📄 এখলাসের পরিচয়
এখলাস বলা হয় কোন কাজে আল্লাহ ব্যতীত আর কারো কাছে নাম-প্রতিদানের আশা না রাখা।
বান্দা এবং আল্লাহ -র মাঝে সৃষ্টিকূলের কোন পর্দা না থাকা। মানুষের গোচরে-অগোচরে একই অনুভূতিতে এবাদত করা।
একাকী এমনভাবে সালাত পড়া, যেন মানুষের সামনে সালাত পড়ছি। মানুষের সামনে এমনভাবে সালাত পড়া, যেন আমি একাই সালাত পড়ছি।
আহলুস সুন্নাহর বৈশিষ্ট্যগুলোর অনন্য একটি হল এখলাস। এখলাস আল্লাহ -র বন্ধুদের সকল বৈশিষ্ট্যের অন্যতম। আল্লাহ-র বন্ধুদের সকল এবাদত আল্লাহ-র জন্য। তাদের সকল চাওয়া-পাওয়া আল্লাহ-র জন্য। তাদের কথা-বার্তা উপদেশ সবই আল্লাহ-র জন্য।
আইয়ূব ইবনে তাইমিয়া সিখতিয়ানী ছিলেন আল্লাহ-র একনিষ্ঠ বন্ধু। তার সামনে উপদেশমূলক হাদিস পাঠ করা হলে তিনি কেঁদে ফেলতেন। তার কাছে মৃত্যুর কথা আলোচনা হলেও তিনি কেঁদে ফেলতেন। অতিরিক্ত ক্রন্দনে তিনি নাক ধরতেন আর বলতেন, 'উফ! কী প্রচণ্ড সর্দি!'
অনেকেই নিজেকে মানুষের কাছে দুনিয়াবিমুখ হিসেবে পরিচিত করতে চায়। ছেঁড়া-তালির জামা পরে। অথচ তার অন্তরে ছেয়ে থাকে দুনিয়ার ছায়া। তার অন্তরে লিপ্সা জাগে রাজত্বের। মনে মনে বাসনা থাকে বাড়ি-গাড়ি আর দোকান-পাটের।
কিন্তু ছেঁড়া-তালি জামার মধ্যে দুনিয়াবিমুখতা নয়। বরং অন্তরের সততা, হারামের অনীহা, অল্পে তুষ্টির মধ্যেই হলো দুনিয়াবিমুখতা।
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ-র বন্ধুদের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য, তারা রাসূল-কে নিজেদের নেতা এবং ন্যায়বিচারক হিসেবে মনে-প্রাণে গ্রহণ করে। আল্লাহ-র রাসূল তাদের কাছে নিজ নিজ ইন্দ্রিয় থেকেও প্রেমানুভূত হয়। আল্লাহ বলেন-
অতএব তোমার পালনকর্তার কসম! সে লোক ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায়বিচারক বলে মনে না করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোন রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা হৃষ্টচিত্তে কবুল করে নেবে। [নিসা: ৬৫]
যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে।' [আহযাব: ২১]
ইমাম মালিক মসজিদে নববীতে মুয়াত্তার পাঠদান করতেন। একদিন তিনি হাদিস পড়াচ্ছেন, এমতাবস্থায় একটি বিচ্ছু তার পায়ে দংশন করতে লাগলো। বিচ্ছুটি একে একে তাকে তেরটি কামড় দিল, কিন্তু তিনি সামান্য নড়াচড়া করলেন না।
হাদিস পাঠদান শেষে তিনি পায়ের নলায় বিচ্ছুর আঘাতগুলো দেখে বিষ প্রতিষেধক দিয়ে ক্ষতস্থানগুলো মুছে নিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হল, 'এতগুলো দংশনের পরও আপনি হাদিসের পাঠদানে বিরতি দিলেন না!'
তিনি বললেন, 'সুবহানাল্লাহ, একটি বিচ্ছুর দংশনে আমি হাদিসের পাঠদানে বিরতি দিবো!'
রাসূলের প্রতি এ কেমন ভালোবাসা!
রাসূলের হাদিসের প্রতি এ কেমন অনুরাগ!
ইবনুল মুসাইয়িব অসুস্থ ছিলেন। তাকে একটি হাদিস জিজ্ঞেস করা হল। তিনি তখন শুয়ে ছিলেন। বললেন, 'তোমরা আমাকে বসাও। আমি শুয়ে শুয়ে রাসূলের হাদিস বর্ণনা করবো! এটি হাদিস বর্ণনার আদর্শ নয়।'
সাহাবায়ে কেরাম মদিনায়, মদিনার আশপাশে রাসূলের কোন স্মৃতিচিহ্ন দেখলে চোখের পানি ছেড়ে দিতেন। কান্না করতেন। তাহলে তারা রাসূলকে দেখলে যেন কেমন করতেন! এ যেন কবির সেই কাব্য-
'লায়লার বাড়ির দেয়াল ঘেঁষে হাঁটছি আমি
এই দেয়ালে ওই দেয়ালে খাচ্ছি চুমি
দেয়ালের প্রেমে পড়ে খাইনি চুমি
দেয়ালের ভেতর আমার জীবন-প্রেমী'
রাসূল মক্কা থেকে হিজরতে বের হচ্ছেন। বারবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছেন আর বলছেন-
উহুদ পাহাড় আমাদের ভালোবাসে, আমরাও উহুদ পাহাড়কে ভালোবাসি। [বুখারি : ৪৪২২]
সুবহানাল্লাহ, পাহাড়ও রাসূলকে ভালোবাসে!
