📘 আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালবাসেন > 📄 নেক আমল ঈমানের প্রতিফলন

📄 নেক আমল ঈমানের প্রতিফলন


আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনের যেখানেই ঈমানের আলোচনা করেছেন সেখানেই নেক আমলের কথা বলেছেন। ঈমান ও নেক আমল উভয়টি সমার্থক। এর কারণ হলো, নেক আমল ব্যতীত ঈমান ফলহীন বৃক্ষের ন্যায়। বস্তুত ঈমানের বহিঃপ্রকাশ হলো আমলে সালেহ তথা নেক আমল। আমলবিহীন কখনো ঈমান পূর্ণতা পায় না এবং আল্লাহর নিকট তা গৃহীত হয় না।
ইরশাদ হয়েছে,
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ 'নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে।'১০২
পবিত্র কুরআনের অসংখ্য স্থানে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঈমান ও আমলের কথা একসঙ্গে উল্লেখ করেছেন।
ইরশাদ হয়েছে,
وَالْعَصْرِ * إِنَّ الإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ * إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ 'কালের শপথ! মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা নয়, যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে, একে অপরকে সত্যের উপদেশ দেয় এবং একে অপরকে ধৈর্যধারণের উপদেশ দেয়। '১০৩
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত অসংখ্য আয়াত দ্বারা এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে, ঈমানের বহিঃপ্রকাশ হলো আমলে সালেহ্‌—নেক আমল। ঈমানের প্রতিফলন হলো আল্লাহর আনুগত্য। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদামতে ঈমান হলো অন্তরের বিশ্বাস, মৌখিক স্বীকারোক্তি এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্তৃক আমল করা। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা হলো, আনুগত্যের মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায়। অবাধ্যতা, নাফরমানির দ্বারা ঈমান হ্রাস হয়। ১০৪ তাই আমাদের জন্য অত্যাবশ্যক হলো, নিজেদের ঈমানের সংরক্ষণ করা। আল্লাহর আনুগত্য ও নেক আমল দ্বারা ঈমানকে শক্তিশালী করা। ঈমান হ্রাস হয় এমন গোনাহ ও অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা। সর্বোপরি এ ব্যাপারে সচেষ্ট থাকা, আমাদের অন্তর যেন কখনো উদাসীনতার সুতোয় আটকে না পড়ে। আল্লাহর স্মরণ ও আনুগত্য থেকে কখনো বিস্মৃত না হয়। জেনে রাখো, সকল নেক আমলের শিকড় হলো অন্তর। অন্তর যদি জাগ্রত থাকে তাহলে অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জাগ্রত থাকবে। অন্তর যদি উদাসীন ও অকর্মণ্য হয়ে যায় তাহলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবাধ্যতা নাফরমানিতে জড়িয়ে পড়বে।
আল্লাহ তায়ালা বান্দাদেরকে নেক আমলের বিভিন্ন পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নেক আমলের সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার হলো, আল্লাহর ভালোবাসা ও তার সন্তুষ্টি লাভ।
ইরশাদ হয়েছে,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ: أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لأَبِهِ ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
'হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্যে যারা স্বীয় ধর্ম ত্যাগ করবে তাদের স্থলে আল্লাহ এমন একদল লোক নিয়ে আসবেন যাদেরকে তিনি ভালোবাসবেন এবং তারাও তাকে ভালোবাসবে। তারা মুমিনদের প্রতি নরম আর কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে এবং তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে, কোনো নিন্দুকের নিন্দায় ভীত হবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। আল্লাহ বড়ো দানশীল, মহাজ্ঞানী।'১০৫
হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিসে কুদসিতে বলেন,
إن الله تعالى قال: من عادى لي ولياً فقد آذنته بالحرب، وما تقرب إلي عبدي بشيء أحب إلي مما افترضته عليه، وما يزال عبدي يتقرب إلي بالنوافل حتى أحبه، فإذا أحببته كنت سمعه الذي يسمع به، وبصره الذي يبصر به، ويده التي يبطش بها، ورجله التي يمشي بها، ولئن سألني لأعطينه، ولئن استعاذني لأعيذنه
‘আল্লাহ তায়ালা বলেন, যে ব্যক্তি আমার কোনো অলির সঙ্গে দুশমনি রাখবে আমি তার সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করব। আমি যা কিছু আমার বান্দার ওপর ফরজ করেছি, শুধু তা দিয়েই আমার নৈকট্য লাভ করা যাবে না। আমার বান্দা সর্বদা নফল ইবাদত দ্বারা নৈকট্য লাভ করতে থাকবে। এমনকি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয় পাত্র বানিয়ে নিই যে, আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আর আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমিই তার পা হয়ে যাই যা দ্বারা সে চলে। সে যদি আমার নিকট কোনো কিছু চায়, তবে আমি নিশ্চয়ই তাকে তা দান করি। আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় দিই।’১০৬
