📘 আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালবাসেন > 📄 তৃতীয় গল্প

📄 তৃতীয় গল্প


এটি এক পরিণত যুবকের গল্প। যে তার অতীত জীবনের গোনাহ ও পাপ থেকে তাওবা করে ফিরে এসেছে। যুবক নিজেই তার প্রত্যাবর্তনের এই বিস্ময়জাগানিয়া গল্প শুনিয়েছে।
আমার বয়স তখন ত্রিশ ছুঁইছুঁই। জীবন ভরপুর যৌবনের উন্মাতাল তরঙ্গে টইটম্বুর। অনেকের মতো আমিও নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছি যৌবন ও প্রবৃত্তির নদীতে। নফসের খেয়ালখুশির উন্মুক্ত দিগন্তে উড়িয়ে দিয়েছি চাহিদার লাগام। মন যা চাইত তাই করতাম। মত্ত ছিলাম আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে।
একরাতের ঘটনা আমি কোনো দিনই ভুলতে পারি না। আমার স্ত্রী ছিল গর্ভবতী। আমাদের প্রথম সন্তান হওয়ার প্রাক্কালে। এমনিতেই আমি আমার স্ত্রীর প্রতি কখনো সদয় ছিলাম না। তার খোঁজ-খবর রাখতাম না। গর্ভকালীন সামান্য যত্নটুকুও আমি তাকে করিনি। এ সময় তার যে প্রয়োজন তা পূরণ করিনি। ঘরে সে একাকী থাকত। আমি দিনরাত বাহিরে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতাম। ঘুরতাম। লোকদের ক্ষতি করতাম। তাদেরকে সৎকাজ থেকে বাধা দিতাম। অসৎকাজে প্ররোচিত করতাম। গভীর রাতে ক্লান্ত হয়ে যখন ঘরে ফিরতাম। কখনো জিজ্ঞেস করতাম না কোনো প্রয়োজন আছে কিনা।
সে রাতে আমি বন্ধুদের সাথে বাজারের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। দেখি এক অশীতিপর অন্ধ, বাজারের দোকানে দোকানে ভিক্ষা করছে। তাকে দেখে আমার মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি এল। বৃদ্ধ যখন লাঠিতে ভর করে আমার সামনে দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তখন আমার একটি পা তার দিকে বাড়িয়ে দিই আর অমনি তিনি উপুড় হয়ে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে যান। এ দেখে আমি সজোরে হাসতে থাকি। আমার বন্ধুরাও হাসতে থাকে। হাসতে হাসতে আমরা একে অপরের ওপর গড়িয়ে পড়ি।
রাতভর বন্ধুদের সাথে ঘুরে, আড্ডা দিয়ে ভোর নাগাদ যখন ঘরে ফিরি দেখি আমার স্ত্রী দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে আমার আগমনের অপেক্ষা করছে। ঘরে প্রবেশ করা মাত্রই আমাকে জিজ্ঞেস করল কোথায় ছিলাম সারা রাত। আমার অপেক্ষায় সে দাঁড়িয়ে আছে। তার শরীর বেশ খারাপ। মাঝরাতে তার প্রচণ্ড পেট ব্যথা শুরু হয়েছে। অনবরত রক্ত ঝরছে।
আমি তখন বুঝতে পারি যে, তার প্রতি আমি অনেক অবিচার করেছি। অনেক অবহেলা করেছি। তার ন্যূনতম খোঁজ-খবর আমি রাখিনি। তার কোনো প্রয়োজনে কখনো পাশে দাঁড়াইনি। সে রাতে কিছুটা অপরাধবোধ আমার ভেতরে জেগে ওঠে।