মসজিদে নতুন মিম্বার স্থাপিত হয়েছে। রাসূল ﷺ সে মিম্বারে প্রথম খোতবা প্রদান করবেন। এতদিন মিম্বার হিসেবে ব্যবহার হওয়া পুরতান খেজুরদণ্ডটি আজ থেকে পরিত্যক্ত। রাসূল ﷺ নতুন মিম্বারে দাঁড়ালেন। পরিত্যক্ত খেজুরদণ্ডটি আবেগাপ্লুত হয়ে উঠল! দশমা উটের মতো অনুভূতিশীল হয়ে উঠল! খেজুরদণ্ডটি থেকে শিশুর মতো কান্নার আওয়ায শুরু হয়ে গেল!
রাসূল ﷺ মিম্বার থেকে নেমে এসে খেজুরদণ্ডের উপর হাত রাখলেন। খেজুরদণ্ডের কান্না থামালেন। রাসূলের স্পর্শে খেজুরদণ্ডটি শান্ত হল।
হাসান বসরি বলেন, 'তোমাদের উপর বড়ই আশ্চর্য হতে হয়। একটি খেজুরদণ্ড রাসূলপ্রেমে আপ্লুত হয়ে ওঠে, অথচ তোমাদের কোন ভাবাবেগ নেই!'
উল্লেখ্য, রাসূলপ্রেমে দীনের দাঈ এবং ইলম অন্বেষী এবং আমি নিজেকেও একটি ব্যাপারে সাবধান করছি। অনেকে তাদের অনুসৃত বিভিন্ন মানুষকে ভালোবাসার আতিশয্যে রাসূলের স্থান দিয়ে থাকে। এটি সুস্পষ্ট বাড়াবাড়ি। আল্লাহ বলেন-
হে আহলে কিতাব, তোমরা তোমাদের দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। [নিসা: ১৭১]
এমনও অনেক মানুষ আছেন, যারা রাসূলের চেয়ে অন্যদের স্মরণই বেশি করে থাকে। অনেক বেদয়াতপন্থী প্রেম নিবেদন এবং নেতা মনোনয়নে রাসূলের পরিবর্তে স্বীয় নেতাদের প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তাদের কথাবার্তায় কাজেকর্মে রাসূল ভিন্ন অন্যের প্রতি বেশি ভক্তি প্রকাশ পায়। তাদের ভালোবাসা রাসূল ছাড়া নিজ নিজ নেতাদের প্রতি একটু বেশিই!
কিছু আছে দলান্ধ। যারা কথায়-কাজে রাসূলের চেয়ে দলকে প্রাধান্য দেয়। তারা আপন দলমতের বিরোধীতার অযুহাতে রাসূলের হাদিসও পরিত্যাগ করে।
এই সব ধরণের সীমালঙ্ঘনকারীদের থেকে সাবধান।
আল্লাহ -র বন্ধুগণ এক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করেন। তারা রাসূল ﷺ-কে নিজেদের ইমাম বানিয়েছেন। আমরা যেন আমাদের কথায় কাজে বিশ্বাসে সর্বাবস্থায় রাসূলেরই অনুসরণ করি। দীন প্রচরের ক্ষেত্রে আমরা যেন রাসূল ছাড়া আর কাউকে মাধ্যম না বানাই।
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ -এর বন্ধুদের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য- তাদের রাগ-অনুরাগ সব আল্লাহ -এর জন্য হয়ে থাকে। আল্লাহ -এর বন্ধুগণ মানুষকে ভালোবাসেন আল্লাহ -এর সাথে মানুষের সম্পর্ক বিবেচনা করে। কারো সাথে দূরত্ব রাখেন আল্লাহ -এর সাথে তার দূরত্ব বিচার করে। আল্লাহ বলেন-
তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মুমিনগণ, যারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং বিনম্র। [মায়িদা: ৫৫]
রাসূল বলেন- যে আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসে, আল্লাহর জন্য কারো প্রতি বিরাগভাজন হয়, আল্লাহর জন্য কাউকে কিছু দান করে, আল্লাহর জন্যই কাউকে দান করা থেকে বিরত থাকে, সে অবশ্যই তার ঈমান পরিপূর্ণ করে নিল। [আবু দাউদ: ৪৬৮১, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ৩০৫১৯]
আল্লাহ -এর বন্ধুগণ কারো বংশ মর্যাদায় প্রভাবিত হয়ে তাকে ভালোবাসেন না। কারো বিপুল পরিচিতিতে আকৃষ্ট হয়ে ভালোবাসেন না। কাউকে নিজের মতের, নিজের পথের বা একই শামিয়ানাতলের বলে ভালোবাসেন না।
ইমাম শাফেঈ নিয়মিত ইমাম আহমদ -এর সাথে দেখা করতে যেতেন। কারণ, তারা পরষ্পরকে আল্লাহ -এর জন্য ভালোবাসতেন।
ইমাম শাফেঈ -কে একদিন বলা হলো, আহমদ তো আপনার চেয়ে ছোট। আপনি বড় হয়েও তাকে দেখতে যান!
