📘 আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালবাসেন > 📄 ভরসা একমাত্র আল্লাহর ওপর

📄 ভরসা একমাত্র আল্লাহর ওপর


আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন, وَتَوَكَّلْ عَلَى الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ * الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ . وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ * إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ 'আর পরাক্রমশালী ও দয়াময় আল্লাহর ওপর ভরসা করো, যিনি তোমাকে দেখতে পান যখন তুমি নামাজে দাঁড়াও এবং দেখতে পান যখন সেজদাকারীর মাঝে তোমার ওঠাবসা। তিনি সবকিছু শোনেন, সবকিছু জানেন। '১৪১
প্রখ্যাত মুফাসসির ইমাম সাদি বলেন, যার অন্তরে আল্লাহর প্রতি অগাধ আস্থা ও পরিপূর্ণ ভরসা রয়েছে সে ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা অধিক আনুগত্য ও ইবাদত করার তাওফিক দান করেন। তাই বান্দার জন্য করণীয় হলো, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভরসা ও অগাধ আস্থা তৈরির জন্য প্রার্থনা করা। পবিত্র কুরআনুল কারিমে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন, وَتَوَكَّلْ عَلَى الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ 'আর পরাক্রমশালী ও দয়াময় আল্লাহর ওপর ভরসা করো।'
তাওয়াক্কুল হলো উপকার লাভ এবং ক্ষতি থেকে বাঁচার ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার ওপর অন্তরের ভরসা স্থাপন। তার প্রতি অগাধ আস্থা এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণে সুধারণা পোষণ করা। নিশ্চয় তিনি পরাক্রমশালী, বান্দার প্রতি দয়ালু। তার একক ক্ষমতা ও শক্তিবলে তিনি বান্দাকে কল্যাণ দান এবং ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সক্ষম। আর এ সবকিছুই তার রহমত ও সীমাহীন দয়া।
আল্লাহ তায়ালা বান্দাদেরকে তার সকল আদেশ পালন করতে, নিষেধ থেকে বিরত থাকতে এবং অন্তরে তার নৈকট্যলাভের আকাঙ্ক্ষা জিইয়ে রাখার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। অতঃপর ক্রমান্বয়ে তিনি বান্দাকে ইহসানের স্তরে উন্নীত হওয়ার আদেশ দিয়েছেন।
ইরশাদ হয়েছে, الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ * وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ 'যিনি তোমাকে দেখতে পান যখন তুমি নামাজে দাঁড়াও এবং দেখতে পান সেজদাকারীর মাঝে তোমার ওঠাবসা। ১৪২
অর্থাৎ, আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তোমাকে দেখছেন যখন তুমি নামাজ আদায় করছ। তোমার দাঁড়ানো, তোমার রুকু, তোমার সেজদা যাবতীয় কিছু তিনি পর্যবেক্ষণ করছেন।
এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বিশেষভাবে নামাজের কথা উল্লেখ করার কারণ হলো, নামাজের ফজিলত ও মাহাত্ম্য অপরিসীম। অন্যান্য ইবাদতের ওপর নামাজের প্রাধান্য রয়েছে। নামাজে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অধিক অর্জিত হয়। নামাজে আল্লাহর সাথে বান্দা কথোপকথন করে। বান্দা তখন অধিক খুশু-খুজু, বিনয় ও নম্রতার সাথে আল্লাহকে অনুভব করে। নামাজ এমন এক ইবাদত যেখানে বান্দা নিজেকে সর্বোচ্চ মিটিয়ে দেয়। তার সবচেয়ে সম্মানিত অঙ্গ মাথাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে প্রস্ফুটিত হয় আল্লাহর বড়োত্ব ও মাহাত্ম্য-যা অন্যান্য ইবাদতে সম্ভব হয় না।
অতঃপর ইরশাদ হয়েছে, إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ 'তিনি সবকিছু শোনেন, সবকিছু জানেন। ১৪৩
অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালা সমস্ত কিছু শুনেন। দৃশ্য, অদৃশ্য, ছোটো-বড়ো বিশাল বিশ্বমণ্ডলের ন্যূনতম কিছুই তার শ্রবণের বাহিরে নয়। এমনিভাবে আসমান-জমিন, সকল সৃষ্টিরাজির প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ সবকিছু তার জ্ঞানের অন্তর্গত। বান্দার প্রতিটি অবস্থা তিনি দেখছেন। তাদের অন্তরে যে সমস্ত চিন্তা, কল্পনারপ্রতিটি কথা তিনি শ্রবণ করছেন। তাদের উদ্রেক হয় তার সবই তিনি অবগত। বান্দা যখন আল্লাহর এ বিশাল ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারে তখন সে ইহসানের স্তরে উন্নীত হতে থাকে।

