📄 ‘আলিফ লাম মীম’
আয়াতে এ হরফগুলোর উদ্দেশ্য নির্ণয়ে ওলামায়ে কেরام মতভিন্নতা করেছেন। মূলত আল্লাহ -ই এর উদ্দেশ্য সর্বাধিক জ্ঞাত আছেন।
নব-আবিষ্কৃত কিছু দল এ হরফগুলোর উদ্দেশ্য নির্ণয়ে বলে থাকে-
أَلِفْ : أَلَّفَ اللهُ مُحَمَّدًا فَبَعَثَهُ نَبِيًّا
আলিফ অর্থ আল্লাহ মোহাম্মদকে মনোনীত করেছেন, অতঃপর তাকে নবী বানিয়ে পাঠিয়েছেন।
لَامْ : لَامَ اللهُ الْمُشْرِكِينَ
লাম অর্থা আল্লাহ মুশরিকদের ধিকৃত করেছেন।
মীম অর্থ আল্লাহ তার বিরোধীদের তিরস্কার করেছেন।
এসব ব্যাখ্যা মূলত নির্বোধদের নিরর্থক ব্যাখ্যা। এসব ব্যাখ্যার কোন ভিত্তি নেই।
অনেকে বলেন, আলিফ লাম মীম হরফগুলো একত্র করলে অসংখ্য অর্থবোধক শব্দ প্রমীত হয়। এই ব্যাখ্যাটি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করা হয়।
মূল কথা হল, এসব হরফ আল্লাহ আরবদের সামনে রেখেছেন তাদেরকে অবাক করার জন্য। আল্লাহ হরফগুলো তাদের সামনে রেখে বলেছেন, তোমরা সাধ্য থাকলে কোরআনের অনুরূপ কিছু তৈরি কর। যোগ্যতা থাকলে কোরআনের ছাঁচে কিছু রচনা কর।
কোরাইশের অন্যতম সাহিত্যিক ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা। একবার সে কোরআন শুনে বলল, 'আল্লাহর কসম, এই কোরআনের উপরিভাগ প্রাচুর্যপূর্ণ, আর নিম্নভাগ হল পল্লবিত। এই কোরআনে রয়েছে বিশেষ মিষ্টতা, রয়েছে বিশেষ মাধুর্যতা। এই বৈশিষ্ট্যগুলো মহান এই কিতাবের মুজিযা। যিনি এই কিতাব নাযিল করছেন, তিনি কতো মহান!'
এ সেই কিতাব। [বাকারা: ০২]
আয়াতাংশ মূলত কোরআনের প্রশংসা।
আল্লাহ এখানে 'এ সেই কোরআন' বলেননি, 'এ সেই কিতাব' বলেছেন। কেমন যেন এটাই শুধু কিতাব, অন্য কিতাব কোন কিতাবই নয়। যেমন আমরা কারো প্রশংসায় বলে থাকি, 'এ সেই ব্যক্তি' 'এ সেই সাহসী'। অর্থাৎ এই ব্যক্তি অন্যান্য ব্যক্তির মত নয়।
যাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। [বাকারা: ০২]
সুতরাং এই কিতাবে কোন যালিম ব্যতীত আর কেউ সন্দেহ করতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন-
এতে মিথ্যার প্রভাব নেই, সামনের দিক থেকেও নেই এবং পেছন দিক থেকেও নেই। এটা প্রজ্ঞাময় প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। [ফুসসিলাত: ৪২]
যে ব্যক্তি কোরআনের উপর আমল করল, সে প্রতিদানপ্রাপ্ত হল। যে ব্যক্তি কোরআন অনুযায়ী বিচার করল, সে ইনসাফ করল। যে ব্যক্তি কোরআন অনুযায়ী চলল, সে সরল-সঠিক পথের উপর চলল।
۞هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ ﴿٢﴾
এই কিতাব পথ প্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য। [বাকারা: ০২]
কুরআন মানুষের পথ প্রদর্শনকারী, হেদায়াতের বাহন। এই পথ প্রদর্শনের দুটি পর্যায় রয়েছে। একটি হল শুধুই পথ দেখানো। যা রাসূল-র মাধ্যমে হয়েছে, এবং দীনের প্রত্যেক দাঈর মাধ্যমে হচ্ছে।
অপরটি হলো হেদায়াতের তাওফিক। বান্দার হেদায়াত গ্রহণ। এটি শুধু আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে। যেমন কোরআনে বর্ণিত হয়েছে-
আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না, তবে আল্লাহই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন। কে সৎপথে আসবে সে সম্পর্কে তিনিই ভালো জানেন। [কাসাস: ৫৬]
আল্লাহ বলেন-
۞هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ ﴿٢﴾
এই কিতাব পথ প্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য। [বাকারা: ০২]
লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ মুসলমানদের জন্য পথ প্রদর্শনকারী না বলে পরহেযগারদের বা মুত্তাকীদের জন্য পথ প্রদর্শনকারী বলেছেন। কারণ মুসলমানদের অনেক স্তর রয়েছে। অনেক মুসলমান কবিরা গোনাহে লিপ্ত থাকে। কোরআন তাদের জন্য ব্যাপক ও পরিপূর্ণ হেদায়াত নয়। অনেক মুসলমান আবার হরহামেশাই আল্লাহ-র অবাধ্যতায় মত্ত থাকে। কোরআনের ব্যাপক হেদায়াতে তারা অন্তর্ভুক্ত নয়। এজন্যই আল্লাহ মুত্তাকীদের জন্য পথ প্রদর্শনকারী বলেছেন। কোরআন তাদেরকেই সবচেয়ে বেশি হেদায়াত দিয়ে থাকে। মুত্তাকীগণ নিজেদের কোরআনের আলোকে যাচাই করে চলেন। কোরআনের আদেশসমূহ পালন করেন, নিষেধসমূহ থেকে বেঁচে থাকেন। কোরআনের স্পষ্ট বিষয়াদিতে ঈমান রাখেন, অস্পষ্ট বিষয়সমূহ আল্লাহ -র কাছে সমর্পন করেন।
পরহেযগার বা মুত্তাকীর উদ্দেশ্য হল যারা তাকওয়া অর্জন করেছেন। আল্লাহ -র এক নূরকে তারা ভয় করেছেন। নূরের রশ্মি ধরে আল্লাহ -র রহমতের আশা রেখেছেন। নূরের জ্যোতি ধরে নেক কাজ করেছেন, সাওয়াবের আশা রেখেছেন। নূরের তাজাল্লীতে পাপকাজ থেকে বেঁচে রয়েছেন, আল্লাহ -র আযাব ও গযবকে প্রাণপণে ভয় করেছেন।
তাকওয়ার অর্থ হল আদিষ্ট দায়িত্ব পালন করা। নিষিদ্ধ পথ পরিহার করা। আল্লাহ -র বাণীসমূহে অন্তরমম বিশ্বাস রাখা।
তাকওয়ার অর্থ হল আল্লাহ -র আনুগত্যসহ নেককাজ করা এবং পাপকাজ ত্যাগ করা।
আলী বলেন, মহামহিম আল্লাহ -র ভয়, তার অবর্তীর্ণ বিষয়ে আমল, অল্পেতুষ্টি এবং মৃত্যুর প্রস্তুতির নাম হল তাকওয়া।
ইবনে মাসউদ বলেন, কখনও আল্লাহ -কে না ভুলে তার স্মরণে নিজেকে উজ্জীবিত রাখা। আল্লাহ -র অবাধ্য না হয়ে তার আনুগত্যে সদা নীত থাকা। আল্লাহ -র নেয়ামতের অস্বীকার না করে তার কৃতজ্ঞতায় সর্বদা নুয়ে থাকা।
তাকওয়ার অর্থ হল আল্লাহ -র আযাব ও বান্দার মাঝে একটি আড় তৈরি করা।
ওমর উবাই ইবনে কাবকে বললেন, 'আমাকে তাকওয়ার পরিচয় শোনাও।'
উবাই বললেন, 'আপনি কাঁটা বিছানো রাস্তায় হেঁটেছেন কখনও?'
ওমর বললেন, 'হ্যাঁ, হেঁটেছি।'
উবাই বললেন, 'কীভাবে হেঁটেছেন?'
