📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 সূরা বাকারার ফযীলত

📄 সূরা বাকারার ফযীলত


ইমাম কুরতুবী বলেন, এই সূরায় একশটি আদেশ, একশটি নিষেধ এবং আরো একশ বার্তা রয়েছে।
যে ঘরে সূরা বাকারা তেলাওয়াত হয়, সে ঘর থেকে শয়তান বিতাড়িত হয়। রাসূল ইরশাদ করেন-
তোমরা কোরআনের দুই কুসুমাংশ তেলাওয়াত করো- সূরা বাকারা এবং সূরা আলে ইমরান। সূরা দু'টি কেয়ামতের দিন মেঘের দু'টুকরো ছায়া হয়ে অথবা সারিবদ্ধ কোন পাখির ঝাঁকের মতো আত্মপ্রকাশ করে তার তেলাওয়াতকারীকে ছায়া দান করবে। [মুসলিম : ৮০৪]
আনাস বলেন, কোন সাহাবি যদি সূরা বাকারা মুখস্থ করতো, সে অন্যদের চেয়ে অগ্রজ, দলপতি ও ইমাম হওয়ার যোগ্যতা রাখতো।
রাসূল ﷺ একটি সারিয়‍্যা (যে যুদ্ধদলে রাসূল অংশগ্রহণ করেননি) আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার জন্য পাঠালেন। পাঠানোর সময় তাদের আমির নির্ধারণ করার জন্য জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমাদের মধ্যে কোরআন বেশি শিখেছে কে?' জনৈক সাহাবি বললেন, 'আমি সূরা বাকার শিখেছি।' রাসূল বললেন, 'তুমি সূরা বাকারা শিখেছ?' সাহাবি বললেন, 'জী, আল্লাহর রাসূল!' রাসূল বললেন, 'ঠিক আছে, তুমিই দলের আমির।' [মুস্তাদরাকে হাকিম : ১৬২২]
রাসূল ইরশাদ করেন- তোমরা তোমাদের ঘরগুলো কবরে পরিণত করোনা। যে ঘরে সূরা বাকারা তেলাওয়াত হয়, সে ঘরে শয়তান প্রবেশ করেনা। (তিরমিযী গ্রন্থে হাসান সনদে বর্ণিত) [মুসলিম : ৭৮০]
এক নেককার বান্দা তার ঘরে জিনের উপদ্রব পেয়েছিল। ওলামায়ে কেরام তাকে সূরা বাকারা তেলাওয়াত করতে বললেন। তিনি যখন সূরা বাকারা তেলাওয়াত করলেন, আল্লাহ-র হুকুমে তার ঘর থেকে জিন তাড়িত হল।

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 আয়াতগুলোর গভীর বার্তা

📄 আয়াতগুলোর গভীর বার্তা


আলিফ লাম মীম; এ হরফগুলোর কী এমন তাৎপর্য, যা দিয়ে আল্লাহ সূরা বাকারা শুরু করেছেন! এগুলো সেই মুজিযা, যা দিয়ে আল্লাহ আরবের কবি-সাহিত্যিকদের চ্যালেঞ্জ করেছেন। আল্লাহ তার কিতাব দিয়ে কাফেরদের অহঙ্কার মলীন করেছেন। শ্রেষ্ঠ বাগ্মীদের মুখে কুলুপ লাগিয়েছেন। বড় বড় কবিদের বাকহারায় পরিণত করেছেন।
প্রত্যেক উম্মতের কিছু বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য থাকে। আল্লাহ সমকালীন নবীদের সেই বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্যকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য প্রেরণ করেছেন।
মুসা-র উম্মত যাদুবিদ্যায় অনেক কৌশলবাজ হয়ে উঠেছিল। আল্লাহ মুসা-কে এক জিয়নকাঠি দান করলেন। উম্মত যা কিছু যাদুকুশল অর্জন করেছিল, মুসা-র জিয়নকাঠির এক ঝলকে সব এক নিমিষে হাওয়া হয়ে গেল।
ঈসা-র উম্মত চিকিৎসা ও টেকনোলজিতে কালের সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করেছিল। আল্লাহ ঈসা-কে কুষ্ঠ ও অন্ধত্ব থেকে মুক্তি দানের অলৌকিকতা দান করেছিলেন। মৃতকে জীবিত করার মুজিযা দান করেছিলেন।
প্রসঙ্গত আমার কসীদায়ে বুরদার মতো একটি কবিতা বানানোর শখ হল-
তোমার ভাই ঈসা ডাকল এক মৃতকে, অমনি সে উঠে দাঁড়ালো! আর তুমি জীবিত করেছ কতো প্রজন্মকে, কালের ক্ষয় আর পচন থেকে!