তাৎক্ষণিক আমি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। পরদিন হাসপাতালে আমাদের প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণ করে। জন্মের সময় আমি হাসপাতালে ছিলাম না। আমাকে ফোন করে জানানো হলো। আমি তড়িঘড়ি হাসপাতালে ছুটে যাই। ডাক্তার আমাকে বললেন, আমার সন্তান অন্ধ। সে কোনোদিন পৃথিবীর আলো-বাতাস দেখতে পারবে না। ডাক্তারের মুখে আকস্মিক এমনতর দুঃসংবাদ শুনে আমি মুষড়ে পড়ি। আমার চিন্তা-চেতনা যেন উলট-পালট হয়ে যাচ্ছে। আর তখনই আমার মনে পড়ে গতকাল রাতে বাজারের সেই অন্ধ বৃদ্ধের কথা। যাকে আমি পা দিয়ে মাটিতে উপুড় করে ফেলে দিয়েছি। আল্লাহ তায়ালা অতি দ্রুত আমার পাপের প্রতিশোধ গ্রহণ করলেন। বারবার আমার স্মৃতিতে ভাসতে থাকে সে রাতের কথা।
সন্তানের নাম রাখা হয় সালিম। জন্মান্ধ হওয়ার কারণে তার প্রতি আমার কোনো আকর্ষণ ছিল না। আমি পুনরায় আমার পূর্বের জীবনে ফিরে গেলাম। আল্লাহর অবাধ্যতা, নাফরমানিতে জড়িয়ে পড়ি। দিনশেষে যখন বাড়ি ফিরতাম, একটিবারের জন্যও আমার সন্তানের দিকে ফিরে তাকাতাম না। তার কোনো খোঁজ-খবর নিতাম না। কিন্তু আমার স্ত্রী ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। আমি আমার সন্তানের প্রতি যতটুকু বেপরোয়া, আমার স্ত্রী ঠিক ততটুকুই তার প্রতি যত্নশীল। তার আদর যত্নে সামান্যতম কমতি করত না। বুকের ধন বুকে আগলে রাখত সর্বদা। একজন মা তার সুস্থ সন্তানকে যেভাবে লালন- পালন করে, আমার স্ত্রী তার অন্ধ সন্তানকে ঠিক সেভাবেই লালন-পালন করতে থাকে।
সময়ের পরিক্রমায় আমার দুজন পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে। তাদের নাম রাখি যথাক্রমে উমর ও খালিদ। দেখতে দেখতে সালিম তার শৈশব অতিক্রম করে কৈশোরে পদার্পণ করে। তার বয়স তখন দশ। এক পবিত্র শুক্রবারে আমি ঘুম থেকে জাগতে জাগতে প্রায় দুপুর হয়ে যায়। ব্যতিব্যস্ত হয়ে যখন ঘর থেকে বের হতে যাই তখন দেখি সালিম কাঁদছে। দীর্ঘ দশ বছরে কত অগণিতবার তাকে ক্রন্দন করতে দেখেছি, কিন্তু কখনো কাছে গিয়ে তার কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করিনি। জন্মের পর থেকেই তার প্রতি আমার একধরনের বিতৃষ্ণা ছিল। হয়তো অন্ধ বলেই। আজ হঠাৎ কী ভেবে আমি দাঁড়িয়ে যাই। আমি আমার নিজেকে জিজ্ঞেস করি, তাকে এভাবে রেখে চলে যাব নাকি কাছে গিয়ে তার কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করব? জানি না, এ আমার বাহুল্য নাকি পিতৃসুলভ স্নেহ। আমি তার দিকে এগিয়ে যাই। জিজ্ঞেস করি কেন কাঁদছে সে? আমার আগমন টের পেয়ে সালিম পেছনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করে। তখন আমি উপলব্ধি করি বিগত দশ বছর আমি তার প্রতি অনেক অবিচার করেছি। পিতা হিসেবে তার ন্যূনতম দায়িত্ব আমার মাঝে ছিল না। কখনো কোনো দিন তার মাথায় হাত রেখে আদর করিনি। আজ আমি তার কাছে যেতে চাইলেও সে দূরে চলে যাচ্ছে।
সালিম পুনরায় কাঁদতে থাকে। আমি দাঁড়িয়ে থাকি। কিছুক্ষণ পর জানতে পারি সে কেন কাঁদছে। আজ শুক্রবার। পবিত্র জুমার দিন। অন্যদিনের তুলনায় নামাজিরা আগে আগে মসজিদে চলে আসে। সালিম নিয়মিত শুক্রবারে মসজিদে যায়, এবং প্রথম কাতারে নামাজ পড়ে। কিন্তু আজ কেউ তাকে মসজিদে নিয়ে যাচ্ছে না। তার ছোটো ভাই উমর ও খালিদ বাড়ি নেই। এদিকে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। মসজিদের প্রথম কাতারে জায়গা পাবে না। তাই এ ভেবে সে একাকী কান্না করছে।
