📘 আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালবাসেন > 📄 নামাজের প্রতি যত্নবান হও

📄 নামাজের প্রতি যত্নবান হও


আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে যে সমস্ত বিষয় হেফাজত করার আদেশ দিয়েছেন তন্মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো নামাজ। পবিত্র কুরআনের বহু জায়গায় আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে নামাজের আদেশ দিয়েছেন। ঈমানের পর সর্বাধিক পছন্দনীয় ইবাদত হলো নামাজ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজের ব্যাপারে তার উম্মতকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছেন। অথচ অধিকাংশ মানুষ আজ নামাজের প্রতি উদাসীন। ইরশাদ হয়েছে,
حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ والصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَقُومُوا لِلَّه قَانِتِينَ
'তোমরা নামাজের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী (আসরের) নামাজের প্রতি; আর আল্লাহর সামনে একনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়াও।'১৫৪ অপর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নামাজের প্রতি যত্নবান মুমিনদের প্রশংসাস্বরূপ ইরশাদ করেন,
وَالَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُونَ 'যারা তাদের নামাজের ব্যাপারে যত্নবান। '১৫৫
যারা নামাজের প্রতি যত্নবান হবে, নামাজকে সকল রুকনসহ যথাযথ আদায় করবে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে তার ক্রোধ ও শাস্তি থেকে হেফাজত করবেন। কিয়ামতের দিন তাদেরকে তিনি নাজাত দেবেন।
জেনে রাখো, নামাজ হলো সর্বোত্তম ইবাদত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
واعلموا أن خير أعمالكم الصلاة
'জেনে রাখো, তোমাদের শ্রেষ্ঠ আমল হলো নামাজ।'১৫৬
আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তায়ালা তাওহিদের পর সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছেন নামাজের প্রতি।
আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন, 'নামাজ বান্দার রিজিক টেনে আনে। বান্দাকে সুস্থ ও সবল রাখে। সমস্ত কষ্ট দূর করে। নামাজ বান্দার অন্তরকে শক্তিশালী করে। চেহারাকে করে সমুজ্জ্বল। অন্তরকে রাখে প্রফুল্ল। নামাজ শরীরের অলসতাকে দূর করে। বক্ষকে প্রসারিত করে। নামাজ আত্মার খাদ্যস্বরূপ। আত্মাকে করে আলোকিত। নামাজ বান্দাকে দেওয়া আল্লাহর নেয়ামতকে হেফাজত করে। বৃদ্ধি করে বরকতসমূহ। শয়তানকে দূরে ঠেলে দেয়। আল্লাহর নিকটবর্তী করে।'
মন্দ ও ক্ষতিকর বিষয়সমূহ দূরীকরণে নামাজের রয়েছে বিস্ময়কর প্রভাব। বিশেষ করে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সকল শর্ত পূরণ করে যদি নামাজ আদায় করা হয় তাহলে উক্ত নামাজ দুনিয়ার ক্ষতি এবং আখেরাতের শান্তি দূরীকরণে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
নামাজ আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক স্থাপন করে। যার সম্পর্ক যত অধিক ও গাঢ় হবে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য সে পরিমাণ কল্যাণের দুয়ার উন্মোচন করে দেবেন। যেমনটি বর্ণিত হয়েছে হাদিসে কুদসিতে,
يا ابن آدم اركع لي من أول النهار أربع ركعات أكفك آخره
'হে আদমসন্তান! তুমি দিনের শুরুতে আমার জন্য চার রাকাত নামাজ আদায় করো, আমি তোমার সারা দিনের দায়িত্ব নিয়ে নিলাম।'
নামাজ মুমিনকে অশ্রীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। নামাজ মুমিনকে গোনাহ থেকে হেফাজত করে। নামাজ মুমিনের জন্য গোনাহ থেকে বিরত থাকার রক্ষাকবচ। পক্ষান্তরে যারা নামাজের প্রতি উদাসীন, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে ধ্বংস ও বিরাট ক্ষতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ইরশাদ হয়েছে, فَخَلَفَ مِن بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيّاً
'তাদের পরে এমন এক প্রজন্ম এল যারা নামাজ নষ্ট করল এবং প্রবৃত্তির বশবর্তী হলো। অতএব তারা ভ্রষ্টতার পরিণতি দেখতে পাবে।' ১৫৭
কিন্তু আজ কেমন আমাদের নামাজ? আমরা কি নামাজের প্রতি যত্নবান? আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে পর্যবেক্ষণ করছেন না? আমরা কি এ আয়াত সম্পর্কে সামান্যতম চিন্তা-ভাবনা করি না?
الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ، وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ 'যখন তুমি নামাজে দাঁড়াও তিনি তোমাকে দেখেন এবং সিজদাকারীদের সাথে তোমার উঠাবসা দেখেন।'
অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হলো, আমরা আজ নামাজের প্রতি অতি উদাসীন। হে আল্লাহর বান্দা! তুমি জিজ্ঞেস করো নিজেকে কতবার তোমার জামাত ছুটে গেছে? কতবার তোমার তাকবিরে উলা ছুটে গেছে? কতদিন তুমি ফজরের নামাজের সময় ঘুমের ঘোরে বিভোর ছিলে?
আল্লাহর শপথ! ততদিন পর্যন্ত আমাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না যতদিন আমরা নামাজের প্রতি যত্নবান হবো। আল্লাহ শপথ! আমাদের ধ্বংস ও অধঃপতনের পরিবর্তন সেদিনই হবে যেদিন আমরা নামাজের কাতারে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াব।

টিকাঃ
১৫৪ সুরা বাকারা: ২৩৮।
১৫৫ সুরা মুমিন: ৯।
১৫৬ ইবনে মাজাহ: ২৭৭।
১৫৭ সুরা মারইয়াম: ৫৯।

📘 আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালবাসেন > 📄 আল্লাহ আপনার কথা শ্রবণ করছেন

📄 আল্লাহ আপনার কথা শ্রবণ করছেন


আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার একটি বিশেষ গুণবাচক নাম হলো সামি। অর্থাৎ তিনি ওই সত্তা যিনি প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল কিছু শ্রবণ করেন। বিশাল জগতের কোনো কিছুই তার শ্রবণ ইন্দ্রীয়ের বাহিরে নয়। পবিত্র কুরআনুল কারিমের বহু আয়াতে আল্লাহ তায়ালার এ পবিত্র নাম ও গুণাবলি আলোচিত হয়েছে।
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
'হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদেরকে কবুল করে নিন। নিশ্চয় আপনি সবকিছু শোনেন ও জানেন।' ১৫৮
إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ 'নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।' ১৫৯
إِنَّهُ سَمِيعٌ قَرِيبٌ 'নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও নিকটবর্তী। ১৬০
আল্লাহ তায়ালা আমাদের যাবতীয় কথাবার্তা, সৃষ্ট সকল মাখলুকের বিচরণ এবং প্রকাশ্য ও লুকায়িত সকল কিছু শ্রবণ করেন। ইরশাদ হয়েছে,
سَوَاء مِّنكُم مِّنْ أَسَرَّ الْقَوْلَ وَمَن جَهَرَ بِهِ وَمَنْ هُوَ مُسْتَخْفِ بِاللَّيْلِ وَسَارِبُ بِالنَّهَارِ، لَهُ مُعَقِّبَاتٌ مِّن بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ يَحْفَظُونَهُ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ وَإِذَا أَرَادَ اللَّهِ بِقَوْمٍ سُوءاً فَلَا مَرَدَّ لَهُ وَمَا لَهُم مِّن دُونِهِ مِن وَالٍ، هُوَ الَّذِي يُرِيكُمُ الْبَرْقَ خَوْفاً وَطَمَعاً وَيُنْشِئُ السَّحَابَ الثَّقَالَ، وَيُسَبِّحُ الرَّعْدُ بِحَمْدِهِ وَالْمَلَائِكَةُ مِنْ خِيفَتِهِ وَيُرْسِلُ الصَّوَاعِقَ فَيُصِيبُ بِهَا مَن يَشَاءُ وَهُمْ يُجَادِلُونَ فِي اللَّهِ وَهُوَ شَدِيدُ الْمِحَالِ
'তোমাদের মধ্যে যে কথা গোপন করে আর যে তা প্রকাশ করে এবং রাতে লুকিয়ে থাকে আর যে দিনে অবাধে বিচরণ করে তার কাছে সবাই সমান। মানুষের জন্য তার সামনে ও পেছনে রয়েছে একের পর এক আগমনকারী ফেরেশতাবৃন্দ। তারা আল্লাহর নির্দেশে তাকে পাহারা দিয়ে রাখে। আল্লাহ তো কোনো জনগোষ্ঠীর অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আর আল্লাহ যখন কোনো জনগোষ্ঠীকে শাস্তি দিতে চান তখন তা কেউ ফেরাতে পারে না। তিনি ছাড়া তাদের কোনো বন্ধুও নেই। তিনিই তোমাদেরকে বিদ্যুৎ দেখান ভয় ও আশার বস্তু হিসেবে। এবং তিনিই ভারি মেঘ সৃষ্টি করেন। বজ্র তার গুণগান ও প্রশংসা করে এবং তার ভয়ে ফেরেশতারাও তাই করে। তিনি বজ্রপাত করেন এবং এর দ্বারা যাকে চান তাকে আঘাত করেন। তবুও তারা আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্ক করে, অথচ তিনি প্রচণ্ড প্রতাপশালী। '১৬১
