📄 আল্লাহর বিধান রক্ষা না করার পরিণাম
আল্লাহর বিধান রক্ষা না করলে আল্লাহর সাহায্য ও সুরক্ষা পাওয়া যায়না। পরিণতিতে পার্থিব জীবনে অবমাননাকর জীবনযাপন অনিবার্য হয়ে পড়ে। অভাগা হয়ে বেঁচে থাকতে হয়। পরকালের জীবনে অনিবার্য হয়ে পড়ে জাহান্নামের পোড়া আগুন। চিরস্থায়ী ছাইভস্ম অগ্নি। আল্লাহ বলেন-
وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيمَةِ أَعْلَى
যে আমার স্মরণে বিমুখ, তার জীবনের ভোগসম্ভার হবে সংকুচিত। আর আমি তাকে কিয়ামতের দিন উত্থিত করবো অন্ধ অবস্থায়। [সূরা ত্বহা: ১২৪]
📄 আল্লাহ ﷺ তাঁর বান্দাকে হেফাযত করেন
বান্দা যখন আল্লাহর বিধান রক্ষা করে, আল্লাহ তাঁর বান্দাকে সমূহ বিপদাপদ থেকে হেফাযত করেন। রাসুল ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর বিধান রক্ষা কর, আল্লাহও তোমাদের রক্ষা করবেন’।
মানুষ আল্লাহর সুরক্ষা পেতে চায় কি! আল্লাহর সুরক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহর বিধান রক্ষা করে কি! মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন-
তোমাদের প্রত্যেক অনুরাগী (আওয়াব) ও স্মরণকারীকে (হাফীয) এরই প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। [সূরা ক্বফ: ৩২]
উল্লিখিত আয়াতে অনুরাগীর (আওয়াব) অর্থ বেশি বেশি তওবা করা, আল্লাহর কাছে লজ্জিত হওয়া, এস্তেগফার পাঠ করা। আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করা। তাঁর কাছে নিজের সকল ভার অর্পণ করা।
স্মরণকারীর (হাফীয) অর্থ হলো সবসময় আল্লাহ-র সকল বিধান স্মরণ রাখা।
📄 সফল ব্যক্তির সম্মান
মানুষের জীবনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ স্থান হল আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্যের স্থান। আল্লাহর কাছে সমর্পিত বান্দা হওয়ার স্থান। আল্লাহর নিষ্ঠাপূর্ণ বান্দা এবং নিরঙ্কুশ আনুগত্য স্বীকারকারীরাই দুনিয়া-আখেরাতের সর্বোচ্চ মর্যাদাশীল। আল্লাহ তার শ্রেষ্ঠ রাসূলকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে সবচেয়ে সম্মানজনক নামে ডেকেছেন এবং সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ স্থানের খেতাব ও উপাধিতে ভূষিত করেছেন।
শ্রেষ্ঠ রাসূল মোহাম্মদ ﷺ। তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হল ইসরা ও মেরাজ। আল্লাহ ইসরা ও মেরাজ সংক্রান্ত আয়াতে রাসূলকে নিজের সমর্পিত বান্দার সম্মানজনক নামে উল্লেখ করেছেন। বলেছেন-
পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রিবেলায় ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত। [সূরা বনী ইসরাঈল: ০১]
রাসূলের জীবনের অত্যন্ত সাফল্যমণ্ডিত প্রেক্ষাপট কোরআন নাযিলের প্রেক্ষাপট। সেখানেও আল্লাহ তার রাসূলকে সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ খেতাব তথা আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দার উপাধিতে উল্লেখ করেছেন। বলেছেন-
পরম কল্যাণময় তিনি যিনি তার বান্দার প্রতি ফয়সালার গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন, যাতে সে বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হয়। [সূরা ফুরকান: ০১]
রাসূলের জীবনব্রত দায়িত্ব ছিল মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকা এবং মানুষের কাছে আল্লাহর আহ্বান পৌঁছানো। মানুষকে খারাপ কাজের কুপরিণতি এবং ভাল কাজের সুপরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া। সেই জীবনব্রত দায়িত্বের আলোচনাতেও আল্লাহ ﷺ তার রাসূলকে সর্বোচ্চ ইজ্জত ও গৌরবপূর্ণ উপাধিতে উল্লেখ করেছেন। বলেছেন-
আর যখন আল্লাহর বান্দা তাকে ডাকার জন্য দণ্ডায়মান হল, তখন অনেক জিন তার কাছে ভিড় জমাল। [সূরা জিন: ১৯]
কবি বলেন- বেড়েছে ইজ্জত, বেড়েছে গৌরব, করেছি সুরায়া দলন; 'হে আমার বান্দা' বলে করেছ দাখিল তোমার বান্দাদের!
অর্থাৎ, আল্লাহ আমাদের 'হে আমার বান্দা' বলে ডেকেছেন এবং এতে আমরা রহমানের বান্দার অন্তর্ভুক্ত হতে পেরেছি, এটাই আমাদের জীবনের ইজ্জত ও গৌরব। যেন আমরা সুরায়া তারা পদদলিত করেছি!
আমাকে তুমি ডাকবে শুধু 'হে আমার গোলাম' বলে, এর চেয়ে দামি আর কোন নাম পাইনি এ ধরাতলে।
আল্লাহর নিষ্ঠাপূর্ণ আনুগত্যই মানুষের সকল শক্তির উৎস। আল্লাহর বিনীত দাসত্ব মানুষের সকল মর্যাদার উৎস। এটিই মানুষের জীবনের ভিত্তি। এটিই মানুষের জীবনের স্বীকৃতি। আল্লাহর কাছে সেই অক্ষয় অপরাজের শক্তি ও সম্মানের আশা আমাদের।
দুহাতে আঁকড়ে ধরো আল্লাহর রজ্জু, সেই হোক জীবনের ভীত। সকল শক্তি ক্ষয়ে যাবে তবু ধসবে না সেই স্তম্ভ।
ইবনে কাসির ۞ তাউস ইবনে কাইসান থেকে বর্ণনা করেন, একবার আমি ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে হারামে প্রবেশ করি। মাকামে ইবরাহিমে দুই রাকাত সালাত আদায় করি। ঘটনাক্রমে সেখানে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ আগমন ঘটল। তার সাথে রয়েছে অস্ত্রসজ্জিত দেহরক্ষী আর সেনা-সমাগম। হাজ্জাজ এবং তার বাহিনী সেখানে এসে মাকামে ইবরাহিমে সালাতে দাঁড়ালো।
হাজ্জাজ সালাতের সালাম ফিরাবে, এমতাবস্থায় ইয়েমেনের এক দুনিয়াবিরাগ আবেদ বাইতুল্লাহর তাওয়াফ শুরু করলেন। যথারীতি তাওয়াফ শেষ করে দুই রাকাত সালাত আদায়ে দাঁড়ালেন। ঘটনাচক্রে এক বল্লমধারীর বল্লমের সাথে আবেদের চাদর পেঁচিয়ে গেল। আবেদ সেজদা থেকে দাঁড়ানোর সময় চাদরের ক্ষিপ্রতায় বল্লমটি হাজ্জাজের গায়ে পড়ল। হাজ্জাজ রেগে গেল। তৎক্ষণাত আবেদকে থামিয়ে দিয়ে নিক্ষিপ্ত বল্লমের মত দু'টি শব্দ ছুঁড়ে দিয়ে আবেদকে জিজ্ঞেস করল, 'কে তুমি?'
আবেদ অসহায়ের মতো উত্তর করলেন, 'আমি একজন মুসলিম। ইয়েমেন থেকে এসেছি।'
আবেদের বাড়ি ইয়েমেনে শুনে হাজ্জাজ জিজ্ঞেস করল, 'তোমাদের বাদশাহ কেমন আছেন?'
হাজ্জাজের আরেক ভাই মোহাম্মদ বিন ইউসুফ তখন ইয়েমেনের বাদশাহ ছিল। হাজ্জাজের মতোই জালেম এবং বর্বর।
আবেদ বললেন, 'বেশ হৃষ্টপুষ্ট আর সুঠাম দেহ নিয়ে ভালই আছেন।'
হাজ্জাজ রেগে গিয়ে বলল, 'তোমাকে তার শারীরিক খবর জিজ্ঞেস করিনি। তার ন্যায়নীতি বিচারব্যবস্থা কেমন, তা জিজ্ঞেস করেছি।'
আবেদ কোন রাখঢাক না করে ধাম করে বলে ফেললেন, 'শাসনব্যবস্থায় সে তো ভয়ানক জালিম ও বর্বর!'
হাজ্জাজ বাঁজখাই কণ্ঠে হুঙ্কার ছেড়ে বলল, 'তুমি কি জানো, আমি হলাম হাজ্জাজ আর সে আমার ভাই? তুমি কি আমাকে ভয় কর না?'
আবেদ সাহসভরা কণ্ঠে বললেন, 'আপনি কি মনে করেন, আল্লাহ আমার যত বড় শক্তি, সে আপনার আরো বড় শক্তি?'
তাউস বলেন, আবেদের উত্তর আর সাহসিকতা দেখে আমি অবাক হলাম। ভীত হলাম। আমার শরীরে একটি কাঁপুনি খেলে গেল। ভয়ে শরীরের লোমগুলো পলায়মান হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই দেখলাম, হাজ্জাজ লোকটিকে ছেড়ে দিলেন। আমি আরো একবার অবাক হলাম।
এই হল আল্লাহর বান্দাদের আত্মসমর্পণ ও আল্লাহর সাথে তাদের অন্তরের সম্পর্ক! এই হল মুমিনের অপরাজেয় শক্তি! যেদিন আল্লাহ ছাড়া আর কোন ক্ষমতাবান থাকবে না, আল্লাহর স্বীকৃতি ছাড়া আর কোন স্বীকৃতি থাকবে না, সেদিন এই দাসত্ব ও আনুগত্যই হবে মুমিনের একমাত্র ভরসা!
আবেদকে থামিয়ে দিয়ে নিক্ষিপ্ত বল্লমের মত দু'টি শব্দ ছুঁড়ে দিয়ে আবেদকে জিজ্ঞেস করল, 'কে তুমি?'
