📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 খুবাইব ইবনে আদী এবং কোরাইশ কাফেররা

📄 খুবাইব ইবনে আদী এবং কোরাইশ কাফেররা


কাফেররা খুবাইব ইবনে আদী-কে ফাঁসির মঞ্চে উপস্থিত করে জিজ্ঞেস করল, 'তোমার শেষ আশা কী, খুবাইব?'
খুবাইব বললেন, 'আমি দুই রাকাত সালাত পড়তে চাই।'
তাকে দুই রাকাত সালাত পড়ার সুযোগ দেয়া হল। তিনি অযু করে দ্রুত দুই রাকাত সালাত আদায় করলেন। সালাত শেষে বললেন, 'তোমরা হয়ত মনে করবে আমি মৃত্যুকে ভয় পেয়েছি। তোমরা যদি এই কথা না বলতে যে, আমি মৃত্যুর ভয়ে ধীরে ধীরে সালাত পড়ছি, তাহলে আমি সালাত আরো ধীরে পড়তাম।'
কাফেররা তাকে আবার ফাঁসির মঞ্চে উঠাল। তিনি তখন আল্লাহর কাছে বললেন,
اللَّهُمَّ أَحْصِهِمْ عَدَدًا وَاقْتُلْهُمْ بَدَدًا وَلَا تُبْقِ مِنْهُمْ أَحَدًا
আল্লাহ, তুমি তাদের গুণে রেখো। তাদের ভয়ঙ্করভাবে ধ্বংস করো। তাদের কাউকে ছেড়ো না।
কাফেররা তখন বলল, 'খুবাইব! তোমাকে তোমার পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদের জন্য ছেড়ে দিয়ে যদি মোহাম্মদকে তোমার স্থানে নিয়ে আসি, তাহলে তুমি কী বল?'
খুবাইব উত্তর দিলেন, 'আল্লাহর কসম! আমি আমার পরিবার-সম্পদের জন্য বেঁচে থাকবো, রাসূলুল্লাহর গায়ে একটি কাঁটা ফুটবে, এমনটা কখনও হতে পারে না।'
অতঃপর কাফেররা তাকে শহীদ করে ফেলল।
ঐতিহাসিকগণ বলেন, মৃত্যুর পূর্বক্ষণে খুবাইব আল্লাহর কাছে দোয়া করে বলছিলেন, 'হে আল্লাহ! আমি যে সুশান্তি পাবো, রাসূলকে তা দিও। হে আল্লাহর রাসূল, সুখের ছটা আপনাকে ছেয়ে নিক। হে আল্লাহর রাসূল, আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। হে আল্লাহর রাসূল, আপনাকে ঘিরে প্রশান্তির নির্ঝরিণী প্রবাহিত হোক।'
খুবাইব মক্কা থেকে এই দোয়া করছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন তখন মদীনায়। রাসূল মদীনা থেকে বললেন, ‘খুবাইব, সুখের ছটা তোমাকেও ছেয়ে নিক। খুবাইব, তোমর উপরও শান্তি বর্ষিত হোক। খুবাইব, তোমাকে ঘিরেও প্রবাহিত হোক প্রশান্তির অবিরল নির্ঝরিণী...’
খুবাইব শহীদ হওয়ার পূর্বে এই কবিতাও পাঠ করেছিলেন-
যেহেতু আমি মুসলিম হিসেবে মৃত্যুবরণ করছি, তাই আমার কোন শঙ্কা নেই; আল্লারহ সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে যে কোন পার্শে আমি ঢলে পড়ি। আমি যেহেতু আল্লাহর পথেই মৃত্যুবরণ করছি, তিনি ইচ্ছা করলে আমার ছিন্নভিন্ন প্রতিটি অঙ্গে বরকত দান করতে পারনে। [সহিহ বুখারি : ৩৯৮৯]

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 আবু মুসলিম খাওলানি এবং আসওয়াদ আনাসি

