📄 তুমিই শত্রু তোমার
হে প্রিয় ভাই ও বোন আমার! আমরা যখন আল্লাহর আনুগত্যকে অবাধ্যতার চাদর দিয়ে ঢেকে ফেলি, তখন আল্লাহ তায়ালা আমাদের সুসময়কে দুঃসময়ে পরিণত করে দেন। আমাদের নেয়ামত ও বরকতের আলোকোজ্জ্বল আকাশে দুর্ভাগ্যের কালো মেঘ ভেসে বেড়ানোর জন্য মূলত আমরাই দায়ী। ইরশাদ হয়েছে,
ذَلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ لَمْ يَكُ مُغَيْرًا نِعْمَةً أَنْعَمَهَا عَلَى قَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ وَأَنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ كَدَأْبِ آلِ لا ج فِرْعَوْنَ وَالَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ كَذَّبُوا بِآيَاتِ رَبِّهِمْ فَأَهْلَكْنَاهُم بِذُنُوبِهِمْ وَأَغْرَقْنَا آلَ فِرْعَوْنَ وَكُلُّ كَانُوا ظَالِمِينَ
'আর তা এজন্য যে, যদি কোনো সম্প্রদায় নিজের অবস্থার পরিবর্তন না করে তবে আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তাদেরকে যে সম্পদ দান করেছেন, তা পরিবর্তন করবেন; এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। ফিরাউনের স্বজন ও তাদের পূর্ববর্তীদের অভ্যাসের ন্যায় তারা তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনকে অস্বীকার করে। তাদের পাপের জন্য আমি তাদেরকে ধ্বংস করেছি এবং ফিরাউনের স্বজনকে নিমজ্জিত করেছি এবং তারা সকলেই ছিল জালিম।'⁴⁵
আল্লামা ইবনে কাসির রহ. বলেন, এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তার সুবিচার, ন্যায়পরায়ণতা এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ ফয়সালার ঘোষণা দিয়েছেন। অবাধ্যতায় লিপ্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা কারও প্রাচুর্যময় জীবনের ইতি ঘটান না।' যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
لَهُ مُعَقِّبَاتٌ مِّن بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ يَحْفَظُونَهُ مِنْ أَمْرٍ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِقَوْمٍ سُوءًا فَلَا مَرَدَّ لَهُ وَمَا لَهُم مِّن دُونِهِ مِن وَال
'মানুষের জন্য তার সম্মুখে ও পেছনে একের পর এক প্রহরী থাকে; তারা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজ অবস্থা নিজে পরিবর্তন করে। কোনো সম্প্রদায় সম্পর্কে যদি আল্লাহ অশুভ কিছুর ইচ্ছা করেন তবে তা রদ হবার নয় এবং তিনি ব্যতীত তাদের কোনো অভিভাবক নেই।'⁴⁶
আল্লাহর অবাধ্যতার ফলে সুসময় দুঃসময়ে পরিণত হয়। সফলতা পরিণত হয় ব্যর্থতায়। এর জ্বলন্ত উদাহরণ হলো ফিরাউন এবং অন্যান্য অবাধ্য সম্প্রদায়গুলো। তারা যখন আল্লাহর নিদর্শনাবলিকে মিথ্যারোপ করেছে তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের থেকে নেয়ামত কেড়ে নিয়ে তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। সুতরাং বোঝা গেল, আল্লাহ তায়ালা কারও ওপর জুলুম করেন না। ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নিজেদের প্রতি নিজেরাই জুলুম করে।
আপনি ও সকল ব্যক্তিদের মতো হবেন না, যারা শুধু মুখে ইস্তেগফারের কথা বলে, কিন্তু তাদের অন্তর ও কাজকর্ম গুনাহের কাজে অটল থাকে। নিশ্চয় এটা মিথ্যাবাদীদের তাওবা এবং নাউজুবিল্লাহ আল্লাহর সাথে তামাশার ন্যায়। প্রখ্যাত আবেদ ফুজাইল ইবনু আয়াজ রহ. বলেন, 'মুখে ইস্তেগফার জপে বাস্তবে গুনাহের কাজ পরিত্যাগ না করা মিথ্যাবাদী ব্যক্তিদের তাওবা।' অপর কেউ একজন আরও চমৎকারভাবে বলেছেন, 'গুনাহ পরিত্যাগ করার সংকল্প ব্যতীত আমরা যে ইস্তেগফার পাঠ করি, এই ইস্তেগফার পাঠ করাও আমাদের জন্য গুনাহের কারণ। এই গুনাহ থেকে পরিত্রাণের জন্য পুনরায় ইস্তেগফার পাঠ করা প্রয়োজন।'
এই কথার উদাহরণ ওই সকল ব্যক্তিদের জীবনে জাজ্বল্যমান রয়েছে, যারা মুখে ইস্তেগফার পাঠ করতে থাকে, অপরদিকে বিদআত, মদপান, সুদ, নির্লজ্জতা, ব্যভিচার, ব্যবসায় প্রতারণা, ধোঁকাবাজিসহ নানাবিধ গুনাহের কাজে লিপ্ত রয়েছে।
কিন্তু প্রকৃত তাওবা হলো, কথা ও কাজকর্মসহ জীবনের সব ক্ষেত্র থেকে গুনাহের মূল উপড়ে ফেলে নেক কাজের মাধ্যমে জান্নাতের পথে অগ্রসর হওয়া। পাশাপাশি বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করা। বস্তুত এই দুনিয়া তো পরীক্ষারই স্থান।
ইস্তেগফারের পূর্বে নিয়ত পরিশুদ্ধ করে নেওয়া জরুরি। ইস্তেগফার আদায়কারীর নিয়ত, অন্তরের সার্বিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে আল্লাহ তায়ালা তার ফলাফল দান করেন। জেনে বুঝে এবং অর্থ অনুধাবন করে যখন কোনো ব্যক্তি ইস্তেগফার পাঠ করে তখন এর কার্যকারিতা জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। চিন্তাশীল এক ব্যক্তি বলেন, 'আল্লাহকে সব সময় স্মরণ করো। তিনি তোমাকে রক্ষণাবেক্ষণ করবেন।'
আল্লাহ তায়ালা কখনো অঙ্গীকারের ব্যত্যয় ঘটান না। তার কথা সামান্যতম হেরফের হয় না কখনো। আল্লাহর কিছু ফয়সালা আমাদের বাহ্যিক দৃষ্টিতে বিপরীত মনে হয়, কিন্তু এতে গূঢ় রহস্য নিহিত রয়েছে। আমাদের দুর্বল অন্তঃকরণে তা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। ইস্তেগফার দোয়ার মতো একটি আমল। এই আমলের দ্বারা কখনো কাঙ্ক্ষিত বস্তু অর্জিত হয়। কখনো কোনো ইচ্ছা ছাড়াই নেমে আসে জীবনের সাধ। আবার কখনো ইস্তেগফারের বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা কঠিন বিপদ থেকে রক্ষা করেন। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেকের আমলনামায় রক্ষিত ইস্তেগফারের প্রতিদান দান করবেন।
