📘 আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালবাসেন > 📄 আল্লাহ আপনার ডাকের অপেক্ষায় আছেন

📄 আল্লাহ আপনার ডাকের অপেক্ষায় আছেন


পার্থিব জীবন রেললাইনের মতো সমান্তরাল নয় কখনো। ঘাত-প্রতিঘাত, উত্থান- পতনের তরঙ্গে বয়ে চলে জীবনের কিশতি। নদীর মতো বয়ে চলা জীবনে শয়তান, নফস, প্রবৃত্তি এবং চাকচিক্যময় দুনিয়ার কুমন্ত্রণার ঢেউ আছড়ে পড়ে জীবনোপকূলে। কখনো আমরা সেই ঢেউয়ে পরাস্ত হই, কখনো দাঁড়িয়ে থাকি সটান সৌধের মতো। তাই সব সময় আপনাকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে, কুমন্ত্রণার ঢেউ যেন আপনাকে দীর্ঘস্থায়ী কোনো ক্ষতির সম্মুখীন করতে না পারে। গুনাহের লকলকে শিখা কখনো আপনাকে স্পর্শ করলে পূর্ণ আত্মবিশ্বাসে প্রতিরোধ করতে হবে তৎক্ষণাৎ। গুনাহের ফিরিস্তি আকাশের মেঘমালা স্পর্শ করলেও হতাশ হবেন না কখনো। গুনাহের জমাট আঁধার ভেদ করে পুণ্যের আলোকরেখা স্পর্শের নিরন্তর সাধক আপনি। আল্লাহ তায়ালা ক্ষমাশীল, অতিশয় দয়ালু। প্রচেষ্টা ও সদিচ্ছার ফলে তিনি তাঁর অপার ক্ষমা ও অনুগ্রহে গুনাহের কালিমা মোচন করে দেবেন।
আল্লাহ তায়ালার রহমতের শামিয়ানার ব্যাপ্তি অসীম। সাগরের অথৈ জলরাশির সমপরিমাণ গুনাহকেও তিনি ক্ষমার আপন মহিমায় ক্ষমা করে দেন। গুনাহের বোঝা মাথায় নিয়ে অনুতপ্ত হৃদয়ে যদি আমরা তার দরবারে কড়া নাড়ি, তিনি তৎক্ষণাৎ আমাদের জন্য খুলে দেবেন রহমতের অবারিত দরোজা। আমার প্রতিপালক কত সহনশীল, তিনি ক্ষমা ও অবারিত রহমতের মালিক। দিবানিশি আকণ্ঠ রবের অবাধ্যতায় ডুবে থাকি, তবুও তিনি আমাদের সকল দোষত্রুটি গোপন রাখেন। হিদায়াতের পথে ফিরে আসার সুযোগ দেন। রাতের শেষ প্রহরে ডেকে ডেকে বলেন,
مَنْ يستغفرني فأغفر لَهُ 'কে আমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব।”¹¹
ইবনু আবিদ দুনিয়া রহ. বলেন, হযরত মালিক ইবনে দিনার রহ. তার কিতাবুশ শুকরে বলেন, 'আমি কয়েকটি হাদিসের কিতাবে পড়েছি আল্লাহ তায়ালা বলেন, "হে আদম সন্তান! আমার কল্যাণ তোমার প্রতি বর্ষণ হয়, পক্ষান্তরে তোমার মন্দ কাজ আমার দিকে উত্থিত হয়। আমি তোমার প্রতি পছন্দনীয় নেয়ামত দান করি, তুমি আমার প্রতি অপছন্দনীয় গুনাহ পাঠাও। সম্মানিত ফেরেশতা তোমার থেকে মন্দ আমল নিয়ে আমার কাছে আসতেই থাকে।”
আল্লামা আলবানি রহ. সহিহুল জামে গ্রন্থে এই হাদিস উল্লেখ করেছেন, 'বামপাশের ফেরেশতা অপরাধী মুসলমানের গুনাহ লিপিবদ্ধ করতে ছয় দফা বিলম্ব করে, এর ভেতরে যদি সে অনুশোচনায় দগ্ধ হয় এবং কৃত অপরাধে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করে তাহলে তা লিপিবদ্ধ করা হয় না, অন্যথায় একটি গুনাহ লিপিবদ্ধ করা হয়।'
প্রিয় ভাই! ধীর পায়ে, কম্পিত হৃদয়ে, মিনতিভরা কণ্ঠে ক্ষমাশীল, দয়ালু প্রতিপালকের দরবার চোখের নোনাজলে সিক্ত করুন, তাওবাকারীদের নুরানি কাফেলায় আশ্রয় নিন পরম নির্ভরতায়।
হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখনিঃসৃত বাণী আমাদের প্রত্যাশার উপকূলে জোয়ারের প্লাবন সৃষ্টি করে, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে থাকি, আমাদের রব অত্যন্ত দয়ালু, তিনি আমাদের ক্ষমা করবেন, যদিও আমাদের গুনাহ আসমান পর্যন্ত পৌঁছে।
لَوْ أَخْطَأْتُمْ حَتَّى تَبْلُغَ خَطَايَاكُمُ السَّمَاءَ ثُمَّ تُبْتُمْ لَتَابَ عَلَيْكُمْ 'তোমরা যদি পাপাচার করো, এমনকি তোমাদের পাপ আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, অতঃপর তোমরা তাওবা করো, তাহলে আল্লাহ অবশ্যই তোমাদের তাওবা কবুল করবেন।'¹²
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
التَّابِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ 'গুনাহ থেকে তাওবাকারী নিষ্পাপ ব্যক্তিতুল্য।'¹³
হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে কিছু নসিহত করুন।' তখন তিনি আমাকে বললেন, 'সাধ্যের সবটুকু দিয়ে আল্লাহকে ভয় করবে। সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ রাখবে, কোনো মন্দ কাজ করে ফেললে তাওবা করবে। গোপনে একটি মন্দ কাজ করলে তৎপরিবর্তে গোপনে একটি ভালো কাজ করবে, প্রকাশ্যে মন্দ কাজ করলে এর পরিবর্তে প্রকাশ্যে একটি ভালো কাজ করবে।'¹⁴
তাওবার অবারিত দরোজা সর্বদা উন্মুক্ত। এই দরজার কপাট দুটো কখনো একত্রিত হয় না। তাহলে অযথাই কেন হীনম্মন্যতায় ভোগছেন। হতাশার চাদর দূরে নিক্ষেপ করুন। ছিঁড়ে ফেলুন অলসতা, কুমন্ত্রণা ও হারাম প্রবৃত্তির সকল ঠুনকো মায়াবী জাল। ফিরে আসুন আসমান-জমিনের প্রতিপালকের সন্তুষ্টির পথে। চোখের নোনাজল নিয়ে হাজির হন তার রহমতের দরোজায়, তার আশ্রয়ের শামিয়ানায় নিজেকে আবদ্ধ রাখুন সব সময়, জান্নাত ও সকল কল্যাণের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী সব পাপরাশি থেকে মহামহিম প্রভুর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করুন বিগলিত হৃদয়ে। দেখুন আল্লাহ তায়ালা আপনার জন্যই ইরশাদ করেছেন,
وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَن يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ
'এবং যারা কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে অথবা নিজেদের প্রতি জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করে। আল্লাহ ব্যতীত কে পাপ ক্ষমা করবে? এবং তারা যা করে ফেলে, জেনে- শুনে তার পুনরাবৃত্তি করে না।”¹⁵
হ্যাঁ, সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিরা সর্বদা আল্লাহর স্মরণ অন্তরে জাগরুক রাখে। তাদের দ্বারা গুনাহের কাজ পুনরাবৃত্তি হয় না। পৃথিবীতে থেকেই তাদের জন্য রয়েছে আখেরাতের অনন্ত সুখের সুসংবাদ।

টিকাঃ
১১ ইবনে মাজাহ: ১৩৮৮
১২ ইবনে মাজাহ: ৪২৪৮
১৩ ইবনে মাজাহ: ৪২৫০
১৪ মুজামুত তাবারানি। সহিহ আত-তারগিব: ৩১৪৪
১৫ সুরা আলে-ইমরান: ১৩৫

📘 আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালবাসেন > 📄 বেলা চলে যায়