টিকাঃ
১৪১ সুরা শুআরা: ২১৭-২২০।

📘 আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালবাসেন > 📄 হৃদয়ে আল্লাহর মুরাকাবা

📄 হৃদয়ে আল্লাহর মুরাকাবা


রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন ইহসানের পরিচয় জিজ্ঞেস করা হয় তখন তিনি বলেন ইহসান হলো,
أن تعبد الله كأنك تراه، فإن لم تكن tراه فإنه يراك 'তুমি আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে করো যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ। আর যদি তুমি আল্লাহকে না দেখো তাহলে ভেবো, আল্লাহ তোমাকে দেখছেন।'
অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা তোমাকে দেখছেন। তিনি তোমার গোপন, প্রকাশ্য সবকিছু জানেন। তুমি যদি মরুভূমিতে থাকো, জমিনে থাকো কিংবা আসমানে, একাকী থাকো অথবা সকলের সাথে, আল্লাহ সর্বাবস্থায় তোামকে দেখছেন।
ইরশাদ হয়েছে,
يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنْزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ 'আল্লাহ জানেন-যা জমিনে প্রবেশ করে এবং যা জমিন থেকে বের হয়, তিনি জানেন যা আরোহণ করে। আল্লাহ তোমাদের সাথে আছেন তোমরা যেখানেই থাকো। তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ জানেন।'১৪৪
সুতরাং ইহসান হলো আল্লাহর বড়োত্ব ও তার সব সময় কর্তৃত্বের ব্যাপারে অন্তরে সুদৃঢ় বিশ্বাস করা স্থাপন করা। সর্বাবস্থায় হৃদয়ে তার মুরাকাবা করা।
মুরাকাবার অর্থ মুরাকাবার অর্থ কী? শাইখ ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন, 'মুরাকাবা হলো বান্দা সর্বদা এ কথা জানা ও বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ তায়ালা তার প্রকাশ্য, অপ্রকাশ্য সকল কিছুর ব্যাপারে অবগত। আল্লাহর ব্যাপারে বান্দার অন্তরে এ ইলম ও ইয়াকিন জাগ্রত থাকার নামই মুরাকাবা। অন্তরে এ বোধ ও বিশ্বাসের ফলাফল হলো, বান্দা জানবে যে আল্লাহ তাকে পর্যবেক্ষণ করছেন, তাকে দেখছেন, তার কথা শুনছেন, তার যাবতীয় কাজ-কর্ম সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন।'
জনৈক সালাফ বলেন, 'অন্তরে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে স্থান দেওয়ার ব্যাপারে আমি লজ্জাবোধ করি। কেননা আমি দেখি, আল্লাহ আমার অন্তরে বিরাজমান।'
শাইখ যুন্নুন বলেন, 'মুরাকাবার নিদর্শন হলো, সর্বদা আল্লাহকে প্রাধান্য দেওয়া। আল্লাহ যা কিছু সম্মানিত করেছেন সেগুলোর যথাযথ সম্মান রক্ষা করা। যা কিছু লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেছেন তা লাঞ্ছিত ও অপমানিত করা।'
শাইখ ইবরাহিম বলেন, 'মুরাকাবা হলো প্রকাশ্য, অপ্রকাশ্য সকল কাজকর্ম একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা।'
উলামায়ে কেরাম বলেন, 'সর্বোত্তম ইবাদত হলো হৃদয়ে আল্লাহর মুরাকাবা করা।'
আল্লাহর পবিত্র নাম ও গুণাবলির প্রভাব
ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন, 'মুরাকাবা হলো আল্লাহর পবিত্র নাম ও গুণাবলির ইলম অর্জন করা। এগুলোর অর্থ জানা এবং মর্ম হৃদয়ে উপলব্ধি করা অতঃপর তদনুযায়ী ইবাদত করা।'
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, 'পবিত্র কুরআনে জান্নাত- জাহান্নামের চেয়ে অধিক আলোচিত হয়েছে আল্লাহর পবিত্র নাম ও গুণাবলি। আল্লাহর নাম ও গুণাবলি সম্বলিত আয়াত মর্যাদার দিক দিয়ে আখেরাতের আলোচনা সম্বলিত আয়াতের চেয়ে অধিক।'