আল্লাহ বলেন- আর যে মৃত ছিল, অতঃপর আমি তাকে জীবিত করেছি এবং তাকে এমন একটি আলো দিয়েছি যা নিয়ে সে মানুষের মধ্যে চলাফেরা করতে পারে; -সে কি ঐ ব্যক্তির সমতুল্য হতে পারে, যে অন্ধকারে রয়েছে, সেখান থেকে বেরুতে পারছে না! [আন'আম: ১২২]
মক্কার কাফেররা রাসূলের তেলাওয়াত শুনতো। তারা আরবী ভাষার অলঙ্কার শৈলী ভালোই জানতো। এজন্য কোরআনের ভাষাশৈলী এবং মুজিযা তারা বুঝতো। তারা ভয় পেয়ে গেল, কোরআন অবশ্যই আমাদের প্রভাবিত করবে।
তুফাইল ইবনে আমর বলেন, 'আমি তখনও মক্কার কাফের ছিলাম। আমি আমার কানে তুলা বুজে রাখতাম। একদিন রাসূল কাবার পাশে তিলাওয়াত করছেন। আমি যখন তার কাছাকাছি আসলাম এবং তার তিলাওয়াতের আওয়ায স্পষ্ট শুনলাম, মনে মনে ভাবলাম- আশ্চর্য! আমি একজন কবি ও সাহিত্যিক। আমি কেন তার তেলাওয়াত শুনছি না! আমি তার তেলাওয়াত শুনবো। তেলাওয়াত যদি আমাকে আচ্ছন্ন করে, তবে তো বেশ! আর যদি আচ্ছন্ন না করে, তাহলে বুঝবো কোরআন আসলে যাদু।'
আমি তার তেলাওয়াত শুনতে লাগলাম। আমার আরও শুনতে মন চাইল। কান থেকে তুলা ফেলে দিলাম। আল্লাহর কসম, তখন কোরআন আমার অন্তরে অঙ্কিত হয়ে গেল।
অতঃপর আমি রাসূলের কাছে গেলাম। রাসূলের সামনে বললাম, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল।' [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৩/৯৯]
জুবাইর ইবনে মুতঈম (রাঃ)। তিনি ছিলেন মক্কার নেতৃস্থানীয় একজন। তিনি কসম করেছিলেন, কোরআনের একটি আয়াতও তিনি শুনবেন না।
সব আল্লাহরই ইচ্ছা। আল্লাহ (সঃ) যুবাইরকে দোযখ থেকে নিষ্কৃতি দিতে চাইলেন। একদিন রাসূল (সঃ) হারামের ভিতর কোরআন তেলাওয়াত করছেন। যুবাইর শুনলেন। রাসূল (সঃ) মাগরিবের সালাত আদায় করছেন। তার তিলাওয়াতের আওয়াযও ছিলো সজোরে-
وَالطُّورِ ﴿١﴾ وَكِتَبٍ مَسْطُورٍ ﴿٢﴾ فِي رَقٍ مَنْشُورٍ ﴿٣﴾ وَالْبَيْتِ الْمَعْمُورِ ﴿٤﴾ وَالسَّقْفِ الْمَرْفُوعِ ﴿٥﴾
শপথ তূর পর্বতের, এবং লিখিত কিতাবের, প্রশস্ত পত্রে, কসম বাইতুল মামুরের তথা আবাদ গৃহের, এবং সমুন্নত ছাদের...' [সূরা আত-তুর: ০১-০৫]
যুবাইর বলেন, তেলাওয়াত শুনে আমার অন্তর যেন উড়ে উড়ে যাচ্ছিল! রাসূলের তেলাওয়াত শুনে যুবাইর সাথে সাথে ঈমান আনলেন।
হারেস ইবনে কালাদা। বিচক্ষণ একজন দার্শনিক। বে-ঈমান। সে কোরআনের মতো একটি কিতাব রচনায় উদ্যোগ নিল।
হীতাকাঙ্ক্ষীরা তাকে এ কাজ থেকে বারণ করেছিল। হারেস কারও কথা শোনেনি। সে তার একগুয়েমিতে অটল রইল।
কোরআনের মত আরেকটি কিতাব রচনা শুরু করল। উদ্যত হারেসের তার দৃষ্টি পড়ল সূরা মায়েদার এই আয়াতের উপর-
