📄 জাহান্নাম থেকে মুক্তি
নেক আমলের সর্বাধিক বড়ো পুরস্কার হলো, আখেরাতের সমূহ কল্যাণ ও নিরঙ্কুশ সফলতা। মুমিনের জন্য নেক আমল হলো, আখেরাতের সফলতা ও কল্যাণের হাতিয়ার। জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ এবং জান্নাতে প্রবেশের সবচেয়ে বড়ো উপকরণ হলো নেক আমল। ইরশাদ হয়েছে,
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَانَتْ لَهُمْ جَنَّاتُ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا خَالِدِينَ فِيهَا لَا يَبْغُونَ عَنْهَا حِوَلًا
'যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে তাদের আতিথেয়তার জন্য রয়েছে বেহেশতের বাগ-বাগিচা। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। কখনো সেখান থেকে স্থান পরিবর্তন করবে না।'১২০
وَتِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِي أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
'এ তো সেই জান্নাত তোমাদেরকে যার উত্তরাধিকারী করা হয়েছে তোমাদের কর্মের জন্য।'১২১
সুতরাং দুনিয়া হলো আখেরাতের শষ্যক্ষেত্র। পরকালের সফলতা অর্জনের অসীম সুযোগ। জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং জান্নাত লাভের সমস্ত উপায় উপকরণ সঞ্চয়ের জায়গা।
ইরশাদ হয়েছে,
وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللَّهِ هُوَ خَيْرًا وَأَعْظَمَ أَجْرًا
'তোমরা নিজেদের জন্য ভালো যা কিছু অগ্রিম প্রেরণ করবে তা আল্লাহর কাছে এমন অবস্থায় পাবে যে, তা আরও ভালো এবং পুরস্কার হিসেবে বড়ো। '১২২
পার্থিব জীবন হলো আখেরাতকে সুন্দর ও সুসজ্জিত করার অফুরন্ত সুযোগ। আমি বারবার এ কথা বলে থাকি, মুমিনের জন্য অত্যাবশ্যক হলো দুনিয়ার জীবনকে আখেরাতের জন্য গণিমত মনে করা। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা হাদিসে কুদসিতে ইরশাদ করেন,
يا عبادي إنما هي أعمالكم أحصيها لكم ثم أوفيها لكم يوم القيامة، فمن وجد فيها خيراً فليحمد الله، ومن وجد دون ذلك فلا يلومن إلا نفسه
'হে আমার বান্দাগণ! অবশ্যই তোমাদের আমল তোমাদের জন্য সংরক্ষণ করা হয় এবং কেয়ামতের দিন তা তোমাদেরকে প্রদান করা হবে। সেদিন যার আমল ভালো হবে সে আল্লাহর প্রশংসা করবে। আর যার আমল এর বিপরীত হবে সে কেবল নিজেকেই তিরস্কার করবে।'
টিকাঃ
১২০ সুরা কাহাফ: ১০৭-১০৮।
১২১ সুরা যুখরুফ: ৭২।
১২২ সুরা মুজাম্মিল: ২০।
📄 আমলের ক্ষেত্র
নেক আমল মুমিনের সম্বল। নেক আমল মুমিনের দুনিয়া আখেরাতের মুক্তির সোপান। কল্যাণের চাবিকাঠি। মুমিনের আমলের ক্ষেত্র অসংখ্য, অগণিত। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মুমিনের জন্য নেক আমলের অসংখ্য ক্ষেত্র তৈরি করেছেন。
ইরশাদ হয়েছে, إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْخَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَأَجْرًا عَظِيمًا
'আত্মসমর্পণকারী পুরুষ ও নারী, ঈমানদার পুরুষ ও নারী, অনুগত পুরুষ ও নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও নারী, বিনীত পুরুষ ও নারী, দানশীল পুরুষ ও নারী, রোজাদার পুরুষ ও নারী, যৌন পবিত্রতা রক্ষাকারী পুরুষ ও নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও নারী; আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও এক মহান পুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন।'১২৩
