📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 কিয়ামুল্লাইলের কিছু ঘটনা ও হাদিস

📄 কিয়ামুল্লাইলের কিছু ঘটনা ও হাদিস


ইবনে ওমর নিজের ঘটনা বর্ণনা করেন-
রাসূলের যুগে সাহাবায়ে কেরাম বিভিন্ন স্বপ্ন দেখতেন। রাসূল ফজরের সালাত আদায় করে আমাদের দিকে ফিরে বসতেন। জিজ্ঞেস করতেন, 'তোমাদের কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছ?'
সাহাবায়ে কেরام কোন স্বপ্ন দেখলে তা রাসূলের কাছে বলতেন।
আমি তখন মসজিদে ঘুমাতাম। একরাতে স্বপ্নে দেখলাম- দুই ব্যক্তি এসে একজন আমার ডান হাত ধরল, অপরজন বাম হাত ধরল। তারা আমাকে একটি বাঁধানো কূপের দিকে নিয়ে গেল। কূপের মধ্যে একটি সম্প্রদায়কে শাস্তি দেয়া হচ্ছে।
আমি ভয় পেয়ে গেলাম। লোক দুজন আমাকে বলল, 'ভয় পেওনা, ভয় পেওনা।'
তারা আবার আমার হাত ধরল। আমি তাদের সাথে চললাম। তারা রেশমের একপ্রস্ত কাপড় আমার হাতে দিল। সেই কাপড় দিয়ে যে দিকেই ইঙ্গিত করছি, আমাকে সেদিকেই একটি সবুজ বাগানের উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
সকালে ইবনে ওমর রাসূলের কাছে তার স্বপ্নের কথা খুলে বলার উদ্যোগ নিলেন। কিন্তু লজ্জা পেলেন। তখন ইবনে ওমরের বয়স কম ছিল। অবিবাহিত ছিলেন তিনি।
ইবনে ওমর আপন বোন হাফসাকে স্বপ্নের কথা জানালেন এবং রাসূলকে বিষয়টি জানানোর জন্য বললেন।
হাফসা রাসূলের কাছে ইবনে ওমরের স্বপ্নের কথা জানালেন। রাসূল স্মিতহাস্যে বললেন, 'আব্দুল্লাহ কতই ভালো লোক! যদি সে রাত জেগে তাহাজ্জুদ আদায় করতো!' [বুখারি : ১১২২]
এরপর থেকে ইবনে ওমর রাতে আর ঘুমুতেন না।
ওলামায়ে কেরাম ইবনে ওমরের উক্ত স্বপ্নের ব্যাখ্যা বর্ণনা করেন। স্বপ্নের বাঁধানো কূপটি ছিল জাহান্নাম। ইবনে ওমরকে জাহান্নামের ভয় দেখানো হয়েছে। আল্লাহ আমাদের জাহান্নাম থেকে হেফাযত করুন।
স্বপ্নের লোক দুজন ছিলেন ফেরেশতা। রেশমের কাপড় হল ইবনে ওমরের নেক আমল। নেক আমল মানুষকে এমনই এক মর্যাদা থেকে আরেক মর্যাদায় উন্নীত করে।

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 ইবনে আব্বাস এর হাদিসের ব্যাখ্যা

📄 ইবনে আব্বাস এর হাদিসের ব্যাখ্যা


ইবনে আব্বাস এর হাদিসটি শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বর্ণনা করেন, রাসূল তাহাজ্জুদের জন্য উঠে এই দোয়া পড়তেন-
আল্লাহ, তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি আসমান যমিন এবং এতদুভয়ের সবকিছুর তত্ত্বাবধায়ক। তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি আসমান যমিন এবং এতদুভয়ের সবকিছুর নূর। তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি আসমান যমিন এবং এতদুভয়ের সবকিছুর মালিক। তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি সত্য। তোমার ওয়াদা সত্য। তোমার সাক্ষাৎ সত্য। তোমার বাণী সত্য। জান্নাত সত্য। জাহান্নাম সত্য। সকল নবী সত্য। মোহাম্মদ সত্য।