মুমিনগণ, তোমরা অঙ্গিকারসমূহ পূর্ণ করো। তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তু হালাল করা হয়েছে, যা তোমাদের কাছে বিবৃত হবে তা ব্যতীত। কিন্তু ইহরাম বাঁধা অবস্থায় শিকারকে হালাল মনে করোনা। নিশ্চয় আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, নির্দেশ দেন। [মায়েদা: ০১]
হারেস এই আয়াত দেখে হতভম্ব হয়ে গেল। সে বলল, এ কেমন আয়াত! একই আয়াতে প্রথমে আহ্বান, অতঃপর আদেশ! আবার আদেশ থেকে ব্যতিক্রম বিধান! প্রশংসা! বৈশিষ্ট্য বর্ণনা! একই আয়াতে এতকিছু!
হারেস বোকা বনে গেল। এক পর্যায়ে তার অর্ধেক শরীর অবস হয়ে গেল। এটি ছিল তার দুনিয়ার শাস্তি। আল্লাহ বলেন- নিশ্চয় আখিরাতের শাস্তি আরও লাঞ্ছনাকর, আর তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না। [ফুসসিলাত: ১৬]
আবুল আলা আল-মারি। অত্যন্ত বিচক্ষণ একজন লোক। ঈমান গ্রহণের তাওফিক হয়নি তার। সে কোরআনকে পরীক্ষা ও যাচাইবাচাই করতে উদ্যত হয়েছিল।
আবুল আলা আল-মারির মৃত্যু হল। দাফনের পর কোন এক কারণে তার কবর খোলার প্রয়োজন হল। কবর খুলতেই দেখা গেল তার মুখের উপর একটি সাপ, লেজ দিয়ে তার দুই পা পেঁচিয়ে ধরে রেখেছে!

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 ‘আলিফ লাম মীম’

📄 ‘আলিফ লাম মীম’


আয়াতে এ হরফগুলোর উদ্দেশ্য নির্ণয়ে ওলামায়ে কেরام মতভিন্নতা করেছেন। মূলত আল্লাহ -ই এর উদ্দেশ্য সর্বাধিক জ্ঞাত আছেন।
নব-আবিষ্কৃত কিছু দল এ হরফগুলোর উদ্দেশ্য নির্ণয়ে বলে থাকে-
أَلِفْ : أَلَّفَ اللهُ مُحَمَّدًا فَبَعَثَهُ نَبِيًّا
আলিফ অর্থ আল্লাহ মোহাম্মদকে মনোনীত করেছেন, অতঃপর তাকে নবী বানিয়ে পাঠিয়েছেন।
لَامْ : لَامَ اللهُ الْمُشْرِكِينَ
লাম অর্থা আল্লাহ মুশরিকদের ধিকৃত করেছেন।
মীম অর্থ আল্লাহ তার বিরোধীদের তিরস্কার করেছেন।
এসব ব্যাখ্যা মূলত নির্বোধদের নিরর্থক ব্যাখ্যা। এসব ব্যাখ্যার কোন ভিত্তি নেই।
অনেকে বলেন, আলিফ লাম মীম হরফগুলো একত্র করলে অসংখ্য অর্থবোধক শব্দ প্রমীত হয়। এই ব্যাখ্যাটি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করা হয়।
মূল কথা হল, এসব হরফ আল্লাহ আরবদের সামনে রেখেছেন তাদেরকে অবাক করার জন্য। আল্লাহ হরফগুলো তাদের সামনে রেখে বলেছেন, তোমরা সাধ্য থাকলে কোরআনের অনুরূপ কিছু তৈরি কর। যোগ্যতা থাকলে কোরআনের ছাঁচে কিছু রচনা কর।
কোরাইশের অন্যতম সাহিত্যিক ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা। একবার সে কোরআন শুনে বলল, 'আল্লাহর কসম, এই কোরআনের উপরিভাগ প্রাচুর্যপূর্ণ, আর নিম্নভাগ হল পল্লবিত। এই কোরআনে রয়েছে বিশেষ মিষ্টতা, রয়েছে বিশেষ মাধুর্যতা। এই বৈশিষ্ট্যগুলো মহান এই কিতাবের মুজিযা। যিনি এই কিতাব নাযিল করছেন, তিনি কতো মহান!'
