📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 কিয়ামুল্লাইলে সহযোগী আমল

📄 কিয়ামুল্লাইলে সহযোগী আমল


কিয়ামুল্লাইল আদায়ে সহযোগী আমল অনেক রয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হল-
এক. ঘুমানোর সময় তেত্রিশ বার সুবহানাল্লাহ, তেত্রিশ বার আলহামদুলিল্লাহ, চৌত্রিশ বার আল্লাহু আকবার পাঠ করা।
ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসূল ﷺ-এর কাছে একজন মহিলা খাদেম চেয়েছিলেন। রাসূল ﷺ তাকে বললেন- আমি তোমাদের একজন খাদেমের তুলনায় আরও উত্তম কিছু দিবো! যখন তোমরা ঘুমুতে যাবে, তেত্রিশ বার সুবহানাল্লাহ, তেত্রিশ বার আলহামদুলিল্লাহ, চৌত্রিশ বার আল্লাহু আকবার পাঠ করবে। [বুখারি : ৩১১৩]
দুই. দিনে একটু বিশ্রাম গ্রহণ করা। সম্ভব হলে যোহরের আগে, না হয় মধ্যাহ্নভোজের পরে।
তিন. গোনাহ পাপাচার কমিয়ে দেয়া। গোনাহ পাপাচার মানুষের মধ্যে এবাদতের ক্ষেত্রে অলসতা তৈরি করে। কিয়ামুল্লাইলের আগ্রহ ও উদ্যম নষ্ট করে।
হাসান বসরি বলেন, 'হে আবু সাঈদ! আমরা কিয়ামুল্লাইল করতে পারি না।' আবু সাঈদ উত্তর দিলেন, 'আল্লাহর কসম! তোমাদের গোনাহ তোমাদেরকে কয়েদি করে রেখেছে।'
চার.
দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া এবং রাত্রি জাগরণ পরিহার করা। রাত্রি জাগরণে বিশেষ কোন লাভ নেই। বরং তা ক্ষতিকর বটে।
ওলামায়ে কেরام বলেন, যে ব্যক্তি রাত্রি জাগরণের ফলে ফজরের সালাত আদায় করতে পারল না, তাহলে কোরআন তেলাওয়াত করে রাত্রি জাগরণ করলেও সে একটি হারাম কাজে লিপ্ত হয়েছে বলে বিবেচিত হবে। কারণ, কোরআন তেলাওয়াত নফল এবং ফজরের সালাত আদায় করা ফরয।
বিষয়টি যদি এমনই হয়, তাহলে যে ব্যক্তি কথাবার্তা গল্পগুজবে রাত কাটাল এবং ফজরের সালাত আদায় করতে পারল না, তার ব্যাপারে আমরা কী বলতে পারি!