টিকাঃ
১৪২ সুরা শুআরা: ২১৭-২২০।
১৪৩ সুরা শুআরা: ২১৭-২২০।
১৪৪ সুরা সাবা: ২

📘 আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালবাসেন > 📄 আল্লাহ আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন

📄 আল্লাহ আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন


আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার একটি গুণবাচক নাম হলো রাকিব। অর্থাৎ, ওই সত্তা যিনি সমগ্র সৃষ্টিজগত তার কুদরতি শক্তির দ্বারা পর্যবেক্ষণ করেন। পবিত্র কুরআনের তিনটি জায়গায় রাকিব নামটি বর্ণিত হয়েছে। সুরা মায়েদায়,
وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ أَأَنتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَهَيْنِ مِنْ دُونِ اللَّهِ قَالَ سُبْحَانَكَ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِي بِحَقِّ إِنْ كُنتُ قُلْتُهُ فَقَدْ عَلِمْتَهُ تَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي وَلَا أَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِكَ إِنَّكَ أَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ * مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَا أَمَرْتَنِي بِهِ أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ وَكُنتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَا دُمْتُ فِيهِمْ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ وَأَنْتَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ * إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
'যখন আল্লাহ বলবেন, হে মরিয়মপুত্র ঈসা! তুমি কি মানুষকে বলেছিলে যে, আল্লাহকে ছেড়ে তোমরা আমাকে ও আমার মাকে উপাস্য বানাও? সে বলবে, মহিমা তোমার! আমরা যা বলার অধিকার নেই আমি তো তা বলতে পারি না। আমি যদি অমন কথা বলতাম তাহলে তুমি তা অবশ্যই জানতে। আমার মনে কি আছে তুমি তা জানো আর আমার মনে কি আছে আমি তা জানি না। অদৃশ্য বিষয়াদি সম্পর্কে তো একমাত্র তুমিই সম্যক অবগত। তুমি আমাকে যা আদেশ দিয়েছিলে আমি তাদেরকে শুধু তাই বলেছি। আর তা হলো, তোমরা আমার প্রভু ও তোমাদের প্রভু আল্লাহর ইবাদত করো। আর আমি যতদিন তাদের মাঝে ছিলাম ততদিন তাদের কর্মকাণ্ড অবগত ছিলাম। তারপর তুমি যখন আমাকে লোকান্তরিত করেছ তখন থেকে তো তুমিই তাদের পর্যবেক্ষক ছিলে।'১৪৫
দ্বিতীয়ত সুরা নিসার শুরুতে,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
'হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রভুকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক ব্যক্তি থেকে। তার থেকে তার সঙ্গিনীকেও সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাদের দুজন থেকে অনেক নর-নারী সৃষ্টি করে ছড়িয়ে দিয়েছেন। আল্লাহকে ভয় করো, যার নামে তোমরা একে অপরের নিকট চেয়ে থাকো। রক্ত সম্পর্কের ব্যাপারেও সতর্ক থেকো। অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের পর্যবেক্ষণ করছেন। '১৪৬
প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা ইবনু জারির তাবারি রহ. বলেন, 'রাকিব' অর্থ হলো, আল্লাহ তায়ালা সকল কিছু পর্যবেক্ষণ করেন। ভূপৃষ্ঠের সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে। তিনি আমাদের আমল ও কর্মসমূহ সংরক্ষণ করেন। আমাদের সকল অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।'
এমনিভাবে সুরা আহযাবে বর্ণিত হয়েছে,
وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ رَقِيبًا
'আল্লাহ সবকিছুর ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখেন। '১৪৭ আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার ইলমের মাধ্যমে পৃথিবীর যাবতীয় কিছু পর্যবেক্ষণ করেন যে ইলম বেষ্টন করে রেখেছে সমগ্র জগতকে। যেমনটি ইরশাদ হয়েছে পবিত্র কুরআনে,
رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَّحْمَةً وَعِلْماً
'হে আমাদের প্রভু অনুগ্রহ ও জ্ঞান দ্বারা তুমি সবকিছু ধারণ করে আছ।' ১৪৮
তিনি জানেন যা অতীতে হয়েছে এবং ভবিষ্যতে হবে। তিনি ওই কুদরতি চক্ষুর মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করছেন সবকিছু, যে চক্ষু কখনো ঘুম ও তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয় না। তিনি ওই কুদরতি শ্রবণশক্তির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করছেন যা বেষ্টন করে রেখেছে প্রত্যেক নড়াচড়া ও প্রতিটি কথা।
কিন্তু আমাদের জীবন, আমাদের সকল কাজকর্ম, লেনদেন এবং আদান- প্রদানে আজ কোথায় এর প্রভাব? আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা রাকিব। তিনি পর্যবেক্ষণ করছেন আমাদের সকল কিছু। দেখছেন আমাদের সকল কৃতকর্ম। তিনি শুনছেন আমাদের সকল কথাবার্তা। অথচ এর ন্যূনতম অনুভূতি আমাদের মাঝে নেই। আমরা সর্বদা মত্ত আছি আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে। তার আদেশসমূহ পালন করছি না। নিষেধ থেকে বেঁচে থাকছি না।