ইমাম শাফেঈ বললেন-
'লোকে বলে, আহমদ আপনাকে দেখতে আসবে, আপনি কেন?
আমি বলি, সম্মান তার উঁচু মাকাম ছাড়বে না কখনো।'
সে আমাকে দেখতে আসুক; তারই মহত্ব
আমি তাকে দেখতে যাই; তারই মহত্ব
সে আসুক বা আমি যাই, সব তারই মহত্ব।
ইমাম শাফেঈ (রহঃ) আরো বলেন-
আমি নই সৎলোক, ভালোবাসি সৎলোক,
কেয়ামত দিবসে পাবো বলে শাফায়াত।
উভয়ের পণ্য যত হোক বরাবর,
ঘৃণা করি তার যত পঙ্কিল তেজারত।
ইমাম শাফেঈ (রহঃ)-র এই কাব্য যেন আল্লাহ (সুবঃ)-র এই বাণীর জীবন্ত অনুভূতি-
বন্ধুরা সেদিন এক অপরের শত্রু হবে, তবে খোদভীরুরা নয়। [যুখরুফ: ৬৭]
অনেকে নিয়মিত সালাত পড়েন, সওম রাখেন, হজ্জ আদায় করেন, তথাপি তারা পাপাচারীকে ভালোবাসেন। পাপাচারীদের আড্ডা পছন্দ করেন। তাদের রাত্রিজাগরণ, রাতের আলাপন সবই আল্লাহ (সুবঃ)-র দুশমনদের সাথে হয়ে থাকে। আফসোস তাদের জন্য।
মানুষ আল্লাহ (সুবঃ)-কে ভালোবাসে, আল্লাহ (সুবঃ)-র শত্রুকেও ভালোবাসে! মানুষের অন্তরে এমন অসার অনুভূতি কিভাবে জাগে!
আল্লাহর কসম! এমনটা হতেই পারে না। যারা আল্লাহ (সুবঃ)-কে ভালোবাসে, তারা আল্লাহ (সুবঃ)-র বন্ধুদেরও ভালোবাসে। তারা আল্লাহ (সুবঃ)-র দুশমন পাপচারীদের ঘৃণা করে।
ইমাম আহমদ (রহঃ) বলেন, আমি যখন দেখি কোন বৃদ্ধলোক তার দাড়ি মেহেদিরাঙ্গা করেছেন, তখন আমার খুব খুশি লাগে। আমি তাকে ভালোবাসি। কারণ, সে রাসূলের একটি সুন্নত পালন করেছে।
কী আশ্চর্য কথা! শুধু দাড়িতে মেহেদি রাঙ্গানোর সুন্নত পালন করাতেই ইমাম আহমদ একজন লোককে ভালোবেসে ফেলেছেন! তাহলে যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত পড়ে, রমযানে রোযা রাখে, রাসূলের বিরোধীদের শায়েস্তা করে।
করে, রাসূলের সকল সুন্নত আদায় করে, সেই ব্যক্তির প্রতি কতটুকু ভালোবাসা জাগতে পারে!
