📄 সুসংবাদ গ্রহণ করো হে তাওবাকারী
হে তাওবাকারী! তোমার রবের সুসংবাদ গ্রহণ করো। হে অন্ধকার থেকে আলোর কাফেলায় প্রত্যাবর্তনকারী! জেনে রাখো! আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য রয়েছে আনন্দায়ক বার্তা। ইরশাদ হয়েছে,
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ 'নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন। '৮৪
তাওবাকারীদের জন্য আল্লাহ তায়ালা তার রহমতের দরজাসমূহ খুলে দিয়েছেন। তাদেরকে তিনি শুনিয়েছেন অভয় বাণী,
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ '(হে নবী! আমার এই কথা আপনি লোকদেরকে) বলে দিন, হে আমার বান্দারা যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করছ! আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ তো সব গোনাহ মাফ করে দেন। নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু। '৮৫
إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُوْلَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا 'তারা ব্যতীত যারা তাওবা করে, ঈমান রাখে এবং সৎকাজ করে; আল্লাহ তাদের পাপসমূহ পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দিবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। '৮৬
إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ 'নিশ্চয় পুণ্যসমূহ পাপসমূহকে মিটিয়ে দেয়।'৮৭
وَإِنِّي لَغَفَّارُ لِمَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَى 'যে তাওবা করে, ঈমান রাখে, সৎকাজ করে আর সঠিক পথ অনুসরণ করে, তার প্রতি আমি অবশ্যই ক্ষমাশীল।'৮৮
হে তাওবাকারী! হে প্রত্যাবর্তনকারী! সুসংবাদ গ্রহণ করো তোমার নবীর পক্ষ থেকে। তিনি বলেছেন,
التائب من الذنب كمن لا ذنب له 'গোনাহ থেকে তাওবাকারী ওই ব্যক্তির মতো, যার কোনো গোনাহ নেই।'
হে তাওবাকারী! সুসংবাদ গ্রহণ করো। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাওবাকারীদের ভালোবাসেন। বান্দা তাওবা করলে তিনি আনন্দিত হন। গোনাহগারদের কান্নার আওয়াজ আল্লাহর নিকট তাসবিহের আওয়াজের চেয়ে অধিক প্রিয়।
একদা জনৈক ব্যক্তি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর নিকট একটি গোনাহের ব্যাপারে জানতে চাইল যে, এর থেকে তাওবা করলে আল্লাহ কবুল করবেন কি না? এ শুনে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি তাকিয়ে দেখেন, লোকটি অঝোরে কান্না করছে। এ দেখে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বললেন, 'বেহেশতের আটটি দরজা রয়েছে। যেগুলো বন্ধ করা হয় আবার খোলা হয়। কিন্তু তাওবা এমন এক দরজা যা কখনো বন্ধ হয় না। সুতরাং তুমি আমল করতে থাকো। কখনো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।
এক ইসরাইলি যুবক বিশ বছর আল্লাহর ইবাদত করেছে। অতঃপর বিশ বছর নাফরমানي করেছে। একদিন সে আয়নায় তাকিয়ে দেখে, বার্ধক্য তাকে গ্রাস করেছে। তার চুল-দাড়ি পেকে গেছে। তখন সে আল্লাহকে ডেকে বলল, হে আল্লাহ! আমি বিশ বছর আপনার ইবাদত করেছি। তারপর বিশ বছর নাফরমানي করেছি। এখন পুনরায় আমি ফিরে এসেছি আপনার নিকট। আপনি কি আমাকে কবুল করবেন? তখন অদৃশ্য থেকে আওয়াজ এল, 'হে আমার বান্দা! যখন তুমি আমাকে ভালোবাসো, আমিও তোমাকে ভালোবাসি। যখন তুমি আমাকে ছেড়ে দাও, আমিও তোমাকে ছেড়ে দিই। কিন্তু তুমি যখন নাফরমানি করো, আমি তোমাকে অবকাশ দিই। আর যখন ফিরে আসো আমি সঙ্গে সঙ্গে কবুল করে নিই।'
وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُوا عَنِ السَّيِّئَاتِ وَيَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ
'তিনি ওই সত্তা যিনি তার বান্দাদের তাওবা কবুল করেন এবং তাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেন। আর তোমরা যা কিছু করো তিনি তা জানেন। '৮৯
টিকাঃ
৮৪ সুরা বাকারাহ: ২২২।
৮৫ সুরা যুমার: ৫৩।
৮৬ সুরা ফুরকান: ৭০।
৮৭ সুরা হুদ: ১১৪
৮৮ সুরা তহা: ৮২।
৮৯ সুরা শুরা: ২৫।
📄 তাওবার পথে অন্তরায়
জেনে রাখো! তাওবার পথে সবচেয়ে বড়ো অন্তরায় ও প্রতিবন্ধক হলো অন্তরে দীর্ঘ আশা পোষণ করা। দুনিয়ার প্রতি অধিক আসক্ত হওয়া। যে ব্যক্তি যত বেশি আশা করে তার আমল হয় তত মন্দ।
ইরশাদ হয়েছে,
ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الْأَمَلُ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ
'ওদেরকে খেতে, ভোগ করতে আর আশায় ভুলে থাকতে দাও। (সময় হলে) ওরা জানতে পারবে।'৯০
أَفَرَأَيْتَ إِنْ مَتَّعْنَاهُمْ سِنِينَ * ثُمَّ جَاءَهُمْ مَا كَانُوا يُوعَدُونَ
'আমি যদি তাদেরকে অনেক বছর (দুনিয়ার সুখ) উপভোগ করতে দিই, তারপর তাদের কাছে তাদের প্রতিশ্রুত শাস্তি আসে (তাতে কি তাদের কোনো লাভ আছে)?' সুরা শুয়ারা: ২০৫-২০৬।
أَيَحْسَبُونَ أَنَّمَا نُمِدُّهُمْ بِهِ مِنْ مَالٍ وَبَنِينَ * نُسَارِعُ لَهُمْ فِي الْخَيْرَاتِ بَل لا يَشْعُرُونَ
'তারা কি মনে করে, আমি যে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তনি দ্বারা তাদেরকে সাহায্য করেছি, তাতে দ্রুত তাদের কল্যাণ সাধন করছি? (আসলে তা নয়) বরং তারা বুঝতে পারছে না। '৯১
জেনে রাখো! মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে তাওবার প্রতি অধিক বেশি উদ্বুদ্ধ করে। যার অন্তরে যত বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ হয়, সে তত দ্রুত তাওবা করে।
হে আল্লাহর বান্দা! মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। মৃত্যু মানুষের অতি নিকটে। জীবন যত দীর্ঘই হোক না কেন প্রকৃতপক্ষে তা সংক্ষিপ্ত। আর দুনিয়া যত প্রিয়ই হোক না কেন বাস্তবার্থে তা খুবই তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট। সুতরাং তুমি ভেবে দেখো! তোমার জন্য কোনটি বেছে নেবে। সেদিন তোমার ও আমার অবস্থা কেমন হবে যেদিন ঘোষণা হবে অমুকের সময় ফুরিয়ে গেছে? সেদিন কেমন পরিণতি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য যেদিন খাটিয়া করে বহন করে নিয়ে যাবে কবরদেশে? সেদিন কেমন অবস্থা হবে যেদিন আপনজনরা মাটিচাপা দিয়ে রেখে আসবে অন্ধকার কবরে? আজই এখন সিদ্ধান্ত নাও, নিজের জন্য তুমি কোনটি বেছে নেবে। সেদিনের পরিণতির কথা ভেবে সজোরে চিৎকার করো। চিৎকার করো। আল্লাহর শপথ! এক কঠিন দিন অপেক্ষা করছে। সেদিন আগমনের পূর্বেই তাওবা করে ফিরে এসো। প্রত্যাবর্তন করো রবের দিকে। তাওবার দুয়ার তিনি উন্মোচন করে রেখেছেন। এ দুয়ার কখনো বন্ধ হয় না। হে আল্লাহর বান্দা! মৃত্যুর দুয়ারে প্রবেশ করার পূর্বে তাওবার দুয়ারে প্রবেশ করো।
হজরত হাসান ইবনে আবু সিনান। তার যখন মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এল তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো তার অনুভূতির কথা। জবাবে তিনি বললেন, 'যদি জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাই তবে তো ভালো। আর নাহয় আমার চেয়ে দুর্ভাগা আর কেউ নেই।'
পুনরায় তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, এ মুহূর্তে কোন জিনিসের প্রতি আপনার অধিক চাহিদা?
