📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এবং সাঈদ ইবনে জুবাইর

📄 হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এবং সাঈদ ইবনে জুবাইর


যেসব মুসলিম ইসলামের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তেমনই একজন। তার প্রসিদ্ধ অনেক ঘটনা রয়েছে, যেসব ঘটনার কারণে সে নিজের বড়ত্ব ও মহত্ব অনুভব করতো।
তাউস ইবনে কায়সান। তিনি ছিলেন ইয়েমেনের প্রখ্যাত একজন আলেম। তিনি হাজ্জাজ বিন ইউসুফের একটি ঘটনা বর্ণনা করেন-
একবার আমি ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে হারামে প্রবেশ করি। মাকামে ইবরাহিমে দুই রাকাত সালাত শেষে একটু বসি। সেখানে মানুষ আসছে, তাওয়াফ করছে, আমি বসে বসে মনোহর সে দৃশ্য দেখছি। হঠাৎ সেখানে মানুষের শোরগোল শুনতে পাই। চারদিকে অস্ত্র; তলোয়ার ঢাল আর বল্লমধারীর সমাবেশ। খোঁজ নিয়ে দেখি, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এসেছে সেখানে। তার দেহরক্ষী আর স্তর-স্তর নিরাপত্তার জন্যই এই অস্ত্র আর সৈন্য সমাগম।
আমি আমার মতই বসে থাকি। এমতাবস্থায় ইয়েমেনের এক দুনিয়াবিরাগ আবেদ বাইতুল্লাহয় তাওয়াফ শুরু করলেন। আবেরদ তাওয়াফ করতে করতে এক পর্যায়ে হাজ্জাজের গায়ের উপর পড়লেন। হাজ্জাজ এতে রেগে গেলো। আবেদকে থামিয়ে দিলো। নিক্ষিপ্ত বল্লমের মত দু'টি শব্দ ছুঁড়ে দিয়ে আবেদকে হাজ্জাজ জিজ্ঞেস করলো, 'কোথা থেকে এসেছো তুমি?'
আবেদের নিস্পৃহ জবাব, 'ইয়েমেন থেকে।'
তেজালো হাজ্জাজ জ্বালাভরা চোখে বাষ্পের মতো তাকিয়ে আছে। তখন ইয়েমেনের বাদশাহ ছিলো হাজ্জাজের আরেক ভাই মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ। আবেদের বাড়ি ইয়েমেনে শুনে হাজ্জাজ জিজ্ঞেস করলো, 'আমার ভাই কেমন আছে?'
আবেদ জিজ্ঞেস করলেন, কে আপনার ভাই?
হাজ্জাজ বললো, মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ আমার ভাই।
মোহাম্মদ বিন ইউসুফও হাজ্জাজের মতো জালিম ছিলেন। আবেদ অবলা উত্তর দিলেন, 'বেশ খৃষ্টপুষ্ট আর সুঠাম দেহ নিয়ে ভালই আছেন।'
হাজ্জাজ রেগে গিয়ে বললো, 'তোমাকে তার শারীরিক খবর জিজ্ঞেস করিনি। তার ন্যায়নীতি আর বিচারব্যবস্থা কেমন, তা জিজ্ঞেস করেছি।'
আবেদ কোন রাখঢাক না করে ধام করে বলে ফেললেন, 'শাসনব্যবস্থায় সে তো ভয়ানক জালিম!'
হাজ্জাজ বাঁজখাই কণ্ঠে হুঙ্কার ছেড়ে বললো, 'তুমি কি ভুলে গেছো, সে আমার ভাই?'
আবেদ সাহসভরা কণ্ঠে বললেন, 'আপনি কি মনে করেন, আল্লাহ- আমার যত বড় শক্তি, সে আপনার আরো বড় শক্তি?'
তাউস বলেন, আবেদের উত্তর আর সাহসিকতা দেখে আমি অবাক হলাম। ভীত হলাম। আমার শরীরে একটি কাঁপুনি খেলে গেলো। আল্লাহই জানেন, হাজ্জাজ আবেদকে কী না করে ফেলেন। ভয়ে আমার শরীরের লোমগুলো পলায়মান হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। কিন্তু পরক্ষণেই দেখলাম, হাজ্জাজ লোকটিকে ছেড়ে দিলো। আমি আরো একবার অবাক হলাম।
সাঈদ ইবনে জুবাইরের সাথে তার ঘটনা অনেক দীর্ঘ এবং শিক্ষণীয়।
হাজ্জাজ দীর্ঘ প্রায় আট বছর সাঈদ ইবনে জুবাইরের পিছনে লেগে ছিলো। এক পর্যায়ে সাঈদ ইবনে জুবাইর তার কাছে ধরা পড়লেন। সাঈদ ইবনে জুবাইর যখন তার দরবারে প্রবেশ করলেন, হাজ্জাজ তাকে জিজ্ঞেস করলো, 'তোমার নাম কী?'
