📄 রাসূল ﷺ-র প্রতি আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহ
রাসূল ﷺ-কে গুপ্তহত্যার সিদ্ধান্ত নিল মক্কার কাফেররা। গোত্রপতিরা বিষমাখানো ধারালো তরবারি তুলে দিল প্রত্যেক গোত্রের সাহসী যুবকদের হাতে। টগবগে কম্পমান যুবকরা তরবারি হাতে রাসূলের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে, কখন রাসূল বের হবেন সেই অপেক্ষায়।
আল্লাহ মহান রাসূলকে সংবাদ জানিয়ে দিলেন, কোরাইশ কাফেররা ঘরের চারদিক ঘিরে নিয়েছে। ফাঁদ পেতে আছে তোমাকে হত্যার জন্য। সুতরাং তুমি ঘর থেকে বের হও।
রাসূল ﷺ এক মুঠো ধুলোমাটি হাতে বের হলেন। ধুলোমাটি ছড়িয়ে দিলেন যুবকদের চোখেমুখে। নিরাপদে ঘর থেকে বের হয়ে চলে গেলেন পাহাড়ের গুহায়। কাফের যুবকদের তো মাথায় হাত!
কাফের যুবকরা তরবারি হাতে রাসূলের পশ্চাদ্ধাবন করল। যে গুহায় রাসূল অবস্থান করেছেন, সে গুহাটির প্রবেশমুখে আনাগোনা করছে। কে এখন রক্ষা করবে রাসূলকে?
রাসূলের সাথে ছিলেন আবু বকর । তিনি ভয়ে শঙ্কায় কাঁপছেন, রাসূলের না জানি কী হয়ে যায়! রাসূল দৃপ্তভরে বললেন,
لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا
ভয় পেওনা। নিশ্চয় আল্লাহ রয়েছেন আমাদের সাথে। [সূরা তাওবা: ৪০]
আল্লাহর কী কুদরত! একটি কবুতর এসে বাসা বানাল রাসূলের গুহার মুখে! মাকড়শা এসে জাল বুনলো রাসূলের গুহার মুখে। গুহার মুখে এতকিছু দেখে কেউ কি ধারণা করতে পারে, এখানে কোন লোক আছে!
কবির ভাষায়-
ভাবলো তারা মাকড়শায় কবুতরে কী হবে!
ওরা জাল বুনে বাসা বুনে রাসূলকে বাঁচাবে?
কিন্তু কী হবে তীর-বর্শায়
কী হবে কেল্লা বা দুর্গে?
আল্লাহর কারিশমা এসব কিছুর ঊর্ধ্বে, বহু ঊর্ধ্বে!
কাফের সুরাকা রাসূলের খোঁজে বাজবেগে ছুটল মরুর বুকে। কখন পাবে কাঙ্ক্ষিত শিকারী! কখন ধরবে মোহাম্মদকে! কিন্তু আল্লাহর সাথে রাসূলের এক গোপন কথায় সব শেষ! রাসূল আল্লাহর কাছে বললেন-
اللَّهُمَّ اكْفِنَاهُ بِمَا شِئْتَ
তুমি যেভাবে চাও, আমাদের পক্ষে ওর জন্য যথেষ্ট হয়ে যাও। [বুখারি : ৫৬০৭]
রাসূলের এক কথায় খেল খতম। কোন কষ্ট ছাড়া, অবরোধ ছাড়া রাসূল নিরাপদে মদীনায় পৌঁছে গেলেন। আল্লাহ-ই রাসূলের পক্ষে সুরাকার জন্য যথেষ্ট হলেন। তার ঘোড়া পা গেরে মরুর বালিতে বসে পড়ল। সে নিজেও ঘোড়া থেকে ছিটকে পড়ল। গুপ্তহত্যার এত চেষ্টার পর আল্লাহই রাসূল-কে বিজয়ী করলেন।
📄 আল্লাহ তার বন্ধুদের কারামত দিয়ে শক্তিশালী করেন
আল্লাহ তার বন্ধুদের কারামাত বা অলৌকিকত্ব দিয়ে শক্তিশালী করেন। মুজিযা দিয়ে শক্তিশালী করেন। রাসূল -কে আল্লাহ অসংখ্য মুজিযা দিয়ে শক্তিশালী করেছিলেন।
একদিন রাসূল সাহাবিদের সামনে দাঁড়ালেন তাদের সাথে কথা বলার জন্য। মসজিদে মিম্বার স্থাপন করা হয়েছে। এতদিন মিম্বার হিসেবে ব্যবহৃত হতো একটি খেজুর গাছের কান্ড। রাসূল নতুন মিম্বারে দাঁড়াতেই পরিত্যক্ত শুকনো খেজুর গাছের কান্ডটি আবেগাপ্লুত হয়ে উঠল। প্রিয় বন্ধুর বিচ্ছেদে অনুভূতিশীল হয়ে উঠল। একটি খেজুর গাছের কান্ড, যেটির কোন লাভ-ক্ষতির হিসাব নেই, কথা নেই, বাকশক্তি নেই, সেটি কিনা সকলের সামনে কেঁদে ওঠল!