এ সেই কিতাব। [বাকারা: ০২]
আয়াতাংশ মূলত কোরআনের প্রশংসা।
আল্লাহ এখানে 'এ সেই কোরআন' বলেননি, 'এ সেই কিতাব' বলেছেন। কেমন যেন এটাই শুধু কিতাব, অন্য কিতাব কোন কিতাবই নয়। যেমন আমরা কারো প্রশংসায় বলে থাকি, 'এ সেই ব্যক্তি' 'এ সেই সাহসী'। অর্থাৎ এই ব্যক্তি অন্যান্য ব্যক্তির মত নয়।
যাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। [বাকারা: ০২]
সুতরাং এই কিতাবে কোন যালিম ব্যতীত আর কেউ সন্দেহ করতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন-
এতে মিথ্যার প্রভাব নেই, সামনের দিক থেকেও নেই এবং পেছন দিক থেকেও নেই। এটা প্রজ্ঞাময় প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। [ফুসসিলাত: ৪২]
যে ব্যক্তি কোরআনের উপর আমল করল, সে প্রতিদানপ্রাপ্ত হল। যে ব্যক্তি কোরআন অনুযায়ী বিচার করল, সে ইনসাফ করল। যে ব্যক্তি কোরআন অনুযায়ী চলল, সে সরল-সঠিক পথের উপর চলল।
۞هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ ﴿٢﴾
এই কিতাব পথ প্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য। [বাকারা: ০২]
কুরআন মানুষের পথ প্রদর্শনকারী, হেদায়াতের বাহন। এই পথ প্রদর্শনের দুটি পর্যায় রয়েছে। একটি হল শুধুই পথ দেখানো। যা রাসূল-র মাধ্যমে হয়েছে, এবং দীনের প্রত্যেক দাঈর মাধ্যমে হচ্ছে।
অপরটি হলো হেদায়াতের তাওফিক। বান্দার হেদায়াত গ্রহণ। এটি শুধু আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে। যেমন কোরআনে বর্ণিত হয়েছে-
আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না, তবে আল্লাহই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন। কে সৎপথে আসবে সে সম্পর্কে তিনিই ভালো জানেন। [কাসাস: ৫৬]
আল্লাহ বলেন-
۞هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ ﴿٢﴾
এই কিতাব পথ প্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য। [বাকারা: ০২]
লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ মুসলমানদের জন্য পথ প্রদর্শনকারী না বলে পরহেযগারদের বা মুত্তাকীদের জন্য পথ প্রদর্শনকারী বলেছেন। কারণ মুসলমানদের অনেক স্তর রয়েছে। অনেক মুসলমান কবিরা গোনাহে লিপ্ত থাকে। কোরআন তাদের জন্য ব্যাপক ও পরিপূর্ণ হেদায়াত নয়। অনেক মুসলমান আবার হরহামেশাই আল্লাহ-র অবাধ্যতায় মত্ত থাকে। কোরআনের ব্যাপক হেদায়াতে তারা অন্তর্ভুক্ত নয়। এজন্যই আল্লাহ মুত্তাকীদের জন্য পথ প্রদর্শনকারী বলেছেন। কোরআন তাদেরকেই সবচেয়ে বেশি হেদায়াত দিয়ে থাকে। মুত্তাকীগণ নিজেদের কোরআনের আলোকে যাচাই করে চলেন। কোরআনের আদেশসমূহ পালন করেন, নিষেধসমূহ থেকে বেঁচে থাকেন। কোরআনের স্পষ্ট বিষয়াদিতে ঈমান রাখেন, অস্পষ্ট বিষয়সমূহ আল্লাহ -র কাছে সমর্পন করেন।
পরহেযগার বা মুত্তাকীর উদ্দেশ্য হল যারা তাকওয়া অর্জন করেছেন। আল্লাহ -র এক নূরকে তারা ভয় করেছেন। নূরের রশ্মি ধরে আল্লাহ -র রহমতের আশা রেখেছেন। নূরের জ্যোতি ধরে নেক কাজ করেছেন, সাওয়াবের আশা রেখেছেন। নূরের তাজাল্লীতে পাপকাজ থেকে বেঁচে রয়েছেন, আল্লাহ -র আযাব ও গযবকে প্রাণপণে ভয় করেছেন।