আল্লাহ, তোমারই কাছে আমি সমর্পিত। তোমাতেই আমি বিশ্বাস রাখি। তোমারই উপর ভরসা রাখি। তোমারই কাছে প্রত্যাবর্তন করি। তোমার মদদে বিবাদ করি। তোমরাই দরবারে বিচার চাই। তুমি আমাকে ক্ষমা কর। আমার পূর্বাপর ক্ষমা কর। আমার প্রকাশ্য-গোপনীয় সবকিছু ক্ষমা কর। [বুখারি: ১১২০]
'আল্লাহ আসমান যমিন এবং এতদুভয়ের সবকিছুর তত্ত্বাবধায়ক'।
যেমন আল্লাহ বলেছেন-
আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই। তিনি জীবিত, সবকিছুর ধারক। [সূরা বাকারা : ২৫৫]
তিনি স্বয়ম্ভূ। সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী। আসমান যমিন সবকিছু তারই স্থাপিত।
আল্লাহ আসমান যমিন এবং এতদুভয়ের সবকিছুর নূর।
আল্লাহর নূরে আসমান যমিন এবং এতদুভয়ের সবকিছু আলোকিত। তার নূর সব ধরনের ত্রুটি থেকে মুক্ত। তার নূর দ্বারা সবকিছু পরিশুদ্ধ। আল্লাহ বলেন-
আল্লাহ নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের নূর। তার নূরের উদাহরণ যেন একটি কুলঙ্গি। [সূরা নূর: ৩৫]
ইবনে কাসির বলেন, উক্ত নূরের অনেক অর্থ রয়েছে। একটি হল, তিনি আসমান ও যমিনের সবকিছুর হেদায়াতদাতা।
তিনি আসমান যমিনের সবকিছুর কর্মবিধায়ক। হেদায়াতপ্রাপ্তদের থেকে অন্যরা সে নূর আহরণ করে।
‘তার নূরের উদাহরণ যেন একটি কুলঙ্গি।’ অর্থাৎ, তিনি যে নূর মুমিনদের দান করেছেন, মুমিনের অন্তরে স্থাপন করেছেন, তার উদাহরণ যেন একটি কুলঙ্গি।
‘তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি সত্য।’
আল্লাহ স্বয়ংসম্পূর্ণ। তার অস্তিত্ব সত্য। তার বাণী সত্য। তার কর্মকাণ্ড সত্য। তিনিই সত্য, আর সব অসত্য...
কবির ভাষায়- আল্লাহ ছাড়া আর সব অসত্য।
মুছে যাবে সবকিছুর অস্তিত্ব। জান্নাত-জাহান্নাম ছাড়া আর সবকিছুর অস্তিত্ব মুছে যাবে।
‘তোমার ওয়াদা সত্য।’
আল্লাহ যে ওয়াদা মানুষদের দিয়েছেন, সে ওয়াদা হল কেয়ামতের ওয়াদা। কেয়ামতের ওয়াদা সত্য। কেয়ামত হবেই, এতে কোন সন্দেহ নেই। আল্লাহ সকল মানুষকে আবার জীবিত করবেন, এতে কোন সংশয় নেই।
‘তোমার সাক্ষাৎ সত্য।’
অর্থাৎ, যেদিন আমরা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবো। আল্লাহর দীদার লাভে ধন্য হবো। এই কথার দ্বারাও কেয়ামতের সত্যতা বুঝা যায়।
‘তোমার বাণী সত্য।’ আল্লাহ-র কোন কথা মিথ্যা নয়। আল্লাহ-র বাণী হল কোরআন। কোরআনে কোন মিথ্যা নেই। কোন সন্দেহ-সংশয় নেই।
