📄 বিপদ-মুসিবতের জাগতিক ও শরঈ কারণ
হে মুসলমানগণ! আমি বারবার বলেছি এ কথা, আমাদের জন্য অত্যাবশ্যক হলো, সকল দুর্ঘটনা ও বিপদ-মুসিবতকে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করা। কেননা, আমরা যদি এসবকে বস্তুগত ও জাগতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করি তাহলে আমরাও কাফেরদের অনুরূপ হয়ে যাব। কেননা কাফেররাই কেবল সকল কিছুকে বস্তুগত ও জাগতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করে। কুরআন-সুন্নাহ থেকে তারা যোজন যোজন দূরে থাকতে চায়। তারা মনে করে এর মাঝেই তাদের গৌরব ও অহংবোধ। এর মাধ্যমে তারা আত্মিক প্রশান্তি লাভ করে। কিন্তু পক্ষান্তরে যারা মুসলমান, আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য পোষণ করে তাদের জন্য একমাত্র করণীয় হলো, আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার প্রেরিত কুরআন এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসের মাধ্যমে শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করা। এটিই মুসলমানদের শান ও মর্যাদা। মুসলমানদের যাবতীয় প্রশান্তি লুকিয়ে আছে কুরআন ও সুন্নাহর মাঝে। সকল সমস্যার সমাধান অন্বেষণ করতে হবে এ দুই মূলনীতি থেকে। মুসলমানদের বিজয় ও ব্যর্থতার সকল কারণ-উপকরণ এ দুইয়ের মাঝেই রয়েছে।
আমরা যখন আমাদের সমস্যা, সঙ্কট, বিপদ ও মুসিবতের কারণ কুরআন-সুন্নাহ থেকে অন্বেষণ করব তখন এর সঠিক কারণ পেয়ে যাব। আমরা যখন আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করব এবং আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করব তাহলে আল্লাহও আমাদেরকে সাহায্য করবেন। এ তার প্রতিশ্রুতি।
ইরশাদ হয়েছে,
وَلَيَنصُرَنَّ اللَّهُ مَنْ يَنصُرُهُ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ * الَّذِينَ إِنْ مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ
'আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করবেন যারা তাকে সাহায্য করে। আল্লাহ তো অবশ্যই শক্তিমান, পরাক্রমশালী। তারা এমন লোক যে, আমি যদি তাদেরকে পৃথিবীতে ক্ষমতা দিই তাহলে তারা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত দেবে, ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আল্লাহর হাতেই সবকিছুর পরিণতি।১৩০
উক্ত আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা এ কথা বলেননি যে, তাদেরকে জমিনে কর্তৃত্ব দিলে তারা গোনাহ, পাপাচার, কুফর ও শিরক প্রতিষ্ঠা করবে। বরং বলেছেন, إِنْ مَكَّنَّاهُمْ فِي الأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ الَّذِينَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الأُمُورِ 'তারা এমন লোক যে, আমি যদি তাদেরকে পৃথিবীতে ক্ষমতা দিই তাহলে তারা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত দেবে, ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আল্লাহর হাতেই সবকিছুর পরিণতি। ১৩১
হে প্রিয় মুসলিম ভাই! ভেবে দেখো, আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা কীভাবে বলেছেন, وَلَيَنصُرَنَّ اللَّهُ مَنْ يَنصُرُهُ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ 'আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করবেন যারা তাকে সাহায্য করে। আল্লাহ তো অবশ্যই শক্তিমান, পরাক্রমশালী। ১৩২
আরও ভেবে দেখো, আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা উপর্যুক্ত আয়াত দুটি কীভাবে সমাপ্ত করেছেন। وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ 'আল্লাহর হাতেই সকল কিছুর পরিণতি।১৩৩
কতক মানুষ তাদের ভুল চিন্তা থেকে এ কথা বলে যে, কাফেরদের বিশাল অস্ত্র ও বিপুল শক্তির বিরুদ্ধে আমরা কীভাবে আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করব? কীভাবে কাফেরদের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করব দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য, অথচ তারা আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী?