চতুর্থ বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ -র বন্ধুদের চতুর্থ বৈশিষ্ট্য হল- তাদের অন্তরগুলো অপর মুসলমানের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হয়ে থাকে! আল্লাহ -র বন্ধুদের অন্তরে অপর মুসলমানের প্রতি কোন হিংসা, বিদ্বেষ, ক্লেদ, বক্রতা, ধোঁকা, প্রতারণা কিছুই থাকে না।
অনেকের অন্তরে এসব গোপন রোগ বাসা বাধে। তারা সামান্য কোন অপ্রাসঙ্গিক বা প্রশাখাগত ভেদাভেদ নিয়েও অপরের সাথে হিংসা বিদ্বেষ করে থাকে। আল্লাহ আমাদের এসকল গোপন রোগ থেকে মুক্ত রাখুন।
একদিন রাসূল মসজিদে একটি মজলিসে বসলেন। একজন লোক অজু করে মসজিদে প্রবেশ করল। আগন্তুকের বাঁ হাতে জুতা। দাড়ি থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় অজুর পানি ঝরছে। লোকটি ভিতরে প্রবেশের পূর্বেই রাসূল উপস্থিত সাহাবাদের বললেন, 'এই দরজা দিয়ে তোমাদের কাছে একজন জান্নাতী লোক প্রবেশ করবেন।'
রাসূলের এ কথার পর লোকটি প্রবেশ করলেন এবং দুই রাকাত সালাত পড়লেন।
দ্বিতীয় দিনেও রাসূল মজলিসে বসে বললেন, 'এখনই তোমাদের সামনে একজন জান্নাতী লোক উপস্থিত হবেন।'
তৃতীয় দিনেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো।
সেই মজলিসে ইবনে ওমর উপস্থিত ছিলেন। তার মনে কৌতুহল জাগল, কী এমন এবাদত করে এই ব্যক্তি দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ পেলেন! উৎসুক হয়ে ইবনে ওমর জান্নাতী ব্যক্তির এবাদতের খোঁজখবর নেয়ার জন্য তার কাছে গেলেন। কিন্তু তাকে খুব বিশেষ এবাদত করতে দেখলেন না। খুব বেশি সওম রাখার বা রাত জেগে সালাত পড়ার চিহ্নও লোকটির ভিতর পেলেন না।
ইবনে ওমর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কী এমন এবাদত করেন? আমি রাসূল -কে আপনার ব্যাপারে এই কথা বলতে শুনেছি- 'এই দরজা দিয়ে তোমাদের কাছে একজন জান্নাতী লোক প্রবেশ করবেন!'
লোকটি বলল, 'আমার যা কিছু এবাদত; সালাত, সওম, তাহাজ্জুদ, সবই তো দেখলেন। এরপরও আপনি কিছু জিজ্ঞেস করলে বলবো, আমার রাতদিন কেটে যাচ্ছে, কিন্তু আমার অন্তরে কখনও কোন মুসলমানের প্রতি ধোঁকা, বিদ্বেষ, হিংসাত্মক মনোভাব থাকে না।' [মুসনাদে আহমাদ: ১১২৮৬]
লোকটির এই অবস্থান হল কুরআনে বর্ণিত জান্নাতের সেই সুউচ্চ অবস্থানের প্রতিচিত্র-
তাদের অন্তরে যে ক্রোধ ছিল, আমি তা দূর করে দেবো। তারা ভাই ভাইয়ের মতো সামনা-সামনি আসনে বসবে। [হিজর: ৪৭]
মুমিনের অন্তরে কোন মুসলমানের প্রতি বিদ্বেষ-বৈরিতা থাকে না। এটি মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ মুমিনদের ভাষ্য বর্ণনা করে বলেন, এবং ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রেখোনা। [হাশর: ১০]
(অর্থাৎ মুমিনগণ যেন আল্লাহ -র কাছে এই দোয়া করে।) হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত আল্লাহ -র এই বন্ধু কারা?
আল্লাহ -র এই বন্ধুরা কখনও কোন মজলিসে, আলাপ-আলোচনায় কারো দোষ-ত্রুটি আলাপ করে না। মানুষের ইজ্জত-সম্মান রক্ষা করে। কবির ভাষায়,
তোমার মুখে গোপন কোন আলাপ না হোক কারও।
তোমার গোপন কথা আছে, মুখটি আছে তারও।
আল্লাহ বলেন- তোমরা কেউ কারো গীবত করোনা। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা একে ঘৃণাই করো। [হুজুরাত: ১২]
পঞ্চম বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ -এর বন্ধুদের পঞ্চম বৈশিষ্ট্য- আল্লাহ -এর ফরযসমূহ আদায়ে যথাতৎপর হওয়া এবং অধিকহারে নফল আদায়ে আন্তরিক হওয়া।
ফরযসমূহ যথাসময়ে আদায় করে অধিকহারে নফল ইবাদত করলে, হারামসমূহ থেকে বেঁচে থাকলে সে ব্যক্তি আল্লাহ -এর বন্ধু বলে পরিগণিত হয়। তার ব্যাপারে আল্লাহ সুসংবাদ দিয়েছেন-
মনে রেখো, যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের না কোন ভয়-ভীতি আছে, না তারা চিন্তান্বিত হবে। যারা ঈমান এনেছে এবং ভীত রয়েছে- তাদের জন্য সুসংবাদ পার্থিব জীবনে ও পরকালীন জীবনে। [সূরা ইউনুস: ৬২-৬৪]
রাসূল বলেন- মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘... আমি বান্দার উপর যা ফরয করেছি, তার চেয়ে অধিক প্রিয় কোন এবাদত দ্বারা বান্দা আমার নৈকট্য অর্জন করতে পারে না। আমার বান্দা সবসময় নফল এবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকবে, একসময় আমি তাকে ভালবাসবো। যখন আমি তাকে ভালবাসবো, আমি তার কান হয়ে যাবো, যা দিয়ে সে শোনে। আমি তার চোখ হয়ে যাবো, যা দিয়ে সে দেখে। আমি তার হাত হয়ে যাবো, যা দিয়ে সে ধরে। আমি তার পা হয়ে যাবো, যা দিয়ে সে চলে। [সহিহ বুখারি : ৬৫০২]
আল্লাহ এই হাদিসে অলিদের দুই ভাগ করেছেন।
এক. মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী; মুকতাসিদ।
দুই. কল্যাণের পথে অগ্রগামী; সাবিকুন বিলখাইরাত।
মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী- যিনি আল্লাহ -এর ফরযসমূহ আদায় করেন। কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকেন।
কল্যাণের পথে অগ্রসর- যিনি ফরযসমূহ আদায় করার পাশাপাশি অধিকহারে নফল এবাদত করে আল্লাহ -এর নৈকট্য অর্জন করেন। কবীরা গুনাহ থেকে বাঁচার পাশাপাশি সগীরা গুনাহ এবং মাকরুহ গুনাহ থেকেও বেঁচে থাকেন।
এক যুবক রাসূল ﷺ-র কাছে এসে বলল, 'আল্লাহর রাসূল, আমি বেহেশতে আপনার সঙ্গ চাই।'
রাসূল বললেন, 'আর কিছু?'
