📄 মূসা ও ফেরাউন
ফেরাউনের সাথে মুসা -র বাদানুবাদ, সে এক পরমাশ্চর্য বাদানুবাদ।
মুসা ছিলেন একজন রাখাল। কিন্তু তিনি আল্লাহ -কে চিনতেন, জানতেন।
মুসা -র ছিল একটি লাঠি। নানা অলৌকিকতা ও বাজিমাত ছড়ানোর লাঠি। মুসা সে লাঠিতে ভর করতেন। ছাগপালের জন্য গাছ থেকে পাতা ঝরাতেন।
আর ফেরাউন!
ফেরাউন ছিল একটা দাজ্জাল। মতিভ্রম, বুদ্ধিভ্রষ্ট, বিকারগ্রস্ত, দাজ্জাল।
ফেরাউন মানুষের সমাবেশ ঘটিয়ে বলতো-
তোমাদের জন্য আমি ছাড়া আর কোন ইলাহ আছে বলে আমি জানি না। [কাসাস : ৩৮]
আবার মিসরবাসীকে একত্র করে বলতো-
আমি তোমাদের বড় রব। [নাযিয়াত: ২৪]
আল্লাহ মুসা -কে বললেন- ফেরাউনের কাছে যাও। সে দারুণ উদ্ধত হয়েছে। [ত্বাহা: ২০]
মুসা দায়িত্বের কথা শুনে প্রথমেই বললেন-
হে আমার রব, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন। [ত্বাহা: ২৫]
আল্লাহ মুসা -র বক্ষ প্রশস্ত করে দিলেন। দারুণ উদ্ধত ফেরাউনের মোকাবেলার জন্য তাকে প্রস্তুত করলেন।
একটি বিষয় হলো, মানুষ জীবনে অনেক কিছুর স্বাদ আস্বাদন করে। কিন্তু তারা কখনও ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে না। ঈমানের মিষ্টতা অনুভব করতে পারে না। তাদের বক্ষগুলো, অন্তরগুলো ঈমানের নূর আরোহণের জন্য প্রশস্ত নয়। রাসূলের সুন্নতের জন্য উন্মুক্ত নয়।
মুসা বললেন-
হে আমার রব, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন। এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। এবং আমার জিহ্বা থেকে জড়তা দূর করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে। [ত্বাহা: ২৬-২৮]
মুসা চেয়েছেন তিনি একজন দাঈ হবেন। একজন সদুপদেশদানকারী ও নসীহতকারী হবেন। যেন মানুষ আল্লাহ -কে চিনে। আল্লাহ -র দিকে মনোনিবেশ করে। এজন্য তিনি এমন দোয়া করেছিলেন।
মুসা ছোট বেলায় আগুনের কয়লা মুখে পুরেছিলেন। সে থেকে তার মুখে জড়তা ছিল। তিনি মুখের জড়তা দূর হওয়ার দোয়াও করলেন। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করলেন। তাঁর মুখের জড়তা দূর করে দিলেন।
মুসা -র এই দোয়ায় সকল জায়গার সকল আলেম ও মুসলিমের জন্য পয়গাম রয়েছে, তারা যেন মানুষের মাঝে হেদায়াত বুঝানোর জন্য, মানুষকে নবির পথে ফিরিয়ে আনার জন্য বক্তৃতা শিখে, লিখনী শিখে। তদ্রূপ সকল আলেম এবং মুসলিমের জন্য এই পয়গামও রয়েছে, তারা যেন মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখানোর জন্য, ভ্রষ্টতা থেকে হেদায়াতের পথে উন্নীত করার জন্য ভাষাশৈলী, বিতর্কের চাতুর্য ও বিচক্ষণতা এবং হালাল কৌশল আয়ত্ত করে।