তাকওয়ার অর্থ হল আদিষ্ট দায়িত্ব পালন করা। নিষিদ্ধ পথ পরিহার করা। আল্লাহ -র বাণীসমূহে অন্তরমম বিশ্বাস রাখা।
তাকওয়ার অর্থ হল আল্লাহ -র আনুগত্যসহ নেককাজ করা এবং পাপকাজ ত্যাগ করা।
আলী বলেন, মহামহিম আল্লাহ -র ভয়, তার অবর্তীর্ণ বিষয়ে আমল, অল্পেতুষ্টি এবং মৃত্যুর প্রস্তুতির নাম হল তাকওয়া।
ইবনে মাসউদ বলেন, কখনও আল্লাহ -কে না ভুলে তার স্মরণে নিজেকে উজ্জীবিত রাখা। আল্লাহ -র অবাধ্য না হয়ে তার আনুগত্যে সদা নীত থাকা। আল্লাহ -র নেয়ামতের অস্বীকার না করে তার কৃতজ্ঞতায় সর্বদা নুয়ে থাকা।
তাকওয়ার অর্থ হল আল্লাহ -র আযাব ও বান্দার মাঝে একটি আড় তৈরি করা।
ওমর উবাই ইবনে কাবকে বললেন, 'আমাকে তাকওয়ার পরিচয় শোনাও।'
উবাই বললেন, 'আপনি কাঁটা বিছানো রাস্তায় হেঁটেছেন কখনও?'
ওমর বললেন, 'হ্যাঁ, হেঁটেছি।'
উবাই বললেন, 'কীভাবে হেঁটেছেন?'
ওমর বললেন, 'খুব সতর্ক হয়ে কাপড় গুটিয়ে হেঁটেছি।'
অদৃশ্যে ঈমান আনাই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে অদৃশ্যে ঈমান আনবে না, তার থেকে আল্লাহ কোন কিছুই কবুল করবেন না। তার দিকে আল্লাহ ফিরেও তাকাবেন না। তাকে পরিশুদ্ধও করবেন না। তার জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি।
যারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে। [বাকারা: ০৩]
সালাত প্রতিষ্ঠা করা মুত্তাকীদের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য।
আল্লাহ যেখানেই মুমিনদের কথা আলোচনা করেছেন, সেখানেই সালাত প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। আর যেখানে মুনাফিকদের কথা বলেছেন, সেখানে বলেছেন সালাত পড়ার কথা।
সালাত আদায়কারী ব্যক্তি দুই ধরণের হয়ে থাকে। এক ধরণের লোক সালাত প্রতিষ্ঠা করে। আরেক শ্রেণীর লোক সালাত শুধু আদায় করে। যারা সালাত শুধু আদায় করে, সালাত তাদেরকে গর্হিত ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে না। আর যারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে, তাদের সালাত তাদেরকে অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে। আল্লাহ বলেন-
নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে। [আনকাবূত: ৪৫]
অনেকেই আশ্চর্য প্রকাশ করেন, কোন ব্যক্তি সালাতও পড়ছেন, খারাপ কাজও করছেন! কোন ব্যক্তি সালাতও পড়ছেন, আবার যিনা-চুরির মতো অপরাধও করছেন! এর কারণ হলো, তিনি সালাত শুধু আদায় করছেন, প্রতিষ্ঠা করছেন না। সালাত তাদেরকেই অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে, যারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে থাকে।
সালাত প্রতিষ্ঠার অর্থ হল, সালাতের খুশু-খুযূর প্রতি গুরুত্ব রাখা। অযু, এখলাস, রুকু, সেজদা, সালাতের সকল যিকির-আযকারের প্রতি গুরুত্বশীল থাকা।
আর আমি তাদেরকে যে রুযি দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে। [বাকারা: ০৩]
এটি মুত্তাকীদের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য।