📄 বেলা চলে যায়


প্রিয় ভাই আমার! পৃথিবী আনন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় আবাসস্থল। ঈমানের স্তম্ভগুলো দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা, নেক কাজে অবিরাম সাধনা, কল্যাণের পথে প্রতিযোগিতা এবং নেককার ব্যক্তিদের পথ অবলম্বন ব্যতীত দুনিয়ার প্রকৃত স্বাদ কখনো উপভোগ করতে পারবেন না। জান্নাতের নেয়ামত বৃদ্ধির জন্য দুনিয়াতে প্রতিযোগিতার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَ فِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ 'এ বিষয়ে প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করুক।¹⁶
আখেরাতের অনন্ত সফরে যাত্রার পূর্বেই জীবনকে অর্থবহ করে তুলুন। সময়কে গনিমত মনে করে নেক কাজে প্রতিযোগিতার ময়দানে নেমে পড়ুন। আব্দুল কাদির জিলানি রাহিমাহুল্লাহ ফাতহুর রব্বানি গ্রন্থে বলেন, 'হে লোকসকল! জীবনপ্রদীপ প্রজ্বলিত থাকা অবস্থায় জীবনকে গনিমত মনে করে নেক কাজের প্রতিযোগিতায় জীবনকে উৎসর্গ করো। তাওবা ও দোয়ার রোনাজারিতে ক্ষমা চাও রবের কাছে। মৃত্যুর দমকা হাওয়ায় অচিরেই জীবনপ্রদীপ নিভে যাবে তোমার।'
প্রিয় ভাই! পরকালে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জীবনের হিসাব নেওয়ার পূর্বে নিজেই নিজের হিসাব মিলাতে থাকুন। আখেরাতের সম্বলহীন পথিক হওয়ার পূর্বে ফিরে আসুন আল্লাহর দরবারে। পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী। অচিরেই দেহের খাঁচা থেকে রুহ উড়ে যাবে আসমান পানে। দুনিয়ার আশা-আকাঙ্ক্ষা ও আপনার নিথর দেহের মাঝে তৈরি হবে অসীম দূরত্ব। যে দূরত্ব কোনোদিন মুছে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
حَتَّىٰ إِذَا جَاءَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُونِ لَعَلَّى أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ كَلَّا إِنَّهَا كَلِمَةٌ هُوَ قَابِلُهَا وَمِن وَرَابِهِم بَرْزَخٌ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ
'যখন ওদের কারও মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন সে বলে, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে পুনরায় প্রেরণ করুন। যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি যা আমি পূর্বে করিনি। না, তা হবার নয়। এই কথা তো তার একটি উক্তি মাত্র। তাদের সম্মুখে বারযাখ থাকবে উত্থান দিবস পর্যন্ত।'¹⁷
ইবনে কাসির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মৃত্যুর সময় কাফের এবং সীমালঙ্ঘনকারী ব্যক্তিদের অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন। যাতে মানুষ পৃথিবীতেই আখেরাতের সুখ-শান্তি বিধ্বংসী কাজ থেকে বিরত থাকে।
প্রিয় ভাই আমার! মৃত্যুর পরোয়ানা এবং জানাজার খাটিয়া আসার পূর্বে আপনার দয়াশীল প্রভুর দরবারে আশ্রয় নিন। আল্লাহর কাছে তাওবা ও গুনাহের লজ্জায় যাদের মুখ অবনমিত হয়, আপনি তাদের দলভুক্ত হোন। আল্লাহর পথে সফরের দীর্ঘ পরিক্রমায় হতাশ হবেন না, অচিরেই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে মুক্তির বিস্তৃত উপকূল। মুক্তির ঠিকানায় পৌঁছার জন্য সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের সাহচর্য গ্রহণ করুন। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ফিতনার সময়ে তারাই আপনার সর্বোত্তম সহযোগী।
জেনে রাখুন, দুনিয়া আমাদের জন্য পরীক্ষার হল। এখানে রয়েছে প্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনার সকল আসবাব। যে ব্যক্তি অপছন্দনীয় জিনিসগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখে সে জান্নাতের পথিক। যে প্রবৃত্তি ও দুনিয়ার সুখ- স্বাচ্ছন্দ্যে ডুবে থাকে সে এগিয়ে চলছে জাহান্নামের পথে। হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
حفَتْ الجنَّةُ بالمكاره وحُفَتْ النَّارُ بالشهوات
'জান্নাতকে সাধনা দ্বারা ঢেকে দেওয়া হয়েছে, আর জাহান্নামকে আচ্ছাদিত করা হয়েছে কামনা-বাসনা দ্বারা।'¹⁸
আল্লাহ তায়ালা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমকে ধৈর্যধারণের নির্দেশ দিয়েছেন। কাফেরদের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের দিকে দৃষ্টিপাত করতে নিষেধ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে,
وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ صلے يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ صلے الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَن ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا
'আপনি নিজেকে ধৈর্য সহকারে রাখুন ওই সকল লোকদের সংসর্গে, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় আহ্বান করে তাদের প্রতিপালককে তার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এবং আপনি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে তাদের হতে আপনার দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না। আপনি তার আনুগত্য করবেন না যার চিত্তকে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী করে দিয়েছি, যে তার খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে।'¹⁹
হে ভাই আমার! নিকট অতীতে হয়তো আপনি অনেক অপরাধ ও পাপকাজে জড়িয়ে ছিলেন, সবকিছু থেকে তাওবা করে এখনো যদি সঠিক পথে ফিরে আসেন, আল্লাহ তায়ালা পূর্বের পাপরাশিকে সওয়াব দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। তিনি তো সকল রাজত্বের অধিপতি, ক্ষমার আধার, অসীম রহমের মালিক। তিনি বান্দাদের দিনের গুনাহসমূহ মোচন করার জন্য রাতে ক্ষমার হাত প্রসারিত করেন, রাতের গুনাহসমূহ মোচনের জন্য দিনে ক্ষমার হাত বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَبِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا وَمَن تَابَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَإِنَّهُ يَتُوبُ إِلَى اللَّهِ مَتَابًا
'তবে যারা তাওবা করে ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে। আল্লাহ তাদের পাপ পরিবর্তন করে দিবেন পুণ্যের দ্বারা। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। যে ব্যক্তি তাওবা করে ও সৎকর্ম করে সে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অভিমুখী হয়।'²⁰
গুনাহের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে দুনিয়া-আখেরাতে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও প্রশান্তিময় জীবনের জন্য কিছু বিষয়ের ওপর আমল করা অতীব জরুরি। অতীতের সকল ভুলত্রুটির জন্য খাঁটি দিলে আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে। নেক কাজে অধিক অংশগ্রহণ এবং গুনাহ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। অতীতের গুনাহের জন্য সর্বাঙ্গে লজ্জা ও অনুশোচনা মেখে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হবে।
ইনশাআল্লাহ, তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার জীবনে নেমে আসবে অবারিত শান্তি, সুন্দর স্থিতিশীলতা, অগণিত রহমত, বরকত ও সাহায্যের শীতল বারিধারা। রিজিকের প্রাচুর্যে বিস্মিত হবে আপনার হৃদয়। এই অনুগ্রহ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকেই দান করেন, তিনি অতিশয় দয়াপরবশ। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেন,
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَكِن كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُم بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
'যদি সেই সকল জনপদের অধিবাসীবৃন্দ ঈমান আনত ও তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের জন্য আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সকল কল্যাণ উন্মুক্ত করে দিতাম, কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল। সুতরাং তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদেরকে শাস্তি দিয়েছি।'²¹
প্রিয় ভাই ও বোন! তাওবা ও ইস্তেগফারের চমৎকার সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য রয়েছে। এর ফলে মানুষের জীবনে নেমে আসে কল্যাণ ও শান্তির ফল্গুধারা। পুষ্পসজ্জায় সজ্জিত এই পথের শেষে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে মুক্তির মোহনা। গুনাহ থেকে মুক্তি লাভ, চিরস্থায়ী জীবনের পরম সৌভাগ্য, পার্থিব জীবনের প্রশান্তি, দাম্পত্যজীবনে ভালোবাসা, জীবনের প্রফুল্লতা, বিপদ থেকে মুক্তি, বিবাহের ব্যবস্থাসহ জীবনের যে-কোনো প্রয়োজনে তাওবা-ইস্তেগফারের বিকল্প নেই। অধিকাংশ মুসলমান গুরুত্বপূর্ণ এই আমলের প্রতি উদাসীন। ইহকালীন ও পরকালীন জীবনে তাওবা-ইস্তেগফারের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে অবগত না থাকার ফলে এই পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হয়।
একটি সুন্দর, নির্মল জীবন উপভোগের জন্য ইস্তেগফার পাঠে অভ্যস্ত হওয়ার বিকল্প নেই। পবিত্র কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَأَنِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُمَتِّعْكُم مَّتَاعًا حَسَنًا إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى
'তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করো এবং তার দিকে প্রত্যাবর্তন করো। তিনি তোমাদেরকে একটি করে নির্দিষ্ট কাজের জন্য উত্তম জীবন উপভোগ করতে দেবেন।' ২২
উক্ত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সমস্ত গুনাহ থেকে তাওবা- ইস্তেগফারকারীদের জন্য উত্তম জীবন উপভোগের অঙ্গীকার করেছেন।
يُمَتِّعْكُم مَّتَاعًا حَسَنًا
আয়াতের এই অংশের ব্যাখ্যায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'রিজিক ও সচ্ছলতা দ্বারা আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ওপর অনুগ্রহ করবেন।'
ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন, 'তাওবা ও ইস্তেগফারের ফলে আল্লাহ তায়ালা প্রশস্ত ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন দান করবেন।'
শারীরিক সামর্থ্য ও সুস্থতা, রহমতের বারিধারা, কল্যাণ ও বরকতের প্রাচুর্যতা অর্জনের জন্য আপনি ইস্তেগফারকে সঙ্গী করুন। হযরত হুদ আলাইহিস সালাম প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,
قُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا وَيُمْدِدْكُم بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَارًا
'আর বলেছি, তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করো, তিনি তো মহা ক্ষমাশীল, তিনি তোমাদের জন্যে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তিনি তোমাদেরকে সমৃদ্ধ করবেন ধন- সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা।' ২৩
ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'বেশি বেশি ইস্তেগফার করার দ্বারা রিজিকে বরকত হয় এবং আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ হয়।'