‘জান্নাত সত্য। জাহান্নাম সত্য।’ হাদিসের এই কথা দিয়ে প্রমাণিত হয়, জান্নাত-জাহান্নাম সৃষ্টি করা হয়েছে। তা এখন বিদ্যমান। এর কোন শেষ নেই। শায়খ হাফেয হিকামি বলেন-
এখনও বিদ্যমান জান্নাত জাহান্নাম, শেষ হবে না কভু এসবের পরিণাম।
‘সকল নবী সত্য।’
কোন নবীই নিজ থেকে নবুওয়াত দাবি করেননি। আল্লাহ -এর পক্ষ থেকে সকল নবীর প্রেরণ সত্য। তাদের উপর সামগ্রিক ও সবিস্তার ঈমান রাখা আবশ্যক।
সামগ্রিক ঈমান আনার অর্থ, আল্লাহ যাদেরই প্রেরণ করেছেন, কোরআন-সুন্নাহয় তাদের নাম উল্লেখ থাক বা না থাক, সকলের উপর ঈমান আনয়ন আবশ্যক।
সবিস্তার ঈমান রাখার অর্থ কোরআনে উল্লিখিত পঁচিশজন নবীর উপর ঈমান আনা আবশ্যক।
‘মোহাম্মদ সত্য।’
মোহাম্মদ আল্লাহ -এর প্রেরিত নবী। তিনি সর্বশেষ নবী। তাঁর মর্যাদা ও সম্মান বিশেষভাবে উল্লিখিত।
‘আল্লাহ, তোমারই কাছে আমি সমর্পিত। তোমাতেই আমি বিশ্বাস রাখি।’
অর্থাৎ, তোমার কাছে দেহ-আত্মা সমর্পণ করলাম। কোন অহঙ্কার, অপূর্ণ ও হেয়জ্ঞান ছাড়া আমার দেহ-আত্মার বাগডোর তোমার কাছে সমর্পণ করলাম। এসবকিছু আমার অন্তর থেকে বিশ্বাস করলাম।
‘তোমারই উপর ভরসা রাখি।’
ইবনে হাজার বলেন, তাওয়াক্কুল বা ভরসার অর্থ হল সবধরনের মাধ্যম ছেড়ে নিজের সকল বিষয় আল্লাহ -এর কাছে সমর্পণ করা।
উল্লেখ্য, ইবনে হাজারের এই ব্যাখ্যাটি ভুল। কারণ, আহলে সুন্নাহর বিশ্বাস অনুযায়ী তাওয়াক্কুল বা ভরসার অর্থ সকল বিষয় আল্লাহ -এর কাছে সমর্পণ করা, তবে তা মাধ্যম ছেড়ে নয়। সুতরাং মাধ্যম গ্রহণ সিদ্ধ। রাসূল মাধ্যম গ্রহণ করেছেন। যুদ্ধে বর্শা ব্যবহার করেছেন। বর্মা পরিধান করেছেন। মাথায় শিরস্ত্রাণ পরেছেন।
রাসূলের কাছে এক লোক এসে আল্লাহর উপর ভরসা সত্ত্বেও উট হারানোর অভিযোগ করেছিল। রাসূল তাকে বলেছিলেন-
উট বেঁধে রাখ। এরপর তাওয়াক্কুল কর। [তিরমিযি : ২৫১৭]
উক্ত ঘটনায় রাসূল ﷺ তাকে আল্লাহ ﷻ-র উপর তাওয়াক্কুল করতে বলেছেন, মাধ্যমও ব্যবহার করতে বলেছেন।
'তোমারই কাছে প্রত্যাবর্তন করি।'
আল্লাহ ﷻ-র কাছে প্রত্যাবর্তন হল তাওয়াক্কুলের শেষ স্তর। কোন বিষয়ে সর্বপ্রথম আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করা হয় এবং সর্বশেষ আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তন করা হয়।
'তোমারই মদদে বিবাদ করি।'
তোমার জন্য কারো সাথে বিতর্ককালে তুমিই আমাকে প্রয়োজনীয় দলীল-প্রমাণের সন্ধান দিয়েছ। দলীল-প্রমাণের মালিকও তুমিই।
'তোমরাই দরবারে বিচার চাই।'