কোনো মানুষকে যখন বলা হয় যে, অমুক ব্যক্তি তোমাকে যারপরনাই ভালোবাসে, অমুক ব্যক্তি তোমার ভূয়সী প্রশংসা করেছে, তখন সে সীমাহীন খুশিতে নেচে ওঠে। আনন্দে তার মন যেন উড়তে থাকে পাখির মতো। তাহলে ভেবে দেখো যদি কাউকে বলা হয় যে, আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসেন, তোমার তিনি প্রশংসা করেছেন-আসমান-জমিন ও এ সমগ্র সৃষ্টির যিনি স্রষ্টা, যার হাতে এ কুল কায়েনাতের একচ্ছত্র আধিপত্য— তাহলে তার মনের অবস্থা কেমন হবে! আর বিষয়টি এমন যে, আল্লাহ যার সঙ্গে আছেন সেই প্রকৃত সফল।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার বান্দাদেরকে ভালোবাসেন। আল্লাহু আকবার! রাজাধিরাজ তিনি ভালোবাসেন সাধারণ প্রজাদেরকে। সকলের চেয়ে ধনী হয়েও তিনি ভালোবাসেন সীমাহীন দরিদ্রদের। সর্বময় শক্তি ও ক্ষমতার অধিকারী হয়েও তিনি ভালোবাসেন অধিকতর দুর্বল ও সহায়সম্বলহীনদের। সর্বাধিক সম্মানিত অথচ তিনি ভালোবাসেন অপদস্থ ও লাঞ্ছিতদের। আমরা জানি, দুনিয়ার সাধারণ নিয়ম হলো-যে ফকির সে ধনীকে ভালোবাসে। ধনী ফকিরকে ভালোবাসে না। যে অপমানিত সে সম্মানিত ব্যক্তিকে ভালোবাসে। সম্মানিত ব্যক্তি অপমানিত ব্যক্তিকে ভালোবাসে না। মালিক গোলামকে ভালোবাসে না। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা রাজাধিরাজ, তিনি ভালোবাসেন সামান্য প্রজাকেও। আল্লাহ তায়ালা তিনি সবচেয়ে বড়ো ধনী, কিন্তু তিনি ভালোবাসেন দুনিয়ার ফকির-মিসকিনকেও। আল্লাহ তায়ালা সবচেয়ে সম্মানিত কিন্তু তিনি ভালোবাসেন অপমানিত ও লাঞ্ছিত ব্যক্তিকে।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! তার ভালোবাসা পেতে হলে প্রয়োজন চেষ্টা ও ধৈর্য। প্রয়োজন তার আনুগত্য। তার দেওয়া সকল আদেশ পালন করা এবং নিষেধ থেকে বেঁচে থাকা। কেবল সে সমস্ত কাজে সময় ব্যয় করা যা করলে তিনি সন্তুষ্ট হোন। সে সমস্ত কাজ থেকে বিরত থাকা যা করলে তিনি অসন্তুষ্ট হোন। নেক আমলের পাশাপাশি গোনাহ ও পাপাচার থেকে সর্বতোভাবে বেঁচে থাকা। তার দেওয়া আদেশ পালন করার পাশাপাশি সকল হারাম ও নাজায়েজ থেকে বিরত থাকা। একই সঙ্গে আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকা। সকল কাজে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা অর্জনই উদ্দেশ্য হওয়া।
নেক আমলের একটি পুরস্কার হলো, আল্লাহর ও ফেরেশতাদের ভালোবাসা অর্জন।
ইরশাদ হয়েছে,
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَيَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمَنُ وُدًّا
'যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে আল্লাহ তাদের জন্য ভালোবাসা সৃষ্টি করেন।'১০৭
হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
إن الله إذا أحب عبداً نادى جبريل وقال له: إني أحب فلاناً فأحببه، فينادي جبريل في أهل السماء: إن الله يجب فلاناً فأحبوه، فيحبه أهل السماء، ثم يوضع له القبول في الأرض
'আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন তখন জিবরাইলকে ডেকে বলেন, আমি আমার অমুক বান্দাকে ভালোবাসি, তুমিও তাকে ভালোবাসো। অতঃপর জিবরাইল আসমানের অধিবাসীদের ডেকে বলেন, আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন, তোমরাও তাকে ভালোবাসো। ফলে আসমানের অধিবাসীরা তাকে ভালোবাসে। অনুরূপভাবে পৃথিবীবাসীর হৃদয়েও তার জন্য ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন।'
আল্লাহর শপথ! মানুষের ভালোবাসা অর্জনে বান্দা যতই চেষ্টা করুক তাদের নিঃশর্ত ভালোবাসা অর্জন করা কখনো সম্ভব নয়। কিন্তু যে ব্যক্তি কেবল আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে সে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের পাশাপাশি সকল মানুষের ভালোবাসাও অর্জন করে। দুনিয়ার মানুষদের অন্তরে আল্লাহ তার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ভালোবাসা ব্যতীত কেবল মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে চায় পরিশেষে সে কারোর ভালোবাসা অর্জন করতে পারে না। জেনে রাখো, সকল কল্যাণ ও সফলতা নিহিত রয়েছে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের মাঝেই। প্রকৃত বুদ্ধিমান তারাই যারা আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের জন্য নিজেদের সময় ও চেষ্টাকে ব্যয় করে। ফলে আসমান ও জমিনের সকলের হৃদয়ে তার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। নির্বোধ ও বোকা তো সে ব্যক্তি, যে মানুষের ভালোবাসা অর্জনের পেছনে তার সময় ও প্রচেষ্টা ব্যয় করে। পরিশেষে সবকিছু থেকেই বঞ্চিত হয়। লাঞ্ছিত হয় দুনিয়া ও আখেরাতে।

