📄 আল্লাহর ভয় অন্তরে স্থাপন করার চারটি মাধ্যম
এক.
আল্লাহ -র ভয় অন্তরে স্থাপন করার একটি কার্যকরী মাধ্যম- কবর যিয়ারত করা। কবরগুলোতে আমাদের সন্তান, পূর্বপুরুষ, সাথি-সঙ্গী, বন্ধু-বান্ধব রয়েছে। কবর যিয়ারতের দ্বারা মনে মৃত্যুর কথা জাগে। মৃত্যুর ভয় সৃষ্টি হয়।
মৃত্যু এমনই এক নিয়তি- নিস্তার নেই এর থেকে। পলায়নের জায়গা নেই।
মৃত্যু এমনই এক শয়ান- শাবাধার থেকে এই নামে, এই তো আবার উঠে।
মানুষ কত স্বপ্ন বোনে, কত আশা পুষে রাখে অন্তরে; পড়ন্ত বার্ধক্যে!
গর্বোদ্দীপ্ত ভবন বানায় আকাশ ছুঁয়ে! অথচ সে জানে- মৃত্যু তার অচিরেই...
রাসূল ইরশাদ করেন- তোমরা কবর যিয়ারত কর। কবর মৃত্যুর কথা স্মরণ করায়।' 'কবর তোমাদের আখেরাতের কথা স্মরণ করায়। [আহমাদ : ৯৩৯৫]
রাসূল নিজে কবর যিয়ারত করতেন এবং কবরের কাছে গিয়ে এই দোয়া পড়তেন-
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ دَارَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لَأَحِقُونَ، يَرْحَمُ اللَّهُ الْمُسْتَقْدِمِينَ مِنَّا وَمِنْكُمْ وَالْمُسْتَأْخِرِينَ، نَسْأَلُ اللَّهَ لَنَا وَلَكُمُ الْعَافِيَةَ.
হে মুমিন ঘরের বাসিন্দা! তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। ইনশাআল্লাহ, অচিরেই আমরা তোমাদের সাথে মিলবো। আল্লাহ আমাদের এবং তোমাদের অনুজ-অগ্রজ সকলকে রহম করুন। আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য এবং তোমাদের জন্য নিরাপত্তা কামনা করছি। [মুসলিম : ৯৭৪, বুখারি : ৯৭৫]
মাতরাফ ইবনে আব্দুল্লাহ শাখির। তিনি নিজের ঘটনা বর্ণনা দিয়ে বলেন, আমি প্রতি সপ্তাহে বাসরার গ্রাম থেকে শহরে আসতাম জুমা আদায় করার জন্য। জুমাবারের একরাত আগে আমি সাধারণত আমি চলে আসতাম এবং জুমারাতে বাসরার কবরস্থান যিয়ারত করতাম। তাদের সালাম দিয়ে খুব করে দোয়া করতাম।
একরাতে প্রচন্ড বর্ষা ছিল। আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত ঠান্ডা। আমি সে রাতে কবরস্থান যিয়ারত করে কবরবাসীর জন্য দোয়া করতে না পেরে বাড়ি চলে আসলাম।
রাতে ঘুমালাম। স্বপ্নে দেখলাম- কবরের একজন লোক এসে আমাকে বলছে, 'মাতরাফ! আপনি আজ আমদের বঞ্চিত করলেন! আল্লাহর কসম! আপনার দোয়ার উসিলায় এক সপ্তাহ আমাদের কবরের আযাব বন্ধ থাকে।'
মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসির ঘটনা। একটি কবরস্থানের পাশ দিয়ে কোথাও যাওয়ার সময় লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ পাঠ করলেন। পাঠ করতেই অদৃশ্য থেকে শুনতে পেলেন- 'হে মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসি! লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ দ্বারা নিজের পথসম্বল যোগাড় করে নাও। তুমি যদি এর সাওয়াব ও প্রতিদান জানতে, নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে এই কালিমা পাঠ করতে। আমাদের মাঝে এবং এই কালিমার মাঝে এখন পর্দা পড়ে গেছে। আমরা এখন আর তা পড়তে পারি না।'
মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তার আমল করার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়।
কোন বেনামাযী মারা গেলে তার সালাত কে আদায় করবে?
কোন ব্যক্তি রোযা না রাখলে তার রোযা কে রাখবে?
কে তার পক্ষ থেকে সদকা করবে? ভালো কাজে খরচ করবে?
কে তার পক্ষ থেকে উত্তম আদর্শ দেখাবে?