বিষয়টি আমাকে প্রবলভাবে নাড়া দিলো। আমার সমগ্র সত্তাজুড়ে যেন এক বিশাল কাঁপুনি সৃষ্টি হলো। সালিম আমার অন্ধ সন্তান, যাকে আমি এড়িয়ে চলছি আজ দশটি বছর। যার কোনো পিতৃদায়িত্ব আমি পালন করিনি। কারণ সে অন্ধ। বাকি দুই পুত্র উমর ও খালিদের প্রতি আমার ঠিকই পিতৃসুলভ আদর-স্নেহ রয়েছে। নেই কেবল সালিমের প্রতি। সেদিন এক অদৃশ্য শক্তি আমাকে জাগিয়ে দিয়ে গেল। আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম, আজ কত বছর আমি মসজিদে যাই না? কত বছর সেজদা দিই না আল্লাহকে? আমার অন্ধ পুত্র যাকে বঞ্চিত করে রেখেছি সকল ন্যায্য আদর-ভালোবাসা থেকে-সে মসজিদের প্রথম কাতারে জায়গা পাবে না ভেবে ক্রন্দন করছে। আর আমি মসজিদে যাই না আজ কত বছর! আমি আল্লাহকে ভুলে আছি। মসজিদ ভুলে আছি। আর আমার অন্ধ সন্তান সে মসজিদে যাওয়ার জন্য ক্রন্দন করছে।
আমি তখন দৃঢ় ইচ্ছা করি যে, আজ আমিই সালিমকে মসজিদে নিয়ে যাব এবং নিজেও তার সঙ্গে প্রথম সারিতে জুমার নামাজ আদায় করব। আমি যখন তাকে এ কথা বললাম সে কিছুতেই বিশ্বাস করছে না। ভেবেছে আমি তার সঙ্গে উপহাস করছি। আজীবন তো মানুষের সাথে এমন উপহাস করেই গেলাম। কিন্তু না, আজ সত্যি সত্যিই আমি আমার প্রতিবন্ধী সন্তানকে মসজিদে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প করি। যখন সে দেখল সত্যিই আমি তাকে মসজিদে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছি তখন তার চেহারায় এক পবিত্র আভা ভেসে উঠল। এক নুরানি দ্যুতি যেন তার চোখ-মুখ থেকে ঠিকরে বের হচ্ছে।
সালিম যেহেতু অন্ধ, পথ চলতে তার কষ্ট হবে তাই প্রথমে আমি তাকে গাড়িতে করে মসজিদে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে করি। কিন্তু সালিম আমাকে অবাক করে বলল, সে পায়ে হেঁটে মসজিদে যাবে। কারণ, পায়ে হেঁটে মসজিদে গেলে প্রতি কদমে একটি নেকি লেখা হবে এবং একটি গোনাহ মোচন করা হবে। আমি তখন নিজেকে নিয়ে আরও দ্বিগুণ লজ্জিত হতে থাকি। সালিমের কথানুযায়ী পায়ে হেঁটেই আমি তাকে মসজিদে নিয়ে যাই।
মসজিদ ততক্ষণে ভরে গেছে। চারপাশ উপচে পড়া মানুষ। নামাজের আর বেশি সময় বাকি নেই। কিন্তু মসজিদের মুসল্লিগণ সালিমকে প্রথম কাতারে বসার জায়গা করে দিলেন। আমিও সালিমের সঙ্গে প্রথম কাতারে বসি।
নামাজ শেষ করে সালিম জায়নামাজে আপন মনে বসে রইল। তাসবিহ, তাহলিল শেষ করে সালিম আমাকে অনুরোধ করল তাকে একটি কুরআন শরিফ দিতে। আমি আশ্চর্য হলাম। কারণ সে তো অন্ধ! কুরআন পড়বে কীভাবে? তবুও তার কথানুযায়ী একটি কুরআন এনে তার হাতে দিলাম। আমাকে দ্বিগুণ আশ্চর্য করে সালিম সুরা কাহাফ মুখস্থ পড়তে শুরু করল। এরই মাঝে সে সুরা কাহাফ পরিপূর্ণ মুখস্থ করে ফেলেছে। কিন্তু এসবের কিছুই আমি জানতাম না। সালিমকে আমি যতই দেখতে থাকি আমার বিস্ময়ের ঘোর ততই বাড়তে থাকে। সেইসঙ্গে লজ্জা ও অনুশোচনা ক্রমাগত দংশন করতে থাকে বিষাক্ত সাপের ন্যায়।
