📄 দ্বিতীয় গল্প
বর্ণনাকারী বলেন, 'আমার এক বন্ধু ছিল। তার চলাফেরা, চালচলন ছিল দৃষ্টিকটু। মানুষের সাথে তার আচার-ব্যবহার ছিল খুবই মন্দ। চরিত্র ছিল খারাপ। মুখ ছিল অশ্লীল। তার কথাবার্তা ও সার্বিক ব্যবহারে লোকেরা ভারি কষ্ট পেত। সর্বদা সে আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে ডুবে থাকত। অশ্লীলতা, পাপাচার ছিল তার নিত্যসঙ্গী। লোকদেরকে সৎকাজে বাধা দিত। অসৎকাজের সঙ্গী হতো। এহেন কোনো অন্যায়-অপকর্ম ছিল না যা সে করত না। তার এসব অনাচারের কারণে দীর্ঘদিন আমি তার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম।
বহুদিন পর একদিন আকস্মিক তার সঙ্গে আমার দেখা হলো। তাকে দেখা মাত্র আমি চমকে উঠি। বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যাই। কিছুতেই যেন নিজেকে আমি বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না। আমার সে বন্ধুটি আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে। মার্জিত পোশাক। চেহারায় ভদ্রতার ছাপ পষ্ট। কথাবার্তা শান্ত। ব্যবহার যে কাউকে মুগ্ধ করবে। আমি তার সাথে করমর্দন করি। তার মিষ্টি হাসি আমার হৃদয়কে ছুঁয়ে গেছে। তার সুন্দর ও নরম কথায় আমি যারপরনাই মুগ্ধ হই। অথচ একসময় তার বিকট হাসিতে কান ফেটে যাওয়ার উপক্রম হতো। অথচ আজ তার হাসি কতো স্নিগ্ধ ! কতো কোমল! একসময় তার বেফাস ও অশ্লীল কথায় অন্তর মারাত্মক আহত হতো। কিন্তু আজ তার শান্ত কণ্ঠের মিষ্টি স্বরের সুন্দর কথায় প্রাণ জুড়িয়ে গেল।
তার সাথে দেখা হওয়ার পর আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে পূর্বের দিনগুলো স্মরণ করার চেষ্টা করছি। আমার অমন আশ্চর্য হওয়া দেখে সে জিজ্ঞেস করল, 'তোমার চোখে-মুখে এত বিস্ময়ের আভা কেন? তুমি কি কিছু জিজ্ঞেস করবে আমাকে?'
আমি বললাম, হ্যাঁ, অবশ্যই জিজ্ঞেস করব।
তারপর আমি তাকে তার পরিবর্তনের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। কীভাবে সে প্রত্যাবর্তন করল আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানি থেকে? বলি—নিশ্চয় এর পেছনে রয়েছে এক না জানা গল্প?