এসব কি সম্ভব?
মানুষ যখন মরে যায়, তার ভালো কাজ করার রাস্তা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
দুই.
অন্তরে আল্লাহ -র ভয় বদ্ধমূল রাখার দ্বিতীয় একটি পন্থা- সবসময় মৃত্যুর কথা স্মরণ করা। সকাল-সন্ধ্যা মৃত্যুর স্মরণ করা। ঘুমুতে গেলেও মৃত্যুর কথা কল্পনা করা।
ওমর ইবনে আব্দুল আযিযের স্ত্রী ফাতেমা বিনতে আব্দুল মালিক বলেন, ওমর রাতে যখন বিছানায় যেতেন, ঠান্ডায় কাতরানো পাখির মতো ছটফট করতেন। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম- 'আমীরুল মুমিনীন! কী হয়েছে আপনার? আপনি ঘুমুচ্ছেন না কেন?'
তিনি বললেন, 'এই বিছানা, অন্ধকার ঘর আমাকে মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।'
ইমাম যাহাবি সুফয়ান সাওরি এর ব্যাপারে বর্ণনা করেন, তিনি ইশার পর থেকে ফজর পর্যন্ত সূরা তাকাসুর পাঠ করতেন। এর মধ্যে তন্দ্রাচ্ছন্ন হলে বলতেন, আমি কিভাবে ঘুমুবো; কবর আমার সামনে!
তিন.
আল্লাহ-র ভয় সৃষ্টি হওয়ার তৃতীয় একটি পন্থা- সবসময় আল্লাহ-র আযাবের কথা স্মরণ করা। আল্লাহর শাস্তি বড় ভয়ানক। তিনি যখন কাউকে শাস্তি দেন, বড় মর্মন্তুদ শাস্তি দেন। যখন প্রতিশোধ নেন, কঠিন প্রতিশোধ নেন। -এসব কথা সমসময় মনে মনে আওড়ালে আল্লাহ-র ভয় অন্তরে সৃষ্টি হয়।
ওমর সবসময় বলতেন এবং তার গভর্নরদেরও লিখে পাঠাতেন- 'আল্লাহর শাস্তি বড় ভয়াবহ, সে কথা ভুলবে না।'
ওমর ইবনে আব্দুল আযিয আদি ইবনে আরতাকে বলেছিলেন, 'সুবহানাল্লাহ! কিভাবে তুমি জুলুমের পথ বেছে নিলে! কিভাবে তুমি অবাধ্য হলে! তুমি কি কখনও কবর যিয়ারত করনি! তুমি কি জানো না, আল্লাহর আযাব ভয়ঙ্কর!'
চার.
আল্লাহ-র ভয় মনে জাগরুক রাখার চতুর্থ পথা- আল্লাহ-র অসীম দৃষ্টিশক্তির কথা স্মরণ রাখা।
ইবনে তাইমিয়া বলেন, 'অন্তর আল্লাহর ঘর। এই ঘর সুন্দর রাখা এবং শুদ্ধ রাখার জন্য করণীয় হল আল্লাহর সাথে সততার আচরণ করা। সবসময় মনে রাখা- আল্লাহ আমাকে দেখছেন।'
ইমাম আহমদ ঘরে প্রবেশ করেলে ভয়ে এতটুকুন হয়ে বসতেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হল, আপনি সকলের সাথে থাকলে এভাবে ভীত-প্রকম্পিত হয়ে বসেন না, কিন্তু ঘরে গেলে এভাবে বসেন কেন?
তিনি বললেন, আল্লাহ বলেছেন-
أَنَا جَلِيْسٌ مَنْ ذَكَرَنِي
যে আমাকে স্মরণ করে, আমি তার সহাবস্থানকারী। [মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা : ১২৬৫]
আল্লাহ-র ভয় মনে জাগরুক রাখার জন্য সবসময় মনে রাখতে হবে- আল্লাহ আমাকে দেখছেন। আমি আল্লাহকে না দেখলেও তিনি আমাকে দেখছেন। সবসময় দেখছেন। সর্বাবস্থায় দেখছেন। [বুখারি: ৫০]
📄 আল্লাহকে ভয় না করার চারটি কারণ
এক.