সুরা কাহাফ তিলাওয়াত শেষে সালিম আল্লাহর দরবারে দু-হাত তুলল। তার সঙ্গে আমিও দু-হাত তুলে ধরি আল্লাহর নিকট। তখনই আমি আমার অন্তরে এক আশ্চর্য পরিবর্তন লক্ষ করি। আমি আমার অতীত জীবনের জঘন্য কৃতকর্মে প্রবল অনুশোচনা ও লজ্জিত হয়ে মসজিদে কাঁদতে থাকি। আমার চোখ ফেটে অবিরাম অশ্রু ঝরতে থাকে। অনুশোচনার অশ্রুতে ভেসে যায় আমার বুক। আমি আরও প্রবল করে কাঁদতে থাকি। সে কান্না ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। পাশে বসে সালিম আমার অবিরাম কান্নার আওয়াজ শুনছিল। কিন্তু সমস্ত লজ্জা ও জড়তা ভেঙে আমি ক্ষমা চাইতে থাকি। মাফ চাইতে থাকি যাপিত জীবনের সকল ভুলের।
তারপর সালিমকে নিয়ে আমি বাড়ি ফিরি। সেদিনের পর আজ পর্যন্ত এক ওয়াক্ত নামাজ আমি ছাড়িনি। প্রতি ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে জামাতের সাথে আদায় করেছি। অসৎ বন্ধুদের সঙ্গ ত্যাগ করেছি। গোনাহের সমস্ত উপকরণ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। একমাত্র আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি মনোনিবেশ করি। সকল নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। কুরআন পড়া শিখেছি। প্রতি মাসে কয়েক বার কুরআন খতম করি। বন্ধুদের সাথে আড্ডার পরিবর্তে আল্লাহর জিকির করি। আলহামদুলিল্লাহ, এখন আমি ঈমানের পূর্ণ স্বাদ আস্বাদন করছি। পরিবারের সকলে আমাকে ভালোবাসে। ইতঃপূর্বে তারা আমাকে সব সময় এড়িয়ে চলত। সকলের নিকট আমি ছিলাম অপাঙ্ক্তেয়। তাদের আদর-স্নেহে আমার হৃদয় এখন ভরপুর।
সালিম—যাকে আমি এতকাল অবহেলা ও দূর দূর করে রেখেছি—এখন সে আমার নিকট সর্বাধিক ভালোবাসার পাত্র। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পূর্বে এবং বাড়িতে প্রবেশ করার পর সর্বপ্রথম আমি সালিমের খোঁজ নেই। তার সকল প্রয়োজন যথাসাধ্য পূরণ করি। জীবনের সকল আনন্দ এখন আমার হাতের মুঠোয়। কারণ এখন আমি ফিরে এসেছি শাশ্বত শান্তির পথে— আল্লাহর নির্দেশিত জীবন আমাকে দিয়েছে জীবনের প্রকৃত সুখ।
একদিন আমি ও আমার বন্ধুরা সিদ্ধান্ত নিই একটি দাওয়াতি কাফেলার সাথে তিন মাসের জন্য সফরে যাব। এ ব্যাপারে আমি আমার পরিবারের নিকট অনুমতি চাইলে তারা আমাকে সাদর অনুমতি দেয়। সবচেয়ে বেশি খুশি হয় সালিম। সে তার ছোট্ট দু-হাত দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে। তাদের আনন্দ দেখে আমার দু-চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে।
কাফেলার সাথে বেরিয়ে পড়ি আল্লাহর রাস্তায়। বাড়ি থেকে বহু দূরবর্তী এক অঞ্চলে তিন মাস ছিলাম। দীর্ঘ এ সময়ে পরিবার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে তাদের প্রতি অন্তরে বিশেষ ভালোবাসা তৈরি হয়। বারবার স্মরণ হতে থাকে প্রিয়তমা স্ত্রী ও সন্তানদের কথা। চোখে ভাসতে থাকে প্রিয় পুত্র সালিমের মুখখানা। অন্যদের চেয়ে সালিমকে বেশি মনে পড়ত আমার। সস্মৃতিতে বাজতে থাকত তার কণ্ঠ। তার সঙ্গে সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা তীব্র হতে থাকে।