📄 আবু মুসলিম খাওলানি এবং আসওয়াদ আনাসি


আসওয়াদ আনাসি আবু মুসলিম খাওলানিকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুমি আমার উপর ঈমান রাখ? আমাকে নবি মান?’
আবু মুসলিম মিথ্যায় অভিযুক্ত করে বললেন, ‘তুমি কী বলেছ, আমি শুনিনি।’
আবু মুসলিমের উত্তর শুনে আসওয়াদ কিছু লাকড়িতে আগুন জ্বালাল এবং আবু মুসলিমকে সে আগুনে নিক্ষেপ করল।
আবু মুসলিম বললেন, ‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকীল।’ ‘আল্লাহই আমার যথেষ্ট, তিনিই উত্তম কর্মবিধাতা।’
তার দোয়ায় আল্লাহ আগুনকে শীতল ও আরামদায়ক বানিয়ে দিলেন। তিনি যখন মদীনায় ফিরে এলেন, ওমর খুশি হয়ে তার সাথে মুয়ানাকা করলেন এবং বললেন, ‘এই উম্মতের খলীলকে স্বাগতম। ইবরাহিম -র সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ব্যক্তিকে স্বাগতম।’

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 রবি ইবনে আমের এবং রুস্তম

📄 রবি ইবনে আমের এবং রুস্তম


কাদিসিয়ার যুদ্ধে রবি ইবনে রুস্তম ছিলেন মুসলমানদের শীর্ষব্যক্তি। তিনি যখন বন্দি হয়ে রুস্তমের সামনে উপস্থিত হলেন, রুস্তম তাকে দম্ভভরে হুঙ্কার ছেড়ে বলল, 'কী এসেছে তোমাদের সাথে?'
রবির সাথে ছিল তখন ভাঙ্গা তীর, ছিন্নভিন্ন কাপড়, আহত ঘোড়া। এই নিয়ে রবি প্রতিউত্তর করলেন, 'আল্লাহ আমাদের পাঠিয়েছেন মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে আল্লাহর দাসত্বে মুক্তি দানের জন্য। পার্থিব সঙ্কীর্ণতা থেকে আখেরাতের প্রশস্ততার দিকে ধাবিত করার জন্য। মিথ্যা ধর্মের যাঁতাকল থেকে সত্য ধর্ম ইসলামের ন্যায়নীতি দান করার জন্য।'
দুর্ভাগ্যবান রুস্তম বলল, 'তুমি আমার প্রাসাদ থেকে মুখে-মাথায় মাটি লেপে বের হও।'
রবি ইবনে আমের মাটি নিলেন এবং সাথীদের বললেন, 'এটা হল তোমাদের জন্য সুসংবাদ। আল্লাহ আমাদের এই মাটির মালিক বানাবেন।'
পরবর্তীতে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস সেখানে অভিযান করে বিজয়ী হয়েছিলেন। রুস্তমের প্রাসাদে প্রবেশ করেছিলেন এবং পারস্যদের সব আড্ডাখানা গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন। তখন তিনি এই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করছিলেন-
'তারা ছেড়ে গিয়েছিল কত উদ্যান আর প্রস্রবণ, কত শষ্যক্ষেত্র আর সুরম্য স্থান, কত সুখের স্থান যাতে তারা সুখগল্প করতো,
এমনই হয়েছিলো এবং আমি এগুলোর মালিক করেছিলাম ভিন্ন সম্প্রদায়কে, তাদের জন্য ক্রন্দন করেনি আকাশ ও পৃথিবী এবং তারা অবকাশও পায়নি।' [দুঃখান: ২৫-২৯]