অর্থাৎ, আমি যা রিযিক দিয়েছি, তা থেকে সব নয়, কিছু কিছু খরচ করে। আল্লাহ যদি বলতেন, 'আমি যা রিযিক দিয়েছি, তাই ব্যয় করে' -তাহলে বান্দার উপর সাধ্যাতীত কষ্ট হয়ে দাঁড়াতো। কারণ, কোন মানুষের পক্ষেই সকল রুযি আল্লাহ -র রাস্তায় খরচ করা সম্ভব নয়।
আয়াতে বেশি বেশি খরচ করার প্রশংসা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন-
যারা স্বীয় ধন-সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে, ব্যয় করার পর সে অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে না এবং কষ্টও দেয় না, তাদেরই জন্য তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে পুরস্কার এবং তাদের কোনই আশঙ্কা নেই, তারা চিন্তিতও হবে না। [বাকারা: ২৬২]
বলুন, আমার পালনকর্তা তার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং সীমিত পরিমাণে দেন। তোমরা যা কিছু ব্যয় কর, তিনি তার বিনিময় দেন। তিনি উত্তম রিযিকদাতা। [সাবা: ৩৯]
এবং তারা যখন ব্যয় করে, তখন অযথা ব্যয় করে না, কৃপণতাও করে না, এবং তাদের পন্থা হয় এতদুভয়ের মধ্যবর্তী। [ফুরকান: ৬৭]
হে ঈমানদারগণ, তোমরা পবিত্র বস্তু সামগ্রী আহার কর, যেগুলো আমি তোমাদের রুযি হিসেবে দান করেছি এবং শুকরিয়া আদায় কর। [বাকারা: ১৭২]
তারা ধৈর্যধারণকারী, সত্যবাদী, নির্দেশ সম্পাদনকারী, সৎপথে ব্যয়কারী, এবং শেষরাতে ক্ষমাপ্রার্থনাকারী। [আলে ইমরান: ১৭]
অনেক সাহাবি এমন আছেন, যারা আল্লাহ -র রাস্তায় বিপুল পরিমান খরচ করেছিলেন। আবু বকর, উসমান, আব্দুর রাহমান ইবনে আউফ বলতে গেলে তাদের সকল সম্পদই আল্লাহ -র জন্য খরচ করেছিলেন।
আবু বকর তার সকল সম্পদ, শরীরের রক্ত, চেষ্টা ও মেহনত, সময়, সবকিছু আল্লাহ -র রাস্তায় খরচ করেছিলেন। বিনিময়ে আল্লাহ তাকে নবী-রাসূলদের পরে সবচেয়ে কাছের বন্ধু বানিয়েছেন।
উসমান ‘রুমার কূপ’ মুসলমানদের অবাদে ব্যবহারের জন্য নিজ অর্থে ক্রয় করে উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। তাবুক যুদ্ধে মুসলমানদের সৈন্য নিজ অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে সামানা দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছিলেন। তখন রাসূল বলেছিলেন-
আজকের পরে উসমান যে আমলই করুক না কেন, তা তাকে কোন ক্ষতি করবে না। [মুসনাদে আহমাদ : ২০১০৭]
(রাসূল যখন হিজরত করে মদীনায় আসেন, তখন মদীনার কোথাও সুপেয় মিঠাপানি পাওয়া যেত না। শুধু একটি কূপেই সুপেয় মিঠাপানি ছিলো। সেই কূপটি হল রুমার কূপ। রাসূল তখন বলেছিলেন, যে রুমার কূপটি ক্রয় করে মুসলমানদের অবাদে ব্যবহারের জন্য ওয়াকফ করে দিবে, বিনিময়ে সে বেহেশতে তদপেক্ষা উত্তম কূপ লাভ করবে। অতঃপর উসমান একান্ত ব্যক্তিগত অর্থে কূপটি ক্রয় করে মুসলমানদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। দ্র. মানাকিবে উসমান, দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ, মেশকাত। -অনুবাদক)
আব্দুর রাহমান ইবনে আউফ এক মুহূর্তে গদি ও পালানযুক্ত সাতশ উট খাদ্যসহ আল্লাহ -র রাস্তায় খরচ করেছিলেন।
কবি বলেন-
‘কোন প্রয়োজনের খোঁজে তারা কাঠ পুড়ে মাটি খুঁড়তেন না। তারা শুধু আপন চেহারা উদ্ভাসিত করে তুলতেন; দেখতেন তাদের প্রয়োজনগুলো ধারণ করেছে সর্বোত্তম রঙ-বেরঙ!’