জেনে রাখো, আল্লাহ তায়ালা কোনো প্রকার আকার-আকৃতি ও সাদৃশ্যতা ব্যতিরেকেই শ্রবণ করেন। এক মহিলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে স্বামীর ব্যাপারে অভিযোগ করে বলল, আমার স্বামী আমাকে أنت علي كظهر أمي 'তুমি আমার মায়ের পিঠের মতো' বলেছে। ১৬২ হে আল্লাহর রাসুল! আপনি বলুন এখন আমাদের করণীয় কী? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্পষ্ট ভাষায় যিহারের হুকুম বলে দিলেন। আল্লাহর শপথ! তুমি তার ওপর হারাম হয়ে গেছ। মহিলা বলল, 'আপনি আল্লাহর নিকট সুপারিশ করুন। আমার কোলে শিশু বাচ্চা রয়েছে। তাকে যদি তাদের নিকট পাঠিয়ে দিই তাহলে তার স্বভাব-চরিত্র নষ্ট হয়ে যাবে। আর যদি আমার নিকট রাখি তাহলে তারা ক্ষুধার্ত থাকবে।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আল্লাহর শপথ! সে তোমার জন্য হারাম হয়ে গেছে।' হজরত আয়েশা রা. বলেন, 'আল্লাহর শপথ! আমার ও সে মহিলার মাঝে ব্যবধান ছিল একটি পর্দা। আমি তার কিছু কথা স্পষ্ট শুনেছি এবং কিছু কথা আমার নিকট অস্পষ্ট ছিল। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা আয়াত অবতীর্ণ করেন।
قَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَشْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرُ الَّذِينَ يُظَاهِرُونَ مِنكُم مِّن نِّسَائِهِم مَّا هُنَّ أُمَّهَاتِهِمْ إِنْ أُمَّهَاتُهُمْ
اِلَّا الّٰٓـئِيْ يُظٰهِرُوْنَ مِنْكُمْ مِّنْ نِّسَآئِهِمْ مَّا هُنَّ اُمَّهٰتِهِمْ‌ اِنْ اُمَّهٰتُهُمْ اِلَّا الّٰٓـئِيْ وَلَدْنَهُمْ‌ وَاِنَّهُمْ لَيَقُوْلُوْنَ مُنْكَرًا مِّنَ الْقَوْلِ وَزُوْرًا‌ وَّاِنَّ اللّٰهَ لَعَفُوٌّ غَفُوْرٌ
'যে মহিলা তার স্বামী সম্বন্ধে আপনার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর নিকট অভিযোগ পেশ করছে আল্লাহ তার কথা শুনেছেন। আল্লাহ তোমাদের দুজনের কথাবার্তাই শুনেছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন। তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে তারা তাদের মা নয়। তাদের মা তো তারাই যারা তাদেরকে জন্মদান করেছে। বস্তুত তারা এক জঘন্য কথা আর মিথ্যা বলে থাকে। আল্লাহ মার্জনাকারী ও ক্ষমাশীল।'১৬৩
হে আল্লাহর বান্দাগণ! উক্ত মহিলা আল্লাহর নিকট তার অভিযোগ পেশ করল। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সে অভিযোগ শ্রবণ করলেন এবং তার সমাধান প্রেরণ করলেন।
একদিন হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. কোথাও যাচ্ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন হজরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রা.। পথে এক অপরিচিত মহিলার সাথে সাক্ষাৎ হলো তাদের। মহিলাটি হজরত উমর রা.-কে লক্ষ্য করে বলল, হে উমর! আপনি আপনার রাজত্বের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন! আপনি আপনার ক্ষমতার ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন! জেনে রাখুন, আল্লাহ আপনাকে রাষ্ট্রের প্রজাদের সম্পর্কে অবশ্যই জিজ্ঞেস করবেন। মহিলার এ কথা শুনে খলিফাতুল মুসলিমিন হজরত উমর রা. কাঁদতে শুরু করেন। খলিফাকে কাঁদতে দেখে হজরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ মহিলাকে তিরস্কার করেন। হজরত উমর রা. তাকে নিষেধ করে বললেন, হে আবু উবায়দা! তাকে ছেড়ে দাও। তার কথা আল্লাহ তায়ালা সাত আসমান ওপর থেকে শ্রবণ করেছেন।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! চিন্তা করো হজরত উমর রা. কী বলেছেন। উমর বলেছেন, 'আল্লাহ সাত আসমান ওপর থেকে মহিলার কথা শ্রবণ করেছেন। সুমহান সেই সত্তা, যিনি মানুষের প্রার্থনা শ্রবণ করেন। তাদের আহ্বানে সাড়া দেন। চাই তারা একাকী ডাকুন কিংবা সমষ্টিগতভাবে। জেনে রাখো, আল্লাহর নিকট তোমাদের ভাষা ও উপস্থাপনার ভিন্নতা ধর্তব্য নয়। সকল ভাষা ও সকল মানুষের মনোভাব তিনি বুঝেন। চাই সে কালো হোক কিংবা সাদা। আরবের হোক অথবা অনারবের। শুধু তাই নয়, মুখ দিয়ে বলার পূর্বেই বান্দা যখন অন্তরে তার কল্পনা করে আল্লাহ তখনই জেনে যান। কখনো কেউ তার প্রয়োজন ঠিকঠাকভাবে আল্লাহর নিকট তুলে ধরতে পারবে না। নানাবিধ অক্ষমতা তাকে আঁকড়ে ধরে। কিন্তু আল্লাহ ঠিকই তার অন্তরের বেদনা অনুভব করেন। এবং সেই অনুপাতে তাদেরকে তিনি দান করেন।