এখানে একটি কথা বলে রাখা জরুরি, দুনিয়ার সকল কাজকর্ম ছেড়ে শুধু তাওবা-ইস্তেগফারের ওপর ভরসা করে বসে থাকবে না। বরং আমলের সাথে সাথে রিজিকের জন্য প্রচেষ্টা চালু রাখতে হবে। বিষয়টি জাগ্রত অবস্থায় স্বপ্ন দেখার মতো। আকাশ থেকে যেমন স্বর্ণ-রুপার বৃষ্টি বর্ষণ হয় না, তেমনই প্রচেষ্টা ব্যতীত রিজিক আপনার দুয়ারে আসবে না। অনেকেই বিষয়টি না বুঝে রিজিকের জন্য ফিকির না করে তাওবা-ইস্তেগফারের ওপর নির্ভর করে থাকে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ ذَلُولًا فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِن رِزْقِهِ وَإِلَيْهِ النُّشُورُ
'তিনি তো তোমাদের জন্য ভূমিকে সুগম করে দিয়েছেন; অতএব তোমরা এর দিগ-দিগন্তে বিচরণ করো এবং আল্লাহপ্রদত্ত জীবনোপকরণ হতে আহার্য গ্রহণ করো, পুনরুত্থান তো তাঁরই নিকট।'৪৭
আল্লাহ তায়ালা উক্ত আয়াতে স্পষ্টতই বলে দিয়েছেন, হালাল রিজিক অন্বেষণে তোমরা পৃথিবীর পথে-ঘাটে ছড়িয়ে পড়ো। রিজিক অন্বেষণের ব্যস্ততায় তোমরা তাওবা-ইস্তেগফারকে ভুলে যেয়ো না। অন্বেষণ এবং ইস্তেগফারের সমন্বয় ঘটলে জীবনে বরকতের হিল্লোল প্রবাহিত হবে। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রিজিক অন্বেষণে অধিকতর উৎসাহ প্রদান করেছেন। নিষেধ করেছেন মানুষের প্রতি হাত প্রসারিত করতে। হযরত যুবাইর ইবনুল আওয়াম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
لأَنْ يَأْخُذَ أَحَدُكُمْ حَبْلَهُ فَيَأْتِيَ بِحُزْمَةِ الْخَطَبِ عَلَى ظَهْرِهِ فَيَبِيعَهَا فَيَكُفَّ اللَّهُ بِهَا وَجْهَهُ، خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَسْأَلَ النَّاسَ أَعْطَوْهُ أَوْ مَنَعُوهُ
'তোমাদের মধ্যে কেউ রশি নিয়ে তার পিঠে কাঠের বোঝা বহন ও তা বিক্রি করা উত্তম। আল্লাহ তার চেহারাকে ভিক্ষা করার লাঞ্ছনা থেকে রক্ষা করেন। তা মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে অধিকতর উত্তম; চাই লোকেরা দিক বা না দিক।'⁴⁸
রিজিক অন্বেষণের সময় যখন অন্তরে ইস্তেগফার থাকবে, তখন সহজ ও সাবলীলভাবে আল্লাহ তায়ালা জীবন ধারণের ব্যবস্থা করবেন। কারণ, তখন দুনিয়াবি চেষ্টার সাথে আল্লাহর সাহায্যের সংমিশ্রণ ঘটে। আর তিনি তো সবকিছুর একচ্ছত্র মালিক। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল সম্বন্ধে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
لَوْ أَنَّكُمْ كُنتُمْ تَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ لَرُزِقْتُمْ كَمَا تُرْزَقُ الطَّيْرُ تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا
'তোমরা যদি প্রকৃতভাবেই আল্লাহ তায়ালার ওপর নির্ভরশীল হতে তাহলে পাখিদের যেভাবে রিজিক দেওয়া হয় সেভাবে তোমাদেরকেও রিজিক দেওয়া হতো। এরা সকালবেলা খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যাবেলায় ভরা পেটে ফিরে আসে।' ⁴⁹
যদি আমরা পাখিদের মতো আল্লাহর ওপর ভরসা এবং চেষ্টা করি, পাখিগুলো যেভাবে প্রত্যুষে উঠে রিজিকের তালাশে মাইলের পর মাইল অতিক্রম করে, ডালে ডালে খুঁজে ফিরে কাঙ্ক্ষিত খাদ্যকনা। আমাদের এরকম প্রচেষ্টা থাকলে আল্লাহ তায়ালা আমাদের রিজিক সহজ করে প্রভূত কল্যাণ দান করবেন।
টিকাঃ
৪৫ সুরা আনফাল: ৫৩,৫৪
৪৬ সুরা রাদ: ১১
৪৭ সুরা মুলক: ১৫
৪৮ বুখারি শরিফ: ১৪৭১
৪৯ সুনানে তিরমিজি: ২৩৪৪
📄 ফিতনা ও প্রলুব্ধি : মুক্তির উপায়
মুসলমান নর-নারী পার্থিব জীবনের ফিতনা ও প্রলুব্ধির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। গুনাহের পথ ছেড়ে সত্যের পথে ফিরে না আসলে অচিরেই মহাবিপদের সম্মুখীন হবে। যেমন, ইন্টারনেট আধুনিক একটি আবিষ্কার। কতক মানুষ ইন্টারনেটকে ব্যবহার করে কল্যাণকর কাজে। এর দ্বারা উপকারী জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং পার্থিব উৎকর্ষতার শীর্ষে আরোহণ করে। অপরদিকে কতক মানুষ এমন রয়েছে যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে জীবন বিধ্বংসী কাজে লিপ্ত রয়েছে। তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে চোখের গুনাহ, সময়ের অপচয়, ইবাদতে অবহেলা করে পৌঁছে গেছে খাদের কিনারে। সুতরাং নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া বা নিরাপদে রাখা আপনার কাছে উভয়টির সুযোগ রয়েছে। চিরস্থায়ী শান্তির জন্য সঠিক পথ বেছে নিন।
মানবজীবনে দুনিয়ার ক্ষেত্রে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ভয়ানক ব্যাধি। এর ফলে সঠিক পথ পাবার পরও কত যুবক ধ্বংসের পথ বেছে নেয়! কত লোককে বিচ্ছিন্ন করে পরিবারের চোখজুড়ানো মায়াবী বন্ধন থেকে! দুনিয়ার আকাঙ্ক্ষার ধোঁকার জালে আবদ্ধ হয়ে অসংখ্য মানুষ কামনা-বাসনার পানপাত্র থেকে ঢোক ঢোক করে পান করে বিপথগামিতার নীল জল। আল্লাহর কাছে এমন মুসিবত থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। হযরত জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
يُبْعَثُ كُلُّ عبدٍ على ما مات عليه