উপর্যুক্ত আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে, সকল কিছুর ক্ষমতা একমাত্র তারই হাতে এবং তিনি সবকিছু করতে সক্ষম। আসমান ও জমিনের রাজত্ব একমাত্র তারই।
এ ব্যাপারে আমাদের অন্তরে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ তায়ালার একটিমাত্র আদেশে সমগ্র বিশ্ব ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তিনি যদি বলেন, 'হয়ে যাও' তাহলে অমনিই তা হয়ে যাবে। মুহূর্তের মধ্যে তিনি এমন কিছু করতে সক্ষম যা সমগ্র বিশ্ব ঐক্যবদ্ধ হয়েও করতে সক্ষম নয়। তিনি চাইলে চোখের পলকে ধ্বংস করে দিতে পারেন সমগ্র আসমান ও জমিন। যা দুনিয়ার সকল মানুষ তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে কোনো দিনই করতে পারবে না। হ্যাঁ, এমনই আল্লাহর শক্তি। তার ক্ষমতা ও শক্তি সম্পর্কে আমাদের অন্তরে ন্যূনতম সন্দেহ নেই। তাহলে কেন এ ভয় যে, কাফেররা আমাদের চেয়ে শক্তিশালী? কেন এ চিন্তা আমাদের হৃদয়ে উদয় হয় যে, আমরা কাফেরদের সাথে লড়াই করে পারব না? কেন আমরা কাফেরদের শক্তিকে ভয় পাই? অথচ আমরা আল্লাহকে বিশ্বাস করি। তার শক্তি ও ক্ষমতার প্রতি ঈমান আনয়ন করেছি।
আল্লাহর শপথ! আমরা যদি আল্লাহ তায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য পরিপূর্ণভাবে সাহায্য করি তাহলে অবশ্যই আমরা আমাদের সকল শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করব। পৃথিবীর কোনো শত্রুই আমাদেরকে পরাজিত করতে পারবে না। আমাদের বিজয়ের পূর্বশর্ত হলো আল্লাহকে সাহায্য করা। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করা। নিজেদের জানমাল সর্বোচ্চ উজাড় করে আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করা। তবেই আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেন। আল্লাহ সর্বাদিক সত্যবাদী। তিনি অবশ্যই তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেন। যদি আমরা তাকে সাহায্য করি।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক সত্য হলো এই যে, মুসলমানদের অধিকাংশ আজ ভুলে গেছে নিজেদের কর্তব্যের কথা। ভুলে গেছে তাদের অর্পিত দায়িত্বের কথা। তারা আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করছে না। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করছে না। তারা কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে না। শরীয়তকে লুণ্ঠিত হতে দেখেও তাদের আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত হয় না। তারা আল্লাহ ও তার রাসুলের শত্রুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে না। তারা বরং কাফেরদের অনুসরণ করে। অপেক্ষায় থাকে, কখন কাফেররা আক্রমণ করবে অতঃপর তারা তাদের অনুগামী হবে। তুমি তাদের আবাসস্থলে গেলে শুনতে পাবে ঘণ্টার ধ্বনি। সেখানে আজানের সুমধুর স্বর শুনতে পাবে না। শুনতে পাবে না আল্লাহর নাম। তাদেরকে দেখবে খেলতামাশায় মত্ত। এমন জাতিকে আল্লাহ তায়ালা সাহায্য করবেন কীভাবে? বরং তাদেরকে ফিরিয়ে দেবেন দ্বিগুণ পথভ্রষ্টতায়।'
এ হলো শাইখ উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহর কথা। তার হৃদয়ছেঁড়া আর্তনাদ। উম্মাহর প্রতি তার উদাত্ত আহ্বান। আজ যদি তিনি উম্মাহর এ করুণ পরিণতি দেখতেন, এ অধঃপতন, বিভক্তি ও মতানৈক্য তার চোখের সামনে সংঘটিত হতো, তাহলে না জানি তার কণ্ঠ দিয়ে কী আর্তনাদ নির্গত হতো!