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, إِنَّ الَّذِينَ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَأَقَامُوا الصَّلاةَ وَأَنْفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةٌ يَرْجُونَ تِجَارَةً لَنْ تَبُورَ
'যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, নামাজ কায়েম করে আর আমি তাদেরকে যা দান করেছিতা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন এক ব্যবসার আশা করে যা নষ্ট হবে না।'১২৪
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার সঙ্গে ব্যাবসা হলো লাভবান ব্যাবসা। সীমাহীন লাভের ব্যাবসা। যেখানে ক্ষতির বিন্দুমাত্র আশঙ্কা নেই। বরং আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বান্দাকে প্রতিটি বিনিময় দশগুণ বৃদ্ধি করে দেন। এছাড়াও তিনি যাকে চান তাকে আরও অগণিত বাড়িয়ে দেন।
উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে নেক আমলের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। কিয়ামতের দিন প্রত্যেক পাপিষ্ট ও কাফের নেক আমলের মূল্য উপলব্ধি করতে পারবে। কিন্তু সেদিন তাদের উপলব্ধি কোনো কাজে আসবে না। সেদিন তারা দরবারে এলাহিতে আকুল ফরিয়াদ জানাবে তাদেরকে পুনরায় দুনিয়াতে প্রেরণ করার জন্য-যাতে তারা দুনিয়াতে এসে নেক আমল করতে পারে। সেদিন তারা নেক আমলের জন্য চিৎকার করবে। কিন্তু তাদের চিৎকার আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। কাফেরদের জন্য সেদিন হবে সীমাহীন আফসোস ও অনুশোচনার।
ইরশাদ হয়েছে, حَتَّى إِذَا جَاءَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُونِ * لَعَلَّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ
'অবশেষে যখন তাদের কারও মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন সে বলে, প্রভু! আমাকে (দুনিয়াতে) ফেরত পাঠাও, যেন আমি যা রেখে এসেছি সেখানে ভালো কাজ করতে পারি।'১২৫
একদা হজতর হাসান বসরি রহ. এক মৃত ব্যক্তির জানাজার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন হাসানা বসরি তার সফরসঙ্গীকে বললেন, 'তুমি কি জানো, মৃত লোকটি যদি এখন পুনরায় জীবিত হতে পারে তাহলে সে বেশি বেশি নেক আমল করতে চাইবে?' সে বলল, হ্যাঁ'। তখন হজরত হাসান বসরি রহ. তাকে বললেন, 'সুতরাং তুমি ওই মৃত ব্যক্তির মতো হয়ে যাও। অধিক পরিমাণে নেك আমল করো। জীবনকে বরকতময় মনে করো। জেনে রাখো, জীবন একটি সুযোগ। এ সুযোগ বারবার আসবে না। আল্লাহর মারেফত অর্জন করো। সময়কে সঠিক কাজে ব্যয় করো।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদিসের মাধ্যমে আলোচনার ইতি টানছি,
أيها الناس! إن لكم معالم فانتهوا إلى معالمكم ، وإن لكم نهاية فانتهوا إلى نهايتكم، إن المؤمن بين مخافتين: بين أجل قد مضى لا يدري كيف صنع الله فيه، وبين أجل قد بقي لا يدري ما الله قاض فيه، فليتزود العبد لنفسه، ومن دنياه لآخرته، ومن الشباب قبل الكبر، ومن الحياة قبل الموت فوالذي نفس محمد بيده ما بعد الموت من مستعتب، وما بعد الدنيا من دار إلا الجنة أو النار
