতরোগী ছিলে না, মানুষ তোমাকে ঘৃণা করত? তুমি কি ফকীর ছিলে না, এরপর আল্লাহ তোমাকে প্রচুর সম্পদ দান করেছেন?'
লোকটি বলল, 'আমি তো এ সম্পদ আমার পূর্বপুরুষ থেকে ওয়ারিশ সূত্রে পেয়েছি।'
ফেরেশতা বললেন, 'তুমি যদি মিথ্যাবাদী হও, তবে আল্লাহ তোমাকে সেরূপ কের দিন, যেমন তুমি ছিলে।'
এরপর ফেরেশতা মাথায় টাকওয়ালার কাছে তার সেই বেশভূষা ও আকৃতিতে গেলেন এবং তাকে ঠিক তদ্রূপই বললেন, যেরূপ তিনি শ্বেতরোগীকে বলেছিলেন। টাকওয়ালাও ফেরেশতাকে ঠিক অনুরূপ জবাব দিল, যেমন জবাব শ্বেতীরোগী দিয়েছিল। তখন ফেরেশতা বললেন, 'যদি তুমি মিথ্যাবাদী হও, তবে আল্লাহ তোমাকে তেমন অবস্থায় ফিরিয়ে দিন, যেমন তুমি ছিলে।'
শেষে ফেরেশতা অন্ধ লোকটির কাছে তার আকৃতিতে আসলেন এবং বললেন, 'আমি একজন নিঃস্ব লোক। মুসাফির মানুষ। আমার সফরের সকল সম্বল শেষ হয়ে গেছে। আজ বাড়ি পৌঁছার জন্য আল্লাহ ছাড়া কোন গতি নেই। তাই আমি তোমার কাছে সেই সত্তার নামে একটি ছাগী প্রার্থনা করছি, যিনি তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি এই ছাগীটি নিয়ে আমার এ সফরে বাড়ি পৌঁছুতে পারবো।'
সে বলল, 'বাস্তবিকই আমি অন্ধ ছিলাম। আল্লাহ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি ফকীর ছিলাম, আল্লাহ আমাকে ধনী বানিয়েছেন। এখন তুমি যা চাও, নিয়ে যাও। আল্লাহর কসম! আল্লাহর ওয়াস্তে তুমি যা কিছু নিবে, তার জন্য আজ আমি তোমার কাছে কোন প্রশংসাই দাবি করবো না।'
তখন ফেরেশতা বললেন, 'তোমার মাল তুমি রেখে দাও। তোমাদের তিনজনকে পরীক্ষা করা হল মাত্র। আল্লাহ তোমার উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন, আর তোমার সাথি দুজনের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন।' [বুখারি: ৩৪৬৪]
উক্ত হাদিস থেকে প্রমাণিত হল, যে আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা পোষণ করে, আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট হন। যে নেয়ামতের অকৃতজ্ঞতা করে, পাপাচারে ব্যয় করে, আল্লাহর আয়াতের সাথে গাদ্দারী করে, আল্লাহ তার উপর অসন্তুষ্ট হন। এসব নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা পোষণ করা উচিত। কারণ, এবাদত কখনও নেয়ামতের জন্য যথেষ্ঠ নয়।
বনি ইসরাইলের জনৈক আবেদ এক উপত্যকায় আল্লাহ -র এবাদতে মগ্ন ছিল। সারাদিন সে এবাদত করত। এভাবে পাঁচশ বছর কেটে গেল। লোকটি যখন মৃত্যুবরণ করল, তাকে জিজ্ঞেস করা হল, 'তুমি তোমার এবাদত দিয়ে জান্নাতে যেতে চাও, নাকি আল্লাহ -র রহমতে জান্নাতে যেতে চাও?'
লোকটি বলল, 'আমি পাঁচশ বছর এবাদত করেছি। আমি আমার এবাদত দিয়ে জান্নাতে যেতে চাই।'
আল্লাহ তখন ফেরেশতাদের আদেশ করলেন, 'এই লোকের আমল গুণে দেখ এবং তার প্রতি আমার নেয়ামতগুলোও গুণে দেখ।'
ফেরেশতারা তার এবাদত গুণে দেখল, পাঁচশ বছরের এবাদত শুধু চোখের নেয়ামতেরই বদলাতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে!
আল্লাহ বললেন- 'ওকে জাহান্নামে নিক্ষেপ কর।'
লোকটি তখন চিৎকার জুড়ে দিল। বলল, 'আল্লাহ! তোমার রহমতেই আমি জান্নাতে যেতে চাই।'
আল্লাহ তাকে রহম করলেন। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালেন। যেন সে একথা বুঝতে পারে, আল্লাহর নেয়ামতের কোন শেষ নেই। কেউ তা গুণে শেষ করতে পারবে না।
রাসূল ইরশাদ করেন – 'তোমাদের কেউ আল্লাহর রহম ছাড়া নিজ আমল দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।'
সাহাবায়ে কেরام জিজ্ঞেস করলেন, 'আল্লাহর রাসূল! আপনিও?'
