📄 তাওবার পথে অন্তরায়
জেনে রাখো! তাওবার পথে সবচেয়ে বড়ো অন্তরায় ও প্রতিবন্ধক হলো অন্তরে দীর্ঘ আশা পোষণ করা। দুনিয়ার প্রতি অধিক আসক্ত হওয়া। যে ব্যক্তি যত বেশি আশা করে তার আমল হয় তত মন্দ।
ইরশাদ হয়েছে,
ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الْأَمَلُ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ
'ওদেরকে খেতে, ভোগ করতে আর আশায় ভুলে থাকতে দাও। (সময় হলে) ওরা জানতে পারবে।'৯০
أَفَرَأَيْتَ إِنْ مَتَّعْنَاهُمْ سِنِينَ * ثُمَّ جَاءَهُمْ مَا كَانُوا يُوعَدُونَ
'আমি যদি তাদেরকে অনেক বছর (দুনিয়ার সুখ) উপভোগ করতে দিই, তারপর তাদের কাছে তাদের প্রতিশ্রুত শাস্তি আসে (তাতে কি তাদের কোনো লাভ আছে)?' সুরা শুয়ারা: ২০৫-২০৬।
أَيَحْسَبُونَ أَنَّمَا نُمِدُّهُمْ بِهِ مِنْ مَالٍ وَبَنِينَ * نُسَارِعُ لَهُمْ فِي الْخَيْرَاتِ بَل لا يَشْعُرُونَ
'তারা কি মনে করে, আমি যে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তনি দ্বারা তাদেরকে সাহায্য করেছি, তাতে দ্রুত তাদের কল্যাণ সাধন করছি? (আসলে তা নয়) বরং তারা বুঝতে পারছে না। '৯১
জেনে রাখো! মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে তাওবার প্রতি অধিক বেশি উদ্বুদ্ধ করে। যার অন্তরে যত বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ হয়, সে তত দ্রুত তাওবা করে।
হে আল্লাহর বান্দা! মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। মৃত্যু মানুষের অতি নিকটে। জীবন যত দীর্ঘই হোক না কেন প্রকৃতপক্ষে তা সংক্ষিপ্ত। আর দুনিয়া যত প্রিয়ই হোক না কেন বাস্তবার্থে তা খুবই তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট। সুতরাং তুমি ভেবে দেখো! তোমার জন্য কোনটি বেছে নেবে। সেদিন তোমার ও আমার অবস্থা কেমন হবে যেদিন ঘোষণা হবে অমুকের সময় ফুরিয়ে গেছে? সেদিন কেমন পরিণতি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য যেদিন খাটিয়া করে বহন করে নিয়ে যাবে কবরদেশে? সেদিন কেমন অবস্থা হবে যেদিন আপনজনরা মাটিচাপা দিয়ে রেখে আসবে অন্ধকার কবরে? আজই এখন সিদ্ধান্ত নাও, নিজের জন্য তুমি কোনটি বেছে নেবে। সেদিনের পরিণতির কথা ভেবে সজোরে চিৎকার করো। চিৎকার করো। আল্লাহর শপথ! এক কঠিন দিন অপেক্ষা করছে। সেদিন আগমনের পূর্বেই তাওবা করে ফিরে এসো। প্রত্যাবর্তন করো রবের দিকে। তাওবার দুয়ার তিনি উন্মোচন করে রেখেছেন। এ দুয়ার কখনো বন্ধ হয় না। হে আল্লাহর বান্দা! মৃত্যুর দুয়ারে প্রবেশ করার পূর্বে তাওবার দুয়ারে প্রবেশ করো।
হজরত হাসান ইবনে আবু সিনান। তার যখন মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এল তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো তার অনুভূতির কথা। জবাবে তিনি বললেন, 'যদি জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাই তবে তো ভালো। আর নাহয় আমার চেয়ে দুর্ভাগা আর কেউ নেই।'
পুনরায় তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, এ মুহূর্তে কোন জিনিসের প্রতি আপনার অধিক চাহিদা?
হাসান ইবনে আবু সিনান বললেন, 'একটি দীর্ঘ রাত; যার পুরোটাই নামাজে কাটিয়ে দেব।'
ইমাম শাফি রহ. যখন মৃত্যুশয্যায় তখন হজরত মুযানি তাকে দেখতে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আবু আব্দুল্লাহ! আপনি কী অবস্থায় সকাল করেছেন?
