📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 রাতজাগা আবেদ

📄 রাতজাগা আবেদ


আল্লাহ! তোমারই গুণকীর্তন করছি। তোমারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি। তোমারই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। তোমারই কাছে হেদায়াত প্রত্যাশা করছি। তোমারই জন্য সকল স্তুতি ও বন্দনা হে আল্লাহ!
মনের যত ধোঁকা ও দুষ্টুমি, আমলের যত দোষ ও ত্রুটি, সবকিছু থেকে তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তুমি যাকে দিশা দাও, কে তাকে বিস্মৃত করতে পারে! তুমি যাকে ভ্রান্ত বানাও, কে তাকে সঠিক পথের খোঁজ দিতে পারে!
হে আল্লাহ! তুমি এক ও অদ্বিতীয়, মোহাম্মদ তোমার বান্দা ও রাসূল, -এ আমার অন্তরসাক্ষ্য।
ইমাম বুখারি (রহঃ) তাহাজ্জুদ অধ্যায়ে লিখেন- আল্লাহ বলেন-
রাতের কিছু অংশ কোরআন পাঠসহ জাগ্রত থাকুন। এটা আপনার জন্য অতিরিক্ত। [সূরা ইসরা : ৭৯]
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসূল (সঃ) তাহাজ্জুদের জন্য উঠে এই দোয়া পড়তেন-
اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ قَيَّمُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَنْ فِيهِنَّ وَلَكَ الْحَمْدُ لَكَ مُلْكُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَنْ فِيهِنَّ وَلَكَ الْحَمْدُ نُورُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ الْحَقُّ وَوَعْدُكَ الْحَقُّ وَلِقَاؤُكَ حَقٌّ وَقَوْلُكَ حَقٌّ وَالْجَنَّةُ حَقٌّ وَالنَّارُ حَقٌّ وَالنَّبِيُّونَ حَقٌّ وَمُحَمَّدٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَقٌّ وَالسَّاعَةُ حَقٌّ اللَّهُمَّ لَكَ أَسْلَمْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْكَ أَنَبْتُ وَبِكَ خَاصَمْتُ وَإِلَيْكَ حَاكَمْتُ فَاغْفِرْ لِي مَا قَدَّمْتُ وَمَا أَخَرْتُ وَمَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ أَنْتَ الْمُقَدِّمُ وَأَنْتَ الْمُؤَخِّرُ لَا اله الا أنت
আল্লাহ, তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি আসমান যমিন এবং এতদুভয়ের সবকিছুর তত্ত্বাবধায়ক। তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি আসমান যমিন এবং এতদুভয়ের সবকিছুর নূর। তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি আসমান যমিন এবং এতদুভয়ের সবকিছুর মালিক। তোমার জন্য সকল প্রশংসা, তুমি সত্য। তোমার ওয়াদা সত্য। তোমার বাণী সত্য। জান্নাত সত্য। দোযখ সত্য। সকল নবী সত্য। মোহাম্মদ সত্য।
আল্লাহ, তোমারই জন্য আমি সমর্পিত। তোমাতেই আমি বিশ্বাস রেখেছি। তোমারই উপর ভরসা করেছি। তোমারই কাছে প্রত্যাবর্তন করেছি। তোমারই রাহে লড়াই করেছি। তোমরাই দরবারে বিচার চেয়েছি। তুমি আমাকে ক্ষমা কর। আমার পূর্বাপর ক্ষমা কর। আমার প্রকাশ্য-গোপনীয় সবকিছু ক্ষমা কর। [বুখারি: ১১২০]
আল্লাহ বলেন-
রাতের কিছু অংশ কোরআন পাঠসহ জাগ্রত থাকুন। এটা আপনার জন্য অতিরিক্ত। হয়ত বা আপনার পালনকর্তা আপনাকে মাকামে মাহমূদে পৌঁছাবেন। [সূরা ইসরা : ৭৯]
আয়াতে রাসূলকে তাহাজ্জুদ সালাতে কোরআন পাঠসহ জাগ্রত থাকতে বলেছেন। অচিরেই তাকে মাকামে মাহমূদে পৌঁছার সুসংবাদ প্রদান করেছেন। বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি আখেরাতে হিসাবের মহাময়দানে সহজভাবে দাঁড়াতে চায়, সে যেন রাতের কিছু অংশ তাহাজ্জুদে দাঁড়ায়।
দুর্বল সনদের একটি হাদিসে বর্ণিত আছে, কবরের অন্ধকারের জন্য রাতের অন্ধকারে দুই রাকাত সালাত পড়। পুনরুত্থানে দাঁড়ানোর জন্য কিছু সদকা কর। [ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকিন: ৫/১৮৭]
রাতের কিছু অংশ কোরআন পাঠসহ জাগ্রত থাকুন। এটা আপনার জন্য অতিরিক্ত। [সূরা ইসরা : ৭৯]
রাতের কিছু অংশ কোরআন পাঠসহ জাগ্রত থাকা রাসূলের জন্য অতিরিক্ত হওয়ার দুটি অর্থ হতে পারে-
এক.