ওমর বললেন, 'খুব সতর্ক হয়ে কাপড় গুটিয়ে হেঁটেছি।'
অদৃশ্যে ঈমান আনাই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে অদৃশ্যে ঈমান আনবে না, তার থেকে আল্লাহ কোন কিছুই কবুল করবেন না। তার দিকে আল্লাহ ফিরেও তাকাবেন না। তাকে পরিশুদ্ধও করবেন না। তার জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি।
যারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে। [বাকারা: ০৩]
সালাত প্রতিষ্ঠা করা মুত্তাকীদের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য।
আল্লাহ যেখানেই মুমিনদের কথা আলোচনা করেছেন, সেখানেই সালাত প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। আর যেখানে মুনাফিকদের কথা বলেছেন, সেখানে বলেছেন সালাত পড়ার কথা।
সালাত আদায়কারী ব্যক্তি দুই ধরণের হয়ে থাকে। এক ধরণের লোক সালাত প্রতিষ্ঠা করে। আরেক শ্রেণীর লোক সালাত শুধু আদায় করে। যারা সালাত শুধু আদায় করে, সালাত তাদেরকে গর্হিত ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে না। আর যারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে, তাদের সালাত তাদেরকে অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে। আল্লাহ বলেন-
নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে। [আনকাবূত: ৪৫]
অনেকেই আশ্চর্য প্রকাশ করেন, কোন ব্যক্তি সালাতও পড়ছেন, খারাপ কাজও করছেন! কোন ব্যক্তি সালাতও পড়ছেন, আবার যিনা-চুরির মতো অপরাধও করছেন! এর কারণ হলো, তিনি সালাত শুধু আদায় করছেন, প্রতিষ্ঠা করছেন না। সালাত তাদেরকেই অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে, যারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে থাকে।
সালাত প্রতিষ্ঠার অর্থ হল, সালাতের খুশু-খুযূর প্রতি গুরুত্ব রাখা। অযু, এখলাস, রুকু, সেজদা, সালাতের সকল যিকির-আযকারের প্রতি গুরুত্বশীল থাকা।
আর আমি তাদেরকে যে রুযি দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে। [বাকারা: ০৩]
এটি মুত্তাকীদের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য।
অর্থাৎ, আমি যা রিযিক দিয়েছি, তা থেকে সব নয়, কিছু কিছু খরচ করে। আল্লাহ যদি বলতেন, 'আমি যা রিযিক দিয়েছি, তাই ব্যয় করে' -তাহলে বান্দার উপর সাধ্যাতীত কষ্ট হয়ে দাঁড়াতো। কারণ, কোন মানুষের পক্ষেই সকল রুযি আল্লাহ -র রাস্তায় খরচ করা সম্ভব নয়।
আয়াতে বেশি বেশি খরচ করার প্রশংসা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন-
যারা স্বীয় ধন-সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে, ব্যয় করার পর সে অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে না এবং কষ্টও দেয় না, তাদেরই জন্য তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে পুরস্কার এবং তাদের কোনই আশঙ্কা নেই, তারা চিন্তিতও হবে না। [বাকারা: ২৬২]
বলুন, আমার পালনকর্তা তার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং সীমিত পরিমাণে দেন। তোমরা যা কিছু ব্যয় কর, তিনি তার বিনিময় দেন। তিনি উত্তম রিযিকদাতা। [সাবা: ৩৯]
এবং তারা যখন ব্যয় করে, তখন অযথা ব্যয় করে না, কৃপণতাও করে না, এবং তাদের পন্থা হয় এতদুভয়ের মধ্যবর্তী। [ফুরকান: ৬৭]
হে ঈমানদারগণ, তোমরা পবিত্র বস্তু সামগ্রী আহার কর, যেগুলো আমি তোমাদের রুযি হিসেবে দান করেছি এবং শুকরিয়া আদায় কর। [বাকারা: ১৭২]
তারা ধৈর্যধারণকারী, সত্যবাদী, নির্দেশ সম্পাদনকারী, সৎপথে ব্যয়কারী, এবং শেষরাতে ক্ষমাপ্রার্থনাকারী। [আলে ইমরান: ১৭]
অনেক সাহাবি এমন আছেন, যারা আল্লাহ -র রাস্তায় বিপুল পরিমান খরচ করেছিলেন। আবু বকর, উসমান, আব্দুর রাহমান ইবনে আউফ বলতে গেলে তাদের সকল সম্পদই আল্লাহ -র জন্য খরচ করেছিলেন।
আবু বকর তার সকল সম্পদ, শরীরের রক্ত, চেষ্টা ও মেহনত, সময়, সবকিছু আল্লাহ -র রাস্তায় খরচ করেছিলেন। বিনিময়ে আল্লাহ তাকে নবী-রাসূলদের পরে সবচেয়ে কাছের বন্ধু বানিয়েছেন।
উসমান ‘রুমার কূপ’ মুসলমানদের অবাদে ব্যবহারের জন্য নিজ অর্থে ক্রয় করে উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। তাবুক যুদ্ধে মুসলমানদের সৈন্য নিজ অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে সামানা দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছিলেন। তখন রাসূল বলেছিলেন-
আজকের পরে উসমান যে আমলই করুক না কেন, তা তাকে কোন ক্ষতি করবে না। [মুসনাদে আহমাদ : ২০১০৭]
(রাসূল যখন হিজরত করে মদীনায় আসেন, তখন মদীনার কোথাও সুপেয় মিঠাপানি পাওয়া যেত না। শুধু একটি কূপেই সুপেয় মিঠাপানি ছিলো। সেই কূপটি হল রুমার কূপ। রাসূল তখন বলেছিলেন, যে রুমার কূপটি ক্রয় করে মুসলমানদের অবাদে ব্যবহারের জন্য ওয়াকফ করে দিবে, বিনিময়ে সে বেহেশতে তদপেক্ষা উত্তম কূপ লাভ করবে। অতঃপর উসমান একান্ত ব্যক্তিগত অর্থে কূপটি ক্রয় করে মুসলমানদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। দ্র. মানাকিবে উসমান, দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ, মেশকাত। -অনুবাদক)
আব্দুর রাহমান ইবনে আউফ এক মুহূর্তে গদি ও পালানযুক্ত সাতশ উট খাদ্যসহ আল্লাহ -র রাস্তায় খরচ করেছিলেন।
কবি বলেন-
‘কোন প্রয়োজনের খোঁজে তারা কাঠ পুড়ে মাটি খুঁড়তেন না। তারা শুধু আপন চেহারা উদ্ভাসিত করে তুলতেন; দেখতেন তাদের প্রয়োজনগুলো ধারণ করেছে সর্বোত্তম রঙ-বেরঙ!’