টিকাঃ
১০২ সুরা বাকারা: ২৭৭।
১০৩ সুরা আসর: ১-৩।
১০৪ ইমাম শাফি ও অন্যান্য সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের মতে ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। তাদের দলিল হলো, কুরআন-সুন্নাহর বিভিন্ন টেক্সটের বাহ্যিক শব্দ। সে সমস্ত আয়াত ও হাদিসে স্পষ্টতই ঈমানের ব্যাপারে হ্রাস-বৃদ্ধি ইত্যাদি শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মত হলো, ঈমানের মাঝে কমবেশি হয় না। তার মতে ঈমান হচ্ছে কতিপয় অত্যাবশ্যকীয় বিষয় সত্যায়ন ও স্বীকার করার নাম। ইমাম আবু হানিফা রহ. যে ঈমান কমবেশি হয় না বলেন তার ব্যাখ্যা হলো, ঈমান যে মৌলিক ন্যূনতম কতিপয় বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপনের নাম, এর কম কিছুতেই হতে পারবে না। পক্ষান্তরে বেশিরও প্রয়োজন নেই। যে-সকল আয়াত-হাদিসে ঈমান কমবেশি হওয়ার কথা বলা হয়েছে, তা মূল ঈমানের মাঝে কমবেশি হওয়ার কথা বলা হয়নি। বরং সৎকাজ করলে, কুরআন তিলাওয়াত করলে, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ইত্যাদি মেনে চললে ঈমান শক্তিশালী ও সুদৃঢ় হবে। আল্লাহর নিকট প্রিয় হবে। ঈমান অটুট অবিচল থাকবে। পক্ষান্তরে এর বিপরীত হলে ঈমান দুর্বল হবে। মুমিন হিসেবে আল্লাহর নিকট তার সম্মান-মর্যাদা কম হবে। মৌলিক ঈমানের মাঝে ত্রুটি হবে না। যারা বলেন ঈমানের মাঝে কম-বেশি হয় না, তাদের উদ্দেশ্য হলো, মুতলাকুল ঈমান (ন্যূনতম ঈমান, আমল অন্তর্ভুক্ত নয়)-মুমিন হওয়ার জন্য যতটুকু ঈমান জরুরি সেখানে কম-বেশি হয় না। পক্ষান্তরে যারা বলেন, ঈমানের মাঝে কম-বেশি হয় তাদের উদ্দেশ্য হলো, ঈমান মুতলাক (ঈমান ও সঙ্গে আমল অন্তর্ভুক্ত) এ কম-বেশি হয়। যত অধিক আমল করবে, আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করবে ঈমান তাদের তত পূর্ণতা পাবে। যেমন, এক হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যখন কোনো ব্যক্তি ব্যভিচার করে তখন সে মুমিন থাকে না। যখন কোনো মুমিন চুরি করে তখন সে মুমিন থাকে না।' এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সে তখন পূর্ণ মুমিন থাকে না। মন্দ আমলের কারণে তার ঈমান তখন হ্রাস পায়। সুতরাং এ মতানৈক্য নিছক শাব্দিক; পারিভাষিক নয়। [অনুবাদক]
১০৫ সুরা মায়েদা: ৫৪।
১০৬ বুখারি: ৬০৫৮।
১০৭ সুরা মারইয়াম: ৯৬।

