📘 আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালবাসেন > 📄 গোনাহ কখনো তুচ্ছ নয়

📄 গোনাহ কখনো তুচ্ছ নয়


হে আল্লাহর বান্দাগণ! বর্তমানে অশীলতা ও মন্দকাজে চারদিক ভেসে যাচ্ছে। নগ্নতা, বেহায়াপনায় সয়লাব পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র। ঈমান ও চরিত্র বিধ্বংসী হাতিয়ার আজ সকলের হাতে হাতে। আমাদের নিয়ন্ত্রণ শক্তি অত্যন্ত দুর্বল। ফলে সহজেই আমরা হারাম ও নাজায়েজ কাজে লিপ্ত হয়ে যাচ্ছি। অশ্লীলতা, বেহায়াপনার গড্ডলিকায় গা ভাসিয়ে দিয়েছি। টিভি, সিনেমা, গান-বাদ্য, সুদ, ঘুসে জড়িয়ে পড়ছি। আমাদের লজ্জা করা উচিত। ঈমানের ব্যাপারে আমাদের লজ্জিত হওয়া উচিত। আল্লাহ আমাদের যাবতীয় কাজকর্ম দেখছেন, আমাদের সকল কথাবার্তা শ্রবণ করছেন, সর্বদা তিনি আমাদেরকে পর্যবেক্ষণ করছেন, তথাপিও আমরা হরদম গোনাহ ও অবাধ্যতা করেই চলছি। আল্লাহর কসম! আমাদের লজ্জা করা উচিত।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! আজ অধিকাংশ মানুষের অবস্থা হলো, তারা বেঁচে থেকেও কেমন যেন অস্তিত্বহীন। তাদের জীবন মৃত্যু সমতুল্য। তারা আল্লাহর আদেশ পালন করে না। নিষেধ থেকে বিরত থাকে না। পবিত্র কুরআনের ভাষায় তারা যেন চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়, বরং এর চেয়েও নিকৃষ্ট।
তাদের অবস্থা হলো, শরিয়ত যদি তাদের মর্জি মুতাবেক হয় তাহলে শরিয়তকে তারা গ্রহণ করে। আর যদি তাদের মর্জির বিপরীত হয় তাহলে শরিয়তকে তারা বিসর্জন দেয়। শরিয়তের যে সমস্ত আদেশ-নিষেধ সহজ তারা সেগুলো পালন করে। যেগুলো তাদের নিকট কঠিন মনে হয় সেগুলো থেকে যোজন যোজন দূরে থাকে। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো, দুনিয়ার অর্থকড়ি, যশ ও খ্যাতি। শরিয়তের যে সমস্ত বিধি-বিধান তাদের উদ্দেশ্য পূরণে প্রতিবন্ধক তারা সেগুলো ছুড়ে ফেলে দেয়।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! নিজেদের পরিণামের কথা ভেবে দেখো। মৃত্যুর পর তোমার পরিণতি কেমন হবে যদি এ নিয়ে চিন্তা করো তাহলে মুক্তির পথ খুঁজে পাবে। আখেরাত সম্পর্কে গভীর অর্থে চিন্তা-ভাবনা করার মাঝেই রয়েছে নাজাত। তুমি যখন তোমার করুণ পরিণতির কথা চিন্তা করবে তখন তুমি সতর্ক হবে। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় অন্বেষণ করবে। যে ব্যক্তি দীর্ঘ সফরের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যায়, সে তার পথচলার পাথেয় ও সামানা সংগ্রহ করে। এটিই প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ।
জেনে রাখো, দীর্ঘ এ পথ পাড়ি দিতে হবে প্রবল ধৈর্য ও আত্মিক প্রশান্তির মাধ্যমে। হজরত বিশর আল হাফি থেকে বর্ণিত আছে, একদা তিনি দূরের এক ভ্রমণে বের হয়েছেন। সঙ্গে ছিল এক সাথি। চলতে চলতে সাথিটির তৃষ্ণা পেল। বলল, 'এই কূপ থেকে পানি পান করব।' বিশর আল হাফি তাকে বললেন, 'ধৈর্যধারণ করো, সামনের কূপ থেকে পানি পান করব। চলতে চলতে যখন তারা পরবর্তী কূপের নিকটবর্তী হলো তখন বিশর আল হাফি পুনরায় তাকে বললেন, 'ধৈর্যধারণ করো, সামনের কূপ থেকে আমরা পানি পান করব। এভাবে তারা চলতে লাগল এবং একের পর এক কূপ অতিক্রম করছিল। প্রতিবারই বিশর আল হাফি তাকে বলছেন, ধের্যধারণ করো, সামনের কূপ থেকে আমরা পানি পান করব। অবশেষে তারা তাদের গন্তব্যে পৌঁছলা। বিশর আল হাফি তাকে সুমিষ্ট পানি পান করতে দিলেন। অতঃপর তাকে বললেন, 'এভাবে দুনিয়া শেষ হয়ে যাবে। দুনিয়ার এ পথ পাড়ি দিতে হবে অসীম ধৈর্যের মাধ্যমে। তাহলেই আখেরাতের সুমিষ্ট নেয়ামত ভোগ করতে পারবে।'