ইমাম শাফি রহ. বলেন, 'আমি এমতাবস্থায় সকাল করেছি যেন প্রিয়জনদের ছেড়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছি। আমার মন্দ আমল আমার সম্মুখে। আর আমার মুখ চুমুক দিচ্ছে বহু আশার পেয়ালায়। আর আমি দাঁড়িয়ে আছি আল্লাহর সম্মুখে অথচ জানি না, আমার ঠিকানা জান্নাত—যেখানে আমি নেয়ামত ভোগ করব—নাকি জাহান্নাম—যেখানে রয়েছে মর্মন্তুদ শান্তি?'
হে আল্লাহর বান্দা! জেনে রাখো! সকল আশা একদিন গুটিয়ে যাবে। সমস্ত ধন-সম্পদ বিলীন হয়ে যাবে। মাটির নিচে পঁচে যাবে তোমার সুন্দর দেহ। দিন-রাত্রি আবর্তিত হবে নতুন নিয়মে। প্রত্যেক দূরবর্তী নিকটবর্তী হবে। ঘনিয়ে আসবে সকল প্রতিশ্রুতি পূরণের দিন। সুতরাং সতর্ক হও হে আল্লাহর বান্দা। বিনয়াবনত হয়ে ফিরে এসো তোমার রবের দিকে। প্রত্যাবর্তন করো অবাধ্যতা ও নাফরমানি ছিন্ন করে।
জেনে রাখো! আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বান্দাকে চারটি জিনিসের বিনিময়ে অপর চারটি জিনিস দান করেন।
এক—যে দোয়া করে আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন। ইরশাদ হয়েছে,
ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ 'তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।'৯২
দুই—যে ক্ষমাপ্রার্থনা করে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। ইরশাদ হয়েছে,
إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا 'নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল।'
তিন—যে শুকরিয়া আদায় করে আল্লাহ তাকে নেয়ামত আরও বাড়িয়ে দেন। ইরশাদ হয়েছে,
لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ 'যদি তোমরা শুকরিয়া জ্ঞাপন করো তাহলে আমি তোমাদেরকে বাড়িয়ে দেব।'৯৩
চার—যে তাওবা করে আল্লাহ তার তাওবা কবুল করেন। ইরশাদ হয়েছে,
وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ 'তিনি ওই সত্তা যিনি তার বান্দাদের তাওবা কবুল করেন।'৯৪
টিকাঃ
৯০ সুরা হিজর: ৩।
৯১ সুরা মুমিনুন: ৫৫-৫৬।
৯২ সুরা গাফির: ৬০।
৯৩ সুরা ইবরাহিম: ৭।
📄 যে জীবন নিদারুণ যন্ত্রণার
জেনে রাখো! যে জীবনে আল্লাহর আনুগত্য নেই সে জীবন মরীচিকা তুল্য। হৃদয়ে আল্লাহর পরশ ও সান্নিধ্য ব্যতীত অন্তর কখনো সংশোধিত হয় না। হে মানুষ! কোন জিনিস তোমাকে তোমার প্রভুর ব্যাপারে ধোঁকায় ফেলেছে? আর কতকাল অবাধ্যতায় মত্ত থাকবে?
হে আল্লাহর বান্দা! প্রত্যাবর্তনের এ গল্প হৃদয়ে লিখে নাও অশ্রু ও অনুশোচনার কালিতে। অতঃপর বিনয়াবনত হয়ে ছুটে এসো তোমার রবের দিকে। অন্তরে প্রবল তৃষ্ণা ও ক্ষুধা নিয়ে তার আনুগত্য করো। গভীর রাতে সবাই যখন ঘুমে বিভোর থাকে তখন একাকী দাঁড়িয়ে যাও নামাজে। একান্ত মুনাজাতে আল্লাহকে ডেকে ডেকে বলো, হে আল্লাহ! আপনিই তো পাপিষ্ঠদের একমাত্র আশার ঠিকানা। আপনিই তো অবাধ্যদের একমাত্র ভরসাস্থল। হে আল্লাহ! আপনি যদি ফিরিয়ে দেন, তবে আমি কার নিকট যাব? হে আল্লাহ! আপনি ব্যতীত আর কে আছে যে দয়া করে গোনাহগারের প্রতি? আমি গোনাহগার। হে রাহমানুর রাহিম আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমার তাওবাকে কবুল করুন। এবং আপনার পথে সর্বদা অটল ও অবিচল থাকুন।
হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন। হে আল্লাহ! আপনি যদি আপনার অনুগত বান্দা ব্যতীত কাউকে ক্ষমা না করেন, তাহলে গোনাহগার ও পাপী বান্দারা কোথায় যাবে? কার নিকট তারা আশ্রয় প্রার্থনা করবে? হে আল্লাহ! আপনি যদি কেবল মুত্তাকি বান্দাদের প্রতি রহম করেন তাহলে আপনার অবাধ্য ও পাপাচারী বান্দারা কার নিকট সাহায্য কামনা করবে? আপনি তো তাদেরও রব। আপনি ছাড়া তো কেউ নেই তাদের। হে আল্লাহ! যারা অসহায় ও দরিদ্র তারা তো ধনীদের দুয়ারে যাবেই। হে আল্লাহ! আপনার চেয়ে বড়ো ধনী আর কে