ইবনে কাসির রহ. এই আয়াতের তাফসিরে বলেছেন, 'তোমরা যখন আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে তাওবা-ইস্তেগফার এবং তাঁর আনুগত্য করবে, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের রিজিকে প্রশস্ততা দান করবেন, আসমান থেকে রহমতের শীতল বারি বর্ষণ করবেন, বিভিন্ন প্রজাতির শস্য উৎপাদন করবেন, পশুর ওলান দুধে পরিপূর্ণ করবেন, সৃষ্টি করবেন চোখজুড়ানো বাগান, যার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হবে নয়নাভিরাম ছোটো ছোটো নদী।'
শাইখ আবু বকর জাযাইরি রহ. আইসারুত তাফাসির গ্রন্থে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'যে ব্যক্তির সন্তান এবং সম্পত্তির প্রতি আগ্রহ রয়েছে সে যেন দিবানিশি অবিরাম ইস্তেগফার পাঠ করে। তাহলে আল্লাহ তায়ালা তার সম্পদ এবং সন্তানের আশা পূরণ করবেন।' ইস্তেগফার কল্যাণ ও সৌভাগ্যের দরোজা উন্মুক্ত করে, সফলতার রাজপথ খুলে দেয়, শত্রুতা ও বিদ্বেষ প্রতিহত করে।
হযরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, পৃথিবীতে আল্লাহর শান্তি থেকে নিরাপদ থাকার দুটি মাধ্যম। একটি মাধ্যম প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। দ্বিতীয়টি হলো ইস্তেগফার। এই মাধ্যমটি এখনো বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ
'আল্লাহ তায়ালা এমন নন যে, আপনি তাদের মধ্যে থাকবেন অথচ তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন। এবং আল্লাহ তায়ালা এমনও নন যে, তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করবে অথচ তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন।' ২৪
হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
مَنْ لَزِمَ الْإِسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا وَمِنْ كُلِّ هَمَّ فَرَجًا وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ.
'কোনো ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার পড়লে আল্লাহ তাকে প্রত্যেক বিপদ থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করবেন, সকল দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করবেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না।'²⁵
হাসান ইবনে আহমাদ ইবনে হাসান হুমাম এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন,' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক পরিমাণে ইস্তেগফার পাঠের ফলাফলস্বরূপ কয়েকটি পুরস্কার লাভের সংবাদ দিয়েছেন। প্রথমটি হলো, বান্দার ধারণাতীত অপ্রত্যাশিত স্থান থেকে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য রিজিকের ব্যবস্থা করবেন। সুতরাং উত্তম রিজিক প্রত্যাশীদের কথা এবং কাজে ইস্তেগফারের ওপর আমল করা উচিত। কোনো ব্যক্তি যদি শুধু মুখে মুখে আস্তাগফিরুল্লাহ বলে, কাজে-কর্মে বাস্তবায়ন না করে তাহলে সে নির্জলা মিথ্যুক সাব্যস্ত হবে।'
তাওবা ও ইস্তেগফারের পুরস্কারের আধিক্য দেখে কিছু মানুষ সন্দিহান। তারা পরস্পরকে প্রশ্ন করে, তাওবা, ইস্তেগফার পাঠ করার পুরস্কার এত বেশি! আমি আশ্বস্ত করে বলতে চাই, জি, প্রিয় ভাই ও বোন! শুধু এতটুকুই নয়, এর পুরস্কার আরও রয়েছে। আমাদের ওপর বিপদ, দুর্যোগ আপতিত হওয়ার কারণ হলো, আমরা ইবাদতের প্রতি উদাসীন, গুনাহের কাজে লিপ্ত এবং শরিয়তের বিরোধী কর্মকাণ্ডে নিমগ্ন। আল্লাহ তায়ালা এই কথাগুলো কুরআনুল কারিমে চমৎকারভাবে উল্লেখ করেছেন,
وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَ يَعْفُوا عَنْ كَثِيرٍ
'তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে তা তো তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল, এবং তোমাদের অনেক অপরাধ তো তিনি ক্ষমা করে দেন।'²⁶
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
ط لَيْسَ بِأَمَانِيكُمْ وَلَا أَمَانِي أَهْلِ الْكِتَابِ مَنْ يَعْمَلْ سُوءًا يُجْزَ بِهِ وَلَا يَجِدْ لَهُ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا
'তোমাদের খেয়াল-খুশি ও কিতাবিদের খেয়াল-খুশি অনুসারে কাজ হবে না। কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিফল সে পাবে এবং আল্লাহ ব্যতীত তার জন্য সে কোনো অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না।'²⁷
অপর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
'মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে তাদেরকে তাদের কোনো কোনো কর্মের শাস্তি তিনি আস্বাদন করান; যাতে তারা ফিরে আসে।'²⁸
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
وَجُعِل الذُّلُّ والصَّغار على من خالف أمرى 'যে আমার আদেশ লঙ্ঘন করবে তার জন্য রয়েছে লাঞ্ছনা এবং অপমান।' ²⁹
সুতরাং, হে প্রিয় ভাই ও বোন! আয়াত ও হাদিসে উল্লিখিত অবাধ্যতা থেকে মুক্তি এবং উভয় জগতে সফলতার জন্য বেশি বেশি ইস্তেগফারের বিকল্প নেই। যে ব্যক্তির আমলনামায় অধিক পরিমাণ ইস্তেগফার রয়েছে, তার জন্য মহা সুসংবাদ। যার আমলনামা ইস্তেগফারশূন্য সেদিন তার কী অবস্থা হবে, যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না; সেদিন উপকৃত হবে কেবল সে, যে আল্লাহর নিকট আসবে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে।
আব্দুল্লাহ ইবনে বুসর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
طُوبَى لِمَنْ وَجَدَ فِي صَحِيفَتِهِ اسْتِغْفَارًا كَثِيرًا 'যে ব্যক্তি তার আমলনামায় অধিক পরিমাণ ইস্তেগফার অর্থাৎ “ক্ষমাপ্রার্থনা” যোগ করতে পেরেছে, তার জন্য সুসংবাদ, আনন্দ।' ³⁰
হযরত জুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
من أَحَبَّ أن تسره صحيفته فليكثر فيها من الاستغفار 'যে ব্যক্তি তার আমলনামা দেখে খুশি হতে চায় সে যেন বেশি বেশি ইস্তেগফার পাঠ করে।' ³¹
একটি বিষয় হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করুন, সমস্ত নবীগণ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। গুনাহের কালিমা যাদেরকে স্পর্শ করতে পারেনি। এতৎসত্ত্বেও তারা অধিক পরিমাণে ক্ষমাপ্রার্থনা করতেন। বারবার আল্লাহকে ডেকে ঘনিষ্ঠতা অর্জন করে একমাত্র প্রভুর দরবারে সাহায্য কামনা করতেন। সেই তুলনায় আমাদের অবস্থা কতটা শোচনীয়! আমলের খাতা পাপ-পঙ্কিলতায় পরিপূর্ণ। ইবাদত স্বল্প ও সংক্ষিপ্ত করা আমাদের সহজাত অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং এইসব সীমাবদ্ধতার জন্য বেশি বেশি তাওবা-ইস্তেগফার করা উচিত। দয়াশীল আল্লাহ তায়ালা গুনাহগারের কাতর কণ্ঠের মিনতি ফিরিয়ে দেবেন না। তিনি সাহায্যকারী, তার ওপরই নির্ভরতা। তিনি ছাড়া কোনো শক্তিমান ও সাহায্যকারী নেই।
আমাদের আদি পিতা হযরত আদম আলাইহিস সালাম এবং মা হাওয়া আলাইহাস সাল্লামের ইস্তেগফারের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
'তারা বলল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি, যদি তুমি আমাদেরকে ক্ষমা না করো এবং দয়া না করো তবে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবো।' ³²
আল্লাহ তায়ালা হযরত মুসা আলাইহিস সালামের ইস্তেগফারের কথা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে ইরশাদ করেন,
قَالَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي فَغَفَرَ لَهُ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
'মুসা আলাইহিস সালাম বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমি তো আমার নিজের প্রতি জুলুম করেছি।' ³³
হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَظَنَّ دَاوُدُ أَنَّمَا فَتَنَّهُ فَاسْتَغْفَرَ رَبَّهُ وَخَرَّ رَاكِعًا وَ أَنَابَ
'দাউদ বুঝতে পারল, আমি তাকে পরীক্ষা করলাম। অতঃপর সে তার প্রতিপালকের নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করল ও নত হয়ে লুটিয়ে পড়ল এবং তাঁর অভিমুখী হলো।'³⁴ ³⁵ হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي وَهَبْ لِي مُلْكًا لَّا يَنبَغِي لِأَحَدٍ مِّن بَعْدِي إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
'সুলাইমান বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমাকে দান করুন এমন এক রাজ্য যার অধিকারী আমি ছাড়া কেউ হবে না। তুমি তো পরম দাতা।' ³⁶ হযরত নুহ আলাইহিস সালাম সম্বন্ধে ইরশাদ হয়েছে,
رَّبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَن دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ
'হে আমার প্রতিপালক! আপনি ক্ষমা করুন আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং যারা মুমিন হয়ে আমার গৃহে প্রবেশ করে তাদেরকে এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে।'³⁷ আল্লাহর কাছে সর্বোচ্চ প্রিয় পাত্র নবীগণ এভাবেই আমাদেরকে তাওবা এবং ইস্তেগফার শিক্ষা দিয়েছেন। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তায়ালা জীবনের সমস্ত ক্ষমার ঘোষণা দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও তিনি পৃথিবীতে সর্বোচ্চ ইস্তেগফারকারী। সর্বদা ইস্তেগফারে ডুবে থাকতেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
إِنَّهُ لَيْغَانُ عَلَى قَلْبِي وَإِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ فِي الْيَوْمِ مِائَةَ مَرَّةٍ
'আমার অন্তরে কখনো কখনো অলসতা দেখা দেয়, তথাপিও আমি দৈনিক একশবার আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করি।' আরও বলেন,
وَاللهِ إِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ أَكْثَرَ مِنْ سَبْعِينَ مَرَّةً.
'আল্লাহর শপথ! আমি প্রতিদিন আল্লাহর কাছে সত্তরবারেরও অধিক ইস্তেগফার ও তাওবা করে থাকি।' ³⁸
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা গণনা করেছি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক বৈঠকে একশবার এই দোয়া পড়েছেন,
رب اغفر لي وتب علي، إنك أنت التواب الرحيم 'হে প্রভু আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার তাওবা গ্রহণ করুন। নিশ্চয়ই আপনি তাওবা গ্রহণকারী, অতিশয় দয়ালু।'
হযরত সাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا انْصَرَفَ مِنْ صَلَاتِهِ اسْتَغْفَرَ ثَلَاثًا
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ শেষ করে তিনবার ইস্তেগফার পাঠ করতেন।' ৩৯
অর্থাৎ ফরজ নামাজ শেষ করেই তিনবার আস্তাগফিরুল্লাহ বলতেন। আবু মুসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নবর্ণিত শব্দে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করতেন,
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي خَطِيئَتِي وَجَهْلِي وَإِسْرَافِي فِي أَمْرِي وَمَا أَنْتَ أَعْلَمُ بِهِ مِنِّي اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي جِدِّي وَهَزْلِي وَخَطَئِي وَعَمْدِي وَكُلُّ ذَلِكَ عِنْدِي اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي مَا قَدَّمْتُ وَمَا أَخَرْتُ وَمَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ وَمَا أَنْتَ أَعْلَمُ بِهِ مِنِّي أَنْتَ الْمُقَدِّمُ وَأَنْتَ الْمُؤَخِّرُ وَأَنْتَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ .
'হে আল্লাহ! আপনি আমার পাপ, আমার অজ্ঞতা ও আমার কাজের সীমালঙ্ঘনকে মার্জনা করে দিন। আপনি এ বিষয়ে আমার চেয়ে সর্বাধিক জ্ঞাত। হে আল্লাহ! আমাকে মাফ করে দিন আমার আন্তরিকতাপূর্ণ ও রসিকতামূলক অপরাধ এবং আমার ইচ্ছাকৃত ও ভুলক্রমে সব রকমের অপরাধগুলো। হে আল্লাহ! মাফ করে দিন যা আমি আগে করে ফেলেছি এবং যা আমি পরে করব। যা আমি গোপনে করেছি এবং যা প্রকাশ্যে করেছি। আর আপনি আমার চাইতে আমার সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত। আপনিই একমাত্র অগ্রবর্তী এবং আপনিই একমাত্র পরবর্তী। আপনি সব বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান।'⁴⁰
প্রিয় ভাই! বাড়িতে-সফরে, একাকী-বৈঠকে যেখানেই থাকুন, তাওবা-ইস্তেগফার দ্বারা নিজ জিহ্বাকে সিক্ত রাখুন। প্রদীপের মিটিমিটি আলোর মতো আল্লাহর স্মরণ প্রজ্বলিত রাখুন হৃদয়গহনে। যদি আপনার আমল এমন হয়ে থাকে, তাহলে আপনি আখেরাতের সফলতার পথপানে এগিয়ে চলছেন। হযরত আবু মুসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَا أَصْبَحْتُ غَدَاةً قَطُّ إِلا اسْتَغْفَرْتُ اللهَ فِيهَا مِائَةَ مَرَّةً
'আমি এমন কোনো সকাল যাপন করি না, যাতে একশবার ইস্তেগফার নেই।'৪১
এই হাদিসে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা উম্মতের হিদায়াতের চিন্তায় সদা অস্থির থাকতেন। দাওয়াত, জিহাদ এবং দ্বীনের নানাবিধ কাজের ব্যস্ততায় সর্বদা ব্যস্ত থাকতেন। তা সত্ত্বেও আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনার জন্য পৃথক সময় নির্ধারণ করেছেন। নবীজির এই শিক্ষা আমাদের জীবনে দৃঢ়ভাবে বাস্তবায়ন করা আবশ্যিক কর্তব্য।
প্রিয় ভাই ও বোন! কত মানুষ জীবনের সংকীর্ণতা, দুর্যোগের ঘনঘটা ও বিপদের দুর্বিপাকে রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এসব মুসিবত থেকে মুক্তির জন্য মানুষ দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছে। খেই হারিয়ে সেবন করছে ভুল প্রতিষেধক। মদ পান, প্রবৃত্তি ও বাসনার পূজা, গণকের দ্বারস্থ হওয়া ইত্যকার আঁধার পথে খুঁজছে আলোর দিশা। এই পথে তাদের সমস্যার সমাধান নেই আদৌ। সঠিক পথ ছেড়ে অযথাই ভুল পথে সমাধান খুঁজে ফিরছে তারা। মূলত তাদের জন্য প্রয়োজন ইস্তেগফারের মহৌষধ।
ডক্টর হুসাইন শারাফা সুনানুল্লাহি ফি ইহয়াইল উমাম গ্রন্থে বলেন, তাওবা ও ইস্তেগফার মানুষকে সভ্যতার পথে নিয়ে যায়। সভ্যতার প্রাসাদ নির্মাণে সর্বপ্রথম তাওবা ও ইস্তেগফারের ইট স্থাপনের বিকল্প নেই। স্বচ্ছ ও খাঁটি হৃদয়ে ইবাদত করার জন্য এটিই প্রথম শর্ত। এরই মাঝে রয়েছে উম্মাহর মহাসফলতা। কুরআন-হাদিসের বিভিন্ন ভাষ্যে তাওবা-ইস্তেগফারের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ও ফলাফল বর্ণিত হয়েছে। প্রশান্তিময় জীবন, আকাশ থেকে ঝরে পড়া রিমঝিম বৃষ্টি, চোখজুড়ানো সবুজ বাগিচা, সন্তান ও সম্পদের প্রাচুর্য-এই আমলের পুরস্কারস্বরূপ আল্লাহ তায়ালা উল্লিখিত নেয়ামত প্রদানের অঙ্গীকার করেছেন। আল্লাহর অঙ্গীকারের কখনো ব্যত্যয় ঘটে না।
তাহলে আর দেরি নয়, পূর্বের গন্তব্য ছেড়ে ফিরে আসুন মুক্তির নতুন মোহনায়। আল্লাহর আদেশের ছায়াতলে আশ্রয় নিন পরম নির্ভরতায়। অন্তরের সুস্থতার জন্য সন্তুষ্টির রজ্জু দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরুন। গুনাহ ও অবাধ্যতার আঁধার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন।
ইমাম কাতাদা রহ. বলেন, 'কুরআন তোমাদের রোগ ও প্রতিষেধক উভয়টি বলে দিয়েছে। সমস্ত গোনাহ হলো রোগ-সমতুল্য। আর ইস্তেগফার হলো সেই রোগের প্রতিষেধক।'
হযরত আলি ইবনে আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'ধ্বংসের কিনারে দাঁড়ানো সেই ব্যক্তিটির ওপর আমি আশ্চর্যবোধ করি, মুক্তির রসদ থাকা সত্ত্বেও যে নিশ্চল রয়েছে! জিজ্ঞেস করা হলো, মুক্তির রসদ কী? তিনি উত্তরে বললেন, ইস্তেগফার।
তিনি আরও বলেন, আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে ক্ষমা করার জন্য বান্দার অন্তরে ইস্তেগফারের অনুভূতি সৃষ্টি করে দেন।'
এক নেককার ব্যক্তি বলেছেন, 'গুনাহ এবং নেয়ামত, মানুষের জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে দুটো বিষয়। গুনাহের পর ইস্তেগফার এবং নেয়ামত ভোগের পর আল্লাহর প্রশংসা আদায় করলে সুন্দর ফলাফল অর্জিত হয়।'
হযরত লোকমান আলাইহিস সালাম তার ছেলেকে উপদেশ দিয়েছিলেন, ওহে পুত্র! আল্লাহ তায়ালা এমন কিছু সময় রেখেছেন যে সময়গুলোতে দোয়া বৃথা যায় না। সুতরাং বেশি বেশি ইস্তেগফার পাঠ করো।'
হযরত বকর ইবনু আব্দিল্লাহ মুযানি বলেন, তোমরা খুব বেশি গুনাহে লিপ্ত হয়ে যাও, এজন্য বেশি বেশি ইস্তেগফার পাঠ করো। হিসাবের দিন মানুষ তার আমলনামার প্রতি দুই লাইনের মাঝে যখন ইস্তেগফার দেখতে পাবে, তখন সে আনন্দে উদ্বেলিত হবে।'
ইমাম হাসান বসরি রহ. বলেন, 'তোমরা ঘরে-বাইরে, পথে-বাজারে, মজলিসে যেখানেই থাকো বেশি বেশি ইস্তেগফার পড়ো। তোমরা জানো না কোন সময় আল্লাহ তায়ালা ক্ষমার শীতল বৃষ্টি নাজিল করবেন।'
একজন নেককার ব্যক্তি বলেন, চারটি জিনিস রিজিক বৃদ্ধি করে। ক. রাত্রির নামাজ। খ. ভোরবেলা অধিক পরিমাণে ইস্তেগফার করা। গ. দান-সদকা ঘ. দিনের প্রথম এবং শেষ ভাগে আল্লাহর স্মরণ।
জাফর ইবনে মুহাম্মাদ সুফিয়ান সাওরিকে বলেন, যখন তুমি খুব বেশি চিন্তিত থাকো, তখন বেশি বেশি لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ الْعَلِيِّ الْعَظِيمِ 'লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা-বিল্লাহিল আলিইয়িল আযিম' পাঠ করো। যখন তোমার ওপর নেয়ামতের প্রাচুর্য কামনা করো, তখন অধিক পরিমাণে الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ 'আল-হামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন' পড়তে থাকো। আর যখন রিজিকের স্বল্পতা অনুভব করো, তখন বেশি বেশি ইস্তেগফার পড়ো।'
আবু বকর আল-মুযানি রহ. বলেন, আমি শীর্ণকায় এক ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করে কিছু উপদেশ কামনা করলাম। তিনি বললেন, তোমাকে কী বলা উচিত আমি ভেবে পাচ্ছি না। মানুষের জন্য উচিত হলো হামদ এবং ইস্তেগফার পাঠে অলসতা করবে না। মানুষের মাঝে দুইটি বিষয় রয়েছে। গুনাহ এবং নেয়ামত। আল্লাহর প্রশংসা এবং কৃতজ্ঞতা আদায় ব্যতীত নেয়ামত ভোগ করা যথার্থ হবে না। অনুরূপভাবে গুনাহের পর তাওবা-ইস্তেগফার ছাড়া তা মোচন হবে না। তখন মুযানি রাহিমাহুল্লাহ বললেন, আপনার এই কথাগুলো দ্বারা আমার ইলম সমৃদ্ধ হয়েছে।
হে প্রিয় ভাই ও বোন! আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ব্যতীত আপনার অন্তর সৌভাগ্য ও সফলতার রাজপথ খুঁজে পাবে না কখনো। জীবন নিক্ষিপ্ত হবে লাঞ্ছনা ও দরিদ্রতার ভাগাড়ে। জীবনের খাতায় সৌভাগ্যের রশ্মি স্পর্শ করতে আল্লাহর স্মরণের বিকল্প নেই। পৃথিবীর তুচ্ছ ভোগবিলাস অচিরেই বিলীন হবে। যদি জীবন রহমানের পথে পরিচালিত না হয়, তাহলে কিয়ামতের দিন পরম শখের জিনিসগুলোই আপনার লজ্জা ও অপদস্থতার কারণ হবে। জীবনের প্রকৃত শান্তি, নিরাপত্তা এবং অন্তরের স্থিতিশীলতার জন্য খাঁটি অন্তঃকরণ নিয়ে আল্লাহর আনুগত্যের চৌকাঠ আঁকড়ে ধরার এখনই সময়। সুতরাং নির্ভেজাল ঈমান নিয়ে দিনরাত্রির প্রতিটি মুহূর্ত ইস্তেগফারের সুরভিত ঘ্রাণে মোহিত করে রাখুন।
ফরজ বিধানাবলি ও অন্যান্য সব ইবাদতে প্রতিযোগিতার ময়দানে অবতীর্ণ হন। ইনশাআল্লাহ জীবনের পরতে পরতে নেমে আসবে সুখদ শান্তির ফল্গুধারা। আসমান-জমিনের বরকতে সিক্ত হবে হৃদয়ের উষ্ণ প্রান্তর। নেয়ামত ও কল্যাণের রাশি রাশি চিত্র ভেসে উঠবে বাস্তবতার আয়নায়। আল্লাহ তায়ালা ঠিক এ কথাটিই বলে দিয়েছেন পবিত্র কুরআনে এভাবে,
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
'মুমিন পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকর্ম করবে তাকে আমি নিশ্চয়ই পবিত্র জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব।'⁴²
তাফসিরে মুয়াসসারে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, আল্লাহ এবং রাসুলের প্রতি বিশ্বাসী ঈমানদার নারী বা পুরুষের যে কেউ সৎকর্ম করুক, সম্পদের প্রাচুর্যতা না থাকলেও আমি তাকে নিশ্চিন্ত, স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন দান করব। দুনিয়াতে যে পরিমাণ আমল করেছে, আখেরাতে এর চেয়ে উত্তম বিনিময় দান করব। ইরশাদ হয়েছে,
وَأَن لَّوِ اسْتَقَامُوا عَلَى الطَّرِيقَةِ لَأَسْقَيْنَاهُم مَّاءً غَدَقًا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ وَمَن يُعْرِضْ عَن ذِكْرِ رَبِّهِ يَسْلُكْهُ عَذَابًا صَعَدًا
'তারা যদি সত্য পথে প্রতিষ্ঠিত থাকত তাদেরকে আমি প্রচুর বারি বর্ষণের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করতাম, এর দ্বারা আমি তাদেরকে পরীক্ষা করতাম। যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের স্মরণ হতে বিমুখ হয় তিনি তাকে দুঃসহ শাস্তিতে প্রবেশ করাবেন।'⁴³
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরে মুয়াসসারে উল্লেখ করা হয়েছে, জিন এবং মানুষ যদি সকলেই ইসলামের পথে ফিরে আসে, তাদের ওপর আমি মুষলধারে কল্যাণকর বারি বর্ষণ করব। রিজিকের প্রাচুর্যতায় সজ্জিত করব দুনিয়ার জীবন। আমি তাদেরকে পরীক্ষা করব, নেয়ামত ভোগ করে তারা কেমন কৃতজ্ঞ? আর যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য, কুরআন শ্রবণ, অনুধাবন ও তদনুযায়ী আমল থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে, সে প্রবিষ্ট হবে মর্মন্তুদ লেলিহান আগুনে।
ইমাম হাসান বসরি রহ. বলেন, 'মানুষ যদি আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকে, আল্লাহ তাদেরকে সম্পদের প্রাচুর্যতা দান করবেন। আল্লাহর কসম করে বলি, সাহাবায়ে কেরাম এই গুণের অধিকারী ছিলেন। ফলশ্রুতিতে আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য রোম-পারস্যের ধন-ভান্ডারের দ্বার খুলে দিয়েছিলেন।' ⁴⁴
আমরা আল্লাহ তায়ালার নেয়ামতের সরোবরে ডুবে আছি। এই নেয়ামতপ্রাপ্তি আমাদের নিজেদের অর্জন নয়, আমাদের প্রতি এবং আমাদের ভূখণ্ডের প্রতি আল্লাহ তায়ালার অপার অনুগ্রহের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। তাই আমাদের জন্য উচিত হলো, আনুগত্যের জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করা এবং নেয়ামতগুলোকে তাঁর কৃতজ্ঞতার মোড়কে সজ্জিত করা। নেয়ামত ভোগ করে যদি গুনাহ ও কৃতজ্ঞতার লাগাম আঁকড়ে থাকি, তাহলে আজ হোক বা কাল নেয়ামত বিলুপ্ত হবে।
কবি কতই-না সুন্দর বলেছেন, 'যখন ডুবে আছ নেয়ামতের প্রাচুর্যতায়, তা আঁকড়ে রাখো। কেননা, গুনাহ নেয়ামত দূরীভূত করে দেয়।
আল্লাহর কৃতজ্ঞতায় ডুবে থাকো অহর্নিশ। নিশ্চয়ই তিনি দ্রুত শাস্তি প্রদানকারী।'