ধৈর্য এক বিরাট শক্তি। এক বড়ো পাওয়ার। ধৈর্য ও ইয়াকিনের মাধ্যমে তুমি লাভ করতে পারবে দ্বীনের ইমামত-নেতৃত্ব। তাই অন্তরকে ধৈর্যের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। নিজেকে ধৈর্যশীলরূপে গড়ে তুলতে হবে। তবেই লাভ করবে প্রতিশ্রুত সুফল।
জনৈক মনীষী তার নফসকে বলেছেন, 'আল্লাহর শপথ! আমি তোমাকে তোমার প্রিয় ও পছন্দনীয় বস্তু থেকে বিরত রাখি মূলত তোমার প্রতি অনুগ্রহ ও দয়াপরবশ হয়ে।'
হজরত আবু যায়েদ বলেন, 'আমি আমার নফসকে যতই আল্লাহ তায়ালার দিকে তাড়িত করি সে ততই ক্রন্দন করতে থাকে। অবশেষে যখন সুমিষ্ট পানি পান করে আনন্দে হাসতে থাকে। অর্থাৎ আমি আমার নফসকে আল্লাহর আনুগত্যে বাধ্য করি। অবশেষে যখন তার মাঝে অটুট ও দৃঢ়তা আসে তখন সে খুশি হয়ে যায়।'
তুমি তোমার জীবনে একমাত্র কামনার লক্ষ্য বানাও আল্লাহকে। তার অনুসরণ, তার আনুগত্য এবং তার সন্তুষ্টি অর্জনই হবে একমাত্র আরাধ্য ও লক্ষ্য। তোমার মুরাকাবা, তোমার চিন্তা-চেতনা, তোমার নির্জনতা, তোমার প্রকাশ্য সবকিছু জুড়ে থাকবে একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এর বাস্তব প্রতিফলন।
الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ، وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ، إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
'যিনি তোমাকে দেখতে পান যখন তুমি নামাজে দাঁড়াও এবং দেখতে পান সিজদাকারীদের সাথে তোমার ওঠাবসা। নিশ্চয় তিনি সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন।'১৬৭
হে আল্লাহর বান্দা! তুমি যদি মনে করো আল্লাহ তায়ালা তোমাকে দেখছেন না, তাহলে এর চেয়ে জঘন্য কুফরি আর কিছু নেই। আর যদি মনে করো আল্লাহ তোমাকে দেখছেন তা সত্ত্বেও তুমি গোনাহ করো তাহলে এর চেয়ে বড়ো ধৃষ্টতা আর হতে পারে না। এর চেয়ে বড়ো নির্লজ্জতা আর কিছুই নেই।
সুতরাং উপদেশ গ্রহণ করো। তদনুযায়ী আমল করো। কেননা, যে উপদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে তার জাহান্নামের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হয়ে গেল।
ইরশাদ হয়েছে, فَمَا لَهُمْ عَنِ التَّذْكِرَةِ مُعْرِضِينَ * كَأَنَّهُمْ حُمُرُ مُسْتَنْفِرَةٌ . فَرَّتْ مِنْ قَسْوَرَةٍ 'তাদের কী হয়েছে যে, উপদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়? যেন তারা ভয় পেয়ে পলায়নকারী গাধা। যারা কোনো সিংহের ভয়ে পালিয়ে এসেছে।'১৬৮
জেনে রাখো, তোমাকে অবশ্যই একদিন আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান হতে হবে। সেদিন কোন মুখে তুমি জবাব দেবে? সুতরাং অত্যাবশ্যকীয় সে প্রশ্নের উত্তর প্রস্তুত করো। তুমি কি ভেবে দেখেছ, আল্লাহর শাস্তি থেকে মুক্তির জন্য তুমি কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছ?
জেনে রাখো, একমাত্র বিশুদ্ধ তাওহিদ এবং আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমেই কেবল তুমি আখেরাতের মর্মন্তুদ শাস্তি থেকে রক্ষা পাবে।
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالعَدْلِ وَالإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعْلَكُمْ تَذَكَّرُونَ فاذكروا الله العظيم الجليل يذكركم، واشكروه على نعمه يزدكم، ولذكر الله أكبر والله يعلم ما تصنعون।

টিকাঃ
১৬৭ সুরা শুয়ারা: ২১৮।
১৬৮ সুরা মুদ্দাছছির: ৪৯-৫২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00