সে বলল, 'হ্যাঁ, আমি বলছি আমার জীবনে ঘটে যাওয়া সে ঘটনা যা আমাকে ফিরিয়ে এনেছে আজকের অবস্থানে।
সে বলতে লাগল, একদিন আমি নদীর তীরবর্তী একটি রাস্তায় প্রচণ্ড গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলাম। হঠাৎ কোথায় থেকে যেন একটি শিশু দৌড়ে গাড়ির সামনে চলে আসে। আমি গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যাই। কিছুক্ষণ পর আমি নিজেকে পানির ভেতর আবিষ্কার করি। রাস্তার তীরবর্তী হলেও নদীটি ছিল খুবই গভীর। আমার তখন শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। নিশ্বাস নেবার জন্য আমি মাথা উঁচু করি। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে গাড়ি পানিতে ভরে যায়। শ্বাস নেবার মতো সামান্য জায়গাও ফাঁকা ছিল না। হতবুদ্ধি হয়ে আমি তখন উভয় হাত নাড়াতে থাকি। চেষ্টা করছি যেন গাড়ির দরজা কোনো রকম খোলা যায়। কিন্তু কিছুতেই গাড়ির দরজা খুলতে পারছিলাম না। আমি তখন জীবনের সকল আশা ছেড়ে দিই। বাঁচার কোনো রাস্তাই তখন আমার সামনে ছিল না।
গভীর পানির তলে আবদ্ধ গাড়ির ভেতর মনে হতে থাকে আমার বিগত জীবনের কথা। আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানির কথা। মানুষকে কষ্ট ও তাদেরকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করার কথা। আমি তখন চূড়ান্ত রকমের বিচলিত হয়ে পড়ি। ছটফট করতে থাকি। না, মৃত্যুর জন্য আমি ছটফট করছিলাম না। কেননা ততক্ষণে আমি আমার মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছি। আমি ছটফট করতে থাকি মৃত্যুর-পরবর্তী জীবন সম্পর্কে। কী নিয়ে আমি হাজির হবো আল্লাহর সম্মুখে? আল্লাহ তায়ালা যখন আমার জীবনের হিসাব চাইবেন তখন আমি কী জবাব দেব। নিশ্চিত পরিণতির কথা ভেবে আমি নিঃশব্দে চিৎকার করতে থাকি আর ডাকতে থাকি আল্লাহকে। আমার সমস্ত সত্তা তখন আল্লাহকে স্মরণ করছে। আমার অনুভূতি জুড়ে একমাত্র আল্লাহ আল্লাহ। ভাবি, যতক্ষণ বেঁচে আছি আল্লাহকে স্মরণ করি।
আমি যখন সকল কিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাসের সাথে আল্লাহকে ডাকতে থাকি তখন আল্লাহ আমার ডাকে সাড়া দিয়েছেন। তিনি আমাকে পানির অতল গহ্বরে আবদ্ধ গাড়ির ভেতর নিশ্চিত মৃত্যুর ঠিক পূর্বমুহূর্তে মুক্তির ব্যবস্থা করেন। হঠাৎ তখন আমার স্মরণ হলো, গাড়ির সামনের কাঁচ ভাঙা। তিনদিন আগে এক এক্সিডেন্টে গাড়ির সামনের কাঁচ পুরোটা ভেঙে যায়। আল্লাহ আমাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন। আমি তখন প্রচণ্ড শক্তি ব্যয় করে গাড়ির সামনের কাঁচ দিয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসি। আমার তখন এতটুকুন শক্তিও ছিল না। আল্লাহ যাকে বাঁচাতে চান কেউ তাকে মারতে পারে না। আর যাকে তিনি মারতে চান তাকে কেউ বাঁচাতে পারে না।