কখনো আল্লাহর পবিত্র নাম ও গুণ 'সামি' এর সাথে আরও বিভিন্ন নাম যুক্ত হয়েছে। যেমন, বাসির, কারিব, আলিম।
সবকিছু এ কথারই প্রমাণ বহন করে যে, বিশাল এ সৃষ্টিজগতের সবকিছুই আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার আয়ত্বাধীন। কোনো কিছুই তার নিয়ন্ত্রণের বাহিরে নয়। কোনো কিছু নয় তার নিকট অস্পষ্ট। সমস্ত কিছু তার শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং জ্ঞানশক্তির অধীন।
আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম হলো বাসির। অর্থাৎ ওই সত্তা যিনি বিশ্বজগতের সকল কিছু দেখেন। অণু থেকে পরমাণু কোনো কিছুই তার দৃষ্টির আড়ালে নয়। আল্লাহ তায়ালা সকল বস্তুর ব্যাপারে দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন এবং সেসবের বিষয়ে তিনি পূর্ণ অবগত। তিনি ছোটো-বড়ো সকল কিছু দেখেন। তিনি দেখেন যা রয়েছে জমিনের নিচে। যা রয়েছে আসমানের ওপরে এবং যা রয়েছে সমুদ্রের গভীর তলদেশে।
ইরশাদ হয়েছে,
'কোনো দৃষ্টি তার নাগাল পায় না, তবে তিনি সব দৃষ্টির নাগাল পান। আর তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মদর্শী ও সবকিছুর খবর রাখেন।' ১৬৪
হে আল্লাহর বান্দাগণ! এ পর্যায়ে আমি কয়েকটি ঘটনা বর্ণনা করছি যা আমরা সকলে অবগত, কিন্তু আমাদের জীবনে নেই সেসবের প্রভাব ও প্রতিফলন। কেন? আমরা কি সেগুলো উপলব্ধি করিনি? আমাদের বোধ ও বিশ্বাসে কি সেগুলো রেখাপাত করেনি?
প্রথম ঘটনা খলিফাতুল মুসলিমিন হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. রাতের বেলা ঘুরে ঘুরে প্রজাদের খোঁজ-খবর নিতেন। বিজন রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ত তখন তিনি মদিনার গলি-ঘুপচি ধরে হাঁটতেন। তাদের সুবিধা-অসুবিধা স্বচক্ষে দেখতেন। এ ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস। এক রাতে হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. শুনতে পেলেন, এক বৃদ্ধা মহিলা তার মেয়েকে দুধে পানি মেশাতে বলছে। মেয়েটি বলল, হে আমার মা! তুমি কি জানো না, আমাদের খলিফা দুধে পানি মেশাতে নিষেধ করেছেন। মেয়ের কথা শুনে মা ভারি বিরক্তমাখা কণ্ঠে বলল, 'খলিফা কি এই অন্ধকার রাতে আমাদের ঘরের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে? মেয়েটি তখন প্রতিউত্তরে বলল, 'খলিফা না দেখুক, কিন্তু আল্লাহ তো দেখছেন। রাতের নিস্তব্ধ আঁধারে আমরা খলিফার চোখ ফাঁকি দিতে পারলেও, আমাদের যিনি রব তাকে তো ফাঁকি দিতে পারব না। তিনি তো দেখছেন সবকিছু।'
হে আল্লাহর বান্দাগণ! এটি একটি বহুল প্রচলিত ঘটনা যা ছোটো-বড়ো সকলেই জানে। কিন্তু আমাদের প্রাত্যহিক জীবন এবং লেনদেনে কেন এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না? কেন আমাদের হৃদয়ে জাগ্রত হয় না এ কথা যে, আল্লাহ আমাদেরকে দেখছেন। কেন আমরা প্রতারণা করতে আল্লাহকে লজ্জা করি না? কেন অন্যায় অপকর্ম করার সময় আমরা আল্লাহর ব্যাপারে লজ্জিত হয় না? আল্লাহ আমাদেরকে দেখছেন, তথাপিও কীভাবে আমরা গোনাহে লিপ্ত হই। তার অবাধ্যতা করি। এর চেয়ে বড়ো ধৃষ্টতা আর কী হতে পারে? এর চেয়ে বড়ো প্রতারণা আর কিছু হতে পারে না হে আল্লাহ বান্দা। আজ খুব কম মানুষই রয়েছে এমন যারা ব্যাবসায় অপরকে ধোঁকা দেয় না। এমন মানুষের সংখ্যা অত্যধিক স্বল্প যারা মাপে সঠিক দেয়। আফসোস, আমরা জানি কিন্তু আমল করি না। আমরা ঈমান এনেছি কিন্তু ঈমানের দাবি আমাদের মাঝে বাস্তবায়িত হয়নি।