তিন ধরনের মানুষ আল্লাহ -র রাস্তায় খরচ করে। প্রথমত, এক শ্রেণীর মানুষ লোক দেখানোর জন্য এবং প্রশংসা কুড়ানোর জন্য খরচ করে। এদের জন্য কোন সাওয়াব থাকবে না। বরং দোযখের আগুন সর্বপ্রথম এদের দ্বারা প্রজ্জ্বলিত হবে।
দ্বিতীয়ত এক শ্রেণীর মানুষ, যারা চক্ষুলজ্জায় বা অভ্যাসবসে খরচ করে। এরা আল্লাহ -র রাস্তায় খরচের প্রতিদান পাবে।
তৃতীয়ত এক শ্রেণীর মানুষ ইখলাসের সাথে আল্লাহ -র সন্তুষ্টির জন্য খরচ করে। এরাই হলো আল্লাহ-র কাছে সর্বাধিক প্রতিদানপ্রাপ্ত বান্দা।
এদের জন্যই আল্লাহ বলেছেন-
أُولَئِكَ عَلَى هُدًى مِّنْ رَّبِّهِمْ * তারাই নিজেদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথপ্রাপ্ত। [বাকারা : ৫]
পরিপূর্ণ ও সুস্পষ্ট হেদায়াতপ্রাপ্ত। এমন নয় যে, তাদের কেউ হেদায়াত পেয়েছেন আর কেউ পাননি, বা তারা হিদায়াতের রাস্তায় চলছেন এখনও গন্তব্যে পৌঁছুননি। বরং তারা সকলে হেদায়াত পেয়ে গেছেন।
এজন্য কেউ এসকল আমলগুলো না করলে সে হেদায়াতের সামান্যই পেয়ে থাকে।
মানুষকে একমাত্র ঈমান এবং উল্লিখিত আমলগুলোই হেদায়াতের পথে অবিচল রাখতে পারে। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ মানুষকে হেদায়াতের পথে অটল রাখতে পারে না। অশ্লীল ও মন্দকাজ থেকে ফেরাতে পারে না। আল্লাহ ইউসুফ -র ব্যাপারে ইরশাদ করেন-
নিশ্চয় মহিলা তার বিষয়ে চিন্তা করেছিলো এবং সে-ও মহিলার বিষয়ে চিন্তা করতো, যদি না সে স্বীয় পালনকর্তার মহিমা অবলোকন করতো। এমনিভাবে হয়েছে, যাতে আমি তার কাছ থেকে মন্দ বিষয় ও নির্লজ্জ বিষয় সরিয়ে দেই। নিশ্চয় সে আমার মনোনীত বান্দাদের একজন। [ইউসুফ: ২৪]
অর্থাৎ, ইউসুফ যেহেতু হেদায়াতপ্রাপ্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলো, এ জন্য আল্লাহ তার উপর থেকে মন্দ ও অশ্লীল কাজ সরিয়ে নিয়েছেন।
সুতরাং, একমাত্র আল্লাহ -ই মানুষকে মন্দ ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখেন।
أُولَئِكَ عَلَى هُدًى مِّنْ رَّبِّهِمْ * তারাই নিজেদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথপ্রাপ্ত। [বাকারা: ০৫]
আল্লাহ শুধু তারা সুপথপ্রাপ্ত বলেননি। বরং নিজেদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথপ্রাপ্ত বলেছেন। কারণ, পথপ্রদর্শনের অনেক প্রকার থাকে। যেমন শয়তানের পক্ষ থেকেও একটি পথপ্রদর্শন আছে। কিন্তু উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গ শয়তানের পথে প্রদর্শিত নয়, বরং তারা তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথপ্রদর্শিত।
আয়াতাংশে আরো লক্ষ্যণীয় হলো, আল্লাহ -র পক্ষ থেকে হেদায়াতপ্রাপ্ত না বলে তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে হেদায়াতপ্রাপ্ত বলা হয়েছে। এরূপ বর্ণনাশৈলীর মাধ্যমে বুঝানো হয়েছে যে, তোমরা হেদায়াতপ্রাপ্ত হয়েছ এমন সত্ত্বার পক্ষ থেকে, যিনি তোমাদের প্রতিপালনও করেন। এটিও তদ্রূপ একটি নেয়ামত। আর নিয়ম হলো, আল্লাহ যেখানে নেয়ামতের উল্লেখ করেছেন, সেখানে প্রতিপালনের কথা উল্লেখ করেছেন। আর যেখানে কোরআনের কথা উল্লেখ করেছেন, সেখানে ইলাহ হওয়ার কথা বলেছেন।
আর তারাই যথার্থ সফলকাম। [বাকারা: ০৫]
وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ﴿٥﴾
আল্লাহ কোরআনের অনেক জায়গায় সফলতার কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন বর্ণিত হয়েছে-
যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম। [হাশর: ০৯]
আল্লাহ ধৈর্যের সাথে সফলতার কথা উল্লেখ করেছেন। যিকিরের সাথে সফলতার কথা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ -র রাস্তায় কষ্ট স্বীকার এবং খরচ করার সাথেও সফলতার কথা উল্লেখ করেছেন।
সফলতার অর্থ হল, উর্ধ্বে আরোহণ করা। তাহলে উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গ সফল হওয়ার অর্থ হল দুনিয়া এবং আখিরাতে তারা অন্যদের উর্ধ্বে আরোহণ করেছে।
আর তারাই যথার্থ সফলকাম; অর্থাৎ তারা বিজয়ী হয়েছে। তাদের বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অন্তঃকরণসহ পরিশুদ্ধ হয়েছে।
আমরা আল্লাহ -র কাছে দোয়া করি, আল্লাহ আমাদের সফলদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আল্লাহ আমাদের সালাত প্রতিষ্ঠাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। অদৃশ্যের উপর ঈমান আনার তাওফিক দিন। আল্লাহ -র রাস্তায় খরচ করার তাওফিক দিন।
📄 মু'মিনের দশ গুণ
সকল প্রশংসা আল্লাহ -র জন্য। অসংখ্য দুরূদ ও সালাম শ্রেষ্ঠতম নবী ও রাসূল মুহাম্মাদ -এর জন্য, তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবায়ে কেরামের জন্য।
মহান আল্লাহ বলেন-
যাদের জন্য প্রথম থেকেই আমার পক্ষ থেকে কল্যাণ নির্ধারিত হয়েছে, তারা দোযখ থেকে দূরে থাকবে। তারা দোযখের অস্ফুট শব্দও শুনবে না, এবং তারা তাদের মনের বাসনা অনুযায়ী চিরকাল বসবাস করবে। মহাত্রাস তাদের চিন্তান্বিত করবে না এবং ফেরেশতারা তাদের অভ্যর্থনা করবে- আজ তোমাদের দিন, যে দিনের ওয়াদা তোমাদের দেয়া হয়েছিল। সেদিন আমি আকাশকে গুটিয়ে নিবো, যেমন গুটানো হয় লিখিত কাগজপত্র। যেভাবে আমি প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করবো। আমার ওয়াদা নিশ্চিত, আমাকে তা পূর্ণ করতেই হবে। আমি উপদেশের পর যবুরে লিখে দিয়েছি যে, আমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাগণ অবশেষে পৃথিবীর অধিকারী হবে। [আম্বিয়া: ১০১-১০৫]
আয়াতে যাদের অবশেষে পৃথিবীর অধিকারী বলা হয়েছে, তারা হলেন আল্লাহ -র বন্ধু। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন-
মনে রেখো, যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের না কোন ভয়-ভীতি আছে, না তারা চিন্তান্বিত হবে; যারা ঈমান এনেছে এবং ভীত রয়েছে। [ইউনুস: ৬২, ৬৩]
আর এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই যে যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে আর আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী। আল্লাহ ক্ষমাকারী, করুণাময়। [বাকারা: ১১৮]
📄 আল্লাহর বন্ধু কারা?
লম্বা জুব্বা পরলেই সে আল্লাহর বন্ধু! আলখাল্লা গায়ে জড়ালেই সে আল্লাহর বন্ধু! শূন্য প্রান্তরে ঘুমোনোর সাধনা করলেই সে আল্লাহর বন্ধু!
কে আসলে আল্লাহর বন্ধু?
জনাকীর্ণ সৌধে গমন করে হাতে ভক্তি ও শ্রদ্ধার চুম্বন পেলেই সে আল্লাহর বন্ধু! মাথায় পাগড়ি পেচালেই সে আল্লাহর বন্ধু! লাল-সাদা রুমালে ঘুতরা বেঁধেই কেউ আল্লাহর বন্ধু হতে পারে! উঁচু কোন পদ-পদবী, উন্নত বাহন বা সুশোভিত ভিলার অধিকারী হওয়া কি আল্লাহর বন্ধু হওয়ার পরিচায়!