আমি যখন গাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে কোনো রকম মাথা উঁচু করি তখন দুজন ব্যক্তি আমাকে পানি থেকে ওপরে তুলে আনে। আমি তাকিয়ে দেখি অসংখ্য লোকজন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে তারা সমস্বরে চিৎকার করে উঠল। উপস্থিত লোকজন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না যে আমি সেখান থেকে জীবন নিয়ে ফিরে এসেছি। তারা বিস্ময়ের চোখে আমাকে দেখতে লাগল। কারণ এ ছিল সত্যিই অবিশ্বাস্য। এত উঁচু রাস্তা থেকে পড়ার পর কারোরই বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু আল্লাহর অপার মহিমা যে, তিনি আমাকে বাঁচিয়েছেন।
সেদিন আমি নবজীবন লাভ করেছি। আল্লাহ আমাকে পুনরায় দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন। আজ না হয় আমি তোমাদের আলোচনার বিষয় হতাম। অন্ধকার কবর হতো আমার ঠিকানা।
তখন থেকে আমার সমস্ত চিন্তা-চেতনার আমূল পরিবর্তন ঘটে। আমি নিজেকে সম্পূর্ণ নতুন ভাবতে থাকি। আল্লাহ এক নতুন জীবন আমাকে দান করেছেন। সেখান থেকে ফিরে আমি যখন ঘরে আসি তখন সর্বপ্রথম আমার দৃষ্টি পড়ে দেয়ালে টাঙানো বিভিন্ন ছবির ওপর। এগুলো ছিল বিভিন্ন নায়ক-নায়িকা ও গায়ক-গায়িকার ছবি, যাদেরকে আমি পছন্দ করতাম। যাদের লাইফস্টাইল অনুসরণ করতাম। আমি দ্রুত সেগুলো দেয়াল থেকে নামিয়ে ছিঁড়ে-মুচড়ে ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করি। পুরো ঘরকে অশ্লীলতামুক্ত করি। সকল হারাম জিনিস ঘর থেকে বের করে ফেলি।
আমি আমার অতীত জীবন থেকে আল্লাহর নিকট তাওবা করি। যাপিত জীবনের সকল গোনাহ ও পাপের জন্য তার নিকট করজোর ক্ষমাপ্রার্থনা করি। আল্লাহর আনুগত্য ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার অঙ্গীকার করি। আলহামদুলিল্লাহ! আজ পর্যন্ত আমি আমার সে অঙ্গীকারের ওপর অটল আছি। এখন তুমি আমাকে সে রূপে, সে পোশাকে দেখতে পাচ্ছ।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! তাওবা এমন এক শক্তিশালী হাতিয়ার যা অতীতের সকল গোনাহ ও পাপরাশিকে মুহূর্তে ধুয়েমুছে স্বচ্ছ আয়নার মতো পরিষ্কার করে দেয়। তাওবা এক অদৃশ্য শক্তি যা বান্দার গোনাহে আচ্ছন্ন কালো অন্তরকে নিমিষেই ঝকঝকে পবিত্র ও সাদা বানিয়ে দেয়। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার গোনাহগার বান্দাদেরকে ক্রমাগত ডাকছেন তাওবার দুয়ারে প্রবেশ করার জন্য।
ইরশাদ হয়েছে,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحاً
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট খাঁটি তাওবা করো।'৮৩
টিকাঃ
৮৩ সুরা তাহরিম: ৪
📄 তৃতীয় গল্প
এটি এক পরিণত যুবকের গল্প। যে তার অতীত জীবনের গোনাহ ও পাপ থেকে তাওবা করে ফিরে এসেছে। যুবক নিজেই তার প্রত্যাবর্তনের এই বিস্ময়জাগানিয়া গল্প শুনিয়েছে।
আমার বয়স তখন ত্রিশ ছুঁইছুঁই। জীবন ভরপুর যৌবনের উন্মাতাল তরঙ্গে টইটম্বুর। অনেকের মতো আমিও নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছি যৌবন ও প্রবৃত্তির নদীতে। নফসের খেয়ালখুশির উন্মুক্ত দিগন্তে উড়িয়ে দিয়েছি চাহিদার লাগام। মন যা চাইত তাই করতাম। মত্ত ছিলাম আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে।