মুসা আরও বললেন-
এবং আমার পরিবারবর্গের মধ্য থেকে আমার একজন সাহায্যকারী করে দিন; আমার ভাই হারুনকে। [ত্বাহা: ২৫, ৩০]
আল্লাহ মুসা-র এই দোয়াও কবুল করলেন। হারুনকে তার সহযোগী বানালেন। বললেন,
হে মুসা, তোমাকে তোমার চাওয়াগুলো দেয়া হয়েছে। [ত্বাহা: ৪৪]
মুসা এবং হারুন ফেরাউনের দরবারে গেলেন। আল্লাহ মুসা এবং হারুনকে পথিমধ্যে সতর্ক করে বললেন-
'তোমরা ফেরাউনের কাছে যাও। সে দারুণ উদ্ধত হয়েছে।' [ত্বাহা: ৪৩]
অর্থাৎ সে সীমালঙ্ঘন করেছে। বাড়াবাড়ি করেছে। তার রবের উপর অহঙ্কার ও দম্ভ করেছে। কিন্তু 'তোমরা তাকে নম্র কথা বলো, হয়তো সে চিন্তাভাবনা করবে অথবা ভীত হবে। [ত্বাহা: ৪৪]
মধুর কথাবার্তা এবং অনুপম উপস্থাপন দ্বারা মানুষের অন্তর কোমল হয়। হৃদ্যতাপূর্ণ প্রেমময় কথা শুনতে মানুষ পছন্দ করে। পজ্ঞাপূর্ণ কৌশলী কথাবার্তায় মানুষ আত্মসমর্পণ করে। এজন্য আল্লাহ তাদের এই নির্দেশনা দিয়ে দিলেন।
সুফিয়ান সাওরি বলেন, 'তোমরা তাকে নম্র কথা বলো, হয়তো সে চিন্তাভাবনা করবে অথবা ভীত হবে।' অর্থাৎ, তাকে তার উপনামে সম্বোধন করবে।
বাস্তবেই যখন কাউকে মূল নামে না ডেকে উপনামে সম্বোধন করা হয়, তখন সে খুশী হয়। প্রফুল্ল ও আনন্দিত হয়। সহাস্য ও হর্ষোৎফুল্ল হয়। আকর্ষিত ও উৎসাহিত হয়। কবি বলেন-
উপনাম ধরে ডাকি আমি তারে, ডাকি তারে মান ভরে
উপাধী নয় কোন খারাপ উপাধী; ওভাবে ডাকিনা তারে।
যে আদব আমি শিখেছি, সে আদব বনে গেছে অভ্যাস
চরিতের মূলে শিকড়ে শিখরে সে আদবেরই শুধু প্রকাশ।
মুসা এবং হারুন ফেরাউনের প্রাসাদে উপস্থিত হলেন। ফেরাউনের উপনাম ছিলো 'আবু মাররা'। (আবু আইয়ূব আনসারী এবং সুফিয়ান সাওরী এর বর্ণনা এরূপ) মুসা তাকে বললেন, 'হে আবু মাররা, তুমি যদি তোমার যৌবন, ধন-সম্পদ, রাজত্ব, প্রসিদ্ধির স্থায়িত্ব চাও, তাহলে এক আল্লাহর বিশ্বাস গ্রহণ করো।'
ফেরাউন বলল- হে মুসা, তোমাদের প্রভু কে? [তাহা: ৪৯]
ফেরাউন আল্লাহ -র অস্তিত্বই অস্বীকার করে বসল!
আল্লাহ বলেন- হে মানুষ! কিসে তোমাকে তোমার মহামহিম পালনকর্তা সম্পর্কে বিভ্রান্ত করল? যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুবিন্যস্ত করেছেন এবং সুষম করেছেন। তিনি তোমাকে তার ইচ্ছামত আকৃতিতে গঠন করেছেন। [ইনফিত্বার: ৬-৮]
ফেরাউন পালনকর্তার অস্তিত্ব অস্বীকার করে জিজ্ঞেস করল, 'তোমাদের প্রভু কে?'