টিকাঃ
১৩০ সুরা হজ: ৪০-৪১।
১৩১ সুরা হজ: ৪১।
১৩২ সুরা হজ: ৪০।
১৩৩ সুরা হজ: ৪১।
📄 বিপদ থেকে উত্তোরণ
হে আল্লাহর বান্দাগণ! আজ বহু মানুষ চিন্তা, পেরেশানি, অস্থিরতা, বিপদ এবং জীবন ও জীবিকায় বরকত না হওয়ার অভিযোগ করে। জেনে রাখো, আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আমরা যদি আমাদের হৃদয়ে তাকওয়া অর্জন করি তাহলে তিনি আমাদের জন্য উন্মোচন করে দেবেন আসমান-জমিনের সমূহ রিজিকের ভান্ডার। আমাদের ওপর অবতীর্ণ করবেন প্রভূত নেয়ামত। আমাদের বাগানগুলো ভরে দেবেন ফলে। আমাদের জমিন পূর্ণ করে দেবেন ফসলে। আমরা যদি মুত্তাকি হই তাহলে তিনি আমাদেরকে জীবন ও জীবিকার পূর্ণতা দান করার ঘোষণ দিয়েছেন।
এমনিভাবে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এ প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন যে, আমরা যদি তার অবাধ্যতা ও নাফরমানি করি তাহলে তিনি আমাদের ওপর অবতীর্ণ করবেন নানাবিধ শাস্তি।
আমাদের প্রভু আমাদেরকে একই সঙ্গে পুরস্কার ও শান্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আমাদেরকে তিনি দুটি পথ দেখিয়েছেন। স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন কোন পথে সফলতা এবং কোন পথে আমাদের ব্যর্থতা নিহিত। আমরা যদি হৃদয়ে তাকওয়া অর্জন করি, আল্লাহকে পরিপূর্ণরূপে ভয় করি তাহলে তিনি আমাদেরকে উত্তম রিজিক দান করবেন। আমাদের জন্য উন্মোচন করে দেবেন আসমান ও জমিনের রিজিকের ভান্ডার। পূর্ণ করে দেবেন আমাদের জীবন অফুরন্ত জীবিকায়। পক্ষান্তরে আমরা যদি আল্লাহর অবাধ্যতা করি, তার নাফরমানি করি, তার আদেশ-নিষেধ মেনে না চলি, তাহলে তিনি আমাদের ওপর অবতীর্ণ করবেন আসমান-জমিনের অসংখ্য শান্তি। আমাদেরকে গ্রাস করবে চিন্তা, পেরেশানি। বন্ধ হয়ে যাবে রিজিকের দুয়ার। অভাব ও দারিদ্র্য ঘিরে ধরবে শক্তভাবে।
সুতরাং হে আল্লাহর বান্দাগণ! আর কতকাল ঘুমিয়ে থাকবে গাফলতের চাদর মুড়িয়ে। আর কতকাল অটল থাকবে প্রভুর অবাধ্যতায়। আর কতকাল দূরে সরে থাকবে আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করা থেকে? আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় নিজেদের জান-মাল নিয়ে এগিয়ে আসবে না? আর কতকাল দেখব পৃথিবীময় আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানির ছড়াছড়ি? ঘরে-বাজারে, পত্রিকায়, ম্যাগাজিনে, মনিটরে, সংগঠনে সর্বত্র আর কত দেখব প্রকাশ্য গোনাহের মহড়া?
আজ সর্বত্র চলছে আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। আমরা কীভাবে বিজয় লাভ করব, কীভাবে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করব যদি আমরা নিজেরাই আল্লাহর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করি? আমরা কীভাবে আল্লাহকে সাহায্য করব অথচ সর্বত্র প্রকাশ্য অশীলতা ও পাপাচারিতার জয়জয়কার? তাহলে এ কী আমাদের পরাজয়, লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার কারণ নয়?
আর কতকাল আমরা আসমান-জমিনের অধিপতির অবাধ্যতা করব? আমরা কি সামান্যও ভয় করি না? আমাদের মাঝে কি শঙ্কা জেগে ওঠে না?