আল্লাহ -কে ভয় না করার প্রথম কারণ- উদাসীনতা। কারো মনে উদাসীনতা ঝেঁকে বসলে সে নিজেকেই ভুলে যায়। তার পক্ষে সরল পথে থেকে সঠিক চিন্তা করা সম্ভব হয় না। উদাসীনরা আল্লাহকে স্মরণ করে না। কোন কিছু বুঝেও বোঝে না।
আল্লাহ বলেন-
কতক মানুষ আছে, যাদের অন্তর আছে, কিন্তু অন্তর দ্বারা কিছু বোঝে না। তাদের কান আছে, কিন্তু কান দ্বারা তারা শোনে না। তাদের চোখ আছে, কিন্তু সে চোখে তারা দেখে না।
আল্লাহ বলেন-
এতে উপদেশ রয়েছে তার জন্য, যার অনুাবন করার মত অন্তর রয়েছে। অথবা সে নিবিষ্ট মনে শ্রবণ করে। [সূরা ক্বাফ : ৩৭]
মানুষ মাত্রই প্রত্যেকের অন্তর রয়েছে। কিন্তু কারো অন্তর জীবিত। কারো অন্তর মৃত। আল্লাহ বলেন-
তারা কি কোরআন সম্বন্ধে গভীর চিন্তা করে, না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ! [সূরা মোহাম্মদ : ২৪]
উদাসীনদের অন্তরে অন্ধকার ছেয়ে যায়। তাদের অন্তর তালাবদ্ধ হয়ে যায়। তারা আল্লাহ -র প্রতিশ্রুতি ভুলে যায়। আল্লাহর যিকির ভুলে যায়। নসিহত শোনে, কিন্তু গ্রহণ করে না। বোঝার চেষ্টা করে না। তাদের অন্তরে মহর আঁটা। তাদের অন্তরালোক নিভে গেছে। সে অন্তর আর আলোকিত হয় না।
দুই.
আল্লাহ -র ভয় অন্তর থেকে মুছে যাওয়ার দ্বিতীয় কারণ- গোনাহ ও পাপাচার। বান্দাকে আল্লাহভোলা বানাতে গোনাহ ও পাপ কাজের ভয়াবহ কুপ্রভাব রয়েছে। গোনাহর কারণে অন্তরে অন্ধকার ছেয়ে যায়।
একের উপর এক অন্ধকার। যখন সে তার হাত বের করে, তখন তাকে একেবারেও দেখতে পায় না। আল্লাহ যাকে জ্যোতি দেন না, তার কোন জ্যোতিই নেই। [সূরা নূর: ৪০]
গোনাহ বান্দার মনে প্রথমে সঙ্কীর্ণতা তৈরি করে। ক্রমে অন্তরে মরিচা পড়ে। মরিচার ছাপ পড়ে যায়। অন্তর মহরাঙ্কিত হয়ে যায়।
অন্তর উদাসীনতা দ্বারা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয় মুমিনের। অন্তর মরিচা-আক্রান্ত হয় ফাসেকের। ক্রমধারায় শেষ পরিণতিতে মহরাঙ্কিত হয় কাফেরের।
মুমিনের অন্তরের উদাসীনতার ব্যাপারে রাসূল বলেন-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ تُوبُوا إِلَى اللَّهِ وَاسْتَغْفِرُوهُ فَإِنِّي أَتُوبُ إِلَى اللَّهِ وَأَسْتَغْفِرُهُ فِي كُلِّ يَوْمٍ مِائَةَ مَرَّةٍ أَوْ أَكْثَرَ مِنْ مِائَةِ مَرَّةٍ
হে লোকসকল! আল্লাহর কাছে তাওবা কর। ক্ষমা চাও। আমি প্রতিদিন শতবারের চেয়ে বেশি আল্লাহর কাছে তাওবা করি। [আহমাদ: ১৮২৯৪]
يَا أَيُّهَا النَّاسُ تُوبُوا إِلَى اللَّهِ وَاسْتَغْفِرُوهُ إِنَّهُ لَيُغَانُ عَلَى قَلْبِي وَإِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ فِي الْيَوْمِ مِائَةَ مَرَّةٍ
হে লোকসকল! আল্লাহর কাছে তাওবা কর। ক্ষমা চাও। কারণ অন্তরে উদাসীনতা ভর করে। প্রতিদিন আমি শতবার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। [মুসলিম : ৭০৩৩]
অন্তরে মরিচা ধরার কথা আল্লাহ স্বয়ং বলেছেন-
তারা যা করে, তাই তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে। [সূরা মুতাফফিফীন : ১৪]
এই আয়াতে কাফের ও ফাসেক সকলেই অন্তর্ভুক্ত।
তিন.