এই বিধান রাসূলের জন্যই অতিরিক্ত আবশ্যক, উম্মতের জন্য নয়। তাবরানী গ্রন্থের একটি দুর্বল সনদের হাদিস থেকেও এই ব্যাখ্যা বুঝা যায়। বর্ণিত হয়েছে- ইবনে আব্বাস বলেন- 'রাতে জাগ্রত থাকার বিধান বিশেষভাবে রাসূল -এর জন্য আবশ্যক। আমাদের জন্য এটি অতিরিক্ত।'
বিশেষভাবে রাসূলের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পর অতিরিক্ত আরও এক ওয়াক্ত আবশ্যক। রাসূল কখনও এই সালাত ছাড়তেন না। কোথাও সফরে বের হলেও তিনি এই সালাত ত্যাগ করতেন না। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এই আমল করে গেছেন।
দুই.
রাসূলের জন্য এটি নফল এবাদত। অতিরিক্ত একটি উত্তম আমল। অন্যদের জন্য এটি নফলও নয়। বরং অন্যদের জন্য এই এবাদত বিভিন্ন গোনাহ ও পাপাচারের কাফফারাস্বরূপ। রাসূল -এর কোন গোনাহ ছিল না। তার পূর্বাপর সবকিছু ক্ষমাঘোষিত ছিল। আল্লাহ বলেন-
যাতে আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যতের ত্রুটিসমূহ মার্জনা করে দেন। [সূরা ফাতহ : ০২]
রাসূলের পূর্বাপর সব ক্ষমাঘোষিত ছিল, রাসূলের কাফফারার কোন প্রয়োজন ছিল না, এজন্য রাসূলের ক্ষেত্রে তাহাজ্জুদ হল নফল এবাদত। উম্মত গোনাহগার, তাই উম্মতের জন্য তা কাফফারাস্বরূপ।
আল্লাহ বলেন-
তারা রাতের সামান্য অংশই নিদ্রা যেত। রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করত। [সূরা যারিয়াত: ১৭, ১৮]
আহনাফ ইবনে কায়স বলেন, আমি নিজেকে আল্লাহর কিতাব দিয়ে যাচাই করে দেখলাম, আল্লাহর খাঁটি বান্দাগণ মহামহিমায় উদ্ভাসিত হয়েছেন। আল্লাহ তাদের গুণাগুণ বর্ণনা করে বলেছেন-
তারা রাতের সামান্য অংশই নিদ্রা যেত। [সূরা যারিয়াত : ১৭]
আফসোস, আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারিনি।
কাফেরদের সাথে নিজেকে যাচাই করে দেখলাম, তারা অত্যন্ত খবিস জাতি। পাপিষ্ঠ জাতি। আল্লাহকে অস্বীকারকারী। কেয়ামত অস্বীকারকারী। আলহামদুলিল্লাহ, আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হইনি।
আমি আবার নিজেকে যাচাই করলাম। এমন কিছু লোক আছে, যারা ভালো কাজের সাথে মন্দ কাজেও লিপ্ত হয়। আমি নিজেকে তাদের সারিতেই পেলাম।
ওলামায়ে কেরام বলেন, একটি ছাগলের দুগ্ধদোহন পরিমাণ সময় হলেও কিয়ামুল্লাইল করা উচিত। দুই রাকাত সালাতও যদি আদায় করা হয়, সেটাও কিয়ামুল্লাইল বলে বিবেচিত হবে।
আলেমগণ উদ্বুদ্ধ করে বলেন, রাতের শুরুতে হোক, মাঝে হোক, শেষে হোক, যে কোন মূহূর্তে কিয়ামুল্লাইল করলেই আল্লাহ -এর এই ঘোষণার অন্তর্ভুক্ত হওয়া যাবে-
তারা রাতের সামান্য অংশই নিদ্রা যেত। [সূরা যারিয়াত: ১৭]
জাফর সাদিক, আনাস ইবনে মালিক, কাতাদা ইবনে দিয়ামা আসসাদুসী বলেন, 'তারা রাতের সামান্য অংশই নিদ্রা যেত', অর্থাৎ মাগরিব থেকে এশা পর্যন্ত তারা সালাতে নিরত থাকত।
জাফর সাদিক অপর এক বর্ণনায় বলেন, 'তারা রাতের সামান্য অংশই নিদ্রা যেত'। এশা আদায় করে নিদ্রা যেত।
হাসান বসরি বলেন, আল্লাহর কসম! কিয়ামুল্লাইল করে তোমরা মূলত আল্লাহর সাথেই রাত্রি যাপন কর। আল্লাহ বলেন,
যে আমায় স্মরণ করে, আমি তার সাথেই উপবেসন করি। [প্রাগুক্ত]
ফুযাইল ইবনে ইয়ায ওয়াকি -কে বললেন, 'ওয়াকি! আল্লাহ কী বলেছেন জান!'