আছে? হে আল্লাহ যারা লাঞ্ছিত অপমানিত তারা তো সম্মানিতদের দুয়ারে করাঘাত করবেই। হে আল্লাহ আপনার চেয়ে অধিক সম্মানিত আর কে আছে। হে রাহমানুর রাহিম! হে আরহামার রাহিমিন! আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিন। আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিন। আপনি আমাদেরকে কাছে টেনে নিন। আপনি আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন। সীমাহীন করুণায় আমাদের ঢেকে নিন। আপনি আমাদেরকে আপনার আনুগত্যের তাওফিক দান করুন। আপনি আমাদেরকে আপনার প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন।
হে আল্লাহ! আমরা আপনার নিকট আপনার ভালোবাসা কামনা করি। আমরা আপনার অন্তরপূর্ণ ভালোবাসা প্রার্থনা করি। এবং প্রার্থনা করি ওই ব্যক্তির ভালোবাসা যে আপনাকে ভালোবাসে। হে আল্লাহ! আপনি আপনার ভালোবাসাকে আমাদের অন্তরে পিপাসার্ত ব্যক্তির নিকট পানির চেয়ে অধিক প্রিয় বানিয়ে দিন। হে আল্লাহ! আপনি ঈমানকে আমাদের নিকট প্রিয় বানিয়ে দিন। আমাদের অন্তরে ঈমানকে সুসজ্জিত করে দিন। হে আল্লাহ! আপনি কুফর ফুসুক ও গোনাহকে আমাদের নিকট ঘৃণিত করে দিন। হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করুন।
হে আল্লাহ! আমরা আপনার নিকট প্রার্থনা করছি, যেন দেখে ও না দেখে আমরা আপনাকে ভয় করি। হে আল্লাহ! সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি, লাভ ও ক্ষতি সর্বক্ষেত্রে আমরা সত্য বলার প্রার্থনা করি। হে আল্লাহ! দরিদ্র ও ধনাঢ্য উভয় অবস্থায় আমরা আপনার সন্তুষ্টির প্রার্থনা করি। হে আল্লাহ! আমরা আপনার চেহারা দর্শনের আনন্দলাভের প্রার্থনা করি। আপনার সাক্ষাৎলাভের প্রার্থনা করি।
হে আল্লাহ! হে রাহমানুর রাহিম! আপনি আমাদেরকে ঈমানের সাজে সজ্জিত করে দিন। হে আল্লাহ! হে দয়ালু মেহেরবান! আপনি আমাদের ঈমানকে শক্তিশালী ও সুদৃঢ় করে দিন। হে আল্লাহ! হে বিশ্বজাহানের প্রতিপালক! আপনি আমাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করুন। আমাদেরকে সরল-সঠিক পথে অটুট ও অবিচল রাখুন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে আমাদের নিজ দেশে নিরাপদ রাখুন। আমাদের দেশকে শান্ত ও নিরাপদ রাখুন। আমাদের দেশের শাসক ও নেতাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করুন। তাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে দিন।
হে আল্লাহ! আমাদের দেশকে এবং সমগ্র মুসলিম রাষ্ট্রসমূহকে শত্রুর শত্রুতা থেকে হেফাজত করুন। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন থেকে মুসলিম দেশগুলোকে নিরাপদ রাখুন। শত্রুর সকল অনিষ্টতা থেকে মুসলিম মানচিত্রগুলো মুক্ত ও শান্তির চাদরে ঢেকে রাখুন। হে আল্লাহ! আপনি আপনার দ্বীনকে, আপনার কিতাবকে, আপনার নবীর সুন্নাতকে এবং আপনার মুমিন বান্দাদেরকে সাহায্য করুন। হে আল্লাহ! আপনার কসম! আপনি সাহায্য করুন। আপনি সাহায্য করুন। হে আল্লাহ! হে আমাদের রব! হে বিশ্বজাহানের প্রতিপালক! আপনি আপনার রাস্তায় জিহাদরত মুজাহিদদের সাহায্য করুন। তাদেরকে রণাঙ্গনে সাহায্য করুন। হে আল্লাহ! হে সাহায্যকারী! আপনি মুজাহিদদেরকে সাহায্য করুন—যেভাবে সাহায্য করেছেন বদরের রণাঙ্গনে। তাদের বিজয় দান করুন—যেমন বিজয় দান করেছেন বদরে মুসলমানদেরকে। হে আল্লাহ! যারা মুজাহিদদেরকে সাহায্য করছে আপনি তাদেরকে সাহায্য করুন। হে আল্লাহ! যারা ইসলাম ও মুসলমানদেরকে সাহায্য করছে, আপনি তাদেরকে সাহায্য করুন। হে আল্লাহ! যারা ইসলাম ও মুসলমানদেরকে লাঞ্ছিত করছে তাদেরকে লাঞ্ছিত করুন। যারা মুসলমানদেরকে মিটিয়ে দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে আপনি তাদেরকে মিটিয়ে দিন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের হয়ে যান। আমাদেরকে আপনার বানিয়ে নিন। আমাদের হৃদয় পূর্ণ করে দিন আপনার ভালোবাসায়।