না, এসবের কোনটিই আল্লাহর বন্ধুত্বের পরিচায়ক নয়।
আল্লাহ -র বন্ধুদের দশটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বৈশিষ্ট্যগুলোর বিবরণ অনেক বিস্তর। খুবই সাধারণ ও সংক্ষেপাকারে সেগুলো তুলে ধরছি। এই বৈশিষ্ট্যগুলো আল্লাহর বন্ধু হওয়ার পরিচায়ক। যার ভেতর বৈশিষ্ট্যগুলো পাওয়া যাবে, সে যেন আল্লাহর শোকরিয়া জ্ঞাপন করে। আর কারো ভেতর না পাওয়া গেলে সে যেন নিজেকেই তিরস্কার করে। কবির ভাষায়-
গভীর প্রেমের এই অশ্রু যখন প্রবাহিত হয় অপাত্রে; সেই অশ্রু অপব্যয়িত, সেই অশ্রু অপব্যয়িত।
প্রথম বৈশিষ্ট্য
আল্লাহর বন্ধুদের প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো এখলাস। আল্লাহর জন্য সকল কাজের একনিষ্ঠতা। আল্লাহ বলেন-
আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছে, যদি আল্লাহর শরীক স্থির করেন তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন হবেন। বরং আল্লাহরই এবাদত করুন এবং কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত থাকুন। [যুমার: ৬৫, ৬৬]
উক্ত আয়াত আমাদের সকল কাজে একনিষ্ঠতার বার্তা দেয়। নিষ্ফল ঐ ব্যক্তি, যে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে দেখানোর জন্য আমল করে। আমরা লোক দেখানো আমল এবং প্রচারপ্রিয় আমল থেকে আল্লাহর পানাহ চাই।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-
যে ব্যক্তি মানুষকে শুনানোর জন্য আমল করে, আল্লাহ তার বদলে তাকে (কিয়ামতের দিন) শুনিয়ে দিবেন। আর যে লোক দেখানোর জন্য আমল করে, আল্লাহ তার বদলে তাকে (কিয়ামতের দিন) দেখিয়ে দিবেন। [বুখারি: ৬৪৯৯]
সুতরাং আল্লাহ -র বন্ধুগণ প্রচারপ্রিয় আমল করতে পারেন না। তারা আমল করেন একমাত্র আল্লাহ -র জন্য।
ইবনে সীরীন -কে একবার লোকেরা বলল, 'আমাদের সাথে নিয়ে সালাত পড়ুন।'
তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম! আমি ভয় করি, তোমাদের সাথে নিয়ে সালাত পড়লে লোকেরা আমার সালাত প্রচার করবে। তারা বলাবলি করবে, ইবনে সীরীন আমাদের সাথে নিয়ে সালাত পড়েছেন। আমি তোমাদের সাথে নিয়ে সালাত পড়বো না।'
এভাবে তিনি প্রচার-প্রসিদ্ধির ভয়ে মানুষের সাথে নফল সালাত পড়া থেকে বিরত থাকতেন।
ইবরাহীম নাখঈ এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তার আশপাশে চারজন লোক বসলেই তিনি সেখান থেকে উঠে যেতেন এবং বলতেন, 'আমি ভয় করি, আমার চারপাশে লোকজন জড়ো হয়ে যায় কিনা!'
তারা আমাদের পূর্বসূরি। তারা আমাদের চেয়ে অধিক মুত্তাকী ছিলেন। অধিক সম্মানী ছিলেন। আল্লাহ -র নিকটভাজন পবিত্র মানব ছিলেন। তাদের আমল ছিল আমাদের চেয়ে এখলাসপূর্ণ। আমাদের আমল হয় এমন আয়োজনপূর্ণ, চারপাশে লোক জড়ো হয়ে যায়!
শপথ!
বংশমান নয় কভু সম্মানের পথ
দুনিয়ায় আছে বহু সম্মানী।
কেঁপে উঠবে যখন দেশ-দেশান্তর,
শুকিয়ে যাবে সব তরুলতা;
মান-সম্মান হবে তখন শুষ্ক একটু তৃণখানি!
রাসূল বলেন-
জাহান্নামের আগুন সর্বপ্রথম তিন ব্যক্তি দ্বারা প্রজ্জ্বলিত করা হবে। এমন কারী, যিনি কুরআন পড়েন। আল্লাহ তাকে বলবেন, 'আমি কি তোমাকে কুরআন পড়াইনি? আমি তোমাকে ইলম শিখাইনি? তুমি এসব দিয়ে কী করেছো?
সে বলবে, 'হে আল্লাহ, আমি জাহেলকে শিখিয়েছি।'
আল্লাহ বলবেন, 'কসম, আমি জানি, তুমি মিথ্যা বলেছো।'
ফেরেশতারাও বলবে, 'তুমি মিথ্যা বলেছো।'
আল্লাহ বলবেন, 'তুমি ইলম শিখিয়েছ যেন তোমাকে আলেম বলা হয়। পৃথিবীতে তোমাকে আলেম বলা হয়েছে। (হে ফেরেশতারা) তোমরা তাকে আগুনে নিক্ষেপ কর।'
অতঃপর তাকে চেহারা উল্টিয়ে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। ধনীদের এবং বীরদের সাথেও এমনই আচরণ হবে। [মুসলিম : ১৯০৫]
এর কারণ, আল্লাহ -এর বন্ধুদের প্রথম বৈশিষ্ট্যই হলো এখলাসপূর্ণ আমল। আল্লাহ বলেন-
জেনে রাখ, নিষ্ঠাপূর্ণ এবাদত আল্লাহরই জন্য। [যুমার: ০৩]
তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর এবাদত করবে। [বায়ি্যনাহ: ০৫]
আর যে মৃত ছিল, অতঃপর আমি তাকে জীবিত করেছি এবং তাকে এমন একটি আলো দিয়েছি, যা নিয়ে সে মানুষের মাঝে চলাফেরা করে -সে কি ঐ ব্যক্তির সমতুল্য হতে পারে, যে অন্ধকারে রয়েছে, সেখান থেকে বের হতে পারছে না? এমনিভাবে কাফেরদের দৃষ্টিতে তাদের কাজকর্মকে সুশোভিত করে দেয়া হয়েছে। [আনয়াম: ১২২]
এসব আয়াত ও হাদিস আমাদের এক আল্লাহ -র জন্য আমলের প্রতি আহ্বান করে।
আবু ইসহাক সিরাজী । শাফেঈ মাযহাবের পঞ্চম শতাব্দীর প্রখ্যাত আলেম। তিনি কোন কথা বলার সময় বা পাঠদানের সময় দুই রাকাত সালাত পড়তেন এবং আল্লাহ -র কাছে দোয়া করতেন- ‘হে আল্লাহ, তুমি আমার এ কথা, আমার এ পাঠদান কবুল করো!’
ইবনুল জাওযি বিশ্ব বিখ্যাত একজন ওয়ায়েয ছিলেন। তিনি যখনই মানুষকে কোন নসীহত করতেন, আগে বিনীত হয়ে মাটিতে লুটোপুটি খেতেন, ক্রন্দন করতেন, দোয়া করতেন- 'আল্লাহ, তুমি আমাকে গোপন রেখো। আমার এ নসীহত কবুল করো।'
এটিই হল মূলত আহলুস সুন্নাহর বৈশিষ্ট্য। অন্যদের থেকে আহলুস সুন্নাহর বিশেষত্ব। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-
আল্লাহ যেদিন বান্দাদের আমলের প্রতিদান দিবেন, সেদিন প্রচারপ্রিয় এবাদতকারীদের বলবেন, তোমরা যাদের দেখানোর জন্য এবাদত করেছো, তাদের কাছে যাও। দেখ, তাদের কাছে কোন প্রতিদান পাও কিনা। [মুসনাদে আহমাদ: ২৩১১৯]
📄 এখলাসের পরিচয়
এখলাস বলা হয় কোন কাজে আল্লাহ ব্যতীত আর কারো কাছে নাম-প্রতিদানের আশা না রাখা।
বান্দা এবং আল্লাহ -র মাঝে সৃষ্টিকূলের কোন পর্দা না থাকা। মানুষের গোচরে-অগোচরে একই অনুভূতিতে এবাদত করা।
একাকী এমনভাবে সালাত পড়া, যেন মানুষের সামনে সালাত পড়ছি। মানুষের সামনে এমনভাবে সালাত পড়া, যেন আমি একাই সালাত পড়ছি।
আহলুস সুন্নাহর বৈশিষ্ট্যগুলোর অনন্য একটি হল এখলাস। এখলাস আল্লাহ -র বন্ধুদের সকল বৈশিষ্ট্যের অন্যতম। আল্লাহ-র বন্ধুদের সকল এবাদত আল্লাহ-র জন্য। তাদের সকল চাওয়া-পাওয়া আল্লাহ-র জন্য। তাদের কথা-বার্তা উপদেশ সবই আল্লাহ-র জন্য।
আইয়ূব ইবনে তাইমিয়া সিখতিয়ানী ছিলেন আল্লাহ-র একনিষ্ঠ বন্ধু। তার সামনে উপদেশমূলক হাদিস পাঠ করা হলে তিনি কেঁদে ফেলতেন। তার কাছে মৃত্যুর কথা আলোচনা হলেও তিনি কেঁদে ফেলতেন। অতিরিক্ত ক্রন্দনে তিনি নাক ধরতেন আর বলতেন, 'উফ! কী প্রচণ্ড সর্দি!'