ওয়াকী বললেন, 'না।'
ফুযাইল বলেন, “আল্লাহ বলেছেন, 'যে আমার ভালোবাসার দাবি করল, অথচ রাতে আমাকে ছেড়ে ঘুমিয়ে পড়ল, সে সত্য দাবি করেনি।" [সিয়ারু আলা মিন নুবালা : ২৭৫৩]
হাসান বসরি বলেন, 'তারা রাতের শুরু থেকেই আল্লাহর সাথে জেগে থাকতেন। রাত যখন শেষ হয়ে আসত, তখন তারা আল্লাহর কাছে অপরাধীর আসনে বসে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন।'
ইবনুল কাইয়িম আলোচ্য আয়াতের অর্থ একটু ভিন্নভাবে করেছেন। তার মতে আয়াতের অর্থ- তাদের অল্পই কিয়ামুল্লাইল করতেন না। সর্বনিম্ন দুই-চার রাকাত হলেও কিয়ামুল্লাইল করতেন। এছাড়া আল্লাহর তাওফিক অনুযায়ী যে যার সাধ্যমত কিয়ামুল্লাইল করতেন।
উল্লেখ্য, যে যতটুকু কিয়ামুল্লাইল করত, সকলেই আলোচ্য আয়াতে প্রশংসার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ বলেন-
রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করত। [সূরা যারিয়াত: ১৮]
সুবহানাল্লাহ! সারারাত এবাদতে কাটিয়ে শেষ রাতে অপরাধীর মত বসে যেতেন ক্ষমা প্রার্থনায়! সারারাত এবাদত করেও যেন ভুলত্রুটি বা গোনাহে রাত কাটানোর অনুভুতি! আল্লাহর সেসব খাঁটি বান্দার তুলনায় ঐসব বান্দারা কোথায় আছেন, যারা সারারাত আনন্দলাল কাটিয়েও শেষ রাতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে না!
তারা সারারাত আল্লাহর প্রতি একাগ্র থেকে, দোয়া কান্নাকাটি করেও শেষ রাতে ইসতিগফার করতেন। শেষ রাতে তারা আলহামদুলিল্লাহ, সুবহানাল্লাহ না বলে আসতাগফিরুল্লাহ বলতেন। কারণ, তারা তখনও নিজেদের অক্ষম অকৃতকার্য মনে করতেন। সারারাত এবাদতে কাটিয়ে তাদের যদি এই অনুভুতি হয়, তাহলে যারা সারারাত আল্লাহর অবাধ্যতা ও পাপাচারে লিপ্ত থাকে, তাদের পরিণতি কেমন হবে! আল্লাহ তো কেয়ামতের দিন সকলকেই একত্র করবেন! আল্লাহ বলেন-
তারা ধৈর্যধারণকারী, সত্যবাদী, নির্দেশ সম্পাদনকারী, সৎপথে ব্যয়কারী এবং শেষ রাতে ক্ষমা প্রার্থনাকারী। [সূরা আলে ইমরান : ১৭]
আয়াতে বিশেষভাবে শেষ রাতের ক্ষমা প্রার্থনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ শেষ রাতে নিকটবর্তী আকাশে অবতরণ করেন। বান্দাদের ডাকেন, 'কেউ আছ ঝাঞ্চাকারী! আমি তাকে দিবো। কেউ আমাকে ডাকছ! আমি সাড়া দিবো। কেউ আছ ক্ষমা প্রার্থনাকারী! আমি ক্ষমা করবো।' [বুখারি : ১১৪৫]
আল্লাহ শেষ রাতে নিকটবর্তী আকাশে তার শান অনুযায়ী অবতরণ করেন। কিভাবে অবতরণ করেন, আমরা তার আকৃতি কল্পনা করবো না। সাদৃশ্যতা ভাববো না। তিনি তার মতই।
কোন কিছুই তার অনুরূপ নয়। তিনি সব দেখেন, সব শুনেন। [সূরা শুরা : ১১]