আল্লাহ-র ভয় অন্তর থেকে ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার তৃতীয় কারণ-সুন্নাত মুস্তাহাব বাদ দিয়ে অধিকহারে বৈধ পন্থা অবলম্বন করা। যেমন, দুনিয়ার গর্বোদ্দীপক বস্তু গ্রহণ করা, প্রাচুর্যশীল হওয়া, দুনিয়াকে আখেরাতের উদ্দেশ ও চাহিদার উপর প্রাধান্য দেয়া, আল্লাহর অত্যধিক মর্জির বাইরে কিছু করা ইত্যাদি।
বাস্তবতা হল, আজ আমরা প্রায় সবাই এই সমস্যায় আক্রান্ত।
চার.
অন্তর থেকে আল্লাহ -র ভয় কমে যাওয়ার চতুর্থ কারণ- সময় নষ্ট করা। কেয়ামতের দিন বান্দা থেকে সময়ের হিসাব নেয়া হবে কড়ায়গন্ডায়। অধিকাংশ মুসলমানই অর্থ-সম্পদের ব্যাপারে সজাগ থাকলেও সময়ের ব্যাপারে উদাসীন। মানুষের দিনরাত চলে যায়, সময়ের ব্যাপারে তাদের এতটুকু সচেতনতাও জাগে না।
📄 সময়ের সদ্ব্যবহার
সময় দ্বারা লাভবান হওয়ার সবচেয়ে উপযোগী ব্যবস্থা হল আল্লাহর ফরযসমূহ আদায় করা।
ইবনে তাইমিয়া -কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, 'মানুষ সন্দেহ-সংশয় এবং কুপ্রবৃত্তির রোগ থেকে বাঁচার জন্য ব্যবস্থাপত্র কী হতে পারে?'
তিনি বললেন, 'এই রোগ থেকে বাঁচার মহৌষধ হলো ফরযসমূহ নিগূঢ় ও বাহ্যিকভাবে শুদ্ধ ও পরিপূর্ণরূপে আদায় করা।'
নিগূঢ়তায় শুদ্ধতার স্বরূপ হল একমাত্র আল্লাহর জন্য নিষ্ঠাপূর্ণ নিয়ত রাখা। সালাতের জন্য যখন দাঁড়াবে, মনে করবে, আমি আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়েছি। এভাবে অন্তরকে আল্লাহর দিকে ধাবিত রাখা।
বাহ্যিকভাবে শুদ্ধতার স্বরূপ হল রাসূল -এর সুন্নাত অনুযায়ী তা পালন করা।
সময় দ্বারা লাভবান হওয়ার জন্য ফরযসমূহ যথাযথভাবে আদায় করার পর সবচেয়ে উপযোগী হল নফল এবাদতে মনোযোগী হওয়া।
ইবনুল জাওযি সাইদুল খাতির গ্রন্থে লিখেন, আশ্চর্য! যে তার মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত, সে কিভাবে আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া একটি নিঃশ্বাস ফেলতে পারে!
তিনি একটি হাদিস উল্লেখ করেন- রাসূল ইরশাদ করেন-
যে একবার সুবহানাল্লাহিল আযীমি ওয়াবিহামদিহী পাঠ করে, তার জন্য জান্নাতে একটি খেজুর গাছ রোপিত হয়। [তিরমিযি : ৩৪৬৪]
হাদিসটি উল্লেখ করে তিনি লিখেন, আফসোস! কত খেজুর গাছ আমাদের হাতছাড়া হচ্ছে! কারণ আমরা আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করছি না।
আবু কাসেম মাগরিবি ইবনে তাইমিয়া -কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'ফরযসমূহের পর কোন আমলের প্রতি আপনি বেশি গুরুত্ব প্রদান করেন?'
ইবনে তাইমিয়া বলেন, 'ফরযসমূহের পর সবচেয়ে মহান উত্তম ও ফলপ্রদ আমল আল্লাহর যিকির ছাড়া আর কিছু আছে বলে আমার জানা নেই। এবাদতের মধ্যে সবচেয়ে সহজতর এবাদত এটিই।'
আল্লাহ বলেন-
জেনে রাখ, আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তরসমূহ শান্তি পায়। [সূরা রা'দ : ২৮]
তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমি তোমাদের স্মরণ রাখবো। [সূরা বাকারা : ১৫২]
📄 আল্লাহভীতির চার প্রমাণ
এক.