যুবক বলল, 'এটাই।'
রাসূল ﷺ বললেন, 'বেশি বেশি সেজদা কর।' [সহিহ মুসলিম : ৪৮৯]
অর্থাৎ, বেশি বেশি নফল এবাদত কর। আল্লাহ ﷺ-র বন্ধু হতে পারবে। জান্নাতেও যেতে পারবে।
নফল এবাদত বিভিন্নভাবে করা যায়। সালাত, সওম, যিকর, দান-সদকা, সবকিছুতেই নফল এবাদত রয়েছে। কার জন্য কোন এবাদত বেশি উপকারী, অন্তরকে বেশি বিগলিত করে, আল্লাহ ﷺ-র বন্ধু হওয়ার মতো বান্দা বানাতে পারে, তা সে নিজেই ভালো জানে। যার জন্য যে এবাদতটি বেশি উপকারী, সে যেন সেই এবাদতটিই বেশি বেশি করে।
আল্লাহ ﷺ-র বন্ধুদের বৈশিষ্ট্য হল- নফল এবাদতে অধিক গুরুত্ব দেয়। আল্লাহ ﷺ-র বন্ধুরা সকালে সালাতে থাকে। দ্বিপ্রহরে রোযারত থাকে। আবার রাতে জেগে এবাদত করে।
ষষ্ঠ বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ ﷺ-র বন্ধুদের ষষ্ঠ বৈশিষ্ট্য- এতেকাদ ও বিশ্বাস লালনে সালাফের অনুসরণ করেন। পূর্ববর্তীদের মধ্যে যারা কুরআন-হাদিসের সঠিক ধারণকারী, তাদের অনুগমন করেন। শরীয়তের চাহিদা বিরোধী কোন বিদয়াত পন্থার আবিষ্কার বা অনুসরণ করে না।
অনেকে দৈনিক পাঁচশ রাকাত নফল সালাত পড়ে, কিন্তু মত ও পথে তারা বিদয়াতী। দীনের চাহিদা বিরোধী নতুন কোন মত ও পথের আবিষ্কারক। দীনের ভুল ব্যাখ্যা প্রদানকারী, বিকৃতকারী। পথচ্যুত, মতভ্রষ্ট।
আল্লাহ ﷺ-র কাছে গ্রহণযোগ্য এবাদতের জন্য চেতনায় ও বিশ্বাসে নিরাপদ, খাঁটি, অক্ষত ও পূর্ণাঙ্গ হতে হয়। রাসূল ﷺ তাওহিদের যেসব পয়গাম দিয়েছেন; আল্লাহ -র নাম-ধাম, কেয়ামতের বিশ্বাস ইত্যাদিতে আহলুস সুন্নাহ ওয়ালজামায়াতের অনুসারী হতে হয়ে।
এই বৈশিষ্ট্যটি আল্লাহ -র বন্ধুদের গূঢ় মহত্বময় একটি বৈশিষ্ট্য। যারা বিদয়াতী, যুগে যুগে রাসূলের পথ ও পদ্ধতির বিরোধীতা করে, চেতনা ও বিশ্বাসে রাসূলের আদর্শের বাইরে চলে, এই বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে তাদের মাঝে এবং আল্লাহ -র খাঁটি বান্দাদের মাঝে পার্থক্য নিরূপিত হয়। আল্লাহ -র বন্ধুগণ কুরআন ও সুন্নাহ থেকে তাদের আকীদা-বিশ্বাস স্থির করেন। আহলুস সুন্নাহ ওয়ালজামায়াতের কুরআন-হাদিসের ব্যাখ্যামূলক নির্ভরযোগ্য রচনাবলী থেকে নিজেদের চেতনা ও চৈতন্য স্থাপন করেন। আকীদা-বিশ্বাসের ভিত্তি স্থাপনে বৈজ্ঞানিক অসার কল্পকথা অথবা আহলে কালামের উদ্ভট বেহুদা বকওয়াস থেকে আল্লাহ -র বন্ধুরা দূরত্ব বজায় রাখেন।
আল্লাহর বন্ধুরা কুরআন-সুন্নাহ থেকে অর্জিত আকীদা-বিশ্বাস ও তাওহিদের মর্মকথার দাওয়াত প্রচার করেন। তারা মানুষের জীবনে তাওহিদ স্থাপন এবং দুনিয়াপন্থী সকল বিদয়াত বর্জনের দাওয়াত দিয়ে থাকেন নবী-রাসূলদের মতো। বক্তৃতায় লিখনীতে এই হয়ে থাকে তাদের আলোচনার আধ্যেয়।
