📄 আল্লাহ আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার একটি গুণবাচক নাম হলো রাকিব। অর্থাৎ, ওই সত্তা যিনি সমগ্র সৃষ্টিজগত তার কুদরতি শক্তির দ্বারা পর্যবেক্ষণ করেন। পবিত্র কুরআনের তিনটি জায়গায় রাকিব নামটি বর্ণিত হয়েছে। সুরা মায়েদায়,
وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ أَأَنتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَهَيْنِ مِنْ دُونِ اللَّهِ قَالَ سُبْحَانَكَ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِي بِحَقِّ إِنْ كُنتُ قُلْتُهُ فَقَدْ عَلِمْتَهُ تَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي وَلَا أَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِكَ إِنَّكَ أَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ * مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَا أَمَرْتَنِي بِهِ أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ وَكُنتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَا دُمْتُ فِيهِمْ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ وَأَنْتَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ * إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
'যখন আল্লাহ বলবেন, হে মরিয়মপুত্র ঈসা! তুমি কি মানুষকে বলেছিলে যে, আল্লাহকে ছেড়ে তোমরা আমাকে ও আমার মাকে উপাস্য বানাও? সে বলবে, মহিমা তোমার! আমরা যা বলার অধিকার নেই আমি তো তা বলতে পারি না। আমি যদি অমন কথা বলতাম তাহলে তুমি তা অবশ্যই জানতে। আমার মনে কি আছে তুমি তা জানো আর আমার মনে কি আছে আমি তা জানি না। অদৃশ্য বিষয়াদি সম্পর্কে তো একমাত্র তুমিই সম্যক অবগত। তুমি আমাকে যা আদেশ দিয়েছিলে আমি তাদেরকে শুধু তাই বলেছি। আর তা হলো, তোমরা আমার প্রভু ও তোমাদের প্রভু আল্লাহর ইবাদত করো। আর আমি যতদিন তাদের মাঝে ছিলাম ততদিন তাদের কর্মকাণ্ড অবগত ছিলাম। তারপর তুমি যখন আমাকে লোকান্তরিত করেছ তখন থেকে তো তুমিই তাদের পর্যবেক্ষক ছিলে।'১৪৫
দ্বিতীয়ত সুরা নিসার শুরুতে,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
'হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রভুকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক ব্যক্তি থেকে। তার থেকে তার সঙ্গিনীকেও সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাদের দুজন থেকে অনেক নর-নারী সৃষ্টি করে ছড়িয়ে দিয়েছেন। আল্লাহকে ভয় করো, যার নামে তোমরা একে অপরের নিকট চেয়ে থাকো। রক্ত সম্পর্কের ব্যাপারেও সতর্ক থেকো। অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের পর্যবেক্ষণ করছেন। '১৪৬
প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা ইবনু জারির তাবারি রহ. বলেন, 'রাকিব' অর্থ হলো, আল্লাহ তায়ালা সকল কিছু পর্যবেক্ষণ করেন। ভূপৃষ্ঠের সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে। তিনি আমাদের আমল ও কর্মসমূহ সংরক্ষণ করেন। আমাদের সকল অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।'
এমনিভাবে সুরা আহযাবে বর্ণিত হয়েছে,
وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ رَقِيبًا
'আল্লাহ সবকিছুর ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখেন। '১৪৭ আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার ইলমের মাধ্যমে পৃথিবীর যাবতীয় কিছু পর্যবেক্ষণ করেন যে ইলম বেষ্টন করে রেখেছে সমগ্র জগতকে। যেমনটি ইরশাদ হয়েছে পবিত্র কুরআনে,
رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَّحْمَةً وَعِلْماً
'হে আমাদের প্রভু অনুগ্রহ ও জ্ঞান দ্বারা তুমি সবকিছু ধারণ করে আছ।' ১৪৮