দ্বিতীয় ঘটনা
প্রতিদিনের অভ্যাস অনুযায়ী খলিফা হাঁটছেন মদিনার অলি-গলিতে। চলতে চলতে একটি গৃহের সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন। গৃহের ভেতর থেকে ভেসে আসছে ক্ষীণ অথচ ভরাট এক স্বর। এক মহিলা আবৃত্তি করছে এ কবিতা,
'রাত্রি দীর্ঘ হয়েছে।
চোখের কাজলের ন্যায় মিষকালো আঁধারে ছেয়ে গেছে মরু দিগন্ত।
অথচ আমার কোনো বন্ধু নেই যার সাথে মেতে উঠব নৈশ খেলায়। আমি একাকী পড়ে আছি নিঃসঙ্গের বিছানায়। চাইলেই চুমুক দিতে পারি শরাবের পেয়ালায়।
শপথ! যদি আল্লাহ না থাকতেন তাহলে কেউ ছিল না, যে বাধা দেবে আমাকে। আমার বিছানা নড়ে উঠত প্রচণ্ড উন্মত্ততায়। কিন্তু প্রভুর ভয় আমাকে বিরত রেখেছে সকল অযাচিত কামনার মায়াজাল থেকে।'
হে আল্লাহর বান্দাগণ! রাতের গভীরে এক মহিলা নিজেকে পাপ ও অবাধ্যতা থেকে বিরত রেখেছে। আর সে স্বীকার করে নিয়েছে এ কথা যে, পাপ থেকে বিরত থাকার একমাত্র কারণ হলো তার হৃদয়ের এ অনুভূতি যে, আল্লাহ তাকে দেখছেন। এর কারণ তো এ ছাড়া আর কিছুই নয় যে, তারা আল্লাহর বড়োত্বকে হৃদয়ে স্থান দিয়েছে। অন্তর তাদের সর্বদা মত্ত থাকে প্রভুর মুরাকাবায়। অন্যায় ও পাপ করতে তারা আল্লাহকে লজ্জা করে। তারা ভালোবাসে আল্লাহকে এবং তার আনুগত্য করে।
তৃতীয় ঘটনা
একদিন হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. মরুভূমি দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথে এক কিশোর রাখালের সাথে তার দেখা। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর অন্তরে হঠাৎ কৌতূহল জাগল। তিনি বালককে পরীক্ষা করতে চাইলেন। বালককে তিনি বললেন, 'তোমার বকরির পাল থেকে একটি বকরি আমার নিকট বিক্রি করে দাও। বালক বলল, আমি তো এর মালিক নই। আমার নিকট মালিকের আমানত মাত্র। এ কথা শুনে সাহাবি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. বললেন, তুমি তোমার মালিককে বলে দেবে যে, একটি বকরি পাহাড় থেকে এক বাঘ এসে খেয়ে ফেলেছে। বালকটি তখন প্রতিউত্তরে বলল, আমি আমার মালিককে নাহয় বলব, বাঘ খেয়ে ফেলেছে কিন্তু আল্লাহকে কী বলব? যেদিন আমার সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আল্লাহর নিকট সাক্ষ্য দেবে সেদিন আমি কী বলব আমার প্রভুকে? ইরশাদ হয়েছে,
الْيَوْمَ نَخْتِمُ عَلَى أَفْوَاهِهِمْ وَتُكَلِّمُنَا أَيْدِيهِمْ وَتَشْهَدُ أَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
'আজ আমি তাদের মুখে মোহর মেরে দেব এবং তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে, তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।'১৬৫
يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ، يَوْمَئِذٍ يُوَفِّيهِمُ اللَّهُ دِينَهُمُ الْحَقَّ وَيَعْلَمُونَ أَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ الْمُبِينُ
'যেদিন তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে তাদের জিহ্বা, তাদের হাত ও তাদের পা তাদেরই বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। সেদিন আল্লাহ তাদের যথার্থ কর্মফল পুরোপুরি দেবেন এবং তারা জানবে যে, আল্লাহই সত্য এবং সবকিছু প্রকাশকারী।'১৬৬
এটা শুনে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. কাঁদতে লাগলেন। সততায় মুগ্ধ হয়ে রাখাল বালককে তিনি আজাদ করে দিলেন। এবং বললেন, 'একটিমাত্র কথা তোমাকে দুনিয়াতে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছে। আমি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করব, যেন আখেরাতেও তিনি তোমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেন।'
এ সমস্ত ঘটনা আমরা সকলেই জানি। বারবার শুনেছি। কিন্তু আমাদের জীবনে কোথায় এর প্রভাব? কেন আমাদের অবস্থার পরিবর্তন হয় না? কেন জাগ্রত হয় না আমাদের অন্তর?