টিকাঃ
৯৪ সুরা শুরা: ২৫।
📄 আমলের প্রতিদান
সময় মানবজীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান সম্পদ। প্রতি বিন্দু সময় মুমিনের নিকট অত্যধিক তাৎপর্যমণ্ডিত। মুমিনের নিকট সময়ের আবেদন ও মাহাত্ম্য প্রভূত। জীবন কী? সময়ের বিন্দু বিন্দু সমষ্টিই তো জীবন। পৃথিবীর সকল কিছুই হারিয়ে গেলে পুনরায় ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু সময় এমন এক মহামূল্যবান জিনিস যা একবার চলে গেলে আর কখনো ফিরে আসে না। প্রকৃত জ্ঞানী সে ব্যক্তি, যে সময়ের মূল্য বুঝতে পারে, এর মাহাত্ম্য অনুধাবন করতে পারে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে তা ব্যয় করে। আর তা সম্ভব হয় একমাত্র আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা যা করতে আদেশ করেছেন সেগুলো বাস্তবায়ন করা এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন সে সমস্ত হারাম ও নাজায়েজ কাজ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে। আর নিঃসন্দেহে এটি একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। জীবনের পরিণত সময় থেকে মৃত্যু অবধি আল্লাহর আদেশ-নিষেধ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা মুমিনের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। একটি শ্রমসাধ্য অধ্যবসায়। তবে সান্ত্বনার বাণী হলো, যারা এ চ্যালেঞ্জ ও অধ্যবসায়কে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করবে আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করবেন। বস্তুত আল্লাহ যাকে সাহায্য করেন তার জন্য কিছুই তখন কঠিন থাকে না।
ইরশাদ হয়েছে,
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ
'যারা আমার জন্য সংগ্রাম করে আমি তাদেরকে অবশ্যই আমার সাথে পরিচালিত করব। আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সঙ্গে আছেন।'৯৫
সময়ের সঠিক মূল্যায়ন এবং সময়কে উপযুক্ত খাতে ব্যয় করার সর্বাধিক কল্যাণকর মাধ্যম হলো—সকল কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা। সর্বদা নেক আমল করা। যেমন: জিকির, নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজের নিষেধ, আত্মীয়তার বন্ধন ইত্যাদি।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বান্দাদেরকে তার সন্তুষ্টি অর্জনে প্রতিযোগিতা ও অগ্রগামিতার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। বান্দাদেরকে তিনি অধিকতর জান্নাতের দিকে অগ্রসর হতে উৎসাহ প্রদান করেছেন। আর এজন্য তাদেরকে দিয়েছেন তিনি রকমারি প্রতিশ্রুতি।
ইরশাদ হয়েছে,
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ
'তোমরা তোমাদের প্রভুর ক্ষমা লাভের চেষ্টা করো।'৯৬
سَابِقُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ
'তোমরা তোমাদের প্রভুর ক্ষমার দিকে ধাবিত হও।'৯৭
পবিত্র কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা প্রেরিত নবী-রাসুলগণের যথোচিত প্রশংসা করেছেন এ বলে,
إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ
'তারা ভালো ভালো কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ত এবং আশা ও ভয় নিয়ে আমাকে ডাকত। আর তারা ছিল আমার প্রতি বিনয়াবনত। '৯৮
সুতরাং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নকারী মুমিন নারী-পুরুষদের অত্যাবশ্যকীয় করণীয় হলো, বেশি বেশি সৎকাজ করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং অসংখ্য নেয়ামতরাজিতে পূর্ণ চিরস্থায়ী জান্নাতের দিকে অগ্রগামী হওয়া।
ইরশাদ হয়েছে,
فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ
'তোমরা কল্যাণের দিকে ধাবিত হও।'৯৯
বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জীবনকে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে বিশেষ পুরস্কার ও গনিমতস্বরূপ মনে করতে বলেছেন। মুমিন নারী-পুরুষদের প্রতি সুসংবাদের বার্তা প্রেরণ করে তিনি বলেছেন,
بادروا بالأعمال سبعاً: هل تنتظرون إلا فقراً منسياً، أو غنى مطغياً، أو مرضاً مفسداً، أو هرماً مفنداً، أو موتاً مجهزاً، أو الدجال فشر غائب ينتظر، أو الساعة فالساعة أدهى وأمر
'সাতটি বিষয়ের পূর্বে তোমরা দ্রুত নেক আমল করো। তোমরা কি এমন দারিদ্র্যের অপেক্ষা করছ, যা তোমাদেরকে সবকিছু ভুলিয়ে দেবে? না এমন ঐশ্বর্যের— যা তোমাদেরকে দর্পিত বানিয়ে ছাড়বে? নাকি এমন রোগের—যার আঘাতে তোমরা জরাজীর্ণ হয়ে পড়বে? না সেই বার্ধক্যের—যা তোমাদেরকে অথর্ব করে ছাড়বে? নাকি মৃত্যুর—যা আকস্মিক এসে পড়বে? নাকি দাজ্জালের—অনুপস্থিত যা কিছুর জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে, দাজ্জাল সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট? না কিয়ামতের অপেক্ষা করছ—যে কিয়ামত কিনা সর্বাপেক্ষা বিভীষিকাময় ও সর্বাপেক্ষা তিক্ত?'১০০
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার দেওয়া আমাদের এ জীবনের সর্বাধিক করণীয় হলো, তার আনুগত্য করা। তাকে ভয় করা। সৎকাজ করা এবং অসৎকাজ থেকে বিরত থাকা। সকল কাজে আল্লাহর আনুগত্য করে এবং তার অবাধ্যতা ও নাফরমানি থেকে সর্বতোভাবে বিরত থেকে শান্তি-সুখে ঘেরা চিরস্থায়ী জান্নাতের দিকে ধাবিত হওয়া। আল্লাহর শপথ! বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, যে ব্যক্তি তার আনুগত্য করবে, হৃদয়ে অর্জন করবে তাকওয়া এবং নেক আমল করবে সে তার কাঙ্ক্ষিত পুরস্কার লাভ করবে। শ্রমিক যেমন তার শ্রমের বিনিময় পেয়ে থাকে, তেমনি নেক আমলকারীও লাভ করবে তার প্রতিশ্রুত পুরস্কার। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার চেয়ে অধিক বড়ো পুরস্কারদাতা আর কে আছে? কেউ নেই। তার চেয়ে বড়ো দাতা আর কেউ নেই। তার দানের চেয়ে বড়ো দানকারী সমগ্র সৃষ্টিজগতে দ্বিতীয় কেউ নেই। তিনি একক। তার সাথে কারও অংশীদার নেই। তিনিই সৃষ্টি করেছেন জান্নাত যার উত্তরাধীকার নির্বাচিত করেছেন তার অনুগত মুমিন বান্দাদের।
ইরশাদ হয়েছে,
أَنِّي لا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِنْكُمْ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى بَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ 'তোমাদের কারও আমল আমি নষ্ট করি না, সে পুরুষ হোক কিংবা নারী। তোমরা একে অপরের অংশ।'
وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا وَكَفَى بِنَا حَاسِبِينَ 'কারও যদি সরিষার দানা পরিমাণও আমল থাকে আমি তা উপস্থিত করব। হিসাব গ্রহণের জন্য আমিই যথেষ্ট। '১০১
আল্লাহ কখনো কারও প্রতিদান নষ্ট করেন না। প্রত্যেককে তিনি সে পরিমাণই দান করেন যে পরিমাণ তার প্রাপ্য। তিনি কারও প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুমও করেন না।
টিকাঃ
৯৫ সুরা আনকাবুত : ৬৯।
৯৬ সুরা আলে ইমরান: ১৩৩।
৩ সুরা হাদিদ: ২১।
৯৮ সুরা আম্বিয়া: ৯০।
৯৯ সুরা বাকারা: ১৪৮।
১০০ জামে তিরমিজি: ২৩০৬।
১০১ সুরা আম্বিয়া: ৪৭।
📄 নেক আমল ঈমানের প্রতিফলন
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনের যেখানেই ঈমানের আলোচনা করেছেন সেখানেই নেক আমলের কথা বলেছেন। ঈমান ও নেক আমল উভয়টি সমার্থক। এর কারণ হলো, নেক আমল ব্যতীত ঈমান ফলহীন বৃক্ষের ন্যায়। বস্তুত ঈমানের বহিঃপ্রকাশ হলো আমলে সালেহ তথা নেক আমল। আমলবিহীন কখনো ঈমান পূর্ণতা পায় না এবং আল্লাহর নিকট তা গৃহীত হয় না।
ইরশাদ হয়েছে,