'প্রত্যেক মানুষকে কিয়ামতের দিন ঠিক ওই অবস্থায় উত্থিত করা হবে যে অবস্থায় সে মারা গেছে।'⁵⁰
মন্দ কাজে লিপ্ত ব্যক্তিরা অচিরেই তাদের পরিণাম দেখতে পাবে। কবর থেকে উঠতে উঠতে দুনিয়ার জীবনের গুনাহের দৃশ্যগুলো একে একে ভেসে উঠবে তাদের সামনে। মানুষের শেষ জীবনের দিনগুলো নিঃসীম অন্ধকারে পথ চলার মতো ঝুঁকিপূর্ণ। টলটলায়মান দুর্বল ঈমানের মানুষজন এই পরীক্ষায় দিশেহারা হয়ে পড়ে। শয়তানের ধোঁকায় পড়ে সকালের ঈমানদার ব্যক্তিটি বিকেলে ঈমানের দৌলত হারিয়ে কুফুরি গ্রহণ করে, কখনো সন্ধ্যায় ঈমানদার ব্যক্তিটি সকালে কুফুরি গ্রহণ করে। আফসোস, দুনিয়ার সামান্য লোভের পেছনে পড়ে মানুষ এভাবেই নিজের আখেরাত ধ্বংস করে।
প্রিয় ভাই ও বোন! ঈমান বিধ্বংসী এসব মহামারি থেকে বেঁচে থাকার উপায় হলো কুরআন এবং সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা এবং জীবনে বাস্তবায়ন করা। দ্বীনকে গভীরভাবে অনুধাবন করে দোয়া, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির এবং অন্যান্য ইবাদতের মাধ্যমে অন্তরকে কলুষমুক্ত রাখা। সর্বোপরি দ্বীনের ওপর দৃঢ়তার জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করা। মহান মালিক ইরশাদ করেন,
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ
'আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্বন্ধে আপনাকে প্রশ্ন করে, আমি তো নিকটেই। প্রার্থনাকারী যখন আমার নিকট প্রার্থনা করে আমি তার প্রার্থনায় সাড়া দিই। সুতরাং তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক। এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক, যাতে তারা সঠিক পথে চলতে পারে।' ৫১
হযরত উবাদা ইবনে সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
مَا عَلَى الْأَرْضِ مُسْلِمٌ يَدْعُو اللَّهَ بِدَعْوَةٍ إِلَّا آتَاهُ اللَّهُ إِيَّاهَا أَوْ صَرَفَ عَنْهُ مِنَ السُّوءِ مِثْلَهَا مَا لَمْ يَدْعُ بِمَأْثَمٍ أَوْ قَطِيعَةِ رَحِمٍ " . فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ إِذَا نُكْثِرَ . قَالَ " اللَّهُ أَكْثَرُ
'পৃথিবীতে এমন কোনো মুসলমান নেই যার দোয়া আল্লাহ তায়ালা কবুল করেন না অথবা তার থেকে এই পরিমাণ ক্ষতি সরিয়ে দেন, যতক্ষণ না সে গোনাহে জড়িত হওয়ার জন্য অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দোয়া করে। সমবেত ব্যক্তিদের একজন বলল, তাহলে আমরা বেশি বেশি দোয়া করব। তিনি বললেন, আল্লাহ তায়ালা এরও বেশি কবুলকারী।' ৫২
হকের ওপর অটল অবিচল থাকার জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো, সর্বদা আল্লাহর কাছে ঈমানের ওপর অবিচল থাকার দোয়া করা।
اللهم يا مقلب القلوب ثبت قلوبنا على دين؛ اللهم يا مصرف القلوب والابصار صرف قلوبنا الى طاعتك ومرضاتك
'হে অন্তর পরিবর্তনকারী আল্লাহ! আপনি আমাদের অন্তরকে দ্বীনের ওপর অবিচল রাখুন। হে অন্তর এবং অন্তর্দৃষ্টি পরিবর্তনকারী আল্লাহ! আপনি আমাদের অন্তরকে আপনার আনুগত্য এবং সন্তুষ্টির প্রতি ধাবিত করে দিন।'
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
'হে আমাদের প্রতিপালক! পথপ্রদর্শন করার পর আপনি আমাদের অন্তরকে বিপথগামী করবেন না। আপনার নিকট থেকে আমাদের করুনা প্রদান করুন। নিশ্চয় আপনি নিজেই পরম বদান্য।' ৫৩
শরিয়ত অসমর্থিত বিষয় ও পাপাচার পরিত্যাগ করার আরও একটা সহযোগী মাধ্যম হলো নামাযের প্রতি যত্নশীল হওয়া। তার সমস্ত অনুষঙ্গ তথা ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ইত্যাদি যথাযথভাবে আদায় করা। অন্তরকে অশ্লীলতা ও পাপাচার থেকে বিরত রাখতে এর কার্যকরী ভূমিকা রয়েছে।
প্রিয় ভাই ও বোন! নামাজের সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন? আপনি কি নামাজের প্রতি যত্নশীল? তা আদায়ের জন্য যথেষ্ট আগ্রহী? আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَأَقِمِ الصَّلَاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ 'এবং নামাজ কায়েম করো। নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।' ৫৪
যে ব্যক্তি নামাজ আদায় করে কিন্তু কৃত নামাজ তাকে গুনাহ থেকে বিরত রাখতে পারে না, তাহলে তার আত্মসমালোচনা করা উচিত। নিজের দিকে গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করতে হবে। অনেক সময় এমন হয় যে, নামাজের অন্তর্গত মোনাজাত ও দোয়াগুলো বিড়বিড় করে পড়ছে ঠিকই, কিন্তু তার মন পার্থিব বিভিন্ন চিন্তায় ঘুরপাক খায়। ব্যাবসা-বাণিজ্য খেলাধুলা কিংবা দুনিয়ার কোনো চাকচিক্যে ঘোরাফেরা করতে থাকে। আরও ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, অনেকে নামাজের মধ্যে অশ্লীলতা ও পাপাচারের গভীর কল্পনায় ডুবে যায়! প্রিয় ভাই ও বোন! এবার আপনিই বলুন, এই নামাজ কী করে আপনাকে গুনাহ থেকে বিরত রাখবে?
গুনাহ ও পাপাচার থেকে দূরে থাকার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো, কুরআন তিলাওয়াত করা। কিন্তু অত্যন্ত আফসোসের কথা হলো, অনেক মুসলিম নর-নারী আজ তা পরিত্যাগ করেছে। অনেকে বছরে মাত্র একবার কুরআন খতম করে! অনেকে আবার কুরআনকে গিলাফাচ্ছাদিত করে আলমারির ভেতর রেখে দেয়, তার দীর্ঘ অমনোযোগিতার ফলে তা ধূলোয় ধূসরিত হয়ে যায়। আল্লাহ সহায়!