তিনি জানেন যা অতীতে হয়েছে এবং ভবিষ্যতে হবে। তিনি ওই কুদরতি চক্ষুর মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করছেন সবকিছু, যে চক্ষু কখনো ঘুম ও তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয় না। তিনি ওই কুদরতি শ্রবণশক্তির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করছেন যা বেষ্টন করে রেখেছে প্রত্যেক নড়াচড়া ও প্রতিটি কথা।
কিন্তু আমাদের জীবন, আমাদের সকল কাজকর্ম, লেনদেন এবং আদান- প্রদানে আজ কোথায় এর প্রভাব? আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা রাকিব। তিনি পর্যবেক্ষণ করছেন আমাদের সকল কিছু। দেখছেন আমাদের সকল কৃতকর্ম। তিনি শুনছেন আমাদের সকল কথাবার্তা। অথচ এর ন্যূনতম অনুভূতি আমাদের মাঝে নেই। আমরা সর্বদা মত্ত আছি আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে। তার আদেশসমূহ পালন করছি না। নিষেধ থেকে বেঁচে থাকছি না।
টিকাঃ
১৪৫ সুরা মায়েদা: ১১৬-১১৮।
১৪৬ সুরা নিসা: ১
১৪৭ সুরা আহযাব: ৫২।
১৪৮ সুরা মুমিন: ৭।
📄 উমায়ের ইবনে ওয়াহাবের ইসলাম গ্রহণ
ঐতিহাসিক বহু গ্রন্থে বদর যুদ্ধ-পরবর্তী সংঘটিত এই ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। একদিন মক্কার উপকণ্ঠে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া এবং উমায়ের ইবনে ওয়াহাব গোপনে শলা পরামর্শ করছেন। সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার পিতা ও ভাই বদর যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে মর্মান্তিকভাবে নিহত হয়। এদিকে উমায়ের ইবনে ওয়াহাবের কনিষ্ঠ সন্তান মদিনায় مسلمانوں হাতে বন্দি। অত্যন্ত সঙ্গোপনে তারা আলোচনা করছে কীভাবে বদর যুদ্ধের প্রতিশোধ নেওয়া যায়। কীভাবে হত্যা করা যায় হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। উমায়ের ইবনে ওয়াহাব বললেন, আমার ছোটো সন্তান মদিনায় মুসলমানদের হাতে যদি বন্দি না থাকত তাহলে আমিই মদিনায় গিয়ে মুহাম্মদকে নির্মমভাবে হত্যা করে আসতাম। কিন্তু আমার ভয় হয়। এছাড়া আমি ব্যতীত পরিবারে উপার্জন করতে সক্ষম দ্বিতীয় কেউ নেই। আমার অনুপস্থিতিতে আমার সন্তানদের আহার জোটানোর কেউ নেই। উমায়ের ইবনে ওয়াহাবের এ কথা শুনে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া বলল, তোমার অনুপস্থিতিতে তোমার সন্তানদের দায়িত্ব আমি নিলাম। সুতরাং তুমি যাও-মদিনায় গিয়ে মুহাম্মদকে হত্যা করো। অবশেষে উমায়ের ইবনে ওয়াহাব সম্মত হলো। তবে কাউকে তাদের সিদ্ধান্তের কথা জানায়নি। তাদের পরামর্শের ব্যাপারে তৃতীয় কেউ জানে না—তবে আল্লাহ জানেন। কেননা, তিনি গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু জানেন। ইরশাদ হয়েছে,
يَعْلَمُ السِّرَّ وَأَخْفَى
'তিনি গোপন ও অধিকতর লুকায়িত বিষয়ও জানেন।'
উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য উমায়ের ইবনে ওয়াহাব গোপনে মদিনায় পৌঁছল। উমর রা. দূর থেকে দেখে ফেলেন উমায়ের ইবনে ওয়াহাব চুপিচুপি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মসজিদে নববিতে বসা। সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে দ্বীনি আলোচনা করছেন। হজরত উমর রা. দৌড়ে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর শত্রু উমায়ের এসেছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে আসতে দাও। উমায়ের এসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জাহিলিয়াতের রীতি অনুযায়ী অভিবাদন জানাল। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাসল্লাম বললেন, হে উমায়ের! আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তোমার দেওয়া অভিবাদন থেকে উত্তম অভিবাদন শিক্ষা দিয়েছেন। আর তাই হবে জান্নাতিদের অভিবাদন।
تَحِيَّتُهُمْ يَوْمَ يَلْقَوْنَهُ سَلَامٌ
'যেদিন তারা আল্লাহর সাথে মিলিত হবে সেদিন তাদের অভিবাদন হবে সালাম।'
অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমায়েরকে মদিনায় আগমনের কারণ জিজ্ঞেস করলেন। উমায়ের বলল, আমি আপনাদের হাতে বন্দি আমার সন্তানকে মক্কায় ফিরিয়ে নিতে এসেছি। আপনি তার ব্যাপারে উত্তম আচরণ করুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার জিজ্ঞেস করলেন, উমায়ের! তাহলে তোমার হাতে তরবারি কেন? তোমার আগমনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? হে উমায়ের! তুমি সত্য বলো, কেন এসেছ তুমি মদিনায়? নবীজির উপর্যুপরি প্রশ্ন শুনে উমায়ের চুপ করে আছে।
উমায়ের তার আগমনের প্রকৃত কারণ বলছে না দেখে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে উমায়ের! শোনো আমি বলছি, কেন এসেছ তুমি এখানে। তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার সাথে তার আলাপচারিতার কথা বিস্তারিত তুলে ধরেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে তাদের গোপন পরামর্শের কথা শুনে উমায়ের আকস্মিক হকচকিয়ে গেল। তার হৃদয়ের পর্দা যেন সরে গেল। উমায়ের বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আল্লাহর রাসুল।
হে আল্লাহ রাসুল! আমি ও সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া যে আলোচনা করেছি তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। আল্লাহ আপনাকে সে বিষয়ে অবগত করেছেন। আপনি সত্যিই আল্লাহর রাসুল। হে আল্লাহর রাসুল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং আপনি তার রাসুল। অতঃপর উমায়ের বলল, সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন। উমায়ের তখনই মুসলমান হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পূর্বে যে ছিল কাফের, সে এখন সাহাবি।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! গভীরভাবে চিন্তা করো আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার এই বাণী সম্পর্কে যা তিনি পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, يَسْتَخْفُونَ مِنَ النَّاسِ وَلَا يَسْتَخْفُونَ مِنَ اللَّهِ وَهُوَ مَعَهُمْ إِذْ يُبَيِّتُونَ مَا لَا يَرْضَى مِنَ الْقَوْلِ وَكَانَ اللَّهُ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطًا
'তারা মানুষের কাছ থেকে গোপন রাখতে চায় কিন্তু আল্লাহর কাছ থেকে গোপন রাখতে পারে না। কারণ, তারা যখন রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে এমনসব কথা বলে যা আল্লাহ পছন্দ করেন না, তখন তিনি তাদের সাথেই থাকেন। আল্লাহ তাদের কাজকর্ম পরিবেষ্টন করে আছেন।' ১৪৯
হে আল্লাহর বান্দাগণ! পবিত্র কুরআনের আয়াত সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করো। কেন এই আয়াতের প্রভাব আমাদের জীবনে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। কেন আমরা সতর্ক হই না। কেন আমরা বিরত থাকি না অবাধ্যতা ও নাফরমানি থেকে? আল্লাহ আমাদের দেখছেন, আমাদের যাবতীয় কাজকর্ম তিনি বেষ্টন করে আছেন, তথাপিও আমরা কীভাবে মত্ত হচ্ছি পাপাচারে? আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেছেন, وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي أَنفُسِكُمْ فَاحْذَرُوهُ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَفُورٌ حَلِيمٌ
'জেনে রাখো! আল্লাহ তোমাদের মনের কথা জানেন। অতএব তাকে ভয় করো। জেনে রাখো! আল্লাহ ক্ষমাপরায়ণ ও সহনশীল।' ১৫০
হে আল্লাহর বান্দাগণ! হজরত উমায়ের ইবনে ওয়াহাব যখন আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও বড়োত্ব সম্পর্কে জানতে পারল তখন সে ইসলাম গ্রহণ করল। আমাদের অন্তরে কি আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও বড়োত্বের পরিচয় উদঘাটিত হয়নি? আমরা কি জানি না আল্লাহর এ বাণী,
وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَا تَسْقُطُ مِن وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ. إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ لا يَخْفَى عَلَيْهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السماء.