অনেকেই নিজেকে মানুষের কাছে দুনিয়াবিমুখ হিসেবে পরিচিত করতে চায়। ছেঁড়া-তালির জামা পরে। অথচ তার অন্তরে ছেয়ে থাকে দুনিয়ার ছায়া। তার অন্তরে লিপ্সা জাগে রাজত্বের। মনে মনে বাসনা থাকে বাড়ি-গাড়ি আর দোকান-পাটের।
কিন্তু ছেঁড়া-তালি জামার মধ্যে দুনিয়াবিমুখতা নয়। বরং অন্তরের সততা, হারামের অনীহা, অল্পে তুষ্টির মধ্যেই হলো দুনিয়াবিমুখতা।
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ-র বন্ধুদের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য, তারা রাসূল-কে নিজেদের নেতা এবং ন্যায়বিচারক হিসেবে মনে-প্রাণে গ্রহণ করে। আল্লাহ-র রাসূল তাদের কাছে নিজ নিজ ইন্দ্রিয় থেকেও প্রেমানুভূত হয়। আল্লাহ বলেন-
অতএব তোমার পালনকর্তার কসম! সে লোক ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায়বিচারক বলে মনে না করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোন রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা হৃষ্টচিত্তে কবুল করে নেবে। [নিসা: ৬৫]
যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে।' [আহযাব: ২১]
ইমাম মালিক মসজিদে নববীতে মুয়াত্তার পাঠদান করতেন। একদিন তিনি হাদিস পড়াচ্ছেন, এমতাবস্থায় একটি বিচ্ছু তার পায়ে দংশন করতে লাগলো। বিচ্ছুটি একে একে তাকে তেরটি কামড় দিল, কিন্তু তিনি সামান্য নড়াচড়া করলেন না।
হাদিস পাঠদান শেষে তিনি পায়ের নলায় বিচ্ছুর আঘাতগুলো দেখে বিষ প্রতিষেধক দিয়ে ক্ষতস্থানগুলো মুছে নিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হল, 'এতগুলো দংশনের পরও আপনি হাদিসের পাঠদানে বিরতি দিলেন না!'
তিনি বললেন, 'সুবহানাল্লাহ, একটি বিচ্ছুর দংশনে আমি হাদিসের পাঠদানে বিরতি দিবো!'
রাসূলের প্রতি এ কেমন ভালোবাসা!
রাসূলের হাদিসের প্রতি এ কেমন অনুরাগ!
ইবনুল মুসাইয়িব অসুস্থ ছিলেন। তাকে একটি হাদিস জিজ্ঞেস করা হল। তিনি তখন শুয়ে ছিলেন। বললেন, 'তোমরা আমাকে বসাও। আমি শুয়ে শুয়ে রাসূলের হাদিস বর্ণনা করবো! এটি হাদিস বর্ণনার আদর্শ নয়।'
সাহাবায়ে কেরাম মদিনায়, মদিনার আশপাশে রাসূলের কোন স্মৃতিচিহ্ন দেখলে চোখের পানি ছেড়ে দিতেন। কান্না করতেন। তাহলে তারা রাসূলকে দেখলে যেন কেমন করতেন! এ যেন কবির সেই কাব্য-
'লায়লার বাড়ির দেয়াল ঘেঁষে হাঁটছি আমি
এই দেয়ালে ওই দেয়ালে খাচ্ছি চুমি
দেয়ালের প্রেমে পড়ে খাইনি চুমি
দেয়ালের ভেতর আমার জীবন-প্রেমী'
রাসূল মক্কা থেকে হিজরতে বের হচ্ছেন। বারবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছেন আর বলছেন-
উহুদ পাহাড় আমাদের ভালোবাসে, আমরাও উহুদ পাহাড়কে ভালোবাসি। [বুখারি : ৪৪২২]
সুবহানাল্লাহ, পাহাড়ও রাসূলকে ভালোবাসে!
মসজিদে নতুন মিম্বার স্থাপিত হয়েছে। রাসূল ﷺ সে মিম্বারে প্রথম খোতবা প্রদান করবেন। এতদিন মিম্বার হিসেবে ব্যবহার হওয়া পুরতান খেজুরদণ্ডটি আজ থেকে পরিত্যক্ত। রাসূল ﷺ নতুন মিম্বারে দাঁড়ালেন। পরিত্যক্ত খেজুরদণ্ডটি আবেগাপ্লুত হয়ে উঠল! দশমা উটের মতো অনুভূতিশীল হয়ে উঠল! খেজুরদণ্ডটি থেকে শিশুর মতো কান্নার আওয়ায শুরু হয়ে গেল!
রাসূল ﷺ মিম্বার থেকে নেমে এসে খেজুরদণ্ডের উপর হাত রাখলেন। খেজুরদণ্ডের কান্না থামালেন। রাসূলের স্পর্শে খেজুরদণ্ডটি শান্ত হল।
হাসান বসরি বলেন, 'তোমাদের উপর বড়ই আশ্চর্য হতে হয়। একটি খেজুরদণ্ড রাসূলপ্রেমে আপ্লুত হয়ে ওঠে, অথচ তোমাদের কোন ভাবাবেগ নেই!'
উল্লেখ্য, রাসূলপ্রেমে দীনের দাঈ এবং ইলম অন্বেষী এবং আমি নিজেকেও একটি ব্যাপারে সাবধান করছি। অনেকে তাদের অনুসৃত বিভিন্ন মানুষকে ভালোবাসার আতিশয্যে রাসূলের স্থান দিয়ে থাকে। এটি সুস্পষ্ট বাড়াবাড়ি। আল্লাহ বলেন-
হে আহলে কিতাব, তোমরা তোমাদের দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। [নিসা: ১৭১]
এমনও অনেক মানুষ আছেন, যারা রাসূলের চেয়ে অন্যদের স্মরণই বেশি করে থাকে। অনেক বেদয়াতপন্থী প্রেম নিবেদন এবং নেতা মনোনয়নে রাসূলের পরিবর্তে স্বীয় নেতাদের প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তাদের কথাবার্তায় কাজেকর্মে রাসূল ভিন্ন অন্যের প্রতি বেশি ভক্তি প্রকাশ পায়। তাদের ভালোবাসা রাসূল ছাড়া নিজ নিজ নেতাদের প্রতি একটু বেশিই!
কিছু আছে দলান্ধ। যারা কথায়-কাজে রাসূলের চেয়ে দলকে প্রাধান্য দেয়। তারা আপন দলমতের বিরোধীতার অযুহাতে রাসূলের হাদিসও পরিত্যাগ করে।
এই সব ধরণের সীমালঙ্ঘনকারীদের থেকে সাবধান।
আল্লাহ -র বন্ধুগণ এক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করেন। তারা রাসূল ﷺ-কে নিজেদের ইমাম বানিয়েছেন। আমরা যেন আমাদের কথায় কাজে বিশ্বাসে সর্বাবস্থায় রাসূলেরই অনুসরণ করি। দীন প্রচরের ক্ষেত্রে আমরা যেন রাসূল ছাড়া আর কাউকে মাধ্যম না বানাই।
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ -এর বন্ধুদের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য- তাদের রাগ-অনুরাগ সব আল্লাহ -এর জন্য হয়ে থাকে। আল্লাহ -এর বন্ধুগণ মানুষকে ভালোবাসেন আল্লাহ -এর সাথে মানুষের সম্পর্ক বিবেচনা করে। কারো সাথে দূরত্ব রাখেন আল্লাহ -এর সাথে তার দূরত্ব বিচার করে। আল্লাহ বলেন-
তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মুমিনগণ, যারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং বিনম্র। [মায়িদা: ৫৫]
রাসূল বলেন- যে আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসে, আল্লাহর জন্য কারো প্রতি বিরাগভাজন হয়, আল্লাহর জন্য কাউকে কিছু দান করে, আল্লাহর জন্যই কাউকে দান করা থেকে বিরত থাকে, সে অবশ্যই তার ঈমান পরিপূর্ণ করে নিল। [আবু দাউদ: ৪৬৮১, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ৩০৫১৯]
আল্লাহ -এর বন্ধুগণ কারো বংশ মর্যাদায় প্রভাবিত হয়ে তাকে ভালোবাসেন না। কারো বিপুল পরিচিতিতে আকৃষ্ট হয়ে ভালোবাসেন না। কাউকে নিজের মতের, নিজের পথের বা একই শামিয়ানাতলের বলে ভালোবাসেন না।
ইমাম শাফেঈ নিয়মিত ইমাম আহমদ -এর সাথে দেখা করতে যেতেন। কারণ, তারা পরষ্পরকে আল্লাহ -এর জন্য ভালোবাসতেন।
ইমাম শাফেঈ -কে একদিন বলা হলো, আহমদ তো আপনার চেয়ে ছোট। আপনি বড় হয়েও তাকে দেখতে যান!