আমরা কি বেমালুম ভুলে গেছি আল্লাহর প্রতিশ্রুতির কথা? তার রাগত ধমকির কথা? তার কঠিন ও মর্মন্তুদ শাস্তির কথা?
ইরশাদ হয়েছে, وَكَذَلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَى وَهِيَ ظَالِمَةٌ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ
'তোমার প্রভু যখন জালেম জনপদসমূহকে ধরেন তখন এভাবেই ধরেন। তার ধরা বড়ো কষ্টদায়ক ও মারাত্মক। ১৩৪
وَإِذَا أَرَدْنَا أَنْ نُهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْنَاهَا تَدْمِيرًا
'আমি যখন কোনো জনপদ ধ্বংস করতে মনস্থ করি তখন তার বিলাসী জীবনযাপনকারীদের (আমার আনুগত্যের) নিদের্শ দিই, কিন্তু তারা সেখানে পাপাচার করে; তখন তার বিরুদ্ধে দণ্ডাজ্ঞা অবধারিত হয়ে যায়। ১৩৫
আমাদের কি এখনো সময় হয়নি সংশোধন হওয়ার নাকি যখন আমাদের ওপর নেমে আসবে প্রভুর কঠিন শাস্তি তখন সংশোধন হবো? জেনে রাখো! প্রভুর শাস্তি খুবই মর্মন্তুদ। অত্যন্ত কঠিন।
ইরশাদ হয়েছে,
فَلَوْلَا إِذْ جَاءَهُمْ بَأْسُنَا تَضَرَّعُوا وَلَكِنْ قَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ * فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى إِذَا فَرِحُوا بِمَا أُوتُوا أَخَذْنَاهُمْ بَغْتَةً فَإِذَا هُمْ مُبْلِسُونَ
'তাদের কাছে যখন আমার শাস্তি এসেছিল তখন তারা বিনয়াবনত হয়নি কেন? বরং তাদের অন্তর কঠিন হয়ে গিয়েছিল এবং তারা যা করছিল শয়তানের দাগায় তাদের কাছে তা ভালো কাজ মনে হয়েছিল। তাদেরকে যা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল তারা যখন তা ভুলে গেল তখন আমি তাদের সামনে প্রতিটি জিনিসের দরজা খুলে দিলাম। এভাবে তাদেরকে যা দেওয়া হয়েছিল তারা যখন তা নিয়ে আনন্দিত, তখনই আমি অকস্মাৎ তাদেরকে পাকড়াও করি। তখনই তারা নিরাশ হয়ে যায়।'১৩৬
আল্লাহ তায়ালা পূর্ববর্তী বহু জাতি-সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছেন কি তাদের গোনাহ, অবাধ্যতা ও নাফরমানির কারণে নয়?
ইরশাদ হয়েছে,
فَكُلًّا أَخَذْنَا بِذَنْبِهِ فَمِنْهُمْ مَنْ أَرْسَلْنَا عَلَيْهِ حَاصِبًا وَمِنْهُمْ مَنْ أَخَذَتْهُ الصَّيْحَةُ وَمِنْهُمْ مَنْ خَسَفْنَا بِهِ الْأَرْضَ وَمِنْهُمْ مَنْ أَغْرَقْنَا وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ
'প্রত্যেককেই তাদের অপরাধের জন্য ধরেছিলাম; আবার কতককে পানিতে ডুবিয়ে দিয়েছিলাম। আল্লাহ তাদের ওপর কোনো জুলুম করেননি। বরং তারাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছিল'। ১৩৭
টিকাঃ
১৩৪সুরা হুদ: ১০২।
১৩৫সুরা ইসরা: ১৬।
১৩৬সুরা আনআম: ৪৩-৪৪।
১৩৭ সুরা আনকাবুত : ৪০।
📄 গোনাহ উম্মাহর পরাজয়ের কারণ