একরাতের ঘটনা আমি কোনো দিনই ভুলতে পারি না। আমার স্ত্রী ছিল গর্ভবতী। আমাদের প্রথম সন্তান হওয়ার প্রাক্কালে। এমনিতেই আমি আমার স্ত্রীর প্রতি কখনো সদয় ছিলাম না। তার খোঁজ-খবর রাখতাম না। গর্ভকালীন সামান্য যত্নটুকুও আমি তাকে করিনি। এ সময় তার যে প্রয়োজন তা পূরণ করিনি। ঘরে সে একাকী থাকত। আমি দিনরাত বাহিরে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতাম। ঘুরতাম। লোকদের ক্ষতি করতাম। তাদেরকে সৎকাজ থেকে বাধা দিতাম। অসৎকাজে প্ররোচিত করতাম। গভীর রাতে ক্লান্ত হয়ে যখন ঘরে ফিরতাম। কখনো জিজ্ঞেস করতাম না কোনো প্রয়োজন আছে কিনা।
সে রাতে আমি বন্ধুদের সাথে বাজারের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। দেখি এক অশীতিপর অন্ধ, বাজারের দোকানে দোকানে ভিক্ষা করছে। তাকে দেখে আমার মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি এল। বৃদ্ধ যখন লাঠিতে ভর করে আমার সামনে দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তখন আমার একটি পা তার দিকে বাড়িয়ে দিই আর অমনি তিনি উপুড় হয়ে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে যান। এ দেখে আমি সজোরে হাসতে থাকি। আমার বন্ধুরাও হাসতে থাকে। হাসতে হাসতে আমরা একে অপরের ওপর গড়িয়ে পড়ি।
রাতভর বন্ধুদের সাথে ঘুরে, আড্ডা দিয়ে ভোর নাগাদ যখন ঘরে ফিরি দেখি আমার স্ত্রী দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে আমার আগমনের অপেক্ষা করছে। ঘরে প্রবেশ করা মাত্রই আমাকে জিজ্ঞেস করল কোথায় ছিলাম সারা রাত। আমার অপেক্ষায় সে দাঁড়িয়ে আছে। তার শরীর বেশ খারাপ। মাঝরাতে তার প্রচণ্ড পেট ব্যথা শুরু হয়েছে। অনবরত রক্ত ঝরছে।
আমি তখন বুঝতে পারি যে, তার প্রতি আমি অনেক অবিচার করেছি। অনেক অবহেলা করেছি। তার ন্যূনতম খোঁজ-খবর আমি রাখিনি। তার কোনো প্রয়োজনে কখনো পাশে দাঁড়াইনি। সে রাতে কিছুটা অপরাধবোধ আমার ভেতরে জেগে ওঠে।
তাৎক্ষণিক আমি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। পরদিন হাসপাতালে আমাদের প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণ করে। জন্মের সময় আমি হাসপাতালে ছিলাম না। আমাকে ফোন করে জানানো হলো। আমি তড়িঘড়ি হাসপাতালে ছুটে যাই। ডাক্তার আমাকে বললেন, আমার সন্তান অন্ধ। সে কোনোদিন পৃথিবীর আলো-বাতাস দেখতে পারবে না। ডাক্তারের মুখে আকস্মিক এমনতর দুঃসংবাদ শুনে আমি মুষড়ে পড়ি। আমার চিন্তা-চেতনা যেন উলট-পালট হয়ে যাচ্ছে। আর তখনই আমার মনে পড়ে গতকাল রাতে বাজারের সেই অন্ধ বৃদ্ধের কথা। যাকে আমি পা দিয়ে মাটিতে উপুড় করে ফেলে দিয়েছি। আল্লাহ তায়ালা অতি দ্রুত আমার পাপের প্রতিশোধ গ্রহণ করলেন। বারবার আমার স্মৃতিতে ভাসতে থাকে সে রাতের কথা।