হে আল্লাহর বান্দাগণ! এ হলো আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার কতিপয় বিশেষ নাম ও গুণাবলি যা ওপরে নাতিদীর্ঘ পরিসরে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের জীবনে কেন এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না? আমাদের ঈমানের মাঝে কেন এর প্রতিক্রিয়া জাগ্রত হয় না? আমরা কেন ਗੋਨਾਹ থেকে বেঁচে থাকি না? কেন আমরা আল্লাহকে লজ্জা করি না?
তুমি যদি তোমার ঈমানকে যাচাই করতে চাও তাহলে নির্জনে একাকী মুরাকাবা করো। জেনে রাখো, কেবল দুই রাকাত নামাজ ও রোজার মাধ্যমে তুমি তোমার ঈমান যাচাই করতে পারবে না। বরং ঈমান যাচাই হবে তোমার অন্তর ও প্রবৃত্তির সাথে জিহাদ করার মাধ্যমে। আল্লাহর শপথ! হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম সম্মান ও মর্যাদার সুউচ্চ শিখরে আরোহণ করেছেন এর মাধ্যমেই। তিনি তার প্রবৃত্তির সাথে লড়াই করে নিজেকে জুলায়খার কুপ্রস্তাব থেকে হেফাজত করেছিলেন।
অন্তর ও প্রবৃত্তির বাহুডোর থেকে যারা নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারবে মহান প্রভুর নিকট তাদের জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান।
ইরশাদ হয়েছে,
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى * فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
'আর যে তার প্রভুর সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করেছে এব কুপ্রবৃত্তি থেকে নিজেকে ফিরিয়ে রেখেছে, তার বাসস্থান হবে জান্নাত।'

টিকাঃ
১৫৮ সুরা বাকারা: ১২৭।
১৫৯ সুরা লুকমান: ২৮।
১৬০ সুরা সাবা: ৫০।
১৬১ সুরা রাদ: ১০-১৩।
১৬২নিজের স্ত্রী অথবা তার কোনো অঙ্গকে মায়ের সাথে অথবা স্থায়ীভাবে বিবাহ হারাম এমন কোনো মহিলার পৃষ্ঠদেশতুল্য বলে আখ্যায়িত করাকে ইসলামি আইনের পরিভাষায় যিহার বলে। এ কথা বলার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, মায়ের সাথে যেমন মেলামেশা হারাম, তেমনি স্ত্রীর সাথেও হারাম করা। কেউ যদি এমনটি করে তাহলে তার জন্য করণীয় হলো, স্ত্রীকে স্পর্শের পূর্বে কাফফারা আদায় করা। যিহারের কাফফারা হলো, রমজান মাসে স্বেচ্ছায় রোজা ভাঙ্গার কাফফারার ন্যায়। একজন গোলাম আজাদ করবে। যদি গোলাম আজাদ করার সামর্থ্য না থাকে তাহলে টানা দুই মাস রোজা রাখবে। যদি তাও না পারে তাহলে ষাট জন মিসকিনকে খাবার খাওয়াবে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, 'তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে তারা যেন জেনে রাখে যে, তারা তাদের মা নয়। তাদের মা তো তারাই যারা তাদেরকে প্রসব করেছে। তারা তো কেবল অসঙ্গত ও মিথ্যা কথা বলে। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল ও মার্জনাকারী।' সুরা মুজাদালা: ২। যিহারের কাফফারা সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে, তারপর তাদের উক্তি প্রত্যাহার করে নেয়, তাদের জন্য পারস্পরিক স্পর্শের পূর্বে একটি দাস মুক্তির বিধান দেওয়া হলো। এটি তোমাদের জন্য নির্দেশ। আর তোমরা যা কিছু করো সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবগত। অতঃপর যে সেটার সামর্থ্য রাখে না তাকে পারস্পরিক স্পর্শের পূর্বে একটানা দু-মাস রোজা রাখতে হবে। যে তারও সামর্থ্য রাখে না তাকে ষাট জন মিসকিনকে খাওয়াতে হবে। এ বিধান এজন্য যে, আল্লাহ ও তার রাসুলের ওপর তোমরা যেন ঈমান রাখো। এটি আল্লাহর সীমারেখা।' সুরা মুজাদালা: ৩-৪। [অনুবাদক]
১৬৩ সুরা মুজাদালা: ১-২।
১৬৪ সুরা আনআম: ১০৩।