হাসান ইবনে আবু সিনান বললেন, 'একটি দীর্ঘ রাত; যার পুরোটাই নামাজে কাটিয়ে দেব।'
ইমাম শাফি রহ. যখন মৃত্যুশয্যায় তখন হজরত মুযানি তাকে দেখতে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আবু আব্দুল্লাহ! আপনি কী অবস্থায় সকাল করেছেন?
ইমাম শাফি রহ. বলেন, 'আমি এমতাবস্থায় সকাল করেছি যেন প্রিয়জনদের ছেড়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছি। আমার মন্দ আমল আমার সম্মুখে। আর আমার মুখ চুমুক দিচ্ছে বহু আশার পেয়ালায়। আর আমি দাঁড়িয়ে আছি আল্লাহর সম্মুখে অথচ জানি না, আমার ঠিকানা জান্নাত—যেখানে আমি নেয়ামত ভোগ করব—নাকি জাহান্নাম—যেখানে রয়েছে মর্মন্তুদ শান্তি?'
হে আল্লাহর বান্দা! জেনে রাখো! সকল আশা একদিন গুটিয়ে যাবে। সমস্ত ধন-সম্পদ বিলীন হয়ে যাবে। মাটির নিচে পঁচে যাবে তোমার সুন্দর দেহ। দিন-রাত্রি আবর্তিত হবে নতুন নিয়মে। প্রত্যেক দূরবর্তী নিকটবর্তী হবে। ঘনিয়ে আসবে সকল প্রতিশ্রুতি পূরণের দিন। সুতরাং সতর্ক হও হে আল্লাহর বান্দা। বিনয়াবনত হয়ে ফিরে এসো তোমার রবের দিকে। প্রত্যাবর্তন করো অবাধ্যতা ও নাফরমানি ছিন্ন করে।
জেনে রাখো! আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বান্দাকে চারটি জিনিসের বিনিময়ে অপর চারটি জিনিস দান করেন।
এক—যে দোয়া করে আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন। ইরশাদ হয়েছে,
ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ 'তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।'৯২
দুই—যে ক্ষমাপ্রার্থনা করে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। ইরশাদ হয়েছে,
إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا 'নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল।'
তিন—যে শুকরিয়া আদায় করে আল্লাহ তাকে নেয়ামত আরও বাড়িয়ে দেন। ইরশাদ হয়েছে,
لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ 'যদি তোমরা শুকরিয়া জ্ঞাপন করো তাহলে আমি তোমাদেরকে বাড়িয়ে দেব।'৯৩
চার—যে তাওবা করে আল্লাহ তার তাওবা কবুল করেন। ইরশাদ হয়েছে,
وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ 'তিনি ওই সত্তা যিনি তার বান্দাদের তাওবা কবুল করেন।'৯৪
টিকাঃ
৯০ সুরা হিজর: ৩।
৯১ সুরা মুমিনুন: ৫৫-৫৬।
৯২ সুরা গাফির: ৬০।
৯৩ সুরা ইবরাহিম: ৭।
📄 যে জীবন নিদারুণ যন্ত্রণার
জেনে রাখো! যে জীবনে আল্লাহর আনুগত্য নেই সে জীবন মরীচিকা তুল্য। হৃদয়ে আল্লাহর পরশ ও সান্নিধ্য ব্যতীত অন্তর কখনো সংশোধিত হয় না। হে মানুষ! কোন জিনিস তোমাকে তোমার প্রভুর ব্যাপারে ধোঁকায় ফেলেছে? আর কতকাল অবাধ্যতায় মত্ত থাকবে?