সন্তানের নাম রাখা হয় সালিম। জন্মান্ধ হওয়ার কারণে তার প্রতি আমার কোনো আকর্ষণ ছিল না। আমি পুনরায় আমার পূর্বের জীবনে ফিরে গেলাম। আল্লাহর অবাধ্যতা, নাফরমানিতে জড়িয়ে পড়ি। দিনশেষে যখন বাড়ি ফিরতাম, একটিবারের জন্যও আমার সন্তানের দিকে ফিরে তাকাতাম না। তার কোনো খোঁজ-খবর নিতাম না। কিন্তু আমার স্ত্রী ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। আমি আমার সন্তানের প্রতি যতটুকু বেপরোয়া, আমার স্ত্রী ঠিক ততটুকুই তার প্রতি যত্নশীল। তার আদর যত্নে সামান্যতম কমতি করত না। বুকের ধন বুকে আগলে রাখত সর্বদা। একজন মা তার সুস্থ সন্তানকে যেভাবে লালন- পালন করে, আমার স্ত্রী তার অন্ধ সন্তানকে ঠিক সেভাবেই লালন-পালন করতে থাকে।
সময়ের পরিক্রমায় আমার দুজন পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে। তাদের নাম রাখি যথাক্রমে উমর ও খালিদ। দেখতে দেখতে সালিম তার শৈশব অতিক্রম করে কৈশোরে পদার্পণ করে। তার বয়স তখন দশ। এক পবিত্র শুক্রবারে আমি ঘুম থেকে জাগতে জাগতে প্রায় দুপুর হয়ে যায়। ব্যতিব্যস্ত হয়ে যখন ঘর থেকে বের হতে যাই তখন দেখি সালিম কাঁদছে। দীর্ঘ দশ বছরে কত অগণিতবার তাকে ক্রন্দন করতে দেখেছি, কিন্তু কখনো কাছে গিয়ে তার কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করিনি। জন্মের পর থেকেই তার প্রতি আমার একধরনের বিতৃষ্ণা ছিল। হয়তো অন্ধ বলেই। আজ হঠাৎ কী ভেবে আমি দাঁড়িয়ে যাই। আমি আমার নিজেকে জিজ্ঞেস করি, তাকে এভাবে রেখে চলে যাব নাকি কাছে গিয়ে তার কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করব? জানি না, এ আমার বাহুল্য নাকি পিতৃসুলভ স্নেহ। আমি তার দিকে এগিয়ে যাই। জিজ্ঞেস করি কেন কাঁদছে সে? আমার আগমন টের পেয়ে সালিম পেছনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করে। তখন আমি উপলব্ধি করি বিগত দশ বছর আমি তার প্রতি অনেক অবিচার করেছি। পিতা হিসেবে তার ন্যূনতম দায়িত্ব আমার মাঝে ছিল না। কখনো কোনো দিন তার মাথায় হাত রেখে আদর করিনি। আজ আমি তার কাছে যেতে চাইলেও সে দূরে চলে যাচ্ছে।
সালিম পুনরায় কাঁদতে থাকে। আমি দাঁড়িয়ে থাকি। কিছুক্ষণ পর জানতে পারি সে কেন কাঁদছে। আজ শুক্রবার। পবিত্র জুমার দিন। অন্যদিনের তুলনায় নামাজিরা আগে আগে মসজিদে চলে আসে। সালিম নিয়মিত শুক্রবারে মসজিদে যায়, এবং প্রথম কাতারে নামাজ পড়ে। কিন্তু আজ কেউ তাকে মসজিদে নিয়ে যাচ্ছে না। তার ছোটো ভাই উমর ও খালিদ বাড়ি নেই। এদিকে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। মসজিদের প্রথম কাতারে জায়গা পাবে না। তাই এ ভেবে সে একাকী কান্না করছে।