আবেদ অসহায়ের মতো উত্তর করলেন, 'আমি একজন মুসলিম। ইয়েমেন থেকে এসেছি।'
আবেদের বাড়ি ইয়েমেনে শুনে হাজ্জাজ জিজ্ঞেস করল, 'তোমাদের বাদশাহ কেমন আছেন?'
হাজ্জাজের আরেক ভাই মোহাম্মদ বিন ইউসুফ তখন ইয়েমেনের বাদশাহ ছিল। হাজ্জাজের মতোই জালেম এবং বর্বর।
আবেদ বললেন, 'বেশ হৃষ্টপুষ্ট আর সুঠাম দেহ নিয়ে ভালই আছেন।'
হাজ্জাজ রেগে গিয়ে বলল, 'তোমাকে তার শারীরিক খবর জিজ্ঞেস করিনি। তার ন্যায়নীতি বিচারব্যবস্থা কেমন, তা জিজ্ঞেস করেছি।'
আবেদ কোন রাখঢাক না করে ধাম করে বলে ফেললেন, 'শাসনব্যবস্থায় সে তো ভয়ানক জালিম ও বর্বর!'
হাজ্জাজ বাঁজখাই কণ্ঠে হুঙ্কার ছেড়ে বলল, 'তুমি কি জানো, আমি হলাম হাজ্জাজ আর সে আমার ভাই? তুমি কি আমাকে ভয় কর না?'
আবেদ সাহসভরা কণ্ঠে বললেন, 'আপনি কি মনে করেন, আল্লাহ আমার যত বড় শক্তি, সে আপনার আরো বড় শক্তি?'
তাউস বলেন, আবেদের উত্তর আর সাহসিকতা দেখে আমি অবাক হলাম। ভীত হলাম। আমার শরীরে একটি কাঁপুনি খেলে গেল। ভয়ে শরীরের লোমগুলো পলায়মান হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই দেখলাম, হাজ্জাজ লোকটিকে ছেড়ে দিলেন। আমি আরো একবার অবাক হলাম।
এই হল আল্লাহর বান্দাদের আত্মসমর্পণ ও আল্লাহর সাথে তাদের অন্তরের সম্পর্ক! এই হল মুমিনের অপরাজেয় শক্তি! যেদিন আল্লাহ ছাড়া আর কোন ক্ষমতাবান থাকবে না, আল্লাহর স্বীকৃতি ছাড়া আর কোন স্বীকৃতি থাকবে না, সেদিন এই দাসত্ব ও আনুগত্যই হবে মুমিনের একমাত্র ভরসা!
ইমাম যাহাবি মুহাদ্দিস ইবনে আবি যীব এর জীবনীতে উল্লেখ করেন, একবার খলিফা মাহদি আব্বাসি মসজিদে নববিতে আগমন করেন। সেখানে অনেক মানুষ এবং হাদিসের ছাত্র উপস্থিত ছিলেন। খলিফা মাহদি আব্বাসি প্রবেশ করতেই সকলে খলিফার সম্মানে দাঁড়িয়ে গেলেন। কিন্তু ইবনে আবি যীব ছিলেন নির্লিপ্ত। খলিফার আগমনে সকলে দাঁড়িয়ে গেলেও আপন মনে বসে রইলেন তিনি। খলিফা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইবনে আবি যীব, আমার আগমনে সকলে দাঁড়াল, তুমি দাঁড়ালে না যে!'
ইবনে আবি যীব বললেন, “আল্লাহর কসম, আমিও দাঁড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু যেই না দাঁড়াবো, অমনিতেই কোরআনের একটি আয়াত মনে পড়ল-
যেদিন সকল মানুষ দাঁড়াবে জগতসমূহের প্রতিপালকের সামনে। [সূরা মুতাফফিফিন: ৬]
এ আয়াত স্মরণ হওয়ায় আমি আর দাঁড়াইনি। আমি আয়াতের উদ্দিষ্ট দিনে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় রইলাম!
তারাই আমাদের অনুসরণীয়। তারা আমাদের পূর্বপুরুষ। তারা আল্লাহর আনুগত্য বুঝেছিলেন। আল্লাহর দাসত্বের সারমর্ম অনুধাবন করেছিলেন।
আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্যের অন্যতম একটি উপসর্গ আল্লাহর ভয়। যারা আল্লাহর ভয়ে ভীত কম্পিত, আল্লাহ তাদের প্রশংসা করেছেন। আল্লাহর প্রতি ধাবিত বন্ধুদের অত্যন্ত সুন্দর বৈশিষ্ট্যে, বড় নৈকট্যশীল ও অনুগত বান্দার উপাধিতে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তাদের সম্মান ঘোষণা করে বলেন-
যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে পেশ হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দুটি উদ্যান। [সূরা রহমান: ৪৬]
যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করেছে এবং খেয়াল-খুশি থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে, তার ঠিকানা হবে জান্নাত। [সূরা নাযিয়াত: ৪০, ৪১]
ওলামায়ে কেরাম বলেন, 'যে কোন বস্তুর কাছাকাছি হলে তার থেকে ভয়মুক্ত হওয়া যায়। কিন্তু আল্লাহর যতই নিকট হই, অন্তরে ততই তার ভয় বৃদ্ধি পায়!'
আল্লাহ বলেন-
আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই তাকে ভয় করে। [সূরা ফাতির: ২৮]
আল্লাহর সাথে ওলামায়ে কেরামের নৈকট্যের কারণেই আয়াতে আল্লাহ আলেমদের ভয় পাওয়ার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। উক্ত আয়াতে নিষ্ঠাপূর্ণ ওলামায়ে কেরামের মর্যাদা প্রকাশ পেয়েছে।
রাসূল ﷺ-র আগমনের পূর্বে আমরা জীবনের রসবোধে মৃত ছিলাম। আমাদের জীবন প্রাণবন্ত ছিল না। আমাদের কোন পরিচয়, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ছিল না। প্রগতি ও অগ্রগতি ছিল না। মিথ্যুকরা যতই মিথ্যাচার করুক, দাজ্জালরা যতই দাজ্জালি করুক, বাস্তব অর্থেই আমাদের কোন সভ্যতা, ভব্যতা, সংস্কৃতি কিছুই ছিল না।
রাসূল ﷺ আমাদের জন্য একটি বিরল ও অদ্বিতীয় বিদ্যাপিঠ খুলেছেন। যে বিদ্যাপিঠ ছিল মানুষের জীবন সঞ্চারের বিদ্যাপিঠ। যে বিদ্যাপিঠ ছিল প্রজন্ম তৈরি, অন্তরের উৎকর্ষ এবং মহান স্রষ্টার কাছে জীবন পরিচালনার বিদ্যাপিঠ।
এই বিদ্যাপিঠের একজন স্বনামধন্য পুণ্যবান ছাত্র ছিলেন ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি বলেন, যেদিন রাসূল ﷺ এসেছেন, সেদিন আমাদের নতুন ও উজ্জ্বল ইতিহাস শুরু হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন-
তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তার আয়াতসমূহ, তাদের পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হেকমত। ইতিপূর্বে তারা ছিল ঘোর পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত। [সূরা জুমুয়াহ: ০২]
আমরা আমাদের জীবন শুরু করেছি রাসূলের আগমনের দিন থেকে। আল্লাহ বলেন-
আর যে মৃত ছিল, অতঃপর আমি তাকে জীবিত করেছি এবং তাকে এমন একটি আলো দিয়েছি, যা নিয়ে সে মানুষের মাঝে চলাফেরা করে।
সে কি ঐ ব্যক্তির সমতুল্য হতে পারে, যে অন্ধকারে রয়েছে- সেখান থেকে বের হতে পারে না? [সূরা আনয়াম: ১২২]
যে তার অজ্ঞতা, গোনাহ, কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ ইত্যাদিতে মৃত ছিল, সে কি ঐ ব্যক্তির মতো হতে পারে, যাকে আল্লাহ ঈমানের মাধ্যমে নতুন জীবন দান করেছেন!
না, তারা এক হতে পারে না।
ইবনে মাসউদ ছিলেন রাসূলের সেই ঐশ্বরিক বিদ্যাপিঠের একজন পুণ্যবান, প্রিয়তম, সম্ভ্রান্ত গোছের ছাত্র। উম্মতের কৃষ্টিতে সহসা জ্বলে ওঠা এক শক্তি। শারীরিক কাঠামোতে তিনি দুর্বল ছিলেন। দেহে-গঠনে জীর্ণশীর্ণ ছিনলে। কিন্তু ঈমানে ছিলেন অত্যন্ত বলবান!
ধার্মিকতা শরীর দিয়ে বিচার্য নয়। ধার্মিকতা বিচার করা হয় অন্তরাত্মা দিয়ে। রাসূল যখন আমাদের অন্তরে ঈমানি শক্তির প্রতিবিম্ব ছড়ালেন, তখন মানুষ পথ পেতে শুরু করেছে। তখনই উদ্ভ্রান্ত মানুষ সঠিক দিশা পেয়েছে।
ইতিহাসবেত্তাগণ বলেন, ইবনে মাসউদ শীর্ণকায় ছিলেন। তিনি বসে থাকা কারো পাশে দাঁড়ালে উভয়কে দণ্ডায়মান ঠাওর হতো!
একদিন তিনি একটি গাছে উঠলেন। হঠাৎ বাতাস বইতে শুরু করল। বাতাস যেন ইবনে মাসউদকে গাছসহ উপড়ে ফেলছিল! এ দৃশ্য দেখে লোকেরা হাসল। রাসূল বললেন, 'তোমরা তার পায়ের নলার ক্ষুদ্রতা দেখে আশ্চর্য হচ্ছো! আল্লাহর কসম! কেয়ামতের দিন মিযানের পাল্লায় সে উহুদ পাহাড়ের চেয়ে ভারী হবে।' তার ঈমান, একিন এবং আল্লাহর সাথে নৈকট্যের মাধ্যমে তিনি উহুদ পাহাড়ের চেয়ে ভারী হবেন!