📘 আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালবাসেন > 📄 দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা

📄 দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা


নেক আমলের পুরস্কার হলো, দুনিয়া ও আখেরাত-উভয় জগতের সফলতা লাভ। নেক আমল বান্দার ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সফলতা অর্জনের একমাত্র হাতিয়ার। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ আজ সফলতার এ মন্ত্র থেকে যোজন যোজন দূরে সরে আছে। তারা জীবনের সফলতা অন্বেষণ করছে অন্যত্র। কতক নারী-পুরুষ তাদের সফলতা অন্বেষণ করছে অঢেল ধন-সম্পদের মাঝে। কেউ অন্বেষণ করছে ভালো চাকরির মাঝে। কেউ অন্বেষণ করছে নেতৃত্ব ও ক্ষমতালাভের মাঝে। হে আল্লাহর বান্দাগণ! ভালো করে শুনে রাখো আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা অর্জনের একমাত্র উপায় কী তা ঘোষণা করেছেন পবিত্র কুরআনুল কারিমে,
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً
'যে পুরুষ বা নারী ঈমানদার অবস্থায় সৎকাজ করবে তাকে আমি উত্তম জীবন দান করব। ১০৮
কবি বড়ো চমৎকার বলেছেন,
'ধন-সম্পদ, অর্থ-বিত্ত ও সুখ্যাতির মাঝে তোমাদের সফলতা নিহিত নয়। সফল তো তারা, যারা নেক আমলে নিজেদের সময় ও যাবতীয় প্রচেষ্টা ব্যয় করছে।'
জীবন হলো বহু রঙের মেলা। এখানে যেমন দুঃখ, কষ্ট ও বিপদ রয়েছে তেমনি রয়েছে হাসি, আনন্দ ও অসংখ্য নেয়ামত। মানুষের জীবন কখনো একটি বৃত্তে স্থির থাকে না। বরং ঘুরতে থাকে চক্রাকারে। কখনো সুখের সাথে তার দেখা হয়। কখনো সে কষ্টকে আলিঙ্গন করে। কিন্তু আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যারা ধৈর্যধারণকারী, যারা আল্লাহর সকল আদেশ পালন করে এবং যাবতীয় নিষেধ থেকে বিরত থাকে, দুনিয়ার দুঃখ কষ্ট তাদের হৃদয়ে কোনো প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না। তাদের মন-মননে কোনো প্রকার প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে না। এমনিভাবে দুনিয়ার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য যখন তাদের হাতে ধরা দেয় তখন তারা অধিকতর আনন্দিত হয় না, যা তাদেরকে অহংকারী বানিয়ে দেয়। কেননা, দুনিয়ার প্রতি তাদের মন কখনো নিবিষ্ট হয় না। পার্থিব মোহ ও লালসা তাদেরকে আকৃষ্ট করতে পারে না। দুনিয়াবি লোভ ও মায়া থেকে তারা যোজন যোজন দূরে অবস্থান করে। তাদের ধ্যান-জ্ঞান একমাত্র আখেরাত। তাদের সকল প্রকার মনোযোগ নিবিষ্ট একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার প্রতি।
ইরশাদ হয়েছে,
مَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ وَأَبْقَى لِلَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ
'আল্লাহর নিকট যা আছে তা তাদের জন্য উত্তম এবং অধিক দীর্ঘস্থায়ী যারা ঈমান এনেছে এবং নিজেদের প্রভুর ওপর ভরসা রাখে।'১০৯
শোনো, আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার সেসব প্রিয় বান্দা, যারা নামাজ আদায় করে, তাদের সম্পর্কে কী বলেছেন কুরআনুল কারিমে,
إِنَّ الإِنسَانَ خُلِقَ هَلُوعًا * إِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ جَزُوعًا * وَإِذَا مَسَّهُ الْخَيْرُ مَنُوعًا : إِلَّا الْمُصَلِّينَ * الَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَاتِهِمْ دَائِمُونَ
'মানুষ সৃষ্টিগতভাবে বড়ো অধৈর্য। যখন সে খারাপ অবস্থায় পতিত হয় তখন ঘাবড়ে যায়। আর যখন তার অবস্থা ভালো হয় তখন কার্পণ্য করে। তবে এর ব্যতিক্রম হলো সেই নামাজিরা যারা সর্বদা নামাজ আদায় করে।'১১০
সুতরাং যারা নামাজি—চাই তারা পুরুষ হোক বা নারী—তাদের নিকট যখন দুনিয়ার সুখ-শান্তি, প্রাচুর্য এসে ধরা দেয় তখন তারা অত্যধিক আনন্দিত হয় না। পার্থিব সুখের সাগরে তারা ডুবে যায় না। এমনিভাবে তাদের জীবন যখন কঠিন থেকে কঠিন বিপদের সম্মুখীন হয় তখনো তারা হতাশ হয় না। চিন্তা তাদেরকে আচ্ছন্ন করতে পারে না। কেননা তাদের অন্তরে এ সুদৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে—দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। অচিরেই ফুরিয়ে যাবে পার্থিব সকল বিপদ-মুসিবত। পার্থিব জীবন সমাপ্ত হলে শুরু হবে আখেরাত। যেখানে প্রভু তাদের জন্য সঞ্চিত রেখেছেন নেয়ামতে ভরা সুন্দর এক উদ্যান।