'যাবতীয় অদৃশ্যের চাবি তার কাছে। তিনি ছাড়া কেউ তা জানে না। স্থলে ও জলে যা কিছু আছে সবই তিনি জানেন। যে পাতাটি পড়ে তাও তার জানা আছে। আবার ভূমির অন্ধকারে যে শস্যদানাটি কিংবা যে আর্দ্র বা শুষ্ক বস্তুটি আছে তাও একটি স্পষ্ট গ্রন্থে লিখিত আছে। '১৫১
আল্লাহ তায়ালার অসংখ্য গুণবাচক নামসমূহের একটি হলো হাফিজ। তিনি ওই সত্তা যিনি তার সমগ্র সৃষ্টিজগতকে হেফাজত করেন। তিনি যা সৃষ্টি করেছেন সবকিছুকে তার অসীম ইলম বেষ্টন করে রাখে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার প্রিয় বান্দাদেরকে পাপ ও ধ্বংস থেকে হেফাজত করেন। তাদের আমল ও পুরস্কার তাদের জন্য সংরক্ষণ করে রাখেন পরকাল দিবসের জন্য।
احفظ الله يحفظك 'তুমি আল্লাহকে হেফাজত করো, তাহলে আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করবেন।'
এ কথার অর্থ হলো, তুমি আল্লাহর দেওয়া সীমারেখা অতিক্রম করা থেকে নিজেকে হেফাজত করো। তার যাবতীয় হক যথোচিত আদায় করো। তিনি যে সমস্ত আদেশ দিয়েছেন সেগুলো পালন করো। নিষেধ থেকে সর্বতোভাবে বিরত থাকো। সকল ওয়াজিব আদায় করো। হারাম ও নাজায়েজ থেকে বেঁচে থাকো।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ওই সমস্ত বান্দাদের প্রশংসা করেছেন যারা তার দেওয়া সীমারেখা অতিক্রম করে না। মুমিনদের গুণাবলি উল্লেখ করতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
التَّائِبُونَ الْعَابِدُونَ الْحَامِدُونَ السَّائِحُونَ الرَّاكِعُونَ السَّاجِدُونَ الآمِرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّاهُونَ عَنِ الْمُنكَرِ وَالْحَافِظُونَ لِحُدُودِ اللَّهِ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ
'(মুমিনগণ) তাওবাকারী, ইবাদতকারী, আল্লাহর প্রশংসাকারী, রোজা পালনকারী, রুকু-সেজদাকারী, ন্যায়ের আদেশ দানকারী, অন্যায় থেকে বিরতকারী এবং আল্লাহর সীমাসমূহ রক্ষাকরী। (হে নবী!) আপনি মুমিনদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিন।১৫২
টিকাঃ
১৪৯ সুরা নিসা: ১০৮
১৫০ সুরা বাকারা: ২৩৫
১৫১সুরা আনআম: ৫৯
১৫২ সুরা তাওবাহ: ১১২।
📄 তাওহিদের গুরুত্ব
আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের ওপর যা কিছু ওয়াজিব করেছেন তন্মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো তাওহিদ। তাওহিদের অর্থ হলো, একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা। তার সাথে অন্য কাউকে শরিক না করা।
বুখারি শরিফে হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
بينما كنت أسير مع النبي صلى الله عليه وسلم، إذ قال : يا معاذ بن جبل ! قلت: لبيك وسعديك يا رسول الله! قال: أتدري ما حق الله على العباد؟ قلت: الله ورسوله أعلم، قال: حق الله على العباد: أن يعبدوه ولا يشركوا به شيئاً، ثم سار ساعة، ثم قال: يا معاذ بن جبل ! قلت: لبيك وسعديك يا رسول الله قال: أتدري ما حق العباد على الله إن هم فعلوا؟ - أي: أتدري ما حقهم على الله إن هم عبدوه ولم يشركوا به شيئاً؟- قلت: الله ورسوله أعلم، قال: حقهم عليه ألا يعذبه
