📄 কিয়ামুল্লাইল কত রাকাত
কিয়ামুল্লাইলের সর্বোচ্চ কোন রাকাতসংখ্যা নেই। ওলামায়ে কেরামের এমনই অভিমত। পূর্ববর্তী ওলামায়ে কেরামের থেকে রাতের দীর্ঘ সময় কিয়ামুল্লাইলে কাটানোর অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে।
ইমাম যাহাবি সিয়ারু আলামিন নুবালা গ্রন্থে যাইনুল আবিদিন আলি ইবনে হুসাইন এর জীবনীতে উল্লেখ করেন, তিনি এক রাতে এক হাজার রাকাত পর্যন্ত কিয়ামুল্লাইল আদায় করতেন।
আতা ইবনে আবি রাবাহ রাতে সালাতে দাঁড়াতেন। যতক্ষণ সালাত থেকে ঢলে না পড়তেন, ততক্ষণ তিনি সালাতেই থাকতেন।
উল্লেখ্য, আমাদের জন্য যতটুকু সহজ হয়, ততটুকুই আমরা আদায় করবো। আল্লাহ আমাদের জন্য সবকিছু সহজ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে-
আপনাকে ক্লেশ দেয়ার জন্য আমি আপনার প্রতি কোরআন অবতীর্ণ করিনি। [সূরা ত্বাহা : ০২]
আমি আপনার জন্য সহজ শরীয়ত সহজতর করে দিবো। [সূরা আ'লা: ০৮]
আল্লাহ কাউকে সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না। [সূরা বাকারা: ২৮৬]
তিনি তোমাদের পছন্দ করেছেন এবং ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন সঙ্কীর্ণতা রাখেননি। [সূরা হাজ্জ : ৭৮]
এবং তাদের উপর থেকে সে বোঝা নামিয়ে দেন এবং বন্দিত্ব অপসারণ করেন, যা তাদের উপর বিদ্যমান ছিল। [সূরা আরাফ : ১৫৭]
মধ্যপন্থায় নিয়মিত এবাদত করা আমাদের দায়িত্ব। অল্প ক'রাকাত হলেও নিয়মিত কিয়ামুল্লাইল আদায় করবো। একরাতে একশ রাকাত আদায় করে পুরো বছর আর কিয়ামুল্লাইল আদায় না করার চেয়ে নিয়মিত অল্প ক'রাকাত আদায় করা ঢের উত্তম।
রাসূল ইরশাদ করেন-
আল্লাহর কাছে এমন আমল সবচেয়ে প্রিয়, যা অল্প হলেও নিয়মিত হয়। [বুখারি : ১৯৭০]
📄 কিয়ামুল্লাইল সর্বনিম্ন কত রাকাত
এশার সালাতের সাথে সাথে সালাতুল বিতির আদায়কারী যদি শেষ রাতে কিয়ামুল্লাইল আদায় করতে চায়, তবে তিনি দুই রাকাত আদায় করলেই কিয়ামুল্লাইল হিসেবে গণ্য হবে। যে ব্যক্তি এই আমল নিয়মিত করবে, সে সৌভাগ্যবান। সে আল্লাহ ﷻ-এর কাছে পছন্দের ব্যক্তি।
📄 কিয়ামুল্লাইলে সহযোগী আমল
কিয়ামুল্লাইল আদায়ে সহযোগী আমল অনেক রয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হল-
এক. ঘুমানোর সময় তেত্রিশ বার সুবহানাল্লাহ, তেত্রিশ বার আলহামদুলিল্লাহ, চৌত্রিশ বার আল্লাহু আকবার পাঠ করা।
ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসূল ﷺ-এর কাছে একজন মহিলা খাদেম চেয়েছিলেন। রাসূল ﷺ তাকে বললেন- আমি তোমাদের একজন খাদেমের তুলনায় আরও উত্তম কিছু দিবো! যখন তোমরা ঘুমুতে যাবে, তেত্রিশ বার সুবহানাল্লাহ, তেত্রিশ বার আলহামদুলিল্লাহ, চৌত্রিশ বার আল্লাহু আকবার পাঠ করবে। [বুখারি : ৩১১৩]
দুই. দিনে একটু বিশ্রাম গ্রহণ করা। সম্ভব হলে যোহরের আগে, না হয় মধ্যাহ্নভোজের পরে।
তিন. গোনাহ পাপাচার কমিয়ে দেয়া। গোনাহ পাপাচার মানুষের মধ্যে এবাদতের ক্ষেত্রে অলসতা তৈরি করে। কিয়ামুল্লাইলের আগ্রহ ও উদ্যম নষ্ট করে।
হাসান বসরি বলেন, 'হে আবু সাঈদ! আমরা কিয়ামুল্লাইল করতে পারি না।' আবু সাঈদ উত্তর দিলেন, 'আল্লাহর কসম! তোমাদের গোনাহ তোমাদেরকে কয়েদি করে রেখেছে।'
চার.
দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া এবং রাত্রি জাগরণ পরিহার করা। রাত্রি জাগরণে বিশেষ কোন লাভ নেই। বরং তা ক্ষতিকর বটে।
ওলামায়ে কেরام বলেন, যে ব্যক্তি রাত্রি জাগরণের ফলে ফজরের সালাত আদায় করতে পারল না, তাহলে কোরআন তেলাওয়াত করে রাত্রি জাগরণ করলেও সে একটি হারাম কাজে লিপ্ত হয়েছে বলে বিবেচিত হবে। কারণ, কোরআন তেলাওয়াত নফল এবং ফজরের সালাত আদায় করা ফরয।
বিষয়টি যদি এমনই হয়, তাহলে যে ব্যক্তি কথাবার্তা গল্পগুজবে রাত কাটাল এবং ফজরের সালাত আদায় করতে পারল না, তার ব্যাপারে আমরা কী বলতে পারি!