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ 'নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে।'১০২
পবিত্র কুরআনের অসংখ্য স্থানে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঈমান ও আমলের কথা একসঙ্গে উল্লেখ করেছেন।
ইরশাদ হয়েছে,
وَالْعَصْرِ * إِنَّ الإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ * إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ 'কালের শপথ! মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা নয়, যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে, একে অপরকে সত্যের উপদেশ দেয় এবং একে অপরকে ধৈর্যধারণের উপদেশ দেয়। '১০৩
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত অসংখ্য আয়াত দ্বারা এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে, ঈমানের বহিঃপ্রকাশ হলো আমলে সালেহ্—নেক আমল। ঈমানের প্রতিফলন হলো আল্লাহর আনুগত্য। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদামতে ঈমান হলো অন্তরের বিশ্বাস, মৌখিক স্বীকারোক্তি এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্তৃক আমল করা। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা হলো, আনুগত্যের মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায়। অবাধ্যতা, নাফরমানির দ্বারা ঈমান হ্রাস হয়। ১০৪ তাই আমাদের জন্য অত্যাবশ্যক হলো, নিজেদের ঈমানের সংরক্ষণ করা। আল্লাহর আনুগত্য ও নেক আমল দ্বারা ঈমানকে শক্তিশালী করা। ঈমান হ্রাস হয় এমন গোনাহ ও অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা। সর্বোপরি এ ব্যাপারে সচেষ্ট থাকা, আমাদের অন্তর যেন কখনো উদাসীনতার সুতোয় আটকে না পড়ে। আল্লাহর স্মরণ ও আনুগত্য থেকে কখনো বিস্মৃত না হয়। জেনে রাখো, সকল নেক আমলের শিকড় হলো অন্তর। অন্তর যদি জাগ্রত থাকে তাহলে অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জাগ্রত থাকবে। অন্তর যদি উদাসীন ও অকর্মণ্য হয়ে যায় তাহলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবাধ্যতা নাফরমানিতে জড়িয়ে পড়বে।
আল্লাহ তায়ালা বান্দাদেরকে নেক আমলের বিভিন্ন পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নেক আমলের সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার হলো, আল্লাহর ভালোবাসা ও তার সন্তুষ্টি লাভ।
ইরশাদ হয়েছে,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ: أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لأَبِهِ ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
'হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্যে যারা স্বীয় ধর্ম ত্যাগ করবে তাদের স্থলে আল্লাহ এমন একদল লোক নিয়ে আসবেন যাদেরকে তিনি ভালোবাসবেন এবং তারাও তাকে ভালোবাসবে। তারা মুমিনদের প্রতি নরম আর কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে এবং তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে, কোনো নিন্দুকের নিন্দায় ভীত হবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। আল্লাহ বড়ো দানশীল, মহাজ্ঞানী।'১০৫
হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিসে কুদসিতে বলেন,
إن الله تعالى قال: من عادى لي ولياً فقد آذنته بالحرب، وما تقرب إلي عبدي بشيء أحب إلي مما افترضته عليه، وما يزال عبدي يتقرب إلي بالنوافل حتى أحبه، فإذا أحببته كنت سمعه الذي يسمع به، وبصره الذي يبصر به، ويده التي يبطش بها، ورجله التي يمشي بها، ولئن سألني لأعطينه، ولئن استعاذني لأعيذنه