টিকাঃ
১০৮ সুরা নাহল: ৯৭।
১০৯ সুরা শুরা: ৩৬।
১১০ সুরা মাআরিজ: ১৯-২৩।

📘 আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালবাসেন > 📄 চিন্তা-পেরেশানি দুঃখ-কষ্ট দূরীভূত হয়

📄 চিন্তা-পেরেশানি দুঃখ-কষ্ট দূরীভূত হয়


নেক আমলের পুরস্কার হলো, নেক আমলের মাধ্যমে বান্দার হৃদয়-মনের সকল দুশ্চিন্তা দূর হয়। যাবতীয় পেরেশানি লাঘব হয়। ঘুচে যায় সকল দুঃখ- কষ্ট। পার্থিব জীবনের শত দুঃখ-কষ্ট তখন রূপান্তরিত হয় চিরস্থায়ী হাসি- আনন্দে।
নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বান্দার সমস্ত প্রয়োজন পূরণ করেন। বান্দা আল্লাহর নিকট যা প্রার্থনা করে তিনি তাই কবুল করেন।
ইরশাদ হয়েছে,
وَأَيُّوبَ إِذْ نَادَى رَبَّهُ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَكَشَفْنَا مَا بِهِ مِنْ ضُرٍّ وَآتَيْنَاهُ أَهْلَهُ وَمِثْلَهُمْ مَعَهُمْ رَحْمَةً مِنْ عِنْدِنَا وَذِكْرَى لِلْعَابِدِينَ وَذَا النُّونِ إِذْ ذَهَبَ مُغَاضِبًا فَظَنَّ أَنْ لَنْ نَقْدِرَ عَلَيْهِ فَنَادَى فِي الظُّلُمَاتِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ * فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَنَجَيْنَاهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ نُنْجِي الْمُؤْمِنِينَ وَزَكَرِيَّا إِذْ نَادَى رَبَّهُ رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنْتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَوَهَبْنَا لَهُ يَحْيَى وَأَصْلَحْنَا لَهُ زَوْجَهُ إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ
'আইয়ুবের কথা স্মরণ করুন, যখন তিনি তার প্রভুকে ডেকে বলেছিলেন, আমি বড়ো কষ্টে পড়েছি এবং আপনি সবচেয়ে দয়ালু। আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম এবং তার কষ্ট দূর করে দিলাম। আমার পক্ষ থেকে অনুগ্রহস্বরূপ ও ইবাদতকারীদের জন্য উপদেশস্বরূপ তাকে তার পরিবার- পরিজনের নিকট ফিরিয়ে দিলাম। তাদের সাথে তাদের অনুরূপ আরও দিলাম। ইসমাইল, ইদরিস ও যুল- কিফলকেও স্মরণ করুন। প্রত্যেকেই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত। আমি তাদেরকে আমার অনুগ্রহের আওতায় এনেছিলাম। নিশ্চয় তারা সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত। যুন- নুনের কথাও স্মরণ করুন, যখন তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গিয়েছিলেন আর ভেবেছিলেন, আমি তার ত্রুটি ধরব না। অতঃপর অন্ধকারে আমাকে ডেকে বলেছিলেন, আপনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। আপনি মহান! নিশ্চয় আমি জালিমদের দলভুক্ত। আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম। তাকে কষ্ট থেকে রক্ষা করলাম। মুমিনদেরকে আমি এভাবেই রক্ষা করি। জাকারিয়ার কথা স্মরণ করুন, যখন তিনি তার প্রভুকে ডাক দিয়েছিলেন, হে আমার প্রভু! আমাকে একা (নিঃসন্তান) রাখিয়েন না। আপনি তো শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকারী। আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম। তার জন্য ইয়াহইয়াকে দান করলাম এবং তার জন্য তার স্ত্রীকে (সন্তান ধারণের) যোগ্য করলাম। তারা ভালো ভালো কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ত এবং আশা ও ভয় নিয়ে আমাকে ডাকত। তারা ছিল আমার প্রতি বিনয়াবনত।'১১১
হে আল্লাহর বান্দাগণ! আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাদের দোয়া কবুল করেছেন। কেননা তারা ছিলেন আল্লাহর প্রিয় বান্দা। সর্বদা তারা আল্লাহর আনুগত্যে তাদের সময় ও চেষ্টা ব্যয় করতেন। তারা ছিলেন নেক আমল ও কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী। তারা আমলে সালেহের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করেছেন। তাই আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। তাদের দোয়া কবুল করেছেন। দুনিয়াতে তাদের প্রয়োজন পূরণ করেছেন। আর এ তো আল্লাহর প্রতিশ্রুতি।
ইরশাদ হয়েছে,
وَكَذَلِكَ نُنْجِي الْمُؤْمِنِينَ
'আমি এভাবেই মুমিনদেরকে মুক্তি দিয়ে থাকি।'১১২
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ওইসমস্ত ব্যক্তিদের দোয়া কবুল করেন যারা তার নির্দেশিত পথে চলে। তার আনুগত্য করে। তার অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকে। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
انطلق ثلاثة نفر ممن كان قبلكم حتى أواهم المبيت إلى غار فدخلوه، فانحدرت صخرة من الجبل فسدت عليهم الغار، فقالوا: إنه لا ينجيكم من هذه الصخرة إلا أن تدعوا الله بصالح أعمالكم
'তোমাদের পূর্ববর্তী যুগে তিনজন লোক ছিল। একদা তারা পথ চলছিল। পথিমধ্যে হঠাৎ তাদেরকে বৃষ্টি ধরল। তখন তারা একটি গুহায় আশ্রয় নিল। আর অমনি তাদের গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গেল। তাদের একজন অন্যদেরকে বলল, বন্ধুগণ! আল্লাহর কসম! এখন তোমাদের নেক আমল ব্যতীত কিছুই তোমাদেরকে মুক্তি দিতে পারবে না।'১১৩
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাদেরকে সে অন্ধকার গুহা থেকে মুক্তির পথ বের করে দিয়েছেন। তারা একেক করে তাদের নেক আমলের মাধ্যমে দোয়া করেছে আল্লাহ তাদের নেক আমলের শক্তি অনুযায়ী তাদের ওপর থেকে বিশাল আকারের পাথরটি সরিয়ে দিয়েছেন।