বিষয়টি আমাকে প্রবলভাবে নাড়া দিলো। আমার সমগ্র সত্তাজুড়ে যেন এক বিশাল কাঁপুনি সৃষ্টি হলো। সালিম আমার অন্ধ সন্তান, যাকে আমি এড়িয়ে চলছি আজ দশটি বছর। যার কোনো পিতৃদায়িত্ব আমি পালন করিনি। কারণ সে অন্ধ। বাকি দুই পুত্র উমর ও খালিদের প্রতি আমার ঠিকই পিতৃসুলভ আদর-স্নেহ রয়েছে। নেই কেবল সালিমের প্রতি। সেদিন এক অদৃশ্য শক্তি আমাকে জাগিয়ে দিয়ে গেল। আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম, আজ কত বছর আমি মসজিদে যাই না? কত বছর সেজদা দিই না আল্লাহকে? আমার অন্ধ পুত্র যাকে বঞ্চিত করে রেখেছি সকল ন্যায্য আদর-ভালোবাসা থেকে-সে মসজিদের প্রথম কাতারে জায়গা পাবে না ভেবে ক্রন্দন করছে। আর আমি মসজিদে যাই না আজ কত বছর! আমি আল্লাহকে ভুলে আছি। মসজিদ ভুলে আছি। আর আমার অন্ধ সন্তান সে মসজিদে যাওয়ার জন্য ক্রন্দন করছে।
আমি তখন দৃঢ় ইচ্ছা করি যে, আজ আমিই সালিমকে মসজিদে নিয়ে যাব এবং নিজেও তার সঙ্গে প্রথম সারিতে জুমার নামাজ আদায় করব। আমি যখন তাকে এ কথা বললাম সে কিছুতেই বিশ্বাস করছে না। ভেবেছে আমি তার সঙ্গে উপহাস করছি। আজীবন তো মানুষের সাথে এমন উপহাস করেই গেলাম। কিন্তু না, আজ সত্যি সত্যিই আমি আমার প্রতিবন্ধী সন্তানকে মসজিদে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প করি। যখন সে দেখল সত্যিই আমি তাকে মসজিদে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছি তখন তার চেহারায় এক পবিত্র আভা ভেসে উঠল। এক নুরানি দ্যুতি যেন তার চোখ-মুখ থেকে ঠিকরে বের হচ্ছে।
সালিম যেহেতু অন্ধ, পথ চলতে তার কষ্ট হবে তাই প্রথমে আমি তাকে গাড়িতে করে মসজিদে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে করি। কিন্তু সালিম আমাকে অবাক করে বলল, সে পায়ে হেঁটে মসজিদে যাবে। কারণ, পায়ে হেঁটে মসজিদে গেলে প্রতি কদমে একটি নেকি লেখা হবে এবং একটি গোনাহ মোচন করা হবে। আমি তখন নিজেকে নিয়ে আরও দ্বিগুণ লজ্জিত হতে থাকি। সালিমের কথানুযায়ী পায়ে হেঁটেই আমি তাকে মসজিদে নিয়ে যাই।
মসজিদ ততক্ষণে ভরে গেছে। চারপাশ উপচে পড়া মানুষ। নামাজের আর বেশি সময় বাকি নেই। কিন্তু মসজিদের মুসল্লিগণ সালিমকে প্রথম কাতারে বসার জায়গা করে দিলেন। আমিও সালিমের সঙ্গে প্রথম কাতারে বসি।
নামাজ শেষ করে সালিম জায়নামাজে আপন মনে বসে রইল। তাসবিহ, তাহলিল শেষ করে সালিম আমাকে অনুরোধ করল তাকে একটি কুরআন শরিফ দিতে। আমি আশ্চর্য হলাম। কারণ সে তো অন্ধ! কুরআন পড়বে কীভাবে? তবুও তার কথানুযায়ী একটি কুরআন এনে তার হাতে দিলাম। আমাকে দ্বিগুণ আশ্চর্য করে সালিম সুরা কাহাফ মুখস্থ পড়তে শুরু করল। এরই মাঝে সে সুরা কাহাফ পরিপূর্ণ মুখস্থ করে ফেলেছে। কিন্তু এসবের কিছুই আমি জানতাম না। সালিমকে আমি যতই দেখতে থাকি আমার বিস্ময়ের ঘোর ততই বাড়তে থাকে। সেইসঙ্গে লজ্জা ও অনুশোচনা ক্রমাগত দংশন করতে থাকে বিষাক্ত সাপের ন্যায়।