কুরআন তিলাওয়াত অন্তরকে পবিত্র ও স্বচ্ছ করে। কুরআনের মাধ্যমে মুসলমান নর-নারীর ওপর আল্লাহ তায়ালা হিদায়াত এবং রহমতের বারি বর্ষণ করেন। কুরআনের সাথে পথচলা এমন লাভজনক ব্যবসা; যে ব্যবসায় ইহকাল-পরকাল কোথাও ক্ষতির কোনো আশঙ্কা নেই। দুনিয়ায় এর দ্বারা আত্মিক প্রশান্তি ও সমৃদ্ধি, ঈমান বৃদ্ধি ও বিপদমুক্তি অর্জন করা যায়। আর আখেরাতে অপেক্ষা করছে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি, তার অসীম অনুগ্রহ এবং চিরসুখের জান্নাত। আমরা আল্লাহর কাছে জান্নাত কামনা করি। যে সমস্ত আমল ও কথা দ্বারা তার নিকটবর্তী হওয়া যায়, তার সক্ষমতা প্রার্থনা করি। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَنفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً يَرْجُونَ تِجَارَةً لَّن تَبُورَ 'যারা আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি যা দিয়েছি তা থেকে প্রকাশ্যে ও গোপনে খরচ করে-তারা এমন ব্যবসা করছে, যা কখনো লোকসান হয় না।'৫৫
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَتْكُم مَّوْعِظَةٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَشِفَاءُ لمَا فِي الصُّدُورِ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ 'হে মানবজাতি! তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে মুসলমানদের জন্য হিতোপদেশ, অন্তরের নিরাময়, হিদায়াত এবং রহমত আগমন করেছে।'৫৬
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ وَلَا يَزِيدُ الظَّالِمِينَ إِلَّا خَسَارًا 'আমি কুরআন অবতীর্ণ করি, যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমতস্বরূপ; কিন্তু তা জালেমদের অধঃপতনই বৃদ্ধি করে।'৫৭
নবি সুন্নাহ আমাদের কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। জীবন্ত অন্তরগুলোকে তা শিক্ষা করা ও শিক্ষা দানে শ্রম ব্যয় করার নির্দেশ দিয়েছে। আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا لَا أَقُولُ {ألم} حَرْفٌ وَلَكِنْ أَلِفْ حَرْفٌ وَلَامٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ
'যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পড়বে, সে একটি নেকি পাবে। আর একটি নেকি দশগুণে বৃদ্ধি পাবে। আমি এটা বলছি না যে, “আলিফ, লাম, মিম” একটি হরফ। বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ, মিম একটি হরফ।' ৫৮ হযরত আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَا اجْتَمَعَ قَوْمُ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللَّهِ تَعَالَى يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَيَتَدَارَسُونَهُ بَيْنَهُمْ إِلَّا نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفَّتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ وَذَكَرَهُمُ اللَّهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ ".
যখন কোনো সম্প্রদায় আল্লাহর কোনো ঘরে সমবেত হয়ে কুরআন তিলাওয়াত করে এবং পরস্পরে তা নিয়ে আলোচনা করে, তখন তাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হয়, তাদেরকে রহমত ঢেকে নেয়, ফেরেশতাগণ তাদেরকে ঘিরে রাখে এবং আল্লাহ তাঁর নিকটবর্তী ফেরেশতাদের কাছে তাদের প্রশংসা করেন। ৫৯ হযরত আবু জর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
قُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ أَوْصِني قَالَ عَلَيْكَ بِتَقْوَى اللَّهِ فَإِنَّهُ رَأْسُ الْأَمْرِ كُلِّهِ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ زِدْنِي قَالَ عَلَيْكَ
بِتَلاَوَةِ الْقُرْآنِ فَإِنَّهُ نُوْرٌ لَكَ فِي الْأَرْضِ وَذُخْرٌ لَكَ فِي السَّمَاءِ
‘আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন, “আল্লাহর ভয় অন্তরে লালন করো। আর এটিই সকল বিষয়ের মূল চালিকাশক্তি।” আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল! আরও উপদেশ দিন।” তিনি বললেন, “কুরআন তিলাওয়াতকে আপন করে নাও; তা জমিনে তোমার জন্য হবে আলো স্বরূপ। আর আকাশে সঞ্চয় স্বরূপ।”
গুনাহ ও পাপাচার থেকে দূরে থাকতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে এমন আরও একটি আমল হলো, বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করা। জিকির আল্লাহ তায়ালার অন্যতম উত্তম একটি ইবাদত। মুসলিম নর-নারীর জন্য অত্যন্ত সহজ একটি ইবাদত। আর সর্বোত্তম জিকির হলো, অন্তরের উপস্থিতিসহ মুখে জিকির করা। যে সর্বাবস্থায় আল্লাহর জিকির করবে, শয়তান তার অন্তরে প্রবেশের কোনো গুপ্ত রাস্তা খুঁজে পাবে না।
যে নিরবচ্ছিন্ন জিকির করবে, সে আল্লাহ তায়ালার বড়োত্ব অনুভব করতে পারবে। সব সময় সব স্থানে আল্লাহ তায়ালা তার সঙ্গে আছেন—এই উপলব্ধি অর্জন করতে পারবে। ফলে গুনাহ ও পাপাচাররের গহ্বরে পতিত হওয়া থেকে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। যখনই কোনো ব্যক্তি গুনাহে মনস্থির করবে বা নফস তাকে গুনাহের প্রতি প্রলুব্ধ করবে কিংবা শয়তান গুনাহকে তার সামনে সুসজ্জিত করে পেশ করবে, তখনই আল্লাহর স্মরণ তাকে ঘিরে ফেলবে এবং প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে তার মাঝে এবং গুনাহের কাজটি বাস্তবায়ন করার মাঝে।
মহান আল্লাহ বলেন,
وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرًا عَظِيمًا
'আল্লাহর অধিক জিকিরকারী পুরুষ ও নারী—তাদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপুরস্কার। ৬১
অন্য আয়াতে বলেন,
فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ
'তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদের স্মরণ করব। তোমরা আমার কৃতজ্ঞ হও, অকৃতজ্ঞ হয়ো না।'৬২
আল্লাহ আরও বলেন,
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِيرًا
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো।'৬৩
আবু দারদা রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
ألا أنبئكم بخير أعمالكم وأزكاها عند مليككم وأرفعها في درجاتكم وخير لكم من إنفاق الذهب والورق وخير لكم من أن تلقوا عدوكم فتضربوا أعناقهم ويضربوا أعناقكم قالوا بلى قال ذكر الله فقال مُعَاذُ بْنُ جَبَلٍ مَا شَيْءٌ أَنْجى من عذابِ اللَّهِ من ذِكرِ اللَّهِ
'আমি কি তোমাদেরকে এমন আমলের কথা বলব না, যা তোমাদের জন্য সর্বোত্তম, তোমাদের মালিকের কাছে পবিত্র, তোমাদের স্তর বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে সুউচ্চ, সোনা-রুপা ব্যয় করার চেয়েও যা উত্তম, শত্রুদের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হওয়া এবং পরস্পরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ করার চেয়েও যা মহিমান্বিত? তারা বলল, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল। তিনি বললেন, তা হলো, আল্লাহ তায়ালার জিকির।'
হযরত মুয়াজ বিন জাবাল রাদি. বলেন, 'আল্লাহর আজাব থেকে নিষ্কৃতি দানকারী জিকিরের চেয়ে উত্তম কোনো আমল নেই।' ৬৪
আল্লাহর জিকির যেমন গুনাহ ও পাপাচার থেকে রক্ষা করে, তেমনই অধিক ইবাদতের পথ সুগম করে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ عَجَزَ مِنْكُمْ عَنِ اللَّيْلِ أَنْ يُكَابِدَهُ وبَخِلَ بالمال أن يُنْفِقَهُ وجبن عن العدو أن يجاهدهُ فليُكْثِر من ذِكْرِ اللَّهِ.