রাসূল বললেন- 'হ্যাঁ, আমিও। তবে আল্লাহ আমাকে তার রহম দ্বারা পূর্ণ করেছেন।' [বুখারি: ৫৬৭৩]
আমরা সকলেই আল্লাহ-র কাছে মুখাপেক্ষী। আমরা সকলেই ভুল করি। আমরা অপূর্ণ। আমাদের এমন কোন আমল নেই, যা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবো। আমরা আল্লাহর রহম কামনা করি। তাঁর অনুকম্পা ভিক্ষা করি।
📄 হাদিসের বার্তা
কাব ইবনে মালিকের ঘটনা আমাদের অনেক বার্তা দেয়। কিছু উল্লেখ করছি:
১. রাসূল ﷺ ভোরবেলা সফরে বের হতেন। এতে মুসলমানের জন্য বার্তা হল, যে কোন সফর ভোরবেলা, ফজরের পরপর করতে পারলে ভালো। রাসূল ইরশাদ করেন, 'হে আল্লাহ! আমার উম্মতের জন্য ভোরবেলায় বরকত দান কর।' [আহমাদ: ১৫০১২]
২. সফর বৃহস্পতিবারে করা সুন্নত। কাব ইবনে মালিক বলেন, 'রাসূল বৃহস্পতিবারে সফর শুরু করেছিলেন।'
রাসূল অধিকাংশ সফর বৃহস্পতিবারে করতেন। ওলামায়ে কেরাম শুক্রবারে সফর করা অপছন্দ করেছেন। অনেকে বলেন, শুক্রবারে ফজরের পর সফর করা অপছন্দের নয়। জুমার প্রথম আযান হওয়ার পর সফর শুরু করা অপছন্দের。
তবে উত্তম হল শুক্রবার সকল কাজ থেকে মুক্ত হয়ে কোথাও স্থির থাকা। ইবাদাত, গোসল, যিকির, কোরআন পাঠ ইত্যাদিতে ব্যস্ত থাকা। মনে রাখতে হবে, শুক্রবার হল মুমিনের ঈদ।
৩. সঙ্ঘবদ্ধ সফরের দলপতির উচিৎ- সকলের খোঁজ-খবর রাখা। রাসূল তাবুকের কাছে যাত্রাবিরতি করে সাহাবিদের খোঁজ নিয়েছিলেন। জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'কাব ইবনে মালিক কোথায়?' বর্ণিত হয়েছে, 'তোমরা সকলেই রক্ষণাবেক্ষণকারী। তোমাদের প্রত্যককেই অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।' [বুখারি: ৮৯৩]
৪. কারো ব্যাপারে কিছু জানা থাকলে তা বলা উচিৎ। ওলামায়ে কেরাম ক্ষেত্র বিশেষ 'জারহ তাদীল' এর অনুমতি দিয়েছেন। তা গীবত হবে না। তবে এই 'জারহ তাদীল' অনুমোদিত স্থানগুলোতেই করা যাবে।
৫. হাদিসের গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা হল, অপর ভাইয়ের মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। কাব ইবনে মালিক-কে জনৈক ব্যক্তি মন্দ বললে মুযায কাবের মর্যাদা রক্ষায় মুখ খুললেন। মন্দ ব্যক্তকারীকে বললেন, 'তুমি অন্যায় বলেছ। আমাদের জানা মতে তিনি একজন মুজাহিদ। তিনি আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালোবাসেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, 'অপর মুসলিম ভাইয়ের মর্যাদা রক্ষাকারীকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়া আল্লাহর দায়িত্ব।' [আহমাদ: ২৭০৬২] সুতরাং কোন মজলিস অপর মুসলমান ভাইয়ের জন্য অপমান ও মর্যাদাহানীমূলক কিছু শুনলে তার প্রতিবাদ করা উচিৎ। স্পষ্ট করে বলা উচিৎ, এটি ভুল। পাশাপাশি আক্রান্ত মুসলিম ভাইয়ের ভালো কিছু জানা থাকলে তা-ও ব্যক্ত করা উচিৎ।
৬. রাসূল সফর থেকে ফিরে আগে মসজিদে গমন করতেন। দুরাকাত সালাত আদায় করতেন। আবু কাতাদা বর্ণনা করেন- إِذَا دَخَلَ أَحَدُكُمُ الْمَسْجِدَ فَلَا يَجْلِسُ حَتَّى يُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে দুরাকাত সালাত আদায় করার আগে যেন না বসে। [বুখারি: ৪৪৪]
৭. সফর থেকে ফিরে লোকদের নিয়ে একটু বসা। সালাম ও মতবিনিময় করা। এটি নববী আদর্শ।
৮. কারো ওযর-অপারগতা গ্রহণ করা। কেউ ওযর ও অপারগতা জানালে তা বাহ্যিক অবস্থার উপর বিবেচনা করা। এ কথা না বলা- সে ভিন্ন কিছু চেয়েছে, তার নিয়ত ভালো ছিল না, সে সত্য বলেনি ইত্যাদি।
৯. পাপাচারীদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা। হাসান বসরী বলেন, 'কী আশ্চর্য! তাবুক যুদ্ধে পিছিয়ে থাকা তিন সাহাবি কোন রক্তপাত করেননি। কারো রাস্তা বন্ধ করেননি। কোন অনাচার করেননি। সম্পদ বিনষ্ট করেননি। তথাপি তারা কী প্রতিদান পেয়েছিল! তাহলে যারা কবীরা গোনাহয় লিপ্ত, অ্লীলতায় লিপ্ত, তাদের সাথে কেমন আচরণ করা উচিৎ!'