১৬৫ সুরা ইয়াসিন: ৬৫।
১৬৬ সুরা নূর: ২৪।

📘 আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালবাসেন > 📄 গোনাহ কখনো তুচ্ছ নয়

📄 গোনাহ কখনো তুচ্ছ নয়


হে আল্লাহর বান্দাগণ! বর্তমানে অশীলতা ও মন্দকাজে চারদিক ভেসে যাচ্ছে। নগ্নতা, বেহায়াপনায় সয়লাব পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র। ঈমান ও চরিত্র বিধ্বংসী হাতিয়ার আজ সকলের হাতে হাতে। আমাদের নিয়ন্ত্রণ শক্তি অত্যন্ত দুর্বল। ফলে সহজেই আমরা হারাম ও নাজায়েজ কাজে লিপ্ত হয়ে যাচ্ছি। অশ্লীলতা, বেহায়াপনার গড্ডলিকায় গা ভাসিয়ে দিয়েছি। টিভি, সিনেমা, গান-বাদ্য, সুদ, ঘুসে জড়িয়ে পড়ছি। আমাদের লজ্জা করা উচিত। ঈমানের ব্যাপারে আমাদের লজ্জিত হওয়া উচিত। আল্লাহ আমাদের যাবতীয় কাজকর্ম দেখছেন, আমাদের সকল কথাবার্তা শ্রবণ করছেন, সর্বদা তিনি আমাদেরকে পর্যবেক্ষণ করছেন, তথাপিও আমরা হরদম গোনাহ ও অবাধ্যতা করেই চলছি। আল্লাহর কসম! আমাদের লজ্জা করা উচিত।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! আজ অধিকাংশ মানুষের অবস্থা হলো, তারা বেঁচে থেকেও কেমন যেন অস্তিত্বহীন। তাদের জীবন মৃত্যু সমতুল্য। তারা আল্লাহর আদেশ পালন করে না। নিষেধ থেকে বিরত থাকে না। পবিত্র কুরআনের ভাষায় তারা যেন চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়, বরং এর চেয়েও নিকৃষ্ট।
তাদের অবস্থা হলো, শরিয়ত যদি তাদের মর্জি মুতাবেক হয় তাহলে শরিয়তকে তারা গ্রহণ করে। আর যদি তাদের মর্জির বিপরীত হয় তাহলে শরিয়তকে তারা বিসর্জন দেয়। শরিয়তের যে সমস্ত আদেশ-নিষেধ সহজ তারা সেগুলো পালন করে। যেগুলো তাদের নিকট কঠিন মনে হয় সেগুলো থেকে যোজন যোজন দূরে থাকে। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো, দুনিয়ার অর্থকড়ি, যশ ও খ্যাতি। শরিয়তের যে সমস্ত বিধি-বিধান তাদের উদ্দেশ্য পূরণে প্রতিবন্ধক তারা সেগুলো ছুড়ে ফেলে দেয়।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! নিজেদের পরিণামের কথা ভেবে দেখো। মৃত্যুর পর তোমার পরিণতি কেমন হবে যদি এ নিয়ে চিন্তা করো তাহলে মুক্তির পথ খুঁজে পাবে। আখেরাত সম্পর্কে গভীর অর্থে চিন্তা-ভাবনা করার মাঝেই রয়েছে নাজাত। তুমি যখন তোমার করুণ পরিণতির কথা চিন্তা করবে তখন তুমি সতর্ক হবে। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় অন্বেষণ করবে। যে ব্যক্তি দীর্ঘ সফরের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যায়, সে তার পথচলার পাথেয় ও সামানা সংগ্রহ করে। এটিই প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ।
জেনে রাখো, দীর্ঘ এ পথ পাড়ি দিতে হবে প্রবল ধৈর্য ও আত্মিক প্রশান্তির মাধ্যমে। হজরত বিশর আল হাফি থেকে বর্ণিত আছে, একদা তিনি দূরের এক ভ্রমণে বের হয়েছেন। সঙ্গে ছিল এক সাথি। চলতে চলতে সাথিটির তৃষ্ণা পেল। বলল, 'এই কূপ থেকে পানি পান করব।' বিশর আল হাফি তাকে বললেন, 'ধৈর্যধারণ করো, সামনের কূপ থেকে পানি পান করব। চলতে চলতে যখন তারা পরবর্তী কূপের নিকটবর্তী হলো তখন বিশর আল হাফি পুনরায় তাকে বললেন, 'ধৈর্যধারণ করো, সামনের কূপ থেকে আমরা পানি পান করব। এভাবে তারা চলতে লাগল এবং একের পর এক কূপ অতিক্রম করছিল। প্রতিবারই বিশর আল হাফি তাকে বলছেন, ধের্যধারণ করো, সামনের কূপ থেকে আমরা পানি পান করব। অবশেষে তারা তাদের গন্তব্যে পৌঁছলা। বিশর আল হাফি তাকে সুমিষ্ট পানি পান করতে দিলেন। অতঃপর তাকে বললেন, 'এভাবে দুনিয়া শেষ হয়ে যাবে। দুনিয়ার এ পথ পাড়ি দিতে হবে অসীম ধৈর্যের মাধ্যমে। তাহলেই আখেরাতের সুমিষ্ট নেয়ামত ভোগ করতে পারবে।'