সুরা কাহাফ তিলাওয়াত শেষে সালিম আল্লাহর দরবারে দু-হাত তুলল। তার সঙ্গে আমিও দু-হাত তুলে ধরি আল্লাহর নিকট। তখনই আমি আমার অন্তরে এক আশ্চর্য পরিবর্তন লক্ষ করি। আমি আমার অতীত জীবনের জঘন্য কৃতকর্মে প্রবল অনুশোচনা ও লজ্জিত হয়ে মসজিদে কাঁদতে থাকি। আমার চোখ ফেটে অবিরাম অশ্রু ঝরতে থাকে। অনুশোচনার অশ্রুতে ভেসে যায় আমার বুক। আমি আরও প্রবল করে কাঁদতে থাকি। সে কান্না ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। পাশে বসে সালিম আমার অবিরাম কান্নার আওয়াজ শুনছিল। কিন্তু সমস্ত লজ্জা ও জড়তা ভেঙে আমি ক্ষমা চাইতে থাকি। মাফ চাইতে থাকি যাপিত জীবনের সকল ভুলের।
তারপর সালিমকে নিয়ে আমি বাড়ি ফিরি। সেদিনের পর আজ পর্যন্ত এক ওয়াক্ত নামাজ আমি ছাড়িনি। প্রতি ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে জামাতের সাথে আদায় করেছি। অসৎ বন্ধুদের সঙ্গ ত্যাগ করেছি। গোনাহের সমস্ত উপকরণ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। একমাত্র আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি মনোনিবেশ করি। সকল নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। কুরআন পড়া শিখেছি। প্রতি মাসে কয়েক বার কুরআন খতম করি। বন্ধুদের সাথে আড্ডার পরিবর্তে আল্লাহর জিকির করি। আলহামদুলিল্লাহ, এখন আমি ঈমানের পূর্ণ স্বাদ আস্বাদন করছি। পরিবারের সকলে আমাকে ভালোবাসে। ইতঃপূর্বে তারা আমাকে সব সময় এড়িয়ে চলত। সকলের নিকট আমি ছিলাম অপাঙ্ক্তেয়। তাদের আদর-স্নেহে আমার হৃদয় এখন ভরপুর।
সালিম—যাকে আমি এতকাল অবহেলা ও দূর দূর করে রেখেছি—এখন সে আমার নিকট সর্বাধিক ভালোবাসার পাত্র। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পূর্বে এবং বাড়িতে প্রবেশ করার পর সর্বপ্রথম আমি সালিমের খোঁজ নেই। তার সকল প্রয়োজন যথাসাধ্য পূরণ করি। জীবনের সকল আনন্দ এখন আমার হাতের মুঠোয়। কারণ এখন আমি ফিরে এসেছি শাশ্বত শান্তির পথে— আল্লাহর নির্দেশিত জীবন আমাকে দিয়েছে জীবনের প্রকৃত সুখ।
একদিন আমি ও আমার বন্ধুরা সিদ্ধান্ত নিই একটি দাওয়াতি কাফেলার সাথে তিন মাসের জন্য সফরে যাব। এ ব্যাপারে আমি আমার পরিবারের নিকট অনুমতি চাইলে তারা আমাকে সাদর অনুমতি দেয়। সবচেয়ে বেশি খুশি হয় সালিম। সে তার ছোট্ট দু-হাত দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে। তাদের আনন্দ দেখে আমার দু-চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে।
কাফেলার সাথে বেরিয়ে পড়ি আল্লাহর রাস্তায়। বাড়ি থেকে বহু দূরবর্তী এক অঞ্চলে তিন মাস ছিলাম। দীর্ঘ এ সময়ে পরিবার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে তাদের প্রতি অন্তরে বিশেষ ভালোবাসা তৈরি হয়। বারবার স্মরণ হতে থাকে প্রিয়তমা স্ত্রী ও সন্তানদের কথা। চোখে ভাসতে থাকে প্রিয় পুত্র সালিমের মুখখানা। অন্যদের চেয়ে সালিমকে বেশি মনে পড়ত আমার। সস্মৃতিতে বাজতে থাকত তার কণ্ঠ। তার সঙ্গে সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা তীব্র হতে থাকে।