সপ্তম বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ -র বন্ধুদের সপ্তম বৈশিষ্ট্য- সৎকাজে আদেশ এবং অসৎকাজে নিষেধ করা। মানুষকে ভালো কাজে উৎসাহ প্রদান করা। ইলম ও জ্ঞান নিয়ে অকৃপণ থাকা।
আল্লাহ বলেন-
আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত, যারা আহ্বান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভালো কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে। আর তারাই হল সফলকাম। [আলে ইমরান: ১০৪]
তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত। মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে, অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। [আলে ইমরান: ১১০]
যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে আমি একজন আজ্ঞাবহ, তার কথা অপেক্ষা উত্তম কথা আর কার? [হা-মীম সিজদাহ: ৩৩]
বনী ইসরাঈলের মধ্যে যারা কাফের, তাদেরকে দাউদ ও মরিয়মতনয় ঈসার মুখে অভিসম্পাত করা হয়েছে। এটা এ কারণে যে তারা অবাধ্যতা করত এবং সীমালঙ্ঘন করত। তারা পরস্পরকে মন্দ কাজে নিষেধ করতো না, যা তারা করতো। তারা যা করতো তা অবশ্যই মন্দ ছিল। [মায়িদাহ: ৭৮, ৭৯]
কসম যুগের, নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে গুরুত্ব দেয় সত্যের এবং গুরুত্ব দেয় সবরের। [আসর : ১-৩]
এই উম্মতের ওলামায়ে কেরام সাধারণ মানুষের মতই। আহলে সুন্নাহ ওলামায়ে কেরام কখনও ঘরে বসে থাকেন না। দীন প্রচারের অবারিত দরজা বন্ধ রেখে ঘরকুণে হয়ে থাকেন না। তারা দীনের প্রচার নিয়ে ঘুরতে থাকেন মসজিদে-মসজিদে, রাস্তাঘাটে, অলিতে-গলিতে, সহকর্মীদের সাথে, সভা- সঙ্ঘে, আড্ডায়-সেমিনারে, শিক্ষাঙ্গনে।
আহলে সুন্নাহ ওলামায়ে কেরام মানুষকে দীন শিখান। আল্লাহ তাদের যে ধন-সম্পদ দেন, দীন শিখানোর জন্য তা ব্যয় করেন। ইলম নিয়ে কার্পণ্য করেন না। বনী ইসরাঈলের মতো ঘরে বসে থাকেন না। বনী ইসরাঈলের অবস্থা আল্লাহ স্বয়ং বর্ণনা করেন-
এবং তারা গোপন করে সেসব বিষয়, যা আল্লাহ তাদের দান করেছেন স্বীয় অনুগ্রহে। [নিসা: ৩৭]
ইমাম যুহরী। তিনি মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতেন। মানুষকে হাদিস শিখাতেন।
ওরওয়া ইবনে যুবাইর। তিনি মানুষকে স্বর্ণ-রূপা, টাকা-পয়সা দান করতেন আর বলতেন, 'লোকসকল! এসো, আমার কাছে হাদিস শোনো।' তিনি মানুষকে হাদিয়া প্রদান করতেন হাদিস শোনানোর জন্য।
যারা মানুষের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন মাসআলা প্রদানের জন্য মানুষের পিছু পিছু কষ্ট স্বীকার করে, তাদের অবস্থান কেমন হতে পারে!