টিকাঃ
১৬ সুরা মুতাফফিফিন: ২৬
১৭ সুরা মুমিনুন: ৯৯,১০০
১৮ মুসলিম শরিফ: ২৮২২
১৯ সুরা কাহফ: ২৮
২০ সুরা ফুরকান: ৭০-৭১
২১ সুরা আরাফ: ৯৬
২২ সুরা হুদ: ৩
২৩ সুরা নুহ: ১০-১২
২৪ সুরা আনফাল: ৩৩
২৫ আবু দাউদ: ১৫১৮
২৬ সুরা শুরা: ৩০
২৭ সুরা নিসা: ১২৩
২৮ সুরা রুম: ৪১
২৯ মুসনাদে আহমাদ: ৫৬৬৭
৩০ ইবনে মাজাহ: ৩৮১৮
৩১ ইমাম বাইহাকি, শুআবুল ঈমান: ৬৪৮
৩২ সুরা আরাফ: ২৩
৩৩ সুরা কাসাস: ১৬
৩৪ সুরা সোয়াদ: ২৪
৩৫ হযরত দাউদ আলাইহিস সালামের ইবাদতখানায় হঠাৎ দুই ব্যক্তি প্রবেশ করল। তিনি ক্রুদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে ধৈর্যধারণ করলেন। তিনি সর্বদা ন্যায়বিচার করতেন। আগত দুই ব্যক্তির বিচারে অত্যাচারীকে কিছু না বলে অত্যাচারিতকে সম্বোধন করায় হয়তো-বা কিছুটা পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করা হয়েছে মনে করে দাউদ আলাইহিস সালাম আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছেন।
৩৬ সুরা সোয়াদ: ৩৫
৩৭ সুরা নুহ: ২৮
৩৮ সহিহ বুখারি: ৬৩০৭
৩৯ সহিহ মুসলিম: ১২২১
৪০ সহিহ মুসলিম: ৬৭৯৪।
৪১ আস-সুনানুল কুবর: ১০২৭৫। তাবারানি।
৪২ সুরা নাহল: ৯৭
৪৩ সুরা জিন: ১৬-১৭
৪৪ আদ্দুররুল মানসুর: ৮/৩০৫