তিন ধরনের মানুষ আল্লাহ -র রাস্তায় খরচ করে। প্রথমত, এক শ্রেণীর মানুষ লোক দেখানোর জন্য এবং প্রশংসা কুড়ানোর জন্য খরচ করে। এদের জন্য কোন সাওয়াব থাকবে না। বরং দোযখের আগুন সর্বপ্রথম এদের দ্বারা প্রজ্জ্বলিত হবে।
দ্বিতীয়ত এক শ্রেণীর মানুষ, যারা চক্ষুলজ্জায় বা অভ্যাসবসে খরচ করে। এরা আল্লাহ -র রাস্তায় খরচের প্রতিদান পাবে।
তৃতীয়ত এক শ্রেণীর মানুষ ইখলাসের সাথে আল্লাহ -র সন্তুষ্টির জন্য খরচ করে। এরাই হলো আল্লাহ-র কাছে সর্বাধিক প্রতিদানপ্রাপ্ত বান্দা।
এদের জন্যই আল্লাহ বলেছেন-
أُولَئِكَ عَلَى هُدًى مِّنْ رَّبِّهِمْ * তারাই নিজেদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথপ্রাপ্ত। [বাকারা : ৫]
পরিপূর্ণ ও সুস্পষ্ট হেদায়াতপ্রাপ্ত। এমন নয় যে, তাদের কেউ হেদায়াত পেয়েছেন আর কেউ পাননি, বা তারা হিদায়াতের রাস্তায় চলছেন এখনও গন্তব্যে পৌঁছুননি। বরং তারা সকলে হেদায়াত পেয়ে গেছেন।
এজন্য কেউ এসকল আমলগুলো না করলে সে হেদায়াতের সামান্যই পেয়ে থাকে।
মানুষকে একমাত্র ঈমান এবং উল্লিখিত আমলগুলোই হেদায়াতের পথে অবিচল রাখতে পারে। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ মানুষকে হেদায়াতের পথে অটল রাখতে পারে না। অশ্লীল ও মন্দকাজ থেকে ফেরাতে পারে না। আল্লাহ ইউসুফ -র ব্যাপারে ইরশাদ করেন-
নিশ্চয় মহিলা তার বিষয়ে চিন্তা করেছিলো এবং সে-ও মহিলার বিষয়ে চিন্তা করতো, যদি না সে স্বীয় পালনকর্তার মহিমা অবলোকন করতো। এমনিভাবে হয়েছে, যাতে আমি তার কাছ থেকে মন্দ বিষয় ও নির্লজ্জ বিষয় সরিয়ে দেই। নিশ্চয় সে আমার মনোনীত বান্দাদের একজন। [ইউসুফ: ২৪]
অর্থাৎ, ইউসুফ যেহেতু হেদায়াতপ্রাপ্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলো, এ জন্য আল্লাহ তার উপর থেকে মন্দ ও অশ্লীল কাজ সরিয়ে নিয়েছেন।
সুতরাং, একমাত্র আল্লাহ -ই মানুষকে মন্দ ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখেন।
أُولَئِكَ عَلَى هُدًى مِّنْ رَّبِّهِمْ * তারাই নিজেদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথপ্রাপ্ত। [বাকারা: ০৫]
আল্লাহ শুধু তারা সুপথপ্রাপ্ত বলেননি। বরং নিজেদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথপ্রাপ্ত বলেছেন। কারণ, পথপ্রদর্শনের অনেক প্রকার থাকে। যেমন শয়তানের পক্ষ থেকেও একটি পথপ্রদর্শন আছে। কিন্তু উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গ শয়তানের পথে প্রদর্শিত নয়, বরং তারা তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথপ্রদর্শিত।
আয়াতাংশে আরো লক্ষ্যণীয় হলো, আল্লাহ -র পক্ষ থেকে হেদায়াতপ্রাপ্ত না বলে তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে হেদায়াতপ্রাপ্ত বলা হয়েছে। এরূপ বর্ণনাশৈলীর মাধ্যমে বুঝানো হয়েছে যে, তোমরা হেদায়াতপ্রাপ্ত হয়েছ এমন সত্ত্বার পক্ষ থেকে, যিনি তোমাদের প্রতিপালনও করেন। এটিও তদ্রূপ একটি নেয়ামত। আর নিয়ম হলো, আল্লাহ যেখানে নেয়ামতের উল্লেখ করেছেন, সেখানে প্রতিপালনের কথা উল্লেখ করেছেন। আর যেখানে কোরআনের কথা উল্লেখ করেছেন, সেখানে ইলাহ হওয়ার কথা বলেছেন।