'হে লোকসকল! তোমাদের জীবনের সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য- উদ্দেশ্য রয়েছে, অতএব তোমরা তোমাদের লক্ষ্যে উপনীত হও। এবং তোমাদের জীবনের একটি গন্তব্য রয়েছে, তোমরা সেই গন্তব্যপানে ছুটে চলো। মুমিন দুটি আশঙ্কার মাঝে আবর্তিত হয়। (এক) অতিবাহিত হয়ে যাওয়া জীবনের ওই অংশ যার ব্যাপারে সে জানে না, আল্লাহ কী ফয়সালা করবেন। (দুই) জীবনের ওই অবশিষ্ট অংশ যার ব্যাপারে সে জানে না, আল্লাহ তার জন্য কী রেখেছেন। তাই বান্দার উচিত নিজের পাথেয় সংগ্রহ করা-আখেরাতের জন্য দুনিয়া থেকে, বার্ধক্যের পূর্বে যৌবন থেকে এবং মৃত্যুর পূর্বে হায়াত থেকে। ওই সত্তার কসম যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! মৃত্যুর পর বাহাদুরি চলবে না এবং দুনিয়ার পর জান্নাত বা জাহান্নাম ছাড়া দ্বিতীয় কোনো বাসস্থান নেই।'
টিকাঃ
১২৩ সুরা আহযাব: ৩৫।
১২৪ সুরা ফাতির: ২৯।
১২৫ সুরা মুমিনুন: ৯৯-১০০।
📄 গোনাহের শাস্তি
শাইখ উসাইমিন বলেন, 'হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা আল্লাহকে পরিপূর্ণরূপে ভয় করো। হৃদয়ে অর্জন করো সুদৃঢ় তাকওয়া। দ্বীনের ব্যাপারে গাফলত ও উদাসীনতা থেকে সর্বতোভাবে বেঁচে থাকো। আল্লাহর নিদর্শনের ব্যাপারে কখনো গাফেল হয়ো না। এবং উদাসীন হয়ো না আল্লাহ তায়ালার প্রেরিত কিতাব পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত ও তাদাব্বুর থেকে এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের ব্যাপারে।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! লোকদের মধ্যে কেউ কেউ এ ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে যে, গোনাহ ও অবাধ্যতা ধ্বংসের কারণ। তারা মনে কওে আল্লাহর নাফরমানির শাস্তি তাদেরকে পাকড়াও করবে না। পাপের শাস্তি তার ভোগ করবে না। এর কারণ হলো তাদের ঈমান দুর্বল। তারা কুরআন তিলাওয়াত এবং কুরআন নিয়ে তাদাব্বুর করে না। রাসুলের সুন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে না।
ইরশাদ হয়েছে, وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَكِنْ كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ * أَفَأَمِنَ أَهْلَ الْقُرَى أَنْ يَأْتِيَهُمْ بَأْسُنَا بَيَاتًا وَهُمْ نَائِمُونَ * أَوَأَمِنَ أَهْلَ الْقُرَى أَنْ يَأْتِيَهُمْ بَأْسُنَا ضُحًى وَهُمْ يَلْعَبُونَ * أَفَأَمِنُوا مَكْرَ اللَّهِ فَلَا يَأْمَنُ مَكْرَ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْخَاسِرُونَ
'আর যদি গ্রামবাসীরা ঈমান আনত ও তাকওয়া অবলম্বন করত তাহলে অবশ্যই আমি তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা অবিশ্বাস করেছে। তাই আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য পাকড়াও করেছি। অতএব গ্রামগুলোর অধিবাসীরা কি রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় তাদের ওপর আমার শাস্তির আগমন থেকে নিরাপদ বোধ করেছিল? অথবা গ্রামগুলোর অধিবাসীরা কি সকালবেলায় খেলাধুলায় রত অবস্থায় তাদের ওপর আমার শাস্তির আগমন থেকে নিরাপদ বোধ করেছিল? তারা কি আল্লাহর পরিকল্পনা থেকে নিরাপদ বোধ করেছিল? বস্তুত ক্ষতিগ্রস্ত লোকেরা ছাড়া কেউ আল্লাহর পরিকল্পনা থেকে নিরাপদ বোধ করে না।'১২৬
জনৈক সালাফ বলেন, 'যদি তুমি কাউকে দেখো যে, আল্লাহ তাকে প্রভূত নেয়ামত দান করেছেন কিন্তু সে আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে লিপ্ত তাহলে মনে করবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে অবকাশ দিয়েছেন। এবং সে এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত,
سَنَسْتَدْرِجُهُمْ مِنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُونَ * وَأُمْلِي لَهُمْ إِنَّ كَيْدِي مَتِينُ