হে আল্লাহর বান্দা! প্রত্যাবর্তনের এ গল্প হৃদয়ে লিখে নাও অশ্রু ও অনুশোচনার কালিতে। অতঃপর বিনয়াবনত হয়ে ছুটে এসো তোমার রবের দিকে। অন্তরে প্রবল তৃষ্ণা ও ক্ষুধা নিয়ে তার আনুগত্য করো। গভীর রাতে সবাই যখন ঘুমে বিভোর থাকে তখন একাকী দাঁড়িয়ে যাও নামাজে। একান্ত মুনাজাতে আল্লাহকে ডেকে ডেকে বলো, হে আল্লাহ! আপনিই তো পাপিষ্ঠদের একমাত্র আশার ঠিকানা। আপনিই তো অবাধ্যদের একমাত্র ভরসাস্থল। হে আল্লাহ! আপনি যদি ফিরিয়ে দেন, তবে আমি কার নিকট যাব? হে আল্লাহ! আপনি ব্যতীত আর কে আছে যে দয়া করে গোনাহগারের প্রতি? আমি গোনাহগার। হে রাহমানুর রাহিম আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমার তাওবাকে কবুল করুন। এবং আপনার পথে সর্বদা অটল ও অবিচল থাকুন।
হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন। হে আল্লাহ! আপনি যদি আপনার অনুগত বান্দা ব্যতীত কাউকে ক্ষমা না করেন, তাহলে গোনাহগার ও পাপী বান্দারা কোথায় যাবে? কার নিকট তারা আশ্রয় প্রার্থনা করবে? হে আল্লাহ! আপনি যদি কেবল মুত্তাকি বান্দাদের প্রতি রহম করেন তাহলে আপনার অবাধ্য ও পাপাচারী বান্দারা কার নিকট সাহায্য কামনা করবে? আপনি তো তাদেরও রব। আপনি ছাড়া তো কেউ নেই তাদের। হে আল্লাহ! যারা অসহায় ও দরিদ্র তারা তো ধনীদের দুয়ারে যাবেই। হে আল্লাহ! আপনার চেয়ে বড়ো ধনী আর কে আছে? হে আল্লাহ যারা লাঞ্ছিত অপমানিত তারা তো সম্মানিতদের দুয়ারে করাঘাত করবেই। হে আল্লাহ আপনার চেয়ে অধিক সম্মানিত আর কে আছে। হে রাহমানুর রাহিম! হে আরহামার রাহিমিন! আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিন। আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিন। আপনি আমাদেরকে কাছে টেনে নিন। আপনি আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন। সীমাহীন করুণায় আমাদের ঢেকে নিন। আপনি আমাদেরকে আপনার আনুগত্যের তাওফিক দান করুন। আপনি আমাদেরকে আপনার প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন।
হে আল্লাহ! আমরা আপনার নিকট আপনার ভালোবাসা কামনা করি। আমরা আপনার অন্তরপূর্ণ ভালোবাসা প্রার্থনা করি। এবং প্রার্থনা করি ওই ব্যক্তির ভালোবাসা যে আপনাকে ভালোবাসে। হে আল্লাহ! আপনি আপনার ভালোবাসাকে আমাদের অন্তরে পিপাসার্ত ব্যক্তির নিকট পানির চেয়ে অধিক প্রিয় বানিয়ে দিন। হে আল্লাহ! আপনি ঈমানকে আমাদের নিকট প্রিয় বানিয়ে দিন। আমাদের অন্তরে ঈমানকে সুসজ্জিত করে দিন। হে আল্লাহ! আপনি কুফর ফুসুক ও গোনাহকে আমাদের নিকট ঘৃণিত করে দিন। হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করুন।
হে আল্লাহ! আমরা আপনার নিকট প্রার্থনা করছি, যেন দেখে ও না দেখে আমরা আপনাকে ভয় করি। হে আল্লাহ! সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি, লাভ ও ক্ষতি সর্বক্ষেত্রে আমরা সত্য বলার প্রার্থনা করি। হে আল্লাহ! দরিদ্র ও ধনাঢ্য উভয় অবস্থায় আমরা আপনার সন্তুষ্টির প্রার্থনা করি। হে আল্লাহ! আমরা আপনার চেহারা দর্শনের আনন্দলাভের প্রার্থনা করি। আপনার সাক্ষাৎলাভের প্রার্থনা করি।