রাসূল ﷺ একদিন তাকে বললেন, 'তুমি আমাকে একটু তেলাওয়াত শোনাও।'
তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! কোরআন আপনার উপর নাযিল হয়েছে, আর আমি আপনাকে তেলাওয়াত শোনাবো! এযে লজ্জা! আদব পরিপন্থী!'
রাসূল বললেন, 'তুমি আমাকে তেলাওয়াত শোনাও। আমি ব্যতীত অন্য কারো থেকে তেলাওয়াত শুনতে পছন্দ করি।' [আহমাদ: ৩৯৮১]
আল্লাহ رضينه অতঃপর ইবনে মাসউদ সূরা নিসা থেকে তেলাওয়াত শুরু করলেন। রাসূল তার তেলাওয়াত শুনছেন। একপর্যায়ে তিনি আয়াত পাঠ করলেন-
আর তখন কি অবস্থা দাঁড়াবে যখন আমি ডেকে আনবো প্রতিটি উম্মতের মধ্য থেকে অবস্থা বর্ণনাকারী এবং আপনাকে ডাকবো তাদের উপর অবস্থা বর্ণনাকারীরূপে। [সূরা নিসা: ৪১]
তখন রাসূল কান্না শুরু করে দিলেন। তার চোখ থেকে পানি ঝরছিল। তিনি বলছিলেন, 'যথেষ্ট হয়েছে।' [বুখারি: ৫০৫০]
তিনি ছিলেন আল্লাহর রাসূল। তার পূর্বাপর সবকিছু মাফ করে দেয়া হয়েছে। তথাপি তিনি ধোঁকায় পতীত হননি। প্রতারিত হননি। কোরআন তার এবাদাত এবং আল্লাহভীতিই বৃদ্ধি করেছে।
সাহাবায়ে কেরام রাতভর এবাদতে মগ্ন থাকতেন। কবি বলেন-
অন্ধকারের গভীর কোলে ঢলে পড়ে রাত্তির, আবেদের কপোল ভিজে চোখের ঝর্ণায়।
জিহাদি নাকারায় বাজে শাহাদাতের দুফ, ঘুমন্ত শার্দুল জাগে শহিদি তামান্নায়।
সাহাবায়ে কেরام রাত জেগে সালাত পড়তেন। তেলাওয়াত করতেন। রাসূল তাদের কাছে যেতেন। তেলাওয়াত শুনতেন।
একদিন আবু মুসা আশয়ারি আবেগমথিত আবেদনময়ী ব্যথাতুর কণ্ঠে তেলাওয়াত করছেন। রাসূল আবু মুসার তেলাওয়াত শুনলেন।
সকালে রাসূল আবু মুসাকে বললেন, 'তুমি যদি গতরাতে আমাকে দেখতে! আমি তোমার তেলাওয়াত শুনেছি। আমাকে দাউদের সুরেলাসুরের একটি দেয়া হয়েছে।' [বুখারি: ৫০৪৮]
আবু মুসা বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমার তেলাওয়াত শুনেছেন!'
রাসূল বললেন, 'যার হাতে আমার জীবন, তার শপথ! আমি তোমার তেলাওয়াত শুনেছি।'
আবু মুসা বললেন, 'যার হাতে আমার জীবন, তার শপথ! যদি জানতাম আপনি আমার তেলাওয়াত শুনছেন, তাহলে আমি আপনার জন্য তেলাওয়াত আরও অলঙ্কৃত করতাম।' [হাকেম : ৬০১৯]
রাসূল ﷺ তেলাওয়াত শুনতে পছন্দ করতেন। তেলাওয়াত তার আল্লাহভীতি বৃদ্ধি পেত। প্রেম-অনুরাগ স্ফীত হত।
তাফসিরে ইবনে আবি হাতেমে বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরায়রা বর্ণনা করেন, তখন রাতের অন্ধকার নেমেছিল। রাসূল ﷺ বের হলেন। মদিনার অলিগলিতে হাঁটছেন। এক ঘরে বয়স্ক একজন মহিলা তেলাওয়াত করছিলো। রাসূল দরজার দিকে মাথা উঁচিয়ে খেয়াল করে শুনলেন। কণ্ঠে মনে হয় বৃদ্ধ ন্যুব্জ মহিলা, কিন্তু তার অন্তর যুবতী। জীবিত। মহিলা বারবার তেলাওয়াত করছেন-
هَلْ أَتْكَ حَدِيثُ الْغَاشِيَةِ আপনার কাছে আচ্ছন্নকারী কেয়ামতের বৃত্তান্ত পৌঁছেছে কি?
মহিলা কাঁদছেন আর তেলাওয়াত করছেন। টেরও করতে পারেননি- রাসূল তার তেলাওয়াত শুনছেন।
মহিলার তেলাওয়াত শুনে রাসূল নিজেই কেঁদে ফেললেন আর বলতে লাগলেন, 'হ্যাঁ, আমার কাছে (আচ্ছন্নকারী কেয়ামতের বৃত্তান্ত) পৌঁছেছে। হ্যাঁ, আমার কাছে পৌঁছেছে।'
আমাদের পূর্ববর্তীগণ আল্লাহভীতির যথাগুরুত্ব জানতেন। তারা কোরআনকে আল্লাহভীতির সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম হিসেবে গণনা করতেন। আল্লাহভীতি না থাকায় আল্লাহ আসহাবে কোরআন ব্যতীত সকল মানুষকে নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন।
ইমাম আহমদ কিতাবুয যুহদে একটি হাদীস বর্ণনা করেন-
রাসূল ইরশাদ করেন, “আল্লাহ বলেন, 'হে আদম সন্তান! তোমার উপর আশ্চর্য হতে হয়! আমি তোমাকে সৃষ্টি করেছি, আর তুমি অন্য কারো এবাদত কর! আমি তোমাকে রিযিক দিচ্ছি, আর তুমি অন্য কারো কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর! তুমি নেয়ামত পেতে পছন্দ কর, অথচ আমি তোমার অমুখাপেক্ষী! তুমি আমার কাছে অপছন্দনীয় হও, অথচ তুমি আমার কাছে মুখাপেক্ষী! আমার মঙ্গল তোমার কাছে অবতরণকারী, আর তোমার পাপ-মন্দ আমার কাছে আরোহণকারী।” [ফায়জুল কাদির : ৪/৪৯৪]
কেউ যখন আল্লাহর নাফরমানি করে, আল্লাহর আনুগত্য ও দাসত্ব থেকে বিমুখ হয়, তখন তার এই অবস্থা। তখন আল্লাহ তার উপর এমন আশ্চর্য প্রকাশ করেন। এজন্য আল্লাহর আনুগত্য ও দাসত্বই হল আল্লাহভীতির সর্বোচ্চ অবস্থা।
উসমান বলেন, 'আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে লজ্জা করে কখনও আমার গুপ্তাঙ্গ দেখিনি। কখনও আমি দাঁড়িয়ে গোসল করিনি।'
কবি বলেন- কোন নিয়ন্তা নিয়ন্ত্রণ করছে আমার ডানাগুলো, নিয়ন্ত্রণ করছে আমার কর্ণ ও অন্তরমম...
আন্দালুসি তার ছেলেকে তাকওয়ার নসিহত করছেন- তুমি যখন অন্ধকারে উৎকণ্ঠায় একাকী হও, মন তোমাকে আহ্বান করে পাপাচারে, তখন লজ্জা কর মহান আল্লাহর দৃষ্টিকে।
মনকে বল- 'মন! তোমাকে দেখছেন তিনি, যিনি সৃষ্টি করেছেন এই অন্ধকারের সুযোগ।'
আমরাও যদি অনুভব জাগ্রত রাখি, অন্ধকারের স্রষ্টা আমাদের দেখছেন, তাহলে আমরা আর গোনাহ করবো না। অবাধ্য হবো না। সীমালঙ্ঘন করবো না। কিন্তু মনের নিয়ন্ত্রণ খুব কম লোকই করতে পারে!
সুসাহিত্যিক সালাব বলেন, আমি একদিন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের কাছে আগমন করলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- 'কে আপনি?'
আমি বললাম, 'আমি একজন সাহিত্যিক। আমি একটি কবিতা পারি।'
তিনি বললেন, 'কবিতাটি আমাকে শুনাও।'
আমি বললাম, "আবু নাওয়াস বলেন-
‘তুমি কখনও একাকী হলেও বলো না আমি একা। বলো, আমার সাথে আছেন একজন মহাদ্রষ্টা, নিয়ন্ত্রক।
ভেবো না তুমি, তিনি কখনও গাফেল থাকেন এক পলক, ভেবো না গোপন থাকে তার কাছে- অদৃশ্য যাকিছু তোমার কাছে।
সালাব বলেন, "আল্লাহর কসম! তিনি আমার কবিতা শুনে কিতাব-কালি রেখে তার রুমের দরজা বন্ধ করলেন। অতঃপর কেঁদে কেঁদে বারবার এই কবিতা পড়তে থাকলেন-
'তুমি কখনও একাকী হলেও বলো না আমি একা। বলো, আমার সাথে আছেন একজন মহাদ্রষ্টা, নিয়ন্ত্রক।”
আবু বকর ছিলেন একজন দুনিয়াবিমুখ আবেদ ও মুজাহিদ। রাসূল তাকে শ্রেষ্ঠসব নাম ও উপাধি দিয়েছিলেন। ইজ্জত, সম্মান, মর্যাদাপূর্ণ খেতাবে ভূষিত করেছিলেন।
ইমাম আহমদ কিতাবুয যুহদ-এ তার একটি ঘটনা বর্ণনা করেন-
একদিন আবু বকর এক আনসার সাহাবির খামারে প্রবেশ করলেন। একটি খেজুর গাছের দিকে মনোযোগ দিলেন। দেখলেন, একটি পাখি এ গাছ থেকে ও গাছে উড়ছে। আবু বকর কেঁদে ফেললেন। কেঁদে কেঁদে বললেন, 'সুখী জীবন তোমার হে পাখি! গাছে গাছে উড়ে বেড়াও, পানির ঘাটে পানি খাও, এরপর মরে যাও, তোমার কোন হিসাব নেই! তোমার কোন আযাব নেই!' এই বলে আবু বকর কাঁদতে থাকলেন। তার সাথের সাহাবিরাও কাঁদতে থাকলেন।
এই হল আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ। এই হলেন জান্নাতের ঘোষণা পাওয়া ব্যক্তি। রাসূল ইরশাদ করেন, “যে কেউ আল্লাহর পথে জোড়া জোড়া ব্যয় করবে, তাকে জান্নাতের দরজাসমূহ থেকে ডাকা হবে- 'হে আল্লাহর বান্দা! এটাই উত্তম।' অতএব যে সালাত আদায়কারী, তাকে সালাতের দরজা থেকে ডাকা হবে। যে মুজাহিদ, তাকে জিহাদের দরজা থেকে ডাকা হবে। যে সিয়াম পালনকারী, তাকে রাইয়ান দরজা থেকে ডাকা হবে। যে সদকা দানকারী, তাকে সদকার দরজা থেকে ডাকা হবে। এরপর আবু বকর রাযি বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ!
আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা কোরবান; সকল দরজা থেকে কাউকে ডাকা প্রয়োজন নেই, তবে কি কাউকে সব দরজা থেকে ডাকা হবে?' রাসূল বললেন, 'হাঁ, আমি আশা করি তুমি তাদের মধ্যে হবে!' [বুখারি: ৩৬৬৬]
আবু বকর যখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত, আয়েশা তাকে বললেন, কবি সত্য বলেছেন-
যখন মৃত্যু আসবে; গলা ভেঙ্গে শব্দ উঠবে গড়গড়, সঙ্কোচনে ভেঙ্গে আসবে বক্ষ-পাঁজর, তখনও নিঃশেষ হয় না কতক যুবকের প্রাচুর্য!
আবু বকর বলে উঠলেন, আয়েশা, এ কথা বলো না। বরং বলো-
মৃত্যুযন্ত্রণা নিশ্চিতই আসবে। এ থেকেই তুমি টালবাহানা করতে। এবং শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে। এটা হবে ভয় প্রদর্শনের দিন। প্রত্যেক ব্যক্তি আগমন করবে, তার সাথে থাকবে চালক ও কর্মের সাক্ষী। [সূরা ক্বাফ : ১৯-২১]
অতঃপর তিনি ইন্তেকাল করলেন।
আবু বকর ছিলেন মুসলিম জাহানের খলিফা। অথচ ইন্তেকালের পর তার পরিত্যক্ত সম্পদ ছিল ব্যবহারের খচ্চর, উট এবং পরনের দুটি কাপড়। ওমর সেগুলো বাইতুল মালে সংগ্রহ করলেন এবং কেঁদে কেঁদে বললেন, 'আবু বকর, আপনার পরের খলিফাদের দৃষ্টান্ত দিয়ে গেলেন!'
ইবনুল কায়্যিম রাওযাতুল মুহিব্বীন ওয়া নুযহাতুল মুশতাকীন গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ওমর প্রতিদিন সকালে আবু বকর এর খবরাখবর দেখতেন। ওমর লক্ষ করলেন, আবু বকর প্রতিদিন ফজরের সালাت শেষে শহরের একটি উপকণ্ঠে আগমন করেন।
কয়েকদিন এ দৃশ্য দেখে একদিন ওমর আবু বকরের পিছুপিছু গমন করলেন। দেখলেন, আবু বকর বসতি থেকে বিচ্ছিন্ন একটি তাঁবুতে প্রবেশ করে কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এলেন। আবু বকর বের হয়ে আসার পর ওমর সে তাঁবুতে প্রবেশ করলেন। দেখলেন, তাঁবুর ভেতর একজন বৃদ্ধা। বৃদ্ধার চোখে আলো নেই। বয়সের ভারে ভেঙ্গে পড়েছে শরীর। সাথে আছে ক'টি বাচ্চা। ওমর বৃদ্ধাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আল্লাহর বান্দি! আপনি কে?'
বৃদ্ধা বললেন, 'আমি এক অন্ধ ও বৃদ্ধ মহিলা। আমার শরীর অবসন্ন হয়ে পড়েছে। এই সংসারের পিতা মারা গেছে। আমার সাথে এই মেয়েগুলো আছে। আল্লাহ ছাড়া এখন আমাদের দেখভাল করার কেউ নেই।'
ওমর বললেন, 'আপনাদের কাছে মাত্র একজন লোক এসে গেলেন, তিনি কে?'
বৃদ্ধা বললেন, 'এই লোককে আমরা চিনি না। এই লোক প্রতিদিন আমাদের এখানে আসেন। তাঁবু ঝাড়ু দেন! আমাদের জন্য সকালের নাস্তা প্রস্তুত করেন! ছাগলগুলোর দুধও দোহন করে দেন!'
মহিলার কথা শুনে ওমর কেঁদে ফেললেন আর বললেন, 'আবু বকর! আপনার পরের খলিফাদের দৃষ্টান্ত দিয়ে গেলেন!'
ওমরের স্মৃতি। তিনি যখন জুমার খোতবা দিতে দাঁড়াতেন, তার পেট ক্ষুধায় ছটফট করত। তিনি তখন আপন মনে বলতেন, 'আমার পেট! ছটফট কর আর না কর, মুসলমান বাচ্চাদের ক্ষুধা যতক্ষণ নিবারণ না হবে, ততক্ষণ তোমার ক্ষুধাও নিবারিত হবে না। আল্লাহর কসম!'
ওমর জুমার খোতবা দিতে দাঁড়াতেন তালিযুক্ত পোষাক পরিধান করে। তার পরিহিত চাদরে চৌদ্দটা পর্যন্ত তালি যুক্ত হয়েছিল। অথচ কিসরা কায়সারের মত পরাশক্তি তার ভয়ে থরথর করে কাঁপত! কবি বলেন-
ওমরে দেখেছ কেউ – পরনে চাদর, খাবারে তেল শুধু, আশ্রয় কুঁড়েঘর!
অথচ কিসরা, রোম, কায়সার, ওমরের ভয়ে সদা কাঁপে থরথর!
ঠিক তাই! আমরা যখন আল্লাহকে ভয় পেতাম, তখন তাবৎ শক্তি আমাদের ভয় করত। দৈত্য-দানব বাদশাহও আমাদের ভয় পেত। যখন আল্লাহর ভয় আমাদের অন্তর থেকে দূর হয়ে গেল, আল্লাহ সেসব রাজ-রাজড়াদের ভয় আমাদের অন্তরে বদ্ধমূল করে দিয়েছেন।
আমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু এর শক্তিতে বলীয়ান হয়ে পৃথিবীর তাবৎ শক্তির সাথে যুদ্ধ করেছি। এই শক্তি ছাড়া আমাদের আর শক্তি ছিল না। তাই তখন আমরা বিজয়ী হয়েছি। আমরা তাদের ভয় করিনি। কারণ একমাত্র আল্লাহকেই আমরা মনেপ্রাণে ভয় করেছি।
কাদিসিয়ার যুদ্ধে রবি ইবনে আমের ছিলেন মুসলমানদের শীর্ষব্যক্তি। তিনি বন্দি হয়ে রুস্তমের সামনে উপস্থিত হলেন। রুস্তমের রাজত্বে ছিল খনি ভর্তি স্বর্ণ-রূপা, রং-বেরংয়ের রেশম, শোভাবর্ধণের যতসব উপকরণ। এদিকে রবির সাথে ছিল ভগ্ন তীর, ছিন্নভিন্ন কাপড়, আহত ঘোড়া। কিন্তু তিনি আল্লাহ -কে ভয় করতেন। আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক রাখতেন। আল্লাহর রহমতের নিশ্চিত আশা রাখতেন।
রুস্তম তাকে দেখে হাসল। রবি ইবনে আমেরের এ অবস্থা দেখে অবজ্ঞাভরে বলল, 'তোমরা এই অকৃত তীর নিয়ে, ছিন্নভিন্ন কাপড় পরে, আহত ঘোড়ায় চড়ে নেমেছ দুনিয়া জয় করার জন্য!'
রবি ইবনে আমের বললেন, 'আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাদের পাঠিয়েছেন মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে আল্লাহর দাসত্বে মুক্তি দানের জন্য। পার্থিব সংকীর্ণতা থেকে আখিরাতের প্রশস্ততার দিকে ধাবিত করার জন্য। মিথ্যা ধর্মের যাঁতাকল থেকে সত্য ধর্ম ইসলামের ন্যায়নীতি দান করার জন্য।'
কে ছুটেছে অস্ত্র লয়ে, আল্লাহ নামের ঝান্ডা লয়ে, আকাশ ছোঁয়া মিনার হয়ে, তারার ভুবন পাড়ি দিয়ে!
গির্জা প্যাগোডা মন্দিরে; আফ্রিকার ঐ ধর্মালয়ে, আল্লাহ নামে আযান ফুঁকে, দিয়েছিল সব গুঁড়িয়ে!
আমরা ছিলাম সেই সে জাতি- পাহাড় দলে পাহাড় গড়ে, সাগর চিড়ে ঢেউয়ের তোড়ে, -আমরা ছিলাম বীরের জাতি।
একটা সময় ছিল- আমাদের এক তাকবিরে শত্রুর অট্টালিকা ধ্বসে পড়ত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস কাদিসিয়ার পর কিসরার অট্টালিকা দেখে তাকবির ধ্বনি দিয়েছিলেন। তাকবির ধ্বনিতে সেদিন কিসরার অট্টালিকার পতন হয়েছিল। বিজয়ের অশ্রু মেখে সাদ কবিতা পাঠ করলেন-
আমায় ভাসিয়ে নিল বিজয়ের প্লাবন। খুশি আর আনন্দে আমার এ কৃতজ্ঞ রোদন...