📘 আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালবাসেন > 📄 তুমিই শত্রু তোমার

📄 তুমিই শত্রু তোমার


হে প্রিয় ভাই ও বোন আমার! আমরা যখন আল্লাহর আনুগত্যকে অবাধ্যতার চাদর দিয়ে ঢেকে ফেলি, তখন আল্লাহ তায়ালা আমাদের সুসময়কে দুঃসময়ে পরিণত করে দেন। আমাদের নেয়ামত ও বরকতের আলোকোজ্জ্বল আকাশে দুর্ভাগ্যের কালো মেঘ ভেসে বেড়ানোর জন্য মূলত আমরাই দায়ী। ইরশাদ হয়েছে,
ذَلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ لَمْ يَكُ مُغَيْرًا نِعْمَةً أَنْعَمَهَا عَلَى قَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ وَأَنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ كَدَأْبِ آلِ لا ج فِرْعَوْنَ وَالَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ كَذَّبُوا بِآيَاتِ رَبِّهِمْ فَأَهْلَكْنَاهُم بِذُنُوبِهِمْ وَأَغْرَقْنَا آلَ فِرْعَوْنَ وَكُلُّ كَانُوا ظَالِمِينَ
'আর তা এজন্য যে, যদি কোনো সম্প্রদায় নিজের অবস্থার পরিবর্তন না করে তবে আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তাদেরকে যে সম্পদ দান করেছেন, তা পরিবর্তন করবেন; এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। ফিরাউনের স্বজন ও তাদের পূর্ববর্তীদের অভ্যাসের ন্যায় তারা তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনকে অস্বীকার করে। তাদের পাপের জন্য আমি তাদেরকে ধ্বংস করেছি এবং ফিরাউনের স্বজনকে নিমজ্জিত করেছি এবং তারা সকলেই ছিল জালিম।'⁴⁵
আল্লামা ইবনে কাসির রহ. বলেন, এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তার সুবিচার, ন্যায়পরায়ণতা এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ ফয়সালার ঘোষণা দিয়েছেন। অবাধ্যতায় লিপ্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা কারও প্রাচুর্যময় জীবনের ইতি ঘটান না।' যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
لَهُ مُعَقِّبَاتٌ مِّن بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ يَحْفَظُونَهُ مِنْ أَمْرٍ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِقَوْمٍ سُوءًا فَلَا مَرَدَّ لَهُ وَمَا لَهُم مِّن دُونِهِ مِن وَال
'মানুষের জন্য তার সম্মুখে ও পেছনে একের পর এক প্রহরী থাকে; তারা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজ অবস্থা নিজে পরিবর্তন করে। কোনো সম্প্রদায় সম্পর্কে যদি আল্লাহ অশুভ কিছুর ইচ্ছা করেন তবে তা রদ হবার নয় এবং তিনি ব্যতীত তাদের কোনো অভিভাবক নেই।'⁴⁶
আল্লাহর অবাধ্যতার ফলে সুসময় দুঃসময়ে পরিণত হয়। সফলতা পরিণত হয় ব্যর্থতায়। এর জ্বলন্ত উদাহরণ হলো ফিরাউন এবং অন্যান্য অবাধ্য সম্প্রদায়গুলো। তারা যখন আল্লাহর নিদর্শনাবলিকে মিথ্যারোপ করেছে তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের থেকে নেয়ামত কেড়ে নিয়ে তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। সুতরাং বোঝা গেল, আল্লাহ তায়ালা কারও ওপর জুলুম করেন না। ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নিজেদের প্রতি নিজেরাই জুলুম করে।
আপনি ও সকল ব্যক্তিদের মতো হবেন না, যারা শুধু মুখে ইস্তেগফারের কথা বলে, কিন্তু তাদের অন্তর ও কাজকর্ম গুনাহের কাজে অটল থাকে। নিশ্চয় এটা মিথ্যাবাদীদের তাওবা এবং নাউজুবিল্লাহ আল্লাহর সাথে তামাশার ন্যায়। প্রখ্যাত আবেদ ফুজাইল ইবনু আয়াজ রহ. বলেন, 'মুখে ইস্তেগফার জপে বাস্তবে গুনাহের কাজ পরিত্যাগ না করা মিথ্যাবাদী ব্যক্তিদের তাওবা।' অপর কেউ একজন আরও চমৎকারভাবে বলেছেন, 'গুনাহ পরিত্যাগ করার সংকল্প ব্যতীত আমরা যে ইস্তেগফার পাঠ করি, এই ইস্তেগফার পাঠ করাও আমাদের জন্য গুনাহের কারণ। এই গুনাহ থেকে পরিত্রাণের জন্য পুনরায় ইস্তেগফার পাঠ করা প্রয়োজন।'
এই কথার উদাহরণ ওই সকল ব্যক্তিদের জীবনে জাজ্বল্যমান রয়েছে, যারা মুখে ইস্তেগফার পাঠ করতে থাকে, অপরদিকে বিদআত, মদপান, সুদ, নির্লজ্জতা, ব্যভিচার, ব্যবসায় প্রতারণা, ধোঁকাবাজিসহ নানাবিধ গুনাহের কাজে লিপ্ত রয়েছে।
কিন্তু প্রকৃত তাওবা হলো, কথা ও কাজকর্মসহ জীবনের সব ক্ষেত্র থেকে গুনাহের মূল উপড়ে ফেলে নেক কাজের মাধ্যমে জান্নাতের পথে অগ্রসর হওয়া। পাশাপাশি বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করা। বস্তুত এই দুনিয়া তো পরীক্ষারই স্থান।
ইস্তেগফারের পূর্বে নিয়ত পরিশুদ্ধ করে নেওয়া জরুরি। ইস্তেগফার আদায়কারীর নিয়ত, অন্তরের সার্বিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে আল্লাহ তায়ালা তার ফলাফল দান করেন। জেনে বুঝে এবং অর্থ অনুধাবন করে যখন কোনো ব্যক্তি ইস্তেগফার পাঠ করে তখন এর কার্যকারিতা জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। চিন্তাশীল এক ব্যক্তি বলেন, 'আল্লাহকে সব সময় স্মরণ করো। তিনি তোমাকে রক্ষণাবেক্ষণ করবেন।'
আল্লাহ তায়ালা কখনো অঙ্গীকারের ব্যত্যয় ঘটান না। তার কথা সামান্যতম হেরফের হয় না কখনো। আল্লাহর কিছু ফয়সালা আমাদের বাহ্যিক দৃষ্টিতে বিপরীত মনে হয়, কিন্তু এতে গূঢ় রহস্য নিহিত রয়েছে। আমাদের দুর্বল অন্তঃকরণে তা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। ইস্তেগফার দোয়ার মতো একটি আমল। এই আমলের দ্বারা কখনো কাঙ্ক্ষিত বস্তু অর্জিত হয়। কখনো কোনো ইচ্ছা ছাড়াই নেমে আসে জীবনের সাধ। আবার কখনো ইস্তেগফারের বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা কঠিন বিপদ থেকে রক্ষা করেন। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেকের আমলনামায় রক্ষিত ইস্তেগফারের প্রতিদান দান করবেন।
এখানে একটি কথা বলে রাখা জরুরি, দুনিয়ার সকল কাজকর্ম ছেড়ে শুধু তাওবা-ইস্তেগফারের ওপর ভরসা করে বসে থাকবে না। বরং আমলের সাথে সাথে রিজিকের জন্য প্রচেষ্টা চালু রাখতে হবে। বিষয়টি জাগ্রত অবস্থায় স্বপ্ন দেখার মতো। আকাশ থেকে যেমন স্বর্ণ-রুপার বৃষ্টি বর্ষণ হয় না, তেমনই প্রচেষ্টা ব্যতীত রিজিক আপনার দুয়ারে আসবে না। অনেকেই বিষয়টি না বুঝে রিজিকের জন্য ফিকির না করে তাওবা-ইস্তেগফারের ওপর নির্ভর করে থাকে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ ذَلُولًا فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِن رِزْقِهِ وَإِلَيْهِ النُّشُورُ
'তিনি তো তোমাদের জন্য ভূমিকে সুগম করে দিয়েছেন; অতএব তোমরা এর দিগ-দিগন্তে বিচরণ করো এবং আল্লাহপ্রদত্ত জীবনোপকরণ হতে আহার্য গ্রহণ করো, পুনরুত্থান তো তাঁরই নিকট।'৪৭
আল্লাহ তায়ালা উক্ত আয়াতে স্পষ্টতই বলে দিয়েছেন, হালাল রিজিক অন্বেষণে তোমরা পৃথিবীর পথে-ঘাটে ছড়িয়ে পড়ো। রিজিক অন্বেষণের ব্যস্ততায় তোমরা তাওবা-ইস্তেগফারকে ভুলে যেয়ো না। অন্বেষণ এবং ইস্তেগফারের সমন্বয় ঘটলে জীবনে বরকতের হিল্লোল প্রবাহিত হবে। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রিজিক অন্বেষণে অধিকতর উৎসাহ প্রদান করেছেন। নিষেধ করেছেন মানুষের প্রতি হাত প্রসারিত করতে। হযরত যুবাইর ইবনুল আওয়াম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
لأَنْ يَأْخُذَ أَحَدُكُمْ حَبْلَهُ فَيَأْتِيَ بِحُزْمَةِ الْخَطَبِ عَلَى ظَهْرِهِ فَيَبِيعَهَا فَيَكُفَّ اللَّهُ بِهَا وَجْهَهُ، خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَسْأَلَ النَّاسَ أَعْطَوْهُ أَوْ مَنَعُوهُ
'তোমাদের মধ্যে কেউ রশি নিয়ে তার পিঠে কাঠের বোঝা বহন ও তা বিক্রি করা উত্তম। আল্লাহ তার চেহারাকে ভিক্ষা করার লাঞ্ছনা থেকে রক্ষা করেন। তা মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে অধিকতর উত্তম; চাই লোকেরা দিক বা না দিক।'⁴⁸
রিজিক অন্বেষণের সময় যখন অন্তরে ইস্তেগফার থাকবে, তখন সহজ ও সাবলীলভাবে আল্লাহ তায়ালা জীবন ধারণের ব্যবস্থা করবেন। কারণ, তখন দুনিয়াবি চেষ্টার সাথে আল্লাহর সাহায্যের সংমিশ্রণ ঘটে। আর তিনি তো সবকিছুর একচ্ছত্র মালিক। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল সম্বন্ধে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
لَوْ أَنَّكُمْ كُنتُمْ تَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ لَرُزِقْتُمْ كَمَا تُرْزَقُ الطَّيْرُ تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا
'তোমরা যদি প্রকৃতভাবেই আল্লাহ তায়ালার ওপর নির্ভরশীল হতে তাহলে পাখিদের যেভাবে রিজিক দেওয়া হয় সেভাবে তোমাদেরকেও রিজিক দেওয়া হতো। এরা সকালবেলা খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যাবেলায় ভরা পেটে ফিরে আসে।' ⁴⁹
যদি আমরা পাখিদের মতো আল্লাহর ওপর ভরসা এবং চেষ্টা করি, পাখিগুলো যেভাবে প্রত্যুষে উঠে রিজিকের তালাশে মাইলের পর মাইল অতিক্রম করে, ডালে ডালে খুঁজে ফিরে কাঙ্ক্ষিত খাদ্যকনা। আমাদের এরকম প্রচেষ্টা থাকলে আল্লাহ তায়ালা আমাদের রিজিক সহজ করে প্রভূত কল্যাণ দান করবেন।

টিকাঃ
৪৫ সুরা আনফাল: ৫৩,৫৪
৪৬ সুরা রাদ: ১১
৪৭ সুরা মুলক: ১৫
৪৮ বুখারি শরিফ: ১৪৭১
৪৯ সুনানে তিরমিজি: ২৩৪৪