যে আমার সাথে বিবাদে লিপ্ত হবে, তার সমাধান তোমার কাছে চাই। তুমি ছাড়া আর কারো কাছে সমাধান নেই। কোন গোত্রপতি যাজকের কাছে সমাধান নেই। তোমার কাছেই একমাত্র সমাধান।
'তুমি আমাকে ক্ষমা কর। আমার পূর্বাপর ক্ষমা কর।'
রাসূল ﷺ-র পূর্বাপর সবকিছু ক্ষমাঘোষিত ছিল। তবু রাসূল কেন ক্ষমা চেয়েছেন? এর নামই হল বিনয়। নিজের দুর্বলতা এবং অক্ষমতার সরল স্বীকারোক্তি। এই ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে রাসূল তার উম্মতকে সবক দিয়েছেন, যেন তারাও আল্লাহ ﷻ-র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
'আমার প্রকাশ্য-গোপনীয় সবকিছু ক্ষমা কর।'
আমি গোপনে যত গোনাহ করেছি, যেসব গোনাহের কোন সাক্ষী নেই, সেগুলো তুমি ক্ষমা কর। প্রকাশ্যে যত গোনাহ করেছি, সেসবও তুমি ক্ষমা কর।
'তুমিই প্রথম-শেষ'
তোমার ইচ্ছায় যেসব বিষয় আগে ঘটানোর, তা আগে ঘটাও। যেসব বিষয় পরে ঘটানোর, তা পরে ঘটাও। আল্লাহ ﷻ-র গুণবাচক নামগুলোর স্থিতি তার আগে নয়। আল্লাহ ﷻ বলেন-
তিনিই প্রথম, তিনিই সর্বশেষ। তিনিই প্রকাশমান ও অপ্রকাশমান। তিনি সববিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত। [সূরা হাদিদ : ৩]
আল্লাহ ﷻ-এর জন্য নতুন কোন গুণবাচক নামের উদ্ভাবন নেই। কোরআন ও হাদিসে আল্লাহ ﷻ-এর যেসব গুণবাচক নামের উল্লেখ আছে, সেসবের মধ্যেই আল্লাহ ﷻ-এর গুণবাচক নাম সীমাবদ্ধ থাকবে।
আল্লাহ ﷻ-এর গুণগুলো পরিপূর্ণ। আল্লাহর গুণাবলীতে কোন অসম্পূর্ণতা নেই। তাঁর গুণগুলো মানুষের বা কোন সৃষ্টিজীবের গুণাবলীর মত নয়। কোন পরিপূর্ণ গুণবাচক শব্দে মানুষের নাম রাখা হলেও মানুষের গুণ পরিপূর্ণ নয়। আল্লাহ গুণ আরও পরিপূর্ণ। যদি কারও নাম রাখা হয় ‘কারীম’ (সম্মানিত) বা ‘হালীম’ (সহনশীল), তাহলে আল্লাহর আরও সম্মানিত। আরও সহনশীল। আল্লাহর সম্মান ও সহনশীলতা মানুষের মত নয়। আল্লাহর গুণাবলী তাঁর উপযুক্ত মত।
আল্লাহ ﷻ-এর গুণবাচক নাম নিরানব্বইটি। আবু হোরায়রা বর্ণনা করেন, আল্লাহর নিরানব্বইটি নাম রয়েছে। যে তা মুখস্থ করবে, জান্নাতে প্রবেশ করবে। [বুখারি : ২৭৩৬]
এই নিরানব্বই নাম ছাড়া আল্লাহর আরও কিছু গুণবাচক নাম আছে। ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ আল্লাহ ﷻ-এর কাছে এই বলে দোয়া করতেন- “হে আল্লাহ! তোমার সকল নামের উসিলায় তোমার কাছে চাইছি; যেসব নাম তুমি নিজের জন্য রেখেছ, আমাদের অজানায় যেসব অর্থ নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছ, যেসব নাম তোমার পাক কিতাবে অবতীর্ণ করেছ বা তোমার কোন সৃষ্টিকে জানিয়েছ।” [আহমাদ : ৩৭০৪]
উক্ত হাদিস থেকে বুঝা যায়, আল্লাহ ﷻ-এর এমন কিছু নাম আছে, যা কেউ জানে না। নবীগণও জানেন না।