জাবির বলেন, আল্লাহর কসম! আমরা খেজুর গাছের কান্ডের কান্না শুনেছি দশমা উটের কান্নার মতো।
রাসূল ﷺ মিম্বর থেকে নেমে আসলেন খেজুর গাছের কান্ডের সান্ত্বনার জন্য। খেজুর গাছের কান্ডের উপর ভালোবাসার পবিত্র হাত রাখলেন। খেজুর গাছের কান্ডের কান্না থামালেন। খেজুর গাছের কান্ডটি শান্ত হল। [বুখারি: ৩৫৮৫]
এটি ছিল রাসূলের মুজিযা।
কারামাত হল শক্তি, সাহসিকতা ও অনুপ্রেরণা প্রদানের জন্য আল্লাহ-র পক্ষ থেকে প্রিয় কোন মুমিন বান্দাকে অলৌকিক কিছুর প্রদান। রাসূলদের মুজিযার মতো আল্লাহ তার প্রিয় অনেক বন্ধুকে কারামাত বা অলৌকিকত্ব দান করেন। আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ভাষ্য- যখন কোন মুমিন বান্দা এবাদতের এমন চূড়ায় অবস্থান করে, যেখানে অগ্রগামীরাই শুধু অবস্থান করতে পারে, তাহলে আল্লাহ তাকে কিছু কারামাত দিয়ে থাকেন। আল্লাহ বলেন-
فَمِنْهُمْ ظَالِمٌ لِنَفْسِهِ وَمِنْهُمْ مُّقْتَصِدٌ وَمِنْهُمْ سَابِقٌ بِالْخَيْرَاتِ
তাদের কেউ কেউ নিজের প্রতি অত্যাচারী, কেউ মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী এবং কেউ আল্লাহর নির্দেশক্রমে কল্যাণের পথে অগ্রসর। [সূরা ফাত্বির: ৩২]
📄 আলা হাযরামির কারামত
আলা হাযরামি ছিলেন রাসূলের একজন সাহাবি। একবার তিনি যুদ্ধের একটি বাহিনী নিয়ে রওয়ানা হলেন। তিনি ছিলেন দলনেতা। চলতে চলতে বাহিনী পথ ভুলে গেল। একবার ডানে, আবার বামে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরতে লাগল। পথের কোন কিনারা খুঁজে পেল না।
তাদের সাথে পানি শেষ হয়ে গিয়েছিল। আশপাশেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে পুরো বাহিনী এতটাই তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ল, তা শুধু আল্লাহই জানেন। কোন মানুষের পক্ষে সে তৃষ্ণা অনুধাবন করার নয়। বাহিনীর লোকেরা বলল, আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মাদির মধ্যে ভালো কিছুর ওয়াদা করেছেন। আল্লাহর কাছে বলুন।
তিনি আল্লাহর দিকে ঝুঁকলেন। আল্লাহকে ডাকলেন কায়মনোবাক্যে। ছোট্ট একটু দোয়া করলেন- 'ইয়া হাকীমু, ইয়া আযীমু, ইয়া আলীমু, ইয়া হাকীমু, ইয়া আলীমু, ইয়া আযীমু, আগিছনা। আমাদের সাহায্য করুন।'
বর্ণনাকারী বলেন, আল্লাহর কসম! তার দোয়া শেষ হতেই একখণ্ড মেঘ উড়ে সাহাবিদের মাথার উপর চলে এল। মাথার উপর আকাশ ছেয়ে নিল। বজ্রধ্বনি করে মুষলধারে বৃষ্টি ঝরাল। সাহাবায়ে কেরাম তৃপ্তিভরে পানি পান করলেন। অজু করলেন। মেঘখণ্ডটি উড়ে গেল!