মুসা এখন কী উত্তর দিবেন? যদি বলেন, আমার প্রভু আল্লাহ। ফেরাউন বলবে, আমিই আল্লাহ। যদি বলেন, আমার প্রভুই আমার প্রভু। ফেরাউন বলবে, আমি তোমার প্রভু।
তাহলে মুসা এখন কী বলবেন? মুসা আল্লাহর ইশারায় অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ উত্তর দিলেন। বললেন-
আমাদের পালনকর্তা তিনি, যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার যোগ্য আকৃতি দান করেছেন, অতঃপর পথ প্রদর্শন করেছেন। [তাহা: ৫০]
মুসা প্রভুর পরিচয়ে এমন বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা দিলেন, যা শুধু এক আল্লাহ -র মধ্যেই পাওয়া যায়। এই বৈশিষ্ট্যগুলো একমাত্র মুর্খ ভ্রষ্ট অবিশ্বাসীরাই অস্বীকার করতে পারে।
ইবনুল কায়্যিম বলেন, ফেরাউন যে বলতো, 'আমি ছাড়া তোমাদের কোন প্রভু আছে বলে জানি না', এটি ছিলো তার মুখের কথা। সে আসলে জানতো, মহান একজন প্রভু আছেন। সে জানতো, যিনি আসমান ও যমিনসমূহ সৃষ্টি করেছেন, তিনি সর্বসক্ষম। তিনি স্বয়ম্ভ বিধাতা। তিনি দৃশ্য অদৃশ্য সবই জানেন।
মুসা ফেরাউনকে বললেন-
তুমি জান যে আসমান ও যমিনের পালনকর্তাই এসব নিদর্শনাবলী প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরূপ নাযিল করেছেন। হে ফেরাউন, আমার ধারণায় তুমি ধ্বংস হতে চলেছ। [ইসরা: ১০২]
আমাদের পালনকর্তা তিনি, যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার যোগ্য আকৃতি দান করেছেন, অতঃপর পথ প্রদর্শন করেছেন। [তাহা: ৫০]
সৃজিত সকল প্রাণবান বস্তুকে জীবনোপকরণ শিখিয়েছেন। কল্যাণ ও মঙ্গলের পথ দেখিয়েছেন। পিপিলিকাকে আপন গর্তে গরমকালে শীতের শষ্য সংরক্ষণের জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। মৌমাছিকে মাইলের পর মাইল উড়ে গিয়ে মধু সংগ্রহ করে চাকে আহোরিত করার নির্দেশনা দিয়েছেন।
সুবাহানাল্লাহ! আল্লাহ কতো মহান! যে আল্লাহকে চিনল না, আল্লাহ থেকে দূরে রইল, সে কতই না ক্ষুদ্র! কতই না নগণ্য!
ফেরাউন রেগে জিজ্ঞেস করল-
তবে পূর্ববর্তীদের কী অবস্থা? [সূরা ত্বাহা: ৫১]
আদম থেকে আমাদের বাপ-দাদা পর্যন্ত যারা মৃত্যুবরণ করেছেন, আমাদের কাছে আর ফিরে আসেননি, তাদের কী অবস্থা?
এমনই হয়ে থাকে কাফের অবিশ্বাসীদের কথাবার্তা।
মুসা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ফেরাউনের এ কথার সুন্দর সাবলীল উত্তর প্রদান করলেন। বললেন-
তাদের খবর আমার পালনকর্তার কাছে লিখিত আছে। আমার পালনকর্তা ভ্রান্ত হন না এবং বিস্মৃতও হন না। [তাহা: ৫২]
মুসা এভাবেই আল্লাহর নির্দেশনায় ফেরাউনকে খণ্ডন করলেন। তাকে পরাস্ত করলেন। তার উপর বিজয়ী হলেন বৈঠকে, ময়দানে। কারণ, মুসা ছিলেন মুত্তাকী, আল্লাহভীরু। পাপিষ্ঠ ও দুর্ভাগ্যবান ছিল ফেরাউন। এজন্যই আল্লাহ ফেরাউনের উপর মুসাকে বিজয় দান করলেন।
📄 পরিশেষে
আল্লাহ যখন বান্দাকে ভালোবাসেন
সকল প্রশংসা আল্লাহ ﷻ-এর জন্য। দুরূদ ও সালাম নবি-রাসূলদের শ্রেষ্ঠতম মোহাম্মদের জন্য। তাঁর পরিবার-পরিজন, সাহাবি-সহচরদের জন্য।
আল্লাহর পরম বন্ধুদের জন্য সুসংবাদসম্বলিত একটি হাদিসে কুদসি রয়েছে। আল্লাহর বন্ধুদের জন্য আল্লাহর পয়গাম। ইমাম শাওকানি কুতুবুল ওয়ালিয়্যি ফী শারহি হাদিসিল ওয়ালিয়্যি নামক গ্রন্থে উক্ত হাদিসের সবিস্তার ব্যাখ্যা করেছেন। এ হাদিসের কিছু দিক আছে, সাধারণ মানুষ বা শিক্ষানবিস দূরের কথা, শীর্ষ ওলামায়ে কেরامও সেগুলোর রহস্য উদঘাটনে গলদঘর্ম হয়েছেন।