হে প্রিয় ভাই! গভীরভাবে চিন্তা করো। পাহাড়ের গুহা। গাঢ় অন্ধকারে ছাওয়া। পানি নেই। খাদ্য নেই। বাতাস নেই। মুক্তির সকল পথ বন্ধ। কেবল একটি উপায় অবশিষ্ট আছে, তা হলো আসমানের দরজা। আল্লাহর দরজা। যে দরজা কখনো বন্ধ হয় না। পাহাড়ের অন্ধকার গুহায় তারা পরামর্শ করল যে নিশ্চিত এ মৃত্যু আমাদের মুক্তির একটি মাত্র পথ রয়েছে, তা হলো আমরা আমাদের কৃত নেক আমল দ্বারা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবো।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথম জন প্রার্থনা করল পিতামাতার প্রতি তার সদাচরণের মাধ্যমে। সে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার নিকট এ বলে প্রার্থনা করল যে, 'হে আল্লাহ! আমার পিতা-মাতা ছিলেন বৃদ্ধ ও দুর্বল। তাদেরকে আমি প্রচণ্ড ভালোবাসতাম। তাদের সকল প্রয়োজন পূরণ করতাম। তাদের ওপর কাউকে প্রাধান্য দিতাম না। না আমার ধন-সম্পদ আর না সন্তান-সন্ততি। আমি যখন সারাদিন জঙ্গলে বকরি চড়িয়ে ঘরে ফিরতাম তখন সবার আগে আমি আমার পিতামাতাকে দুধ পান করাতাম। তাদের পূর্বে কাউকে পান করতে দিতাম না। একদিন বকরি চড়িয়ে ঘরে ফিরতে আমার রাত হয়ে যায়। ফিরে দেখি আমার পিতা-মাতা দুজনই ঘুমিয়ে পড়েছেন। তারা আমার অপেক্ষা করে অনাহারে ঘুমিয়ে পড়েছেন। এ জন্য আমার দারুণ অনুশোচনা হয়। দুধের পেয়ালা হাতে আমি রাতভর পিতামাতার শিয়রে দাঁড়িয়ে থাকি। আমার পাশে তখন আমার শিশু পুত্ররা ক্ষুধার তাড়নায় চিৎকার করছিল। কিন্তু আমি তাদেরকে দুধ পান করতে দিইনি। কেননা আমার প্রতিদিনের অভ্যাস ছিল, সর্বপ্রথম আমার পিতা-মাতা পান করবেন তারপর অন্যরা। দীর্ঘক্ষণ আমি এভাবে দুধের পেয়ালা হাতে দাঁড়িয়ে থাকি। এভাবে সকাল হয়ে গেল। প্রথমে তাদেরকে দুধ পান করাই তারপর আমার সন্তানদেরকে দুধ পান করতে দিই।' অতঃপর সে বলল, 'হে আল্লাহ! আমার এ আমল যদি একমাত্র আপনার সন্তুষ্টির জন্য হয়ে থাকে তাহলে আপনি পাহাড়ের গুহা থেকে আমাদের বের হওয়ার পথকে প্রশস্ত করে দিন। আমাদেরকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার করুন। গুহার মুখ থেকে পাথর সরিয়ে দিন।
দেখো কেমন ছিল তার দোয়া। কেমন ছিল তার ইখলাস। সে তার নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছে। বিপদ থেকে মুক্তির দোয়া করেছে। সে বলেছে, 'হে আল্লাহ! আমি যদি এ কাজ একমাত্র আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করে থাকি তাহলে আপনি আমাদের বের হওয়ার রাস্তা প্রশস্ত করে দিন। আমাদেরকে এ অন্ধকার গুহা থেকে উদ্ধার করুন।'
তার দোয়া আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা কবুল করলেন। গুহার মুখদ্বার থেকে পাথর সামান্য একটু সরে গেল। কিন্তু এ দিয়ে তারা গুহা থেকে বের হতে পারবে না।
অতঃপর দ্বিতীয়জন বলল, 'আমার এক চাচাত বোন ছিল। তাকে আমি প্রচণ্ড ভালোবাসতাম। মনে-প্রাণে তাকে আমি কামনা করতাম। আমি তাকে আমার বাহুতে আবদ্ধ করতে চাইতাম। দীর্ঘদিন তার কামনা-বাসনা আমাকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। অবশেষে একদিন এল সে কাঙ্ক্ষিত সুযোগ। জরুরি এক প্রয়োজনে সে আমার দ্বারস্থ হলো। আমি তাকে বললাম, 'একটি শর্তে আমি তোমার প্রয়োজন পূরণ করব। যদি তুমি নিজেকে আমার নিকট সমর্পণ করো, আমার গোপন বাসনা পূরণ করো। তখন সে ছিল নিরুপায়। আমার কথায় সম্মত হয়ে গেল। আমি তাকে একশত স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করলাম। আমার অন্তরে অবৈধ কামনা জেগে উঠল তীব্রভাবে। সে যখন আমার কোলে চড়ে বসল ঠিক তখন সে আমাকে একটি কথা বলল।'
হে আল্লাহর বান্দাগণ! ভালো করে শোনো কী ছিল সে কথা। হৃদয়ের সকল দরজা উন্মোচন করে শোনো সে কথা।
'সে আমাকে বলল, 'তুমি আল্লাহকে ভয় করো। অন্যায়ভাবে তুমি আমার সতীত্ব নষ্ট করো না।'
যুবক বলল, এ কথা শোনার পর আমি বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলাম। অথচ সে ছিল আমার নিকট অত্যন্ত প্রিয়। আমার হৃদয়-মনজুড়ে ছিল তার উপস্থিতি। দীর্ঘদিন আমি তাকে কল্পনা করেছি। তাকে একান্তে পাওয়ার জন্য বহু দিবস-রজনী অপেক্ষা করেছি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে এল কাঙ্ক্ষিত সুযোগ। কিন্তু যখন সে আমাকে বলল "আল্লাহকে ভয় করো" অমনি আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি।'
যুবকটি বললো, 'হে আল্লাহ! আমি যদি তা কেবল আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করে থাকি তাহলে আপনি গুহার প্রবেশমুখ থেকে পাথরটি সরিয়ে দিন। আমাদেরকে বিপদ থেকে রক্ষা করুন।'
এ তো হলো সে যুবকের অবস্থা। যদি বর্তমান সময়ে এমন ঘটনা ঘটত তাহলে কী বলত? আল্লাহকে ভয় করো, আমার সাথে এমনটি করো না?
খুব কম লোকই রয়েছে যাদেরকে আল্লাহর নাম ও তাঁর ভয় দেখিয়ে সতর্ক করলে তারা সাড়া দেবে। কম লোকই রয়েছে এমন যাদেরকে আল্লাহর ভয় দেখালে গোনাহ থেকে বিরত থাকবে। শুধু তাই নয়, বরং রাগে, ক্রোধে ফেটে পড়বে। তাকে মেরে ফেলার উপক্রম হবে।
অথচ আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা নবীদেরকেও বলেছেন এ কথা।
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ اتَّقِ اللَّهَ
'হে নবী! আপনি আল্লাহকে ভয় করুন।' ১১৪
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার বান্দাদেরকে সম্বোধন করে বলেছেন,
وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
'তোমরা সেই দিনকে ভয় করো যখন তোমাদেরকে আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে আনা হবে। অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তিকে পুরোপুরি তাই দেওয়া হবে যা সে উপার্জন করেছে এবং তাদের প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না।' ১১৫
মেয়েটি যখন বলল, 'তুমি আল্লাহকে ভয় করো। অন্যায়ভাবে আমার সতীত্ব নষ্ট করো না।' তখন যুবক তাকে ছেড়ে দিলো। নিভে গেল তাঁর কামনার আগুন।
যুবকটি সেদিনের ঘটনাকে স্মরণ করে আল্লাহর নিকট দোয়া করল। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করলেন। গুহার মুখ থেকে ভারী পাথরটি আরও কিঞ্চিত সরে গেল। কিন্তু বের হওয়া সম্ভব হচ্ছিল না।