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 কিয়ামুল্লাইলের দোয়া

📄 কিয়ামুল্লাইলের দোয়া


কিয়ামুল্লাইলের তিনটি দোয়া এখানে উল্লেখ করা হল। এই দোয়াগুলো মুখস্থ করা সম্ভব না হলে যে যার সাধ্যমত আল্লাহ ﷻ-এর কাছে কায়মনোবাক্যে দোয়া করবো। মানুষ যখন অন্যমনস্ক থাকে, তখন তার অলঙ্কারপূর্ণ কথাবার্তাও আল্লাহ ﷻ-এর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম হতে পারে না।
এক.
আয়েশা বলেন, রাসূল ﷺ যখন কিয়ামুল্লাইলে দাঁড়াতেন, তখন এই দোয়া পড়তেন-
اللَّهُمَّ رَبَّ جِبْرِيلَ وَمِيكَائِيلَ وَإِسْرَافِيلَ فَاطِرَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ عَالِمَ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ أَنْتَ تَحْكُمُ بَيْنَ عِبَادِكَ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ اهْدِنِي لِمَا اخْتَلَفْتُ فِيهِ مَنْ الْحَقِّ بِإِذْنِكَ إِنَّكَ تَهْدِي مَنْ تَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ
হে আল্লাহ! জিবরাইল মিকাইল ইসরাফীলের প্রভু! আসমান ও যমিনসমূহের সৃষ্টিকারী! দৃশ্য অদৃশ্য সবকিছুর জান্তা! আপনি আপনার বান্দাদের বিবাদমান বিষয়ে বিহিত করেন। হকের ব্যাপারে যে বিবাদ করা হচ্ছে, তাতে আপনি স্বীয় অনুগ্রহে আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। আপনি যাকে ইচ্ছা, সরল পথ প্রদর্শন করেন। [মুসলিম : ২৫২২৫]
দুই. রাসূল ﷺ কিয়ামুল্লাইলে দাঁড়িয়ে এই দোয়া পাঠ করতেন-
اللَّهُمَّ اجْعَلْ فِي قَلْبِي نُورًا وَفِي سَمْعِي نُورًا وَفِي بَصَرِي نُورًا وَعَنْ يَمِينِي نُورًا وَعَنْ شِمَالِي نُورًا وَأَمَامِي نُورًا وَخَلْفِى نُورًا وَفَوْقِ نُورًا وَتَحْتِي نُورًا وَاجْعَلْ لِي نُورًا أَوْ قَالَ وَاجْعَلْنِي نُورًا
হে আল্লাহ! আমার অন্তরে নূর স্থাপন করো। আমার শ্রবণে নূর দাও। আমার দৃষ্টিতে নূর দাও। আমার সামনে-পিছনে নূর দাও। আমার ডানে- বাঁয়ে নূর দাও। আমার উপরে-নিচে নূর দাও। আমার অস্থি-গোস্তে নূর দাও। আমার রক্তে, পশমে, ত্বকে নূর দাও। [মুসলিম: ১৮৩০]
উক্ত দোয়া সেই নূরের প্রার্থনা করা হয়েছে, যা আল্লাহ বলেছেন-
আল্লাহ নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের নূর। তার নূরের উদাহরণ যেন একটি কুলঙ্গি। [সূরা নূর: ৩৫]
তিন.
اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ قَيَّمُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَنْ فِيهِنَّ وَلَكَ الْحَمْدُ لَكَ مُلْكُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَنْ فِيهِنَّ وَلَكَ الْحَمْدُ نُورُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ الْحَقُّ وَوَعْدُكَ الْحَقُّ وَلِقَاؤُكَ حَقٌّ وَقَوْلُكَ حَقٌّ وَالْجَنَّةُ حَقٌّ وَالنَّارُ حَقٌّ وَالنَّبِيُّونَ حَقٌّ وَمُحَمَّدُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَقٌّ وَالسَّاعَةُ حَقٌّ اللَّهُمَّ لَكَ أَسْلَمْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْكَ أَنَبْتُ وَبِكَ خَاصَمْتُ وَإِلَيْكَ حَاكَمْتُ فَاغْفِرْ لِي مَا قَدَّمْتُ وَمَا أَخَّرْتُ وَمَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ أَنْتَ الْمُقَدِّمُ وَأَنْتَ الْمُؤَخِّرُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ.
আল্লাহ, তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি আসমান যমিন এবং এতদুভয়ের সবকিছুর তত্ত্বাবধায়ক। তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি আসমান যমিন এবং এতদুভয়ের সবকিছুর নূর। তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি আসমান যমিন এবং এতদুভয়ের সবকিছুর মালিক। তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি সত্য। তোমার ওয়াদা সত্য। তোমার বাণী সত্য। জান্নাত সত্য। দোযখ সত্য। সকল নবী সত্য। মোহাম্মদ সত্য।
আল্লাহ, তোমারই জন্য আমি সমর্পিত। তোমাতেই আমি বিশ্বাস রেখেছি। তোমারই উপর ভরসা করেছি। তোমারই কাছে প্রত্যাবর্তন করেছি। তোমারই রাহে লড়াই করেছি। তোমরাই দরবারে বিচার চেয়েছি। তুমি আমাকে ক্ষমা কর। আমার পূর্বাপর ক্ষমা কর। আমার প্রকাশ্য-গোপনীয় সবকিছু ক্ষমা কর।

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 আকাবির আসলাফের কিয়ামুল্লাইল