📄 কিয়ামুল্লাইলের দোয়া
কিয়ামুল্লাইলের তিনটি দোয়া এখানে উল্লেখ করা হল। এই দোয়াগুলো মুখস্থ করা সম্ভব না হলে যে যার সাধ্যমত আল্লাহ ﷻ-এর কাছে কায়মনোবাক্যে দোয়া করবো। মানুষ যখন অন্যমনস্ক থাকে, তখন তার অলঙ্কারপূর্ণ কথাবার্তাও আল্লাহ ﷻ-এর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম হতে পারে না।
এক.
আয়েশা বলেন, রাসূল ﷺ যখন কিয়ামুল্লাইলে দাঁড়াতেন, তখন এই দোয়া পড়তেন-
اللَّهُمَّ رَبَّ جِبْرِيلَ وَمِيكَائِيلَ وَإِسْرَافِيلَ فَاطِرَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ عَالِمَ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ أَنْتَ تَحْكُمُ بَيْنَ عِبَادِكَ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ اهْدِنِي لِمَا اخْتَلَفْتُ فِيهِ مَنْ الْحَقِّ بِإِذْنِكَ إِنَّكَ تَهْدِي مَنْ تَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ
হে আল্লাহ! জিবরাইল মিকাইল ইসরাফীলের প্রভু! আসমান ও যমিনসমূহের সৃষ্টিকারী! দৃশ্য অদৃশ্য সবকিছুর জান্তা! আপনি আপনার বান্দাদের বিবাদমান বিষয়ে বিহিত করেন। হকের ব্যাপারে যে বিবাদ করা হচ্ছে, তাতে আপনি স্বীয় অনুগ্রহে আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। আপনি যাকে ইচ্ছা, সরল পথ প্রদর্শন করেন। [মুসলিম : ২৫২২৫]
দুই. রাসূল ﷺ কিয়ামুল্লাইলে দাঁড়িয়ে এই দোয়া পাঠ করতেন-
اللَّهُمَّ اجْعَلْ فِي قَلْبِي نُورًا وَفِي سَمْعِي نُورًا وَفِي بَصَرِي نُورًا وَعَنْ يَمِينِي نُورًا وَعَنْ شِمَالِي نُورًا وَأَمَامِي نُورًا وَخَلْفِى نُورًا وَفَوْقِ نُورًا وَتَحْتِي نُورًا وَاجْعَلْ لِي نُورًا أَوْ قَالَ وَاجْعَلْنِي نُورًا
হে আল্লাহ! আমার অন্তরে নূর স্থাপন করো। আমার শ্রবণে নূর দাও। আমার দৃষ্টিতে নূর দাও। আমার সামনে-পিছনে নূর দাও। আমার ডানে- বাঁয়ে নূর দাও। আমার উপরে-নিচে নূর দাও। আমার অস্থি-গোস্তে নূর দাও। আমার রক্তে, পশমে, ত্বকে নূর দাও। [মুসলিম: ১৮৩০]
উক্ত দোয়া সেই নূরের প্রার্থনা করা হয়েছে, যা আল্লাহ বলেছেন-
আল্লাহ নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের নূর। তার নূরের উদাহরণ যেন একটি কুলঙ্গি। [সূরা নূর: ৩৫]
তিন.
اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ قَيَّمُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَنْ فِيهِنَّ وَلَكَ الْحَمْدُ لَكَ مُلْكُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَنْ فِيهِنَّ وَلَكَ الْحَمْدُ نُورُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ الْحَقُّ وَوَعْدُكَ الْحَقُّ وَلِقَاؤُكَ حَقٌّ وَقَوْلُكَ حَقٌّ وَالْجَنَّةُ حَقٌّ وَالنَّارُ حَقٌّ وَالنَّبِيُّونَ حَقٌّ وَمُحَمَّدُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَقٌّ وَالسَّاعَةُ حَقٌّ اللَّهُمَّ لَكَ أَسْلَمْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْكَ أَنَبْتُ وَبِكَ خَاصَمْتُ وَإِلَيْكَ حَاكَمْتُ فَاغْفِرْ لِي مَا قَدَّمْتُ وَمَا أَخَّرْتُ وَمَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ أَنْتَ الْمُقَدِّمُ وَأَنْتَ الْمُؤَخِّرُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ.
আল্লাহ, তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি আসমান যমিন এবং এতদুভয়ের সবকিছুর তত্ত্বাবধায়ক। তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি আসমান যমিন এবং এতদুভয়ের সবকিছুর নূর। তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি আসমান যমিন এবং এতদুভয়ের সবকিছুর মালিক। তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি সত্য। তোমার ওয়াদা সত্য। তোমার বাণী সত্য। জান্নাত সত্য। দোযখ সত্য। সকল নবী সত্য। মোহাম্মদ সত্য।
আল্লাহ, তোমারই জন্য আমি সমর্পিত। তোমাতেই আমি বিশ্বাস রেখেছি। তোমারই উপর ভরসা করেছি। তোমারই কাছে প্রত্যাবর্তন করেছি। তোমারই রাহে লড়াই করেছি। তোমরাই দরবারে বিচার চেয়েছি। তুমি আমাকে ক্ষমা কর। আমার পূর্বাপর ক্ষমা কর। আমার প্রকাশ্য-গোপনীয় সবকিছু ক্ষমা কর।