‘আল্লাহ তায়ালা বলেন, যে ব্যক্তি আমার কোনো অলির সঙ্গে দুশমনি রাখবে আমি তার সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করব। আমি যা কিছু আমার বান্দার ওপর ফরজ করেছি, শুধু তা দিয়েই আমার নৈকট্য লাভ করা যাবে না। আমার বান্দা সর্বদা নফল ইবাদত দ্বারা নৈকট্য লাভ করতে থাকবে। এমনকি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয় পাত্র বানিয়ে নিই যে, আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আর আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমিই তার পা হয়ে যাই যা দ্বারা সে চলে। সে যদি আমার নিকট কোনো কিছু চায়, তবে আমি নিশ্চয়ই তাকে তা দান করি। আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় দিই।’১০৬
কোনো মানুষকে যখন বলা হয় যে, অমুক ব্যক্তি তোমাকে যারপরনাই ভালোবাসে, অমুক ব্যক্তি তোমার ভূয়সী প্রশংসা করেছে, তখন সে সীমাহীন খুশিতে নেচে ওঠে। আনন্দে তার মন যেন উড়তে থাকে পাখির মতো। তাহলে ভেবে দেখো যদি কাউকে বলা হয় যে, আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসেন, তোমার তিনি প্রশংসা করেছেন-আসমান-জমিন ও এ সমগ্র সৃষ্টির যিনি স্রষ্টা, যার হাতে এ কুল কায়েনাতের একচ্ছত্র আধিপত্য— তাহলে তার মনের অবস্থা কেমন হবে! আর বিষয়টি এমন যে, আল্লাহ যার সঙ্গে আছেন সেই প্রকৃত সফল।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার বান্দাদেরকে ভালোবাসেন। আল্লাহু আকবার! রাজাধিরাজ তিনি ভালোবাসেন সাধারণ প্রজাদেরকে। সকলের চেয়ে ধনী হয়েও তিনি ভালোবাসেন সীমাহীন দরিদ্রদের। সর্বময় শক্তি ও ক্ষমতার অধিকারী হয়েও তিনি ভালোবাসেন অধিকতর দুর্বল ও সহায়সম্বলহীনদের। সর্বাধিক সম্মানিত অথচ তিনি ভালোবাসেন অপদস্থ ও লাঞ্ছিতদের। আমরা জানি, দুনিয়ার সাধারণ নিয়ম হলো-যে ফকির সে ধনীকে ভালোবাসে। ধনী ফকিরকে ভালোবাসে না। যে অপমানিত সে সম্মানিত ব্যক্তিকে ভালোবাসে। সম্মানিত ব্যক্তি অপমানিত ব্যক্তিকে ভালোবাসে না। মালিক গোলামকে ভালোবাসে না। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা রাজাধিরাজ, তিনি ভালোবাসেন সামান্য প্রজাকেও। আল্লাহ তায়ালা তিনি সবচেয়ে বড়ো ধনী, কিন্তু তিনি ভালোবাসেন দুনিয়ার ফকির-মিসকিনকেও। আল্লাহ তায়ালা সবচেয়ে সম্মানিত কিন্তু তিনি ভালোবাসেন অপমানিত ও লাঞ্ছিত ব্যক্তিকে।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! তার ভালোবাসা পেতে হলে প্রয়োজন চেষ্টা ও ধৈর্য। প্রয়োজন তার আনুগত্য। তার দেওয়া সকল আদেশ পালন করা এবং নিষেধ থেকে বেঁচে থাকা। কেবল সে সমস্ত কাজে সময় ব্যয় করা যা করলে তিনি সন্তুষ্ট হোন। সে সমস্ত কাজ থেকে বিরত থাকা যা করলে তিনি অসন্তুষ্ট হোন। নেক আমলের পাশাপাশি গোনাহ ও পাপাচার থেকে সর্বতোভাবে বেঁচে থাকা। তার দেওয়া আদেশ পালন করার পাশাপাশি সকল হারাম ও নাজায়েজ থেকে বিরত থাকা। একই সঙ্গে আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকা। সকল কাজে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা অর্জনই উদ্দেশ্য হওয়া।
নেক আমলের একটি পুরস্কার হলো, আল্লাহর ও ফেরেশতাদের ভালোবাসা অর্জন।
ইরশাদ হয়েছে,
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَيَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمَنُ وُدًّا
'যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে আল্লাহ তাদের জন্য ভালোবাসা সৃষ্টি করেন।'১০৭
হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
إن الله إذا أحب عبداً نادى جبريل وقال له: إني أحب فلاناً فأحببه، فينادي جبريل في أهل السماء: إن الله يجب فلاناً فأحبوه، فيحبه أهل السماء، ثم يوضع له القبول في الأرض
'আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন তখন জিবরাইলকে ডেকে বলেন, আমি আমার অমুক বান্দাকে ভালোবাসি, তুমিও তাকে ভালোবাসো। অতঃপর জিবরাইল আসমানের অধিবাসীদের ডেকে বলেন, আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন, তোমরাও তাকে ভালোবাসো। ফলে আসমানের অধিবাসীরা তাকে ভালোবাসে। অনুরূপভাবে পৃথিবীবাসীর হৃদয়েও তার জন্য ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন।'