প্রকৃত আল্লাহভীতির প্রথম প্রমাণ- বান্দার ভিতর-বাহির এক হওয়া। বাহ্য ও অভ্যন্তর এক হওয়া। বান্দার বাহ্যিক অবস্থা অভ্যন্তরের চেয়ে ভালো হবেনা। রাসূল ইরশাদ করেন- আল্লাহ বলেন- শেষ যমানায় কিছু লোক এমন বের হবে, যারা ধর্ম পুঁজি করে দুনিয়াকে ধোঁকা দিবে। তারা ভেড়ার পশমের মতো নরম পোষাক পরিধান করবে। তাদের যবান মধুর মত মিষ্টি হবে, কিন্তুঅন্তর হবে নেকড়ের মত।' আল্লাহ বলেন, 'তারা আমাকে ধোঁকা দিচ্ছে, নাকি আমার সাথে স্পর্ধা দেখাচ্ছে! আমি আমার শপথ করে বলছি, তাদের উপর এমন ফেতনা চাপিয়ে দিবো, তাদের মধ্যে সবচেয়ে সহনশীল ব্যক্তিকেও পেরেশান করে ছাড়বে। [তিরমিযি: ২৪০৪]
আল্লাহ-র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। বেশ-ভূষা সুন্দর রেখে আভ্যন্তর খারাপ রাখার মতো কপটতা থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
দুই.
প্রকৃত আল্লাহভীতির দ্বিতীয় একটি প্রমাণ- শুধু বুলি আওড়ে নয়, সার্বিক কথাবার্তায়, কাজেকর্মে, আচার-আচরণে আল্লাহর সাথে সততা বজায় রাখা। আল্লাহর সাথে সততার এই তিনটি স্তর ওলামায়ে কেরام বর্ণনা করেছেন।
শাফি আসবাহি থেকে বর্ণিত, আমি একদিন আবু হোরায়রার কাছে আগমন করলাম। আবু হোরায়রা তখন মসজিদে নববিতে অবস্থান করছিলেন। আমি তাকে বললাম, 'আবু হোরায়রা! আমি আপনাকে আল্লার কসম দিয়ে বলছি, আপনি আমাকে এমন একটি হাদিস বলুন, যা আপনি নিজে রাসূল ﷺ-র মুখ থেকে শুনেছেন।'
তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম! আমি আপনাকে এমন একটি হাদিস বলছি, যা আমি নিজে রাসূল ﷺ-র মুখ থেকে শুনেছি।'
এ কথা বলে তিনি কান্না শুরু করলেন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকলেন। একপর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়লেন। চেতন ফিরে এলে তিনি বললেন, "আমি রাসূল ﷺ-কে বলতে শুনেছি, 'কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম তিন ব্যক্তি দ্বারা অগ্নি প্রজ্জ্বলন করা হবে। তারা হলেন, আলেম বা কারী, ব্যবসায়ী, মুজাহিদ। তারা তাদের আমল করেছিল লোক দেখানোর জন্য। তারা এক আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ নিয়ত করেনি। আল্লাহ ﷻ অন্যদের আগে তাদের জাহান্নামে ফেলবেন।'
শাফি আসবাহি বলেন, আমি মুয়াবিয়ার কাছে গেলাম। মুয়াবিয়াকে উক্ত হাদিসের কথা বললাম। তিনি তখন চেয়ারে উপবিষ্ট ছিলেন। হাদিসটি শুনে তিনি কাঁদতে কাঁদতে চেয়ার থেকে পড়ে গেলেন। অতঃপর বললেন, আল্লাহ ﷺ সত্যই বলেছেন-
যে ব্যক্তি পার্থিবজীবন ও তার চাকচিক্যই কামনা করে, হয় আমি তাদের দুনিয়াতেই তাদের আমলের প্রতিফল ভোগ করিয়ে দেব এবং তাতে তাদের প্রতি কিছুমাত্র কমতি করা হবে না।
এরাই হল সেসব লোক, আখেরাতে যাদের জন্য আগুন ছাড়া নেই। তারা এখানে যা কিছু করেছিল, সবই বরবাদ করেছে। আর যা কিছু উপার্জন করেছিল সবই বিনষ্ট হল। [সূরা হূদ: ১৫, ১৬] [তিরমিযি : ২৩৮২]
তিন.