'আমি তাদেরকে এমনভাবে পাকড়াও করব যে, তারা জানতেই পারবে না। আমি তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকি। আসলে আমার কৌশল বেশ মজবুত।'১২৭
হে আল্লাহর বান্দাগণ! আল্লাহর শপথ! গোনাহ ও পাপাচারের প্রভাব শুধু ব্যক্তির ওপর নয় রাষ্ট্রের ওপরও পড়ে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। রাষ্ট্রের প্রাচুর্য এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষভাবে প্রভাব ফেলে জনগণের হৃদয়ে। গোনাহ একের প্রতি অপরের মাঝে ঘৃণাবোধ তৈরি করে। আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানি মুসলমানদের মাঝে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও বন্ধনকে বিনষ্ট করে। দুই মুসলমানের মাঝে পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাৎ হলে মনে হয় তারা যেন ভিন্ন ধর্মের। তাদের মাঝে ধর্মীয় বন্ধন নেই। পারস্পরিক প্রীতিবোধ নেই। নেই একের প্রতি অপরের ন্যূনতম সৌজন্যতা।
কিন্তু আমরা যদি একে অপরের প্রতি কল্যাণকামী হই, একে অপরের সংশোধনের ব্যাপারে মনোনিবেশ করি, আমাদের নিজেদের, পরিবার-পরিজন, প্রতিবেশি এবং রাষ্ট্রের সকল জনগণের আত্মোন্নয়ন এবং তাদের বিকাশ ও অগ্রগতির ব্যাপারে সচেষ্ট হই, একে অপরকে সৎকাজের আদেশ করি, অসৎকাজের নিষেধ করি, উপকারী কথা ও উপদেশের মাধ্যমে নেক আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করি তাহলে আমাদের মাঝে পারস্পরিক বন্ধন ও সম্প্রীতি তৈরি হবে। কল্যাণকামিতা ও সহমর্মিতা সৃষ্টি হবে। রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রাচুর্য বৃদ্ধি পাবে।
ইরশাদ হয়েছে,
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ . وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ
'তোমাদের মধ্যে যেন এমন একটি দল থাকে যারা কল্যাণের দিকে ডাকবে এবং ভালো কাজের আদেশ দেবে ও খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করবে। তারাই সফলকাম। তোমরা তাদের মতো হয়ো না যারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়েছিল এবং তাদের কাছে নিদর্শনসমূহ আসার পরও মতভেদ করেছিল। ওদের জন্য রয়েছে বিরাট শাস্তি। ১২৮
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার বাণী শোনো,
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُوْلَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ
'তোমরা তাদের মতো হয়ো না যারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়েছিল এবং তাদের কাছে নিদর্শনসমূহ আসার পরও মতভেদ করেছিল। ওদের জন্য রয়েছে বিরাট শান্তি। ১২৯
টিকাঃ
১২৬সুরা আরাফ: ৯৬-৯৯।
১২৭সুরা আরাফ: ১৮২-১৮৩।
১২৮ সুরা আলে ইমরান: ১০৪-১০৫।
১২৯ সুরা আলে ইমরান: ১০৫।
📄 বিপদ-মুসিবতের জাগতিক ও শরঈ কারণ
হে মুসলমানগণ! আমি বারবার বলেছি এ কথা, আমাদের জন্য অত্যাবশ্যক হলো, সকল দুর্ঘটনা ও বিপদ-মুসিবতকে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করা। কেননা, আমরা যদি এসবকে বস্তুগত ও জাগতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করি তাহলে আমরাও কাফেরদের অনুরূপ হয়ে যাব। কেননা কাফেররাই কেবল সকল কিছুকে বস্তুগত ও জাগতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করে। কুরআন-সুন্নাহ থেকে তারা যোজন যোজন দূরে থাকতে চায়। তারা মনে করে এর মাঝেই তাদের গৌরব ও অহংবোধ। এর মাধ্যমে তারা আত্মিক