ইমাম শাফেঈ বললেন-
'লোকে বলে, আহমদ আপনাকে দেখতে আসবে, আপনি কেন?
আমি বলি, সম্মান তার উঁচু মাকাম ছাড়বে না কখনো।'
সে আমাকে দেখতে আসুক; তারই মহত্ব
আমি তাকে দেখতে যাই; তারই মহত্ব
সে আসুক বা আমি যাই, সব তারই মহত্ব।
ইমাম শাফেঈ (রহঃ) আরো বলেন-
আমি নই সৎলোক, ভালোবাসি সৎলোক,
কেয়ামত দিবসে পাবো বলে শাফায়াত।
উভয়ের পণ্য যত হোক বরাবর,
ঘৃণা করি তার যত পঙ্কিল তেজারত।
ইমাম শাফেঈ (রহঃ)-র এই কাব্য যেন আল্লাহ (সুবঃ)-র এই বাণীর জীবন্ত অনুভূতি-
বন্ধুরা সেদিন এক অপরের শত্রু হবে, তবে খোদভীরুরা নয়। [যুখরুফ: ৬৭]
অনেকে নিয়মিত সালাত পড়েন, সওম রাখেন, হজ্জ আদায় করেন, তথাপি তারা পাপাচারীকে ভালোবাসেন। পাপাচারীদের আড্ডা পছন্দ করেন। তাদের রাত্রিজাগরণ, রাতের আলাপন সবই আল্লাহ (সুবঃ)-র দুশমনদের সাথে হয়ে থাকে। আফসোস তাদের জন্য।
মানুষ আল্লাহ (সুবঃ)-কে ভালোবাসে, আল্লাহ (সুবঃ)-র শত্রুকেও ভালোবাসে! মানুষের অন্তরে এমন অসার অনুভূতি কিভাবে জাগে!
আল্লাহর কসম! এমনটা হতেই পারে না। যারা আল্লাহ (সুবঃ)-কে ভালোবাসে, তারা আল্লাহ (সুবঃ)-র বন্ধুদেরও ভালোবাসে। তারা আল্লাহ (সুবঃ)-র দুশমন পাপচারীদের ঘৃণা করে।
ইমাম আহমদ (রহঃ) বলেন, আমি যখন দেখি কোন বৃদ্ধলোক তার দাড়ি মেহেদিরাঙ্গা করেছেন, তখন আমার খুব খুশি লাগে। আমি তাকে ভালোবাসি। কারণ, সে রাসূলের একটি সুন্নত পালন করেছে।
কী আশ্চর্য কথা! শুধু দাড়িতে মেহেদি রাঙ্গানোর সুন্নত পালন করাতেই ইমাম আহমদ একজন লোককে ভালোবেসে ফেলেছেন! তাহলে যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত পড়ে, রমযানে রোযা রাখে, রাসূলের বিরোধীদের শায়েস্তা করে।
করে, রাসূলের সকল সুন্নত আদায় করে, সেই ব্যক্তির প্রতি কতটুকু ভালোবাসা জাগতে পারে!
চতুর্থ বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ -র বন্ধুদের চতুর্থ বৈশিষ্ট্য হল- তাদের অন্তরগুলো অপর মুসলমানের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হয়ে থাকে! আল্লাহ -র বন্ধুদের অন্তরে অপর মুসলমানের প্রতি কোন হিংসা, বিদ্বেষ, ক্লেদ, বক্রতা, ধোঁকা, প্রতারণা কিছুই থাকে না।
অনেকের অন্তরে এসব গোপন রোগ বাসা বাধে। তারা সামান্য কোন অপ্রাসঙ্গিক বা প্রশাখাগত ভেদাভেদ নিয়েও অপরের সাথে হিংসা বিদ্বেষ করে থাকে। আল্লাহ আমাদের এসকল গোপন রোগ থেকে মুক্ত রাখুন।
একদিন রাসূল মসজিদে একটি মজলিসে বসলেন। একজন লোক অজু করে মসজিদে প্রবেশ করল। আগন্তুকের বাঁ হাতে জুতা। দাড়ি থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় অজুর পানি ঝরছে। লোকটি ভিতরে প্রবেশের পূর্বেই রাসূল উপস্থিত সাহাবাদের বললেন, 'এই দরজা দিয়ে তোমাদের কাছে একজন জান্নাতী লোক প্রবেশ করবেন।'
রাসূলের এ কথার পর লোকটি প্রবেশ করলেন এবং দুই রাকাত সালাত পড়লেন।
দ্বিতীয় দিনেও রাসূল মজলিসে বসে বললেন, 'এখনই তোমাদের সামনে একজন জান্নাতী লোক উপস্থিত হবেন।'
তৃতীয় দিনেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো।
সেই মজলিসে ইবনে ওমর উপস্থিত ছিলেন। তার মনে কৌতুহল জাগল, কী এমন এবাদত করে এই ব্যক্তি দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ পেলেন! উৎসুক হয়ে ইবনে ওমর জান্নাতী ব্যক্তির এবাদতের খোঁজখবর নেয়ার জন্য তার কাছে গেলেন। কিন্তু তাকে খুব বিশেষ এবাদত করতে দেখলেন না। খুব বেশি সওম রাখার বা রাত জেগে সালাত পড়ার চিহ্নও লোকটির ভিতর পেলেন না।
ইবনে ওমর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কী এমন এবাদত করেন? আমি রাসূল -কে আপনার ব্যাপারে এই কথা বলতে শুনেছি- 'এই দরজা দিয়ে তোমাদের কাছে একজন জান্নাতী লোক প্রবেশ করবেন!'
লোকটি বলল, 'আমার যা কিছু এবাদত; সালাত, সওম, তাহাজ্জুদ, সবই তো দেখলেন। এরপরও আপনি কিছু জিজ্ঞেস করলে বলবো, আমার রাতদিন কেটে যাচ্ছে, কিন্তু আমার অন্তরে কখনও কোন মুসলমানের প্রতি ধোঁকা, বিদ্বেষ, হিংসাত্মক মনোভাব থাকে না।' [মুসনাদে আহমাদ: ১১২৮৬]
লোকটির এই অবস্থান হল কুরআনে বর্ণিত জান্নাতের সেই সুউচ্চ অবস্থানের প্রতিচিত্র-
তাদের অন্তরে যে ক্রোধ ছিল, আমি তা দূর করে দেবো। তারা ভাই ভাইয়ের মতো সামনা-সামনি আসনে বসবে। [হিজর: ৪৭]
মুমিনের অন্তরে কোন মুসলমানের প্রতি বিদ্বেষ-বৈরিতা থাকে না। এটি মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ মুমিনদের ভাষ্য বর্ণনা করে বলেন, এবং ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রেখোনা। [হাশর: ১০]
(অর্থাৎ মুমিনগণ যেন আল্লাহ -র কাছে এই দোয়া করে।) হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত আল্লাহ -র এই বন্ধু কারা?