অতঃপর সাদ তেলাওয়াত করলেন-
তারা ছেড়ে গিয়েছিলেন কত উদ্যান আর প্রস্রবণ, কত শষ্যক্ষেত্র আর সুরম্য স্থান, কত সুখের স্থান যাতে তারা সুখগল্প করতো, এমনই হয়েছিল এবং আমি এগুলোর মালিক করেছিলাম ভিন্ন সম্প্রদায়কে, তাদের জন্য ক্রন্দন করেনি আকাশ ও পৃথিবী এবং তারা অবকাশও পায়নি। [সূরা দুখান: ২৫-২৯]
সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর একান্ত বান্দা ছিলেন। তারা আল্লাহকে ভয় করতেন। ইবনে আব্বাস যখন নিম্নোক্ত আয়াত তেলাওয়াত করতেন, চোখ ছেড়ে কান্না করতেন-
যে ব্যক্তি রাতে সেজদায় অথবা দাঁড়িয়ে এবাদত করে, পরকালের আশঙ্কা রাখে এবং তার পালনকর্তার রহমত প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান, যে এরূপ করে না! [সূরা যুমার: ০৯]
তেলাওয়াত শেষে বলতেন, 'এই ব্যক্তি হলেন উসমান ইবনে আফফান। তিনি ইশা থেকে ফজর পর্যন্ত আল্লাহর তাসবীহ এবং কোরআন তেলাওয়াত করতেন!'
রাত জেগে এবাদতকারী মহান শহীদ উসমান ইবনে আফফানকে বর্বরোচিত হমালায় হত্যা করা হল। হাসসান ইবনে সাবিত তাঁর হত্যাকাণ্ডে বাকরুদ্ধ হয়েছিলেন। কবিতা গেঁথে বলেছিলেন-
সিজদায় যার চুল সাদা হয়েছে, তাসবীহ আর মোহাম্মতে যার রাত কেটেছে, সেই বিরল দৃষ্টান্তকে তারা হত্যা করেছে!
ইবনে হাজার ফাতহুল বারীতে এবং মারুযী-ও উল্লেখ করেন, উসমান ইশার পর এক রাকাত সালাতে পুরো কোরআন তেলাওয়াত করে সারারাত কাটিয়ে দিতেন।
এমন ছিলেন তারা। এমনই ছিল তাদের আল্লাহভীতি ও আল্লাহপ্রেম। আল্লাহর সাথে এযুগের উম্মতে মোহাম্মদির প্রেম ও ভালোবাসা আরও গাঢ় করা উচিত। আত্মপর্যালোচনা করা উচিত- আমাদের আদর্শ সাহাবায়ে কেরام কেমন এবাদত করতেন, আমরা কেমন করছি! বিশ্ব মানবতা যাদের সমতুল্য আজও পায়নি, কোন মানবসভ্যতা যাদের অনুরূপ আজও দেখেনি, পূর্বসূরী হয়েও তাদের থেকে আমরা আজ কতদূরে। তাদের উপর্যুক্ত এবাদতের তুলনায় আমরা আজ কী করছি! আমরা পরকালের জন্য অগ্রে কী প্রেরণ করেছি!
তাবুক যুদ্ধের সময় রাসূল সাহাবিদের মসজিদে সমবেত করে বললেন, 'কে এই কঠিন দিনের সেনাবাহিনী সাজিয়ে দিবে? তার জন্য জান্নাতের ঘোষণা!' [আহমাদ : ৫১৩]
এই ভারবহন ছিলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সাহাবায়ে কেরাম চুপ রইলেন।
রাসূল দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করলেন, 'কে এই কঠিন দিনের সেনাবাহিনী সাজিয়ে দিবে? তার জন্য জান্নাতের ঘোষণা!'
সাহাবায়ে কেরام এবারও চুপ রইলেন।
রাসূল তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করলেন, 'কে এই কঠিন দিনের সেনাবাহিনী সাজিয়ে দিবে? তার জন্য জান্নাতের ঘোষণা!'
উসমান দাঁড়ালেন। বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, এই কঠিন দিনের বাহিনী আমি সাজিয়ে দিবো। অর্থ, অস্ত্র, ঘোড়া, জিনপোশ, আল্লাহর রাহে সবই আমি বহন রবো।'
উসমানের ঘোষণা শুনে রাসূলের দুই চোখে অশ্রু গড়ালা। রাসূল দোয়া করে বললেন, 'আল্লাহ! উসমানের পূর্বাপর সব গোনাহ মাফ করো। আল্লাহ! তুমি তার উপর সন্তুষ্ট হও, আমিও তার উপর সন্তুষ্ট।' [তিরমিযি: ৩৭০১]
সাহাবায়ে কেরামের এ ঘটনা ও স্মৃতিগুলো ঈমানজাগানিয়া। উৎসাহব্যঞ্জক। নসিহতপূর্ণ। আল্লাহ তাদেরকে আমাদের জন্য আদর্শ বানিয়েছেন। নেতা ও অনুসরণীয় বানিয়েছেন। আল্লাহ বলেন-
এরা এমন ছিল, যাদের আল্লাহ পথ প্রদর্শন করেছিলেন। অতএব আপনিও তাদের পথ অনুসরণ করুন। [সূরা আনয়াম: ৯০]
সুতরাং যে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়তে চায়, আল্লাহর এবাদতে নিরত হতে চায়, তার আদর্শ ও অনুসরণ সাহাবায়ে কেরামের রঙিন মখমল জীবন ঘিরেই আবর্তিত। কবির ভাষায়-
সাহাবাদের মতো হও যুহদ ও তাকওয়ায়, তাদের মতো জীবন্ত এবাদত বলো আর কোথায় পাই!
আলি আমাদের উপমা। যিরার ইবনে হারিস সাদাঈ বলেন, “আলি মিম্বারে দাঁড়াতেন। দাড়িতে হাত বুলাতেন আর বলতেন, ‘হে দুনিয়া! আমি ছাড়া আর কাউকে ধোঁকা দাও। আমি তোমাকে তিন তালাক দিয়েছি। তিন তালাকের পর ফিরিয়ে আনার কোন পথ থাকে না। তোমার সফর দীর্ঘ তোমার পাথেয় তুচ্ছ তোমার বয়স সঙ্কীর্ণ হায়! কেউ এই সফর থেকে দূরে থাক এই সম্ভার থেকে দূরে থাক মৃত্যুর সাক্ষাত ...”
প্রকৃত মুসলমান সেই, যে আল্লাহকে ভয় পায়। সাহাবায়ে কেরাম মৃত্যুকে ভয় পেতেন। মৃত্যুর ভয়ে প্রকম্পিত থাকতেন। আল্লাহ -র সাক্ষাতে ভয় পেতেন। এজন্য আল্লাহ তাদের লক্ষ্যে পৌঁছিয়েছেন। তাদের কাঙ্ক্ষিত স্থান দান করেছেন।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া আল্লাহভীতির সুন্দর পরিচয় দিয়েছেন। আল্লাহভীতি এমন অনুভুতি, যা মানুষকে গোনাহ থেকে বিরত রাখে। মানুষ জীবন সম্ভারের প্রতি মুখাপেক্ষী হয় না। সংসার, নিদ্রা, পানাহার সবকিছু ত্যাগ করা আল্লাহভীতি নয়। এসব ইসলামের অংশ নয়। সুফিদের বাড়াবাড়ি মাত্র।
আল্লাহভীতি মানুষকে গোনাহ থেকে বাঁচায়। গোনাহ ত্যাগের উপর অবিচল রাখে। যে ভীতি মানুষকে গোনাহ থেকে বাঁচায় না, তা ভীতি আল্লাহভীতি নয়। সে ভীতি মুখের কথা মাত্র।
মুআত্তা কিতাবে হাসান থেকে বর্ণিত, সাজসজ্জার নাম ঈমান নয়। আশাপ্রত্যাশার নাম ঈমান নয়। ঈমান মানুষের অন্তরে গভীর রেখাপাত করে এবং তার আমলে সত্যায়িত হয়। ঈমান ও আল্লাহভীতির প্রভাব মানুষের সৎকর্মকুশল দ্বারা প্রতিফলিত হয়।
যাহাবি সিয়ারু আলামিন নুবালা গ্রন্থে দুনিয়াবিমুখ প্রখ্যাত আলেম আব্দুল্লাহ ইবনে ওয়াহাব মিসরি এর স্মৃতি উল্লেখ করেন- আব্দুল্লাহ ইবনে ওয়াহহাব কেয়ামতের ভয়াবহতা প্রতিপাদ্য করে আহওয়ালু ইয়াওমিল কিয়ামা নামে একটি কিতাব রচনা করেন। কিতাব রচনা শেষ হলে ছাত্ররা তাকে বলল, ‘কিতাবটি আমাদের পড়ে শোনান।’
আব্দুল্লাহ ইবনে ওয়াহহাব বললেন, 'আমি! আল্লাহর কসম! আমি এ কিতাব তোমাদের পড়ে শোনাতে পারবো না। তোমাদের একজন সামনে এসে পড়।' ছাত্ররা বলল, 'তাহলে আপনার ছেলেই আমাদের তা পড়ে শোনাক!'
আব্দুল্লাহ ইবনে ওয়াহহাবের ছেলে কিতাবটি পড়তে শুরু করলেন। কিতাবে এমনসব আলোচনা স্থান পেয়েছে, যা ইতিপূর্বে কেউ কখনও শোনেনি। আব্দুল্লাহ ইবনে ওয়াহহাব তন্ময় হয়ে শুনছেন। কেয়ামতের ভয়াবহতা শুনে এক পর্যায়ে তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়লেন। তিন দিন যাবৎ তিনি বেহুঁশ হয়ে ছিলেন। চতুর্থ দিনে তিনি ইন্তেকাল করেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে ওয়াহহাবের এমনও স্মৃতি আছে- একদিন তিনি গোসল করছিলেন। দিনটি ছিল শুক্রবার। গোসল করা অবস্থায় তার ছেলের তেলাওয়াত শুনলেন। ছেলে তেলাওয়াত করছে- যখন তারা জাহান্নামে পরস্পর বিতর্ক করবে। [সূরা মুমিন: ৪৭]
আব্দুল্লাহ ইবনে ওয়াহহাব এই আয়াত শুনে সংজ্ঞা হারিয়ে সেখানেই পড়ে গেলেন!