প্রশান্তি লাভ করে। কিন্তু পক্ষান্তরে যারা মুসলমান, আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য পোষণ করে তাদের জন্য একমাত্র করণীয় হলো, আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার প্রেরিত কুরআন এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসের মাধ্যমে শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করা। এটিই মুসলমানদের শান ও মর্যাদা। মুসলমানদের যাবতীয় প্রশান্তি লুকিয়ে আছে কুরআন ও সুন্নাহর মাঝে। সকল সমস্যার সমাধান অন্বেষণ করতে হবে এ দুই মূলনীতি থেকে। মুসলমানদের বিজয় ও ব্যর্থতার সকল কারণ-উপকরণ এ দুইয়ের মাঝেই রয়েছে।
আমরা যখন আমাদের সমস্যা, সঙ্কট, বিপদ ও মুসিবতের কারণ কুরআন-সুন্নাহ থেকে অন্বেষণ করব তখন এর সঠিক কারণ পেয়ে যাব। আমরা যখন আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করব এবং আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করব তাহলে আল্লাহও আমাদেরকে সাহায্য করবেন। এ তার প্রতিশ্রুতি।
ইরশাদ হয়েছে,
وَلَيَنصُرَنَّ اللَّهُ مَنْ يَنصُرُهُ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ * الَّذِينَ إِنْ مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ
'আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করবেন যারা তাকে সাহায্য করে। আল্লাহ তো অবশ্যই শক্তিমান, পরাক্রমশালী। তারা এমন লোক যে, আমি যদি তাদেরকে পৃথিবীতে ক্ষমতা দিই তাহলে তারা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত দেবে, ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আল্লাহর হাতেই সবকিছুর পরিণতি।১৩০
উক্ত আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা এ কথা বলেননি যে, তাদেরকে জমিনে কর্তৃত্ব দিলে তারা গোনাহ, পাপাচার, কুফর ও শিরক প্রতিষ্ঠা করবে। বরং বলেছেন, إِنْ مَكَّنَّاهُمْ فِي الأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ الَّذِينَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الأُمُورِ 'তারা এমন লোক যে, আমি যদি তাদেরকে পৃথিবীতে ক্ষমতা দিই তাহলে তারা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত দেবে, ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আল্লাহর হাতেই সবকিছুর পরিণতি। ১৩১
হে প্রিয় মুসলিম ভাই! ভেবে দেখো, আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা কীভাবে বলেছেন, وَلَيَنصُرَنَّ اللَّهُ مَنْ يَنصُرُهُ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ 'আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করবেন যারা তাকে সাহায্য করে। আল্লাহ তো অবশ্যই শক্তিমান, পরাক্রমশালী। ১৩২
আরও ভেবে দেখো, আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা উপর্যুক্ত আয়াত দুটি কীভাবে সমাপ্ত করেছেন। وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ 'আল্লাহর হাতেই সকল কিছুর পরিণতি।১৩৩
কতক মানুষ তাদের ভুল চিন্তা থেকে এ কথা বলে যে, কাফেরদের বিশাল অস্ত্র ও বিপুল শক্তির বিরুদ্ধে আমরা কীভাবে আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করব? কীভাবে কাফেরদের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করব দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য, অথচ তারা আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী?