📄 আকাবির আসলাফের কিয়ামুল্লাইল


আকাবির আসলাফের; আমাদের পূর্ববর্তী মহান মনীষীদের কিয়ামুল্লাইলের কিছু আলোচনা পূর্বে বিবৃত হয়েছে। কিয়ামুল্লাইল, তাহাজ্জুদ ছিল তাদের জীবনের পাথেয়।
বিখ্যাত মুজাহিদ ও পরহেযগার আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক রাহি. এর জনৈক ছাত্র বলেন, আমরা আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারকের সাথে খোরাসানের মাটিতে জিহাদে গিয়েছিলাম। একদিন রাতে ঘুমুতে গিয়ে ভাবলাম, আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক সারারাত কী করেন, দেখবো।
সেদিন রাত ছিল শীতকম্পিত। আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক ঘুম থেকে উঠে ঠান্ডা পানি দিয়ে অজু করলেন। সালাতে দাঁড়িয়ে কোরআন তেলাওয়াত করতে লাগলেন-
প্রাচুর্যের লালসা তোমাদের গাফেল রাখে। এমনকি তোমরা কবরস্থানে পৌঁছে যাও।... [সূরা তাকাসুর]
তিনি ফজর পর্যন্ত সালাতেই মগ্ন রইলেন।
ইবনে কাসির এবং যাহাবি সিলা বিন উসাইমের ঘটনা বর্ণনা করেন- সিলা বিন উসাইম কাবুলে জিহাদে গিয়েছিলেন। তিনি রাতে তাহাজ্জুদ শুরু করার আগ পর্যন্ত বিছানায় ছটফট করতেন।
তার এক সহচর বর্ণনা করেন, সিলা বিন উসাইম কাবুলের এক বনে সালাত পড়তেন। একদিন আমি গাছে চড়ে বসলাম তার এবাদত দেখার জন্য।
সেটি ছিল বনের রাজা সিংহের অভয়ারণ্য। সিলা বিন উসাইম সালাত শুরু করলেন। আল্লাহ -র কাছে কান্না করছেন। এমন সময় একটি সিংহ বন থেকে বেরিয়ে তার দিকে আসতে লাগল। আল্লাহর কসম! সিলা বিন উসাইম একটুও বিচলিত হলেন না। নড়াচড়া করলেন না। স্থির চিত্তে সালাত শেষ করলেন। সিংহটি তার পাশে দাঁড়াল। সালাত শেষে সিংহকে নির্দেশসুরে বললেন, 'হে বনের রাজা সিংহ! তুমি আমার মৃত্যুদূত হয়ে আসলে আমাকে খেয়ে যেতে পার। আল্লাহ -র প্রতিরক্ষা ছাড়া আমার আর কোন অস্ত্র নেই। আর মৃত্যুদূত হয়ে না আসলে চলে যাও। আহার খোঁজ কর। আমাকে সালাত পড়তে দাও।'
সিলা বিন উসাইমের কথা শুনে সিংহটি লেজ নাড়িয়ে মাথা ঝুঁঁকিয়ে সন্তর্পণে আপন গুহায় চলে গেল। সিলা বিন উসাইম ভোর পর্যন্ত সালাতেই রত রইলেন।
সকালে যখন তার সাথে দেখা, তখন তিনি অত্যন্ত প্রফুল্ল ও প্রাণবন্ত। অথচ আমি তখন খুবই ক্লান্ত। কারণ তিনি রাত কাটিয়েছেন আল্লাহ -র সান্নিধ্যে। আর আমি!
হাসান বসরিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, 'যারা কিয়ামুল্লাইল আদায় করেন, তাদের চেহারা এত উজ্জ্বল থাকে কেন?'
তিনি বললেন, 'তারা আল্লাহর সান্নিধ্যে থাকে। এজন্য আল্লাহ তাদের চেহারায় একটি নূর দান করেন। এই নূর আল্লাহর নূর।'

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 কিয়ামুল্লাইলের কিছু ঘটনা ও হাদিস

📄 কিয়ামুল্লাইলের কিছু ঘটনা ও হাদিস


ইবনে ওমর নিজের ঘটনা বর্ণনা করেন-
রাসূলের যুগে সাহাবায়ে কেরাম বিভিন্ন স্বপ্ন দেখতেন। রাসূল ফজরের সালাত আদায় করে আমাদের দিকে ফিরে বসতেন। জিজ্ঞেস করতেন, 'তোমাদের কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছ?'
সাহাবায়ে কেরام কোন স্বপ্ন দেখলে তা রাসূলের কাছে বলতেন।
আমি তখন মসজিদে ঘুমাতাম। একরাতে স্বপ্নে দেখলাম- দুই ব্যক্তি এসে একজন আমার ডান হাত ধরল, অপরজন বাম হাত ধরল। তারা আমাকে একটি বাঁধানো কূপের দিকে নিয়ে গেল। কূপের মধ্যে একটি সম্প্রদায়কে শাস্তি দেয়া হচ্ছে।
আমি ভয় পেয়ে গেলাম। লোক দুজন আমাকে বলল, 'ভয় পেওনা, ভয় পেওনা।'
তারা আবার আমার হাত ধরল। আমি তাদের সাথে চললাম। তারা রেশমের একপ্রস্ত কাপড় আমার হাতে দিল। সেই কাপড় দিয়ে যে দিকেই ইঙ্গিত করছি, আমাকে সেদিকেই একটি সবুজ বাগানের উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
সকালে ইবনে ওমর রাসূলের কাছে তার স্বপ্নের কথা খুলে বলার উদ্যোগ নিলেন। কিন্তু লজ্জা পেলেন। তখন ইবনে ওমরের বয়স কম ছিল। অবিবাহিত ছিলেন তিনি।
ইবনে ওমর আপন বোন হাফসাকে স্বপ্নের কথা জানালেন এবং রাসূলকে বিষয়টি জানানোর জন্য বললেন।
হাফসা রাসূলের কাছে ইবনে ওমরের স্বপ্নের কথা জানালেন। রাসূল স্মিতহাস্যে বললেন, 'আব্দুল্লাহ কতই ভালো লোক! যদি সে রাত জেগে তাহাজ্জুদ আদায় করতো!' [বুখারি : ১১২২]
এরপর থেকে ইবনে ওমর রাতে আর ঘুমুতেন না।
ওলামায়ে কেরাম ইবনে ওমরের উক্ত স্বপ্নের ব্যাখ্যা বর্ণনা করেন। স্বপ্নের বাঁধানো কূপটি ছিল জাহান্নাম। ইবনে ওমরকে জাহান্নামের ভয় দেখানো হয়েছে। আল্লাহ আমাদের জাহান্নাম থেকে হেফাযত করুন।
স্বপ্নের লোক দুজন ছিলেন ফেরেশতা। রেশমের কাপড় হল ইবনে ওমরের নেক আমল। নেক আমল মানুষকে এমনই এক মর্যাদা থেকে আরেক মর্যাদায় উন্নীত করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00