পাপাচারীর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বৈশিষ্ট্য। আর যে বিদয়াত প্রচার করে, তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা আবশ্যক।
তদ্রূপ অন্যান্য গোনাহয় লিপ্ত যেমন, মাদকাসক্ত, গান শ্রবণকারী, সুন্নতের বিরোধিতাকারীদের প্রাথমিক সতর্ক ও নসিহত করে তাদের সাথেও সম্পর্কচ্ছেদ করা উচিৎ।
পার্থিব কোন বিষয়ে কারো সাথে তিন দিনের বেশি সম্পর্কচ্ছেদ রাখা বৈধ নয়। রাসূল বলেন-
তিন দিনের বেশি কোন মুসলিম ভাইয়ের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ রাখা মুসলমানের জন্য বৈধ নয়; দুজনের সাক্ষাৎ হলে পরষ্পর মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাদের জন্য ভালো হল সালাম দিয়ে শুরু করা। [বুখারি: ৬০৭৭]
দীনী বিষয়ে অবাধ্যদের সাথে ভালো মনে হলে তাদের শিষ্টাচার শিখানো পর্যন্ত সম্পর্কচ্ছেদ করা জরুরি। ইবনে তাইমিয়া বলেন, 'সম্পর্কচ্ছেদের কারণে যদি অবাধ্যতা আরও বৃদ্ধি পায়, তাহলে সম্পর্কচ্ছেদ না করা চাই।
ফতোয়ায়ে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
১০. এক মুসলমান অপর মুসলমানকে সুসংবাদ প্রদান করা। কারো সন্তান ভূমিষ্ট হল, ছেলে কোন বিপদ থেকে মুক্ত হল, তখন বাবা-মাকে সুসংবাদ প্রদান করা। কারো ব্যাপারে ভালো কিছু শুনলে, স্বপ্ন দেখলে তাকে সুখবর শোনানো।
হিংসুক ও বিদ্বেষপরায়ণ লোকেরা কারো ব্যাপারে ভালো কিছু প্রকাশ করে, অন্তরে তার ব্যাপারে মন্দ পোষে। মুসলিম ভাইয়ের ভালো কিছু দেখলে বা শুনলে তা গোপন রাখে। সম্মানহানীকর কিছু শুনলে তা কানে কানে প্রচার করে।
১১. সুসংবাদপ্রদানকারীকে কিছু হাদিয়া ও উপহার প্রদান করা। মুসলিম সবসময় সম্মানী। উদারহস্ত। দানশীল।
১২. একটি মুসলিম জীবনের সবচে শ্রেষ্ঠ দিন হল আল্লাহর কাছে তওবা কবুল হওয়ার দিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাবকে বলেছিলেন, 'সুসংবাদ হে কাব! আল্লাহ তোমার তওবা কবুল করেছেন। জন্মাবধি আজকের দিনটি তোমার জন্য সবচে উৎকৃষ্ট।'
এটি কাবে জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। এই দিন তার ইসলামের দিন। তাওবা কবুল হওয়ার দিন।
📄 সারকথা
বিপদাপদে জীবন যতই দুর্বিষহ হোক, বিপদাপদ যতই ঘনীভূত হোক, এর থেকে মুক্তি দিতে পারেন একমাত্র আল্লাহ。
ইবনুল জাওযি বলেন, রিযিক দিতে পারেন একমাত্র আল্লাহ। বিপদ থেকে মুক্তি দিতে পারেন একমাত্র আল্লাহ।
এটাই আহলে সুন্নাত ওয়ালজামাতের আকিদা। প্রগাঢ় বিশ্বাস।
সমাপ্ত