অতঃপর তৃতীয়জন বলল, 'আমার অধীনে কয়েকজন শ্রমিক কাজ করত। দিনশেষে আমি তাঁদের প্রত্যেকের পারিশ্রমিক দিয়ে দিতাম। একদিন এক শ্রমিক তাঁর পারিশ্রমিক না নিয়ে চলে গেল। আমি তাঁর পারিশ্রমিক আমার নিকট সযত্নে রেখে দিলাম। অপেক্ষা করতে লাগলাম তাঁর আগমনের। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পরও সে আসেনি। তার রেখে যাওয়া সে পারিশ্রমিক আমি ব্যবসায় বিনিয়োগ করি। দিনদিন তা বাড়তে থাকে। বহুদিন পর হঠাৎ একদিন সে শ্রমিক এসে তার পারিশ্রমিক দাবি করল। আমি তাকে বললাম, বিশাল এ উপত্যকাজুড়ে যা কিছু দেখতে পাচ্ছ উট, গরু, বকরি, দাস এর সবই তোমার। সে বলল, আপনি কি আমার সাথে উপহাস করছেন? আমি বললাম, না। সত্যিই বলছি এ সবকিছু তোমারই। অতঃপর এক এক করে সে সবকিছু নিয়ে গেল। কিছুই অবশিষ্ট রাখেনি আমার জন্য।
সে আল্লাহর নিকট এ বলে দোয়া করল, হে আল্লাহ! আমি যদি কেবল আপনার সন্তুষ্টির জন্য এমনটি করে থাকি তাহলে আপনি বিশালাকার পাথরটি সরিয়ে দিন। আমাদেরকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার করুন।
আল্লাহ তায়ালা তার দোয়া কবুল করলেন। পাথরটি সরে গেল। তারা বেরিয়ে এল গুহা থেকে।
এই হলো নেক আমলের প্রতিদান। তারা তাদের নেক আমলের ওসিলায় দোয়া করেছে। আল্লাহ তাদের দোয়া কবুল করেছেন। তারা নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহকে ডেকেছে, আল্লাহ তাদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন।
যা কিছু ইখলাস ও সততার সাথে করা হয় তাই নেক আমল। যেমন, পিতামাতার সেবা করা। দুঃখজনক হলেও সত্য আজ বহু পিতামাতা তাদের সন্তানদের অবাধ্যতার ব্যাপারে অভিযোগ করেন! সন্তান পিতামাতার সামনে উঁচু স্বরে কথা বলে। তাদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে। তাদেরকে কষ্ট দেয়। পিতামাতাগণ সন্তানদের কথায়, আচরণে, চরিত্রে ব্যথিত হয়। পশ্চিমা বিশ্বে পিতা-মাতার প্রতি সৌজন্যবোধ কবেই বিদায় নিয়েছে। সেখানে গড়ে উঠেছে বৃদ্ধাশ্রম। যে পিতা-মাতা জীবনভর সন্তানদের লালন-পালন করেছেন, লেখা-পড়া শিখিয়েছেন, পরিণত বয়সে তাদেরকে সেবা-যত্ন না করে বরং দূরের সেই বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, পশ্চিমা বিশ্বের ন্যায় মুসলিম দেশগুলোতে বৃদ্ধাশ্রম সংস্কৃতির ব্যাপক আমদানি হচ্ছে। মুসলমানরা তাদের পিতা-মাতাদের সেখানে রেখে আসছে। জীবনের শেষ লগ্নে তারা সন্তানদের সেবা-ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছে। পিতামাতার প্রতি সন্তানদের সে সদাচার আজ কোথায়? আজ যদি কোনো সন্তান তার পিতামাতার খেদমত এবং তাদের প্রতি সদাচারের ওসিলায় প্রার্থনা করে তাহলে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা কি তাদের ডাকে সাড়া দেবেন? তাদের প্রার্থনা কবুল করবেন?
অশ্লীলতার কথা কী বলব? মুসলিম পরিবার ও সমাজ আজ অশ্লীলতা- বেহায়াপনায় সয়লাব। এমন ঘর আজ কমই রয়েছে যেখানে অশ্লীলতার অসংখ্য উপাদান নেই। এর মাধ্যমে مسلمانوں চরিত্র ধ্বংস হচ্ছে। তাদের ঈমান ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। তাদের হৃদয় মরে যাচ্ছে। বিশেষত মুসলিম তরুণ প্রজন্ম আজ ইসলামি চেতনা ও তামাদ্দুন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। অথচ উম্মাহর তারা অতন্দ্র প্রহরী। জাতির আশাজাগানিয়া ঠিকানা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য অশ্লীলতা ও পাপাচারে তারা আকণ্ঠ নিমজ্জিত। পাশ্চাত্য সভ্যতার ইসলামবিরোধী শত্রুরা তাদের প্রধান হাতিয়ার বানিয়েছে অশ্লীলতাকে। মুসলিম তরুণ প্রজন্মকে তারা তাদের লক্ষ্যস্থল বানিয়েছে। আল্লাহ আমাদেরকে পাশ্চাত্যের সকল ষড়যন্ত্র থেকে হেফাজত করুন। এর থেকে পরিত্রাণ না পেলে উম্মাহর ভাগ্যাকাশে রয়েছে বিপদের ঘনঘটা।
পাহাড়ের গুহায় আটকে পড়া তৃতীয় ব্যক্তিটি প্রার্থনা করেছিল শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রদান করার মাধ্যমে। কিন্তু আজ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, মুসলমান সোসাইটিতে মালিকগণ তাদের অধীনস্ত কর্মচারীদেরকে ন্যায্য অধিকার প্রদান করছে না। তাদেরকে তাদের পাওনা থেকে বঞ্চিত করছে। শ্রমিকরা পাচ্ছে না শ্রমের যথোচিত মর্যাদা। আজ তো এমন মালিক খুব কমই রয়েছে যার অধীনস্থ কর্মচারীরা তাদের মালিক সম্পর্কে আমানত ও দিয়ানতদারীতার প্রশংসা করে। তাদের প্রাপ্য মজুরি এবং তাদের হক আদায়ের ব্যাপারে গুরুত্ব প্রদানকারী।
প্রথম ব্যক্তি দোয়া করেছিল পিতামাতার সেবার মাধ্যমে। দ্বিতীয় ব্যক্তি দোয়া করেছিল অশ্লীলতা ও ব্যভিচার থেকে আত্মরক্ষার মাধ্যম। তৃতীয় ব্যক্তি দোয়া করেছিল শ্রমিককে তার প্রাপ্য মজুরি প্রদানের মাধ্যমে। তারা তাদের নেক আমলকে ওসিলা করে দোয়া করেছে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাদের সে দোয়া কবুল করেছেন। তাদের প্রার্থনায় সাড়া দিয়েছেন। তাদের আমল ছিল ইখলাস ও নিয়ত ছিল নিখুঁত । একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালাকে সন্তুষ্ট করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। আল্লাহর ভয় তাদের মাঝে জাগ্রত ছিল পরিপূর্ণ। ইখলাস ও একনিষ্ঠ নিয়তের সাথে যখন কোনো ইবাদত করা হয় তখন তা অত্যন্ত মর্যাদাবান বলে প্রতীয়মান হয় আল্লাহর নিকট। চাই তা যত ছোটো থেকে ছোটো ইবাদতই হোক না কেন।
ইরশাদ হয়েছে,
أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِنْكُمْ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى بَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ
'তোমাদের কারও কাজ আমি নষ্ট করি না, সে পুরুষ হোক কিংবা নারী।'১১৬
সুতরাং উপরোক্ত ঘটনার আলোকে প্রতীয়মান হলো যে, নেক আমলের মাধ্যমে চিন্তা-পেরেশানি দূর হয়। বিপদ-মুসিবত কেটে যায়। তাই হে বিপদে পতিত ব্যক্তি! ঘোরতর মুসিবতে আক্রান্ত ব্যক্তি! অধিক পরিমাণে নেক আমল করো। আল্লাহর আনুগত্য করো। আল্লাহর ভয়ে অন্তরকে সদা শীতল করে রাখো। তাহলে তিনিই উদ্ধার করবেন তোমাকে সমূহ বিপদ থেকে। মুক্ত করবেন তোমাকে ঘোরতর চিন্তা ও বিপদের গহ্বর থেকে।