ধৈর্য এক বিরাট শক্তি। এক বড়ো পাওয়ার। ধৈর্য ও ইয়াকিনের মাধ্যমে তুমি লাভ করতে পারবে দ্বীনের ইমামত-নেতৃত্ব। তাই অন্তরকে ধৈর্যের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। নিজেকে ধৈর্যশীলরূপে গড়ে তুলতে হবে। তবেই লাভ করবে প্রতিশ্রুত সুফল।
জনৈক মনীষী তার নফসকে বলেছেন, 'আল্লাহর শপথ! আমি তোমাকে তোমার প্রিয় ও পছন্দনীয় বস্তু থেকে বিরত রাখি মূলত তোমার প্রতি অনুগ্রহ ও দয়াপরবশ হয়ে।'
হজরত আবু যায়েদ বলেন, 'আমি আমার নফসকে যতই আল্লাহ তায়ালার দিকে তাড়িত করি সে ততই ক্রন্দন করতে থাকে। অবশেষে যখন সুমিষ্ট পানি পান করে আনন্দে হাসতে থাকে। অর্থাৎ আমি আমার নফসকে আল্লাহর আনুগত্যে বাধ্য করি। অবশেষে যখন তার মাঝে অটুট ও দৃঢ়তা আসে তখন সে খুশি হয়ে যায়।'
তুমি তোমার জীবনে একমাত্র কামনার লক্ষ্য বানাও আল্লাহকে। তার অনুসরণ, তার আনুগত্য এবং তার সন্তুষ্টি অর্জনই হবে একমাত্র আরাধ্য ও লক্ষ্য। তোমার মুরাকাবা, তোমার চিন্তা-চেতনা, তোমার নির্জনতা, তোমার প্রকাশ্য সবকিছু জুড়ে থাকবে একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এর বাস্তব প্রতিফলন।
الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ، وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ، إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
'যিনি তোমাকে দেখতে পান যখন তুমি নামাজে দাঁড়াও এবং দেখতে পান সিজদাকারীদের সাথে তোমার ওঠাবসা। নিশ্চয় তিনি সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন।'১৬৭
হে আল্লাহর বান্দা! তুমি যদি মনে করো আল্লাহ তায়ালা তোমাকে দেখছেন না, তাহলে এর চেয়ে জঘন্য কুফরি আর কিছু নেই। আর যদি মনে করো আল্লাহ তোমাকে দেখছেন তা সত্ত্বেও তুমি গোনাহ করো তাহলে এর চেয়ে বড়ো ধৃষ্টতা আর হতে পারে না। এর চেয়ে বড়ো নির্লজ্জতা আর কিছুই নেই।
সুতরাং উপদেশ গ্রহণ করো। তদনুযায়ী আমল করো। কেননা, যে উপদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে তার জাহান্নামের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হয়ে গেল।
ইরশাদ হয়েছে, فَمَا لَهُمْ عَنِ التَّذْكِرَةِ مُعْرِضِينَ * كَأَنَّهُمْ حُمُرُ مُسْتَنْفِرَةٌ . فَرَّتْ مِنْ قَسْوَرَةٍ 'তাদের কী হয়েছে যে, উপদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়? যেন তারা ভয় পেয়ে পলায়নকারী গাধা। যারা কোনো সিংহের ভয়ে পালিয়ে এসেছে।'১৬৮
জেনে রাখো, তোমাকে অবশ্যই একদিন আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান হতে হবে। সেদিন কোন মুখে তুমি জবাব দেবে? সুতরাং অত্যাবশ্যকীয় সে প্রশ্নের উত্তর প্রস্তুত করো। তুমি কি ভেবে দেখেছ, আল্লাহর শাস্তি থেকে মুক্তির জন্য তুমি কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছ?
জেনে রাখো, একমাত্র বিশুদ্ধ তাওহিদ এবং আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমেই কেবল তুমি আখেরাতের মর্মন্তুদ শাস্তি থেকে রক্ষা পাবে।
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالعَدْلِ وَالإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعْلَكُمْ تَذَكَّرُونَ فاذكروا الله العظيم الجليل يذكركم، واشكروه على نعمه يزدكم، ولذكر الله أكبر والله يعلم ما تصنعون।

টিকাঃ
১৬৭ সুরা শুয়ারা: ২১৮।
১৬৮ সুরা মুদ্দাছছির: ৪৯-৫২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00