আবু হোরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূল ইরশাদ করেন-
মহান আল্লাহ বলেন, 'যে আমার কোন অলির সাথে শত্রুতা করল, সে আমার সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হল। আমি বান্দার উপর যা ফরজ করেছি, তার চেয়ে অধিক প্রিয় কোন এবাদতদ্বারা বান্দা আমার নৈকট্য অর্জন করতে পারে না। আমার বান্দা সবসময় নফল এবাদতদ্বারা আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকবে, একসময় আমি তাকে ভালবাসবো। যখন আমি তাকে ভালবাসবো, তখন আমি তার কান হয়ে যাবো, যা দিয়ে সে শোনে। আমি তার চোখ হয়ে যাবো, যা দিয়ে সে দেখে। আমি তার হাত হয়ে যাবো, যা দিয়ে সে ধরে। আমি তার পা হয়ে যাবো, যা দিয়ে সে চলে। বান্দা যদি আমার কাছে কিছু চায়, অবশ্যই আমি তাকে দান করবো। বান্দা যদি আমার কাছে আশ্রয় চায়, অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় দিবো। আমি যে কোন কাজ করতে চাইলে কোন সংকোচ করি না, মুমিন বান্দার প্রাণ হরণে যতটা দ্বিধা সংকোচ করি। সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে, আমি তার কষ্ট অপছন্দ করি। [বুখারি: ৬৫০২]
রাসূল ﷺ সমবেত নবিদের সবচে মর্যাদাবান। শীর্ষ। সকল নবির নেতা ও খতীব। সকলের প্রতিনিধি নির্বাচনে তিনি মুখপাত্র। নবিদের সমাবেশে তিনি ইমাম। কেয়ামতের দিন সুপারিশকারী। তিনিই সর্বপ্রথম কড়া নাড়বেন বেহেশতের দরজায়! আলাইহিমুস সালাতু ওয়াসসালাম।
আল্লাহ -র সকল বন্ধুর সেরা বন্ধু আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু। নবিদের পর তার চেয়ে সুমহান, তার চেয়ে মর্যাদাবান আর কোন আল্লাহওয়ালা নেই। তার চেয়ে আল্লাহর নিকটভাজন কোন বন্ধু নেই। খিজির আলাইহিস সালাম যদি আল্লাহ -র নবি না হয়ে আল্লারহ নৈকট্যপ্রাপ্ত বন্ধু হয়ে থাকেন, তাহলে তার চেয়েও মর্যাদাবান আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু।
রাসূল ﷺ বলেছেন- مَا طَلَعَتِ الشَّمْسُ وَلَا غَرَبَتْ بَعْدَ النَّبِيِّينَ وَالْمُرْسَلِينَ عَلَى أَفْضَلِ مِنْ أَبِي بَكْرٍ
নবি-রাসূলদের পর আবু বকরের চেয়ে মর্যাদাবান কোন ব্যক্তির উপর সূর্যের উদয়-অস্ত হয়নি! [আবু নুয়াইমের আল-হিলয়াহ : ৩/৩২৫]
সুতরাং আবু বকর হলেন আল্লাহর সকল বন্ধুর প্রিয় বন্ধু। এই উম্মতের মধ্যে তার চেয়ে মর্যাদাবান কোন আল্লাহওয়ালার আগমন নেই। তার চেয়ে প্রেমময় সালাত, ত্যাগসম্পন্ন সওম, ভক্তিমনা হজ্জ, কষ্ট-মোজাহাদা আর কারও নেই। প্রতিটি এবাদতে তিনি অর্জন করেছেন প্রথম স্তর।
রাসূল ﷺ বলেন- যে কেউ আল্লাহর পথে জোড়া জোড়া ব্যয় করবে, তাকে জান্নাতের দরজাসমূহ থেকে ডাকা হবে- 'হে আল্লাহর বান্দা! এটাই উত্তম।' অতএব যে সালাত আদায়কারী, তাকে সালাতের দরজা থেকে ডাকা হবে। যে মুজাহিদ, তাকে জিহাদের দরজা থেকে ডাকা হবে। যে সিয়াম পালনকারী, তাকে রাইয়ান দরজা থেকে ডাকা হবে। যে সদকাকারী, তাকে সদকার দরজা থেকে ডাকা হবে।
আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা কুরবান; সকল দরজা থেকে কাউকে কি ডাকা হবে?'