টিকাঃ
১১১ সুরা আম্বিয়া: ৮৩-৯০।
১১২ সুরা আম্বিয়া: ৮৮।
১১৩ বুখারি: ৩২১৬।
১১৪ সুরা আহযাব: ১।
১১৫ সুরা বাকারা: ২৮১।
১১৬ সুরা আলে ইমরান: ১৯৫।

📘 আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালবাসেন > 📄 ধন-সম্পদ, পরিবার-পরিজনের হেফাজত

📄 ধন-সম্পদ, পরিবার-পরিজনের হেফাজত


নেক আমলের একটি বিশেষ পুরস্কার হলো, এর মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বান্দার ধন-সম্পদ এবং তার পরিবার-পরিজনকে হেফাজত করেন। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সুরা কাহাফে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। অনেকে প্রতি শুক্রবারে সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করে। কিন্তু তারা জানে না এ সুরার প্রকৃত মর্ম। জানে না অন্তর্নিহিত রহস্য। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা কত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন এ সুরায় তারা সে সম্পর্কে বেখবর। সুরা কাহাফ পবিত্র কুরআনের একটি বিশেষ ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত সুরা। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এ সুরা তিলাওয়াত করার আদেশ দিয়েছেন। কেননা, এ সুরা মানুষের বোধ ও বিশ্বাসকে শানিত করে। তাদের আকিদাকে সঠিক ও সুন্দর করে। ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া থেকে তাদের দৃষ্টিকে ফিরিয়ে চিরস্থায়ী আখেরাতের প্রতি ধাবিত করে।
ইরশাদ হয়েছে,
إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِينَةً لَهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَإِنَّا لَجَاعِلُونَ مَا عَلَيْهَا صَعِيدًا جُرُزًا
'পৃথিবীতে সবকিছু আমি তার শোভায় পরিণত করেছি, যাতে লোকদেরকে পরীক্ষা করতে পারি কে তাদের মধ্যে উত্তম আমলকারী। আবার সবকিছু আমি শূন্য শুষ্ক মাটি করে দেব। ১১৭
অতঃপর অন্য আয়াতে ইরশাদ করেন,
الْمَالُ وَالْبَنُونَ زِينَةُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَالْبَاقِيَاتُ الصَّالِحَاتُ خَيْرٌ عِنْدَ رَبِّكَ ثَوَابًا وَخَيْرٌ أَمَلًا
'ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি হলো পার্থিব জীবনের জৌলুস। পক্ষান্তরে স্থায়ী সৎকর্মসমূহ তোমার প্রভুর কাছে পুরস্কার হিসেবেও সেরা এবং আশার বস্তু হিসেবেও সেরা।'১১৮
সুরা কাহাফ স্মরণ করিয়ে দেয়, একদিন আমাদেরকে দণ্ডায়মান হতে হবে মহান রবের সম্মুখে। স্মরণ করিয়ে দেয়, একদিন অবসান হবে পার্থিব এ রঙিন জীবনের। সেদিন যাপিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে। সুরা কাহাফ স্মরণ করিয়ে দেয়, পার্থিব জীবন যত দীর্ঘই হোক না কেন একদিন রয়েছে এর সমাপ্তি। নির্ধারিত সময় শেষে অবশ্যই চলে যেতে হবে সকল মায়া ও বন্ধন ছিন্ন করে।
ইরশাদ হয়েছে,
وَأَمَّا الْجِدَارُ فَكَانَ لِغُلَامَيْنِ يَتِيمَيْنِ فِي الْمَدِينَةِ وَكَانَ تَحْتَهُ كَنزٌ لَهُمَا وَكَانَ أَبُوهُمَا صَالِحًا فَأَرَادَ رَبُّكَ أَنْ يَبْلُغَا أَشُدَّهُمَا وَيَسْتَخْرِجَا كَنزَهُمَا رَحْمَةً مِنْ رَبِّكَ وَمَا فَعَلْتُهُ عَنْ أَمْرِي ذَلِكَ تَأْوِيلُ مَا لَمْ تَسْطِعْ عَلَيْهِ صَبْرًا
'প্রাচীরটি ছিল নগরীর দুজন অনাথ বালকের। দেয়ালের নিচে ছিল তাদের এক ধনভান্ডার। আর তাদের পিতা ছিল একজন সৎলোক। তাই অনুগ্রহবশত আপনার প্রভুর ইচ্ছে হলো, ওরা দুজন বয়োপ্রাপ্ত হোক এবং ওদের ধণভান্ডার বের করুক। কাজটি আমি আমার ইচ্ছায় করিনি। আপনি যে সব বিষয়ে ধৈর্য রাখতে পারেননি এই হলো তার তাৎপর্য। '১১৯
পিতার নেক আমল ঔরসজাত সন্তানের জন্য হেফাজতের মাধ্যম। পিতার আমলের প্রতিদান লাভ করবে তার সন্তানও। এর স্বপক্ষে সত্যায়ন পাওয়া যায় হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি কথায়। একদিন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছোট্ট ইবনে আব্বাসকে সম্বোধন করে বলেন, 'তুমি আল্লাহর হক যথাযথ হেফাজত করো, তাহলে আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করবেন।' এ কথার মর্ম হলো, হে ইবনে আব্বাস! তুমি আল্লাহর আদেশ পালন করা, নিষেধ থেকে বেঁচে থাকা এবং পরিপূর্ণ আনুগত্যের মাধ্যমে আল্লাহর হকসমূহ সংরক্ষণ করো, তাহলে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তোমার দ্বীন, তোমার দুনিয়া এবং তোমার পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদ হেফাজত করবেন। আর আল্লাহর চেয়ে অধিক উত্তম হেফাজতকারী আর কে আছে?
এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে, আপনি আপনার সন্তানদেরকে প্রাণাধিক ভালোবাসেন। একবার আমি একটি হাসপাতালে উপস্থিত ছিলাম। তখন একটি কমবয়সি ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হলো। তার পা ছিল জখম। ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে। ডাক্তার যখনই ছেলেটির জখমে স্পর্শ করতে চাচ্ছে তখনই সে উঁচু গলায় কান্না জুড়ে দিচ্ছে। তার ভারি কান্নায় হাসপাতাল থমথমে হয়ে আসে। সন্তানের এমন করুণ বেদনা ও চিৎকার শুনে পিতা ডাক্তারকে বলল, হে ডাক্তার! আপনি আমার সন্তানের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন। আমি কখনোই আমার সন্তানকে এমন করতে দেখিনি।' ডাক্তার পুনরায় স্পর্শ করতে চাইলে ছেলেটি চিৎকার জুড়ে দিলো। আমি দেখছি, ছেলেটির পিতা সামনে দাঁড়িয়ে নিদারুণ যন্ত্রণায় ছটফট করছে। লোকটির অমন অবস্থা দেখে আমি তাকে সান্ত্বনার স্বরে বললাম, 'হে আমার ভাই! জখমের স্থানে স্পর্শ করা ব্যতীত চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। এবং এখানে সামান্য চাপও দিতে হবে।' আমার কথা শুনে লোকটি বলল, 'আল্লাহর শপথ! যতবার সে আহ করছে ততবার আমার হৃদয় যেন এফোঁড়- ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছে। সন্তানের বেদনা যেন আমার অন্তরে গভীর প্রভাব ফেলছে। আল্লাহর শপথ! আমি তা সহ্য করতে পারছি না।'
আমি বললাম, 'সুবহানাল্লাহ! তুমি যখন তোমার সন্তানকে ভালোবাসো, তাদের শান্তি ও নিরাপত্তার ব্যাপারে এত অধিক চিন্তিত, তাহলে আল্লাহর হকসমূহ যথাযথ হেফাজত করো। তাকে ভয় করো। তার আনুগত্য করো। তার আদেশসমূহ পালন করো। নিষেধ থেকে সর্বতোভাবে বেঁচে থাকো। তাহলে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তোমার নেক আমলের কারণে তোমার সন্তানদেরকে হেফাজত করবেন সকল বিপদ-আপদ থেকে। জেনে রাখো, আল্লাহর চেয়ে অধিক দয়ালু ও হেফাজতকারী দ্বিতীয় কেউ নেই।

টিকাঃ
১১৭ সুরা কাহাফ: ৭-৮।
১১৮ সুরা কাহাফ: ৪৬।
১১৯ সুরা কাহাফ: ৮২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00