হাজ্জাজ সাঈদ ইবনে জুবাইরের নাম জানতো, তবু জিজ্ঞেস করলো। সাঈদ ইবনে জুবাইর উত্তর দিলেন, 'আমার নাম সাঈদ ইবনে জুবাইর।' (সাঈদ অর্থ সৌভাগ্যবান)
হাজ্জাজ বললো, 'না, তোমার নাম শাকী ইবনে কাসীর।' (শাকী অর্থ দুর্ভাগ্যবান)
সাঈদ বললেন, 'আমার মা যখন আমার নাম রেখেছেন, তখন তিনি এর অর্থ ভালোই জানতেন।'
হাজ্জাজ বললো, 'তুমি দুর্ভাগ্যবান। তোমার মা দুর্ভাগ্যবান। কসম! আমি দুনিয়াতেই তোমাকে লেলীহান আগুনে জ্বালিয়ে দিবো!'
সাঈদ বললেন, 'আমি যদি জানতাম তুমি একাজ করতে সক্ষম, তাহলে তোমাকে ইলাহ বানাতাম।'
হাজ্জাজ ভাবলো, আমার অনেক স্বর্ণ-রূপা আছে। এই ভেবে সাঈদ ইবনে জুবাইরকে পরীক্ষা করার জন্য হাজ্জাজ স্বর্ণ-রূপার পাত্র এনে তার সামনে ছড়িয়ে দিলো।
সাঈদ এসব দেখে বললেন, 'হাজ্জাজ, তুমি যদি এগুলো লোক দেখানোর জন্য অহঙ্কার বসত ছড়িয়ে থাকো, তবে মনে রেখো, আল্লাহ থেকে তুমি কখনও অমুখাপেক্ষী নও।'
হাজ্জাজ এবার ভাবলো, আমার তো নর্তকী আছে! সাঈদ ইবনে জুবাইরকে পরীক্ষা করার জন্য নর্তকীকে নাচ-গান করার নির্দেশ দিলো।
ঘটনাচিত্রে সাঈদ কাঁদতে শুরু করলেন। তার কান্না দেখে হাজ্জাজ বললো, 'সাঈদ! তুমি কি আনন্দে কান্না করছ!'
সাঈদ উত্তর দিলেন, 'আল্লাহর কসম! আমি আনন্দে কান্না করছিনা। আমি কান্না করছি এই নর্তকীর জন্য। এই নর্তকী এমন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, যে কাজের জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়নি। আল্লাহ তাকে নাচ-গানের জন্য সৃষ্টি করেননি।'
হাজ্জাজ তার পেয়াদাদের বললো, 'তোমরা ওকে কেবলার দিক থেকে অন্য দিকে মুখ ফিরাও। আল্লাহর কসম সাঈদ! তোমাকে আমি এমনভাবে হত্যা করবো, যেভাবে কাউকে হত্যা করা হয়নি।'
সাঈদ বললেন, 'হাজ্জাজ! যেভাবে ইচ্ছা হত্যা কর। আল্লাহর কসম! আমাকে তুমি যেভাবে হত্যা করবে, আল্লাহ তোমাকে সেভাবে হত্যা করে শাস্তি দিবেন।'
হাজ্জাজ পেয়াদাদের বললো, 'কেবলার দিক থেকে ওর মুখ ফিরিয়ে দাও।'
সাঈদ বললেন, 'তোমরা যেদিকেই ফির, সেদিকেই রয়েছেন আল্লাহ!' [বাকারা: ১১৫]
হাজ্জাজ বললো, 'তোমরা ওকে মাটিতে নামাও।'
সাঈদ বললেন, 'এই মাটি থেকে তোমাদের সৃষ্টি করেছি। এতেই তোমাদের ফিরিয়ে দিবো। এবং পুনরায় এ থেকেই আমি তোমাদের উত্থিত করবো।' [সূরা ত্বাহা: ৫৫]
হাজ্জাজ বললো, 'তোমরা ওকে মেরে ফেলো!'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00