📘 আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালবাসেন > 📄 ফিতনা ও প্রলুব্ধি : মুক্তির উপায়

📄 ফিতনা ও প্রলুব্ধি : মুক্তির উপায়


মুসলমান নর-নারী পার্থিব জীবনের ফিতনা ও প্রলুব্ধির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। গুনাহের পথ ছেড়ে সত্যের পথে ফিরে না আসলে অচিরেই মহাবিপদের সম্মুখীন হবে। যেমন, ইন্টারনেট আধুনিক একটি আবিষ্কার। কতক মানুষ ইন্টারনেটকে ব্যবহার করে কল্যাণকর কাজে। এর দ্বারা উপকারী জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং পার্থিব উৎকর্ষতার শীর্ষে আরোহণ করে। অপরদিকে কতক মানুষ এমন রয়েছে যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে জীবন বিধ্বংসী কাজে লিপ্ত রয়েছে। তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে চোখের গুনাহ, সময়ের অপচয়, ইবাদতে অবহেলা করে পৌঁছে গেছে খাদের কিনারে। সুতরাং নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া বা নিরাপদে রাখা আপনার কাছে উভয়টির সুযোগ রয়েছে। চিরস্থায়ী শান্তির জন্য সঠিক পথ বেছে নিন।
মানবজীবনে দুনিয়ার ক্ষেত্রে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ভয়ানক ব্যাধি। এর ফলে সঠিক পথ পাবার পরও কত যুবক ধ্বংসের পথ বেছে নেয়! কত লোককে বিচ্ছিন্ন করে পরিবারের চোখজুড়ানো মায়াবী বন্ধন থেকে! দুনিয়ার আকাঙ্ক্ষার ধোঁকার জালে আবদ্ধ হয়ে অসংখ্য মানুষ কামনা-বাসনার পানপাত্র থেকে ঢোক ঢোক করে পান করে বিপথগামিতার নীল জল। আল্লাহর কাছে এমন মুসিবত থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। হযরত জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
يُبْعَثُ كُلُّ عبدٍ على ما مات عليه
'প্রত্যেক মানুষকে কিয়ামতের দিন ঠিক ওই অবস্থায় উত্থিত করা হবে যে অবস্থায় সে মারা গেছে।'⁵⁰
মন্দ কাজে লিপ্ত ব্যক্তিরা অচিরেই তাদের পরিণাম দেখতে পাবে। কবর থেকে উঠতে উঠতে দুনিয়ার জীবনের গুনাহের দৃশ্যগুলো একে একে ভেসে উঠবে তাদের সামনে। মানুষের শেষ জীবনের দিনগুলো নিঃসীম অন্ধকারে পথ চলার মতো ঝুঁকিপূর্ণ। টলটলায়মান দুর্বল ঈমানের মানুষজন এই পরীক্ষায় দিশেহারা হয়ে পড়ে। শয়তানের ধোঁকায় পড়ে সকালের ঈমানদার ব্যক্তিটি বিকেলে ঈমানের দৌলত হারিয়ে কুফুরি গ্রহণ করে, কখনো সন্ধ্যায় ঈমানদার ব্যক্তিটি সকালে কুফুরি গ্রহণ করে। আফসোস, দুনিয়ার সামান্য লোভের পেছনে পড়ে মানুষ এভাবেই নিজের আখেরাত ধ্বংস করে।
প্রিয় ভাই ও বোন! ঈমান বিধ্বংসী এসব মহামারি থেকে বেঁচে থাকার উপায় হলো কুরআন এবং সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা এবং জীবনে বাস্তবায়ন করা। দ্বীনকে গভীরভাবে অনুধাবন করে দোয়া, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির এবং অন্যান্য ইবাদতের মাধ্যমে অন্তরকে কলুষমুক্ত রাখা। সর্বোপরি দ্বীনের ওপর দৃঢ়তার জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করা। মহান মালিক ইরশাদ করেন,
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ
'আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্বন্ধে আপনাকে প্রশ্ন করে, আমি তো নিকটেই। প্রার্থনাকারী যখন আমার নিকট প্রার্থনা করে আমি তার প্রার্থনায় সাড়া দিই। সুতরাং তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক। এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক, যাতে তারা সঠিক পথে চলতে পারে।' ৫১
হযরত উবাদা ইবনে সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
مَا عَلَى الْأَرْضِ مُسْلِمٌ يَدْعُو اللَّهَ بِدَعْوَةٍ إِلَّا آتَاهُ اللَّهُ إِيَّاهَا أَوْ صَرَفَ عَنْهُ مِنَ السُّوءِ مِثْلَهَا مَا لَمْ يَدْعُ بِمَأْثَمٍ أَوْ قَطِيعَةِ رَحِمٍ " . فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ إِذَا نُكْثِرَ . قَالَ " اللَّهُ أَكْثَرُ
'পৃথিবীতে এমন কোনো মুসলমান নেই যার দোয়া আল্লাহ তায়ালা কবুল করেন না অথবা তার থেকে এই পরিমাণ ক্ষতি সরিয়ে দেন, যতক্ষণ না সে গোনাহে জড়িত হওয়ার জন্য অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দোয়া করে। সমবেত ব্যক্তিদের একজন বলল, তাহলে আমরা বেশি বেশি দোয়া করব। তিনি বললেন, আল্লাহ তায়ালা এরও বেশি কবুলকারী।' ৫২
হকের ওপর অটল অবিচল থাকার জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো, সর্বদা আল্লাহর কাছে ঈমানের ওপর অবিচল থাকার দোয়া করা।
اللهم يا مقلب القلوب ثبت قلوبنا على دين؛ اللهم يا مصرف القلوب والابصار صرف قلوبنا الى طاعتك ومرضاتك
'হে অন্তর পরিবর্তনকারী আল্লাহ! আপনি আমাদের অন্তরকে দ্বীনের ওপর অবিচল রাখুন। হে অন্তর এবং অন্তর্দৃষ্টি পরিবর্তনকারী আল্লাহ! আপনি আমাদের অন্তরকে আপনার আনুগত্য এবং সন্তুষ্টির প্রতি ধাবিত করে দিন।'
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
'হে আমাদের প্রতিপালক! পথপ্রদর্শন করার পর আপনি আমাদের অন্তরকে বিপথগামী করবেন না। আপনার নিকট থেকে আমাদের করুনা প্রদান করুন। নিশ্চয় আপনি নিজেই পরম বদান্য।' ৫৩
শরিয়ত অসমর্থিত বিষয় ও পাপাচার পরিত্যাগ করার আরও একটা সহযোগী মাধ্যম হলো নামাযের প্রতি যত্নশীল হওয়া। তার সমস্ত অনুষঙ্গ তথা ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ইত্যাদি যথাযথভাবে আদায় করা। অন্তরকে অশ্লীলতা ও পাপাচার থেকে বিরত রাখতে এর কার্যকরী ভূমিকা রয়েছে।
প্রিয় ভাই ও বোন! নামাজের সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন? আপনি কি নামাজের প্রতি যত্নশীল? তা আদায়ের জন্য যথেষ্ট আগ্রহী? আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَأَقِمِ الصَّلَاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ 'এবং নামাজ কায়েম করো। নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।' ৫৪
যে ব্যক্তি নামাজ আদায় করে কিন্তু কৃত নামাজ তাকে গুনাহ থেকে বিরত রাখতে পারে না, তাহলে তার আত্মসমালোচনা করা উচিত। নিজের দিকে গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করতে হবে। অনেক সময় এমন হয় যে, নামাজের অন্তর্গত মোনাজাত ও দোয়াগুলো বিড়বিড় করে পড়ছে ঠিকই, কিন্তু তার মন পার্থিব বিভিন্ন চিন্তায় ঘুরপাক খায়। ব্যাবসা-বাণিজ্য খেলাধুলা কিংবা দুনিয়ার কোনো চাকচিক্যে ঘোরাফেরা করতে থাকে। আরও ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, অনেকে নামাজের মধ্যে অশ্লীলতা ও পাপাচারের গভীর কল্পনায় ডুবে যায়! প্রিয় ভাই ও বোন! এবার আপনিই বলুন, এই নামাজ কী করে আপনাকে গুনাহ থেকে বিরত রাখবে?
গুনাহ ও পাপাচার থেকে দূরে থাকার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো, কুরআন তিলাওয়াত করা। কিন্তু অত্যন্ত আফসোসের কথা হলো, অনেক মুসলিম নর-নারী আজ তা পরিত্যাগ করেছে। অনেকে বছরে মাত্র একবার কুরআন খতম করে! অনেকে আবার কুরআনকে গিলাফাচ্ছাদিত করে আলমারির ভেতর রেখে দেয়, তার দীর্ঘ অমনোযোগিতার ফলে তা ধূলোয় ধূসরিত হয়ে যায়। আল্লাহ সহায়!
কুরআন তিলাওয়াত অন্তরকে পবিত্র ও স্বচ্ছ করে। কুরআনের মাধ্যমে মুসলমান নর-নারীর ওপর আল্লাহ তায়ালা হিদায়াত এবং রহমতের বারি বর্ষণ করেন। কুরআনের সাথে পথচলা এমন লাভজনক ব্যবসা; যে ব্যবসায় ইহকাল-পরকাল কোথাও ক্ষতির কোনো আশঙ্কা নেই। দুনিয়ায় এর দ্বারা আত্মিক প্রশান্তি ও সমৃদ্ধি, ঈমান বৃদ্ধি ও বিপদমুক্তি অর্জন করা যায়। আর আখেরাতে অপেক্ষা করছে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি, তার অসীম অনুগ্রহ এবং চিরসুখের জান্নাত। আমরা আল্লাহর কাছে জান্নাত কামনা করি। যে সমস্ত আমল ও কথা দ্বারা তার নিকটবর্তী হওয়া যায়, তার সক্ষমতা প্রার্থনা করি। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَنفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً يَرْجُونَ تِجَارَةً لَّن تَبُورَ 'যারা আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি যা দিয়েছি তা থেকে প্রকাশ্যে ও গোপনে খরচ করে-তারা এমন ব্যবসা করছে, যা কখনো লোকসান হয় না।'৫৫