📄 আবু মুসলিম খাওলানির কারামত
আবু মুসলিম খাওলানি ছিলেন একজন তাবেয়ী। ভণ্ডনবী আসওয়াদ আনাসির কাছে তিনি হাযির হলেন।
আসওয়াদ জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কি মুহাম্মদের উপর ঈমান রাখ?'
আবু মুসলিম উত্তর দিল, 'আমি মোহাম্মদ ﷺ-এর উপর ঈমান এনেছি।'
আবু মুসলিমের উত্তর শুনে আসওয়াদ রেগেমেগে বলল, তোমাকে আমি এমনভাবে হত্যা করবো, যেভাবে কাউকে হত্যা করা হয়নি। আসওয়াদ কিছু লাকড়িতে আগুন জ্বালাল এবং আবু মুসলিমকে সে আগুনে নিক্ষেপ করল।
আবু মুসলিম ইবরাহিম আ.-এর দোয়াটি পড়লেন-
حَسْبِيَ اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
আল্লাহই আমার যথেষ্ট, তিনিই উত্তম কর্মবিধাতা।
তাঁর দোয়ায় আল্লাহ আগুনকে শীতল ও আরামদায়ক বানিয়ে দিলেন। তিনি যখন মদীনায় ফিরে এলেন, উমর রাযি. খুশি হয়ে তার সাথে দীর্ঘ মুয়ানাকা করলেন এবং বললেন, 'এই উম্মতের খলীলকে স্বাগতম। ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ব্যক্তিকে স্বাগতম।'
ওমর রাযি. তাঁকে আবু বকর রাযি. এর কাছে নিয়ে গেলেন। তাঁকে আবু বকর রাযি. এবং নিজের মাঝখানে বসিয়ে বললেন, 'আল্লাহর জন্য সকল প্রশংসা, তিনি উম্মতে মোহাম্মদীর মধ্যে এমন লোক দেখিয়েছেন, যার সাথে কৃত অনুগ্রহ ইবরাহিম আ.-এর সাথে কৃত অনুগ্রহের মতো।'
উম্মতে মোহাম্মদীর মধ্যে এমন অনেক বড় বড় দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেগুলো আল্লাহর বন্ধুদের সাথে তাঁর অপার অনুগ্রহ, বন্ধুদের সুরক্ষা এবং হিফাযতের প্রমাণ। আল্লাহই তো মানুষকে হিফাযত করবেন। এজন্যই ঘুমানোর সময় দোয়া পড়তে হয়-
اللَّهُمَّ أَسْلَمْتُ نَفْسِي إِلَيْكَ وَفَوَّضْتُ أَمْرِي إِلَيْكَ وَأَلْجَأْتُ ظَهْرِي إِلَيْكَ رَهْبَةٌ وَرَغْبَةٌ إِلَيْكَ لَا مَلْجَأَ وَلَا مَنْجَا مِنْكَ إِلَّا إِلَيْكَ
হে আল্লাহ! আমি নিজেকে তোমার কাছে অর্পণ করেছি, তোমার কাছেই আমার সকল বিষয় সমর্পণ করেছি, তোমার দিকেই আমার চেহারা ফিরিয়েছি, তোমার কাছেই আমার পিঠ ঠেকিয়েছি; এসব তোমারই ভয়ে এবং তোমারই অনুগ্রহের আশায়। তুমি ব্যতীত কোন ঠিকানা আর আশ্রয়স্থল নেই। [বুখারি: ৬৩১১]