আল্লাহ -র এই বন্ধুরা কখনও কোন মজলিসে, আলাপ-আলোচনায় কারো দোষ-ত্রুটি আলাপ করে না। মানুষের ইজ্জত-সম্মান রক্ষা করে। কবির ভাষায়,
তোমার মুখে গোপন কোন আলাপ না হোক কারও।
তোমার গোপন কথা আছে, মুখটি আছে তারও।
আল্লাহ বলেন- তোমরা কেউ কারো গীবত করোনা। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা একে ঘৃণাই করো। [হুজুরাত: ১২]
পঞ্চম বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ -এর বন্ধুদের পঞ্চম বৈশিষ্ট্য- আল্লাহ -এর ফরযসমূহ আদায়ে যথাতৎপর হওয়া এবং অধিকহারে নফল আদায়ে আন্তরিক হওয়া।
ফরযসমূহ যথাসময়ে আদায় করে অধিকহারে নফল ইবাদত করলে, হারামসমূহ থেকে বেঁচে থাকলে সে ব্যক্তি আল্লাহ -এর বন্ধু বলে পরিগণিত হয়। তার ব্যাপারে আল্লাহ সুসংবাদ দিয়েছেন-
মনে রেখো, যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের না কোন ভয়-ভীতি আছে, না তারা চিন্তান্বিত হবে। যারা ঈমান এনেছে এবং ভীত রয়েছে- তাদের জন্য সুসংবাদ পার্থিব জীবনে ও পরকালীন জীবনে। [সূরা ইউনুস: ৬২-৬৪]
রাসূল বলেন- মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘... আমি বান্দার উপর যা ফরয করেছি, তার চেয়ে অধিক প্রিয় কোন এবাদত দ্বারা বান্দা আমার নৈকট্য অর্জন করতে পারে না। আমার বান্দা সবসময় নফল এবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকবে, একসময় আমি তাকে ভালবাসবো। যখন আমি তাকে ভালবাসবো, আমি তার কান হয়ে যাবো, যা দিয়ে সে শোনে। আমি তার চোখ হয়ে যাবো, যা দিয়ে সে দেখে। আমি তার হাত হয়ে যাবো, যা দিয়ে সে ধরে। আমি তার পা হয়ে যাবো, যা দিয়ে সে চলে। [সহিহ বুখারি : ৬৫০২]
আল্লাহ এই হাদিসে অলিদের দুই ভাগ করেছেন।
এক. মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী; মুকতাসিদ।
দুই. কল্যাণের পথে অগ্রগামী; সাবিকুন বিলখাইরাত।
মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী- যিনি আল্লাহ -এর ফরযসমূহ আদায় করেন। কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকেন।
কল্যাণের পথে অগ্রসর- যিনি ফরযসমূহ আদায় করার পাশাপাশি অধিকহারে নফল এবাদত করে আল্লাহ -এর নৈকট্য অর্জন করেন। কবীরা গুনাহ থেকে বাঁচার পাশাপাশি সগীরা গুনাহ এবং মাকরুহ গুনাহ থেকেও বেঁচে থাকেন।
এক যুবক রাসূল ﷺ-র কাছে এসে বলল, 'আল্লাহর রাসূল, আমি বেহেশতে আপনার সঙ্গ চাই।'
রাসূল বললেন, 'আর কিছু?'
যুবক বলল, 'এটাই।'
রাসূল ﷺ বললেন, 'বেশি বেশি সেজদা কর।' [সহিহ মুসলিম : ৪৮৯]
অর্থাৎ, বেশি বেশি নফল এবাদত কর। আল্লাহ ﷺ-র বন্ধু হতে পারবে। জান্নাতেও যেতে পারবে।
নফল এবাদত বিভিন্নভাবে করা যায়। সালাত, সওম, যিকর, দান-সদকা, সবকিছুতেই নফল এবাদত রয়েছে। কার জন্য কোন এবাদত বেশি উপকারী, অন্তরকে বেশি বিগলিত করে, আল্লাহ ﷺ-র বন্ধু হওয়ার মতো বান্দা বানাতে পারে, তা সে নিজেই ভালো জানে। যার জন্য যে এবাদতটি বেশি উপকারী, সে যেন সেই এবাদতটিই বেশি বেশি করে।
আল্লাহ ﷺ-র বন্ধুদের বৈশিষ্ট্য হল- নফল এবাদতে অধিক গুরুত্ব দেয়। আল্লাহ ﷺ-র বন্ধুরা সকালে সালাতে থাকে। দ্বিপ্রহরে রোযারত থাকে। আবার রাতে জেগে এবাদত করে।
ষষ্ঠ বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ ﷺ-র বন্ধুদের ষষ্ঠ বৈশিষ্ট্য- এতেকাদ ও বিশ্বাস লালনে সালাফের অনুসরণ করেন। পূর্ববর্তীদের মধ্যে যারা কুরআন-হাদিসের সঠিক ধারণকারী, তাদের অনুগমন করেন। শরীয়তের চাহিদা বিরোধী কোন বিদয়াত পন্থার আবিষ্কার বা অনুসরণ করে না।
অনেকে দৈনিক পাঁচশ রাকাত নফল সালাত পড়ে, কিন্তু মত ও পথে তারা বিদয়াতী। দীনের চাহিদা বিরোধী নতুন কোন মত ও পথের আবিষ্কারক। দীনের ভুল ব্যাখ্যা প্রদানকারী, বিকৃতকারী। পথচ্যুত, মতভ্রষ্ট।
আল্লাহ ﷺ-র কাছে গ্রহণযোগ্য এবাদতের জন্য চেতনায় ও বিশ্বাসে নিরাপদ, খাঁটি, অক্ষত ও পূর্ণাঙ্গ হতে হয়। রাসূল ﷺ তাওহিদের যেসব পয়গাম দিয়েছেন; আল্লাহ -র নাম-ধাম, কেয়ামতের বিশ্বাস ইত্যাদিতে আহলুস সুন্নাহ ওয়ালজামায়াতের অনুসারী হতে হয়ে।
এই বৈশিষ্ট্যটি আল্লাহ -র বন্ধুদের গূঢ় মহত্বময় একটি বৈশিষ্ট্য। যারা বিদয়াতী, যুগে যুগে রাসূলের পথ ও পদ্ধতির বিরোধীতা করে, চেতনা ও বিশ্বাসে রাসূলের আদর্শের বাইরে চলে, এই বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে তাদের মাঝে এবং আল্লাহ -র খাঁটি বান্দাদের মাঝে পার্থক্য নিরূপিত হয়। আল্লাহ -র বন্ধুগণ কুরআন ও সুন্নাহ থেকে তাদের আকীদা-বিশ্বাস স্থির করেন। আহলুস সুন্নাহ ওয়ালজামায়াতের কুরআন-হাদিসের ব্যাখ্যামূলক নির্ভরযোগ্য রচনাবলী থেকে নিজেদের চেতনা ও চৈতন্য স্থাপন করেন। আকীদা-বিশ্বাসের ভিত্তি স্থাপনে বৈজ্ঞানিক অসার কল্পকথা অথবা আহলে কালামের উদ্ভট বেহুদা বকওয়াস থেকে আল্লাহ -র বন্ধুরা দূরত্ব বজায় রাখেন।
আল্লাহর বন্ধুরা কুরআন-সুন্নাহ থেকে অর্জিত আকীদা-বিশ্বাস ও তাওহিদের মর্মকথার দাওয়াত প্রচার করেন। তারা মানুষের জীবনে তাওহিদ স্থাপন এবং দুনিয়াপন্থী সকল বিদয়াত বর্জনের দাওয়াত দিয়ে থাকেন নবী-রাসূলদের মতো। বক্তৃতায় লিখনীতে এই হয়ে থাকে তাদের আলোচনার আধ্যেয়।
সপ্তম বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ -র বন্ধুদের সপ্তম বৈশিষ্ট্য- সৎকাজে আদেশ এবং অসৎকাজে নিষেধ করা। মানুষকে ভালো কাজে উৎসাহ প্রদান করা। ইলম ও জ্ঞান নিয়ে অকৃপণ থাকা।
আল্লাহ বলেন-
আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত, যারা আহ্বান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভালো কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে। আর তারাই হল সফলকাম। [আলে ইমরান: ১০৪]
তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত। মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে, অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। [আলে ইমরান: ১১০]
যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে আমি একজন আজ্ঞাবহ, তার কথা অপেক্ষা উত্তম কথা আর কার? [হা-মীম সিজদাহ: ৩৩]
বনী ইসরাঈলের মধ্যে যারা কাফের, তাদেরকে দাউদ ও মরিয়মতনয় ঈসার মুখে অভিসম্পাত করা হয়েছে। এটা এ কারণে যে তারা অবাধ্যতা করত এবং সীমালঙ্ঘন করত। তারা পরস্পরকে মন্দ কাজে নিষেধ করতো না, যা তারা করতো। তারা যা করতো তা অবশ্যই মন্দ ছিল। [মায়িদাহ: ৭৮, ৭৯]
কসম যুগের, নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে গুরুত্ব দেয় সত্যের এবং গুরুত্ব দেয় সবরের। [আসর : ১-৩]
এই উম্মতের ওলামায়ে কেরام সাধারণ মানুষের মতই। আহলে সুন্নাহ ওলামায়ে কেরام কখনও ঘরে বসে থাকেন না। দীন প্রচারের অবারিত দরজা বন্ধ রেখে ঘরকুণে হয়ে থাকেন না। তারা দীনের প্রচার নিয়ে ঘুরতে থাকেন মসজিদে-মসজিদে, রাস্তাঘাটে, অলিতে-গলিতে, সহকর্মীদের সাথে, সভা- সঙ্ঘে, আড্ডায়-সেমিনারে, শিক্ষাঙ্গনে।
আহলে সুন্নাহ ওলামায়ে কেরام মানুষকে দীন শিখান। আল্লাহ তাদের যে ধন-সম্পদ দেন, দীন শিখানোর জন্য তা ব্যয় করেন। ইলম নিয়ে কার্পণ্য করেন না। বনী ইসরাঈলের মতো ঘরে বসে থাকেন না। বনী ইসরাঈলের অবস্থা আল্লাহ স্বয়ং বর্ণনা করেন-
এবং তারা গোপন করে সেসব বিষয়, যা আল্লাহ তাদের দান করেছেন স্বীয় অনুগ্রহে। [নিসা: ৩৭]
ইমাম যুহরী। তিনি মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতেন। মানুষকে হাদিস শিখাতেন।
ওরওয়া ইবনে যুবাইর। তিনি মানুষকে স্বর্ণ-রূপা, টাকা-পয়সা দান করতেন আর বলতেন, 'লোকসকল! এসো, আমার কাছে হাদিস শোনো।' তিনি মানুষকে হাদিয়া প্রদান করতেন হাদিস শোনানোর জন্য।
যারা মানুষের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন মাসআলা প্রদানের জন্য মানুষের পিছু পিছু কষ্ট স্বীকার করে, তাদের অবস্থান কেমন হতে পারে!