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَتْكُم مَّوْعِظَةٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَشِفَاءُ لمَا فِي الصُّدُورِ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ 'হে মানবজাতি! তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে মুসলমানদের জন্য হিতোপদেশ, অন্তরের নিরাময়, হিদায়াত এবং রহমত আগমন করেছে।'৫৬
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ وَلَا يَزِيدُ الظَّالِمِينَ إِلَّا خَسَارًا 'আমি কুরআন অবতীর্ণ করি, যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমতস্বরূপ; কিন্তু তা জালেমদের অধঃপতনই বৃদ্ধি করে।'৫৭
নবি সুন্নাহ আমাদের কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। জীবন্ত অন্তরগুলোকে তা শিক্ষা করা ও শিক্ষা দানে শ্রম ব্যয় করার নির্দেশ দিয়েছে। আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا لَا أَقُولُ {ألم} حَرْفٌ وَلَكِنْ أَلِفْ حَرْفٌ وَلَامٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ
'যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পড়বে, সে একটি নেকি পাবে। আর একটি নেকি দশগুণে বৃদ্ধি পাবে। আমি এটা বলছি না যে, “আলিফ, লাম, মিম” একটি হরফ। বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ, মিম একটি হরফ।' ৫৮ হযরত আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَا اجْتَمَعَ قَوْمُ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللَّهِ تَعَالَى يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَيَتَدَارَسُونَهُ بَيْنَهُمْ إِلَّا نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفَّتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ وَذَكَرَهُمُ اللَّهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ ".
যখন কোনো সম্প্রদায় আল্লাহর কোনো ঘরে সমবেত হয়ে কুরআন তিলাওয়াত করে এবং পরস্পরে তা নিয়ে আলোচনা করে, তখন তাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হয়, তাদেরকে রহমত ঢেকে নেয়, ফেরেশতাগণ তাদেরকে ঘিরে রাখে এবং আল্লাহ তাঁর নিকটবর্তী ফেরেশতাদের কাছে তাদের প্রশংসা করেন। ৫৯ হযরত আবু জর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
قُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ أَوْصِني قَالَ عَلَيْكَ بِتَقْوَى اللَّهِ فَإِنَّهُ رَأْسُ الْأَمْرِ كُلِّهِ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ زِدْنِي قَالَ عَلَيْكَ
بِتَلاَوَةِ الْقُرْآنِ فَإِنَّهُ نُوْرٌ لَكَ فِي الْأَرْضِ وَذُخْرٌ لَكَ فِي السَّمَاءِ
‘আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন, “আল্লাহর ভয় অন্তরে লালন করো। আর এটিই সকল বিষয়ের মূল চালিকাশক্তি।” আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল! আরও উপদেশ দিন।” তিনি বললেন, “কুরআন তিলাওয়াতকে আপন করে নাও; তা জমিনে তোমার জন্য হবে আলো স্বরূপ। আর আকাশে সঞ্চয় স্বরূপ।”
গুনাহ ও পাপাচার থেকে দূরে থাকতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে এমন আরও একটি আমল হলো, বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করা। জিকির আল্লাহ তায়ালার অন্যতম উত্তম একটি ইবাদত। মুসলিম নর-নারীর জন্য অত্যন্ত সহজ একটি ইবাদত। আর সর্বোত্তম জিকির হলো, অন্তরের উপস্থিতিসহ মুখে জিকির করা। যে সর্বাবস্থায় আল্লাহর জিকির করবে, শয়তান তার অন্তরে প্রবেশের কোনো গুপ্ত রাস্তা খুঁজে পাবে না।
যে নিরবচ্ছিন্ন জিকির করবে, সে আল্লাহ তায়ালার বড়োত্ব অনুভব করতে পারবে। সব সময় সব স্থানে আল্লাহ তায়ালা তার সঙ্গে আছেন—এই উপলব্ধি অর্জন করতে পারবে। ফলে গুনাহ ও পাপাচাররের গহ্বরে পতিত হওয়া থেকে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। যখনই কোনো ব্যক্তি গুনাহে মনস্থির করবে বা নফস তাকে গুনাহের প্রতি প্রলুব্ধ করবে কিংবা শয়তান গুনাহকে তার সামনে সুসজ্জিত করে পেশ করবে, তখনই আল্লাহর স্মরণ তাকে ঘিরে ফেলবে এবং প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে তার মাঝে এবং গুনাহের কাজটি বাস্তবায়ন করার মাঝে।
মহান আল্লাহ বলেন,
وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرًا عَظِيمًا
'আল্লাহর অধিক জিকিরকারী পুরুষ ও নারী—তাদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপুরস্কার। ৬১
অন্য আয়াতে বলেন,
فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ
'তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদের স্মরণ করব। তোমরা আমার কৃতজ্ঞ হও, অকৃতজ্ঞ হয়ো না।'৬২
আল্লাহ আরও বলেন,
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِيرًا
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো।'৬৩
আবু দারদা রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
ألا أنبئكم بخير أعمالكم وأزكاها عند مليككم وأرفعها في درجاتكم وخير لكم من إنفاق الذهب والورق وخير لكم من أن تلقوا عدوكم فتضربوا أعناقهم ويضربوا أعناقكم قالوا بلى قال ذكر الله فقال مُعَاذُ بْنُ جَبَلٍ مَا شَيْءٌ أَنْجى من عذابِ اللَّهِ من ذِكرِ اللَّهِ
'আমি কি তোমাদেরকে এমন আমলের কথা বলব না, যা তোমাদের জন্য সর্বোত্তম, তোমাদের মালিকের কাছে পবিত্র, তোমাদের স্তর বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে সুউচ্চ, সোনা-রুপা ব্যয় করার চেয়েও যা উত্তম, শত্রুদের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হওয়া এবং পরস্পরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ করার চেয়েও যা মহিমান্বিত? তারা বলল, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল। তিনি বললেন, তা হলো, আল্লাহ তায়ালার জিকির।'
হযরত মুয়াজ বিন জাবাল রাদি. বলেন, 'আল্লাহর আজাব থেকে নিষ্কৃতি দানকারী জিকিরের চেয়ে উত্তম কোনো আমল নেই।' ৬৪
আল্লাহর জিকির যেমন গুনাহ ও পাপাচার থেকে রক্ষা করে, তেমনই অধিক ইবাদতের পথ সুগম করে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ عَجَزَ مِنْكُمْ عَنِ اللَّيْلِ أَنْ يُكَابِدَهُ وبَخِلَ بالمال أن يُنْفِقَهُ وجبن عن العدو أن يجاهدهُ فليُكْثِر من ذِكْرِ اللَّهِ.
'যে ব্যক্তি রাতের বেলা ইবাদত করতে সক্ষম নয়, ধন-সম্পদ ব্যয় করতে কুণ্ঠাবোধ করে এবং শত্রুর মোকাবেলায় ভীতু, সে যেন বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করে।'৬৫
তাই বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করুন। জিকির পরিশ্রমসাধ্য কোনো কাজ নয়। একটা চিত্র কল্পনা করে দেখুন, আপনি গাড়িতে আছেন এবং প্রচণ্ড জ্যামে আটকে আছেন। এখান থেকে মুক্ত হতে ঘণ্টাখানেক লেগে যেতে পারে। যদি সেই সময়টুকু অবহেলায় না কাটিয়ে জিকিরের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন, তাহলে ভেবে দেখুন তো, আপনার সওয়াবের হিসাব কত প্রলম্বিত হবে! এমন সুযোগগুলোর সদ্ব্যবহার করে জীবনকে অর্থবহ করে তোলার চেষ্টা করুন। অবহেলায় নষ্ট করে দেবেন না।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের জানা উচিত, আমরা অন্তরকে যদি ভালো কোনো কাজে লিপ্ত না রাখি, তাহলে অন্তর খারাপ বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যাবে। যে অবসর সময় কাটায় এবং ইবাদতেও তার গতি শ্লথ, তার অন্তর কখনো তাকে ভালো পথের দিশা দেবে না; বরং আল্লাহর রাস্তা থেকে সরিয়ে ধূমপান, মদ্যপান, জিনা-ব্যভিচার, চুরি-ডাকাতি ইত্যাদি বিভিন্ন হারাম ও অশ্লীল কাজে জড়িয়ে দিতে উৎসাহিত করবে।
অতএব, যে সমস্ত কাজ করলে আপনার উপকার হবে সেগুলোর সাথে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। ধ্বংস ও বিনাশের সমস্ত পথ থেকে পরিপূর্ণ সতর্ক থেকে নিজেকে হেফাজত করুন।

টিকাঃ
৫০ মুসলিম শরিফ। সহিহ ইবনে হিব্বান : ৭৩১৩
৫১ সুরা বাকারা: ১৮৬
৫২ সুনানে তিরমিজি: ৩৫৭৩
৫৩ সুরা আলে-ইমরান: ৮
৫৪ সুরা আনকাবুত : ৪৫
৫৫ ফাতির : ২৯
৫৬ ইউনুস: ৫৭
৫৭ ইসরা: ৮২
৫৮ সুনানে তিরমিজি: ২৯১০
৫৯ মুসলিম: ৬৭৪৬, আবু দাউদ: ১৪৫৫
৬০ ইবনে হিব্বান। আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব: ২/২৯৮।
৬১ সুরা আহযাব: ৩৫
৬২ সুরা বাকারা: ১৫২
৬৩ সুরা আহযাব: ৪১
৬৪ সহিহ মুসলিম: ১২২১
৬৫ তাবারানি: ১১১২১। মুসনাদে বাযযার: ৪৯০৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00