রাসূল ﷺ মুচকি হেসে বললেন- হাঁ, আমি আশা করি তুমি তাদের মধ্যে হবে! [সহিহ বুখারি: ১৮৯৭]
📄 আল্লাহই সবকিছুর হেফাযতকারী
আল্লাহ সবকিছুর সৃষ্টিকারী। আল্লাহই সবকিছুর হেফাযতকারী। আল্লাহই সব। সকল সৃষ্টির অভিভাবক তিনিই। সকল জীবের রিযিকদাতাও তিনিই। রক্ষণাবেক্ষণে তিনিই শ্রেষ্ঠ। তিনিই দয়ালুদিগের সেরা দয়ালু。
ছোট্ট একটি চড়ুই পাখি, কর্তালী ফলিয়ে উড়ছে এ গাছ থেকে ও গাছে। চড়ুইয়ের মুখে এক লোকমা গোশত। পাখিটি উড়ে উড়ে উঁচু একটি খেজুর গাছের মাথায় গিয়ে বসলো। চড়ুইয়ের কাণ্ড দেখে নিচ থেকে উৎসুক হলেন এক লোক। কী করছে চড়ুইটি, দেখা দরকার!
যেই ভাবা, সেই কাজ। লোকটি গাছে উঠলেন। দেখলেন, গাছের মাথায় বিড়া বানিয়ে বসে আছে ভারি বয়সের একটি অন্ধসাপ। চড়ুই পাখি সাপের সাথে কানেমুখে কিচিরমিচির রবে কী যেনো বললো! সাপটি মুখ হাঁ করলো। চড়ুইটি সাপের মুখে গোশতের লোকমা তুলে দিলো!
সুবহানাল্লাহ! চড়ুই পাখিকে অন্ধ এই সাপের সংবাদ কে জান লো! কাঁটাপাতার খেজুর শাখে অন্ধ সাপের আহারের ব্যবস্থা কার নির্দেশনায়! চড়ুই পাখির কিচিরমিচির ভাষা বুঝে সাপটি চোয়াল খুললো কোন কারিশমায়! তিনি আল্লাহ। এক আল্লাহ। তিনি চড়ুই পাখির রব, আল্লাহ। তিনি অন্ধ সাপের প্রভু, বিশ্ববিধাতা আল্লাহ। তিনি বলেছেন, 'পৃথিবীর সকল জীবের জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহরই। তিনিই জানেন সকল জীবের স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থান।' তিনি বলেছেন-
সবকিছু লিপিবদ্ধ আছে তাঁর সুস্পষ্ট কিতাবে। [সূরা হূদ: ৬]
জীবনের অসংখ্য অনুষঙ্গে মানুষ আল্লাহ-কে স্মরণ করে। যে আল্লাহকে স্মরণ করে জীবনের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি অবস্থায়, আল্লাহ তাকে সমাধান দেন উত্তম রূপে, কল্পনার উর্ধ্বে। আল্লাহ তাকে আনুকূল্য দেন জীবনের পরম আরাধ্য ধর্ম বিষয়ে। আল্লাহ তাকে পরিত্রাণ দেন পার্থিব সব প্রতিকূল বিষয়ে। আল্লাহ মহান। আল্লাহ মহানুভব। কোরআনের ভাষায়-
فَاللَّهُ خَيْرٌ حَفِظًا وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّحِمِينَ) রক্ষণাবেক্ষণে আল্লাহই শ্রেষ্ঠ। তিনিই দয়ালুদের সেরা দয়ালু। [ইউসুফ: ৬৪]
ধর্ম মানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। জীবনের গভীরে মহত্ত্বময় পটভূমি।