'যে ব্যক্তি রাতের বেলা ইবাদত করতে সক্ষম নয়, ধন-সম্পদ ব্যয় করতে কুণ্ঠাবোধ করে এবং শত্রুর মোকাবেলায় ভীতু, সে যেন বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করে।'৬৫
তাই বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করুন। জিকির পরিশ্রমসাধ্য কোনো কাজ নয়। একটা চিত্র কল্পনা করে দেখুন, আপনি গাড়িতে আছেন এবং প্রচণ্ড জ্যামে আটকে আছেন। এখান থেকে মুক্ত হতে ঘণ্টাখানেক লেগে যেতে পারে। যদি সেই সময়টুকু অবহেলায় না কাটিয়ে জিকিরের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন, তাহলে ভেবে দেখুন তো, আপনার সওয়াবের হিসাব কত প্রলম্বিত হবে! এমন সুযোগগুলোর সদ্ব্যবহার করে জীবনকে অর্থবহ করে তোলার চেষ্টা করুন। অবহেলায় নষ্ট করে দেবেন না।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের জানা উচিত, আমরা অন্তরকে যদি ভালো কোনো কাজে লিপ্ত না রাখি, তাহলে অন্তর খারাপ বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যাবে। যে অবসর সময় কাটায় এবং ইবাদতেও তার গতি শ্লথ, তার অন্তর কখনো তাকে ভালো পথের দিশা দেবে না; বরং আল্লাহর রাস্তা থেকে সরিয়ে ধূমপান, মদ্যপান, জিনা-ব্যভিচার, চুরি-ডাকাতি ইত্যাদি বিভিন্ন হারাম ও অশ্লীল কাজে জড়িয়ে দিতে উৎসাহিত করবে।
অতএব, যে সমস্ত কাজ করলে আপনার উপকার হবে সেগুলোর সাথে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। ধ্বংস ও বিনাশের সমস্ত পথ থেকে পরিপূর্ণ সতর্ক থেকে নিজেকে হেফাজত করুন।
টিকাঃ
৫০ মুসলিম শরিফ। সহিহ ইবনে হিব্বান : ৭৩১৩
৫১ সুরা বাকারা: ১৮৬
৫২ সুনানে তিরমিজি: ৩৫৭৩
৫৩ সুরা আলে-ইমরান: ৮
৫৪ সুরা আনকাবুত : ৪৫
৫৫ ফাতির : ২৯
৫৬ ইউনুস: ৫৭
৫৭ ইসরা: ৮২
৫৮ সুনানে তিরমিজি: ২৯১০
৫৯ মুসলিম: ৬৭৪৬, আবু দাউদ: ১৪৫৫
৬০ ইবনে হিব্বান। আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব: ২/২৯৮।
৬১ সুরা আহযাব: ৩৫
৬২ সুরা বাকারা: ১৫২
৬৩ সুরা আহযাব: ৪১
৬৪ সহিহ মুসলিম: ১২২১
৬৫ তাবারানি: ১১১২১। মুসনাদে বাযযার: ৪৯০৪।
📄 তাওবা-ইস্তেগফারের সুমিষ্ট ফল
এই ছোটো পুস্তিকাটির পরিসমাপ্তি টানতে চাই, তাওবা-ইস্তেগফারের ফলাফল- সংক্রান্ত কিছু ঘটনার বিবরণ দিয়ে। তাদের ঘটনা, যারা তাওবা-ইস্তেগফারকে আঁকড়ে ধরেছে এবং তার চাক্ষুষ ফলাফল লাভ করেছে। কীভাবে এর দ্বারা তাদের সামনে বদ্ধ দরজাগুলো উন্মুক্ত হয়েছে, কল্যাণ ও সমৃদ্ধি এসেছে, অন্ধকার জীবনে লেগেছে আলোর ছোঁয়া! এই ফলাফলগুলো তাওবা ও ইস্তেগফারের মহিমা ঘোষণা করে। ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। তাই আমাদের কর্তব্য হলো, নিজেদের জবানকে আল্লাহর জিকিরের প্রতি অভ্যস্ত করে তোলা। দিবারাত্রি অধিকহারে ইস্তেগফার করা।
ইমাম আবু হানিফা রহ. তাঁর মুসনাদে হযরত জাবির রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন,
جاء رجل من الأنصار إلى النبي ﷺ فقال له ما رزقت ولدا قط ولا ولد لى ولد قال فأين أنت عن الاستغفار وكثرة الصدقة يرزق الله بهما الولد فكان الرجل يكثر الصدقة ويكثر الاستغفار قال جابر فولد له سبعة من الذكور
'একবার জনৈক ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমার কোনো সন্তান নেই। সন্তান হয় না। রাসুল বললেন, তাহলে তুমি বেশি বেশি ইস্তেগফার ও দান-সদকা করছ না কেন? এই দুটি জিনিস দ্বারা আল্লাহ তায়ালা সন্তান দান করেন। পরবর্তীতে সে ব্যক্তি বেশি বেশি ইস্তেগফার ও দান-সদকা করতে লাগল। জাবির রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, এরপর ওই ব্যক্তির নয়টি পুত্রসন্তান জন্ম নিয়েছিল। ৬৬
এক ব্যক্তি কিছু পণ্য বিক্রি করতে বাজারে গেল। বাজার ক্রেতা-বিক্রেতায় পরিপূর্ণ ছিল। পা ফেলারও জায়গা ছিল না। সে অনেক কষ্ট করে বিক্রির জন্য নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে সেখানে পণ্য ছড়িয়ে দিয়ে তার পাশে বসে থাকল। সময় বয়ে যায়, কিন্তু মানুষ তার পণ্যের দিকে ফিরেও তাকায় না। কদাচিৎ কেউ এসে দেখে-শুনে চলে যায়। অন্যদিকে এই লোকের টাকার প্রয়োজন ছিল অত্যধিক। আর সে এজন্যই মূলত পণ্য বিক্রি করতে বাজারে আসা। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পরও কেউ যেহেতু তার পণ্য কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না, তখন তার অন্তর বিষাদে ছেঁয়ে গেল। আর ভাবতে লাগল, কী করা যায়! অকস্মাৎ তার স্মৃতিপটে মসজিদের ইমাম সাহেবের মুখে শ্রুত একটি হাদিস জ্বলজ্বল করে উঠল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ أَكْثَرَ مِنَ الاسْتِغْفَارِ، جَعَلَ اللهُ لَهُ مِنْ كُلِّ هَمٌّ فَرَجًا، وَمِنْ كُلِّ ضِيْقٍ مَخْرَجًا، وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لا يَحْتَسِبُ 'যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইস্তেগফার পাঠ করবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে উত্তরণের উপায় বের করে দেবেন, তার সমস্ত দুশ্চিন্তা নিরসন সহজ করে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তাকে রিজিক দান করবেন। '৬৭