হে আল্লাহ! হে রাহমানুর রাহিম! আপনি আমাদেরকে ঈমানের সাজে সজ্জিত করে দিন। হে আল্লাহ! হে দয়ালু মেহেরবান! আপনি আমাদের ঈমানকে শক্তিশালী ও সুদৃঢ় করে দিন। হে আল্লাহ! হে বিশ্বজাহানের প্রতিপালক! আপনি আমাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করুন। আমাদেরকে সরল-সঠিক পথে অটুট ও অবিচল রাখুন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে আমাদের নিজ দেশে নিরাপদ রাখুন। আমাদের দেশকে শান্ত ও নিরাপদ রাখুন। আমাদের দেশের শাসক ও নেতাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করুন। তাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে দিন।
হে আল্লাহ! আমাদের দেশকে এবং সমগ্র মুসলিম রাষ্ট্রসমূহকে শত্রুর শত্রুতা থেকে হেফাজত করুন। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন থেকে মুসলিম দেশগুলোকে নিরাপদ রাখুন। শত্রুর সকল অনিষ্টতা থেকে মুসলিম মানচিত্রগুলো মুক্ত ও শান্তির চাদরে ঢেকে রাখুন। হে আল্লাহ! আপনি আপনার দ্বীনকে, আপনার কিতাবকে, আপনার নবীর সুন্নাতকে এবং আপনার মুমিন বান্দাদেরকে সাহায্য করুন। হে আল্লাহ! আপনার কসম! আপনি সাহায্য করুন। আপনি সাহায্য করুন। হে আল্লাহ! হে আমাদের রব! হে বিশ্বজাহানের প্রতিপালক! আপনি আপনার রাস্তায় জিহাদরত মুজাহিদদের সাহায্য করুন। তাদেরকে রণাঙ্গনে সাহায্য করুন। হে আল্লাহ! হে সাহায্যকারী! আপনি মুজাহিদদেরকে সাহায্য করুন—যেভাবে সাহায্য করেছেন বদরের রণাঙ্গনে। তাদের বিজয় দান করুন—যেমন বিজয় দান করেছেন বদরে মুসলমানদেরকে। হে আল্লাহ! যারা মুজাহিদদেরকে সাহায্য করছে আপনি তাদেরকে সাহায্য করুন। হে আল্লাহ! যারা ইসলাম ও মুসলমানদেরকে সাহায্য করছে, আপনি তাদেরকে সাহায্য করুন। হে আল্লাহ! যারা ইসলাম ও মুসলমানদেরকে লাঞ্ছিত করছে তাদেরকে লাঞ্ছিত করুন। যারা মুসলমানদেরকে মিটিয়ে দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে আপনি তাদেরকে মিটিয়ে দিন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের হয়ে যান। আমাদেরকে আপনার বানিয়ে নিন। আমাদের হৃদয় পূর্ণ করে দিন আপনার ভালোবাসায়।
টিকাঃ
৯৪ সুরা শুরা: ২৫।
📄 আমলের প্রতিদান
সময় মানবজীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান সম্পদ। প্রতি বিন্দু সময় মুমিনের নিকট অত্যধিক তাৎপর্যমণ্ডিত। মুমিনের নিকট সময়ের আবেদন ও মাহাত্ম্য প্রভূত। জীবন কী? সময়ের বিন্দু বিন্দু সমষ্টিই তো জীবন। পৃথিবীর সকল কিছুই হারিয়ে গেলে পুনরায় ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু সময় এমন এক মহামূল্যবান জিনিস যা একবার চলে গেলে আর কখনো ফিরে আসে না। প্রকৃত জ্ঞানী সে ব্যক্তি, যে সময়ের মূল্য বুঝতে পারে, এর মাহাত্ম্য অনুধাবন করতে পারে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে তা ব্যয় করে। আর তা সম্ভব হয় একমাত্র আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা যা করতে আদেশ করেছেন সেগুলো বাস্তবায়ন