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এবং সাঈদ ইবনে জুবাইর

📄 হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এবং সাঈদ ইবনে জুবাইর


যেসব মুসলিম ইসলামের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তেমনই একজন। তার প্রসিদ্ধ অনেক ঘটনা রয়েছে, যেসব ঘটনার কারণে সে নিজের বড়ত্ব ও মহত্ব অনুভব করতো।
তাউস ইবনে কায়সান। তিনি ছিলেন ইয়েমেনের প্রখ্যাত একজন আলেম। তিনি হাজ্জাজ বিন ইউসুফের একটি ঘটনা বর্ণনা করেন-
একবার আমি ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে হারামে প্রবেশ করি। মাকামে ইবরাহিমে দুই রাকাত সালাত শেষে একটু বসি। সেখানে মানুষ আসছে, তাওয়াফ করছে, আমি বসে বসে মনোহর সে দৃশ্য দেখছি। হঠাৎ সেখানে মানুষের শোরগোল শুনতে পাই। চারদিকে অস্ত্র; তলোয়ার ঢাল আর বল্লমধারীর সমাবেশ। খোঁজ নিয়ে দেখি, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এসেছে সেখানে। তার দেহরক্ষী আর স্তর-স্তর নিরাপত্তার জন্যই এই অস্ত্র আর সৈন্য সমাগম।
আমি আমার মতই বসে থাকি। এমতাবস্থায় ইয়েমেনের এক দুনিয়াবিরাগ আবেদ বাইতুল্লাহয় তাওয়াফ শুরু করলেন। আবেরদ তাওয়াফ করতে করতে এক পর্যায়ে হাজ্জাজের গায়ের উপর পড়লেন। হাজ্জাজ এতে রেগে গেলো। আবেদকে থামিয়ে দিলো। নিক্ষিপ্ত বল্লমের মত দু'টি শব্দ ছুঁড়ে দিয়ে আবেদকে হাজ্জাজ জিজ্ঞেস করলো, 'কোথা থেকে এসেছো তুমি?'
আবেদের নিস্পৃহ জবাব, 'ইয়েমেন থেকে।'
তেজালো হাজ্জাজ জ্বালাভরা চোখে বাষ্পের মতো তাকিয়ে আছে। তখন ইয়েমেনের বাদশাহ ছিলো হাজ্জাজের আরেক ভাই মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ। আবেদের বাড়ি ইয়েমেনে শুনে হাজ্জাজ জিজ্ঞেস করলো, 'আমার ভাই কেমন আছে?'
আবেদ জিজ্ঞেস করলেন, কে আপনার ভাই?
হাজ্জাজ বললো, মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ আমার ভাই।
মোহাম্মদ বিন ইউসুফও হাজ্জাজের মতো জালিম ছিলেন। আবেদ অবলা উত্তর দিলেন, 'বেশ খৃষ্টপুষ্ট আর সুঠাম দেহ নিয়ে ভালই আছেন।'
হাজ্জাজ রেগে গিয়ে বললো, 'তোমাকে তার শারীরিক খবর জিজ্ঞেস করিনি। তার ন্যায়নীতি আর বিচারব্যবস্থা কেমন, তা জিজ্ঞেস করেছি।'
আবেদ কোন রাখঢাক না করে ধام করে বলে ফেললেন, 'শাসনব্যবস্থায় সে তো ভয়ানক জালিম!'
হাজ্জাজ বাঁজখাই কণ্ঠে হুঙ্কার ছেড়ে বললো, 'তুমি কি ভুলে গেছো, সে আমার ভাই?'
আবেদ সাহসভরা কণ্ঠে বললেন, 'আপনি কি মনে করেন, আল্লাহ- আমার যত বড় শক্তি, সে আপনার আরো বড় শক্তি?'
তাউস বলেন, আবেদের উত্তর আর সাহসিকতা দেখে আমি অবাক হলাম। ভীত হলাম। আমার শরীরে একটি কাঁপুনি খেলে গেলো। আল্লাহই জানেন, হাজ্জাজ আবেদকে কী না করে ফেলেন। ভয়ে আমার শরীরের লোমগুলো পলায়মান হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। কিন্তু পরক্ষণেই দেখলাম, হাজ্জাজ লোকটিকে ছেড়ে দিলো। আমি আরো একবার অবাক হলাম।