সে তাৎক্ষণিক তার জবান ও কলবকে ইস্তেগফারে নিমগ্ন করে দিলো। সে বলে, আমি ইস্তেগফার পড়া শুরু করার অব্যবহিত পরেই মানুষ আমার পণ্যের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। কেউ এটা নিচ্ছে, কেউ ওটা নিচ্ছে। অনেকে আবার এক পণ্যের ওপর নিলাম পর্যন্ত শুরু করে দিয়েছে। আমি আমার পণ্য সব বিক্রি করে ফেললাম, আমার অন্তর প্রসন্ন হলো। আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে এই মূল্যবান ভান্ডারের প্রতি আমার অবহেলার কথা স্মরণ করতে করতে চোখ বেয়ে অশ্রু ধারা নেমে এল। আলহামদুলিল্লাহ।
হযরত হাসান বসরি রহ.-এর কাছে এসে এক লোক অনাবৃষ্টির অভিযোগ করল। আরেকজন এসে দরিদ্রতার অভিযোগ করল। তিনি তাদেরকে বললেন, 'ইস্তেগফার পড়ো।'
কিছুক্ষণ পর আরেকজন এসে বলল, 'আপনি আমার জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করুন তিনি যেন আমাকে সন্তান দান করেন।' হযরত হাসান বসরি রহ. তাকে বললেন, 'ইস্তেগফার করো।'
অতঃপর আরেকজন এসে অভিযোগ করল, তার বাগানে ফল হয় না। হযরত হাসান বসরি তাকেও বললেন, 'ইস্তেগফার পড়ো।'
লোকেরা তাকে বারবার অনুরূপ উত্তর প্রদানের কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, 'আমি নিজ থেকে বানিয়ে কিছু বলিনি। আল্লাহ তায়ালা সুরা নুহে বলেছেন,
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا وَيُمْدِدْكُم بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَارًا
'তোমরা তোমাদের রবের কাছে ইস্তেগফার করো, তিনি পরম ক্ষমাশীল। তোমাদেরকে মুষলধারে বৃষ্টি দান করবেন। তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দেবেন, তোমাদের জন্যে উদ্যান স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্যে নদীনালা প্রবাহিত করবেন।'৬৮
আরও একটি শিক্ষনীয় গল্প হলো, এক নিঃসন্তান দম্পতি, বিভিন্ন উন্নত হাসপাতালে চিকিৎসার পর সন্তান হওয়ার ব্যাপারে তারা হতাশ। সমস্ত ডাক্তার ও সব ধরনের ঔষধ প্রয়োগ যখন শেষ, এমন সময় তারা একজন আলেমের কাছে এ বিষয়ে সমাধান চাইল। আলেম তাদের সকাল-সন্ধ্যা বেশি বেশি ইস্তেগফার পাঠ করতে বললেন। এবং বললেন, আল্লাহ তায়ালা ইস্তেগফারকারীদের ব্যাপারে বলেছেন,
শেষ করে একটি ভালো মানের চাকরি খুঁজছিলেন। এমন চাকরি যা তার নারীত্বের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে এবং ফ্রি ম্যাক্সিং তথা নারী-পুরুষের সহাবস্থানমুক্ত। মেয়েটি বলল, 'আমি প্রতিদিন ফজর নামাজের পর নিয়ম করে প্রায় ঘণ্টাখানিক সময় ইস্তেগফার করতে লাগলাম। দুই মাসের মধ্যেই আমি আমার মনমতো একটা চাকরি পেয়ে গেলাম।'
আরেক ব্যক্তি রাজনৈতিক মামলার জেরে আরব বিশ্বের এক জেলখানায় বন্দি হলো। দীর্ঘ সময়ের জন্য তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হলো। লোকটি বলল, 'আমি সকাল-বিকেল আল্লাহর ইস্তেগফার করতে লাগলাম। মাত্র তিন মাসের মাথায় আমার মুক্তিনামা চলে এল। আল্লাহ তায়ালা আমাকে উদ্ধার করলেন। শুধু তাই নয়, উপরন্তু আমাকে নেতৃস্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তিরা ডেকে পাঠালেন এবং আমাকে অনেক বড়ো অংক দান করলেন। আমার অবস্থাও দূর্গতিপূর্ণ ছিল, আমার কাছে কোনো টাকা ছিল না। আল্লাহ এখান থেকেও আমাকে উদ্ধার করলেন।'
এই ছোট্ট পুস্তিকার শেষদিকে প্রত্যেক মুসলমান নারী-পুরুষকে বিনীতভাবে বলতে চাই, তাওবা-ইস্তেগফারের ফজিলত, ব্যক্তি এবং সামাজিক জীবনে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ইত্যাদি বিষয় নিয়ে যদি বৃহৎ কলেবরের কিতাব লেখা হয় তাহলেও তার পূর্ণ হক আদায় হবে না। এজন্য আমি হৃদয় থেকে উৎসারিত কিছু কথামালা মুসলমান ভাই-বোনদের সমীপে উপস্থাপন করেছি। কিতাবটি একটি শস্যদানার ন্যায়। যে ব্যক্তি এটাকে হৃদয়ের জমিনে বপন করে যত্ন সহকারে পরিচর্যা করবে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর অন্তরকে ঈমান ও নুরের আলো দ্বারা সবুজাভ ও সুশোভিত করে দেবেন।
উপসংহারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে রাখি, ইস্তেগফার পাঠ করে এর ফলাফল লাভের জন্য অস্থির হবেন না। ইস্তেগফারের ফুল কখনো দ্রুত প্রস্ফুটিত হয়। আবার কখনো বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে বিলম্ব হয়। আবার কোনো সময় ইস্তেগফারের ওসিলায় বড়ো মুসিবত দূরীভূত বা লাঘব করে দেওয়া হয়। আপনার থেকে কখনো এমনটি যেন না হয়, আপনার কোনো প্রয়োজন পূরণ বা কোনো কাজ সহজ হওয়ার জন্য কিছুদিন ইস্তেগফার পড়লেন, কাজটি সিদ্ধি হওয়ার পর ইস্তেগফার ছেড়ে পূর্বের অবাধ্যতায় ফিরে গেলেন। এটি অত্যন্ত গর্হিত কাজ।