যারা গোনাহ ও পাপাচারে লিপ্ত রয়েছে, আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে ব্যস্ত এবং এসবকে অতি তুচ্ছ বিষয় বলে মনে করছে তাদের কানে কানে অস্ফুট স্বরে এ কথা বলতে চাই যে, তাদের গোনাহের কারণে মুসলিম জাতি আজ নিদারুণ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। তাদের গোনাহের দায়ভার কেবল তাদের ওপরই পতিত হচ্ছে না বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে এর করুণ পরিণতি বরণ করতে হচ্ছে। পৃথিবীব্যাপী মুসলিম জাতির অধঃপতনের অন্যতম কারণ তারা। আরও দুঃখজনক ব্যাপার হলো, গোনাহ ও অবাধ্যতার কারণে আমাদের ওপর দিয়ে অতিক্রম করছে উম্মাহর সর্বশেষ বিপর্যয়। কেননা, আজ অধিকাংশ মুসলমান কখনো একাকী কখনো ঐক্যবদ্ধ হয়ে তারা গোনাহে মত্ত হয়ে আছে। অবাধ্যতা ও নাফরমানির সাগরে ডুবে আছে। আল্লাহর শরিয়ত থেকে তারা দূরে সরে আছে। বরং তাদের অনেকে প্রকাশ্যে গোনাহের ঘোষণা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। গোনাহের জন্য অপরাপর লোকদেরকে আহ্বান করছে। তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করছে। আল্লাহর শপথ! দেশে দেশে মুসলমানদের বিপর্যয় ও অধঃপতনের এটিই সবচেয়ে বড়ো কারণ।
সমগ্র মুসলিম উম্মাহ আজ আল্লাহর প্রতিশ্রুতির সাথে স্পষ্ট প্রতারণা করছে। তার দ্বীনকে তারা সাহায্য করছে না। জমিনে তার দ্বীন প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করছে না। উপরন্তু তারা মত্ত হয়ে আছে অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে। গোনাহ, পাপাচারে জড়িয়ে আছে। আল্লাহ ও তার রাসুলের সাথে এ স্পষ্ট ধোঁকা ও প্রতারণা
ইরশাদ হয়েছে,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করো না এবং জেনেশুনে নিজেদের আমানতসমূহের খেয়ানত করো না।'১৩৮
জেনে রাখো, প্রত্যেক গোনাহগার ও পাপিষ্ঠ ব্যক্তিই আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধাচরণকারী। যারা আল্লাহর সাথে অবাধ্যতা করে তারা আল্লাহর অঙ্গীকারের সাথে প্রতারণা করছে। প্রতিটি গোনাহ আল্লাহর বিরোধিতার নামান্তর। কেননা, তিনি তাঁর বান্দাদেরকে গোনাহ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। যারা গোনাহে লিপ্ত হয় তারা আল্লাহর সে আদেশের স্পষ্ট লঙ্ঘনকারী। আর প্রতিটি গোনাহ উম্মাহর অধঃপতনের কারণ। এমনিভাবে নেক আমল এবং আল্লাহর আনুগত্য উম্মাহর বিজয়ের একেকটি কারণ। মুসলমান যদি নেক আমল, আল্লাহর আনুগত্য অধিক করে তাহলে উম্মাহ বিজিত হবে। আর গোনাহ, নাফরমানি যদি অধিক হয় তাহলে উম্মাহ পরাজিত হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য আজ মুসলমানরা অধিকহারে গোনাহ এবং আল্লাহর অবাধ্যতায় মত্ত হয়ে আছে। ফলে অবধারিতভাবে উম্মাহ আজ পরাজয় বরণ করছে। আমাদের ওপর নেমে আসছে আল্লাহর নানাবিধ শাস্তি। দেশে দেশে আজ মুসলমানদের অধঃপতন।
আজকে যে ব্যক্তি জামাতের সাথে ফজরের নামাজ আদায় করেছে সে উম্মাহর বিজয়কাফেলার একজন সদস্য।
আল্লাহর নাম নিয়ে তোমাকে জিজ্ঞেস করছি, বলো, তুমি কি আজ তাদের সাথে ছিলে যারা মসজিদে জামাতের সাথে ফজরের নামাজ আদায় করেছে নাকি তাদের সাথে ছিলে যারা আল্লাহর অবাধ্যতায় মত্ত ছিল? যারা বিভোর ছিল গাফলতের ঘুমের কোলে?