প্রকৃত আল্লাহভীতির তৃতীয় প্রমাণ- মন্দ কাজে অনুতপ্ত হওয়া এবং ভালো কাজে খুশি হওয়া। ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এক বাহিনীকে ভাষণ দিয়ে বলেন, 'যাকে ভালো কাজ খুশি করে এবং মন্দ কাজ অনুতপ্ত করে, সেই প্রকৃত মুমিন।'
আল্লাহর অবাধ্যতা করে যে অনুতপ্ত হয়, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্য ঘোষণা-
তারা কখনও কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে অথবা কোন মন্দ কাজে জড়িত হয়ে নিজের উপর জুলুম করে ফেললে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া কে তাদের ক্ষমা করবেন? তারা নিজের কৃতকর্মের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে না এবং জেনে শুনে তাই করতে থাকে না। তাদেরই জন্য প্রতিদান হলো তাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং জান্নাত। যার তলদেশে প্রবাহিত হচ্ছে প্রস্রবণ যেখানে তারা থাকবে অনন্তকাল। যারা কাজ করে তাদের জন্য কতইনা চমৎকার প্রতিদান। [সূরা আলে ইমরান: ১৩৫, ১৩৬]
চার.
প্রকৃত আল্লাহভীতির চতুর্থ প্রমাণ- বান্দার আজকের দিন গতকালের চেয়ে ভালো কাটবে। আগামীকাল আজকের চেয়ে ভালো কাটবে। যে এবাদতে উৎকর্ষ করতে চায়, তার সততা এবং আল্লাহভীতির জন্য এটি অন্যতম প্রমাণ।
যার গতকাল আজকের চেয়ে ভালো কেটেছে, আজকের দিন আগামীকালের চেয়ে ভালো কাটছে, সে দিনদিন পশ্চাদগামী হচ্ছে। তার এবাদতে মিথ্যা ও ধোঁকার অনুপ্রবেশ ঘটেছে।
ইবনে তাইমিয়া বলেন, আল্লাহর ভয় ততটুকু অত্যাবশ্যক, যতটুকু বান্দাকে গোনাহ থেকে বাঁচাবে। এর অতিরিক্ত ভয় অত্যাবশ্যক নয়।
ওলামায়ে কেরام বলেন, আল্লাহর ভয় হল- বান্দা যখন একা একা অনুভব করবে- আল্লাহ তার আসনের সামনেই!
আল্লাহর ভয় হল- বান্দার সামনে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার দৃশ্য জ্বলে উঠবে। বান্দা অনুধাবন করবে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ছাড়া সে পরাজিত!
আল্লাহর ভয় হল- বান্দা এমন অনুভুতি নিয়ে আমল করবে যে, সে আল্লাহর সামনে লজ্জিত। তার সকল আমল যেন তার কাছে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ বলেন-
আল্লাহ ধর্মভীরুদের পক্ষ থেকেই তো গ্রহণ করেন। [সূরা মায়েদা : ২৭]
ইবনে ওমর বলেন- 'আল্লাহ যদি আমার সামান্য কণা পরিমাণ আমল গ্রহণ করতেন!'
উপস্থিত লোকেরা জিজ্ঞেস করল, 'আপনি এমন কথা কেন বললেন?'
তিনি বললেন, "কারণ- আল্লাহ ধর্মভীরুদের পক্ষ থেকেই তো গ্রহণ করেন। [সূরা মায়েদা : ২৭]
উপস্থিত লোকেরা বলল, 'আপনি ভয় পাচ্ছেন? আপনি তো অনেক নেক কাজ করেন!'
তিনি বললেন, "আমি নেক কাজ নিয়ে শঙ্কা করি না। শঙ্কা করি, যদি নেক কাজ করার পর আল্লাহ বলেন, 'আমার ইযযত ও মহত্তের কসম! তোমার এ আমল আমি কবুল করবো না!”
আল্লাহ বলেন- তারা দেখতে পাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন শাস্তি, যা তারা কল্পনাও করতনা। [সূরা যুমার : ৪৯]
আল্লাহ যাদের ব্যাপারে এ কথা বলেছেন, তাদের ধারণা ছিল, তারা অনেক নেক কাজ করছে। কিন্তু তাদের নেক কাজে লৌকিকতা প্রচারপ্রিয়তা এবং কপটতার চোরাপ্রবেশ ছিল। তাদের সেসব আমল তাদের দিকে ফিরে আসবে। আল্লাহ তাদের সে আমল তাদের চেহারায় নিক্ষেপ করবেন। কারণ আল্লাহ সেই আমলই কবুল করেন, যা তার জন্য একনিষ্ঠ নিয়তে করা হয়। যা রাসূলের সুন্নাত অনুযায়ী সঠিকভাবে করা হয়।