তারা ছিলেন সেই সে মানুষ, আল্লাহ -এর সাথে যাদের অন্তরের গভীর সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। তাদের গোনাহ কমে গিয়েছিল। তাওবা, প্রত্যাবর্তন, আল্লাহমুখীতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। এজন্য আল্লাহ তাদের লক্ষ্যে পৌঁছিয়াছিলেন।
মনীষা চরিতের বিরল কিতাব আল-কামালু ফী আসমাইর রিজাল এর লেখক প্রসিদ্ধ ও বিদগ্ধ মুহাদ্দিস আব্দুল গনি মাকদিসি একবার গ্রেফতার হয়েছিলেন। তার সাথে একই জেলখানায় কজন কাফের বন্দীও ছিল। আব্দুল গনি মাকদিসি বন্দী জীবন শুরু। প্রথম রাতে ঘুম ছেড়ে অযু করে দুই রাকাত সালাত আদায় করেন। অযু ছুটে গেলে আবার অযু করেন, সালাত পড়েন। কোরআন তেলাওয়াত করেন। আল্লাহ -এর কাছে দোয়ার হাত তুলে অবিরাম কাঁদতে থাকেন। এভাবে তিনি রাত কাটিয়ে দেন।
কাফের বন্দীরা তার এ দৃশ্য অবলোকন করছিল। সকাল হতেই তারা কারারক্ষীদের কাছে গিয়ে বলল, 'আমাদের ছেড়ে দিন। আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি। আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, মোহাম্মদ আল্লার রাসূল।'
কারারক্ষীরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'তোমরা কিভাবে ঈমান গ্রহণ করলে?'
তারা বলল, 'আমরা এমন একটি রাত কাটিয়েছি, যা আমাদের সারা জীবনে প্রথম। আমরা যখন এই লোকটিকে (আব্দুল গনি মাকদিসি) সালাত পড়ে কান্না করতে দেখলাম, মনে হচ্ছিল- কেয়ামত বুঝি অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে!'
কথাবার্তা ওয়ায-নসিহতের তুলনায় আমল দিয়ে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকলে, যুহদ ও তাকওয়া, আল্লাহর সাথে নিগূঢ় সম্পর্ক ধরে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করলে তা বেশি ফলপ্রসূ। আমাদের পূর্ববর্তী ওলামায়ে কেরাম এ পদ্ধতিতে উল্লেখযোগ্য ফলাফল দেখিয়ে গেছেন। তাদের কাছে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি সবসময়ই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আব্দুল গন মাকদিস এর ঘটনা আমাদের সে কথাই বলে।
আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক এর এক ছাত্র বলেন, 'একদিন আমি তার সফরসঙ্গী হয়েছিলাম। ভাবছিলাম- উসতায আমাদের মতই সালাত পড়ছেন। আমাদের মতই তেলাওয়াত করছেন। আমাদের মতই রোযা রাখছেন। অথচ আল্লাহ তার সুখ্যাতি মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন। বিশ্বময় তাকে উঁচু মর্যাদার অধিকারী করেছেন। কেন? কী এমন গোপন ভেদ?'
এসব ভাবতে ভাবতে আমরা একটি রুমে প্রবেশ করলাম। অন্ধকার রাত। হঠাৎ আমাদের রুমের বাতিটিও নিভে গেল। বাতি জ্বালানোর জন্য বের হলাম। বাতি জ্বালিয়ে কিছুক্ষণ পর রুমে ফিরলাম। রুমে ফিরে দেখি উসতায কাঁদছেন। চোখের পানি বেয়ে বেয়ে তার দাড়ি ভিজিয়ে দিচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম, 'কী হয়েছে আপনার?'
তিনি বললেন, 'ছোট অন্ধকার এই রুমে আমার কবরের কথা মনে পড়েছে। আমি ভাবছি, কবর যেন কেমন হবে!'
আমি যে ভাবছিলাম, কী এমন গোপন ভেদে আল্লাহ বিশ্বময় তাকে উঁচু মর্যাদার অধিকারী করেছেন, উসতাযের এই কথা শুনে আমার ভাবনার অবসান হল। সে গোপন ভেদ আমি খুঁজে পেলাম!
কবর জগত এক ভীষণ জগত। সেখানে আরাম খোঁজ করবো, কিন্তু আরাম পাবো না। সেখান থেকে ফিরে আসতে চাইবো, কিন্তু ফিরতে পারবো না। সে জগতে যাওয়ার আগেই আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের প্রস্তুতি গ্রহণ আবশ্যক। আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পন করা আবশ্যক।
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর যখন জাহান্নামীদের ব্যাপারে বর্ণিত এই আয়াত পড়তেন- 'তাদের ও তাদের বাসনার মধ্যে অন্তরাল হয়ে গেছে, যেমন তাদের সতীর্থদের সাথেও এরূপ করা হয়েছে-
যারা তাদের পূর্বে ছিল। তারা ছিলো বিভ্রান্তিকর সন্দেহে পতিত। [সূরা সাবা: ৫৪]
তখন তিনি কান্না জুড়ে দিতেন আর বলতেন, 'আমার এবং আমার বাসনার মধ্যে অন্তরাল করো না।'
তাকে জিজ্ঞেস করা হল, 'আপনার বাসনা কী?'
তিনি বললেন, 'আমার বাসনা হল- কবরে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু পাঠ করবো!' কবরে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু পাঠ করার কথা কখনও শোনা যায়? কবরে সালাত পড়ার কথা শুনেছে কেউ? কবরে আবার সওম-ও আদায় করে কেউ? আল্লাহ বলেন-
তাদের ও তাদের বাসনার মধ্যে অন্তরাল হয়ে গেছে, যেমন তাদের সতীর্থদের সাথেও এরূপ করা হয়েছে, যারা তাদের পূর্বে ছিল। তারা ছিল বিভ্রান্তিকর সন্দেহে পতিত। [সূরা সাবা: ৫৪]
আলি এর ঘটনা। কুফা নগরীতে একটি কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। কবরবাসীদের সালাম নিবেদন করলেন- 'আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর! আনতুম সালাফুনা ওয়ানাহনু বিলআছার।' অতঃপর বললেন, 'তোমারদের কবর দেখতে কতো সুন্দর, কিন্তু ভিতরে তোমরা কেমন যেন আছ! কী খবর যেন তোমাদের! আমাদের খবর জানবে! তোমার রেখে যাওয়া ঘরবাড়িতে লোকজন বাস করছে। তোমার স্ত্রীর বিয়ে হয়ে গেছে। ধনসম্পদ বণ্টিত হয়ে গেছে। এই হল আমাদের খবর। তোমাদের খবর যেন কী!'
এরপর তিনি বললেন, "কবরবাসী তো চুপ। কোন কথা বলছে না। যদি তারা কথা বলতো, তাহলে এই কথাই বলতো-
আর তোমরা পাথেয় সাথে নিয়ে নাও। নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম পাথেয় হচ্ছে আল্লাহর ভয়। [সূরা বাকারা: ১৯৭]
খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আযিয তিনি ছিলেন দুনিয়াবিমুখ একজন শাসক। বয়সে ছিলেন যুবক, চল্লিশের কোটাও পেরুতে পারেননি। ইবনে কাসির তার স্মৃতিতে উল্লেখ করেন, ওমর ইবনে আব্দুল আযিয একবার ঈদের সালাত আদায় করলেন। উমাইয়া খেলাফতের আমীর-উযিররাও ছিলেন তার সাথে। সালাত শেষে তার সামনে বাহন আনা হল। তিনি বললেন, 'আমি একজন মুসলমান। আমি মানুষ।' একথা বলে তিনি সামনে চলতে লাগলেন।
তিনি যখন কবরস্থানের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তখন দাঁড়ালেন। কবরবাসীদের সালাম জানালেন- 'আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর।' আল্লাহ রব উচ্চারণ করে বললেন, 'কবর! তোমারে গর্ভে কত মসৃণ গাল আর কাজলমাখা চোখ আশ্রয় নিয়েছে! তারা পৃথিবীতে হেসেছে, খেলেছে, জীবনরাঙ্গা স্বপ্নও দেখেছে!'
অতঃপর তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে উঁচু গলায় বললেন, 'মরণ! বন্ধুদের কী করলি তুই!'
আবার আপন মনেই উত্তর খুঁজে বললেন, 'মরণ ওদের চোখের তারা মিলিয়ে দিয়েছে। ওদের চোখদুটি মাটিতে খেয়েছে। বাহু থেকে হাত খসে পড়েছে। কাঁধ থেকে বাহু বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। পায়ের পাতা ছিন্ন হয়েছে নলা থেকে, নলা ছিন্ন হয়েছে হাঁটু থেকে।'
চোখ মুদিলে নাই কিছু নাই, এই দুনিয়ায় বাধলি ঘর- সেই ঘর ভালো তো সবই ভালো, মন্দ হলে সবই পর। ধন কামালি মাল কামালি, চলে গেলি সব ছাড়ি- -ওয়ারিসরা সব নিয়ে নিল, মরার পরে সবাই পর... ঐ দুনিয়ায় ঘর বাধো মন; ঘরের রক্ষী থাক রাযি আহমদ হবেন প্রতিবেশী, নির্মাতা তার মহান রব...
ভবন হবে স্বর্ণালী তার মিসক হবে পলেস্তর যাফরানি ঘাস তরুলতায় মাঠ-জমি-ঘাট সব উর্বর...
মানুষ! যাই করো না কেন, চিরস্থায়ী ভুবনের জন্য কিছু করো। অনন্ত অশেষ নির্বিঘ্ন জীবনের কিছু করো। সে জীবনের জন্য কিছু করলে আল্লাহভীতি সৃষ্টি হবে। সে সাড়ম্বর জীবনে আনতনয়না হুরগণ গানে গানে আহ্বান জানাবে-
আমরা অনন্ত সঙ্গিনী, আমাদের ধ্বংস নেই। আমরা সুখ-সম্পদশালীনী, আমাদের অভাব নেই। (আমরা আমাদের মালিকদের প্রতি তুষ্ট) অসন্তুষ্টি নেই আমাদের। মোবারক সেসব ব্যক্তি, যারা আমাদের এবং আমরা যাদের! (তিরমিযির হাদীসের আলোকে অনুদিত) [তিরমিযি : ২৫৬৪]
যারা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকবে, কুচরিতার্থ ও গান-বাজনা থেকে বেঁচে থাকবে, তাদের জন্য এই নেয়ামত। যারা গোনাহ থেকে বাঁচবে না, গান- বাজনা করবে, কুচরিতার্থ করবে, তারা এই নেয়ামত ভোগ করতে পারবে না। ইবনুল কায়্যিম বলেন-
মধুময় আবেশে, মৃদুময় বাতাসে, কেঁপে কেঁপে নড়ে ওঠে লতা পাতা শাখ কানে কানে মানুষের, বেজে ওঠে কী সুরের! তালে লয়ে গানে অনুরাগ মন ভরে শুনি তবু, মন ভরে নাকো কভু, জান্নাতে আল্লাহর দান! তবলা ও বেহালা, সেতারা ও দোতারা, বাঁশরীর কী শোন গো গান?