অষ্টম বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ -এর বন্ধুদের অষ্টম বৈশিষ্ট্য- তারা জামায়াত ভালোবাসেন। ঐক্য ভালোবাসেন। বিচ্ছিন্নতা ঘৃণা করেন। বিচ্ছিন্নতা দূর করে একতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।
যেসব সংকীর্ণমনা দল-বল উম্মতের মাঝে অনৈক্যের সৃষ্টি করে, উম্মতের মাঝে বিবাদ-বিক্ষিপ্ততা উস্কে দেয়, তাদের কোন তৎপরতা বা উদ্যোগ দীনের উদ্যোগ নয়। দীনের অন্তর্ভুক্ত নয়।
আল্লাহ -এর বন্ধুরা আহলে সুন্নাহর অনুসৃত পথ ভালোবাসেন। তাদের মাঝে কোন পার্থক্য করেন না। এমন নয়, যে আমার মত গ্রহণ করবে, তাকে ভালোবাসবো। যে আমার মতবিরোধী হবে, তাকে প্রত্যাখ্যান করবো।
সকল মুসলমান মূলত একই জামায়াত। তাদের মাঝে বিক্ষিপ্ততা অগ্রহণযোগ্য। দীনকে একটি দৃষ্টিভঙ্গিতে সীমাবদ্ধ করা অগ্রহণযোগ্য। নির্দিষ্ট কোন গবেষণায় আটকে রাখা অগ্রহণযোগ্য।
আহলে সুন্নাহর অনুপম বৈশিষ্ট্য- তারা ঐক্যে প্রত্যাশী।
বিদয়াতীদের বৈশিষ্ট্য- তারা আলেমদের অপবাদযুক্ত করতে খুব তৎপর। এসব করে তারা খুব খুশি। বিদয়াতীরা ঐক্য অপছন্দ করে। বিক্ষিপ্ততা ভালোবাসে। আল্লাহ -এর বন্ধুদের অর্থাৎ আহলুসসুন্নাহ ওয়ালজামায়াতের বিরোধিতার প্রয়াশে আনন্দ পায়।
নবম বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ -এর বন্ধুদের নবম বৈশিষ্ট্য- পরস্পর মতভিন্নতার সময় তারা কুরআন-সুন্নাহয় মনোনিবেশ করে। কোন মাসআলায় মতবিরোধ হলে কিতাব এবং সুন্নাহ থেকেই এর সমাধান বের করার প্রয়াস পায়। আল্লাহ বলেন-
তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ কর, তার ফয়সালা আল্লাহর কাছে সোপর্দ। [শূরা: ১০]
আল্লাহ -র বন্ধুরা বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো আল্লাহর কাছেই সমর্পণ করেন। আল্লাহর কাছে দোয়া করেন-
اللَّهُمَّ رَبَّ جِبْرَائِيلَ وَمِيْكَائِيلَ وَإِسْرَافِيْلَ فَاطِرَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ عَالِمَ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ أَنْتَ تَحْكُمُ بَيْنَ عِبَادِكَ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ اهْدِنَا لِمَا اخْتُلِفَ فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِكَ إِنَّكَ تَهْدِي مَنْ تَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ
হে জিবরাইল মিকাইল ইসরাফীলের প্রভু, আসমান ও যমিনসমূহের সৃষ্টিকর্তা, প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সকল বিষয়ের সর্বজ্ঞাতা, আপনি আপনার বান্দাদের বিবাদমান বিষয়ে ফায়সালা করুন। আমাদের বিবাদমান বিষয়ে আপনার নির্দেশনায় হকের সন্ধান দিন। আপনিই সরল পথের দিকে পৌঁছান। [সহিহ মুসলিম : ৭৭0]
দশম বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ -র বন্ধুরা সদা হক কথা বলেন। প্রবৃত্তির কোন চাহিদা তাদের মুখের হক কথা বারণ করতে পারে না।
বর্ণিত হয়েছে- রাসূল আল্লাহর কাছে দোয়া করে বলতেন, 'হে আল্লাহ, আমি প্রকাশ্যে গোপনে (সর্বাবস্থায়) অন্তর জুড়ে তোমার ভয় প্রার্থনা করি। আমি রাগে সন্তোষে (সর্বাবস্থায়) হক কথা বলার তওফিক প্রার্থনা করি।' [নাসাঈ : ১৩০৫, ১৩০৬]
মানুষ ভাই, বন্ধু, সহপাঠীর সাথে রাগ হয়। প্রবৃত্তির ধোঁকায় পড়ে তাদের অবান্তর ও অনুপস্থিত দোষত্রুটি চর্চা করে। আবার যখন তার উপর সন্তুষ্ট থাকে, তখন তার ভিতর উপস্থিত ও উল্লেখ্য দোষত্রুটিও ভুলে যায়।
কবির ভাষায়-
প্রেমের চোখে ঢাকা পড়ে দোষগুলো তার; রাতের মতো।
রাগের চোখে প্রকাশ করে দোষগুলো তার শত শত।
আমরা আল্লাহ -র কাছে দোয়া করি মধ্যমপন্থার। আল্লাহ বলেন-
হে ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক, আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান কর। [নিসা: ১৩৫]
আল্লাহ বলেন-
আপনার প্রতিপালকের বাক্য পূর্ণ সত্য ও সুষম। [আনয়াম: ১১৫]
এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার কর। এটাই আল্লাহভীতির অধিক নিকটবর্তী।' [মায়েদা: ০৮]
তোমরা কারো উপর রাগান্বিত থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে অন্যায় ও মিথ্যা ফায়সালা গ্রহণ করো না। তোমরা ন্যায়বিচারক হও।
আল্লাহ -এর বন্ধুদের দশটি বৈশিষ্ট্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হল। একটু চিন্তা করলেই এই দশ বৈশিষ্ট্যের আড়ালে আরও অনেক বৈশিষ্ট্য বেরিয়ে আসবে।
আল্লাহ -এর কাছে আমার জন্য এবং আপনাদের জন্য দোয়া করি, আমরা যেন এই দশ বৈশিষ্ট্যে নিজের জীবন শোভামণ্ডিত করতে পারি। বৈশিষ্ট্যগুলোর দাবি জীবনভর পালন করতে পারি। নিজেদের যেন আল্লাহ -এর বন্ধু বানাতে পারি।