সফর শেষ হওয়া মাত্রই আমি বাড়ি ফিরে আসি। মুহূর্ত আর দেরি করিনি। সাক্ষাতের প্রবল তৃষ্ণা বুকে আমি দরজায় করাঘাত করি। আমার ভেতরে আকাঙ্ক্ষা ছিল হয়তো সালিম এসে দরজা খুলবে। কিন্তু না, চার বছর বয়সি কনিষ্ঠ পুত্র খালিদ দরজা খুলে। আনন্দের আতিশয্যে খালিদকে আমি কোলে তুলে নিই। খালিদ আমাকে দেখে কাঁদতে থাকে। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে কান্নার আওয়াজ। আমি তখন কিছুই বুঝতে পারিনি খালিদ ঠিক কী কারণে কাঁদছে। ঘরে প্রবেশ করার পর সকলের মাঝে একধরনের পরিবর্তন লক্ষ করি। তাদের চোখে মুখে কেমন বিষাদের ছায়া। আমি সালিমকে ডাকতে থাকি। একবার দুই বার করে কয়েক বার। কিন্তু কোনো সাড়া মিলছে না সালিমের। আমি আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করি, সালিম কোথায়? প্রশ্ন শুনে স্ত্রী তার মাথা নুয়ে ফেলে। কোনো উত্তর দেয় না। বার কয়েক জিজ্ঞেস করার পর সে তার আঁচলে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে থাকে। আমার ভেতরটা কেমন নড়ে ওঠে। তখন খালিদ কাঁপা কাঁপা এবড়ো-থেবড়ো কণ্ঠে যা বলে তা শোনার জন্য আমি কিছুতেই প্রস্তুত ছিলাম না। খালিদ বলে, ভাইয়াকে আল্লাহ নিয়ে গেছে। ভাইয়া এখন বেহেশতে।
সত্যিই এমন একটি শোকাবহ সংবাদ শোনার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। প্রচণ্ড আওয়াজে আমি কাঁদতে থাকি। কাঁদতে কাঁদতে একপর্যায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি।
কিছুদিন আগে সালিমের জ্বর হয়েছিল। দিনদিন তার অবস্থার অবনতি হতে থাকে। আমার স্ত্রী তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। দুইদিন হাসপাতালে থাকার পর তৃতীয় দিন সালিম মারা যায়। আমি বুঝতে পারি—আল্লাহ তায়ালা এর মাধ্যমে আমার পরীক্ষা নিচ্ছেন। আমি পুত্রশোকের নিদারুণ যন্ত্রণা বুকে পাথরচাপা দিয়ে ধৈর্যধারণ করি।
একদা আমি অন্ধ ও খোঁড়া সালিমকে নিয়ে কত চিন্তিত ছিলাম। কত অবিচার করেছি আমি তার প্রতি। সালিম নয়, প্রকৃতার্থে অন্ধ তো ছিলাম আমি। যে তাকে সকল আদর-স্নেহ থেকে বঞ্চিত করেছি। আমি সালিমের চেয়ে বড়ো অন্ধ। কারণ আমি তাকে চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও দেখিনি। তার কাছে যাইনি। তাকে কোলে নিইনি। দীর্ঘ দশটি বছর আমি তাকে নিদারুণ অবহেলা আর অহেতুক বঞ্চনার মাঝে ফেলে রেখেছি। সেই তো প্রকৃত অন্ধ। যে আল্লাহর পরিচয় জানে না। যার অন্তরে আল্লাহর মারেফত নেই। যে ঈমান ও ইয়াকিন থেকে যোজন যোজন দূরে সরে আছে সেই প্রকৃত অন্ধ। সালিমই প্রকৃত দৃষ্টিসম্পন্ন। তার অন্তরে ঈমানের আলো আছে। ইয়াকিনের দৃঢ়তা আছে। আল্লাহর আনুগত্য ছিল তার নিকট সর্বাধিক প্রিয়। সালিম-যার চক্ষু নেই, চক্ষু আছে আমার। অথচ তার হাত ধরে আমি পেয়েছি সঠিক পথের দিশা। অন্ধকার থেকে এসেছি আলোর পথে। আল্লাহর কসম! সালিম নয়, প্রকৃত অন্ধ আমরা; যারা ঈমান ও আমলের রাস্তা থেকে দূরে পড়ে আছি।'
হে আল্লাহ! সালিমকে আপনি কবুল করে নিন। আপনার রহমতের চাদরে তাকে ঢেকে রাখুন। হে আল্লাহ! মৃত্যু পর্যন্ত আপনি আমাদেরকে আপনার সরল-সঠিক পথে অবিচল রাখুন।