সফর শেষ হওয়া মাত্রই আমি বাড়ি ফিরে আসি। মুহূর্ত আর দেরি করিনি। সাক্ষাতের প্রবল তৃষ্ণা বুকে আমি দরজায় করাঘাত করি। আমার ভেতরে আকাঙ্ক্ষা ছিল হয়তো সালিম এসে দরজা খুলবে। কিন্তু না, চার বছর বয়সি কনিষ্ঠ পুত্র খালিদ দরজা খুলে। আনন্দের আতিশয্যে খালিদকে আমি কোলে তুলে নিই। খালিদ আমাকে দেখে কাঁদতে থাকে। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে কান্নার আওয়াজ। আমি তখন কিছুই বুঝতে পারিনি খালিদ ঠিক কী কারণে কাঁদছে। ঘরে প্রবেশ করার পর সকলের মাঝে একধরনের পরিবর্তন লক্ষ করি। তাদের চোখে মুখে কেমন বিষাদের ছায়া। আমি সালিমকে ডাকতে থাকি। একবার দুই বার করে কয়েক বার। কিন্তু কোনো সাড়া মিলছে না সালিমের। আমি আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করি, সালিম কোথায়? প্রশ্ন শুনে স্ত্রী তার মাথা নুয়ে ফেলে। কোনো উত্তর দেয় না। বার কয়েক জিজ্ঞেস করার পর সে তার আঁচলে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে থাকে। আমার ভেতরটা কেমন নড়ে ওঠে। তখন খালিদ কাঁপা কাঁপা এবড়ো-থেবড়ো কণ্ঠে যা বলে তা শোনার জন্য আমি কিছুতেই প্রস্তুত ছিলাম না। খালিদ বলে, ভাইয়াকে আল্লাহ নিয়ে গেছে। ভাইয়া এখন বেহেশতে।
সত্যিই এমন একটি শোকাবহ সংবাদ শোনার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। প্রচণ্ড আওয়াজে আমি কাঁদতে থাকি। কাঁদতে কাঁদতে একপর্যায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি।
কিছুদিন আগে সালিমের জ্বর হয়েছিল। দিনদিন তার অবস্থার অবনতি হতে থাকে। আমার স্ত্রী তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। দুইদিন হাসপাতালে থাকার পর তৃতীয় দিন সালিম মারা যায়। আমি বুঝতে পারি—আল্লাহ তায়ালা এর মাধ্যমে আমার পরীক্ষা নিচ্ছেন। আমি পুত্রশোকের নিদারুণ যন্ত্রণা বুকে পাথরচাপা দিয়ে ধৈর্যধারণ করি।
একদা আমি অন্ধ ও খোঁড়া সালিমকে নিয়ে কত চিন্তিত ছিলাম। কত অবিচার করেছি আমি তার প্রতি। সালিম নয়, প্রকৃতার্থে অন্ধ তো ছিলাম আমি। যে তাকে সকল আদর-স্নেহ থেকে বঞ্চিত করেছি। আমি সালিমের চেয়ে বড়ো অন্ধ। কারণ আমি তাকে চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও দেখিনি। তার কাছে যাইনি। তাকে কোলে নিইনি। দীর্ঘ দশটি বছর আমি তাকে নিদারুণ অবহেলা আর অহেতুক বঞ্চনার মাঝে ফেলে রেখেছি। সেই তো প্রকৃত অন্ধ। যে আল্লাহর পরিচয় জানে না। যার অন্তরে আল্লাহর মারেফত নেই। যে ঈমান ও ইয়াকিন থেকে যোজন যোজন দূরে সরে আছে সেই প্রকৃত অন্ধ। সালিমই প্রকৃত দৃষ্টিসম্পন্ন। তার অন্তরে ঈমানের আলো আছে। ইয়াকিনের দৃঢ়তা আছে। আল্লাহর আনুগত্য ছিল তার নিকট সর্বাধিক প্রিয়। সালিম-যার চক্ষু নেই, চক্ষু আছে আমার। অথচ তার হাত ধরে আমি পেয়েছি সঠিক পথের দিশা। অন্ধকার থেকে এসেছি আলোর পথে। আল্লাহর কসম! সালিম নয়, প্রকৃত অন্ধ আমরা; যারা ঈমান ও আমলের রাস্তা থেকে দূরে পড়ে আছি।'
হে আল্লাহ! সালিমকে আপনি কবুল করে নিন। আপনার রহমতের চাদরে তাকে ঢেকে রাখুন। হে আল্লাহ! মৃত্যু পর্যন্ত আপনি আমাদেরকে আপনার সরল-সঠিক পথে অবিচল রাখুন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00