বলো, তুমি কি মুসলিম উম্মাহর বিজয় কাফেলার গর্বিত সদস্য নাকি তাদের অন্তর্ভুক্ত যারা উম্মাহকে পরাজিত করছে?
ইরশাদ হয়েছে, وَمَا ظَلَمْنَاهُمْ وَلَكِنْ كَانُوا هُمُ الظَّالِمِينَ
'আমি তাদের প্রতি জুলুম করিনি, বরং তারাই ছিল জালেম।'১৩৯
আল্লাহ তায়ালা পাপী ও গোনাহগারের প্রতি সৌজন্যমূলক আচরণ করেন না, তাদেরকে তিনি ভালোবাসেন না। তাকেই তিনি ভালোবাসেন এবং তাদের সাথেই উত্তম আচরণ করেন যে তার আনুগত্য করে। দ্বীন পালন করে। পরিপূর্ণরূপে যে তার দ্বীনে প্রবেশ করেছে। আল্লাহ ও বান্দার মাঝে বন্ধন একমাত্র ইসলাম। সুতরাং আমরা যদি ইসলামকে সাহায্য করি, পৃথিবীতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণান্ত প্রচেষ্টা করি তাহলে তিনি আমাদেরকে সাহায্য করবেন। পৃথিবীতে আমাদেরকে বিজয় দান করবনে।
ইরশাদ হয়েছে,
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُم فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا
'তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে তাদেরকে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে স্থলাভিষিক্ত করবেন, যেমন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন। তিনি তাদের জন্য যে ধর্মকে পছন্দ করেছেন তা তাদের জন্য অবশ্যই সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন এবং তাদের ভয়ের পর তার পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমারই ইবাদত করবে, আমার সাথে কোনোকিছু শরিক করবে না। '১৪০
তাই হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। তার পূর্ণ আনুগত্য করো। একনিষ্ঠভাবে তার ইবাদত করো। তিনি যেসব কাজের আদেশ দিয়েছেন সেগুলো সর্বতোভাবে পালন করো। নিষেধসমূহ থেকে বিরত থাকো। কুরআনের ভাষ্যানুযায়ী পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো।
আজ এমন কোনো জ্ঞানী ব্যক্তিকে পাওয়া যাবে না, যিনি আমাদের অবস্থা দেখে সন্তুষ্ট হবেন। বর্তমানে প্রতিটি মুসলিম দেশে গোনাহ, পাপাচার, অবাধ্যতা ও নাফরমানির যে সয়লাভ তাতে কারও চিত্তই আনন্দিত হবে না।
মুসলিম উম্মাহ আজ ধ্বংস ও অধঃপতনের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত। এর থেকে মুক্তি ও উত্তরণের একমাত্র পথ হলো আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। গোনাহমুক্ত জীবনযাপন করা। অবাধ্যতাকে আনুগত্যে রূপান্তরিত করা। অন্তরে আল্লাহর ভয় ও মারেফত হাসিল করা। আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্যের অঙ্গীকার করা। পৃথিবীর সর্বত্র কালিমাকে সমুন্নত করণের প্রয়াস ও চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা। তবেই আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পূরণ করবেন প্রদত্ত বিজয় ও অফুরন্ত রিজিকের প্রতিশ্রুতি।
টিকাঃ
১৩৮ সুরা আনফাল: ২৭।
১৩৯ সুরা যুখরুফ: ৭৬।
১৪০ সুরা নূর: ৫৫।
📄 ভরসা একমাত্র আল্লাহর ওপর
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন, وَتَوَكَّلْ عَلَى الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ * الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ . وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ * إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ 'আর পরাক্রমশালী ও দয়াময় আল্লাহর ওপর ভরসা করো, যিনি তোমাকে দেখতে পান যখন তুমি নামাজে দাঁড়াও এবং দেখতে পান যখন সেজদাকারীর মাঝে তোমার ওঠাবসা। তিনি সবকিছু শোনেন, সবকিছু জানেন। '১৪১