যদিও মানুষের কাছে ধর্মই আজ আপেক্ষিক, আনুষ্ঠানিক, উপেক্ষিত। কিছু মানুষ আছে, যাদের জীবনে আল্লাহ ধর্মপালনের সকল আনুকূল্য দান করেন। তাদেরকে সঠিক দিশায় অটল রাখেন। ধর্মের সাড়ম্বর মঞ্চে জীবনানুষ্ঠান পরিচালনা করেন নির্বিঘ্ন গতিময় নিয়মে। আল্লাহ তাদের অন্তরকে ভ্রান্তি ও দ্বিধা থেকে মুক্ত ও সুস্থির রাখেন। তাদের অন্তর থেকে শিরক ও নিফাক দূর করেন। সন্দেহ সংশয়ের দোলাচল থেকে উত্তরণ ঘটান।
যেসব মানুষ লক্ষ্যহীন উদ্ভ্রান্ত জীবনে ভূপাতিত, আল্লাহ তাদের সকল বিনাশ থেকে আশুমুক্তি দান করেন। আল্লাহই তাকে হেফাজত করেন। আল্লাহ -র কৃপাতেই মানুষ সফলতার রাজতোরণ দর্শন করে।
মানুষ যখন মরণকালের সঙ্গিন সময়ে উপনীত হয়, শয়তান তখন মনুষ্যশিকারে লোভাতুর হয়ে ওঠে। শয়তান তখন মানুষকে কুফরির মহাধ্বংশে ধরাশায়ী করতে উন্মাতাল হয়ে ওঠে। কিন্তু আল্লাহ তখনও কিছু মানুষের সহায় হন। কুফরির মহাধ্বংশ থেকে মানুষের রক্ষাকবচ হন। মৃত্যুর বিভীষিকাময় অবস্থাতেও আল্লাহ কিছু মানুষকে সরল পথে জিইয়ে রাখেন। তার মুখে মহাসত্যের উচ্চারণ ঘটান- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ!
এরা সেই সে সৌভাগ্যবান, যারা আল্লাহ -কে স্মরণ করেছে তাদের অহর্নিশ জীবনে। স্মরণ করেছে জীবনের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি অবস্থায়, প্রতিটি প্রসঙ্গে।
অনেক মানুষ আছে, যারা আল্লাহ -র বিধান অমান্য করে। জীবন চলার পথে আল্লাহ -র নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে। সেসব মানুষ পরাজিত হয়, লজ্জিত হয়। মৃত্যুর সময় সেসব মানুষের যবানও তাদের সাথে বেইমানি করে। মৃত্যুমুখে তারা কালিমাহ উচ্চারণে হোঁচট খায়। তারা স্তব্ধ হয়ে যায়। অনুতাপে ভোগে। পরকালে তারা পরিতাপের করুণ পাঁচালী বহন করে। তারা দুনিয়াতে আল্লাহর সীমা রক্ষা করেনি, আল্লাহও তাদের সফলতার রাজমুকুট সুরক্ষিত রাখেননি। তারা দুনিয়াতে ক্ষতিগ্রস্ত। আখিরাতেও ক্ষতিগ্রস্ত। তারাই মহাকালের ক্ষতিগ্রস্ত।
📄 আল্লাহর বিধান রক্ষা না করার পরিণাম
আল্লাহর বিধান রক্ষা না করলে আল্লাহর সাহায্য ও সুরক্ষা পাওয়া যায়না। পরিণতিতে পার্থিব জীবনে অবমাননাকর জীবনযাপন অনিবার্য হয়ে পড়ে। অভাগা হয়ে বেঁচে থাকতে হয়। পরকালের জীবনে অনিবার্য হয়ে পড়ে জাহান্নামের পোড়া আগুন। চিরস্থায়ী ছাইভস্ম অগ্নি। আল্লাহ বলেন-
وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيمَةِ أَعْلَى
যে আমার স্মরণে বিমুখ, তার জীবনের ভোগসম্ভার হবে সংকুচিত। আর আমি তাকে কিয়ামতের দিন উত্থিত করবো অন্ধ অবস্থায়। [সূরা ত্বহা: ১২৪]