ইবনে আব্বাসের বর্ণিত দোয়াটি রাসূল তাহাজ্জুদে কখন পড়তেন- ইবনে খোযায়মার সহীহ সূত্রে বর্ণিত, রাসূল ﷺ সালাতে তাকবীরের পর উক্ত দোয়াটি পড়তেন।
আল্লাহ -এর কাছে দোয়া করি, আল্লাহ আমাদের রাতজাগা এবাদতকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। রাতের শেষ প্রহরে তাহাজ্জুদ আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।
কবির ভাষায়-
রাতের আঁধারে ঢেকে যায় যবে এবাদতকারী চোখের বন্যা প্রবাহিত হয় কপোল গড়িয়ে...

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 ইবনে তাইমিয়ার উপদেশ

📄 ইবনে তাইমিয়ার উপদেশ


সকল প্রশংসা বিশ্বপ্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য। সালাম ও শান্তি মুত্তাকীদের ইমাম, সকল মানুষের নেতা মোহাম্মদ -এর জন্য। তার পরিবারবর্গ, সাথি-সহচর ও অনুসারীদের জন্য।
শাইখুল ইসলাম আল্লামা ইবনে তাইমিয়া । প্রখ্যাত আলেমে দীন। বীর- মুজাহিদ। দুনিয়াবিরাগ এবাদতকারী। প্রতিভাবান লেখক ও গবেষক। বিচক্ষণ ব্যক্তিত্ব। বক্ষমান শিরোনামে তার একটি হাদিয়া বা অসিয়তনামা উল্লেখ করছি।
আবুল কাসেম মাগরিবি নামে জনৈক লোক ইবনে তাইমিয়া এর ব্যক্তিত্ব শুনে তার সাথে দেখা করার উৎসাহ পেল। লোকটি ইবনে তাইমিয়ার সাথে দেখা করার জন্য দামেস্ক সফর করল। ইবনে তাইমিয়াকে দেখে লোকটি হতভম্ভ হয়ে গেল। তার ব্যক্তিত্বের কথা মন থেকে উবে গেল। লোকটি ইবনে তাইমিয়ার কাছে কিছু জানতে চেয়ে একটি চিঠি লিখল-
হে সম্মানিত শায়খ! বিগত মহান মনীষীদের সম্পূরক নমুনা! আগত প্রজন্মের পরিপূর্ণ আদর্শ! প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দেশ দেশান্তরে সমাদৃত তাকিউদ্দিন আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনে তাইমিয়ার সাথে আমি দেখা করতে এসেছি। আমাকে দীন ও দুনিয়ার কল্যাণকর কিছু উপদেশ দিন। আমাকে এমন একটি কিতাব দিন, শরীয়তের যে কোন বিষয়ে যেন আমি উক্ত কিতাবের ভরসা করতে পারি। ওয়াজিব আমল ছাড়াও বিভিন্ন নফল ও উত্তম আমলের পথনির্দেশ সে কিতাব থেকে গ্রহণ করতে পারি। আয় উপার্জনের জন্যও উত্তম ও উপযুক্ত একটি পন্থা সে কিতাব থেকে অবলম্বন করতে পারি। কিতাবটি যেন নিগূঢ় অর্থবাহী সুসংক্ষিপ্ত ভাষায় রচিত হয়। আল্লাহ শায়খকে হেফাযত করুন। আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু। [মোজমুআতুল ফাতাওয়া : ১০/৬৫]