প্রিয় ভাই ও বোন! নিজের দুর্বল ঈমান ও আল্লাহর অবাধ্যতার দোহাই দিয়ে কখনো পাপের পথে অটল থাকবেন না। শয়তানের সাজানো ফাঁদে পদস্খলন থেকে সচেতনতা ও সর্তকতা অবলম্বন করুন। জীবনের জন্য বাতাস, খাবার ও পানীয় যেমন অত্যাবশ্যক, অন্তর জীবিত, সতেজ ও সজীব থাকার জন্য ইস্তেগফার তেমনই জরুরি। তাওবা-ইস্তেগফার আপনার কলবকে সতেজ, সুস্থ, প্রাণচাঞ্চল্য করে তুলবে। জীবনকে করবে নিরাপদ ও কণ্টকমুক্ত। চিরশান্তি ও সৌভাগ্যের মোহনায় নিয়ে যাবে। আসুন হেঁটে চলি আমরা সেই সুখদ সৌভাগ্যের খোঁজে।
টিকাঃ
৬৬ মুসনাদে আবু হানিফা: শরহে মুল্লা আলি কারি
৬৭ সুনানে আবু দাউদ: ১৫১৮
৬৮ নুহ: ১১-১৩
📄 আল্লাহ সবচেয়ে বড়ো ক্ষমাশীল
ইমাম বুখারি রহ. হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إن الله ملائكة يطوفون في الطريق يلتمسون أهل الذكر، فإذا وجدوا قوماً يذكرون الله تنادوا: هلموا إلى حاجتكم، قال: فيحفونهم بأجنحتهم إلى السماء الدنيا، فيسألهم ربهم جل في علاه وهو أعلم بهم: ما يقول عبادي؟ فيقولون: يسبحونك ويكبرونك ويمجدونك ويحمدونك، فيقول جل في علاه: هل رأوني؟ فيقولون: لا والله ما رأوك، فيقول: كيف لو رأوني؟ فيقولون: لو رأوك كانوا أشد لك عبادة، وأشد لك تمجيداً وتحميداً وأكثر تسبيحا قال: فيقول جل في علاه: فما يسألونني؟ قال: فيقولون: يسألونك الجنة، فيقول: هل رأوها? فيقولون: لا والله يا رب ما رأوها، فيقول: فكيف لو رأوها? فيقولون: لو أنهم رأوها لكانوا أشد عليها حرصاً، وأشد لها طلباً، وأعظم فيها رغبة)، فأين المشمرون? قال فيقول: فمم يتعوذون? فيقولون من النار، فيقول: هل رأوها? فيقولون: لا والله يا رب ما رأوها، فيقول: كيف لو رأوها? فيقولون: لو رأوها لكانوا أشد منها فراراً، وأشد لها مخافة)، اللهم أجرنا من النار فيقول: أشهدكم أني قد غفرت لهم، فيقول ملك من الملائكة: فيهم فلان ليس
مِنْهُمْ، إِنَّمَا جَاءَ لِحَاجَةٍ، فَيَقُولُ جَلَّ فِي عُلَاهُ: وَلَهُ قَدْ غَفَرْتُ، هُمُ الْقَوْمُ لَا يَشْقَى بِهِمْ جَلِيسُهُمْ
'আল্লাহর একদল ফেরেশতা রয়েছেন যারা দুনিয়াতে আল্লাহর জিকিররত লোকদের অন্বেষণে পথে-পথে ঘোরাফেরা করেন। তারা যখন কোথাও আল্লাহর জিকিররত লোকদের দেখতে পান, তখন তাদের একজন অন্যজনকে ডাকাডাকি করে বলেন, তোমরা নিজ নিজ কর্তব্য সম্পাদনের জন্য এদিকে চলে এসো। তখন তারা সকলে এসে তাদের ডানাগুলো দিয়ে সেই লোকদের ঢেকে ফেলেন নিকটস্থ আসমান পর্যন্ত। তখন তাদের রব তাদের জিজ্ঞেস করেন-অথচ ফেরেশতাদের চেয়ে তিনি বেশি জানেন-আমার বান্দারা কী বলেছে? তখন তারা জবাব দেন, তারা আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছে, তারা আপনার শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করছে, তারা আপনার প্রশংসা করছে এবং আপনার মাহাত্ম্য বর্ণনা করছে। আল্লাহ তখন জিজ্ঞেস করেন, তারা কি আমাকে দেখেছে? ফেরেশতাগণ বলেন, হে আমাদের রব, আপনার কসম! তারা আপনাকে দেখেনি। আল্লাহ বলেন, আচ্ছা যদি তারা আমাকে দেখত? ফেরেশতারা বলেন, যদি তারা আপনাকে দেখত তাহলে তারা আরও বেশি আপনার ইবাদত করত, আরও অধিক আপনার মাহাত্ম্য বর্ণনা করত আর বেশি বেশি আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করত।
আল্লাহ বলেন, তারা আমার নিকট কী চায়? ফেরেশতা বলেন, তারা আপনার নিকট জান্নাত চায়। তিনি জিজ্ঞেস করেন, তারা কি জান্নাত দেখেছে? ফেরেশতারা বলেন, আপনার সত্তার কসম হে রব! তারা জান্নাত দেখিনি। আল্লাহ জিজ্ঞেস করেন, তারা যদি দেখত তবে তারা কী করত? ফেরেশতারা বলেন, যদি তারা জান্নাত দেখত তাহলে তারা জান্নাতের আরও বেশি আশা করত, আরও অধিক চাইত এবং এর জন্য আরও অতিশয় উৎসাহী হতো। আল্লাহ তায়ালা জিজ্ঞেস করেন, তারা কীসের থেকে আশ্রয় চায়? ফেরেশতারা বলেন, জাহান্নام থেকে। আল্লাহ বলেন, তারা কি জাহান্নাম কি দেখেছে? ফেরেশতারা বলেন, আল্লাহর কসম, হে রব! তারা জাহান্নام দেখেনি। আল্লাহ বলেন, তারা যদি জাহান্নام দেখত তাহলে তাদের কী হতো? ফেরেশতারা বলেন, তারা যদি দেখত তাহলে তারা এ থেকে দ্রুত পালিয়ে যেত এবং সাংঘাতিক ভয় করত। তখন আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি তোমাদের সাক্ষী রাখছি যে, আমি তাদের মাফ করে দিলাম। তখন ফেরেশতাদের একজন বলবেন, তাদের মধ্যে অমুক আছে, যে তাদের অন্তর্ভুক্ত নয় বরং সে কোনো প্রয়োজনে এসেছে। আল্লাহ বলেন, তারা এমন যাদের বৈঠকে অংশগ্রহণকারী কেউ বিমুখ হয় না।'৭২
সুতরাং হে জিকিরের মজলিসে উপবিষ্ট ব্যক্তিগণ! সুসংবাদ গ্রহণ করো। তোমাদের প্রভু সুবিশাল রহমতের অধিকারী। তার দয়া ও অনুগ্রহ সীমাহীন, বিপুল। আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে ডেকে বলছেন, 'পুণ্যবান বান্দাদের আকাঙ্ক্ষা তীব্র হচ্ছে আমার সাথে সাক্ষাতের জন্য। আমিও তাদের সাথে সাক্ষাতের অপেক্ষা করছি। জেনে রাখো! যে আমাকে অন্বেষণ করে সে আমাকে পায়। যে আমাকে ব্যতীত অন্যকে অন্বেষণ করে সে আমাকে পায় না। এমন কি কেউ আছে, যে আমার দিকে এগিয়ে এসেছে কিন্তু আমি তাকে কবুল করিনি? এমন কি কেউ আছে, যে আমার পথ অন্বেষণ করেছে কিন্তু আমি তার জন্য আমার রহমতের দুয়ার উন্মোচন করে দিইনি?