আল্লাহর শপথ! মানুষের ভালোবাসা অর্জনে বান্দা যতই চেষ্টা করুক তাদের নিঃশর্ত ভালোবাসা অর্জন করা কখনো সম্ভব নয়। কিন্তু যে ব্যক্তি কেবল আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে সে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের পাশাপাশি সকল মানুষের ভালোবাসাও অর্জন করে। দুনিয়ার মানুষদের অন্তরে আল্লাহ তার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ভালোবাসা ব্যতীত কেবল মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে চায় পরিশেষে সে কারোর ভালোবাসা অর্জন করতে পারে না। জেনে রাখো, সকল কল্যাণ ও সফলতা নিহিত রয়েছে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের মাঝেই। প্রকৃত বুদ্ধিমান তারাই যারা আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের জন্য নিজেদের সময় ও চেষ্টাকে ব্যয় করে। ফলে আসমান ও জমিনের সকলের হৃদয়ে তার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। নির্বোধ ও বোকা তো সে ব্যক্তি, যে মানুষের ভালোবাসা অর্জনের পেছনে তার সময় ও প্রচেষ্টা ব্যয় করে। পরিশেষে সবকিছু থেকেই বঞ্চিত হয়। লাঞ্ছিত হয় দুনিয়া ও আখেরাতে।
টিকাঃ
১০২ সুরা বাকারা: ২৭৭।
১০৩ সুরা আসর: ১-৩।
১০৪ ইমাম শাফি ও অন্যান্য সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের মতে ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। তাদের দলিল হলো, কুরআন-সুন্নাহর বিভিন্ন টেক্সটের বাহ্যিক শব্দ। সে সমস্ত আয়াত ও হাদিসে স্পষ্টতই ঈমানের ব্যাপারে হ্রাস-বৃদ্ধি ইত্যাদি শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মত হলো, ঈমানের মাঝে কমবেশি হয় না। তার মতে ঈমান হচ্ছে কতিপয় অত্যাবশ্যকীয় বিষয় সত্যায়ন ও স্বীকার করার নাম। ইমাম আবু হানিফা রহ. যে ঈমান কমবেশি হয় না বলেন তার ব্যাখ্যা হলো, ঈমান যে মৌলিক ন্যূনতম কতিপয় বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপনের নাম, এর কম কিছুতেই হতে পারবে না। পক্ষান্তরে বেশিরও প্রয়োজন নেই। যে-সকল আয়াত-হাদিসে ঈমান কমবেশি হওয়ার কথা বলা হয়েছে, তা মূল ঈমানের মাঝে কমবেশি হওয়ার কথা বলা হয়নি। বরং সৎকাজ করলে, কুরআন তিলাওয়াত করলে, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ইত্যাদি মেনে চললে ঈমান শক্তিশালী ও সুদৃঢ় হবে। আল্লাহর নিকট প্রিয় হবে। ঈমান অটুট অবিচল থাকবে। পক্ষান্তরে এর বিপরীত হলে ঈমান দুর্বল হবে। মুমিন হিসেবে আল্লাহর নিকট তার সম্মান-মর্যাদা কম হবে। মৌলিক ঈমানের মাঝে ত্রুটি হবে না। যারা বলেন ঈমানের মাঝে কম-বেশি হয় না, তাদের উদ্দেশ্য হলো, মুতলাকুল ঈমান (ন্যূনতম ঈমান, আমল অন্তর্ভুক্ত নয়)-মুমিন হওয়ার জন্য যতটুকু ঈমান জরুরি সেখানে কম-বেশি হয় না। পক্ষান্তরে যারা বলেন, ঈমানের মাঝে কম-বেশি হয় তাদের উদ্দেশ্য হলো, ঈমান মুতলাক (ঈমান ও সঙ্গে আমল অন্তর্ভুক্ত) এ কম-বেশি হয়। যত অধিক আমল করবে, আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করবে ঈমান তাদের তত পূর্ণতা পাবে। যেমন, এক হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যখন কোনো ব্যক্তি ব্যভিচার করে তখন সে মুমিন থাকে না। যখন কোনো মুমিন চুরি করে তখন সে মুমিন থাকে না।' এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সে তখন পূর্ণ মুমিন থাকে না। মন্দ আমলের কারণে তার ঈমান তখন হ্রাস পায়। সুতরাং এ মতানৈক্য নিছক শাব্দিক; পারিভাষিক নয়। [অনুবাদক]
১০৫ সুরা মায়েদা: ৫৪।
১০৬ বুখারি: ৬০৫৮।
১০৭ সুরা মারইয়াম: ৯৬।