লোকটি ইবনে তাইমিয়ার কাছে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণবাহী কিছু উপদেশ জানতে চাইল, অথচ উপদেশগুলো সংক্ষিপ্ত ভাষায় লিখার শর্ত জুড়ে। দিল। কারণ লোকটি জানত, ইবনে তাইমিয়ার কলম চালনা শুরু হলে কয়েক খণ্ডের দীর্ঘ রচনা হওয়ার আগ পর্যন্ত তা আর থামবে না। উপদেশগুলো তখন পৃথক একটি কয়েক খণ্ডের কিতাব আকারে দাঁড়াবে।
ইবনে তাইমিয়া লোকটির উদ্দেশ্য বুঝে চিঠির জওয়াব লিখলেন- সকল প্রশংসা বিশ্বপ্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য।
ইবনে তাইমিয়া যে কোন উত্তরনামা সবসময় আল্লাহ -র প্রশংসা দিয়ে শুরু করতেন। রাসূল ﷺ থেকে বর্ণিত হয়েছে, 'যে কাজ আল্লাহর প্রশংসা ছাড়া শুরু হয়, তা অপূর্ণ।'
কোন কোন বর্ণনায় 'আল্লাহর প্রশংসা' এর স্থলে 'বিসমিল্লাহ' বা 'আল্লাহর স্মরণ' শব্দমালা দিয়ে বর্ণিত হয়েছে। এই হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনাসূত্র দুর্বল হলেও সামষ্টিকভাবে তা হাসান পর্যায়ে পৌঁছে। ইবনে তাইমিয়া সবসময় এই হাদিস দিয়েই তার সকল বিষয়ের সূচনা করতেন। আল্লাহ তাকে যে জ্ঞান প্রজ্ঞা এবং দীনের বুঝ দান করেছেন, তিনি সেই নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায় করতেন। রাসূল ﷺ যে কোন খোৎবা আল্লাহর প্রশংসা দিয়ে শুরু করতেন। চিঠিপত্র বিসমিল্লাহ দিয়ে শুরু করতেন। এটি রাসূলের আদর্শ।
আপনি আমার কাছে উপদেশ চেয়েছেন। যে আল্লাহর ও রাসূলের উপদেশ বোঝে এবং অনুসরণ করে, তার জন্য আমার দৃষ্টিতে সর্বশ্রেষ্ঠ উপদেশ হল আল্লাহ -র এই বাণী-
বস্তুত আমি নির্দেশ দিয়েছি তোমাদের পূর্ববর্তী গ্রন্থের অধিকারীদের এবং তোমাদের যে তোমরা সবাই ভয় করতে থাক আল্লাহকে। [সূরা নিসা : ১৩১]
এটি হল বান্দার প্রতি আল্লাহ -র উপদেশ। আল্লাহ তার কিতাবে এই উপদেশ দিয়েছেন। রাসূল ﷺ -ও হাদিসে এই উপদেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলকে তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দিয়েছেন। তাকওয়ার উপদেশই হল সর্বাপেক্ষা তাৎপর্যপূর্ণ উপদেশ।
ইবনুল কাইয়িম কিতাবুল ফাওয়ায়েদ-এ উল্লেখ করেন- সুলাইমান বলেন, 'মানুষ যেসব বিষয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, আমরাও সেসব বিষয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি। মানুষ যেসব বিষয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না, সেসব বিষয় থেকেও আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি। তাকওয়ার মত গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু পাইনি। মানুষ যেন তার বন্ধু সহচর ছেলে প্রতিবেশীদের তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ প্রদান করে।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00