টিকাঃ
১৪৫ সুরা মায়েদা: ১১৬-১১৮।
১৪৬ সুরা নিসা: ১
১৪৭ সুরা আহযাব: ৫২।
১৪৮ সুরা মুমিন: ৭।

📘 আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালবাসেন > 📄 উমায়ের ইবনে ওয়াহাবের ইসলাম গ্রহণ

📄 উমায়ের ইবনে ওয়াহাবের ইসলাম গ্রহণ


ঐতিহাসিক বহু গ্রন্থে বদর যুদ্ধ-পরবর্তী সংঘটিত এই ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। একদিন মক্কার উপকণ্ঠে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া এবং উমায়ের ইবনে ওয়াহাব গোপনে শলা পরামর্শ করছেন। সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার পিতা ও ভাই বদর যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে মর্মান্তিকভাবে নিহত হয়। এদিকে উমায়ের ইবনে ওয়াহাবের কনিষ্ঠ সন্তান মদিনায় مسلمانوں হাতে বন্দি। অত্যন্ত সঙ্গোপনে তারা আলোচনা করছে কীভাবে বদর যুদ্ধের প্রতিশোধ নেওয়া যায়। কীভাবে হত্যা করা যায় হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। উমায়ের ইবনে ওয়াহাব বললেন, আমার ছোটো সন্তান মদিনায় মুসলমানদের হাতে যদি বন্দি না থাকত তাহলে আমিই মদিনায় গিয়ে মুহাম্মদকে নির্মমভাবে হত্যা করে আসতাম। কিন্তু আমার ভয় হয়। এছাড়া আমি ব্যতীত পরিবারে উপার্জন করতে সক্ষম দ্বিতীয় কেউ নেই। আমার অনুপস্থিতিতে আমার সন্তানদের আহার জোটানোর কেউ নেই। উমায়ের ইবনে ওয়াহাবের এ কথা শুনে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া বলল, তোমার অনুপস্থিতিতে তোমার সন্তানদের দায়িত্ব আমি নিলাম। সুতরাং তুমি যাও-মদিনায় গিয়ে মুহাম্মদকে হত্যা করো। অবশেষে উমায়ের ইবনে ওয়াহাব সম্মত হলো। তবে কাউকে তাদের সিদ্ধান্তের কথা জানায়নি। তাদের পরামর্শের ব্যাপারে তৃতীয় কেউ জানে না—তবে আল্লাহ জানেন। কেননা, তিনি গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু জানেন। ইরশাদ হয়েছে,
يَعْلَمُ السِّرَّ وَأَخْفَى
'তিনি গোপন ও অধিকতর লুকায়িত বিষয়ও জানেন।'
উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য উমায়ের ইবনে ওয়াহাব গোপনে মদিনায় পৌঁছল। উমর রা. দূর থেকে দেখে ফেলেন উমায়ের ইবনে ওয়াহাব চুপিচুপি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মসজিদে নববিতে বসা। সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে দ্বীনি আলোচনা করছেন। হজরত উমর রা. দৌড়ে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর শত্রু উমায়ের এসেছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে আসতে দাও। উমায়ের এসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জাহিলিয়াতের রীতি অনুযায়ী অভিবাদন জানাল। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাসল্লাম বললেন, হে উমায়ের! আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তোমার দেওয়া অভিবাদন থেকে উত্তম অভিবাদন শিক্ষা দিয়েছেন। আর তাই হবে জান্নাতিদের অভিবাদন।
تَحِيَّتُهُمْ يَوْمَ يَلْقَوْنَهُ سَلَامٌ
'যেদিন তারা আল্লাহর সাথে মিলিত হবে সেদিন তাদের অভিবাদন হবে সালাম।'
অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমায়েরকে মদিনায় আগমনের কারণ জিজ্ঞেস করলেন। উমায়ের বলল, আমি আপনাদের হাতে বন্দি আমার সন্তানকে মক্কায় ফিরিয়ে নিতে এসেছি। আপনি তার ব্যাপারে উত্তম আচরণ করুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার জিজ্ঞেস করলেন, উমায়ের! তাহলে তোমার হাতে তরবারি কেন? তোমার আগমনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? হে উমায়ের! তুমি সত্য বলো, কেন এসেছ তুমি মদিনায়? নবীজির উপর্যুপরি প্রশ্ন শুনে উমায়ের চুপ করে আছে।
উমায়ের তার আগমনের প্রকৃত কারণ বলছে না দেখে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে উমায়ের! শোনো আমি বলছি, কেন এসেছ তুমি এখানে। তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার সাথে তার আলাপচারিতার কথা বিস্তারিত তুলে ধরেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে তাদের গোপন পরামর্শের কথা শুনে উমায়ের আকস্মিক হকচকিয়ে গেল। তার হৃদয়ের পর্দা যেন সরে গেল। উমায়ের বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আল্লাহর রাসুল।
হে আল্লাহ রাসুল! আমি ও সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া যে আলোচনা করেছি তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। আল্লাহ আপনাকে সে বিষয়ে অবগত করেছেন। আপনি সত্যিই আল্লাহর রাসুল। হে আল্লাহর রাসুল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং আপনি তার রাসুল। অতঃপর উমায়ের বলল, সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন। উমায়ের তখনই মুসলমান হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পূর্বে যে ছিল কাফের, সে এখন সাহাবি।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! গভীরভাবে চিন্তা করো আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার এই বাণী সম্পর্কে যা তিনি পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, يَسْتَخْفُونَ مِنَ النَّاسِ وَلَا يَسْتَخْفُونَ مِنَ اللَّهِ وَهُوَ مَعَهُمْ إِذْ يُبَيِّتُونَ مَا لَا يَرْضَى مِنَ الْقَوْلِ وَكَانَ اللَّهُ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطًا
'তারা মানুষের কাছ থেকে গোপন রাখতে চায় কিন্তু আল্লাহর কাছ থেকে গোপন রাখতে পারে না। কারণ, তারা যখন রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে এমনসব কথা বলে যা আল্লাহ পছন্দ করেন না, তখন তিনি তাদের সাথেই থাকেন। আল্লাহ তাদের কাজকর্ম পরিবেষ্টন করে আছেন।' ১৪৯
হে আল্লাহর বান্দাগণ! পবিত্র কুরআনের আয়াত সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করো। কেন এই আয়াতের প্রভাব আমাদের জীবনে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। কেন আমরা সতর্ক হই না। কেন আমরা বিরত থাকি না অবাধ্যতা ও নাফরমানি থেকে? আল্লাহ আমাদের দেখছেন, আমাদের যাবতীয় কাজকর্ম তিনি বেষ্টন করে আছেন, তথাপিও আমরা কীভাবে মত্ত হচ্ছি পাপাচারে? আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেছেন, وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي أَنفُسِكُمْ فَاحْذَرُوهُ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَفُورٌ حَلِيمٌ