করা এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন সে সমস্ত হারাম ও নাজায়েজ কাজ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে। আর নিঃসন্দেহে এটি একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। জীবনের পরিণত সময় থেকে মৃত্যু অবধি আল্লাহর আদেশ-নিষেধ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা মুমিনের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। একটি শ্রমসাধ্য অধ্যবসায়। তবে সান্ত্বনার বাণী হলো, যারা এ চ্যালেঞ্জ ও অধ্যবসায়কে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করবে আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করবেন। বস্তুত আল্লাহ যাকে সাহায্য করেন তার জন্য কিছুই তখন কঠিন থাকে না।
ইরশাদ হয়েছে,
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ
'যারা আমার জন্য সংগ্রাম করে আমি তাদেরকে অবশ্যই আমার সাথে পরিচালিত করব। আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সঙ্গে আছেন।'৯৫
সময়ের সঠিক মূল্যায়ন এবং সময়কে উপযুক্ত খাতে ব্যয় করার সর্বাধিক কল্যাণকর মাধ্যম হলো—সকল কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা। সর্বদা নেক আমল করা। যেমন: জিকির, নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজের নিষেধ, আত্মীয়তার বন্ধন ইত্যাদি।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বান্দাদেরকে তার সন্তুষ্টি অর্জনে প্রতিযোগিতা ও অগ্রগামিতার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। বান্দাদেরকে তিনি অধিকতর জান্নাতের দিকে অগ্রসর হতে উৎসাহ প্রদান করেছেন। আর এজন্য তাদেরকে দিয়েছেন তিনি রকমারি প্রতিশ্রুতি।
ইরশাদ হয়েছে,
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ
'তোমরা তোমাদের প্রভুর ক্ষমা লাভের চেষ্টা করো।'৯৬
سَابِقُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ
'তোমরা তোমাদের প্রভুর ক্ষমার দিকে ধাবিত হও।'৯৭
পবিত্র কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা প্রেরিত নবী-রাসুলগণের যথোচিত প্রশংসা করেছেন এ বলে,
إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ
'তারা ভালো ভালো কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ত এবং আশা ও ভয় নিয়ে আমাকে ডাকত। আর তারা ছিল আমার প্রতি বিনয়াবনত। '৯৮
সুতরাং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নকারী মুমিন নারী-পুরুষদের অত্যাবশ্যকীয় করণীয় হলো, বেশি বেশি সৎকাজ করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং অসংখ্য নেয়ামতরাজিতে পূর্ণ চিরস্থায়ী জান্নাতের দিকে অগ্রগামী হওয়া।
ইরশাদ হয়েছে,
فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ
'তোমরা কল্যাণের দিকে ধাবিত হও।'৯৯
বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জীবনকে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে বিশেষ পুরস্কার ও গনিমতস্বরূপ মনে করতে বলেছেন। মুমিন নারী-পুরুষদের প্রতি সুসংবাদের বার্তা প্রেরণ করে তিনি বলেছেন,