সাঈদ ইবনে জুবাইরের সাথে তার ঘটনা অনেক দীর্ঘ এবং শিক্ষণীয়।
হাজ্জাজ দীর্ঘ প্রায় আট বছর সাঈদ ইবনে জুবাইরের পিছনে লেগে ছিলো। এক পর্যায়ে সাঈদ ইবনে জুবাইর তার কাছে ধরা পড়লেন। সাঈদ ইবনে জুবাইর যখন তার দরবারে প্রবেশ করলেন, হাজ্জাজ তাকে জিজ্ঞেস করলো, 'তোমার নাম কী?'
হাজ্জাজ সাঈদ ইবনে জুবাইরের নাম জানতো, তবু জিজ্ঞেস করলো। সাঈদ ইবনে জুবাইর উত্তর দিলেন, 'আমার নাম সাঈদ ইবনে জুবাইর।' (সাঈদ অর্থ সৌভাগ্যবান)
হাজ্জাজ বললো, 'না, তোমার নাম শাকী ইবনে কাসীর।' (শাকী অর্থ দুর্ভাগ্যবান)
সাঈদ বললেন, 'আমার মা যখন আমার নাম রেখেছেন, তখন তিনি এর অর্থ ভালোই জানতেন।'
হাজ্জাজ বললো, 'তুমি দুর্ভাগ্যবান। তোমার মা দুর্ভাগ্যবান। কসম! আমি দুনিয়াতেই তোমাকে লেলীহান আগুনে জ্বালিয়ে দিবো!'
সাঈদ বললেন, 'আমি যদি জানতাম তুমি একাজ করতে সক্ষম, তাহলে তোমাকে ইলাহ বানাতাম।'
হাজ্জাজ ভাবলো, আমার অনেক স্বর্ণ-রূপা আছে। এই ভেবে সাঈদ ইবনে জুবাইরকে পরীক্ষা করার জন্য হাজ্জাজ স্বর্ণ-রূপার পাত্র এনে তার সামনে ছড়িয়ে দিলো।
সাঈদ এসব দেখে বললেন, 'হাজ্জাজ, তুমি যদি এগুলো লোক দেখানোর জন্য অহঙ্কার বসত ছড়িয়ে থাকো, তবে মনে রেখো, আল্লাহ থেকে তুমি কখনও অমুখাপেক্ষী নও।'
হাজ্জাজ এবার ভাবলো, আমার তো নর্তকী আছে! সাঈদ ইবনে জুবাইরকে পরীক্ষা করার জন্য নর্তকীকে নাচ-গান করার নির্দেশ দিলো।
ঘটনাচিত্রে সাঈদ কাঁদতে শুরু করলেন। তার কান্না দেখে হাজ্জাজ বললো, 'সাঈদ! তুমি কি আনন্দে কান্না করছ!'
সাঈদ উত্তর দিলেন, 'আল্লাহর কসম! আমি আনন্দে কান্না করছিনা। আমি কান্না করছি এই নর্তকীর জন্য। এই নর্তকী এমন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, যে কাজের জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়নি। আল্লাহ তাকে নাচ-গানের জন্য সৃষ্টি করেননি।'
হাজ্জাজ তার পেয়াদাদের বললো, 'তোমরা ওকে কেবলার দিক থেকে অন্য দিকে মুখ ফিরাও। আল্লাহর কসম সাঈদ! তোমাকে আমি এমনভাবে হত্যা করবো, যেভাবে কাউকে হত্যা করা হয়নি।'
সাঈদ বললেন, 'হাজ্জাজ! যেভাবে ইচ্ছা হত্যা কর। আল্লাহর কসম! আমাকে তুমি যেভাবে হত্যা করবে, আল্লাহ তোমাকে সেভাবে হত্যা করে শাস্তি দিবেন।'
হাজ্জাজ পেয়াদাদের বললো, 'কেবলার দিক থেকে ওর মুখ ফিরিয়ে দাও।'
সাঈদ বললেন, 'তোমরা যেদিকেই ফির, সেদিকেই রয়েছেন আল্লাহ!' [বাকারা: ১১৫]
হাজ্জাজ বললো, 'তোমরা ওকে মাটিতে নামাও।'
সাঈদ বললেন, 'এই মাটি থেকে তোমাদের সৃষ্টি করেছি। এতেই তোমাদের ফিরিয়ে দিবো। এবং পুনরায় এ থেকেই আমি তোমাদের উত্থিত করবো।' [সূরা ত্বাহা: ৫৫]
হাজ্জাজ বললো, 'তোমরা ওকে মেরে ফেলো!'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00