আর তারাই যথার্থ সফলকাম। [বাকারা: ০৫]
وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ﴿٥﴾
আল্লাহ কোরআনের অনেক জায়গায় সফলতার কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন বর্ণিত হয়েছে-
যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম। [হাশর: ০৯]
আল্লাহ ধৈর্যের সাথে সফলতার কথা উল্লেখ করেছেন। যিকিরের সাথে সফলতার কথা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ -র রাস্তায় কষ্ট স্বীকার এবং খরচ করার সাথেও সফলতার কথা উল্লেখ করেছেন।
সফলতার অর্থ হল, উর্ধ্বে আরোহণ করা। তাহলে উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গ সফল হওয়ার অর্থ হল দুনিয়া এবং আখিরাতে তারা অন্যদের উর্ধ্বে আরোহণ করেছে।
আর তারাই যথার্থ সফলকাম; অর্থাৎ তারা বিজয়ী হয়েছে। তাদের বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অন্তঃকরণসহ পরিশুদ্ধ হয়েছে।
আমরা আল্লাহ -র কাছে দোয়া করি, আল্লাহ আমাদের সফলদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আল্লাহ আমাদের সালাত প্রতিষ্ঠাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। অদৃশ্যের উপর ঈমান আনার তাওফিক দিন। আল্লাহ -র রাস্তায় খরচ করার তাওফিক দিন।

📘 আল্লাহকে মানুন নিরাপদ থাকুন > 📄 মু'মিনের দশ গুণ

📄 মু'মিনের দশ গুণ


সকল প্রশংসা আল্লাহ -র জন্য। অসংখ্য দুরূদ ও সালাম শ্রেষ্ঠতম নবী ও রাসূল মুহাম্মাদ -এর জন্য, তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবায়ে কেরামের জন্য।
মহান আল্লাহ বলেন-
যাদের জন্য প্রথম থেকেই আমার পক্ষ থেকে কল্যাণ নির্ধারিত হয়েছে, তারা দোযখ থেকে দূরে থাকবে। তারা দোযখের অস্ফুট শব্দও শুনবে না, এবং তারা তাদের মনের বাসনা অনুযায়ী চিরকাল বসবাস করবে। মহাত্রাস তাদের চিন্তান্বিত করবে না এবং ফেরেশতারা তাদের অভ্যর্থনা করবে- আজ তোমাদের দিন, যে দিনের ওয়াদা তোমাদের দেয়া হয়েছিল। সেদিন আমি আকাশকে গুটিয়ে নিবো, যেমন গুটানো হয় লিখিত কাগজপত্র। যেভাবে আমি প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করবো। আমার ওয়াদা নিশ্চিত, আমাকে তা পূর্ণ করতেই হবে। আমি উপদেশের পর যবুরে লিখে দিয়েছি যে, আমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাগণ অবশেষে পৃথিবীর অধিকারী হবে। [আম্বিয়া: ১০১-১০৫]
আয়াতে যাদের অবশেষে পৃথিবীর অধিকারী বলা হয়েছে, তারা হলেন আল্লাহ -র বন্ধু। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন-
মনে রেখো, যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের না কোন ভয়-ভীতি আছে, না তারা চিন্তান্বিত হবে; যারা ঈমান এনেছে এবং ভীত রয়েছে। [ইউনুস: ৬২, ৬৩]
আর এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই যে যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে আর আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী। আল্লাহ ক্ষমাকারী, করুণাময়। [বাকারা: ১১৮]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00