প্রখ্যাত মুফাসসির ইমাম সাদি বলেন, যার অন্তরে আল্লাহর প্রতি অগাধ আস্থা ও পরিপূর্ণ ভরসা রয়েছে সে ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা অধিক আনুগত্য ও ইবাদত করার তাওফিক দান করেন। তাই বান্দার জন্য করণীয় হলো, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভরসা ও অগাধ আস্থা তৈরির জন্য প্রার্থনা করা। পবিত্র কুরআনুল কারিমে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন, وَتَوَكَّلْ عَلَى الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ 'আর পরাক্রমশালী ও দয়াময় আল্লাহর ওপর ভরসা করো।'
তাওয়াক্কুল হলো উপকার লাভ এবং ক্ষতি থেকে বাঁচার ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার ওপর অন্তরের ভরসা স্থাপন। তার প্রতি অগাধ আস্থা এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণে সুধারণা পোষণ করা। নিশ্চয় তিনি পরাক্রমশালী, বান্দার প্রতি দয়ালু। তার একক ক্ষমতা ও শক্তিবলে তিনি বান্দাকে কল্যাণ দান এবং ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সক্ষম। আর এ সবকিছুই তার রহমত ও সীমাহীন দয়া।
আল্লাহ তায়ালা বান্দাদেরকে তার সকল আদেশ পালন করতে, নিষেধ থেকে বিরত থাকতে এবং অন্তরে তার নৈকট্যলাভের আকাঙ্ক্ষা জিইয়ে রাখার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। অতঃপর ক্রমান্বয়ে তিনি বান্দাকে ইহসানের স্তরে উন্নীত হওয়ার আদেশ দিয়েছেন।
ইরশাদ হয়েছে, الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ * وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ 'যিনি তোমাকে দেখতে পান যখন তুমি নামাজে দাঁড়াও এবং দেখতে পান সেজদাকারীর মাঝে তোমার ওঠাবসা। ১৪২
অর্থাৎ, আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তোমাকে দেখছেন যখন তুমি নামাজ আদায় করছ। তোমার দাঁড়ানো, তোমার রুকু, তোমার সেজদা যাবতীয় কিছু তিনি পর্যবেক্ষণ করছেন।
এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বিশেষভাবে নামাজের কথা উল্লেখ করার কারণ হলো, নামাজের ফজিলত ও মাহাত্ম্য অপরিসীম। অন্যান্য ইবাদতের ওপর নামাজের প্রাধান্য রয়েছে। নামাজে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অধিক অর্জিত হয়। নামাজে আল্লাহর সাথে বান্দা কথোপকথন করে। বান্দা তখন অধিক খুশু-খুজু, বিনয় ও নম্রতার সাথে আল্লাহকে অনুভব করে। নামাজ এমন এক ইবাদত যেখানে বান্দা নিজেকে সর্বোচ্চ মিটিয়ে দেয়। তার সবচেয়ে সম্মানিত অঙ্গ মাথাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে প্রস্ফুটিত হয় আল্লাহর বড়োত্ব ও মাহাত্ম্য-যা অন্যান্য ইবাদতে সম্ভব হয় না।
অতঃপর ইরশাদ হয়েছে, إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ 'তিনি সবকিছু শোনেন, সবকিছু জানেন। ১৪৩
অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালা সমস্ত কিছু শুনেন। দৃশ্য, অদৃশ্য, ছোটো-বড়ো বিশাল বিশ্বমণ্ডলের ন্যূনতম কিছুই তার শ্রবণের বাহিরে নয়। এমনিভাবে আসমান-জমিন, সকল সৃষ্টিরাজির প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ সবকিছু তার জ্ঞানের অন্তর্গত। বান্দার প্রতিটি অবস্থা তিনি দেখছেন। তাদের অন্তরে যে সমস্ত চিন্তা, কল্পনারপ্রতিটি কথা তিনি শ্রবণ করছেন। তাদের উদ্রেক হয় তার সবই তিনি অবগত। বান্দা যখন আল্লাহর এ বিশাল ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারে তখন সে ইহসানের স্তরে উন্নীত হতে থাকে।
টিকাঃ
১৪১ সুরা শুআরা: ২১৭-২২০।