তারা সারারাত এবাদত করে শেষ রাতে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। রাতের উপসংহারে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। মুমিনের সকল এবাদতের উপসংহার ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমেই হয়। আল্লাহ সকল নেক আমলের পরে ইসতিগফারের নির্দেশও করেছেন। যেমন সালাতের পর ইসতিগফার পাঠ করার সুন্নত রয়েছে। সাওবান থেকে বর্ণিত, রাসূল সালাতের সালাম ফিরিয়ে 'আসতাগফিরুল্লাহ আসতাগফিরুল্লাহ আসতাগফিরুল্লাহ' পাঠ করতেন। [মুসলিম : ৫৯১]
আল্লাহ রাসূলের শেষ জীবনে নাযিল করেছেন-
যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়, এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দীনে প্রবেশ করতে দেখবেন, তখন আপনি আপনার পালনকর্তার পবিত্রতা বর্ণনা করুন এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাকারী। [সূরা নাসর]
রাসূলের শেষ জীবনে এই সূরা নাযিলের মাধ্যমে একটি বার্তা দেয়া হয়েছে। বার্তাটি হল- আপনি আপনার প্রভুর কাছে ইসতিগফার পাঠের মাধ্যমে জীবনের পরিসমাপ্তি টানুন।
ইবনে তাইমিয়া বলেন, যে কোন নেক আমল ইসতিগফারের মাধ্যমে শেষ করার রহস্য হল, অনেক সময় মানুষ গর্ববোধ করতে পারে, আমি নেক কাজ করেছি, আমি ইসতিগফার করবো কেন? কিন্তু কোন নেক আমলই ত্রুটির উর্ধ্বে নয়। এজন্যই যে কোন নেক আমলের পরে ইসতিগফার করতে হয়।
শেষ রাত হল আল্লাহর খাঁটি বান্দাদের স্বতঃস্ফূর্ত এবাদত ও একাগ্রতার সময়। তাউস ইবনে কাইসান রাহি. একদিন ফজরের পূর্বে তার এক বন্ধুর সাক্ষাতে গেলেন। বন্ধুর ঘরের কড়া নাড়লেন। ভেতর থেকে বন্ধুর ছোট্ট মেয়ে বেরিয়ে সংবাদ দিল, 'বাবা ঘুমোচ্ছেন'।
তাউস ইবনে কাইসান আশ্চর্য হয়ে বললেন, সুবহানাল্লাহ! মোহাম্মদ -র কোন উম্মত ফজরের পূর্বে ঘুমায়! আমি তো কল্পনাই করতে পারি না!
তাউস ইবনে কাইসান সকলকে নিজের মত মনে করেছেন।
জনৈক আবেদের একটি বাঁদি ছিল। আবেদ অত্যন্ত আল্লাহভীরু ও আল্লাহওয়ালা ছিলেন। তিনি তার স্ত্রী-সন্তান, গোলাম-বাঁদি নিয়ে কিয়ামুল্লাইল করতেন। একদিন আবেদ তার বাঁদিটি বিক্রি করে দিলেন।
বাঁদি নতুন মালিকের ঘরে প্রথম রাত কাটাচ্ছে। রাতের আধাআধিতে বাঁদি সজাগ হল। সে মনে করেছিল, তার এই মালিকও আগের মালিকের মতই। এই ভেবে বাঁদি তার নতুন মালিককে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিল। মালিক জিজ্ঞেস করল, 'ফজরের সময় হয়ে গেছে?'
বাঁদি বলল, 'না। আপনি কিয়ামুল্লাইল করবেন না!'
মালিক বলল, 'কিয়ামুল্লাইল করবো না। ফজরে জাগিয়ে দিও।'
রাত শেষ হলে বাঁদি তার আগের মালিকের কাছে চলে এল। মালিককে বলল, 'আপনি আমার উপর জুলুম করেছেন। আপনি আমাকে এমন লোকের কাছে বিক্রি করেছেন, যিনি কিয়ামুল্লাইল করে না!'