بادروا بالأعمال سبعاً: هل تنتظرون إلا فقراً منسياً، أو غنى مطغياً، أو مرضاً مفسداً، أو هرماً مفنداً، أو موتاً مجهزاً، أو الدجال فشر غائب ينتظر، أو الساعة فالساعة أدهى وأمر
'সাতটি বিষয়ের পূর্বে তোমরা দ্রুত নেক আমল করো। তোমরা কি এমন দারিদ্র্যের অপেক্ষা করছ, যা তোমাদেরকে সবকিছু ভুলিয়ে দেবে? না এমন ঐশ্বর্যের— যা তোমাদেরকে দর্পিত বানিয়ে ছাড়বে? নাকি এমন রোগের—যার আঘাতে তোমরা জরাজীর্ণ হয়ে পড়বে? না সেই বার্ধক্যের—যা তোমাদেরকে অথর্ব করে ছাড়বে? নাকি মৃত্যুর—যা আকস্মিক এসে পড়বে? নাকি দাজ্জালের—অনুপস্থিত যা কিছুর জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে, দাজ্জাল সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট? না কিয়ামতের অপেক্ষা করছ—যে কিয়ামত কিনা সর্বাপেক্ষা বিভীষিকাময় ও সর্বাপেক্ষা তিক্ত?'১০০
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার দেওয়া আমাদের এ জীবনের সর্বাধিক করণীয় হলো, তার আনুগত্য করা। তাকে ভয় করা। সৎকাজ করা এবং অসৎকাজ থেকে বিরত থাকা। সকল কাজে আল্লাহর আনুগত্য করে এবং তার অবাধ্যতা ও নাফরমানি থেকে সর্বতোভাবে বিরত থেকে শান্তি-সুখে ঘেরা চিরস্থায়ী জান্নাতের দিকে ধাবিত হওয়া। আল্লাহর শপথ! বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, যে ব্যক্তি তার আনুগত্য করবে, হৃদয়ে অর্জন করবে তাকওয়া এবং নেক আমল করবে সে তার কাঙ্ক্ষিত পুরস্কার লাভ করবে। শ্রমিক যেমন তার শ্রমের বিনিময় পেয়ে থাকে, তেমনি নেক আমলকারীও লাভ করবে তার প্রতিশ্রুত পুরস্কার। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার চেয়ে অধিক বড়ো পুরস্কারদাতা আর কে আছে? কেউ নেই। তার চেয়ে বড়ো দাতা আর কেউ নেই। তার দানের চেয়ে বড়ো দানকারী সমগ্র সৃষ্টিজগতে দ্বিতীয় কেউ নেই। তিনি একক। তার সাথে কারও অংশীদার নেই। তিনিই সৃষ্টি করেছেন জান্নাত যার উত্তরাধীকার নির্বাচিত করেছেন তার অনুগত মুমিন বান্দাদের।
ইরশাদ হয়েছে,
أَنِّي لا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِنْكُمْ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى بَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ 'তোমাদের কারও আমল আমি নষ্ট করি না, সে পুরুষ হোক কিংবা নারী। তোমরা একে অপরের অংশ।'
وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا وَكَفَى بِنَا حَاسِبِينَ 'কারও যদি সরিষার দানা পরিমাণও আমল থাকে আমি তা উপস্থিত করব। হিসাব গ্রহণের জন্য আমিই যথেষ্ট। '১০১
আল্লাহ কখনো কারও প্রতিদান নষ্ট করেন না। প্রত্যেককে তিনি সে পরিমাণই দান করেন যে পরিমাণ তার প্রাপ্য। তিনি কারও প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুমও করেন না।
টিকাঃ
৯৫ সুরা আনকাবুত : ৬৯।
৯৬ সুরা আলে ইমরান: ১৩৩।
৩ সুরা হাদিদ: ২১।
৯৮ সুরা আম্বিয়া: ৯০।
৯৯ সুরা বাকারা: ১৪৮।
১০০ জামে তিরমিজি: ২৩০৬।
১০১ সুরা আম্বিয়া: ৪৭।