'আমি একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে পথ চলছিলাম। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন হে মুয়াজ ইবনে জাবাল! আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি উপস্থিত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি জানো বান্দাদের ওপর আল্লাহর হক কী? আমি বললাম, আল্লাহ ও তার রাসুলই অধিক ভালো জানেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বান্দাদের ওপর আল্লাহর হক হলো, আল্লাহর ইবাদত করা এবং তার সাথে কাউকে শরিক না করা। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে মুয়াজ ইবনে জাবাল! বান্দা যদি তার হক আদায় করে তাহলে বান্দাদের ওপর আল্লাহর হক কী তা জানো? আমি বললাম, আল্লাহ ও তার রাসুলই ভালো জানেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি বান্দাগণ আল্লাহর হক আদায় করে তাহলে আল্লাহর ওপর বান্দাদের হক হলো আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দেবেন না।'১৫৩
আল্লাহর ওপর বান্দাদের হক হলো, তারা যদি আল্লাহর ইবাদত করে, তাকে এক ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করে, তার সাথে কাউকে শরিক না করে তাহলে তিনি তাদেরকে শান্তি দেবেন না। আর যদি আল্লাহ তাদেরকে শান্তি না দেন তাহলে তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। সুতরাং আল্লাহ তায়ালা বান্দাদেরকে যে সমস্ত আদেশ দিয়েছেন তন্মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো, তাওহিদ। তাওহিদের প্রচার-প্রসারের জন্য আল্লাহ তায়ালা কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। প্রেরণ করেছেন অগণিত রাসুল।
ইরশাদ হয়েছে, لِيَعْلَمَ أَنْ قَدْ أَبْلَغُوا رِسَالَاتِ رَبِّهِمْ وَأَحَاطَ بِمَا لَدَيْهِمْ وَأَحْصَى كُلَّ شَيْءٍ عَدَدًا
'যেন জানতে পারেন যে, তারা তাদের প্রভুর বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। তাদের কাছে যা আছে তা তিনি বেষ্টন করে আছেন এবং সবকিছুই গুণে গুণে হিসাব রাখছেন।' সুরা জিন: ২৮।
টিকাঃ
১৫৩ বুখারি, মুসলিম।
📄 নামাজের প্রতি যত্নবান হও
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে যে সমস্ত বিষয় হেফাজত করার আদেশ দিয়েছেন তন্মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো নামাজ। পবিত্র কুরআনের বহু জায়গায় আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে নামাজের আদেশ দিয়েছেন। ঈমানের পর সর্বাধিক পছন্দনীয় ইবাদত হলো নামাজ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজের ব্যাপারে তার উম্মতকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছেন। অথচ অধিকাংশ মানুষ আজ নামাজের প্রতি উদাসীন। ইরশাদ হয়েছে,
حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ والصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَقُومُوا لِلَّه قَانِتِينَ
'তোমরা নামাজের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী (আসরের) নামাজের প্রতি; আর আল্লাহর সামনে একনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়াও।'১৫৪ অপর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নামাজের প্রতি যত্নবান মুমিনদের প্রশংসাস্বরূপ ইরশাদ করেন,
وَالَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُونَ 'যারা তাদের নামাজের ব্যাপারে যত্নবান। '১৫৫
যারা নামাজের প্রতি যত্নবান হবে, নামাজকে সকল রুকনসহ যথাযথ আদায় করবে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে তার ক্রোধ ও শাস্তি থেকে হেফাজত করবেন। কিয়ামতের দিন তাদেরকে তিনি নাজাত দেবেন।
জেনে রাখো, নামাজ হলো সর্বোত্তম ইবাদত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
واعلموا أن خير أعمالكم الصلاة
'জেনে রাখো, তোমাদের শ্রেষ্ঠ আমল হলো নামাজ।'১৫৬
আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তায়ালা তাওহিদের পর সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছেন নামাজের প্রতি।
আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন, 'নামাজ বান্দার রিজিক টেনে আনে। বান্দাকে সুস্থ ও সবল রাখে। সমস্ত কষ্ট দূর করে। নামাজ বান্দার অন্তরকে শক্তিশালী করে। চেহারাকে করে সমুজ্জ্বল। অন্তরকে রাখে প্রফুল্ল। নামাজ শরীরের অলসতাকে দূর করে। বক্ষকে প্রসারিত করে। নামাজ আত্মার খাদ্যস্বরূপ। আত্মাকে করে আলোকিত। নামাজ বান্দাকে দেওয়া আল্লাহর নেয়ামতকে হেফাজত করে। বৃদ্ধি করে বরকতসমূহ। শয়তানকে দূরে ঠেলে দেয়। আল্লাহর নিকটবর্তী করে।'
মন্দ ও ক্ষতিকর বিষয়সমূহ দূরীকরণে নামাজের রয়েছে বিস্ময়কর প্রভাব। বিশেষ করে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সকল শর্ত পূরণ করে যদি নামাজ আদায় করা হয় তাহলে উক্ত নামাজ দুনিয়ার ক্ষতি এবং আখেরাতের শান্তি দূরীকরণে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
নামাজ আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক স্থাপন করে। যার সম্পর্ক যত অধিক ও গাঢ় হবে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য সে পরিমাণ কল্যাণের দুয়ার উন্মোচন করে দেবেন। যেমনটি বর্ণিত হয়েছে হাদিসে কুদসিতে,
يا ابن آدم اركع لي من أول النهار أربع ركعات أكفك آخره
'হে আদমসন্তান! তুমি দিনের শুরুতে আমার জন্য চার রাকাত নামাজ আদায় করো, আমি তোমার সারা দিনের দায়িত্ব নিয়ে নিলাম।'
নামাজ মুমিনকে অশ্রীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। নামাজ মুমিনকে গোনাহ থেকে হেফাজত করে। নামাজ মুমিনের জন্য গোনাহ থেকে বিরত থাকার রক্ষাকবচ। পক্ষান্তরে যারা নামাজের প্রতি উদাসীন, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে ধ্বংস ও বিরাট ক্ষতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ইরশাদ হয়েছে, فَخَلَفَ مِن بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيّاً
'তাদের পরে এমন এক প্রজন্ম এল যারা নামাজ নষ্ট করল এবং প্রবৃত্তির বশবর্তী হলো। অতএব তারা ভ্রষ্টতার পরিণতি দেখতে পাবে।' ১৫৭
কিন্তু আজ কেমন আমাদের নামাজ? আমরা কি নামাজের প্রতি যত্নবান? আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে পর্যবেক্ষণ করছেন না? আমরা কি এ আয়াত সম্পর্কে সামান্যতম চিন্তা-ভাবনা করি না?
الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ، وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ 'যখন তুমি নামাজে দাঁড়াও তিনি তোমাকে দেখেন এবং সিজদাকারীদের সাথে তোমার উঠাবসা দেখেন।'
অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হলো, আমরা আজ নামাজের প্রতি অতি উদাসীন। হে আল্লাহর বান্দা! তুমি জিজ্ঞেস করো নিজেকে কতবার তোমার জামাত ছুটে গেছে? কতবার তোমার তাকবিরে উলা ছুটে গেছে? কতদিন তুমি ফজরের নামাজের সময় ঘুমের ঘোরে বিভোর ছিলে?
আল্লাহর শপথ! ততদিন পর্যন্ত আমাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না যতদিন আমরা নামাজের প্রতি যত্নবান হবো। আল্লাহ শপথ! আমাদের ধ্বংস ও অধঃপতনের পরিবর্তন সেদিনই হবে যেদিন আমরা নামাজের কাতারে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াব।
টিকাঃ
১৫৪ সুরা বাকারা: ২৩৮।
১৫৫ সুরা মুমিন: ৯।
১৫৬ ইবনে মাজাহ: ২৭৭।
১৫৭ সুরা মারইয়াম: ৫৯।