রাসূল রাতে কোরআন তেলাওয়াত শোনার জন্য মদীনার অলিগলিতে ঘোরাঘুরি করতেন। যেদিকে সাহাবীদের কোরআন তেলাওয়াতের আওয়ায শুনতেন, সেদিকে যেতেন। একরাতে রাসূল মদীনার গলিতে ঘুরছেন। হঠাৎ শুনলেন, একজন বৃদ্ধা কেঁদে কেঁদে তেলাওয়াত করছেন-
هَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ الْغَاشِيَةِ
আপনার কাছে আচ্ছন্নকারী কেয়ামতের বৃত্তান্ত পৌঁছেছে কি? [গাশিয়া: ১]
মহিলা এই আয়াত বারবার তেলাওয়াত করছিলেন এবং কেঁদেই চলছিলেন।
রাসূল তার দরজার দিকে কান পেতে নিজেই কেঁদে ফেললেন এবং বলতে লাগলেন- 'হ্যাঁ, আচ্ছন্নকারীর সংবাদ আমার কাছে এসেছে।'
রাসূলের মত ওমর-ও কোরআন তেলাওয়াত শোনার জন্য মদীনার অলিগলিতে ঘোরাঘুরি করতেন এবং কোরআন তেলাওয়াত শুনতেন।
আবু মুসা আশয়ারি এর তেলাওয়াত ছিল অত্যন্ত সুললীত কণ্ঠের। তার কণ্ঠ মানুষের অন্তর ছুঁয়ে তরঙ্গায়িত হতো।
রাসূল এক রাতে মসজিদে এসে শরীর এলিয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন। মসজিদটি ছিল ঘরের পাশেই। তখন আবু মুসা তেলাওয়াত করছিলেন। রাসূল সেখান থেকেই আবু মুসার তেলাওয়াত শুনতে পেলেন। আবু মুসার তেলাওয়াত শুনে রাসূল কাঁদলেন। আবু মুসা জানতেন না, রাসূল তার তেলাওয়াত শুনছেন।
সকালে রাসূল আবু মুসার সাথে সাক্ষাৎ করে বললেন, 'গতরাতে তুমি আমাকে যদি দেখতে! আমি তোমার তেলাওয়াত শুনেছি। আমাকে দাউদের সুরেলাসুরের একটি দেয়া হয়েছে।'
আবু মুসা বললেন- 'হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমার তেলাওয়াত শুনেছেন!'
রাসূল বললেন- 'যার হাতে আমার জীবন, তার শপথ! আমি তোমার তেলাওয়াত শুনেছি।'
আবু মুসা বললেন, 'যার হাতে আমার জীবন, তার শপথ! যদি জানতাম আপনি আমার তেলাওয়াত শুনছেন, তাহলে আমি আপনার জন্য তেলাওয়াতকে আরও অলঙ্কৃত করতাম।' আমি তেলাওয়াতকে আরও বিশুদ্ধ, সুন্দর ও সুললিত করতাম।
আল্লাহ বলেন-
তাদের পার্শ্বশয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের পালনকর্তাকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদের যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। [সূরা সাজদা : ১৬]
ইবনে রাওয়াহা রাসূলের প্রশংসাগাঁথায় বলেন-
শরীর ও বিছানার যোজন দূরত্ব,
মুশরিকদের উৎপাতে কাটেনা যে রাত;
যবে আকাশ ছেয়ে উজ্জ্বল হয় যামিনী,
তখন শুনি রাসূলের তেলাওয়াত।
সুফিয়ান সাওরি সারারাত জেগে থাকতেন। জনৈক ব্যক্তি বলেন, একবার আমি তার কাছে রাত কাটিয়েছিলাম। চোখে ঘুম আসছে, এমন সময় দেখলাম, তিনি বিছানার উপর চড়ুই পাখির মত তড়পাচ্ছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'কী হয়েছে আপনার?'
তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম! জাহান্নামের স্মরণ আমার ঘুম তাড়িয়ে দিয়েছে।'
খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আযীযের স্ত্রী বলেন, “খলিফা রাতে বিছানায় আসতেন, কিন্তু ঘুমুতেন না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতেন। আমি তার কান্নার আওয়াজ শুনতাম। একবার তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'কী হয়েছে আপনার?”
তিনি বললেন, 'হায় আফসোস! মোহাম্মদের উম্মতের দায়িত্ব নিয়েছি আমি! দুর্বল, মিসকীন, শিশু, বিধবা, কত ধরনের মানুষ...!'
এ কথা বলে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং সালাত পড়ে সকাল পর্যন্ত কান্না করলেন!'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00