অষ্টম বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ -এর বন্ধুদের অষ্টম বৈশিষ্ট্য- তারা জামায়াত ভালোবাসেন। ঐক্য ভালোবাসেন। বিচ্ছিন্নতা ঘৃণা করেন। বিচ্ছিন্নতা দূর করে একতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।
যেসব সংকীর্ণমনা দল-বল উম্মতের মাঝে অনৈক্যের সৃষ্টি করে, উম্মতের মাঝে বিবাদ-বিক্ষিপ্ততা উস্কে দেয়, তাদের কোন তৎপরতা বা উদ্যোগ দীনের উদ্যোগ নয়। দীনের অন্তর্ভুক্ত নয়।
আল্লাহ -এর বন্ধুরা আহলে সুন্নাহর অনুসৃত পথ ভালোবাসেন। তাদের মাঝে কোন পার্থক্য করেন না। এমন নয়, যে আমার মত গ্রহণ করবে, তাকে ভালোবাসবো। যে আমার মতবিরোধী হবে, তাকে প্রত্যাখ্যান করবো।
সকল মুসলমান মূলত একই জামায়াত। তাদের মাঝে বিক্ষিপ্ততা অগ্রহণযোগ্য। দীনকে একটি দৃষ্টিভঙ্গিতে সীমাবদ্ধ করা অগ্রহণযোগ্য। নির্দিষ্ট কোন গবেষণায় আটকে রাখা অগ্রহণযোগ্য।
আহলে সুন্নাহর অনুপম বৈশিষ্ট্য- তারা ঐক্যে প্রত্যাশী।
বিদয়াতীদের বৈশিষ্ট্য- তারা আলেমদের অপবাদযুক্ত করতে খুব তৎপর। এসব করে তারা খুব খুশি। বিদয়াতীরা ঐক্য অপছন্দ করে। বিক্ষিপ্ততা ভালোবাসে। আল্লাহ -এর বন্ধুদের অর্থাৎ আহলুসসুন্নাহ ওয়ালজামায়াতের বিরোধিতার প্রয়াশে আনন্দ পায়।
নবম বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ -এর বন্ধুদের নবম বৈশিষ্ট্য- পরস্পর মতভিন্নতার সময় তারা কুরআন-সুন্নাহয় মনোনিবেশ করে। কোন মাসআলায় মতবিরোধ হলে কিতাব এবং সুন্নাহ থেকেই এর সমাধান বের করার প্রয়াস পায়। আল্লাহ বলেন-
তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ কর, তার ফয়সালা আল্লাহর কাছে সোপর্দ। [শূরা: ১০]
আল্লাহ -র বন্ধুরা বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো আল্লাহর কাছেই সমর্পণ করেন। আল্লাহর কাছে দোয়া করেন-
اللَّهُمَّ رَبَّ جِبْرَائِيلَ وَمِيْكَائِيلَ وَإِسْرَافِيْلَ فَاطِرَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ عَالِمَ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ أَنْتَ تَحْكُمُ بَيْنَ عِبَادِكَ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ اهْدِنَا لِمَا اخْتُلِفَ فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِكَ إِنَّكَ تَهْدِي مَنْ تَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ
হে জিবরাইল মিকাইল ইসরাফীলের প্রভু, আসমান ও যমিনসমূহের সৃষ্টিকর্তা, প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সকল বিষয়ের সর্বজ্ঞাতা, আপনি আপনার বান্দাদের বিবাদমান বিষয়ে ফায়সালা করুন। আমাদের বিবাদমান বিষয়ে আপনার নির্দেশনায় হকের সন্ধান দিন। আপনিই সরল পথের দিকে পৌঁছান। [সহিহ মুসলিম : ৭৭0]
দশম বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ -র বন্ধুরা সদা হক কথা বলেন। প্রবৃত্তির কোন চাহিদা তাদের মুখের হক কথা বারণ করতে পারে না।
বর্ণিত হয়েছে- রাসূল আল্লাহর কাছে দোয়া করে বলতেন, 'হে আল্লাহ, আমি প্রকাশ্যে গোপনে (সর্বাবস্থায়) অন্তর জুড়ে তোমার ভয় প্রার্থনা করি। আমি রাগে সন্তোষে (সর্বাবস্থায়) হক কথা বলার তওফিক প্রার্থনা করি।' [নাসাঈ : ১৩০৫, ১৩০৬]
মানুষ ভাই, বন্ধু, সহপাঠীর সাথে রাগ হয়। প্রবৃত্তির ধোঁকায় পড়ে তাদের অবান্তর ও অনুপস্থিত দোষত্রুটি চর্চা করে। আবার যখন তার উপর সন্তুষ্ট থাকে, তখন তার ভিতর উপস্থিত ও উল্লেখ্য দোষত্রুটিও ভুলে যায়।
কবির ভাষায়-
প্রেমের চোখে ঢাকা পড়ে দোষগুলো তার; রাতের মতো।
রাগের চোখে প্রকাশ করে দোষগুলো তার শত শত।
আমরা আল্লাহ -র কাছে দোয়া করি মধ্যমপন্থার। আল্লাহ বলেন-