জেনে রাখো! যে আমার ওপর ভরসা করে আমি তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাই। যে আমাকে ডাকে আমি তার ডাকে সাড়া দিই। যে আমার নিকট চায় আমি তাকে দিই।
জেনে রাখো! যারা আমাকে স্মরণ করে তারা সর্বদা আমার সাহচর্যে থাকে। যারা আমার কৃতজ্ঞতা আদায় করে আমি তাদেরকে আমার নেয়ামত আরও বাড়িয়ে দিই। যারা আমার আনুগত্য করে তারা আমার রহমতে ডুবে থাকে। যারা আমার অবাধ্যতা করে আমি তাদেরকে আমার রহমত থেকে কখনো নিরাশ করি না। যদি তারা তাওবা করে ফিরে আসে তাহলে আমি তাদেরকে ভালোবাসি। তারা যদি তাওবা না করে তথাপিও আমি তাদেরকে আমার নেয়ামত ভোগ করতে দিই। আমি তাদেরকে বিভিন্ন বিপদ দ্বারা পরীক্ষা করি যেন তারা অন্ধকার থেকে বের হয়ে আসে।
যে আমার দিকে এগিয়ে আসে আমি তাকে দূর থেকে স্বাগত জানাই। পক্ষান্তরে যে আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় আমি তাকে কাছ থেকে আহ্বান করি। যে আমাকে বর্জন করে আমি তাকে দ্বিগুণ দিই। আর যে আমার সন্তুষ্টি কামনা করে সে যেমন চায় আমি তাকে তেমনই দিই। যে আমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে আমি তাকে আশ্রয় দিই। যে আমার নিকট তার যাবতীয় কিছু অর্পণ করে আমি তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাই। যে নিজেকে আমার নিকট বিক্রি করে আমি তাকে ক্রয় করে নিই। বিনিময়ে আমি তাকে দান করি জান্নাত।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! এগুলো আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার প্রতিশ্রুতি। আর তিনি কখনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না।
ইরশাদ হয়েছে,
وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ
'আল্লাহর চেয়ে বড়ো ওয়াদা পূরণকারী আর কে আছে?'৭৩
যারা আল্লাহর নিকট তাওবা করে আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করেন। শুধু তাই নয়, আল্লাহ তাদের প্রতি খুশি হন। সুতরাং হে তাওবাকারী! আল্লাহর সন্তুষ্টির সুসংবাদ গ্রহণ করো।
ইরশাদ হয়েছে,
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
'আল্লাহ তাওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন। '৭৪
আল্লাহর প্রশংসা করো। তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো। এবং বলো হে আল্লাহ! আপনি আমার রব। আপনি ব্যতীত আর কোনো উপাস্য নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি আপনার বান্দা। আমি যথাসাধ্য আপনার আনুগত্য করি। আমি আপনার নিকট প্রার্থনা করি সকল প্রকার অনিষ্টতা থেকে। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। আপনি ব্যতীত আর কেউ নেই যে আমাকে ক্ষমা করবে।
আরও বলো 'হে আল্লাহ! আমি ছিলাম মৃত, আপনি আমাকে জীবিত করেছেন। আমি ছিলাম দুর্বল, আপনি আমাকে করেছেন শক্তিশালী। হে আল্লাহ! আমি ছিলাম ফকির, আপনি আমাকে বানিয়েছেন ধনী। আমি ছিলাম পথভ্রষ্ট, আপনি আমাকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন। হে আল্লাহ! আমি ছিলাম মূর্খ, আপনি আমাকে জ্ঞান দান করেছেন। আমি ছিলাম ক্ষুধার্ত, আপনি আমাকে আহার করিয়েছেন। আমার সমস্ত প্রশংসা তাই একমাত্র আপনার জন্য। সকল কৃতজ্ঞতা কেবল আপনার সমীপে। সকল কল্যাণ কেবল আপনার কুদরতি হাতেই। যাবতীয় বিষয় আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তন করে। আপনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই।
হজরত মানসুর ইবনে আম্মার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ভোর হয়ে গেছে ভেবে একরাতে মসজিদের যাওয়ার জন্য আমি ঘর থেকে বের হলাম। বাহিরে বের হয়ে দেখি, এখনো রাত ঢের বাকি। আমি তখন একটি গৃহের সামনে এসে বসি। আর তখন হঠাৎ এক যুবকের ক্রন্দনের ক্ষীণ আওয়াজ আমার কানে ভেসে আসে। আমি দ্বিগুণ কৌতূহল নিয়ে যুবকের দিকে মনোনিবেশ করি। সে কেঁদে কেঁদে বলছে, 'হে আল্লাহ! আপনার বড়োত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের কসম! আমি আমার গোনাহের দ্বারা আপনার অবাধ্যতা করতে চাইনি। আমি গোনাহ করেছি, কারণ আমি তখন ছিলাম মূর্খ। হে আল্লাহ! তোমার নামের কসম! আমি তোমার শাস্তির ব্যাপারে বেপরোয়া ছিলাম না। আমি তোমাকে উপেক্ষা করিনি। হে আল্লাহ! আমি আমার নিজেকে জিজ্ঞেস করে দেখেছি, সত্যিই আমি অপরাধী। আমি ধোঁকায় পড়ে গোনাহ করে ফেলেছি। হে আল্লাহ! এখন তোমার শাস্তি থেকে কে আমাকে রক্ষা করবে? হে আল্লাহ! তুমি আমার অতীতের সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও। আমি কায়মনো হয়ে তোমার নিকট তাওবা করছি।'
মানসুর বলেন, 'আমি সে যুবকের কান্নাভেজা প্রার্থনা শুনে পবিত্র কুরআনের এ আয়াত তিলাওয়াত করি,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلائِكَةٌ غِلاظٌ شِدَادٌ لَّا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যার দায়িত্বে নিয়োজিত আছে নির্দয় ও কঠোর ফেরেশতারা। তারা আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে না এবং যা করার নির্দেশ পায় তারা তাই করে।’ ৭৫
মানসুর বলেন, ‘অতঃপর আমি সেখান থেকে চলে আসি। সকালে যখন বের হই দেখি, কাফনে মোড়ানো একটি মৃতদেহ জানাজার অপেক্ষা করছে। একজন বৃদ্ধ লোক লাশের সামনে পায়চারি করছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কে এই মৃত ব্যক্তি?
আমার কথা শুনে বৃদ্ধ লোকটি বেদনার স্বরে বলল, অনুগ্রহ করে আমার হৃদয়ের ব্যথা নতুন করে জাগিয়ে দেবেন না।
বললাম, আমি একজন আগন্তুক। তাই জানতে চাচ্ছি কে এই মৃত ব্যক্তি?
বৃদ্ধ লোকটি বলল, ‘সে আমার সন্তান। গতকাল রাতে ইন্তেকাল করেছে। কে যেন কুরআনের একটি আয়াত তিলাওয়াত করেছে যেখানে আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামের ভয়াবহতা আলোচনা করেছেন। আমার ছেলে উক্ত আয়াত শুনে কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে অবশেষ সে মারা যায়।’
টিকাঃ
৭২ বুখারি: ৫৯৬৬।
৭৩ সুরা তাওবা: ১১১।
৭৪ সুরা বাকারা: ২২২।
৭৫ সুরা তাহরিম: ৬।