এই হলো জান্নাতের গান। জান্নাতে যে এই গান শুনতে চায়, সে দুনিয়ার পাপিষ্ঠ গান থেকে দূরে থাকুন। যে অন্তর জান্নাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়, সে অন্তর পার্থিব তৃপ্তি থেকে বেঁচে থাকুন। যে চোখ জান্নাতের নেয়ামতরাজি দেখতে চায়, সে চোখ দুনিয়ার হারাম দৃশ্য দেখা থেকে বিরত থাকুন।
আমাদের সালফে সালেহীন আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য আল্লাহভীতির বাহনকে সবচেয়ে নিরাপদ বাহন হিসেবে ব্যবহার করতেন। খোদভীতির মাধ্যমেই তারা আল্লাহর এত নৈকট্যভাজন হতে পেরেছিলেন। ইবনে আব্বাস সারারাত একটি মাত্র আয়াত পড়তেন আর এই আয়াতটি পড়ে পড়েই সারারাত খুব কাঁদতেন-
তোমাদের আশার উপর ভিত্তি নয়, আহলে কিতাবের আশার উপরও ভিত্তি নয়। যে কেউ মন্দ কাজ করবে, সে তার শাস্তি পাবে এবং সে আল্লাহর ছাড়া নিজের কোন সমর্থক বা সাহায্যকারী পাবে না। [সূরা নিসা: ১২৩]
ইবনে আব্বাস বলেন, 'আমি এর ছাত্র আতা ইবনে আবি রাবাহ ইবনে আব্বাসের চোখ সবসময় ভেজা রশির মতো আর্দ্র দেখতাম।'
ইবনে আব্বাসের জীবনি সংকলকগণ লিখেন, তায়েফে তার ইন্তেকালের পর যখন কাফন পরিয়ে জানাযার জন্য উপস্থিত করা হয়, তখন একটি পাখি এসে তার কাফনের উপর বসে। এক শ্রোতা পাখির কণ্ঠে কোরআনের এ আয়াত তেলাওয়াত করতে শোনে-
'হে প্রশান্ত মন! তুমি তোমার পালনকর্তার কাছে ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর।'
যে মন আল্লাহ -কে প্রভু মেনে সন্তুষ্ট হয়েছে, মোহাম্মদ -কে নবি পেয়ে ধন্য হয়েছে, ইসলামকে ধর্ম পেয়ে বিজয়ী হয়েছে, সে মন আল্লাহর বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। সে মন জান্নাতে প্রবেশকারী। আল্লাহ -র পক্ষ থেকে এটা তার পুরস্কার।
পৃথিবীতে আল্লাহকে সবচেয়ে ভয় পেতেন রাসূল । সহীহ বুখারীতে আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত হয়েছে, “রাসূল বলেন, 'তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে আল্লাহভীরু আমি।”
ইবনে মারদূয়া বিলাল রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, বিলাল বলেন- আমি একদিন ভোররাতে রাসূলের কাছে গিয়েছি সালাতের ঘোষণা দেয়ার জন্য। গিয়ে দেখলাম, রাসূল কাঁদছেন। আমি রাসূলকে বললাম, 'আমার বাবা-মা আপনার জন্য কোরবান হোক! কোন জিনিস আপনাকে কাঁদিয়েছে!'
রাসূল বললেন, "বেলাল! আমার উপর কিছু আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। যে ব্যক্তি আয়াতগুলো তেলাওয়াত করে, অথচ তা নিয়ে চিন্তা করে না, তার জন্য দুর্ভোগ! আয়াতগুলো হল-
নিশ্চয় আসমান ও যমিন সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের আবর্তনে নিদর্শন রয়েছে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্য। যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা গবেষণা করে আসমান ও যমিন সৃষ্টির বিষয়ে। তারা বলে, 'পরওয়ারদিগার! এসব তুমি অনর্থক সৃষ্টি করনি। সকল পবিত্রতা তোমারই। আমাদের তুমি দোযখের শাস্তি থেকে বাঁচাও। [সূরা আলে ইমরান: ১৯০, ১৯১] [তাফসিরে ইবনে কাসির : ১/৪৪১]
দোযখের আগুন থেকে বাঁচার ফরিয়াদ সকলের জরুরি। দোযখের আগুন থেকে বাঁচা যাবে আল্লাহ -কে ভয় করার মাধ্যমে। আল্লাহ -র গোস্বা থেকে বাঁচা যাবে আল্লাহভীতির মাধ্যমে।
রাজাদের গোলাম যখন শুভ্রকেশী হয়, রাজাগণ তাদের আযাদ করে দেন ন্যায়সঙ্গতভাবে।
প্রভু! এই ন্যায়পরায়ণে তুমিই উত্তম; আমার কেশ শুভ্র হয়েছে, আমায় আযাদ করো আগুন থেকে।
ইমাম আহমাদ এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তিনি যখন ঘরে নিভৃতে বসতেন, এক পায়ের উপর আরেক পা আড়াআড়িভাবে রেখে বসতেন। স্থির হয়ে বসতেন। ভীত প্রকম্পিত হয়ে বসতেন। যখন মানুষের সামনে আসতেন, তখন তার ভিতর সেই প্রকম্পন দেখা যেত না। তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আমার সাথে একজন পাহারাদার আছেন। তিনিও আমার সাথে একত্রে বসেন।'
ইমাম আহমাদ এর কথা সেই হাদিসের বাস্তবতা- রাসূল ইরশাদ করেন- أَنَا جَلِيْسٌ مَنْ ذَكَرَنِي
আল্লাহ বলেন, যে আমাকে স্মরণ করে, আমি তার সহচর। [মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা : ১২৬৫]
আবু হোরায়রা থেকে বর্ণিত, فَإِنْ ذَكَرَنِي فِي نَفْسِهِ ذَكَرْتُهُ فِي نَفْسِي وَإِنْ ذَكَرَنِي فِي مَلَا ذَكَرْتُهُ فِي مَلَإٍ خَيْرٍ مِنْهُمْ
আল্লাহ বলেন, যে আমাকে আপন মনে স্মরণ করে, আমি তাকে আপন মনে স্মরণ করি। যে আমাকে মানুষের মজলিসে স্মরণ করে, আমি তাকে তার চেয়ে উত্তম মজলিসে স্মরণ করি। [বুখারি: ৭৪০৫]
আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্যের অন্যতম আরেকটি উপসর্গ হল ইখলাস। আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ মনে আমল করা। যে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ হয়ে আমল করে, তারাই আমলের সাওয়াব ও প্রতিদান পায়। আল্লাহ বলেন- তাদের এ ছাড়া কোন নির্দেশ দেয়া হয়নি যে তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর এবাদত করবে। [সূরা বায়্যিনা: ০৫]
জেনে রাখুন, নিষ্ঠাপূর্ণ এবাদত আল্লাহরই জন্য। [সূরা যুমার: ০৩]
কোন এবাদতে আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে দেখানো বা শোনানোর মানসিকতা না থাকাই ইখলাস। আল্লাহ বলেন-
আপনি আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যকে আহ্বান করবেন না। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। আল্লাহর সত্তা ব্যতীত সবকিছুই ধ্বংস হবে। বিধান তারই, এবং তোমরা তারই কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে। [সূরা কাসাস : ৮৮]
ইখলাস ছাড়া আল্লাহ -র কাছে কোন আমলের বা এবাদতের গ্রহণযোগ্যতা নেই। আমলের মাধ্যমে আল্লাহকে পাওয়ার এটিই শ্রেষ্ঠ রাস্তা। এটিই উন্মুক্ত দরজা। রাসূল মুয়ায -কে বলেন- يَا مُعَاذُا أَخْلِصْ دِينَكَ يَكْفِيكَ الْقَلِيلُ مِنَ الْعَمَلِ
মুয়ায, তোমার এবাদত নিষ্ঠাপূর্ণ কর। অল্প আমলই নাজাতের জন্য যথেষ্ট হবে। [মুস্তাদরাকে হাকিম: ৭৯১৬]
প্রচারমুখী আমল প্রচুর হলেও কোন কাজে আসবে না। নিষ্ঠাপূর্ণ প্রচারবিমুখ আমল অল্প হলেও প্রচুর আমলের মতো হবে। সে আমল বরকতপূর্ণ হবে। নাজাতের জন্য যথেষ্ট হবে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-
সর্বপ্রথম জাহান্নামের আগুন প্রজ্জ্বলিত হবে আলেম মুজাতিদ এবং ব্যবসায়ী দ্বারা। কারণ, তারা প্রচারপ্রিয় ছিল। দুনিয়াতে মানুষকে দেখানোর জন্য তারা আমল করেছিল। [তিরমিযি : ২৩৮২]
মুয়াবিয়া উক্ত হাদিস শুনে কান্না শুরু করে দিয়েছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, আল্লাহ সত্যই বলেছেন-
যে ব্যক্তি পার্থিবজীবন ও তার চাকচিক্যই কামনা করে, হয় আমি দুনিয়াতেই তাদের আমলের প্রতিফল ভোগ করিয়ে দিবো এবং তাতে তাদের প্রতি কিছুমাত্র কমতি করা হবে না। এরাই হলো সেসব লোক, আখেরাতে যাদের জন্য আগুন ছাড়া নেই। তারা এখানে যা কিছু করেছিলো, সবই বরবাদ করেছে। আর যা কিছু উপার্জন করেছিলো, সবই বিনষ্ট হয়েছে। [সূরা হুদ: ১৫, ১৬]
জুনদুব ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে সুফয়ান থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন- مَنْ سَمَّعَ سَمَّعَ اللَّهُ بِهِ وَمَنْ يُرَائِي يُرَانِي اللَّهُ بِهِ
যে লোক দেখানোর জন্য আমল করে, আল্লাহ তা লোকের কাছে দেখিয়ে দেন। যে মানুষের কাছে প্রশংসা শোনার জন্য আমল করে, আল্লাহ তাকে মানুষের প্রশংসা শুনিয়ে দেন। [বুখারি : ৬৪৯৯]
যে তার আমল প্রচার করতে চায়, আল্লাহ তার আমল প্রচার করিয়ে দেন। আল্লাহর কাছে সে আমলের কোন প্রতিদান থাকে না। যে মানুষের কাছে সম্মান পাওয়ার জন্য আমল করে, আল্লাহ তাকে মানুষের কাছে সম্মানিত বানিয়ে দেন। আখিরাতের সাওয়াব সে বিলকুল পায় না।
আহমদ আদি ইবনে হাতেম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি রাসূল -কে জিজ্ঞেস করেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার বাবা আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করেন। মেহমানের মেহমানদারী করেন। দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করেন। তিনি আল্লাহর কাছে এর বিনিময়ে কিছু পাবেন কি?'