'জেনে রাখো! আল্লাহ তোমাদের মনের কথা জানেন। অতএব তাকে ভয় করো। জেনে রাখো! আল্লাহ ক্ষমাপরায়ণ ও সহনশীল।' ১৫০
হে আল্লাহর বান্দাগণ! হজরত উমায়ের ইবনে ওয়াহাব যখন আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও বড়োত্ব সম্পর্কে জানতে পারল তখন সে ইসলাম গ্রহণ করল। আমাদের অন্তরে কি আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও বড়োত্বের পরিচয় উদঘাটিত হয়নি? আমরা কি জানি না আল্লাহর এ বাণী,
وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَا تَسْقُطُ مِن وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ. إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ لا يَخْفَى عَلَيْهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السماء.
'যাবতীয় অদৃশ্যের চাবি তার কাছে। তিনি ছাড়া কেউ তা জানে না। স্থলে ও জলে যা কিছু আছে সবই তিনি জানেন। যে পাতাটি পড়ে তাও তার জানা আছে। আবার ভূমির অন্ধকারে যে শস্যদানাটি কিংবা যে আর্দ্র বা শুষ্ক বস্তুটি আছে তাও একটি স্পষ্ট গ্রন্থে লিখিত আছে। '১৫১
আল্লাহ তায়ালার অসংখ্য গুণবাচক নামসমূহের একটি হলো হাফিজ। তিনি ওই সত্তা যিনি তার সমগ্র সৃষ্টিজগতকে হেফাজত করেন। তিনি যা সৃষ্টি করেছেন সবকিছুকে তার অসীম ইলম বেষ্টন করে রাখে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার প্রিয় বান্দাদেরকে পাপ ও ধ্বংস থেকে হেফাজত করেন। তাদের আমল ও পুরস্কার তাদের জন্য সংরক্ষণ করে রাখেন পরকাল দিবসের জন্য।
احفظ الله يحفظك 'তুমি আল্লাহকে হেফাজত করো, তাহলে আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করবেন।'
এ কথার অর্থ হলো, তুমি আল্লাহর দেওয়া সীমারেখা অতিক্রম করা থেকে নিজেকে হেফাজত করো। তার যাবতীয় হক যথোচিত আদায় করো। তিনি যে সমস্ত আদেশ দিয়েছেন সেগুলো পালন করো। নিষেধ থেকে সর্বতোভাবে বিরত থাকো। সকল ওয়াজিব আদায় করো। হারাম ও নাজায়েজ থেকে বেঁচে থাকো।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ওই সমস্ত বান্দাদের প্রশংসা করেছেন যারা তার দেওয়া সীমারেখা অতিক্রম করে না। মুমিনদের গুণাবলি উল্লেখ করতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
التَّائِبُونَ الْعَابِدُونَ الْحَامِدُونَ السَّائِحُونَ الرَّاكِعُونَ السَّاجِدُونَ الآمِرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّاهُونَ عَنِ الْمُنكَرِ وَالْحَافِظُونَ لِحُدُودِ اللَّهِ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ
'(মুমিনগণ) তাওবাকারী, ইবাদতকারী, আল্লাহর প্রশংসাকারী, রোজা পালনকারী, রুকু-সেজদাকারী, ন্যায়ের আদেশ দানকারী, অন্যায় থেকে বিরতকারী এবং আল্লাহর সীমাসমূহ রক্ষাকরী। (হে নবী!) আপনি মুমিনদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিন।১৫২

টিকাঃ
১৪৯ সুরা নিসা: ১০৮
১৫০ সুরা বাকারা: ২৩৫
১৫১সুরা আনআম: ৫৯
১৫২ সুরা তাওবাহ: ১১২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00