হে ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক, আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান কর। [নিসা: ১৩৫]
আল্লাহ বলেন-
আপনার প্রতিপালকের বাক্য পূর্ণ সত্য ও সুষম। [আনয়াম: ১১৫]
এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার কর। এটাই আল্লাহভীতির অধিক নিকটবর্তী।' [মায়েদা: ০৮]
তোমরা কারো উপর রাগান্বিত থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে অন্যায় ও মিথ্যা ফায়সালা গ্রহণ করো না। তোমরা ন্যায়বিচারক হও।
আল্লাহ -এর বন্ধুদের দশটি বৈশিষ্ট্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হল। একটু চিন্তা করলেই এই দশ বৈশিষ্ট্যের আড়ালে আরও অনেক বৈশিষ্ট্য বেরিয়ে আসবে।
আল্লাহ -এর কাছে আমার জন্য এবং আপনাদের জন্য দোয়া করি, আমরা যেন এই দশ বৈশিষ্ট্যে নিজের জীবন শোভামণ্ডিত করতে পারি। বৈশিষ্ট্যগুলোর দাবি জীবনভর পালন করতে পারি। নিজেদের যেন আল্লাহ -এর বন্ধু বানাতে পারি।
📄 সুখী মানুষ দুঃখী মানুষ
বমহিমাময় আল্লাহ; যিনি বান্দার সবকিছু দেখেন, সবকিছু শোনেন। সর্বকল্যাণময় আল্লাহ; যিনি নভোমণ্ডলে সৃষ্টি করেছেন রাশিচক্র, তাতে রেখেছেন জ্বলজ্বলে সূর্য, রেখেছেন দীপ্তিময় চন্দ্র।
আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহ-ই আমার একমাত্র ইলাহ। আমি বিশ্বাস রাখি, মোহাম্মদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। আমার এ বিশ্বাস সেদিনের পারাপারের জন্য, যেদিন কাজে আসবে না কোন ধন-সম্পদ। কাজে আসবে না কোন পরিবার-পরিজন। কাজে আসবে শুধু সেই, যে আল্লাহ-র কাছে আসবে শুদ্ধচিত্ত নিয়ে।
আল্লাহ! ফুল যেমন মন-প্রাণ মোহিত করে সুরভী ছড়ায়, বৃষ্টি যেমন ঝরে-ঝরে মুষলধারে বর্ষিত হয়, তেমনই তুমি দুরূদ-সালাম বর্ষণ করো মোহাম্মদ -এর উপর। বন্ধু যেমন আলিঙ্গনে একাত্মা হয়ে হারিয়ে যায়, পুণ্যাত্মারা পবিত্র আবহে যেভাবে মিলিত হয়, রাতের পরে যেমন দিন আসে আবার দিনের পরে রাত, তেমনই তুমি দুরূদ-সালাম বর্ষণ করো তোমার রাসূল মোহাম্মদের উপর। দুরূদ-সালাম বর্ষিত করো মোহাম্মদের পরিজনের উপর। বর্ষিত করো মুহাজির-আনসার সকল সাহাবার উপর। কেয়ামত পর্যন্ত তার দেখানো হেদায়াতের রাহে সকল মুসাফিরের উপর।
সুখী মানুষ, দুঃখী মানুষ মানুষ দুই প্রকার।
সুখী মানুষ, দুঃখী মানুষ। সৌভাগ্যবান, দুর্ভাগ্যবান। সৌভাগ্যবান মানুষ জান্নাতে যাবে, দুর্ভাগ্যবানরা যাবে জাহান্নামে। আল্লাহ বলেন- এই দুই বাদী-বিবাদী, তারা তাদের পালনকর্তা সম্পর্কে বিতর্ক করে। [হাজ্জ: ১৯]
📄 মানুষের চোখ দুই প্রকার
কিছু চোখ আল্লাহ -কে চিনে। আল্লাহর ভয়ে অশ্রু ঝরিয়ে কাঁদে। আল্লাহ -র নিদর্শনাবলী দেখে তাতে চিন্তা করে। সৃষ্টিকূল থেকে অমুখাপেক্ষী থাকে।
কিছু চোখ হারামের দিকে দৃষ্টি দেয়। পৃথিবীর সর্বসেরা মানুষের প্রদর্শিত রাস্তা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। গোনাহের রাস্তা খুঁটিয়ে আবিষ্কার করে। নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ উঁকি মেরে দেখে। এই চোখ কাঁদবে, কেয়ামতের হিসাবে আল্লাহ -র কাছে আফসোস করে খুব কাঁদবে।
📄 মানুষের মন দুই প্রকার
কিছু মন আছে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর সুধায় তৃপ্ত। সে অন্তর আল্লাহ --কে চিনে। সে হৃদয় রাসূল -কে ভালোবাসে। রাসূলের পথ ও পাথেয় অনুসরণ করে। সেই মন হল সুখী মন। সেই অন্তর সমৃদ্ধ অন্তর। সেই হৃদয় সৌভাগ্যবান হৃদয়।
কিছু মন আছে আল্লাহ -র যিকির থেকে গাফেল থাকে। কোরআন তিলাওয়াত বিতৃষ্ণ লাগে। সালাতে অলসতা লাগে। আল্লাহ -র প্রেম, রাসূলের সরল পথ, রাসূলের পবিত্র জীবনদর্শন অপ্রিয় লাগে। সেই মন পরাজিত মন। সে অন্তর ভঙ্গুর অন্তর। সেই হৃদয় অধঃপতিত হৃদয়।