রাসূল বললেন- 'না। তোমার বাবা এসব আমল দ্বারা (পার্থিব) কিছু আশা করেছিল। আল্লাহ তাকে তা পাইয়ে দিয়েছেন।' [আহমাদ: ১৮৮৯৬]
সে যেহেতু দুনিয়াতে নামধাম চেয়েছিল, সম্মান চেয়েছিল, সুতরাং আল্লাহর কাছে এই আমলের কোন প্রতিদান নেই। দুনিয়াতে সে নামধাম সম্মান পেয়ে গেছে।
আয়েশা রাসূল-কে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! ইবনে জুদয়ান দান-সদকা করে। সে সম্মানী ব্যক্তি। তার এসব আল্লাহর কাছে কোন কাজে আসবে কি?'
রাসূল উত্তরে বললেন- لَا يَنْفَعُهُ إِنَّهُ لَمْ يَقُلْ يَوْمًا رَبِّ اغْفِرْ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ আল্লাহর কাছে এসব তার কোন কাজে আসবে না। সে জীবনে কখনও আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেনি- আল্লাহ, কেয়ামতের দিন আমার ভুলগুলো মাফ করে দিন। [মুসলিম: ৫৪০]
সর্বোপরি সততা ও নিষ্ঠা আল্লাহর প্রকৃত বান্দা হওয়ার জন্য অত্যাবশ্যক। প্রকৃত বান্দা হওয়ার প্রধান নিক্তি। প্রথম ধাপ। আল্লাহর প্রকৃত বান্দা হওয়ার অনেক ধাপ থাকলেও এটিই হল অন্যতম। ইখলাস ও নিষ্ঠা ছাড়া কোন আমল হয় না। আর আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া ইখলাস ও নিষ্ঠা অর্জিত হয়না। ইখলাসের জন্য আনুগত্য ও নিয়তের সততা আবশ্যক। আল্লাহ বলেন-
অতএব জিহাদের সিদ্ধান্ত এলে তারা যদি আল্লাহর প্রতি প্রদত্ত অঙ্গীকার পূর্ণ করে, তাহলে তাদের জন্য তা মঙ্গলজনক হবে। [সূরা মোহাম্মদ : ২১]
এক গ্রাম্য সাহাবি রাসূলের দরবারে আসলেন। রাসূলের হাতে বাইয়াত হলেন। রাসূলের দরবারে তখন একটি বকরি হাদিয়া আসল। রাসূল বকরিটি ঐ সাহাবিকে হাদিয়া দিয়ে দিলেন। তখন তিনি বললেন, 'আপনার জন্য আল্লাহর মাগফিরাত। আমি বকরি লাভের জন্য বা অন্য কোন মালের জন্য আপনার হাতে বাইয়াত হইনি। আমি আপনার হাতে বাইয়াত হয়েছি, যেন একটি অনিয়ন্ত্রিত তীর আমার বুকে বিঁধে পিঠ দিয়ে বের হয়ে যায়।'
রাসূল বললেন, 'যদি তুমি সত্য বলে থাক, আল্লাহ এর বাস্তবায়ন ঘটিয়ে তোমার সততা প্রমাণ করবেন।'
এরপর এক যুদ্ধে ঐ সাহাবি শহীদ হলেন। রাসূল তার লাশ দেখে বললেন, 'সে আল্লাহর সাথে সততা রেখেছে। আল্লাহও তাকে সত্যায়িত করেছেন।' [নাসায়ি : ১৯৫৩]
মানুষ আল্লাহর কাছে গৃহীত হওয়ার জন্য, তার আনুগত্যের উপর আল্লাহর কাছে প্রতিদান পাওয়ার জন্য ইখলাস অতি আবশ্যক।
ইখলাস ও নিয়ত এমনই একটি বিষয়, কোন ব্যক্তি একটি ভালো কাজের নিয়ত করে যদি উক্ত কাজ সম্পন্ন করতে না পারে, তথাপি নিয়তের কারণে সে ভালো কাজের সাওয়াব পাবে। রাসূল ইরশাদ করেন, 'মুমিনের নিয়ত তার আমলের চেয়ে ফলপ্রসু, উত্তম।' [মাজমাউদ যাওয়াইদ: ২১২]
সাহল ইবনে হানিফ থেকে বর্ণিত, রাসূল ইরশাদ করেন, مَنْ سَأَلَ اللَّهَ الشَّهَادَةَ بِصِدْقٍ بَلَغَهُ اللهُ مَنَازِلَ الشُّهَدَاءِ وَإِنْ مَاتَ عَلَى فِرَاشِهِ যে আল্লাহর কাছে শহিদি মৃত্যু চায়, মন থেকে সততার সাথে চায়, সে যদি আপন বিছানায়ও মারা যায়, তথাপি আল্লাহ তাকে শহিদের মর্যাদা দান করেন। [মুসলিম : ১৯০৯]
মূল কথা- কেউ অন্তর থেকে চাইলে আল্লাহ তাকে কখনও কখনও তা পাইয়ে দেন। ওমর এক হজ্জের সফরে আবতাহে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, 'হে আল্লাহ! আমার নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ শেষ। আমার অস্থি-মজ্জা দুর্বল হয়ে গেছে। আমার মৃত্যু নিকটবর্তী। আমাকে তোমার রাসূলের শহরে শহিদের মৃত্যু দান কর।'
আল্লাহ তার মনের সততা জানতেন। আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেছেন। মদিনাতেই এক দুর্ভাগা অগ্নিপূজারীর হাতে শাহাদাত বরণ করেন।
আল্লাহর প্রকৃত বান্দা হওয়ার জন্য ইখলাসপূর্ণ আমল করা আবশ্যক। রাসূলের আনুগত্য ও অনুসরণ আবশ্যক। রাসূলের অনুসরণ এবং ইখলাসপূর্ণ সাথে আমলই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য।
রিয়া বা প্রচারপ্রিয়তা এমন এক সূক্ষ্ম ও ধ্বংসাত্মক ব্যাধি, যা মানুষের মধ্যে অজান্তেই সংক্রমণ করে। এবাদতকারীর এবাদতের মধ্যে, আলেমের ইলমের মধ্যে, দাঈর দাওয়াতের মধ্যে, দানবীরের দানের মধ্যে, মুজাহিদের জিহাদের মধ্যে অনায়াসেই রিয়ার অনুপ্রবেশ ঘটে।
রিয়া থেকে বাঁচার তিনটি পন্থা রয়েছে-
এক.
বান্দা এই অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস মনে জাগ্রত রাখবে যে, সকল ভালো- মন্দের মালিক কেবলই আল্লাহ । তিনিই দান করেন, দান থেকে বিরত থাকেন। তিনি জীবন দান করেন, মৃত্যু দান করেন। তিনি রিযিক দান করেন, রিযিক উঠিয়ে নেন। তার হাতেই সকল কাজের চাবিকাঠি।
দুই.
বান্দা বিশ্বাস রাখবে, দুনিয়া ধ্বংসশীল। সে অচিরেই মৃত্যুবরণ করবে। সে তার আমলের প্রতিদান পাবে। তার হিসাব-নিকাশ দিতে হবে। ভালো কাজ করলে ভালো প্রতিদান পাবে। মন্দকাজ করলে মন্দ প্রতিদান পাবে।
তিন.
আল্লাহর বড়ত্ব ও মহত্ত্ব মনে জাগরিত রাখবে। তাওবা, ইসতিগফার, দোয়ায় নিরত থাকবে। সকাল সন্ধ্যা এই দোয়া পড়বে- اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ [মাজমাউদ যাওয়াইদ : ১৭৬৭০]
সবিশেষ, মানুষের অন্তর জীবিত থাকবে আল্লাহর দাসত্ব দ্বারা। আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন দ্বারা। আমরা যেন দাসত্বের সেই স্থান অর্জন করার জন্য সচেষ্ট ও উদ্যোগী থাকি। আল্লাহ ﷺ আমাদের তাওফীক দান করুন।
📄 তাকওয়া কী?
তালক ইবনে হাবিব বলেন, আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করে তার নূরের আশ্রয়ে কোন ভাল কাজ করাই তাকওয়া।
ইবনে তাইমিয়া বলেন, আল্লাহ -র আদেশ পালন করা এবং আল্লাহ -র নিষেধ থেকে বেঁচে থাকার নাম তাকওয়া।
আলি ইবনে আবু তালেব বলেন, আল্লাহকে ভয় করা, কোরআনের উপর আমল করা, অল্পে তুষ্ট থাকা এবং আখেরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হল তাকওয়া।
অনেক আলেমের মতে- তাকওয়া হল আল্লাহ -র আযাব এবং বান্দার মাঝে একটি আড় স্থাপন করা।