উপর্যুক্ত আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে, সকল কিছুর ক্ষমতা একমাত্র তারই হাতে এবং তিনি সবকিছু করতে সক্ষম। আসমান ও জমিনের রাজত্ব একমাত্র তারই।
এ ব্যাপারে আমাদের অন্তরে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ তায়ালার একটিমাত্র আদেশে সমগ্র বিশ্ব ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তিনি যদি বলেন, 'হয়ে যাও' তাহলে অমনিই তা হয়ে যাবে। মুহূর্তের মধ্যে তিনি এমন কিছু করতে সক্ষম যা সমগ্র বিশ্ব ঐক্যবদ্ধ হয়েও করতে সক্ষম নয়। তিনি চাইলে চোখের পলকে ধ্বংস করে দিতে পারেন সমগ্র আসমান ও জমিন। যা দুনিয়ার সকল মানুষ তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে কোনো দিনই করতে পারবে না। হ্যাঁ, এমনই আল্লাহর শক্তি। তার ক্ষমতা ও শক্তি সম্পর্কে আমাদের অন্তরে ন্যূনতম সন্দেহ নেই। তাহলে কেন এ ভয় যে, কাফেররা আমাদের চেয়ে শক্তিশালী? কেন এ চিন্তা আমাদের হৃদয়ে উদয় হয় যে, আমরা কাফেরদের সাথে লড়াই করে পারব না? কেন আমরা কাফেরদের শক্তিকে ভয় পাই? অথচ আমরা আল্লাহকে বিশ্বাস করি। তার শক্তি ও ক্ষমতার প্রতি ঈমান আনয়ন করেছি।
আল্লাহর শপথ! আমরা যদি আল্লাহ তায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য পরিপূর্ণভাবে সাহায্য করি তাহলে অবশ্যই আমরা আমাদের সকল শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করব। পৃথিবীর কোনো শত্রুই আমাদেরকে পরাজিত করতে পারবে না। আমাদের বিজয়ের পূর্বশর্ত হলো আল্লাহকে সাহায্য করা। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করা। নিজেদের জানমাল সর্বোচ্চ উজাড় করে আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করা। তবেই আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেন। আল্লাহ সর্বাদিক সত্যবাদী। তিনি অবশ্যই তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেন। যদি আমরা তাকে সাহায্য করি।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক সত্য হলো এই যে, মুসলমানদের অধিকাংশ আজ ভুলে গেছে নিজেদের কর্তব্যের কথা। ভুলে গেছে তাদের অর্পিত দায়িত্বের কথা। তারা আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করছে না। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করছে না। তারা কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে না। শরীয়তকে লুণ্ঠিত হতে দেখেও তাদের আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত হয় না। তারা আল্লাহ ও তার রাসুলের শত্রুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে না। তারা বরং কাফেরদের অনুসরণ করে। অপেক্ষায় থাকে, কখন কাফেররা আক্রমণ করবে অতঃপর তারা তাদের অনুগামী হবে। তুমি তাদের আবাসস্থলে গেলে শুনতে পাবে ঘণ্টার ধ্বনি। সেখানে আজানের সুমধুর স্বর শুনতে পাবে না। শুনতে পাবে না আল্লাহর নাম। তাদেরকে দেখবে খেলতামাশায় মত্ত। এমন জাতিকে আল্লাহ তায়ালা সাহায্য করবেন কীভাবে? বরং তাদেরকে ফিরিয়ে দেবেন দ্বিগুণ পথভ্রষ্টতায়।'
এ হলো শাইখ উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহর কথা। তার হৃদয়ছেঁড়া আর্তনাদ। উম্মাহর প্রতি তার উদাত্ত আহ্বান। আজ যদি তিনি উম্মাহর এ করুণ পরিণতি দেখতেন, এ অধঃপতন, বিভক্তি ও মতানৈক্য তার চোখের সামনে সংঘটিত হতো, তাহলে না জানি তার কণ্ঠ দিয়ে কী আর্তনাদ নির্গত হতো!
টিকাঃ
১৩০ সুরা হজ: ৪০-৪১।
১৩১ সুরা হজ: ৪১।
১৩২ সুরা হজ: ৪০।
১৩৩ সুরা হজ: ৪১।